সংবাদ

মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি

নাগিব মাহফুজের দু’টি গল্প


অনুবাদ: ফজল হাসান
অনুবাদ: ফজল হাসান
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:২১ এএম

নাগিব মাহফুজের দু’টি গল্প
নাগিব মাহফুজ (জন্ম: ডিসেম্বর ১১, ১৯১১ - মৃত্যু: আগস্ট ৩০, ২০০৬)


ভাগ্য

আপনি নিঁখুতভাবে জানেন না কখন ঘটনার সূত্রপাত ঘটতে পারে। যারা ঘটনা দেখেছে, তাদের কাছে বিবরণ হলো নিজস্ব সংস্করণ। সময় তার ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। পানি বিক্রেতা উম্ম হিফনি যা বলেছিলেন, তা হলো:

‘আমি মধু দিয়ে তৈরি কিছু পিঠা কেনার জন্য, যাতে অতিরিক্ত সবজির চর্বি ছিল, পেস্ট্রির দোকানে গিয়েছিলাম। সে কিছু খামির নেয়, বেলুন দিয়ে পাতলা করে এবং হাতের তালু দিয়ে মসৃণ করে। কিন্তু একসময় সে হাতের কাজ বন্ধ করে এবং কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি স্তম্ভিত। আমি তাকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি এবং কীভাবে সাহায্য করতে পারি, তা-ও বলেছি। কিন্তু সে অনবরত কাঁদতে থাকে, দু’হাত ঘষতে থাকে এবং পুনরায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। তার দোকানের সম্মুখে লোকজন জমায়েত হয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার পরিবারের লোকজন আসে। তারা তাকে বাড়ি নিয়ে যায় এবং তখনও সে কাঁদছিল।’

এক মহিলা, যিনি আচারযুক্ত শাকসবজি বিক্রি করেন, বললেন:

‘সিত্তি উম্ম আলী আমার দোকানে আচারযুক্ত শাকসবজি কিনতে একটি গামলা নিয়ে এসেছিলেন। একসময় তিনি শশা এবং ফালাফেলের দিকে আঙুল তোলেন, কিন্তু তারপর তিনি হঠাৎ থেমে যান এবং তার অভিব্যক্তি বরফের মতো জমে যায়। তিনি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার শুরু করেন এবং সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কান্না আরও জোরে এবং অত্যধিক পরিমাণে বাড়তে থাকে। আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়; আমি চিন্তিত ছিলাম এ কারণে যে, আমি কি এমন কিছু করেছি যার জন্য তিনি দুঃখ পেয়েছেন। লোকজন চারপাশে জড়ো হয়। তার স্বামী চটজলদি দোকান থেকে আসেন এবং তাকে বাড়ি নিয়ে যান। প্রত্যেকেই হতবাক এবং বিস্মিত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।’

এসব কাহিনী বহু গুণে বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ বিস্তার লাভ করে। পুরুষ এবং মহিলা মিলিয়ে অনেক ভুক্তভোগী ছিলেন। যখন মহল্লার প্রধানের কাছে সংবাদ পৌঁছে, তিনি ভীষণ ক্রুদ্ধ হন।

‘তোমরা কখনও অবিশ্বাস্য এবং মিথ্যা কথা বন্ধ করতে পারো না’, তিনি বললেন। 

যাহোক, যখন তিনি দেখলেন যে একজন প্রহরী কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তৎক্ষণাৎ তিনি লোকজনকে দোষারোপ করা থামিয়ে দেন এবং চটজলদি উপসংহারে পৌছেন।

‘তাহলে এখন আমাদের মহল্লায় নতুন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে’, তিনি মসজিদের ইমামকে বললেন। ‘বিপর্যয় সৃষ্টির মাধ্যমে মহল্লা কখনই পরিপূর্ণ হয় না।’

‘লোকজন গরম পানিতে গোসল এবং শীতল পানীয় পান করে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভ করছে’, জবাবে ইমাম বললেন।

গোসল-পরিচারক উম্মি হানিয়া কাছাকাছি ছিলেন।

‘এ থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় হলো’, তিনি বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পাঠ।’

‘ঘটনার সঙ্গে কী শয়তান জড়িত?’ ইমাম জিজ্ঞেস করেন।

‘কোনও কারণ ছাড়া কেউ কাঁদে না’, উম্মি হানিয়া বললেন। ‘একমাত্র ব্যতিক্রম হলো যদি ভূত কাউকে স্পর্শ করে; সেই ক্ষেত্রে ঝাড়ফুঁক করলে ভূত তাকে ছেড়ে চলে যাবে।’

‘আমি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই’, মহল্লার প্রধান বললেন, ‘যে পুরো মহল্লা আক্রান্ত হয়েছে। যাহোক, আমি বিষয়টি স্বাস্থ্য পরিদর্শককে অবহিত করব।’ 

তিনি যথাযথভাবে মহামান্য স্বাস্থ্য পরিদর্শকের কাছে যান এবং পুরো ঘটনা বলেন।

‘আপনি বিভ্রম থেকে বাস্তবকে আলাদা করছেন না’, পরিদর্শকের জবাব ছিল।

তারপর মহল্লার প্রধান শপথ করে বললেন যে, তিনি নিজের চোখে অশ্রুকণা অনুভব করেছেন; প্রতিটি বাড়ি আক্রান্ত হয়েছে। পরদিন সকালে পরিদর্শক একজন প্রহরী এবং একজন সেবিকা নিয়ে মহল্লার বাসিন্দাদের দেখতে যান। লোকজন ছুটে আসে:

‘আমাদের রক্ষা করুন, মহামান্য!’ তারা সবাই চিৎকার করে বলল। 

তিনি কুদ্ধ হয়ে লোকজনের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকান এবং তার রাগ প্রশমিত হয় যখন তিনি দেখতে পেলেন যে, পুরুষ ও মহিলা সবাই বিলাপ করছে। 

‘আপনাদের জীবনযাত্রায় কী নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে?’ পরিদর্শক মহল্লার প্রধানকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যা হয়তো বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে।’ 

‘না, জনাব, একেবারেই নতুন কিছু হয়নি। আমাদের জীবন সুখ-দুঃখ নিয়ে যেমন ছিল, তেমনই আছে।’

পরিদর্শক এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যান। তিনি মহল্লার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে বেড়ান। তিনি কোনও দোকান, ক্যাফে, ঝরনা, কোরান শিক্ষার প্রতিষ্ঠান অথবা জন্তু-জানোয়ার বাদ দেননি; তিনি গাধা এবং খচ্চরদের পর্যবেক্ষণ করেছেন, এমনকি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখেছেন পুরনো দূর্গের দেওয়াল ও ভূগর্ভস্থ বাড়িঘর। তিনি মহল্লার প্রধানের ঘরে বসেন। তিনি ক্লান্ত এবং দূরের পানে তাকিয়ে থাকেন। ঠিক সেই সময় দোকানের সম্মুখে জমায়েত হওয়া জনতার ভিড় থেকে উম্মি হানিয়ার কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসে: 

‘ভূত তাড়ানোর আচার-অনুষ্ঠান!’ তিনি আর্তচিৎকার করে বললেন। ‘একমাত্র মুক্তির পথ, মহামান্য।’

‘চুপ করো, তুমি!’ মহল্লার প্রধান রাগান্বিত হয়ে চিৎকার করে বললেন। 

মহল্লার প্রধান আশা করছিলেন যে, পরিদর্শক কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি চুপ করে থাকেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ক্রমশ আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অবশেষে মহল্লার প্রধান সিদ্ধান্ত নেন যে, পরিদর্শক হয়তো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবেন।

ওস্তাদ হাসান, যিনি সঙ্গীত শিল্পী এবং স্থানীয় ক্যাবারের মালিক, একই দৃশ্য অবলোকন করেন। তিনি মহল্লার প্রধানকে পরামর্শ দেন যে, তিনি যেন পরিদর্শককে তার বাড়িতে নিয়ে যান, যাতে পরিদর্শক ঝরণার পাশে বিশ্রাম নিতে পারেন। তিনি পরিদর্শকের জন্য শীতল পানীয় তৈরি করবেন এবং তাজা ফুলের ব্যবস্থা করবেন। সবাইকে বাড়তি ঝামেলা থেকে বাঁচানোর জন্য মহল্লার প্রধান তৎক্ষণাৎ ওস্তাদ হাসানের প্রস্তাব প্রহণ করেন।

সুতরাং পরিদর্শক ওস্তাদ হাসানের বাড়িতে যান। লোকজন তাদের দুর্দশা নিয়ে পুনরায় আলাপ-আলোচনা শুরু করে।

‘তিনি একজন মানুষ’, মহল্লার প্রধান রাগী গলায় বললেন। ‘প্রত্যেকেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।’

যাহোক, সঙ্গীত শিল্পীর বাড়ি থেকে যে আওয়াজ ভেসে আসে, তা হলো স্পন্দনশীল ছন্দ, ঢোলের শব্দ এবং হাততালি। কেউ একজন সঙ্গীত শিল্পীর বাড়ির দিকে মুখ করে তাকিয়ে দেখছিল।

‘তিনি নাচছেন!’ লোকটি চিৎকার করে ওঠে। ‘আর কি সুন্দর সেই নৃত্য!’

লোকটি গায়কের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়:

‘তোমার ভাগ্য তোমাকে খুঁজে পেতে বাধ্য...’

মনে হয় তিনি নাচছেন ও গান পরিবেশন করছেন।

সব মহল্লা থেকে লোকজন এসে ভিড় করে এবং সঙ্গীত শিল্পীর গানের সঙ্গে গাইতে শুরু করে। 

যারা কাঁদছিলেন, হঠাৎ তাদের কান্না থেমে যায়। 

তারা সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।



জীবন একটা খেলা

কোম্পানির সর্বশেষ পদোন্নতির জন্য আমি আলি জাইদানকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলাম।

‘আমি অনুতপ্ত হয়েছি’, তিনি বললেন, ‘অতীতে যা কিছু ঘটেছে, সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করুন।’

‘আমি শুনেছি যে, আপনি আগেও একই কথা অনেকবার বলেছেন’, আমি সন্দেহের সঙ্গে বললাম।

‘কিন্তু এবার’, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘কঠিন সংকল্প নিয়ে এসেছে।’

‘আমি ভাবছি, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কেউ কি বিষয়টি লুকিয়েছে, নাকি সহকর্মীরা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে?’

‘এবার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালো হওয়ার কারণ যে, কোনও কারণ ছাড়াই অনুভূতিগুলো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমি আমার পচে যাওয়া নষ্ট জীবনকে ভিন্ন রূপে পরিবর্তন করতে পেরেছি এবং নতুন জীবনকে স্বাগত জানাতে অনুপ্রাণিত হয়েছি।’

যখন তিনি অতি উত্তেজনার কারণে মাথা ঝিমঝিমানি নিয়ে জেগে ওঠেন, তখন তিনি আবিষ্কার করেন যে, তার নিজের বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের মতো এবং আমাদের এই জগতে তিনি একজন আগুন্তুক। তার কোনও জমানো টাকাপয়সা ছিল না, যার ওপর তিনি ভরসা করতে পারেন। কিন্তু তার ছিল এমন এক কর্মজীবন, যা ভ্যাপসা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। তিনি আমাকে সঙ্গ দেওয়া শুরু করেন এবং আলাপ করার উদ্যোগ নেন, যাতে তিনি নতুন বিশ্ব আবিষ্কার করতে পারেন এবং নিজেকে লোকজনের কার্যকলাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে সম্পৃত্ত করতে পারেন। 

‘সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস আমি জুয়ার টেবিলে হারিয়েছি’, একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি দুশ্চিন্তার চরমে ছিলেন, ‘তা ছিল আমার জীবন, অর্থকড়ি নয়।’   

‘জীবন শুরু হয় ষাটে’, আমি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাকে বলেছিলাম।

‘আমি বিয়ে করতে চাই’, সম্পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন।

‘আমি আমার বোন আফকারের সঙ্গে কথা বলেছি, কেননা বরাবর তিনিই প্রথম আমাকে বিয়ে করার জন্য তাগিদ দিতেন। কিন্তু আমি প্রকৃত অর্থে বিয়ে করতে চেয়েছি।’ 

‘আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?’

‘আমি কোনও ভালো রমণীর কাছ থেকে অবশিষ্ট কিছু খুঁজছি না! আমার পছন্দ একজন যুবতী কুমারী নববধূ, যে দেখতে মোটামুটি ভালো এবং কিছু পড়াশোনা জানে।’ 

‘আজকাল বিয়েশাদী ব্যয়বহুল’, আমি খোলাখুলিভাবে তাকে বলেছি। 

‘আমার বেতন, যা মোটেও খারাপ নয়, উল্লেখ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে’, জবাবে তিনি বললেন। তার কণ্ঠস্বরে অবজ্ঞার সুর বেজে ওঠে। 

‘তাহলে ঠিক আছে। আপনার জীবনে কি কোনও নারী নেই?’

‘প্রেম-ভালোবাসা করার মতো আমার কখনই কোনও সময় ছিল না’, তিনি চোখেমুখে তিক্ততার হাসি ফুটিয়ে বললেন।

এখন আমাদের, অর্থাৎ আফকার হাতেম এবং আমার, মধ্যে যৌথ প্রচেষ্টা শুরু হয়। আমরা প্রথমে আলি জাইদানের পদমর্যাদা এবং বেতন নিয়ে কথাবার্তা আরম্ভ করি; যা বাড়তি তথ্য জানার জন্য নিশ্চিত শ্রোতার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। তবে যখন তার কর্ম জীবনের কথা বলা হয়, তখন আফকার ভ্রু উপরে ওঠে। আলি জাইদান নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে ‘আপনি বলতে চান, সেই জুয়াড়ি?’ আফকারের চিৎকার আমার কানে প্রচণ্ড জোরে আঘাত হানে। সত্যি বলতে কী, আমি বুঝতে পেরেছি যে, কিছু মানুষ, যদিও তারা চুরি এবং ঘুষ উপেক্ষা করতে রাজি, জুয়া এবং জুয়াড়ির কথা শুনলেই বিস্মিত হয়। 

এ খবরটি অবশ্যই আমার বন্ধুকে বলতে হবে। তিনি একই সঙ্গে ক্রুদ্ধ এবং দুঃখিত। আমার মনে হয়েছিল যে, তিনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বুড়ো হয়ে যাচ্ছিলেন।

‘আমি এ পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি না’, তিনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন, ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি একজন স্বামী এবং বাবা হব।’ 

‘আমাদের হতাশ হওয়ার দরকার নেই’, বন্ধু হিসেবে আমি বললাম।

‘এখন আমার একটা কিছুর ওপর ভরসা করতে হবে। আমি শেইখ লাবিবের কাছে গিয়েছিলাম এবং তিনি আমার ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ করেছেন।’ 

আমি হাসি থামাতে পারিনি।

‘আমি বুঝতে পারিনি যে, আপনি এমন একজন মানুষ যিনি এ ধরনের লোকদের বিশ্বাস করেন’, আমি বললাম।

‘হতাশা এর চেয়ে আরও খারাপ পথে নিয়ে যেতে পারে’, দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন।

শেইখ লাবিব সত্য কথাই বলেছিলেন। বুড়ি দালাল, শয়তানী কাজে যার সুনাম রয়েছে, আমাদের মহল্লায় অত্যন্ত পরিচিত মুখ, আমার বন্ধুর সমস্যা জেনেছেন। তার কুড়ি বছর বয়সী এক মেয়ে ছিল। সে ছিল অত্যন্ত সুন্দরী ও উদার মানসিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সৌন্দর্য ও আন্তরিকতা সারা মহল্লার মানুষকে উত্তেজিত করেছিল। বুড়ি দালাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তিনি এই মেয়েটিকে নিজের সংসারে যুক্ত করবেন। কানাঘুষা, টিপন্নি এবং ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে তিনি সুন্দরী তরুণী সুয়াদকে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য বৃদ্ধের পথে এগিয়ে দেন। বৃদ্ধ, যিনি রাগান্বিত এবং মরিয়া, সোনালি ফাঁদে আটকা পড়েন। তিনি তার পরিবারের কোনও প্রতিবাদ শোনেননি এবং সব বন্ধুদের হারিয়েছেন। তিনি মহল্লার সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প হয়ে ওঠেন। 

‘আমি কাউকে আমার সুখ-আনন্দ নষ্ট করতে দেব না’, তিনি অর্থহীন হাসি মুখে আমাকে বলেছেন, ‘এখন দৈবাৎ এই সুযোগ এসেছে।’ আমার হাত ধরে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে থাকা এবং আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি আশা করি আপনিও বিশ্বাস করেন: যখনই আপনাকে এক গ্লাস দেওয়া হবে, তখনই তলানি পর্যন্ত পান করুন।’ 

বছরের পর বছর চলে যায় এবং আলি জাইদানের এক ছেলে ও দুই মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যখন তিনি অবসর গ্রহণ করেন, তখন ছেলেমেয়েরা তাকে তার ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে তার স্ত্রী নিজের রূপ দিয়ে অন্য সব কিছু থেকে তাকে সরিয়ে রাখেন। তার সংসার প্রবাদতুল্য হয়ে ওঠে। যখনই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তিনি বলেন, ‘আমি এখনও জুয়ার টেবিলে হেরে যাচ্ছি।’ 

***

[নোবেলজয়ী মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের মৃত্যু হয় ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, কায়রোতে। তার মৃত্যুর বারো বছর পরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, লেখকের স্বহস্তে লেখা গল্পের পাণ্ডুলিপি ড্রয়ারের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপি সুতোয় বাঁধা ছিল এবং সংযুক্ত লেবেলে লেখা ছিল ‘১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হবে।’ আততায়ীর হাতে জখম হওয়ার কারণে তিনি গল্পগুলো সময় মতো প্রকাশ করতে পারেননি। সেখানে ১৮টি গল্প ছিল এবং প্রতিটি গল্প লেখকের স্মৃতি বিজড়িত কায়রোর বিখ্যাত গামালিয়া মহল্লার বাসিন্দাদের ঘিরে রচিত হয়েছে। গল্পগুলো লেখকের অন্যতম অনুবাদক রজার অ্যালেনের ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য কোয়ার্টার: স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়।

উপরে ‘দ্য কোয়ার্টার: স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ গল্প সংকলন থেকে দুটি গল্প প্রকাশিত হলো। ইংরেজিতে যথাক্রমে ‘ইয়োর লট ইন লাইফ’ এবং ‘লাইফ ইজ অ্যা গেইম’ গল্পের অনুবাদ। উল্লেখ্য, গল্প দুটি আগে বাংলায় অনূদিত হয়নি।]

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


নাগিব মাহফুজের দু’টি গল্প

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image


ভাগ্য

আপনি নিঁখুতভাবে জানেন না কখন ঘটনার সূত্রপাত ঘটতে পারে। যারা ঘটনা দেখেছে, তাদের কাছে বিবরণ হলো নিজস্ব সংস্করণ। সময় তার ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। পানি বিক্রেতা উম্ম হিফনি যা বলেছিলেন, তা হলো:

‘আমি মধু দিয়ে তৈরি কিছু পিঠা কেনার জন্য, যাতে অতিরিক্ত সবজির চর্বি ছিল, পেস্ট্রির দোকানে গিয়েছিলাম। সে কিছু খামির নেয়, বেলুন দিয়ে পাতলা করে এবং হাতের তালু দিয়ে মসৃণ করে। কিন্তু একসময় সে হাতের কাজ বন্ধ করে এবং কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি স্তম্ভিত। আমি তাকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি এবং কীভাবে সাহায্য করতে পারি, তা-ও বলেছি। কিন্তু সে অনবরত কাঁদতে থাকে, দু’হাত ঘষতে থাকে এবং পুনরায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। তার দোকানের সম্মুখে লোকজন জমায়েত হয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার পরিবারের লোকজন আসে। তারা তাকে বাড়ি নিয়ে যায় এবং তখনও সে কাঁদছিল।’

এক মহিলা, যিনি আচারযুক্ত শাকসবজি বিক্রি করেন, বললেন:

‘সিত্তি উম্ম আলী আমার দোকানে আচারযুক্ত শাকসবজি কিনতে একটি গামলা নিয়ে এসেছিলেন। একসময় তিনি শশা এবং ফালাফেলের দিকে আঙুল তোলেন, কিন্তু তারপর তিনি হঠাৎ থেমে যান এবং তার অভিব্যক্তি বরফের মতো জমে যায়। তিনি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার শুরু করেন এবং সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কান্না আরও জোরে এবং অত্যধিক পরিমাণে বাড়তে থাকে। আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়; আমি চিন্তিত ছিলাম এ কারণে যে, আমি কি এমন কিছু করেছি যার জন্য তিনি দুঃখ পেয়েছেন। লোকজন চারপাশে জড়ো হয়। তার স্বামী চটজলদি দোকান থেকে আসেন এবং তাকে বাড়ি নিয়ে যান। প্রত্যেকেই হতবাক এবং বিস্মিত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।’

এসব কাহিনী বহু গুণে বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ বিস্তার লাভ করে। পুরুষ এবং মহিলা মিলিয়ে অনেক ভুক্তভোগী ছিলেন। যখন মহল্লার প্রধানের কাছে সংবাদ পৌঁছে, তিনি ভীষণ ক্রুদ্ধ হন।

‘তোমরা কখনও অবিশ্বাস্য এবং মিথ্যা কথা বন্ধ করতে পারো না’, তিনি বললেন। 

যাহোক, যখন তিনি দেখলেন যে একজন প্রহরী কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তৎক্ষণাৎ তিনি লোকজনকে দোষারোপ করা থামিয়ে দেন এবং চটজলদি উপসংহারে পৌছেন।

‘তাহলে এখন আমাদের মহল্লায় নতুন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে’, তিনি মসজিদের ইমামকে বললেন। ‘বিপর্যয় সৃষ্টির মাধ্যমে মহল্লা কখনই পরিপূর্ণ হয় না।’

‘লোকজন গরম পানিতে গোসল এবং শীতল পানীয় পান করে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভ করছে’, জবাবে ইমাম বললেন।

গোসল-পরিচারক উম্মি হানিয়া কাছাকাছি ছিলেন।

‘এ থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় হলো’, তিনি বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পাঠ।’

‘ঘটনার সঙ্গে কী শয়তান জড়িত?’ ইমাম জিজ্ঞেস করেন।

‘কোনও কারণ ছাড়া কেউ কাঁদে না’, উম্মি হানিয়া বললেন। ‘একমাত্র ব্যতিক্রম হলো যদি ভূত কাউকে স্পর্শ করে; সেই ক্ষেত্রে ঝাড়ফুঁক করলে ভূত তাকে ছেড়ে চলে যাবে।’

‘আমি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই’, মহল্লার প্রধান বললেন, ‘যে পুরো মহল্লা আক্রান্ত হয়েছে। যাহোক, আমি বিষয়টি স্বাস্থ্য পরিদর্শককে অবহিত করব।’ 

তিনি যথাযথভাবে মহামান্য স্বাস্থ্য পরিদর্শকের কাছে যান এবং পুরো ঘটনা বলেন।

‘আপনি বিভ্রম থেকে বাস্তবকে আলাদা করছেন না’, পরিদর্শকের জবাব ছিল।

তারপর মহল্লার প্রধান শপথ করে বললেন যে, তিনি নিজের চোখে অশ্রুকণা অনুভব করেছেন; প্রতিটি বাড়ি আক্রান্ত হয়েছে। পরদিন সকালে পরিদর্শক একজন প্রহরী এবং একজন সেবিকা নিয়ে মহল্লার বাসিন্দাদের দেখতে যান। লোকজন ছুটে আসে:

‘আমাদের রক্ষা করুন, মহামান্য!’ তারা সবাই চিৎকার করে বলল। 

তিনি কুদ্ধ হয়ে লোকজনের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকান এবং তার রাগ প্রশমিত হয় যখন তিনি দেখতে পেলেন যে, পুরুষ ও মহিলা সবাই বিলাপ করছে। 

‘আপনাদের জীবনযাত্রায় কী নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে?’ পরিদর্শক মহল্লার প্রধানকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যা হয়তো বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে।’ 

‘না, জনাব, একেবারেই নতুন কিছু হয়নি। আমাদের জীবন সুখ-দুঃখ নিয়ে যেমন ছিল, তেমনই আছে।’

পরিদর্শক এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যান। তিনি মহল্লার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে বেড়ান। তিনি কোনও দোকান, ক্যাফে, ঝরনা, কোরান শিক্ষার প্রতিষ্ঠান অথবা জন্তু-জানোয়ার বাদ দেননি; তিনি গাধা এবং খচ্চরদের পর্যবেক্ষণ করেছেন, এমনকি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখেছেন পুরনো দূর্গের দেওয়াল ও ভূগর্ভস্থ বাড়িঘর। তিনি মহল্লার প্রধানের ঘরে বসেন। তিনি ক্লান্ত এবং দূরের পানে তাকিয়ে থাকেন। ঠিক সেই সময় দোকানের সম্মুখে জমায়েত হওয়া জনতার ভিড় থেকে উম্মি হানিয়ার কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসে: 

‘ভূত তাড়ানোর আচার-অনুষ্ঠান!’ তিনি আর্তচিৎকার করে বললেন। ‘একমাত্র মুক্তির পথ, মহামান্য।’

‘চুপ করো, তুমি!’ মহল্লার প্রধান রাগান্বিত হয়ে চিৎকার করে বললেন। 

মহল্লার প্রধান আশা করছিলেন যে, পরিদর্শক কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি চুপ করে থাকেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ক্রমশ আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অবশেষে মহল্লার প্রধান সিদ্ধান্ত নেন যে, পরিদর্শক হয়তো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবেন।

ওস্তাদ হাসান, যিনি সঙ্গীত শিল্পী এবং স্থানীয় ক্যাবারের মালিক, একই দৃশ্য অবলোকন করেন। তিনি মহল্লার প্রধানকে পরামর্শ দেন যে, তিনি যেন পরিদর্শককে তার বাড়িতে নিয়ে যান, যাতে পরিদর্শক ঝরণার পাশে বিশ্রাম নিতে পারেন। তিনি পরিদর্শকের জন্য শীতল পানীয় তৈরি করবেন এবং তাজা ফুলের ব্যবস্থা করবেন। সবাইকে বাড়তি ঝামেলা থেকে বাঁচানোর জন্য মহল্লার প্রধান তৎক্ষণাৎ ওস্তাদ হাসানের প্রস্তাব প্রহণ করেন।

সুতরাং পরিদর্শক ওস্তাদ হাসানের বাড়িতে যান। লোকজন তাদের দুর্দশা নিয়ে পুনরায় আলাপ-আলোচনা শুরু করে।

‘তিনি একজন মানুষ’, মহল্লার প্রধান রাগী গলায় বললেন। ‘প্রত্যেকেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।’

যাহোক, সঙ্গীত শিল্পীর বাড়ি থেকে যে আওয়াজ ভেসে আসে, তা হলো স্পন্দনশীল ছন্দ, ঢোলের শব্দ এবং হাততালি। কেউ একজন সঙ্গীত শিল্পীর বাড়ির দিকে মুখ করে তাকিয়ে দেখছিল।

‘তিনি নাচছেন!’ লোকটি চিৎকার করে ওঠে। ‘আর কি সুন্দর সেই নৃত্য!’

লোকটি গায়কের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়:

‘তোমার ভাগ্য তোমাকে খুঁজে পেতে বাধ্য...’

মনে হয় তিনি নাচছেন ও গান পরিবেশন করছেন।

সব মহল্লা থেকে লোকজন এসে ভিড় করে এবং সঙ্গীত শিল্পীর গানের সঙ্গে গাইতে শুরু করে। 

যারা কাঁদছিলেন, হঠাৎ তাদের কান্না থেমে যায়। 

তারা সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।



জীবন একটা খেলা

কোম্পানির সর্বশেষ পদোন্নতির জন্য আমি আলি জাইদানকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলাম।

‘আমি অনুতপ্ত হয়েছি’, তিনি বললেন, ‘অতীতে যা কিছু ঘটেছে, সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করুন।’

‘আমি শুনেছি যে, আপনি আগেও একই কথা অনেকবার বলেছেন’, আমি সন্দেহের সঙ্গে বললাম।

‘কিন্তু এবার’, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘কঠিন সংকল্প নিয়ে এসেছে।’

‘আমি ভাবছি, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কেউ কি বিষয়টি লুকিয়েছে, নাকি সহকর্মীরা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে?’

‘এবার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালো হওয়ার কারণ যে, কোনও কারণ ছাড়াই অনুভূতিগুলো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমি আমার পচে যাওয়া নষ্ট জীবনকে ভিন্ন রূপে পরিবর্তন করতে পেরেছি এবং নতুন জীবনকে স্বাগত জানাতে অনুপ্রাণিত হয়েছি।’

যখন তিনি অতি উত্তেজনার কারণে মাথা ঝিমঝিমানি নিয়ে জেগে ওঠেন, তখন তিনি আবিষ্কার করেন যে, তার নিজের বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের মতো এবং আমাদের এই জগতে তিনি একজন আগুন্তুক। তার কোনও জমানো টাকাপয়সা ছিল না, যার ওপর তিনি ভরসা করতে পারেন। কিন্তু তার ছিল এমন এক কর্মজীবন, যা ভ্যাপসা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। তিনি আমাকে সঙ্গ দেওয়া শুরু করেন এবং আলাপ করার উদ্যোগ নেন, যাতে তিনি নতুন বিশ্ব আবিষ্কার করতে পারেন এবং নিজেকে লোকজনের কার্যকলাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে সম্পৃত্ত করতে পারেন। 

‘সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস আমি জুয়ার টেবিলে হারিয়েছি’, একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি দুশ্চিন্তার চরমে ছিলেন, ‘তা ছিল আমার জীবন, অর্থকড়ি নয়।’   

‘জীবন শুরু হয় ষাটে’, আমি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাকে বলেছিলাম।

‘আমি বিয়ে করতে চাই’, সম্পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে তিনি আমাকে বলেছিলেন।

‘আমি আমার বোন আফকারের সঙ্গে কথা বলেছি, কেননা বরাবর তিনিই প্রথম আমাকে বিয়ে করার জন্য তাগিদ দিতেন। কিন্তু আমি প্রকৃত অর্থে বিয়ে করতে চেয়েছি।’ 

‘আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?’

‘আমি কোনও ভালো রমণীর কাছ থেকে অবশিষ্ট কিছু খুঁজছি না! আমার পছন্দ একজন যুবতী কুমারী নববধূ, যে দেখতে মোটামুটি ভালো এবং কিছু পড়াশোনা জানে।’ 

‘আজকাল বিয়েশাদী ব্যয়বহুল’, আমি খোলাখুলিভাবে তাকে বলেছি। 

‘আমার বেতন, যা মোটেও খারাপ নয়, উল্লেখ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে’, জবাবে তিনি বললেন। তার কণ্ঠস্বরে অবজ্ঞার সুর বেজে ওঠে। 

‘তাহলে ঠিক আছে। আপনার জীবনে কি কোনও নারী নেই?’

‘প্রেম-ভালোবাসা করার মতো আমার কখনই কোনও সময় ছিল না’, তিনি চোখেমুখে তিক্ততার হাসি ফুটিয়ে বললেন।

এখন আমাদের, অর্থাৎ আফকার হাতেম এবং আমার, মধ্যে যৌথ প্রচেষ্টা শুরু হয়। আমরা প্রথমে আলি জাইদানের পদমর্যাদা এবং বেতন নিয়ে কথাবার্তা আরম্ভ করি; যা বাড়তি তথ্য জানার জন্য নিশ্চিত শ্রোতার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। তবে যখন তার কর্ম জীবনের কথা বলা হয়, তখন আফকার ভ্রু উপরে ওঠে। আলি জাইদান নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে ‘আপনি বলতে চান, সেই জুয়াড়ি?’ আফকারের চিৎকার আমার কানে প্রচণ্ড জোরে আঘাত হানে। সত্যি বলতে কী, আমি বুঝতে পেরেছি যে, কিছু মানুষ, যদিও তারা চুরি এবং ঘুষ উপেক্ষা করতে রাজি, জুয়া এবং জুয়াড়ির কথা শুনলেই বিস্মিত হয়। 

এ খবরটি অবশ্যই আমার বন্ধুকে বলতে হবে। তিনি একই সঙ্গে ক্রুদ্ধ এবং দুঃখিত। আমার মনে হয়েছিল যে, তিনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বুড়ো হয়ে যাচ্ছিলেন।

‘আমি এ পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি না’, তিনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন, ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি একজন স্বামী এবং বাবা হব।’ 

‘আমাদের হতাশ হওয়ার দরকার নেই’, বন্ধু হিসেবে আমি বললাম।

‘এখন আমার একটা কিছুর ওপর ভরসা করতে হবে। আমি শেইখ লাবিবের কাছে গিয়েছিলাম এবং তিনি আমার ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ করেছেন।’ 

আমি হাসি থামাতে পারিনি।

‘আমি বুঝতে পারিনি যে, আপনি এমন একজন মানুষ যিনি এ ধরনের লোকদের বিশ্বাস করেন’, আমি বললাম।

‘হতাশা এর চেয়ে আরও খারাপ পথে নিয়ে যেতে পারে’, দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন।

শেইখ লাবিব সত্য কথাই বলেছিলেন। বুড়ি দালাল, শয়তানী কাজে যার সুনাম রয়েছে, আমাদের মহল্লায় অত্যন্ত পরিচিত মুখ, আমার বন্ধুর সমস্যা জেনেছেন। তার কুড়ি বছর বয়সী এক মেয়ে ছিল। সে ছিল অত্যন্ত সুন্দরী ও উদার মানসিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সৌন্দর্য ও আন্তরিকতা সারা মহল্লার মানুষকে উত্তেজিত করেছিল। বুড়ি দালাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তিনি এই মেয়েটিকে নিজের সংসারে যুক্ত করবেন। কানাঘুষা, টিপন্নি এবং ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে তিনি সুন্দরী তরুণী সুয়াদকে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য বৃদ্ধের পথে এগিয়ে দেন। বৃদ্ধ, যিনি রাগান্বিত এবং মরিয়া, সোনালি ফাঁদে আটকা পড়েন। তিনি তার পরিবারের কোনও প্রতিবাদ শোনেননি এবং সব বন্ধুদের হারিয়েছেন। তিনি মহল্লার সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প হয়ে ওঠেন। 

‘আমি কাউকে আমার সুখ-আনন্দ নষ্ট করতে দেব না’, তিনি অর্থহীন হাসি মুখে আমাকে বলেছেন, ‘এখন দৈবাৎ এই সুযোগ এসেছে।’ আমার হাত ধরে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে থাকা এবং আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি আশা করি আপনিও বিশ্বাস করেন: যখনই আপনাকে এক গ্লাস দেওয়া হবে, তখনই তলানি পর্যন্ত পান করুন।’ 

বছরের পর বছর চলে যায় এবং আলি জাইদানের এক ছেলে ও দুই মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যখন তিনি অবসর গ্রহণ করেন, তখন ছেলেমেয়েরা তাকে তার ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে তার স্ত্রী নিজের রূপ দিয়ে অন্য সব কিছু থেকে তাকে সরিয়ে রাখেন। তার সংসার প্রবাদতুল্য হয়ে ওঠে। যখনই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তিনি বলেন, ‘আমি এখনও জুয়ার টেবিলে হেরে যাচ্ছি।’ 

***

[নোবেলজয়ী মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের মৃত্যু হয় ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, কায়রোতে। তার মৃত্যুর বারো বছর পরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, লেখকের স্বহস্তে লেখা গল্পের পাণ্ডুলিপি ড্রয়ারের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপি সুতোয় বাঁধা ছিল এবং সংযুক্ত লেবেলে লেখা ছিল ‘১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হবে।’ আততায়ীর হাতে জখম হওয়ার কারণে তিনি গল্পগুলো সময় মতো প্রকাশ করতে পারেননি। সেখানে ১৮টি গল্প ছিল এবং প্রতিটি গল্প লেখকের স্মৃতি বিজড়িত কায়রোর বিখ্যাত গামালিয়া মহল্লার বাসিন্দাদের ঘিরে রচিত হয়েছে। গল্পগুলো লেখকের অন্যতম অনুবাদক রজার অ্যালেনের ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য কোয়ার্টার: স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়।

উপরে ‘দ্য কোয়ার্টার: স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ গল্প সংকলন থেকে দুটি গল্প প্রকাশিত হলো। ইংরেজিতে যথাক্রমে ‘ইয়োর লট ইন লাইফ’ এবং ‘লাইফ ইজ অ্যা গেইম’ গল্পের অনুবাদ। উল্লেখ্য, গল্প দুটি আগে বাংলায় অনূদিত হয়নি।]

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত