নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় গত দুই মাসে পৃথক চারটি হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ২৪ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- কেন থামছে না এই হত্যাকাণ্ড?
সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদুল ইসলাম বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আলোচিত সন্ত্রাসী শেখ সিফাতসহ তার বাহিনীর আরও ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও স্থানীয় অপরাধচক্রের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বুলবুলের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তিনি বন্দরের সালেহনগর এলাকায় থাকতেন।
ঘটনাটি ৫ আগস্টের। বন্দরের এক বাসায় চাকরি করতেন রাসেল (২২)। সেদিন রাতে মোবাইলে গেম খেলছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তার বন্ধু মিলন তার ফোন কেড়ে নেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাসেল মিলনকে চড় থাপ্পড় মারে। এর জের ধরে পরদিন ৬ আগস্ট দুপুরে মিলনের ছোট ভাই সজিব (১৯) ও তার বন্ধু সাগর (২৪) রাসেলের ওপর হামলা চালায়। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন রাসেল। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনায় সজিব ও সাগরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ৪ জুলাই বন্দরের তালতলা এলাকার একটি ডোবা থেকে অটোরিকশাচালক মাছুম রানার (৩৫) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ছয় দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, মাছুমের সঙ্গে কথাকাটাকাটির জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রাসেল ও জুম্মন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২৬ জুন মুছাপুর ইউনিয়নের কুলচর এলাকায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান আব্দুল মোতালিব (৬৪)। এ ঘটনায় প্রধান আসামি মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার এজাহারভুক্ত আরও কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
পরপর এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার করলেই হবে না- মাদক, কিশোর গ্যাং ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘এখানে এখন আর নিরাপদে ঘুমানো যায় না। রাতে ঘর থেকে বের হওয়া মানেই মৃত্যুর মুখে পা দেওয়া। গ্যাং-মাদক-অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বুলবুল হত্যাকাণ্ডসহ বন্দরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি ও ইভটিজিং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘বন্দর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দুঃখজনক। দুই মাসে চারটি হত্যাকাণ্ডের কারণে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি না।’
শেখ সিফাতের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘সিফাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সবসময় তৎপর ছিল। বিভিন্ন ঘটনার পর সে আত্মগোপনে চলে যেত। এবার অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।’
শুধু হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চান স্থানীয়রা। মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা। পুলিশের সেই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর- সেটাই এখন দেখার পালা।

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় গত দুই মাসে পৃথক চারটি হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ২৪ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- কেন থামছে না এই হত্যাকাণ্ড?
সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদুল ইসলাম বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আলোচিত সন্ত্রাসী শেখ সিফাতসহ তার বাহিনীর আরও ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও স্থানীয় অপরাধচক্রের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বুলবুলের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তিনি বন্দরের সালেহনগর এলাকায় থাকতেন।
ঘটনাটি ৫ আগস্টের। বন্দরের এক বাসায় চাকরি করতেন রাসেল (২২)। সেদিন রাতে মোবাইলে গেম খেলছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তার বন্ধু মিলন তার ফোন কেড়ে নেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাসেল মিলনকে চড় থাপ্পড় মারে। এর জের ধরে পরদিন ৬ আগস্ট দুপুরে মিলনের ছোট ভাই সজিব (১৯) ও তার বন্ধু সাগর (২৪) রাসেলের ওপর হামলা চালায়। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন রাসেল। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনায় সজিব ও সাগরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ৪ জুলাই বন্দরের তালতলা এলাকার একটি ডোবা থেকে অটোরিকশাচালক মাছুম রানার (৩৫) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ছয় দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, মাছুমের সঙ্গে কথাকাটাকাটির জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রাসেল ও জুম্মন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২৬ জুন মুছাপুর ইউনিয়নের কুলচর এলাকায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান আব্দুল মোতালিব (৬৪)। এ ঘটনায় প্রধান আসামি মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার এজাহারভুক্ত আরও কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
পরপর এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার করলেই হবে না- মাদক, কিশোর গ্যাং ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘এখানে এখন আর নিরাপদে ঘুমানো যায় না। রাতে ঘর থেকে বের হওয়া মানেই মৃত্যুর মুখে পা দেওয়া। গ্যাং-মাদক-অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বুলবুল হত্যাকাণ্ডসহ বন্দরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি ও ইভটিজিং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘বন্দর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দুঃখজনক। দুই মাসে চারটি হত্যাকাণ্ডের কারণে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি না।’
শেখ সিফাতের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘সিফাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সবসময় তৎপর ছিল। বিভিন্ন ঘটনার পর সে আত্মগোপনে চলে যেত। এবার অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।’
শুধু হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চান স্থানীয়রা। মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা। পুলিশের সেই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর- সেটাই এখন দেখার পালা।

আপনার মতামত লিখুন