রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল ১০টা। সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ভিডিও কলে আট মাসের ছেলে তাসরিফকে দেখছিলেন সোহেল রানা সুমন (৩০)। মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে হাসছিল শিশুটি। কে জানত, সেই হাসিই হবে বাবা-ছেলের শেষ দেখা! কয়েক ঘণ্টা পরেই রিয়াদের এক সোফা তৈরির কারখানার আগুনে নিভে যায় সোহেলের জীবনপ্রদীপ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে সোহেলের নিথর দেহ যখন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের মাতম। আট মাসের শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক স্ত্রী আমেনা (২৩)। স্বামীকে হারানোর শোকের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আগামীর অনিশ্চয়তা।
সোহেলের বাড়ির মতো একই হাহাকার এখন আত্রাইয়ের আরও ছয়টি পরিবারে। রিয়াদের সেই অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর সাত প্রবাসীর মরদেহ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দেশে আসার পর শুক্রবার (২৮ আগস্ট) তাদের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।
একসঙ্গে সাতজনের জানাজা
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে এই সাতজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান ও আত্রাই থানার ওসি মাহবুব আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কয়েক হাজার স্থানীয় মানুষ অংশ নেন।
জানাজা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে রিয়াদে শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ দেশে পৌঁছালে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে রাত দেড়টার দিকে সাতজনের মরদেহ আত্রাইয়ে আনা হয়।
জমি বেঁচে বিদেশে, ফিরলেন নিথর
নিহত সোহেল রানার গল্পটি ছিল চরম সংগ্রামের। দেড় বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের হাল ধরতে পৈতৃক দেড় বিঘা জমি ও মায়ের সামান্য অলংকার বিক্রি করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে সুন্দর করে সংসার সাজাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রিয়াদের কারখানায়। সোহেলের মা স্বপ্না বেগম এখন দিশেহারা। স্বামী হারানোর পর একমাত্র পুত্রকেও হারালেন তিনি।
রিয়াদের অগ্নিকাণ্ড ও শনাক্ত ৭ জন
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ১৬ জন মারা যান। তাদের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন নওগাঁর। ধাপে ধাপে মরদেহ শনাক্তের পর এখন পর্যন্ত আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ দেশে এল।
শনাক্ত হওয়া সাতজন হলেন - আত্রাইয়ের উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, মোহন আলী, সুমন আলী ও কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা সুমন এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরদার।
সহযোগিতার আশ্বাস
সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, ‘নিহতদের পরিবারগুলোকে ওয়েজ অর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাঁদের পাশে থাকবে সরকার। বাকি মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’
আপনার মতামত লিখুন