সংবাদ

বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং ও বিশ্বব্যবস্থার গতিধারা


সাদিয়া সুলতানা রিমি
সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং ও বিশ্বব্যবস্থার গতিধারা

একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল পরিবেশবিষয়ক সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি সবকিছু মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই বাস্তবতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক যে পদ্ধতিগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে কার্বন ট্রেডিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

কার্বন ট্রেডিংকে অনেকে কেবল পরিবেশ রক্ষার একটি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। কোন দেশ কতটা নিঃসরণ করতে পারবে, কে কার্বন কমানোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন দেশ কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করবে, কোন দেশ তা কিনবে এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার্বনের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এসব প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে কার্বন বাজার এখন একই সঙ্গে পরিবেশনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। 

কার্বন ট্রেডিং আসলে কী?

সহজভাবে বললে, কার্বন ট্রেডিং হলো এমন একটি বাজারব্যবস্থা যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই নিঃসরণ-অধিকার বা নিঃসরণ কমানোর প্রমাণপত্র কেনাবেচা করা যায়। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। কার্বন ট্রেডিংকে সরাসরি অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোসের ‘Polluter Pays Principle’-এর তত্ত্ব বলা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। কোসের কাজ মূলত সম্পত্তির অধিকার ও বাহ্যিকতার অর্থনৈতিক সমস্যাকে বাজারভিত্তিক সমাধানের আলোচনায় নিয়ে আসে; আর ‘polluter pays’ নীতিটি পরবর্তীতে পরিবেশনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে আলাদাভাবে বিকশিত হয়। 

 

কিয়োটো থেকে প্যারিস: কার্বন বাজারের আন্তর্জাতিকীকরণ

আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিয়োটো প্রোটোকলের অধীনে Clean Development Mechanism প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট ধরনের নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করে নির্গমন হ্রাসের ক্রেডিট অর্জন করতে পারত। 

পরবর্তীতে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি জলবায়ু কূটনীতিকে আরও বিস্তৃত কাঠামো দেয়। প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ এ-আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতির আইনি ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৬.২এ- আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরযোগ্য নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব ও বাণিজ্যের সুযোগ দেয় এবং অনুচ্ছেদ ৬.৪এ-একটি জাতিসংঘ-তত্ত্বাবধানে নতুন কার্বন ক্রেডিটিং ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে। 

এর অর্থ হলো— কার্বন এখন শুধু পরিবেশগত সূচক নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি ক্রমবর্ধমান সম্পদে পরিণত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কার্বনের মূল্য, হিসাব ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যার হাতে থাকবে, জলবায়ু অর্থনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে। 

জলবায়ু কূটনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন

কার্বন বাজার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর একটি হলো Global North বনাম Global South। উন্নত দেশগুলোর যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম খরচে নিঃসরণ কমানো সম্ভব। যেখানে কম খরচে কার্বন কমানো যায়, সেখানে বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিকভাবে একই অর্থে বেশি পরিবেশগত ফল পাওয়া সম্ভব। 

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের যুক্তি হলো, শিল্পবিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই মাত্রার উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হলে তা ন্যায্য হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। 

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে খুব কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই শুধু কার্বনের বাজার তৈরি করলেই জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রয়োজন ঐতিহাসিক দায়, সক্ষমতা, উন্নয়নের অধিকার এবং ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া। 

কার্বন বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: গ্রিনওয়াশিং

কার্বন ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো greenwashing। কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বাস্তব নিঃসরণ কমানোর পরিবর্তে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেই ক্রেডিট যদি প্রকৃত অতিরিক্ত নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিনিধিত্ব না করে, তাহলে পরিবেশগত লাভ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। 

এখানেই কার্বন বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন আসে। একটি প্রকল্প বাস্তবে কত টন কার্বন কমিয়েছে তার সঠিক হিসাব না থাকলে বাজার কাগজে বড় হলেও বাস্তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নাও হতে পারে। 

তাই কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে additionality, permanence, leakage, measurement, reporting and verification অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রকল্পটি সত্যিই অতিরিক্ত নিঃসরণ কমিয়েছে কি না, কার্বন হ্রাস দীর্ঘস্থায়ী কি না, এক জায়গায় নিঃসরণ কমিয়ে অন্য জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না এসব নিশ্চিত করতে হবে। 

কার্বন এখন বাণিজ্যনীতিরও অংশ

কার্বন বাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Carbon Border Adjustment Mechanism এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর লক্ষ্য হলো কার্বন-নিবিড় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কার্বন ব্যয়ের প্রতিফলন ঘটানো এবং ইউরোপীয় শিল্পকে এমন প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, যেখানে অন্য দেশে তুলনামূলক কম কঠোর জলবায়ু নীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় কম হতে পারে। 

CBAM-এর মাধ্যমে কার্বন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে কোনো দেশের পরিবেশনীতি এখন শুধু সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; তার রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত। 

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক হলেও CBAM-এর প্রাথমিক আওতায় পোশাক খাত নেই। তাই সরাসরি পোশাক রপ্তানিতে CBAM-জনিত শুল্ক এখনই আরোপ হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে ভবিষ্যতে কার্বন হিসাব, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবেশগত মান ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠতে পারে। 

অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি শুধু সম্ভাব্য ‘কার্বন শুল্ক’ নয়; বরং বৈশ্বিক বাজারে কম-কার্বন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা। 

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কোথায়?

কার্বন বাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, সুযোগও তৈরি করতে পারে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন, পুনঃবনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কৃষি প্রকল্প থেকে যাচাইযোগ্য নিঃসরণ হ্রাস তৈরি করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। 

কিন্তু এখানে সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের বন, জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু কার্বন ক্রেডিট তৈরির সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীববৈচিত্র্য, ভূমির মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো কার্বন প্রকল্প গ্রহণ করলে তা নতুন ধরনের শোষণের জন্ম দিতে পারে। 

কার্বন বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে দরকষাকষির ক্ষমতার অসমতা। উন্নত দেশের বড় কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রকল্প থেকে কম দামে ক্রেডিট কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করে, তাহলে প্রকল্পের স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট দেশ ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। 

তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা নয়; বরং কার্বনের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ, প্রকল্পের মালিকানা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো। 

 [লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং ও বিশ্বব্যবস্থার গতিধারা

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল পরিবেশবিষয়ক সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি সবকিছু মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই বাস্তবতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক যে পদ্ধতিগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে কার্বন ট্রেডিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

কার্বন ট্রেডিংকে অনেকে কেবল পরিবেশ রক্ষার একটি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। কোন দেশ কতটা নিঃসরণ করতে পারবে, কে কার্বন কমানোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন দেশ কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করবে, কোন দেশ তা কিনবে এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার্বনের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এসব প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে কার্বন বাজার এখন একই সঙ্গে পরিবেশনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। 


কার্বন ট্রেডিং আসলে কী?

সহজভাবে বললে, কার্বন ট্রেডিং হলো এমন একটি বাজারব্যবস্থা যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই নিঃসরণ-অধিকার বা নিঃসরণ কমানোর প্রমাণপত্র কেনাবেচা করা যায়। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। কার্বন ট্রেডিংকে সরাসরি অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোসের ‘Polluter Pays Principle’-এর তত্ত্ব বলা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। কোসের কাজ মূলত সম্পত্তির অধিকার ও বাহ্যিকতার অর্থনৈতিক সমস্যাকে বাজারভিত্তিক সমাধানের আলোচনায় নিয়ে আসে; আর ‘polluter pays’ নীতিটি পরবর্তীতে পরিবেশনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে আলাদাভাবে বিকশিত হয়। 

 

কিয়োটো থেকে প্যারিস: কার্বন বাজারের আন্তর্জাতিকীকরণ

আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিয়োটো প্রোটোকলের অধীনে Clean Development Mechanism প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট ধরনের নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করে নির্গমন হ্রাসের ক্রেডিট অর্জন করতে পারত। 

পরবর্তীতে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি জলবায়ু কূটনীতিকে আরও বিস্তৃত কাঠামো দেয়। প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ এ-আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতির আইনি ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৬.২এ- আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরযোগ্য নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব ও বাণিজ্যের সুযোগ দেয় এবং অনুচ্ছেদ ৬.৪এ-একটি জাতিসংঘ-তত্ত্বাবধানে নতুন কার্বন ক্রেডিটিং ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে। 

এর অর্থ হলো— কার্বন এখন শুধু পরিবেশগত সূচক নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি ক্রমবর্ধমান সম্পদে পরিণত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কার্বনের মূল্য, হিসাব ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যার হাতে থাকবে, জলবায়ু অর্থনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে। 


জলবায়ু কূটনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন

কার্বন বাজার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর একটি হলো Global North বনাম Global South। উন্নত দেশগুলোর যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম খরচে নিঃসরণ কমানো সম্ভব। যেখানে কম খরচে কার্বন কমানো যায়, সেখানে বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিকভাবে একই অর্থে বেশি পরিবেশগত ফল পাওয়া সম্ভব। 

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের যুক্তি হলো, শিল্পবিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই মাত্রার উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হলে তা ন্যায্য হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। 

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে খুব কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই শুধু কার্বনের বাজার তৈরি করলেই জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রয়োজন ঐতিহাসিক দায়, সক্ষমতা, উন্নয়নের অধিকার এবং ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া। 


কার্বন বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: গ্রিনওয়াশিং

কার্বন ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো greenwashing। কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বাস্তব নিঃসরণ কমানোর পরিবর্তে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেই ক্রেডিট যদি প্রকৃত অতিরিক্ত নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিনিধিত্ব না করে, তাহলে পরিবেশগত লাভ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। 

এখানেই কার্বন বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন আসে। একটি প্রকল্প বাস্তবে কত টন কার্বন কমিয়েছে তার সঠিক হিসাব না থাকলে বাজার কাগজে বড় হলেও বাস্তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নাও হতে পারে। 

তাই কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে additionality, permanence, leakage, measurement, reporting and verification অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রকল্পটি সত্যিই অতিরিক্ত নিঃসরণ কমিয়েছে কি না, কার্বন হ্রাস দীর্ঘস্থায়ী কি না, এক জায়গায় নিঃসরণ কমিয়ে অন্য জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না এসব নিশ্চিত করতে হবে। 


কার্বন এখন বাণিজ্যনীতিরও অংশ

কার্বন বাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Carbon Border Adjustment Mechanism এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর লক্ষ্য হলো কার্বন-নিবিড় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কার্বন ব্যয়ের প্রতিফলন ঘটানো এবং ইউরোপীয় শিল্পকে এমন প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, যেখানে অন্য দেশে তুলনামূলক কম কঠোর জলবায়ু নীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় কম হতে পারে। 

CBAM-এর মাধ্যমে কার্বন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে কোনো দেশের পরিবেশনীতি এখন শুধু সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; তার রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত। 

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক হলেও CBAM-এর প্রাথমিক আওতায় পোশাক খাত নেই। তাই সরাসরি পোশাক রপ্তানিতে CBAM-জনিত শুল্ক এখনই আরোপ হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে ভবিষ্যতে কার্বন হিসাব, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবেশগত মান ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠতে পারে। 

অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি শুধু সম্ভাব্য ‘কার্বন শুল্ক’ নয়; বরং বৈশ্বিক বাজারে কম-কার্বন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা। 


বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কোথায়?

কার্বন বাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, সুযোগও তৈরি করতে পারে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন, পুনঃবনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কৃষি প্রকল্প থেকে যাচাইযোগ্য নিঃসরণ হ্রাস তৈরি করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। 

কিন্তু এখানে সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের বন, জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু কার্বন ক্রেডিট তৈরির সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীববৈচিত্র্য, ভূমির মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো কার্বন প্রকল্প গ্রহণ করলে তা নতুন ধরনের শোষণের জন্ম দিতে পারে। 

কার্বন বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে দরকষাকষির ক্ষমতার অসমতা। উন্নত দেশের বড় কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রকল্প থেকে কম দামে ক্রেডিট কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করে, তাহলে প্রকল্পের স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট দেশ ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। 

তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা নয়; বরং কার্বনের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ, প্রকল্পের মালিকানা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো। 

 [লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত