সংবাদ

হিমালয়ের বরফ গলায় বিপর্যয়, বিপদে বাংলাদেশও


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম

হিমালয়ের বরফ গলায় বিপর্যয়, বিপদে বাংলাদেশও
স্যাটেলাইট ছবিতে হিমালয় থেকে বেরিয়ে আসা নদীগুলো।

নেপাল–তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ ঢল দেখিয়ে দিল পাহাড়ের বিপদ কত দ্রুত নিচের জনপদে নেমে আসতে পারে। হিমবাহ সঙ্কুচিত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে অস্থির হিমবাহ-হ্রদ। বাড়ছে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি। আর হিমালয়ের পানি যে নদীগুলো দিয়ে বাংলাদেশে আসে, সেই নদী অববাহিকাতেই তৈরি হচ্ছে নতুন অনিশ্চয়তা।

গেল ২৬ আগস্ট সকালেও নেপাল–তিব্বত সীমান্তের পাহাড়গুলো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই পাহাড় থেকে নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদীর পানি বাড়েনি। মনে হলো যেন পাহাড়ের একটি অংশই নদী হয়ে নিচে নেমে এসেছে।

পরে স্যাটেলাইট ছবি ও ভূকম্পন-তথ্য বিশ্লেষণে সামনে আসে। হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। বরফের সঙ্গে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মিশে তৈরি হয় প্রবল ‘কাদা-পাথরের ঢল’।

ঘটনাটি নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে। কিন্তু এর অভিঘাতের গল্প কেবল নেপালেই শেষ হয় না। কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদী শেষ পর্যন্ত ভারত হয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে।

তাই নেপালের এই বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- হিমালয়ের বরফ দ্রুত কমে গেলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?উত্তর দিতে গেলে জানতে হবে সেই বরফের ইতিহাস যা বাংলাদেশের নদীগুলো তৈরি করেছে।

বরফে আচ্ছাদিত হিমালয়

বরফগলা নদী

বাংলাদেশকে অনেক সময় নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নদীগুলোর বড় একটি অংশের গল্প শুরু হয়েছে দেশের সীমানার বহু ওপরে- হিমালয়ের বরফ ও তুষারে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ বৃহৎ নদী অববাহিকার পানি আসে বৃষ্টি, তুষার ও হিমবাহের গলন থেকে। হিমালয়ের পরিবর্তন তাই বাংলাদেশের পানি, কৃষি, বন্যা, নদীর প্রবাহ এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। তাদের আনুমানিক বরফের মজুত প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ২০০০ সালের পর বরফ হারানোর গতি আরও বেড়েছে।

অর্থাৎ পাহাড়ে যে পরিবর্তনটি আজ চোখে পড়ছে, সেটি শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য হারানোর গল্প নয়। এটি নিচের দুই বিলিয়নের বেশি মানুষের পানি ও জীবিকার প্রশ্ন। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র-এর মূল্যায়নেও হিন্দুকুশ–হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তনকে এ অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হিমালয়ের ভূ-বৈচিত্র্য

বড় বিপদটি অদ্ভুত

সবচেয়ে বড় বিপদটি বড়ই অদ্ভুত। হিমবাহ গলে যাচ্ছে- শুনলে মনে হতে পারে, এতে তো নদীতে বেশি পানি আসবে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো সময় ও প্রবাহের ভারসাম্য।  উষ্ণতা বাড়লে প্রথম পর্যায়ে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে। এতে নদীতে অতিরিক্ত পানি যোগ হয়। বর্ষায় যখন বৃষ্টির পানিও বেশি থাকে, তখন সেই অতিরিক্ত গলিত পানি বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হতে হতে একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন গলানোর মতো বরফই কমে যায়। তখন শুষ্ক মৌসুমে নদীতে হিমবাহ-নির্ভর পানির সরবরাহ কমতে পারে। অর্থাৎ একই পরিবর্তন একদিকে অতিরিক্ত পানির ঝুঁকি, অন্যদিকে ভবিষ্যতে পানির ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ে পানি প্রাপ্যতা শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দীর্ঘমেয়াদে কমতে পারে।

হিমবাহ গললে ‍উপচে যাবে খাদ

আসছে ‘হঠাৎ’ বিপদ

বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশের জন্য এ এক ভয়ংকর বৈপরীত্য। ফলে শুধু বন্যা নয়, আসছে ‘হঠাৎ’ বিপদ। নেপাল–তিব্বতের সাম্প্রতিক ঘটনা এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক দেখিয়েছে। হিমবাহ গলে শুধু নদীর পানি বাড়ে না। পাহাড়ের ওপর তৈরি হতে পারে হিমবাহ-হ্রদ। কোনো কারণে সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে বিপুল পানি নিচে নেমে আসে। একে বলা হয় বরফগলা হ্রদ ভেঙে সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্ল্যাড বা জিএলওএফ।

এর সঙ্গে ভূমিধস, বরফধস ও পাথরের ধস যুক্ত হলে বিপর্যয় আরও ভয়ংকর হয়। আইসিআইএমওডি বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একাধিক ঝুঁকি এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে- ভূমিধস, হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বন্যা, আকস্মিক ঢলসহ একাধিক বিপদ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। নেপালের এবারের ঘটনা সেই ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ’ বাস্তবতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে কি সেই ঢল এসে পড়বে? এ প্রশ্নের উত্তরে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। নেপাল–তিব্বত সীমান্তের এবারের ঢল সরাসরি বাংলাদেশের দিকে আসছে না। ঘটনাটি মূলত ভোতে কোশি–ত্রিশূলী–নারায়ণী/গণ্ডক নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এবারের বন্যার পানি একই শক্তিতে বাংলাদেশে এসে পড়বে- এমন আশঙ্কার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মানচিত্রে গোটা হিমালয়

বাংলাদেশে বিপদ অন্য জায়গায়

তবে বাংলাদেশের জন্য বিপদটি অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ একই বৃহৎ হিমালয়-নির্ভর নদী ব্যবস্থার ভাটিতে অবস্থান করছে। ফলে হিমালয়ে বরফ, তুষার, বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের চরিত্র বদলালে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো অববাহিকায়। আর বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

উজানে পরিবর্তন মানেই বর্ষার অতিবৃষ্টি। যা থেকে আসে নদীর পলি। সেই পলি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করে। এই একাধিক চাপ একই সময়ে কাজ করলে বন্যার ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতিতে গঙ্গা, যমুনা ও পদ্মার বন্যা-ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও পরিবর্তিত প্রবাহ ও বন্যা-ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ভয় শুধু পানির নয়

হিমালয়ের পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে- নদীর অনিশ্চয়তা। কখন বেশি পানি আসবে, কখন কম আসবে, কোন বছর বন্যা হবে, কোন বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকবে- এসবের পূর্বাভাস আরও কঠিন হতে পারে।

কৃষির জন্য এর অর্থ বড়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ফসল নষ্ট করতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে সেচ, নৌপরিবহন ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের সংকট হয়তো শুধু ‘বন্যা’ বনাম ‘খরা’ নয়। বরং একই নদী ব্যবস্থায় কখনো অতিরিক্ত পানি, কখনো পানির ঘাটতি- এই অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা- বাংলাদেশ একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না হিমালয়ের বরফ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নেই। নদীর উজানও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে বাংলাদেশের পানি-নিরাপত্তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে সীমান্তের ওপারের পাহাড়, নদী, বাঁধ, হিমবাহ এবং আবহাওয়ার ওপর।

এই বাস্তবতায় শুধু দেশের ভেতরে বাঁধ নির্মাণ বা নদী খনন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পুরো নদী অববাহিকাকে একক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা। নেপাল, ভারত, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশ- এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, নদীর রিয়েল-টাইম প্রবাহের তথ্য, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আকস্মিক বন্যা সতর্কতা এবং আকস্মিক ঢলের আগাম বার্তা ভাগাভাগি করা ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইসিআইএমওডি ও আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা, উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নদী অববাহিকা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে।

নদী বয়ে চলে

আমাদের ভবিষ্যৎ লিখছে হিমালয়

নেপালের এবারের বিপর্যয়কে তাই বিচ্ছিন্ন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একদিকে, পাহাড়ে বরফ কমছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে নতুন হিমবাহ-হ্রদ। কোথাও অস্থিতিশীল বরফ-পাথর ভেঙে পড়ছে। আর তার সঙ্গে কখনো অতিরিক্ত পানি নেমে আসছে, আবার দীর্ঘমেয়াদে কমে যেতে পারে হিমবাহ-নির্ভর পানির সরবরাহ।

এই পরিবর্তনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। হিমালয়ে একটি হিমবাহ ভাঙলে ঢল নামে নেপালে। নদী ফুলে ওঠে ভারতে। আর তার দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুগত অভিঘাত পৌঁছাতে পারে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশের জন্য হিমালয়ের বরফ গলার খবর কোনো দূর পাহাড়ের খবর নয়।

এটি বাংলাদেশের নদীর খবর। কৃষির খবর। পানির খবর। খাদ্যনিরাপত্তার খবর। এমনকি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের খবর। আর নেপাল–তিব্বতের সাম্প্রতিক বিপর্যয় হয়তো সেই ভবিষ্যতের একটি ভয়ংকর ট্রেলার মাত্র।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬


হিমালয়ের বরফ গলায় বিপর্যয়, বিপদে বাংলাদেশও

প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নেপাল–তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ ঢল দেখিয়ে দিল পাহাড়ের বিপদ কত দ্রুত নিচের জনপদে নেমে আসতে পারে। হিমবাহ সঙ্কুচিত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে অস্থির হিমবাহ-হ্রদ। বাড়ছে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি। আর হিমালয়ের পানি যে নদীগুলো দিয়ে বাংলাদেশে আসে, সেই নদী অববাহিকাতেই তৈরি হচ্ছে নতুন অনিশ্চয়তা।

গেল ২৬ আগস্ট সকালেও নেপাল–তিব্বত সীমান্তের পাহাড়গুলো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই পাহাড় থেকে নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদীর পানি বাড়েনি। মনে হলো যেন পাহাড়ের একটি অংশই নদী হয়ে নিচে নেমে এসেছে।

পরে স্যাটেলাইট ছবি ও ভূকম্পন-তথ্য বিশ্লেষণে সামনে আসে। হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। বরফের সঙ্গে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মিশে তৈরি হয় প্রবল ‘কাদা-পাথরের ঢল’।

ঘটনাটি নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে। কিন্তু এর অভিঘাতের গল্প কেবল নেপালেই শেষ হয় না। কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদী শেষ পর্যন্ত ভারত হয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে।

তাই নেপালের এই বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- হিমালয়ের বরফ দ্রুত কমে গেলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?উত্তর দিতে গেলে জানতে হবে সেই বরফের ইতিহাস যা বাংলাদেশের নদীগুলো তৈরি করেছে।

বরফে আচ্ছাদিত হিমালয়

বরফগলা নদী

বাংলাদেশকে অনেক সময় নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নদীগুলোর বড় একটি অংশের গল্প শুরু হয়েছে দেশের সীমানার বহু ওপরে- হিমালয়ের বরফ ও তুষারে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ বৃহৎ নদী অববাহিকার পানি আসে বৃষ্টি, তুষার ও হিমবাহের গলন থেকে। হিমালয়ের পরিবর্তন তাই বাংলাদেশের পানি, কৃষি, বন্যা, নদীর প্রবাহ এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। তাদের আনুমানিক বরফের মজুত প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ২০০০ সালের পর বরফ হারানোর গতি আরও বেড়েছে।

অর্থাৎ পাহাড়ে যে পরিবর্তনটি আজ চোখে পড়ছে, সেটি শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য হারানোর গল্প নয়। এটি নিচের দুই বিলিয়নের বেশি মানুষের পানি ও জীবিকার প্রশ্ন। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র-এর মূল্যায়নেও হিন্দুকুশ–হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তনকে এ অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হিমালয়ের ভূ-বৈচিত্র্য

বড় বিপদটি অদ্ভুত

সবচেয়ে বড় বিপদটি বড়ই অদ্ভুত। হিমবাহ গলে যাচ্ছে- শুনলে মনে হতে পারে, এতে তো নদীতে বেশি পানি আসবে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো সময় ও প্রবাহের ভারসাম্য।  উষ্ণতা বাড়লে প্রথম পর্যায়ে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে। এতে নদীতে অতিরিক্ত পানি যোগ হয়। বর্ষায় যখন বৃষ্টির পানিও বেশি থাকে, তখন সেই অতিরিক্ত গলিত পানি বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হতে হতে একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন গলানোর মতো বরফই কমে যায়। তখন শুষ্ক মৌসুমে নদীতে হিমবাহ-নির্ভর পানির সরবরাহ কমতে পারে। অর্থাৎ একই পরিবর্তন একদিকে অতিরিক্ত পানির ঝুঁকি, অন্যদিকে ভবিষ্যতে পানির ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ে পানি প্রাপ্যতা শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দীর্ঘমেয়াদে কমতে পারে।

হিমবাহ গললে ‍উপচে যাবে খাদ

আসছে ‘হঠাৎ’ বিপদ

বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশের জন্য এ এক ভয়ংকর বৈপরীত্য। ফলে শুধু বন্যা নয়, আসছে ‘হঠাৎ’ বিপদ। নেপাল–তিব্বতের সাম্প্রতিক ঘটনা এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক দেখিয়েছে। হিমবাহ গলে শুধু নদীর পানি বাড়ে না। পাহাড়ের ওপর তৈরি হতে পারে হিমবাহ-হ্রদ। কোনো কারণে সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে বিপুল পানি নিচে নেমে আসে। একে বলা হয় বরফগলা হ্রদ ভেঙে সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্ল্যাড বা জিএলওএফ।

এর সঙ্গে ভূমিধস, বরফধস ও পাথরের ধস যুক্ত হলে বিপর্যয় আরও ভয়ংকর হয়। আইসিআইএমওডি বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একাধিক ঝুঁকি এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে- ভূমিধস, হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বন্যা, আকস্মিক ঢলসহ একাধিক বিপদ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। নেপালের এবারের ঘটনা সেই ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ’ বাস্তবতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে কি সেই ঢল এসে পড়বে? এ প্রশ্নের উত্তরে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। নেপাল–তিব্বত সীমান্তের এবারের ঢল সরাসরি বাংলাদেশের দিকে আসছে না। ঘটনাটি মূলত ভোতে কোশি–ত্রিশূলী–নারায়ণী/গণ্ডক নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এবারের বন্যার পানি একই শক্তিতে বাংলাদেশে এসে পড়বে- এমন আশঙ্কার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মানচিত্রে গোটা হিমালয়

বাংলাদেশে বিপদ অন্য জায়গায়

তবে বাংলাদেশের জন্য বিপদটি অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ একই বৃহৎ হিমালয়-নির্ভর নদী ব্যবস্থার ভাটিতে অবস্থান করছে। ফলে হিমালয়ে বরফ, তুষার, বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের চরিত্র বদলালে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো অববাহিকায়। আর বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

উজানে পরিবর্তন মানেই বর্ষার অতিবৃষ্টি। যা থেকে আসে নদীর পলি। সেই পলি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করে। এই একাধিক চাপ একই সময়ে কাজ করলে বন্যার ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতিতে গঙ্গা, যমুনা ও পদ্মার বন্যা-ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও পরিবর্তিত প্রবাহ ও বন্যা-ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ভয় শুধু পানির নয়

হিমালয়ের পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে- নদীর অনিশ্চয়তা। কখন বেশি পানি আসবে, কখন কম আসবে, কোন বছর বন্যা হবে, কোন বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকবে- এসবের পূর্বাভাস আরও কঠিন হতে পারে।

কৃষির জন্য এর অর্থ বড়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ফসল নষ্ট করতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে সেচ, নৌপরিবহন ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের সংকট হয়তো শুধু ‘বন্যা’ বনাম ‘খরা’ নয়। বরং একই নদী ব্যবস্থায় কখনো অতিরিক্ত পানি, কখনো পানির ঘাটতি- এই অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা- বাংলাদেশ একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না হিমালয়ের বরফ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নেই। নদীর উজানও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে বাংলাদেশের পানি-নিরাপত্তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে সীমান্তের ওপারের পাহাড়, নদী, বাঁধ, হিমবাহ এবং আবহাওয়ার ওপর।

এই বাস্তবতায় শুধু দেশের ভেতরে বাঁধ নির্মাণ বা নদী খনন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পুরো নদী অববাহিকাকে একক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা। নেপাল, ভারত, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশ- এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, নদীর রিয়েল-টাইম প্রবাহের তথ্য, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আকস্মিক বন্যা সতর্কতা এবং আকস্মিক ঢলের আগাম বার্তা ভাগাভাগি করা ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইসিআইএমওডি ও আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা, উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা এবং নদী অববাহিকা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে।

নদী বয়ে চলে

আমাদের ভবিষ্যৎ লিখছে হিমালয়

নেপালের এবারের বিপর্যয়কে তাই বিচ্ছিন্ন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একদিকে, পাহাড়ে বরফ কমছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে নতুন হিমবাহ-হ্রদ। কোথাও অস্থিতিশীল বরফ-পাথর ভেঙে পড়ছে। আর তার সঙ্গে কখনো অতিরিক্ত পানি নেমে আসছে, আবার দীর্ঘমেয়াদে কমে যেতে পারে হিমবাহ-নির্ভর পানির সরবরাহ।

এই পরিবর্তনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। হিমালয়ে একটি হিমবাহ ভাঙলে ঢল নামে নেপালে। নদী ফুলে ওঠে ভারতে। আর তার দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুগত অভিঘাত পৌঁছাতে পারে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশের জন্য হিমালয়ের বরফ গলার খবর কোনো দূর পাহাড়ের খবর নয়।

এটি বাংলাদেশের নদীর খবর। কৃষির খবর। পানির খবর। খাদ্যনিরাপত্তার খবর। এমনকি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের খবর। আর নেপাল–তিব্বতের সাম্প্রতিক বিপর্যয় হয়তো সেই ভবিষ্যতের একটি ভয়ংকর ট্রেলার মাত্র।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত