ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাংবাদিক কামাল আহমেদ। কমিশন একটি রিপোর্টও দিয়েছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয়নি। রিপোর্টে কী ছিলো, কেন বাস্তবায়ন হতে পারলো না সে বিষয় এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ঝুঁকি নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টারের’ পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ আলাপ করেছেন সংবাদ-এর ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ-এর সঙ্গে। হুবহু প্রকাশ করা হলো সেই আলাপচারিতা।
রাশেদ আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সরকার সেই কমিশনের রিপোর্ট কেন বাস্তবায়নের পথে এগলো না?
কামাল আহমেদ: তথ্য মন্ত্রণালয় ঐ ১৫ মাসের সরকারে তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। যে মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না, সেই মন্ত্রণালয়ে কোনো কাজ বিশেষ করে সংস্কারের মতন কাজ সম্পাদিত হবে এটা আশা করা যায় না। সুতরাং সেটা একটা বড় দুর্বলতা ছিল তাদের। আরেকটি দুর্বলতা, সেটি হচ্ছে যে শীর্ষ নেতৃত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের ১১টি কমিশন করেছিলেন। তার মধ্যে ৬টি কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নের জন্য তিনি আলাদা উদ্যোগ নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন নারী অধিকার প্রশ্ন, শ্রম অধিকার প্রশ্ন, স্বাস্থ্য খাতের বিষয় এবং স্থানীয় সরকারের বিষয় - এই পাঁচটি বিষয়ের কমিশনের সুপারিশমালা কিন্তু ওই ঐকমত্য কমিশনের এখতিয়ারে দেওয়া হয়নি।
রাশেদ আহমেদ : তখন আপনাদের একটা প্রায়োরিটি লিস্ট তৈরি করতে বলা হয়েছিল, সেটি করে দিয়েছিলেন অল্প সময়ের মধ্যে। সেটি করতে বলা হওয়ার মূল কারণ থাকতে পারে যে এটি দ্রুত যেন বাস্তবায়ন করা হয়।
কামাল আহমেদ: অবশ্যই। আমাদের সেই আশাবাদ ছিলই। যখন আমরা কমিশনের প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে দিলাম, পাঁচ মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করে দিয়েছি। এটা দেওয়ার পরে আমাকে বলা হলো যে আপনাদের যদি অগ্রাধিকার থাকে কোনো কিছুতে যে আশু করণীয় এবং খুব দ্রুত করা যাবে সরকার করতে পারে, তাহলে সেগুলোর একটা তালিকা করে দেন, তাহলে আমরা সেগুলো দ্রুত করতে পারব। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান অধ্যাপক ইউনূস নিজেই বলেছিলেন। আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কিন্তু সেটা করে দিয়েছিলাম।
একমাত্র বার্তা সংস্থা হিসেবে দুটি বার্তা সংস্থা ছিল- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং ইউনাইটেড নিউজ অফ বাংলাদেশ (ইউএনবি)। এর বাইরে আর কিছু ছিল না। সেখান থেকে আপনি বর্তমান বাস্তবতায় যদি চিন্তা করেন, হাজারের ওপরে পত্রিকা সারা দেশে। শুধু ঢাকা শহর থেকেই ৫৯৪টা পত্রিকা। আবার টেলিভিশনের সংখ্যা তিন ডজনের বেশি। রেডিও আছে প্রায় সমসংখ্যক। বেসরকারি অনলাইন মাধ্যম যেটা নতুন মাধ্যম, এটা আগে কখনো ছিল না, সেটাও এসেছে এবং তার কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল যারা নিজেদের সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করে অথবা গণমাধ্যম হিসেবে দাবি করে তারাও রয়েছে। সুতরাং এখানে সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে কাজের ধরন অনুধাবন করা, অনুসন্ধান করা এটা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। আমরা কিন্তু সেই দুঃসাধ্য কাজটা মাত্র ৫ মাসে করার চেষ্টা করি এবং করেছি।
রাশেদ আহমেদ : আপনার কাছে কি মনে হয়, এটি আটকে গেল কোন জায়গায়?
কামাল আহমেদ: আমি তো একটা কারণ বললাম যে নেতৃত্বে যারা ছিলেন মন্ত্রণালয়ে তাদের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা না থাকা। তাদের অনভিজ্ঞতাও একটা বড় কারণ। কারণ আপনি জানেন যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যে তিনজন পালন করেছেন, তার মধ্যে দুজন ছাত্রনেতা। তারা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো পরিচালনা করেন নাই, কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন নাই বা করলেও খুবই অল্প সময়। তো তাদের অনভিজ্ঞতা একটা বিষয় ছিল।
রাশেদ আহমেদ: চব্বিশে গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে আমাদের সংবাদপত্র বলেন, টেলিভিশন বলেন, তারা ওরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি নানা কারণে। টেলিভিশনের অবস্থা তো আরও বাজে ছিল সেটি আপনি নিজেও জানেন। এই যে মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত; সরকার দ্বারা বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা, সেই নিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে এটি মুক্ত করা দরকার।
কামাল আহমেদ: আগের অবস্থা যেটা ছিল সেটা হচ্ছে যে সরকারের দিক থেকে যখন তখন মন্ত্রীরা ফোন করতেন... মিডিয়ার অবস্থা যদি বলেন, তাহলে তো বলব যে এটা একটা নৈরাজ্যজনক অবস্থা। এই অবস্থা টিকতে পারে না। এই অবস্থা এভাবে চললে আমি বলব যে সংকট আরও গুরুতর হবে এবং পাঠক, দর্শক, শ্রোতা এগুলো কিছুই আমরা পাব না। আমরা এখনই পাই না। এখনই বহু বাড়িতে আপনি দেখবেন যে টেলিভিশন মাসের পর মাস কেউ খোলে না, সুইচ অন করে না। এখন রেডিও তো শোনেই না অনেক। রেডিও কেবলমাত্র শোনে যারা ঐ যে নৌকা নিয়ে নদীতে যায় বা সাগরে মাছ ধরতে যায় তাদের শোনার জন্য ওটাই একমাত্র মাধ্যম, সেই কারণে তারা ওটা শোনে। তারপরও যদি নেটওয়ার্ক থাকে তাহলে মোবাইলেই তাদের ভরসা। রেডিও সেখানে তাদের শুনতে হবে না। সংবাদপত্র একই কথা যে, সংবাদপত্র যদি মানুষের কথা না বলে তাহলে সংবাদপত্র মানুষ পড়বে কেন? সংবাদপত্রের সার্কুলেশন প্রচার সংখ্যা এটা পড়তে শুরু করেছিল সেই কোভিডের সময় থেকে। কারণ তখন মানুষ ভয়ে সংবাদপত্র ধরত না যে, এখানে সংক্রমণের মাধ্যম হিসেবে এটা বিপজ্জনক হতে পারে এই আশঙ্কায়। তারপর সেই যে পত্রিকা পড়া ছেড়েছে, পত্রিকার অভ্যাস এখনো অনেকেরই সেই অভ্যাস আর ফিরে পেতে চায় না কারণ তারা ইতিমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবর নিতে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার খবর একেবারেই সম্পাদিত খবর নয়, যাচাই করা খবর নয়।
এখন সেই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি চলছে। এবং এই নৈরাজ্য আরও বাড়বে যদি আমরা সংবাদ মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাপূর্ণ জবাবদিহির ব্যবস্থা আনতে না পারি। জবাবদিহি বলতে কিন্তু আমি বলে রাখি সরকারের কাছে জবাবদিহি নয়, পাঠক দর্শক শ্রোতার কাছে জবাবদিহি। আমার বিশ্বাসযোগ্যতার জবাবদিহি। আমি যদি কাউকে অপদস্থ করি ইচ্ছাকৃতভাবে, আমি যদি নিজে সুবিধা নেওয়ার জন্য এই গণমাধ্যমকে ব্যবহার করি, তাহলে তার জবাবদিহি সেই জবাবদিহির ব্যবস্থাটা পাঠক দর্শক সাধারণ মানুষের কাছে।
রাশেদ আহমেদ : আপনার কি মনে হয় যে অনেক গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ করে, ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে?
কামাল আহমেদ: এটা মনে হওয়ার বিষয় নয়, এটা তো হচ্ছে। আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন যে ব্যবসায়িক স্বার্থে, গোষ্ঠীর স্বার্থে, ব্যক্তির স্বার্থে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খবর প্রচার করা হচ্ছে না, প্রকাশ করা হচ্ছে না? উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে। আমি যদি এখানে উদাহরণ দেই একটা নাম আমি বলছি না কিন্তু একই মিডিয়া কোম্পানির বা একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর একাধিক টেলিভিশন, একাধিক দৈনিক পত্রিকা বাংলা এবং ইংরেজি মিলিয়ে, একাধিক অনলাইন- এগুলো সব কিছুতে একই খবর প্রচার হয়, একই ভাষ্য প্রচার হয়, একই বিশ্লেষণ প্রচার হয়। এটা কীভাবে হয়, কেন হয়? এবং এগুলোর অনেকগুলোই অসত্য ভিত্তিহীন অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে। মনগড়া কাল্পনিক কথার ওপর ভিত্তি করে। যখন বর্তমান সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় ছিলেন না তিনি যখন বিদেশে নির্বাসনে ছিলেন এবং বাংলাদেশে তার বক্তব্য প্রচার প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল, সে সময় আমরা দেখেছি যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর এই পত্রিকাগুলোর এই টেলিভিশনগুলোতে তারেক রহমানকে অপদস্থ করার জন্য কত রকমের কাহিনি ছাপা হয়েছে। খালেদা জিয়া জেলে ছিলেন, খালেদা জিয়া সম্পর্কে ঐ একইভাবে নানা খবর ছাপা হয়েছে।
ঐ প্রতিষ্ঠানে ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত করছে। সেটা শুধু দুর্নীতি দমন কমিশন নয় সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) যেটা তারা তদন্ত করছে। সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই গণমাধ্যমগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরকম শুধু একটা হাউজ না, এরকম আরও বেশ কয়েকটি হাউজ আছে, তারা এই একই কাজ করছে। একটি হাউজ তাদের একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, অত্যন্ত প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল। তাদের কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিল না। এখন তারা একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় শেয়ার নিয়েছে আরও একাধিক পত্রিকা বাংলায় এবং ইংরেজি মিলিয়ে বাজারে এনেছে। আরও একটি টেলিভিশন চ্যানেল কেনার চেষ্টা করছে। কেন? এগুলো যদি ঐ গণমাধ্যমের যে প্রভাবক ক্ষমতা সেই ক্ষমতাকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে গোষ্ঠীগত স্বার্থে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য না থাকে তাহলে তো এটা করার কথা নয়।
রাশেদ আহমেদ: এই জন্যই কি আপনি একটি প্রতিষ্ঠান একটি গণমাধ্যম এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন?
কামাল আহমেদ: অবশ্যই। এবং এটা শুধু আমাদের জন্য না এটা বিশ্বের বহু দেশে এই নীতি অনুসৃত হয়। যিনি টেলিভিশনের মালিক তিনি সংবাদপত্রের মালিক হতে পারেন না। কারণ একসাথে মিডিয়া পাওয়ার এর কনসেন্ট্রেশন ঘটুক মনোপলাইজেশন অফ ইনফরমেশন হোক এটা কোনো দেশেই মানুষের কল্যাণের জন্য শুভ নয়, গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এজন্য কোনো দেশেই সরকার এটা এলাউ করে না, করতে পারে না। যেসব দেশে এখনো আছে, সেসব দেশেও এই আলোচনা চলছে যে এগুলো বন্ধ করতে হবে।
আপনার থাকতেই পারে আপনার ব্যবসার প্রসার ঘটার জন্য আপনি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতেই পারেন। ধরুন আপনি বিজ্ঞাপনের জন্য বছরে ৫০ কোটি টাকা খরচ করেন। আপনি মনে করলেন আপনার নিজের যদি একটা পত্রিকা থাকে সেই পত্রিকাতে ১০ কোটি টাকা বা ১৫ কোটি টাকা বা ২০ কোটি টাকা একটা পত্রিকা বছরে চালু রাখতে পারেন। সুতরাং আপনি বিজ্ঞাপনের কিছছু অর্থ এখানে বিনিয়োগ করে নিজের পত্রিকার মালিক হলেন। করতে পারেন আপনি সেটা। কিন্তু আপনার ঐ যে পত্রিকা আপনি করলেন সেই পত্রিকায় ঘোষণা থাকতে হবে প্রকাশ্যে যে আপনার এখানে স্বার্থ আছে। আমি আরও খোলাসা করে বলি, আপনার যদি সিমেন্টের ব্যবসা থাকে আপনার যদি আবাসনের ব্যবসা থাকে, আপনার যদি ডাল চালের ব্যবসা থাকে, তো যখন ডাল চাল আমদানির প্রশ্ন উঠবে কিংবা সিমেন্টের ওপর শুল্ক আরোপের প্রশ্ন উঠবে কিংবা যখন অন্য যে পণ্য আপনি উৎপাদন করেন বা বিপণন করেন সেই পণ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের কোনো নীতিমালা প্রণয়নের প্রশ্ন উঠবে তখন আপনি যদি সুবিধা নেওয়ার পক্ষে বা সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে কোনো কলাম লেখেন কোনো প্রতিবেদন করেন সেখানে ঘোষণা থাকা উচিত যে আপনার আপনার মালিক প্রতিষ্ঠানের এখানে স্বার্থ রয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : মিডিয়া তো সাধারণত ব্যবসায়ীরাই পরিচালনা করবে, ইনভেস্ট করে তো তারাই। আমি জনসেবা করতে চাই, আমি চাইলেই তো একটা মিডিয়া দিতে পারবো না। কারণ আমার তো ঐ সক্ষমতা নাই। সেক্ষেত্রে সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। আপনি যেগুলো বললেন যে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ প্রচার করে। সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে কে? সরকারই তো ব্যবস্থা নিবে।
কামাল আহমেদ: আমি সরকারের হাতে কোনো নিয়ন্ত্রণই দেওয়ার পক্ষপাতী নই। আমরা কমিশন থেকে সেটাই বলেছি। সরকারের হাতে অভূতপূর্ব ক্ষমতা, বলতে পারেন প্রায় অসীম ক্ষমতা সরকারের মধ্যে। সরকার যাকে খুশি তাকে ধরতে পারে, যাকে খুশি তাকে হ্যারেজ করতে পারে, যাকে খুশি তাকে উৎখাত করতে পারে, উচ্ছেদ করতে পারে, আবার যেখানে সেখানে বসিয়েও দিতে পারে- এই ধরনের ক্ষমতা আছে এবং সে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি। ক্ষমতা থাকলে সেই অপপ্রয়োগের ঝুঁকিও থাকবে, বিপদও থাকতে পারে। সুতরাং সরকারকে এসব বিষয়ে ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই, আমরা নই।
এই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের ধারণাটাও আবার একই রকম যে এটা শুধুমাত্র আমরাই আমাদের বিচার করব। না তাহলে আবার আমাদের অন্যায় করার অবকাশ থাকতে পারে। এখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থাকবে। প্রতিনিধি থাকতে হবে। অর্থাৎ পাঠক দর্শক শ্রোতা এরাই কিন্তু আমাদের সবচাইতে বড় অংশীজন। তাদের কাছেই আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। কারণ তারা পয়সা দিয়ে আমাদের কাগজ কেনেন, তারা পয়সা দিয়ে টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখেন। সুতরাং তাদেরও একটা প্রতিনিধিত্ব এখানে থাকতে হবে। এই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনটি গঠিত হবে সংবাদপত্র বা টেলিভিশন বা রেডিও এই শিল্পে গণমাধ্যম শিল্পের প্রতিনিধিত্ব সেখানে যেমন থাকবে তেমনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকবে তেমনি বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং স্বাধীনভাবে এটা কাজ করবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনি যে কমিশনের রিপোর্ট দিয়েছিলেন সেখানে ওয়েবসাইটে একটি অংশ প্রচার হয় নাই। আপনি বারবার সেগুলো বলছিলেন।
রাশেদ আহমেদ : কী ধরণের অঙ্গীকারনামা ছিল? তা কি এখন বলতে বাধা আছে?
কামাল আহমেদ: আমাদের কোনো বাধা নেই, কমিশনের কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু কাগজগুলো নথিগুলো তারা প্রকাশ করেনি। আমরা বলেছি যে সেখানে এমন জিনিস আমরা দেখেছি, ধরুন একটা ছোট উদাহরণ দেই। আপনি কি জানতেন যে একাত্তর টেলিভিশন তারা একসাথে ১০টি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন চেয়েছেন? আমরা কেউ জানতাম না। একসাথে তারা যে ১০টি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি চেয়েছিলেন তার মধ্যে তারা সংস্কৃতি বিষয়ক চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা খেলাধুলার চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা নাটকের চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন- এই রকম বিষয়ভিত্তিক ১০টা চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন।
এরকম আরও বেশ কয়েকটা চ্যানেল আছে যেসব চ্যানেলগুলো এই ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার করে যে তারা আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক আদর্শ সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করবে, প্রধানমন্ত্রী তখন যিনি ছিলেন শেখ হাসিনার যে উন্নয়নের এজেন্ডা সেই উন্নয়নের এজেন্ডা তুলে ধরবে, উন্নয়নের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে এবং তিনি যে উন্নয়নগুলো করছেন সেই উন্নয়নগুলো প্রচার করবে। সর্বোপরি প্রায় প্রত্যেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের আবেদনে ছিল যে তারা বিটিভি’র অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার করতে চান সারা বিশ্বে।
রাশেদ আহমেদ: বিটিভির খবর প্রচার করতে চান?
কামাল আহমেদ: করবেন, এই অঙ্গীকার করেছিলেন।
রাশেদ আহমেদ : তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্কুলার ছিল যে বিটিভি’র যেকোনো একটি নিউজ প্রচার করতে হবে এই রকম।
কামাল আহমেদ: তখন আবার তারা বাইরে এসে এটার বিরোধিতা করেছেন যে, না আমরা কেন এটা প্রচার করব, আমাদের প্রচার সময়ের মূল্য আছে ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কথা বলেছেন। কিন্তু কাগজে কলমে তাদের অঙ্গীকার আছে যে তারা বিটিভি’র সংবাদ এবং বিটিভি’র অনুষ্ঠানও প্রচার করবেন, উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান।
রাশেদ আহমেদ : টেলিভিশনের লাইসেন্স এটা তো সরকারের কাছ থেকে নিতে হয়। যে কাউকে সরকার খুব সহজভাবে দেন। যেটা পত্রিকার ডিক্লারেশন অথবা রেজিস্ট্রেশন নিতে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কামাল আহমেদ: আসলে সব ক্ষেত্রেই, যেকোনো গণমাধ্যম সেটা টেলিভিশন হোক, রেডিও হোক, সংবাদপত্র হোক, অনলাইন হোক সরকার অনুমতি দেয়। কোনোটা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে অনুমতি আসে যেমন সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কিন্তু টেলিভিশনের অনুমতি আসে সরাসরি তথ্য মন্ত্রণালয় এবং আরও একটি বিভাগ জড়িত আছে সেটি হচ্ছে বিটিআরসি। টেলিকমিউনিকেশন অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার যে মন্ত্রণালয় তারা। এছাড়াও নেপথ্যে থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তার ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এগুলো সব কিছুই সরকারের সিদ্ধান্ত, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে। সরকার যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কাউকে পত্রিকার অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জেলা প্রশাসক কখনোই ওটা দেবেন না। এটা একটা আছে। কিন্তু আমরা যেটা বলেছি এই যে সরকার যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা আছে যে তারা সিদ্ধান্ত নেন কোনটার অনুমতি দেওয়া হবে বা অনুমতি দেওয়া হবে না সেটা থাকুক থাকতে পারে কিন্তু এই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, হয়তো। সেজন্য আমরা বলেছি যে এটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। এখন নীতিমালা কোথাও কোথাও আছে কোথাও কোথাও নেই।
দৈনিক সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও তাই যারা প্রকাশক হবেন তাদের একটা যোগ্যতা প্রমাণ করার প্রশ্ন আছে। এই জন্য আমরা বলেছি যে গণমাধ্যমের মালিক হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। আপনি একটা লাইসেন্স নিলেন, নিয়ে তারপর আপনি বিনিয়োগকারী অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন, নেমে তারপর আপনি একজন বিনিয়োগকারীর সাথে সমঝোতায় টেলিভিশন চ্যানেল করছেন, যেভাবে এই টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অনেকগুলোই হয়েছে। মূল চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়েছেন দলের কর্মী যার জ্ঞাত আয়ের মধ্যে বা সম্পদের মধ্যে ঐ টেলিভিশন চালু করার কোনো যোগ্যতা সক্ষমতা ছিল না। তিনি কোনো একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে লেনদেন করে রাতারাতি টেলিভিশন চ্যানেলের শেয়ারহোল্ডার বনে গেছেন মালিক হয়ে গেছেন।
রাশেদ আহমেদ : একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন নিতে হলে একজন সম্পাদকের মাধ্যমে নিতে হয় অবশ্যই সম্পাদক প্রকাশক। টেলিভিশনগুলোতে কিন্তু সেটি নেই, সেটি হচ্ছে একজন ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারী তিনি সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন সরকার যাচাই বাছাই করে সেটি দিয়ে দেয়। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার একটি নীতিমালা থাকা উচিত কিনা।
কামাল আহমেদ: আমরা সব ক্ষেত্রেই নীতিমালা চাই।এখন যে কেউ বসে একটা অনলাইন পোর্টাল করে ফেলছে। কোনো নিউজ রুম নাই। এবং অন্যের ওয়েবসাইটে যে খবর ছাপা হয়েছে সেটা কপি করে নিজের ওয়েবসাইটে চালিয়ে দিচ্ছে। অহরহ হচ্ছে। অথচ যারা সৎভাবে সাংবাদিকতা করতে চায় তাদের তো রক্ত ঝরিয়ে ঘাম ঝরিয়ে আপনার খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
আমরা বলেছি যে যেকোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান করার ক্ষেত্রে যেন একটা শর্ত হয় যে তার একটা বার্তা কক্ষ থাকতে হবে। বার্তা কক্ষে প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব থাকতে হবে সাংবাদিকতায়। প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাক্টে এই বিধান আছে যে আপনি একটা সংবাদপত্রের লাইসেন্স নিতে গেলে আপনার নূন্যতম পাঁচ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং এই নূন্যতম পাঁচ বছরের সাংবাদিকতা প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্রে। ওখানে কিন্তু শ্রেণীকরণ করা আছে প্রথম শ্রেণী দ্বিতীয় শ্রেণী ক খ গ বলে এরকম নানাভাবে শ্রেণীকরণ করা আছে। আপনি একটা গ শ্রেণীর পত্রিকা করতে গেলেও আপনার প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় পাঁচ বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে সম্পাদক হতে হবে। একইভাবে তার বার্তা কক্ষ থাকতে হবে কতজন সহ-সম্পাদক কতজন রিপোর্টার এগুলো সব কিছু নির্ধারণ করা আছে। টেলিভিশন ক্ষেত্রে সেটি কীভাবে... টেলিভিশনের ক্ষেত্রে এটা নেই। সেটি কি করা সম্ভব? অবশ্যই করা সম্ভব, করতে হবে, কারণ পেশাদার বার্তা কক্ষ ছাড়া আপনি একটা টেলিভিশন চ্যানেলে নিউজ করবেন কী করে?কেন নিউজ চালাবেন? আমরা তো এখন অনেকগুলো চ্যানেল দেখি, যে চ্যানেলগুলোতে শুধু কাজই হচ্ছে সারাদিন পুরনো দিনের ছায়াছবির গান বাজানো আর পুরনো নাটক দেখানো। তারপর জোড়াতালি দিয়ে আধাঘণ্টার একটা সংবাদ বুলেটিন করে, সেই বুলেটিনেও দেখা যায় যে অধিকাংশ দুইজন, তিনজনের কাজ কোনো পেশাদারিত্বে কোনো ছাপ নেই পেশাদারিত্ব নেই।
রাশেদ আহমেদ : আমি চব্বিশে একটু ফিরি। চব্বিশের আন্দোলনের সময় টেলিভিশনগুলো ভূমিকা রাখতে পারল না, তাদের নিউজ প্রচার করতে পারল না। এর দায় তো আর সাংবাদিকদের নয়, এটি সাংবাদিকদের তো চাকরি করেন মালিকদের অধীনে। যেভাবে তারা পরিচালিত করতে চান সেভাবে করতে হয়েছে তাদের। কিন্তু আল্টিমেটলি দায়টা কিন্তু সাংবাদিকদের ওপরে এসে পড়ল।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিকদের দায় নেই একথা বলা যাবে না। কারণ আপনি যদি ৪ আগস্ট, ৫ আগস্টের কথাই ধরেন, ৪ আগস্ট এবং ৫ আগস্টে অনেক টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা সরাসরি সম্প্রচার করতে না পারে। সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হয় ওগুলো নিউজ চ্যানেল। তারা কিন্তু অন-এয়ার ছিল না কিছুক্ষণের জন্য আধা ঘণ্টা কেউ এক ঘণ্টা এরকম কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্প্রচার বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাদের। পরে তারা কিন্তু সাহস করে আবার সম্প্রচার শুরু করেছে এবং সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সরকার তখন আর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। বাকি চ্যানেলগুলো করল না কেন? কেন করল না? করা তো উচিত ছিল। এটা এক। দুই নম্বর প্রশ্ন হচ্ছে... মালিকরা যেভাবে চান সেভাবেই তো হয়। এই দুটো প্রতিষ্ঠানের মালিকরা চাননি তারা বাধা হয়ে দাঁড়াননি দাঁড়ালে হয়তো হতো না আমি কিন্তু নিশ্চিত না যে বাধা হননি। সমস্যাটা আছে মালিকরা অনেক জায়গাতে চাননি এটা। কিন্তু সাংবাদিকরা চেয়েছেন কি? ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সাংবাদিকরা চেয়েছেন কিনা এই প্রশ্নের উত্তর কি?
এই নেতারাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বার্তা কক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা বিভিন্ন সময় দলের হয়ে দলীয় কর্মীর মতো কাজ করেছেন। ভিন্নমতের নিউজ করতে দেননি জুনিয়র রিপোর্টারদের। এরকম অসংখ্য রিপোর্ট আছে। সুতরাং সাংবাদিকদের যে কোনো দায় নেই একথা বলা যাবে না সাংবাদিকদেরও দায় আছে। সবচাইতে বড় সমস্যা যেটা সেটা হলো যে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য নেই। রাজনৈতিকভাবে আমরা দলের কর্মী হয়ে গেছি। অধিকাংশ বার্তা কক্ষে আপনি দেখবেন নেতৃত্বের অবস্থানে যারা ছিলেন এখনো আছেন তারাও ঐ দলের কর্মী হয়ে যান, দলের কর্মী হয়ে গিয়েছিলেন এবং আমার আশঙ্কা ভবিষ্যতেও হয়তো সেটাই হতে থাকবে। এই অবস্থাটা দূর করার জন্য তাহলে কী করা? আমি আবারো ঐ একই প্রশ্নে ফিরে যাই যে সাংবাদিকদের মধ্যে যদি ঐক্য থাকতো, পেশাদারিত্বের প্রশ্নে ঐক্য যে আমরা সত্য প্রচার করব। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন আমার যে আদর্শের প্রতিই আনুগত্য থাকুক না কেন আমি সত্য প্রকাশ থেকে বিরত হব না এবং সত্য প্রকাশে বাধা আসলে আমরা সবাই এক হয়ে দাঁড়াব। এই ঐক্যটা থাকলে কিন্তু কোনো মালিক কোনো সরকারি কিছু করতে পারে না, স্বাধীনতা হরণ করতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ : কাগজ চাইলেই তো বন্ধ করা যায় না কিন্তু টেলিভিশন চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যায় যেকোনো মুহূর্তেই।
কামাল আহমেদ: কাগজ চাইলেও বন্ধ করার রেকর্ড তো আছে বাংলাদেশে। আছে একটু সময় লাগে তো সেটার কতগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও তাই কিন্তু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসার কথা। মুখের কথায় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করার রেকর্ড হয়েছে কিন্তু সেটাও করেছেন ঐ অতি উৎসাহী দলবাজ কর্মকর্তারা। আমরা তো জানি যে দলীয়করণ কোন পর্যায়ে গিয়েছিল। প্রশাসনে দলীয়করণ হয়েছিল, গোয়েন্দা সংস্থায় দলীয়করণ হয়েছিল, নিরাপত্তা সংস্থায় দলীয়করণ হয়েছিল, সর্বগ্রাসী দলীয়করণ যে কারণে এটা সম্ভব হয়েছে তা না হলে এটা হওয়ার কথা না। আইনসম্মত ক্ষমতা ছাড়া আইনসম্মত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির আইনগত নির্দেশ ছাড়া বেআইনি নির্দেশে তো কোনো কিছু বন্ধ হতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু এটা তো বিভিন্ন সরকারের সময়ই হয়েছে, আপনি ২০০০ সালের পরের কথা...
কামাল আহমেদ: শুনুন আমরা বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে ৫৫ বছরে ঐ খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়েছি। কে কার চেয়ে বেশি খারাপ হতে পারেন। দুর্ভাগ্যর বিষয় হচ্ছে যে বাংলাদেশে এই ৫৫ বছরের মধ্যে মাত্র তিন চার বছর বা পাঁচ বছর আমরা সর্বোচ্চ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছিলাম। অধিকাংশ সময় আমরা পারিনি। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পরে যে সরকারগুলো কেবলমাত্র সেই সরকারের প্রথম কয়েক বছর সংবাদমাধ্যমে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছিলাম। তারপর আবার শুরু হয়েছে এই প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে বেশি দলীয়করণ করতে পারে, কে কার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে, নিপীড়নমূলক হতে পারে এবং সেটা গত ১৭ বছরে সবচাইতে খারাপ অবস্থায় গেছে। ডিএফপি নামক একটি প্রতিষ্ঠান আছে যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পত্রিকাগুলোতে কোন কোন পত্রিকা সরকারের বিরুদ্ধে গেল তাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া এই ধরনের নানা কাজ হয়তো হয়ে আসছে এবং এখনো হবে হচ্ছে হয়তো যদি আমরা সংস্কারটা না করতে পারি।
ঢাকা শহরে সরকারি হিসাব মতে ৫৯০টার ওপর দৈনিক পত্রিকা আছে। আমরা তো কমিশন থেকে যাচাই করে দেখেছি ৫০টার বেশি কাগজ হকাররা বিক্রি করেন না। মানে তার কোনো ক্রেতা নেই। তো যে জিনিসের ক্রেতা নেই সেই জিনিস কেন ছাপা হয়, সেই জিনিসে কেন বিজ্ঞাপন ছাপা হবে, কেন বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে? বিজ্ঞাপন কিন্তু তারা পাচ্ছে। কীভাবে পাচ্ছে? রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা টাকা দিয়ে আপনার ২০ লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন নেবে ২ লক্ষ টাকা খরচ করে ৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে অহরহ হচ্ছে এগুলো। আমরা এজন্য এই তদারকি ব্যবস্থা যেটা বিজ্ঞাপন যাচাই করার যে ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাটায় পরিবর্তনের কথা বলেছি। যেখানে অংশীজন সবাই থাকতে হবে মালিকদের প্রতিনিধি থাকবে ইউনিয়নের প্রতিনিধি থাকবে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিনিধি থাকবে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি থাকবে তারা যাচাই করবে প্রচার সংখ্যা। এটা এক নম্বর। দুই নম্বর হচ্ছে যে, যে যে প্রতিষ্ঠানের সার্কুলেশন সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানকে তার আয়করের হিসাব দিতে হবে ঐ ডিএফপির কাছে, ঐ কমিটির কাছে। যাতে আয়করের হিসাব থেকে হিসাব মেলাতে পারে তারা। আপনার যদি ৩০ হাজার কাগজ বিক্রি হয়ে থাকে তাহলে আপনি ৩ হাজারের আয়কর দেবেন না ট্যাক্স দেবেন আপনি ৩০ হাজারের। ৩০ হাজারের বিক্রি না হলে আপনি ৩০ হাজারের ট্যাক্স দেবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ট্যাক্সের কাগজপত্র যাচাই করা হয় না যাচাই করা হচ্ছে না, এখনো পর্যন্ত হচ্ছে না। আমরা বলেছি সেই ট্যাক্সের রিটার্ন এই সার্কুলেশন সংখ্যা প্রচার সংখ্যা যাচাই করার জন্য একটা অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয় আরেকটা বলেছি যে প্রতি বছর অডিটেড অ্যাকাউন্টস প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ করতে হবে সবার জন্য।
রাশেদ আহমেদ : যে স্বাধীন সাংবাদিকতার কথা বলছেন, সেটি কি বিশ্বে আছে এখন?
রাশেদ আহমেদ : আপনার এই কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে বর্তমান নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়েছে?
কামাল আহমেদ: আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। আর কার সাথে আলোচনা হবে? প্রথমত কমিশন তো আর নেই, কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কমিশন ডিসব্যান্ডেড হয়ে গেছে। কমিশনের সদস্যদের সরকার আমন্ত্রণ জানাতে পারে কিন্তু এখনো ঐভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথাবার্তা হয়নি। এমনিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকার যে সমস্ত মতবিনিময় করে সেসব জায়গায় ইন্ডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটিতে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে যেমন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আমাদের কমিশনের দুই একজন সদস্যকেও বিভিন্ন সময় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং আমরা গেছি আমাদের মতামত তুলে ধরেছি, বলেছি আমাদের কথা।
রাশেদ আহমেদ: যেহেতু আপনি নিজেও সাংবাদিক এবং এই যে রাষ্ট্রের এই সমস্যাগুলো এটির একটি সমাধান দরকার আপনার নিজের ক্ষেত্রেও এবং সবার জন্যই পেশাদারিত্বের জন্য। আপনি নিজেও তো উদ্যোগী হয়ে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের কথা এগিয়ে নিতে পারেন। সেটি বলছি আমি।
কামাল আহমেদ: আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারের কাছে তদবির করার পক্ষপাতী নই, আমি সেই ভূমিকায় নেই। আমি সাংবাদিক, সাংবাদিক হিসেবেই থাকতে চাই, লেখালেখি করছি, লেখালেখির মাধ্যমে বলতে পারি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাকলে সেখানে বলতে পারি, সেখানে যে বলছি মন্ত্রীদের সামনে বলেছি সরকারের যারা নীতিনির্ধারক তাদের সাথে কোনো আলোচনার অকেশন ঘটলে সেখানে বলেছি এবং বলছিও।
রাশেদ আহমেদ: ডেইলি স্টারের ওপর হামলা হয়েছিল, এটার কি কোনো সুরহা কিছু হলো, বোঝা গেল কি?
কামাল আহমেদ: মামলা তো আছেই, মামলা তদন্ত হচ্ছে মামলার তদন্তে কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে এবং তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। দেখা যাক আর কতদিন সময় যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন আমাদের এই পুড়ে যাওয়া ভবন দেখতে এসেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। সেটা ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে, তাতে আমরা আশা করেছিলাম মার্চের মধ্যে সেই তদন্ত শেষ হবে। সে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। দেখি আর কতদিন সময় যায়।
রাশেদ আহমেদ: কারা করলো? এটার সাথে কাদের যোগসূত্র? বোঝা গেছে কিছু?
কামাল আহমেদ: ভিডিও ফুটেজে তো সবাইকে চেনা যায় যে কারা হামলায় জড়িত ছিল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা অনেকেই তখন লাইভ ব্রডকাস্ট করেছে যে বীরত্ব এবং কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য। সুতরাং তাদের চিহ্নিত করতে তো সরকারের কষ্ট হওয়ার কথা নয়, তদন্তকারীদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আশা করি যে তারা চিহ্নিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।
রাশেদ আহমেদ: একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী এটা করেছে, এটি বলা হয়েছে। এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থানটা চব্বিশ পরবর্তীতে দেখা গেল, তারা বিভিন্ন জায়গায় মব করছে। চব্বিশের পরবর্তীতে তাদের এই উত্থানটা কীভাবে হলো?
কামাল আহমেদ: এটা হলো রাজনৈতিক প্রশ্ন। আমি আসলে রাজনৈতিক প্রশ্নে এখন যেতে চাই না। খুবই সংক্ষেপে যদি বলতে বলেন আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে ২৪শে গণঅভ্যুত্থানের পর ঐ গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, একটা বিরাট জাতীয় ঐক্য হয়েছিল, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে নেমে গিয়েছিল।
এখন তাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো কতদূর পর্যন্ত যেতে দেবে সেটা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করে। তার মধ্যে একটা বড় অংশ হচ্ছে সরকার। এখন যেহেতু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছে রাজনৈতিক সরকার তাদের কতটা সংগঠিত হতে দেবে বাড়তে দেবে সেটা সরকারের বিষয়, সরকারকে দেখতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখতে হবে। উগ্রবাদ একটা হুমকি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য, সেটা তো আমরা সবাই অনুভব করি, সেটা আমরা বুঝতে পারি।
রাশেদ আহমেদ: আমি বলছি, তাদের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকতা করাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়।
কামাল আহমেদ: হ্যাঁ সেটা সত্য, একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তো সহিষ্ণুতার অভাব আমরা দেখছি। সহিংসতা দেখছি আমরা। তারাও তো হামলা করছে, মাঠ পর্যায়ে অন্তত। ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করে না কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তাদের সমর্থকরা হেনস্থা করছে বিভিন্ন জায়গায়। তো এই ঝুঁকি সাংবাদিকতায় আছে। আর দলগুলোর ক্ষেত্রে এই ধরনের ত্রুটি সাংগঠনিক দুর্বলতা, সাংগঠনিক বিচ্যুতি এগুলো আছে, সেগুলো থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারবেন কবে, আমরা জানি না।
রাশেদ আহমেদ : কামাল আহমেদ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য।
কামাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাংবাদিক কামাল আহমেদ। কমিশন একটি রিপোর্টও দিয়েছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয়নি। রিপোর্টে কী ছিলো, কেন বাস্তবায়ন হতে পারলো না সে বিষয় এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ঝুঁকি নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টারের’ পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ আলাপ করেছেন সংবাদ-এর ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ-এর সঙ্গে। হুবহু প্রকাশ করা হলো সেই আলাপচারিতা।
রাশেদ আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সরকার সেই কমিশনের রিপোর্ট কেন বাস্তবায়নের পথে এগলো না?
কামাল আহমেদ: তথ্য মন্ত্রণালয় ঐ ১৫ মাসের সরকারে তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। যে মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না, সেই মন্ত্রণালয়ে কোনো কাজ বিশেষ করে সংস্কারের মতন কাজ সম্পাদিত হবে এটা আশা করা যায় না। সুতরাং সেটা একটা বড় দুর্বলতা ছিল তাদের। আরেকটি দুর্বলতা, সেটি হচ্ছে যে শীর্ষ নেতৃত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের ১১টি কমিশন করেছিলেন। তার মধ্যে ৬টি কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নের জন্য তিনি আলাদা উদ্যোগ নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন নারী অধিকার প্রশ্ন, শ্রম অধিকার প্রশ্ন, স্বাস্থ্য খাতের বিষয় এবং স্থানীয় সরকারের বিষয় - এই পাঁচটি বিষয়ের কমিশনের সুপারিশমালা কিন্তু ওই ঐকমত্য কমিশনের এখতিয়ারে দেওয়া হয়নি।
রাশেদ আহমেদ : তখন আপনাদের একটা প্রায়োরিটি লিস্ট তৈরি করতে বলা হয়েছিল, সেটি করে দিয়েছিলেন অল্প সময়ের মধ্যে। সেটি করতে বলা হওয়ার মূল কারণ থাকতে পারে যে এটি দ্রুত যেন বাস্তবায়ন করা হয়।
কামাল আহমেদ: অবশ্যই। আমাদের সেই আশাবাদ ছিলই। যখন আমরা কমিশনের প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে দিলাম, পাঁচ মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করে দিয়েছি। এটা দেওয়ার পরে আমাকে বলা হলো যে আপনাদের যদি অগ্রাধিকার থাকে কোনো কিছুতে যে আশু করণীয় এবং খুব দ্রুত করা যাবে সরকার করতে পারে, তাহলে সেগুলোর একটা তালিকা করে দেন, তাহলে আমরা সেগুলো দ্রুত করতে পারব। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান অধ্যাপক ইউনূস নিজেই বলেছিলেন। আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কিন্তু সেটা করে দিয়েছিলাম।
একমাত্র বার্তা সংস্থা হিসেবে দুটি বার্তা সংস্থা ছিল- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং ইউনাইটেড নিউজ অফ বাংলাদেশ (ইউএনবি)। এর বাইরে আর কিছু ছিল না। সেখান থেকে আপনি বর্তমান বাস্তবতায় যদি চিন্তা করেন, হাজারের ওপরে পত্রিকা সারা দেশে। শুধু ঢাকা শহর থেকেই ৫৯৪টা পত্রিকা। আবার টেলিভিশনের সংখ্যা তিন ডজনের বেশি। রেডিও আছে প্রায় সমসংখ্যক। বেসরকারি অনলাইন মাধ্যম যেটা নতুন মাধ্যম, এটা আগে কখনো ছিল না, সেটাও এসেছে এবং তার কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল যারা নিজেদের সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করে অথবা গণমাধ্যম হিসেবে দাবি করে তারাও রয়েছে। সুতরাং এখানে সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে কাজের ধরন অনুধাবন করা, অনুসন্ধান করা এটা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। আমরা কিন্তু সেই দুঃসাধ্য কাজটা মাত্র ৫ মাসে করার চেষ্টা করি এবং করেছি।
রাশেদ আহমেদ : আপনার কাছে কি মনে হয়, এটি আটকে গেল কোন জায়গায়?
কামাল আহমেদ: আমি তো একটা কারণ বললাম যে নেতৃত্বে যারা ছিলেন মন্ত্রণালয়ে তাদের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা না থাকা। তাদের অনভিজ্ঞতাও একটা বড় কারণ। কারণ আপনি জানেন যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যে তিনজন পালন করেছেন, তার মধ্যে দুজন ছাত্রনেতা। তারা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো পরিচালনা করেন নাই, কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন নাই বা করলেও খুবই অল্প সময়। তো তাদের অনভিজ্ঞতা একটা বিষয় ছিল।
রাশেদ আহমেদ: চব্বিশে গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে আমাদের সংবাদপত্র বলেন, টেলিভিশন বলেন, তারা ওরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি নানা কারণে। টেলিভিশনের অবস্থা তো আরও বাজে ছিল সেটি আপনি নিজেও জানেন। এই যে মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত; সরকার দ্বারা বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা, সেই নিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে এটি মুক্ত করা দরকার।
কামাল আহমেদ: আগের অবস্থা যেটা ছিল সেটা হচ্ছে যে সরকারের দিক থেকে যখন তখন মন্ত্রীরা ফোন করতেন... মিডিয়ার অবস্থা যদি বলেন, তাহলে তো বলব যে এটা একটা নৈরাজ্যজনক অবস্থা। এই অবস্থা টিকতে পারে না। এই অবস্থা এভাবে চললে আমি বলব যে সংকট আরও গুরুতর হবে এবং পাঠক, দর্শক, শ্রোতা এগুলো কিছুই আমরা পাব না। আমরা এখনই পাই না। এখনই বহু বাড়িতে আপনি দেখবেন যে টেলিভিশন মাসের পর মাস কেউ খোলে না, সুইচ অন করে না। এখন রেডিও তো শোনেই না অনেক। রেডিও কেবলমাত্র শোনে যারা ঐ যে নৌকা নিয়ে নদীতে যায় বা সাগরে মাছ ধরতে যায় তাদের শোনার জন্য ওটাই একমাত্র মাধ্যম, সেই কারণে তারা ওটা শোনে। তারপরও যদি নেটওয়ার্ক থাকে তাহলে মোবাইলেই তাদের ভরসা। রেডিও সেখানে তাদের শুনতে হবে না। সংবাদপত্র একই কথা যে, সংবাদপত্র যদি মানুষের কথা না বলে তাহলে সংবাদপত্র মানুষ পড়বে কেন? সংবাদপত্রের সার্কুলেশন প্রচার সংখ্যা এটা পড়তে শুরু করেছিল সেই কোভিডের সময় থেকে। কারণ তখন মানুষ ভয়ে সংবাদপত্র ধরত না যে, এখানে সংক্রমণের মাধ্যম হিসেবে এটা বিপজ্জনক হতে পারে এই আশঙ্কায়। তারপর সেই যে পত্রিকা পড়া ছেড়েছে, পত্রিকার অভ্যাস এখনো অনেকেরই সেই অভ্যাস আর ফিরে পেতে চায় না কারণ তারা ইতিমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবর নিতে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার খবর একেবারেই সম্পাদিত খবর নয়, যাচাই করা খবর নয়।
এখন সেই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি চলছে। এবং এই নৈরাজ্য আরও বাড়বে যদি আমরা সংবাদ মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাপূর্ণ জবাবদিহির ব্যবস্থা আনতে না পারি। জবাবদিহি বলতে কিন্তু আমি বলে রাখি সরকারের কাছে জবাবদিহি নয়, পাঠক দর্শক শ্রোতার কাছে জবাবদিহি। আমার বিশ্বাসযোগ্যতার জবাবদিহি। আমি যদি কাউকে অপদস্থ করি ইচ্ছাকৃতভাবে, আমি যদি নিজে সুবিধা নেওয়ার জন্য এই গণমাধ্যমকে ব্যবহার করি, তাহলে তার জবাবদিহি সেই জবাবদিহির ব্যবস্থাটা পাঠক দর্শক সাধারণ মানুষের কাছে।
রাশেদ আহমেদ : আপনার কি মনে হয় যে অনেক গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ করে, ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে?
কামাল আহমেদ: এটা মনে হওয়ার বিষয় নয়, এটা তো হচ্ছে। আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন যে ব্যবসায়িক স্বার্থে, গোষ্ঠীর স্বার্থে, ব্যক্তির স্বার্থে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খবর প্রচার করা হচ্ছে না, প্রকাশ করা হচ্ছে না? উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে। আমি যদি এখানে উদাহরণ দেই একটা নাম আমি বলছি না কিন্তু একই মিডিয়া কোম্পানির বা একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর একাধিক টেলিভিশন, একাধিক দৈনিক পত্রিকা বাংলা এবং ইংরেজি মিলিয়ে, একাধিক অনলাইন- এগুলো সব কিছুতে একই খবর প্রচার হয়, একই ভাষ্য প্রচার হয়, একই বিশ্লেষণ প্রচার হয়। এটা কীভাবে হয়, কেন হয়? এবং এগুলোর অনেকগুলোই অসত্য ভিত্তিহীন অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে। মনগড়া কাল্পনিক কথার ওপর ভিত্তি করে। যখন বর্তমান সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় ছিলেন না তিনি যখন বিদেশে নির্বাসনে ছিলেন এবং বাংলাদেশে তার বক্তব্য প্রচার প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল, সে সময় আমরা দেখেছি যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর এই পত্রিকাগুলোর এই টেলিভিশনগুলোতে তারেক রহমানকে অপদস্থ করার জন্য কত রকমের কাহিনি ছাপা হয়েছে। খালেদা জিয়া জেলে ছিলেন, খালেদা জিয়া সম্পর্কে ঐ একইভাবে নানা খবর ছাপা হয়েছে।
ঐ প্রতিষ্ঠানে ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত করছে। সেটা শুধু দুর্নীতি দমন কমিশন নয় সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) যেটা তারা তদন্ত করছে। সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই গণমাধ্যমগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরকম শুধু একটা হাউজ না, এরকম আরও বেশ কয়েকটি হাউজ আছে, তারা এই একই কাজ করছে। একটি হাউজ তাদের একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, অত্যন্ত প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল। তাদের কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিল না। এখন তারা একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় শেয়ার নিয়েছে আরও একাধিক পত্রিকা বাংলায় এবং ইংরেজি মিলিয়ে বাজারে এনেছে। আরও একটি টেলিভিশন চ্যানেল কেনার চেষ্টা করছে। কেন? এগুলো যদি ঐ গণমাধ্যমের যে প্রভাবক ক্ষমতা সেই ক্ষমতাকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে গোষ্ঠীগত স্বার্থে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য না থাকে তাহলে তো এটা করার কথা নয়।
রাশেদ আহমেদ: এই জন্যই কি আপনি একটি প্রতিষ্ঠান একটি গণমাধ্যম এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন?
কামাল আহমেদ: অবশ্যই। এবং এটা শুধু আমাদের জন্য না এটা বিশ্বের বহু দেশে এই নীতি অনুসৃত হয়। যিনি টেলিভিশনের মালিক তিনি সংবাদপত্রের মালিক হতে পারেন না। কারণ একসাথে মিডিয়া পাওয়ার এর কনসেন্ট্রেশন ঘটুক মনোপলাইজেশন অফ ইনফরমেশন হোক এটা কোনো দেশেই মানুষের কল্যাণের জন্য শুভ নয়, গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এজন্য কোনো দেশেই সরকার এটা এলাউ করে না, করতে পারে না। যেসব দেশে এখনো আছে, সেসব দেশেও এই আলোচনা চলছে যে এগুলো বন্ধ করতে হবে।
আপনার থাকতেই পারে আপনার ব্যবসার প্রসার ঘটার জন্য আপনি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতেই পারেন। ধরুন আপনি বিজ্ঞাপনের জন্য বছরে ৫০ কোটি টাকা খরচ করেন। আপনি মনে করলেন আপনার নিজের যদি একটা পত্রিকা থাকে সেই পত্রিকাতে ১০ কোটি টাকা বা ১৫ কোটি টাকা বা ২০ কোটি টাকা একটা পত্রিকা বছরে চালু রাখতে পারেন। সুতরাং আপনি বিজ্ঞাপনের কিছছু অর্থ এখানে বিনিয়োগ করে নিজের পত্রিকার মালিক হলেন। করতে পারেন আপনি সেটা। কিন্তু আপনার ঐ যে পত্রিকা আপনি করলেন সেই পত্রিকায় ঘোষণা থাকতে হবে প্রকাশ্যে যে আপনার এখানে স্বার্থ আছে। আমি আরও খোলাসা করে বলি, আপনার যদি সিমেন্টের ব্যবসা থাকে আপনার যদি আবাসনের ব্যবসা থাকে, আপনার যদি ডাল চালের ব্যবসা থাকে, তো যখন ডাল চাল আমদানির প্রশ্ন উঠবে কিংবা সিমেন্টের ওপর শুল্ক আরোপের প্রশ্ন উঠবে কিংবা যখন অন্য যে পণ্য আপনি উৎপাদন করেন বা বিপণন করেন সেই পণ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের কোনো নীতিমালা প্রণয়নের প্রশ্ন উঠবে তখন আপনি যদি সুবিধা নেওয়ার পক্ষে বা সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে কোনো কলাম লেখেন কোনো প্রতিবেদন করেন সেখানে ঘোষণা থাকা উচিত যে আপনার আপনার মালিক প্রতিষ্ঠানের এখানে স্বার্থ রয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : মিডিয়া তো সাধারণত ব্যবসায়ীরাই পরিচালনা করবে, ইনভেস্ট করে তো তারাই। আমি জনসেবা করতে চাই, আমি চাইলেই তো একটা মিডিয়া দিতে পারবো না। কারণ আমার তো ঐ সক্ষমতা নাই। সেক্ষেত্রে সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। আপনি যেগুলো বললেন যে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ প্রচার করে। সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে কে? সরকারই তো ব্যবস্থা নিবে।
কামাল আহমেদ: আমি সরকারের হাতে কোনো নিয়ন্ত্রণই দেওয়ার পক্ষপাতী নই। আমরা কমিশন থেকে সেটাই বলেছি। সরকারের হাতে অভূতপূর্ব ক্ষমতা, বলতে পারেন প্রায় অসীম ক্ষমতা সরকারের মধ্যে। সরকার যাকে খুশি তাকে ধরতে পারে, যাকে খুশি তাকে হ্যারেজ করতে পারে, যাকে খুশি তাকে উৎখাত করতে পারে, উচ্ছেদ করতে পারে, আবার যেখানে সেখানে বসিয়েও দিতে পারে- এই ধরনের ক্ষমতা আছে এবং সে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি। ক্ষমতা থাকলে সেই অপপ্রয়োগের ঝুঁকিও থাকবে, বিপদও থাকতে পারে। সুতরাং সরকারকে এসব বিষয়ে ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই, আমরা নই।
এই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের ধারণাটাও আবার একই রকম যে এটা শুধুমাত্র আমরাই আমাদের বিচার করব। না তাহলে আবার আমাদের অন্যায় করার অবকাশ থাকতে পারে। এখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থাকবে। প্রতিনিধি থাকতে হবে। অর্থাৎ পাঠক দর্শক শ্রোতা এরাই কিন্তু আমাদের সবচাইতে বড় অংশীজন। তাদের কাছেই আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। কারণ তারা পয়সা দিয়ে আমাদের কাগজ কেনেন, তারা পয়সা দিয়ে টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখেন। সুতরাং তাদেরও একটা প্রতিনিধিত্ব এখানে থাকতে হবে। এই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনটি গঠিত হবে সংবাদপত্র বা টেলিভিশন বা রেডিও এই শিল্পে গণমাধ্যম শিল্পের প্রতিনিধিত্ব সেখানে যেমন থাকবে তেমনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকবে তেমনি বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং স্বাধীনভাবে এটা কাজ করবে।
রাশেদ আহমেদ: আপনি যে কমিশনের রিপোর্ট দিয়েছিলেন সেখানে ওয়েবসাইটে একটি অংশ প্রচার হয় নাই। আপনি বারবার সেগুলো বলছিলেন।
রাশেদ আহমেদ : কী ধরণের অঙ্গীকারনামা ছিল? তা কি এখন বলতে বাধা আছে?
কামাল আহমেদ: আমাদের কোনো বাধা নেই, কমিশনের কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু কাগজগুলো নথিগুলো তারা প্রকাশ করেনি। আমরা বলেছি যে সেখানে এমন জিনিস আমরা দেখেছি, ধরুন একটা ছোট উদাহরণ দেই। আপনি কি জানতেন যে একাত্তর টেলিভিশন তারা একসাথে ১০টি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন চেয়েছেন? আমরা কেউ জানতাম না। একসাথে তারা যে ১০টি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি চেয়েছিলেন তার মধ্যে তারা সংস্কৃতি বিষয়ক চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা খেলাধুলার চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা নাটকের চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন, তারা বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন- এই রকম বিষয়ভিত্তিক ১০টা চ্যানেল করতে চেয়েছিলেন।
এরকম আরও বেশ কয়েকটা চ্যানেল আছে যেসব চ্যানেলগুলো এই ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার করে যে তারা আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক আদর্শ সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করবে, প্রধানমন্ত্রী তখন যিনি ছিলেন শেখ হাসিনার যে উন্নয়নের এজেন্ডা সেই উন্নয়নের এজেন্ডা তুলে ধরবে, উন্নয়নের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে এবং তিনি যে উন্নয়নগুলো করছেন সেই উন্নয়নগুলো প্রচার করবে। সর্বোপরি প্রায় প্রত্যেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের আবেদনে ছিল যে তারা বিটিভি’র অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার করতে চান সারা বিশ্বে।
রাশেদ আহমেদ: বিটিভির খবর প্রচার করতে চান?
কামাল আহমেদ: করবেন, এই অঙ্গীকার করেছিলেন।
রাশেদ আহমেদ : তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্কুলার ছিল যে বিটিভি’র যেকোনো একটি নিউজ প্রচার করতে হবে এই রকম।
কামাল আহমেদ: তখন আবার তারা বাইরে এসে এটার বিরোধিতা করেছেন যে, না আমরা কেন এটা প্রচার করব, আমাদের প্রচার সময়ের মূল্য আছে ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কথা বলেছেন। কিন্তু কাগজে কলমে তাদের অঙ্গীকার আছে যে তারা বিটিভি’র সংবাদ এবং বিটিভি’র অনুষ্ঠানও প্রচার করবেন, উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান।
রাশেদ আহমেদ : টেলিভিশনের লাইসেন্স এটা তো সরকারের কাছ থেকে নিতে হয়। যে কাউকে সরকার খুব সহজভাবে দেন। যেটা পত্রিকার ডিক্লারেশন অথবা রেজিস্ট্রেশন নিতে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কামাল আহমেদ: আসলে সব ক্ষেত্রেই, যেকোনো গণমাধ্যম সেটা টেলিভিশন হোক, রেডিও হোক, সংবাদপত্র হোক, অনলাইন হোক সরকার অনুমতি দেয়। কোনোটা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে অনুমতি আসে যেমন সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কিন্তু টেলিভিশনের অনুমতি আসে সরাসরি তথ্য মন্ত্রণালয় এবং আরও একটি বিভাগ জড়িত আছে সেটি হচ্ছে বিটিআরসি। টেলিকমিউনিকেশন অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার যে মন্ত্রণালয় তারা। এছাড়াও নেপথ্যে থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তার ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এগুলো সব কিছুই সরকারের সিদ্ধান্ত, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে। সরকার যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কাউকে পত্রিকার অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জেলা প্রশাসক কখনোই ওটা দেবেন না। এটা একটা আছে। কিন্তু আমরা যেটা বলেছি এই যে সরকার যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা আছে যে তারা সিদ্ধান্ত নেন কোনটার অনুমতি দেওয়া হবে বা অনুমতি দেওয়া হবে না সেটা থাকুক থাকতে পারে কিন্তু এই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, হয়তো। সেজন্য আমরা বলেছি যে এটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। এখন নীতিমালা কোথাও কোথাও আছে কোথাও কোথাও নেই।
দৈনিক সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও তাই যারা প্রকাশক হবেন তাদের একটা যোগ্যতা প্রমাণ করার প্রশ্ন আছে। এই জন্য আমরা বলেছি যে গণমাধ্যমের মালিক হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। আপনি একটা লাইসেন্স নিলেন, নিয়ে তারপর আপনি বিনিয়োগকারী অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন, নেমে তারপর আপনি একজন বিনিয়োগকারীর সাথে সমঝোতায় টেলিভিশন চ্যানেল করছেন, যেভাবে এই টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অনেকগুলোই হয়েছে। মূল চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়েছেন দলের কর্মী যার জ্ঞাত আয়ের মধ্যে বা সম্পদের মধ্যে ঐ টেলিভিশন চালু করার কোনো যোগ্যতা সক্ষমতা ছিল না। তিনি কোনো একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে লেনদেন করে রাতারাতি টেলিভিশন চ্যানেলের শেয়ারহোল্ডার বনে গেছেন মালিক হয়ে গেছেন।
রাশেদ আহমেদ : একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন নিতে হলে একজন সম্পাদকের মাধ্যমে নিতে হয় অবশ্যই সম্পাদক প্রকাশক। টেলিভিশনগুলোতে কিন্তু সেটি নেই, সেটি হচ্ছে একজন ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারী তিনি সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন সরকার যাচাই বাছাই করে সেটি দিয়ে দেয়। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার একটি নীতিমালা থাকা উচিত কিনা।
কামাল আহমেদ: আমরা সব ক্ষেত্রেই নীতিমালা চাই।এখন যে কেউ বসে একটা অনলাইন পোর্টাল করে ফেলছে। কোনো নিউজ রুম নাই। এবং অন্যের ওয়েবসাইটে যে খবর ছাপা হয়েছে সেটা কপি করে নিজের ওয়েবসাইটে চালিয়ে দিচ্ছে। অহরহ হচ্ছে। অথচ যারা সৎভাবে সাংবাদিকতা করতে চায় তাদের তো রক্ত ঝরিয়ে ঘাম ঝরিয়ে আপনার খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
আমরা বলেছি যে যেকোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান করার ক্ষেত্রে যেন একটা শর্ত হয় যে তার একটা বার্তা কক্ষ থাকতে হবে। বার্তা কক্ষে প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব থাকতে হবে সাংবাদিকতায়। প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাক্টে এই বিধান আছে যে আপনি একটা সংবাদপত্রের লাইসেন্স নিতে গেলে আপনার নূন্যতম পাঁচ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং এই নূন্যতম পাঁচ বছরের সাংবাদিকতা প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্রে। ওখানে কিন্তু শ্রেণীকরণ করা আছে প্রথম শ্রেণী দ্বিতীয় শ্রেণী ক খ গ বলে এরকম নানাভাবে শ্রেণীকরণ করা আছে। আপনি একটা গ শ্রেণীর পত্রিকা করতে গেলেও আপনার প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় পাঁচ বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে সম্পাদক হতে হবে। একইভাবে তার বার্তা কক্ষ থাকতে হবে কতজন সহ-সম্পাদক কতজন রিপোর্টার এগুলো সব কিছু নির্ধারণ করা আছে। টেলিভিশন ক্ষেত্রে সেটি কীভাবে... টেলিভিশনের ক্ষেত্রে এটা নেই। সেটি কি করা সম্ভব? অবশ্যই করা সম্ভব, করতে হবে, কারণ পেশাদার বার্তা কক্ষ ছাড়া আপনি একটা টেলিভিশন চ্যানেলে নিউজ করবেন কী করে?কেন নিউজ চালাবেন? আমরা তো এখন অনেকগুলো চ্যানেল দেখি, যে চ্যানেলগুলোতে শুধু কাজই হচ্ছে সারাদিন পুরনো দিনের ছায়াছবির গান বাজানো আর পুরনো নাটক দেখানো। তারপর জোড়াতালি দিয়ে আধাঘণ্টার একটা সংবাদ বুলেটিন করে, সেই বুলেটিনেও দেখা যায় যে অধিকাংশ দুইজন, তিনজনের কাজ কোনো পেশাদারিত্বে কোনো ছাপ নেই পেশাদারিত্ব নেই।
রাশেদ আহমেদ : আমি চব্বিশে একটু ফিরি। চব্বিশের আন্দোলনের সময় টেলিভিশনগুলো ভূমিকা রাখতে পারল না, তাদের নিউজ প্রচার করতে পারল না। এর দায় তো আর সাংবাদিকদের নয়, এটি সাংবাদিকদের তো চাকরি করেন মালিকদের অধীনে। যেভাবে তারা পরিচালিত করতে চান সেভাবে করতে হয়েছে তাদের। কিন্তু আল্টিমেটলি দায়টা কিন্তু সাংবাদিকদের ওপরে এসে পড়ল।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিকদের দায় নেই একথা বলা যাবে না। কারণ আপনি যদি ৪ আগস্ট, ৫ আগস্টের কথাই ধরেন, ৪ আগস্ট এবং ৫ আগস্টে অনেক টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা সরাসরি সম্প্রচার করতে না পারে। সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হয় ওগুলো নিউজ চ্যানেল। তারা কিন্তু অন-এয়ার ছিল না কিছুক্ষণের জন্য আধা ঘণ্টা কেউ এক ঘণ্টা এরকম কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্প্রচার বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাদের। পরে তারা কিন্তু সাহস করে আবার সম্প্রচার শুরু করেছে এবং সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সরকার তখন আর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। বাকি চ্যানেলগুলো করল না কেন? কেন করল না? করা তো উচিত ছিল। এটা এক। দুই নম্বর প্রশ্ন হচ্ছে... মালিকরা যেভাবে চান সেভাবেই তো হয়। এই দুটো প্রতিষ্ঠানের মালিকরা চাননি তারা বাধা হয়ে দাঁড়াননি দাঁড়ালে হয়তো হতো না আমি কিন্তু নিশ্চিত না যে বাধা হননি। সমস্যাটা আছে মালিকরা অনেক জায়গাতে চাননি এটা। কিন্তু সাংবাদিকরা চেয়েছেন কি? ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সাংবাদিকরা চেয়েছেন কিনা এই প্রশ্নের উত্তর কি?
এই নেতারাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বার্তা কক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা বিভিন্ন সময় দলের হয়ে দলীয় কর্মীর মতো কাজ করেছেন। ভিন্নমতের নিউজ করতে দেননি জুনিয়র রিপোর্টারদের। এরকম অসংখ্য রিপোর্ট আছে। সুতরাং সাংবাদিকদের যে কোনো দায় নেই একথা বলা যাবে না সাংবাদিকদেরও দায় আছে। সবচাইতে বড় সমস্যা যেটা সেটা হলো যে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য নেই। রাজনৈতিকভাবে আমরা দলের কর্মী হয়ে গেছি। অধিকাংশ বার্তা কক্ষে আপনি দেখবেন নেতৃত্বের অবস্থানে যারা ছিলেন এখনো আছেন তারাও ঐ দলের কর্মী হয়ে যান, দলের কর্মী হয়ে গিয়েছিলেন এবং আমার আশঙ্কা ভবিষ্যতেও হয়তো সেটাই হতে থাকবে। এই অবস্থাটা দূর করার জন্য তাহলে কী করা? আমি আবারো ঐ একই প্রশ্নে ফিরে যাই যে সাংবাদিকদের মধ্যে যদি ঐক্য থাকতো, পেশাদারিত্বের প্রশ্নে ঐক্য যে আমরা সত্য প্রচার করব। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন আমার যে আদর্শের প্রতিই আনুগত্য থাকুক না কেন আমি সত্য প্রকাশ থেকে বিরত হব না এবং সত্য প্রকাশে বাধা আসলে আমরা সবাই এক হয়ে দাঁড়াব। এই ঐক্যটা থাকলে কিন্তু কোনো মালিক কোনো সরকারি কিছু করতে পারে না, স্বাধীনতা হরণ করতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ : কাগজ চাইলেই তো বন্ধ করা যায় না কিন্তু টেলিভিশন চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যায় যেকোনো মুহূর্তেই।
কামাল আহমেদ: কাগজ চাইলেও বন্ধ করার রেকর্ড তো আছে বাংলাদেশে। আছে একটু সময় লাগে তো সেটার কতগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও তাই কিন্তু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসার কথা। মুখের কথায় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করার রেকর্ড হয়েছে কিন্তু সেটাও করেছেন ঐ অতি উৎসাহী দলবাজ কর্মকর্তারা। আমরা তো জানি যে দলীয়করণ কোন পর্যায়ে গিয়েছিল। প্রশাসনে দলীয়করণ হয়েছিল, গোয়েন্দা সংস্থায় দলীয়করণ হয়েছিল, নিরাপত্তা সংস্থায় দলীয়করণ হয়েছিল, সর্বগ্রাসী দলীয়করণ যে কারণে এটা সম্ভব হয়েছে তা না হলে এটা হওয়ার কথা না। আইনসম্মত ক্ষমতা ছাড়া আইনসম্মত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির আইনগত নির্দেশ ছাড়া বেআইনি নির্দেশে তো কোনো কিছু বন্ধ হতে পারে না।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু এটা তো বিভিন্ন সরকারের সময়ই হয়েছে, আপনি ২০০০ সালের পরের কথা...
কামাল আহমেদ: শুনুন আমরা বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে ৫৫ বছরে ঐ খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়েছি। কে কার চেয়ে বেশি খারাপ হতে পারেন। দুর্ভাগ্যর বিষয় হচ্ছে যে বাংলাদেশে এই ৫৫ বছরের মধ্যে মাত্র তিন চার বছর বা পাঁচ বছর আমরা সর্বোচ্চ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছিলাম। অধিকাংশ সময় আমরা পারিনি। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পরে যে সরকারগুলো কেবলমাত্র সেই সরকারের প্রথম কয়েক বছর সংবাদমাধ্যমে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছিলাম। তারপর আবার শুরু হয়েছে এই প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে বেশি দলীয়করণ করতে পারে, কে কার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে, নিপীড়নমূলক হতে পারে এবং সেটা গত ১৭ বছরে সবচাইতে খারাপ অবস্থায় গেছে। ডিএফপি নামক একটি প্রতিষ্ঠান আছে যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পত্রিকাগুলোতে কোন কোন পত্রিকা সরকারের বিরুদ্ধে গেল তাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া এই ধরনের নানা কাজ হয়তো হয়ে আসছে এবং এখনো হবে হচ্ছে হয়তো যদি আমরা সংস্কারটা না করতে পারি।
ঢাকা শহরে সরকারি হিসাব মতে ৫৯০টার ওপর দৈনিক পত্রিকা আছে। আমরা তো কমিশন থেকে যাচাই করে দেখেছি ৫০টার বেশি কাগজ হকাররা বিক্রি করেন না। মানে তার কোনো ক্রেতা নেই। তো যে জিনিসের ক্রেতা নেই সেই জিনিস কেন ছাপা হয়, সেই জিনিসে কেন বিজ্ঞাপন ছাপা হবে, কেন বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে? বিজ্ঞাপন কিন্তু তারা পাচ্ছে। কীভাবে পাচ্ছে? রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা টাকা দিয়ে আপনার ২০ লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন নেবে ২ লক্ষ টাকা খরচ করে ৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে অহরহ হচ্ছে এগুলো। আমরা এজন্য এই তদারকি ব্যবস্থা যেটা বিজ্ঞাপন যাচাই করার যে ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাটায় পরিবর্তনের কথা বলেছি। যেখানে অংশীজন সবাই থাকতে হবে মালিকদের প্রতিনিধি থাকবে ইউনিয়নের প্রতিনিধি থাকবে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিনিধি থাকবে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি থাকবে তারা যাচাই করবে প্রচার সংখ্যা। এটা এক নম্বর। দুই নম্বর হচ্ছে যে, যে যে প্রতিষ্ঠানের সার্কুলেশন সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানকে তার আয়করের হিসাব দিতে হবে ঐ ডিএফপির কাছে, ঐ কমিটির কাছে। যাতে আয়করের হিসাব থেকে হিসাব মেলাতে পারে তারা। আপনার যদি ৩০ হাজার কাগজ বিক্রি হয়ে থাকে তাহলে আপনি ৩ হাজারের আয়কর দেবেন না ট্যাক্স দেবেন আপনি ৩০ হাজারের। ৩০ হাজারের বিক্রি না হলে আপনি ৩০ হাজারের ট্যাক্স দেবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ট্যাক্সের কাগজপত্র যাচাই করা হয় না যাচাই করা হচ্ছে না, এখনো পর্যন্ত হচ্ছে না। আমরা বলেছি সেই ট্যাক্সের রিটার্ন এই সার্কুলেশন সংখ্যা প্রচার সংখ্যা যাচাই করার জন্য একটা অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয় আরেকটা বলেছি যে প্রতি বছর অডিটেড অ্যাকাউন্টস প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ করতে হবে সবার জন্য।
রাশেদ আহমেদ : যে স্বাধীন সাংবাদিকতার কথা বলছেন, সেটি কি বিশ্বে আছে এখন?
রাশেদ আহমেদ : আপনার এই কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে বর্তমান নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়েছে?
কামাল আহমেদ: আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। আর কার সাথে আলোচনা হবে? প্রথমত কমিশন তো আর নেই, কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কমিশন ডিসব্যান্ডেড হয়ে গেছে। কমিশনের সদস্যদের সরকার আমন্ত্রণ জানাতে পারে কিন্তু এখনো ঐভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথাবার্তা হয়নি। এমনিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকার যে সমস্ত মতবিনিময় করে সেসব জায়গায় ইন্ডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটিতে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে যেমন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আমাদের কমিশনের দুই একজন সদস্যকেও বিভিন্ন সময় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং আমরা গেছি আমাদের মতামত তুলে ধরেছি, বলেছি আমাদের কথা।
রাশেদ আহমেদ: যেহেতু আপনি নিজেও সাংবাদিক এবং এই যে রাষ্ট্রের এই সমস্যাগুলো এটির একটি সমাধান দরকার আপনার নিজের ক্ষেত্রেও এবং সবার জন্যই পেশাদারিত্বের জন্য। আপনি নিজেও তো উদ্যোগী হয়ে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের কথা এগিয়ে নিতে পারেন। সেটি বলছি আমি।
কামাল আহমেদ: আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারের কাছে তদবির করার পক্ষপাতী নই, আমি সেই ভূমিকায় নেই। আমি সাংবাদিক, সাংবাদিক হিসেবেই থাকতে চাই, লেখালেখি করছি, লেখালেখির মাধ্যমে বলতে পারি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাকলে সেখানে বলতে পারি, সেখানে যে বলছি মন্ত্রীদের সামনে বলেছি সরকারের যারা নীতিনির্ধারক তাদের সাথে কোনো আলোচনার অকেশন ঘটলে সেখানে বলেছি এবং বলছিও।
রাশেদ আহমেদ: ডেইলি স্টারের ওপর হামলা হয়েছিল, এটার কি কোনো সুরহা কিছু হলো, বোঝা গেল কি?
কামাল আহমেদ: মামলা তো আছেই, মামলা তদন্ত হচ্ছে মামলার তদন্তে কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে এবং তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। দেখা যাক আর কতদিন সময় যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন আমাদের এই পুড়ে যাওয়া ভবন দেখতে এসেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। সেটা ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে, তাতে আমরা আশা করেছিলাম মার্চের মধ্যে সেই তদন্ত শেষ হবে। সে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। দেখি আর কতদিন সময় যায়।
রাশেদ আহমেদ: কারা করলো? এটার সাথে কাদের যোগসূত্র? বোঝা গেছে কিছু?
কামাল আহমেদ: ভিডিও ফুটেজে তো সবাইকে চেনা যায় যে কারা হামলায় জড়িত ছিল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা অনেকেই তখন লাইভ ব্রডকাস্ট করেছে যে বীরত্ব এবং কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য। সুতরাং তাদের চিহ্নিত করতে তো সরকারের কষ্ট হওয়ার কথা নয়, তদন্তকারীদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আশা করি যে তারা চিহ্নিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে।
রাশেদ আহমেদ: একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী এটা করেছে, এটি বলা হয়েছে। এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থানটা চব্বিশ পরবর্তীতে দেখা গেল, তারা বিভিন্ন জায়গায় মব করছে। চব্বিশের পরবর্তীতে তাদের এই উত্থানটা কীভাবে হলো?
কামাল আহমেদ: এটা হলো রাজনৈতিক প্রশ্ন। আমি আসলে রাজনৈতিক প্রশ্নে এখন যেতে চাই না। খুবই সংক্ষেপে যদি বলতে বলেন আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে ২৪শে গণঅভ্যুত্থানের পর ঐ গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, একটা বিরাট জাতীয় ঐক্য হয়েছিল, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে নেমে গিয়েছিল।
এখন তাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো কতদূর পর্যন্ত যেতে দেবে সেটা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করে। তার মধ্যে একটা বড় অংশ হচ্ছে সরকার। এখন যেহেতু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছে রাজনৈতিক সরকার তাদের কতটা সংগঠিত হতে দেবে বাড়তে দেবে সেটা সরকারের বিষয়, সরকারকে দেখতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখতে হবে। উগ্রবাদ একটা হুমকি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য, সেটা তো আমরা সবাই অনুভব করি, সেটা আমরা বুঝতে পারি।
রাশেদ আহমেদ: আমি বলছি, তাদের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকতা করাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়।
কামাল আহমেদ: হ্যাঁ সেটা সত্য, একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তো সহিষ্ণুতার অভাব আমরা দেখছি। সহিংসতা দেখছি আমরা। তারাও তো হামলা করছে, মাঠ পর্যায়ে অন্তত। ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করে না কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তাদের সমর্থকরা হেনস্থা করছে বিভিন্ন জায়গায়। তো এই ঝুঁকি সাংবাদিকতায় আছে। আর দলগুলোর ক্ষেত্রে এই ধরনের ত্রুটি সাংগঠনিক দুর্বলতা, সাংগঠনিক বিচ্যুতি এগুলো আছে, সেগুলো থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারবেন কবে, আমরা জানি না।
রাশেদ আহমেদ : কামাল আহমেদ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য।
কামাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন