নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের দৃশ্যগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো সবকিছু বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু একজন কৃষিবিদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা মানুষ হিসেবে এই ঘটনাকে আমি শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখতে পারছি না। আমার কাছে এটি হিমালয় অঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
প্রাথমিকভাবে অঞ্চলটিতে ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ায় অনেকে ভূমিকম্পের কথা ভেবেছিলেন। পরে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। হিমালয়ের ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলা উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। সেই ধস পানি, কাদা ও পাথরের সঙ্গে মিশে এক ভয়ংকর ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসস্রোত তৈরি করে। কোনো কোনো পর্যায়ে এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এই গতির একটি স্রোতের সামনে মানুষের আত্মরক্ষার সময় যে কতটা কম, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের জায়গা ক্রমেই কমছে। হিমালয় বদলে যাচ্ছে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফভাণ্ডারের প্রায় ৯ শতাংশ হারিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ১৯৭৫ সালের পর কোথাও কোথাও বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অঞ্চলের পানি ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-এর তথ্যও আমাদের আশ্বস্ত করে না। সংস্থাটির এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। মধ্য হিমালয়ে কম শীতকালীন তুষারপাত এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপ হিমবাহ ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।
এসব সংখ্যা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী। জড়িয়ে আছে কৃষি। জড়িয়ে আছে খাদ্য এবং শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন। হিমালয়কে আমরা অনেক সময় দূরের কোনো বরফে ঢাকা পর্বতমালা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে হিমালয় শুধু নেপাল, ভারত, ভুটান বা চীনের পাহাড় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল নদীব্যবস্থার প্রাণ এই হিমালয়।
আমরা এমন একটি বদ্বীপে বাস করি, যেখানে অধিকাংশ বড় নদীর উৎস দেশের সীমানার বাইরে। উজানে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলন, পাহাড়ি ঢল কিংবা নদীর প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও আমাদের ঘিরে রয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে হিমালয়ের পরিবর্তন, অন্যদিকে সমুদ্রের পরিবর্তন এই দুই প্রান্তের জলবায়ু ঝুঁকির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। কৃষি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, “জলবায়ু পরিবর্তন” কথাটি অনেক সময় আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাপত্র কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় বলে মনে হয়।
একজন কৃষকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এত জটিল কোনো শব্দ নয়। তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন হলো বীজ বোনার সময় বৃষ্টি না হওয়া; ধান পাকার ঠিক আগে অতিবৃষ্টি; কয়েক মাসের খরায় জমি ফেটে যাওয়া; তীব্র গরমে ফুল ও ফল ঝরে পড়া; অথবা এক রাতের বন্যায় কয়েক মাসের শ্রম হারিয়ে যাওয়া।অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সংকট।
প্রথমত, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ, পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর প্রবাহের জন্য শক্তিশালী আঞ্চলিক ‘আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র, নদী সেন্সর এবং আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। কয়েক মিনিট কিংবা কয়েক ঘণ্টার আগাম সতর্কতাও অনেক ক্ষেত্রে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ও নদীসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করতে হবে। নেপাল, ভুটান, ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহের অবস্থা এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের তথ্য প্রায় বাস্তব সময়ে বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ নদী রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। দুর্যোগও পাসপোর্ট নিয়ে আসে না।
চতুর্থত, আমাদের কৃষিকে আরও জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অতীতের আবহাওয়ার রেকর্ড নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিকেও বিবেচনা করতে হবে। আজকের একটি সেতু, বাঁধ বা সড়ক হয়তো আগামী ৫০ বছর ব্যবহার করা হবে। তাই গতকালের জলবায়ু দিয়ে আগামী দিনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করলে চলবে না।
আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যেটি হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। হিমালয়ের দুর্গম গ্রামের একজন মানুষ কিংবা বাংলাদেশের উপকূলের একজন কৃষক বৈশ্বিক শিল্পায়নের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাননি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য তাদেরই ঘর, ফসল, জীবিকা এবং কখনো জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে।
নিহতদের শান্তি দেওয়া, নিখোঁজ মানুষগুলোকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আর নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এই ভয়াবহ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য পাশে দাড়াতে হবে বিশ্বকে। আবার শোকের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা নিতেও হবে।
বিজ্ঞান আমাদের বিপদের সংকেত দেখাতে পারে।প্রযুক্তি আমাদের আগাম সতর্ক করতে পারে।গবেষণা আমাদের পথ দেখাতে পারে।প্রয়োজন সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। হিমালয় বাংলাদেশের সীমানার বাইরে কিন্তু হিমালয়ের পানি আমাদের নদীতে আসে। সেই নদীর পানি আমাদের কৃষিজমিকে উর্বর করে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও জীবনকে টিকিয়ে রাখে।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের দৃশ্যগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো সবকিছু বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু একজন কৃষিবিদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা মানুষ হিসেবে এই ঘটনাকে আমি শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখতে পারছি না। আমার কাছে এটি হিমালয় অঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
প্রাথমিকভাবে অঞ্চলটিতে ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ায় অনেকে ভূমিকম্পের কথা ভেবেছিলেন। পরে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। হিমালয়ের ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলা উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। সেই ধস পানি, কাদা ও পাথরের সঙ্গে মিশে এক ভয়ংকর ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসস্রোত তৈরি করে। কোনো কোনো পর্যায়ে এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এই গতির একটি স্রোতের সামনে মানুষের আত্মরক্ষার সময় যে কতটা কম, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের জায়গা ক্রমেই কমছে। হিমালয় বদলে যাচ্ছে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফভাণ্ডারের প্রায় ৯ শতাংশ হারিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ১৯৭৫ সালের পর কোথাও কোথাও বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অঞ্চলের পানি ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-এর তথ্যও আমাদের আশ্বস্ত করে না। সংস্থাটির এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। মধ্য হিমালয়ে কম শীতকালীন তুষারপাত এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপ হিমবাহ ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।
এসব সংখ্যা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী। জড়িয়ে আছে কৃষি। জড়িয়ে আছে খাদ্য এবং শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন। হিমালয়কে আমরা অনেক সময় দূরের কোনো বরফে ঢাকা পর্বতমালা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে হিমালয় শুধু নেপাল, ভারত, ভুটান বা চীনের পাহাড় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল নদীব্যবস্থার প্রাণ এই হিমালয়।
আমরা এমন একটি বদ্বীপে বাস করি, যেখানে অধিকাংশ বড় নদীর উৎস দেশের সীমানার বাইরে। উজানে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলন, পাহাড়ি ঢল কিংবা নদীর প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও আমাদের ঘিরে রয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে হিমালয়ের পরিবর্তন, অন্যদিকে সমুদ্রের পরিবর্তন এই দুই প্রান্তের জলবায়ু ঝুঁকির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। কৃষি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, “জলবায়ু পরিবর্তন” কথাটি অনেক সময় আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাপত্র কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় বলে মনে হয়।
একজন কৃষকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এত জটিল কোনো শব্দ নয়। তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন হলো বীজ বোনার সময় বৃষ্টি না হওয়া; ধান পাকার ঠিক আগে অতিবৃষ্টি; কয়েক মাসের খরায় জমি ফেটে যাওয়া; তীব্র গরমে ফুল ও ফল ঝরে পড়া; অথবা এক রাতের বন্যায় কয়েক মাসের শ্রম হারিয়ে যাওয়া।অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সংকট।
প্রথমত, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ, পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর প্রবাহের জন্য শক্তিশালী আঞ্চলিক ‘আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র, নদী সেন্সর এবং আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। কয়েক মিনিট কিংবা কয়েক ঘণ্টার আগাম সতর্কতাও অনেক ক্ষেত্রে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ও নদীসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করতে হবে। নেপাল, ভুটান, ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহের অবস্থা এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের তথ্য প্রায় বাস্তব সময়ে বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ নদী রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। দুর্যোগও পাসপোর্ট নিয়ে আসে না।
চতুর্থত, আমাদের কৃষিকে আরও জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অতীতের আবহাওয়ার রেকর্ড নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিকেও বিবেচনা করতে হবে। আজকের একটি সেতু, বাঁধ বা সড়ক হয়তো আগামী ৫০ বছর ব্যবহার করা হবে। তাই গতকালের জলবায়ু দিয়ে আগামী দিনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করলে চলবে না।
আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যেটি হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। হিমালয়ের দুর্গম গ্রামের একজন মানুষ কিংবা বাংলাদেশের উপকূলের একজন কৃষক বৈশ্বিক শিল্পায়নের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাননি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য তাদেরই ঘর, ফসল, জীবিকা এবং কখনো জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে।
নিহতদের শান্তি দেওয়া, নিখোঁজ মানুষগুলোকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আর নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এই ভয়াবহ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য পাশে দাড়াতে হবে বিশ্বকে। আবার শোকের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা নিতেও হবে।
বিজ্ঞান আমাদের বিপদের সংকেত দেখাতে পারে।প্রযুক্তি আমাদের আগাম সতর্ক করতে পারে।গবেষণা আমাদের পথ দেখাতে পারে।প্রয়োজন সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। হিমালয় বাংলাদেশের সীমানার বাইরে কিন্তু হিমালয়ের পানি আমাদের নদীতে আসে। সেই নদীর পানি আমাদের কৃষিজমিকে উর্বর করে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও জীবনকে টিকিয়ে রাখে।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

আপনার মতামত লিখুন