সংবাদ

লবণাক্ততায় বিপন্ন উপকূলের জনস্বাস্থ্য


আল শাহারিয়া
আল শাহারিয়া
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫ এএম

লবণাক্ততায় বিপন্ন উপকূলের জনস্বাস্থ্য

খুলনার দাকোপ কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কোনো একটি গ্রামের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। গনগনে রোদের মধ্যে কলস কাঁখে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন একদল নারী। তাঁদের গন্তব্য এমন একটি পুকুর বা পানির ফিল্টার, যেখানে কিছুটা মিষ্টি পানি মিলতে পারে। একসময় এই জনপদে মিষ্টি পানির এত হাহাকার ছিল না। বাড়ির পাশের পুকুর বা নলকূপ থেকেই অনায়াসে মিলত তৃষ্ণা মেটানোর পানি। চারপাশের শিবসা, পশুর কিংবা কপোতাক্ষ নদের পানিতে এখন লবণের আধিক্য। খাবার পানিতে লবণের এই আগ্রাসন শুধু মানুষের তৃষ্ণাই বাড়াচ্ছে না, ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে উপকূলের জনস্বাস্থ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মিষ্টি পানির আধারগুলোকে লবণাক্ত করে তুলেছে। আইলা, আম্পান কিংবা রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার পরও জমিতে রেখে যায় লবণের স্থায়ী ক্ষত। লবণাক্ততা এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি গভীর কাঠামোগত বৈষম্যেরও কারণ হয়ে উঠেছে।

উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন। কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঘরের পুরুষেরা কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান শহরের ইটভাটায় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে যান গভীর সমুদ্রে। বাড়িতে থাকা নারীদের দিন কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবিকা হারানোর ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গবাদিপশুর মৃত্যু এবং আয় কমে যাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী চাপ।

সম্প্রতি স্প্রিঙ্গার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং নিপোর্টের একটি গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু লবণাক্ত পানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। গবেষণায় অংশ নেওয়া চার হাজারের বেশি নারীর প্রায় ৭৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন। পরিবেশগত অনিশ্চয়তা কোনো এককালীন দুর্যোগ নয়। এটি বারবার ফিরে এসে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ ও অনিচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করার পরিণতি উদ্বেগজনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পানির অতিরিক্ত লবণ সরাসরি সব ক্ষেত্রে রোগ সৃষ্টি না করলেও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আইসিডিডিআর,বির ওই গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। পানীয় জলে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর যেসব নারী একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পানি পান করছেন এবং তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। গ্রামের পর গ্রাম মানুষ বুঝতেই পারছেন না, কেন তাঁদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। ঘাড়ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গকে তাঁরা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ সুপেয় পানির অভাব তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। প্রান্তিক এসব মানুষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সীমিত।

লবণাক্ততার সবচেয়ে বড় শিকার উপকূলের নারীরা। গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি পান করলে প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। এসব জটিলতা মাতৃস্বাস্থ্যকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মাতৃত্বের পাশাপাশি নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য ও ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতাও হুমকির মুখে। সুপেয় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও দূষিত পানি দিয়ে স্যানিটারি কাপড় ধুতে হচ্ছে তাঁদের। অনিরাপদ পরিচ্ছন্নতার কারণে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদি স্ত্রীরোগে ভুগছেন। এসব সমস্যা উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

লবণাক্ত পানির এই আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। প্রতিদিনের গোসল ও পানীয় জলে লবণের আধিক্য তাদের ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপ উপকূলীয় এলাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ। বারবার অসুস্থ হওয়ার কারণে শিশুরা অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। লবণাক্ত পানির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে শাকসবজি ও দেশি ফলের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উঠানের লাউ-কুমড়ার মাচাগুলো অনেক জায়গায় প্রায় শূন্য। ফলের গাছও মরে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের পুষ্টির স্বাভাবিক উৎসগুলো একে একে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

লবণাক্ততার এই সংকট সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি। খাদ্যে লবণের পরিমাণ মানুষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা অতিরিক্ত সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা নিয়মিত বোতলজাত পানি কেনেন কিংবা গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর সেই সুযোগ নেই। সুপেয় পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে নারীদের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, বাড়ে শারীরিক ক্লান্তি এবং কমে বিশ্রাম ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার সময়। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চেপে বসছে। অভিযোজনের নামে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোর সুফলও অনেক সময় হতদরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু উচ্চ রক্তচাপের প্রচলিত চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা যুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং এলাকাভিত্তিক পানি শোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যত বাড়বে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে এবং উপকূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনা ফাঁকা বুলি হয়েই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত বিশ্বের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। অথচ এর চরম মূল্য আজও চুকিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের উপকূলের প্রান্তিক মানুষ।

[লেখক:শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


লবণাক্ততায় বিপন্ন উপকূলের জনস্বাস্থ্য

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

খুলনার দাকোপ কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কোনো একটি গ্রামের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। গনগনে রোদের মধ্যে কলস কাঁখে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন একদল নারী। তাঁদের গন্তব্য এমন একটি পুকুর বা পানির ফিল্টার, যেখানে কিছুটা মিষ্টি পানি মিলতে পারে। একসময় এই জনপদে মিষ্টি পানির এত হাহাকার ছিল না। বাড়ির পাশের পুকুর বা নলকূপ থেকেই অনায়াসে মিলত তৃষ্ণা মেটানোর পানি। চারপাশের শিবসা, পশুর কিংবা কপোতাক্ষ নদের পানিতে এখন লবণের আধিক্য। খাবার পানিতে লবণের এই আগ্রাসন শুধু মানুষের তৃষ্ণাই বাড়াচ্ছে না, ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে উপকূলের জনস্বাস্থ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মিষ্টি পানির আধারগুলোকে লবণাক্ত করে তুলেছে। আইলা, আম্পান কিংবা রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার পরও জমিতে রেখে যায় লবণের স্থায়ী ক্ষত। লবণাক্ততা এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি গভীর কাঠামোগত বৈষম্যেরও কারণ হয়ে উঠেছে।

উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন। কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঘরের পুরুষেরা কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান শহরের ইটভাটায় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে যান গভীর সমুদ্রে। বাড়িতে থাকা নারীদের দিন কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবিকা হারানোর ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গবাদিপশুর মৃত্যু এবং আয় কমে যাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী চাপ।

সম্প্রতি স্প্রিঙ্গার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং নিপোর্টের একটি গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু লবণাক্ত পানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। গবেষণায় অংশ নেওয়া চার হাজারের বেশি নারীর প্রায় ৭৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন। পরিবেশগত অনিশ্চয়তা কোনো এককালীন দুর্যোগ নয়। এটি বারবার ফিরে এসে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ ও অনিচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করার পরিণতি উদ্বেগজনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পানির অতিরিক্ত লবণ সরাসরি সব ক্ষেত্রে রোগ সৃষ্টি না করলেও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আইসিডিডিআর,বির ওই গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। পানীয় জলে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর যেসব নারী একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পানি পান করছেন এবং তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। গ্রামের পর গ্রাম মানুষ বুঝতেই পারছেন না, কেন তাঁদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। ঘাড়ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গকে তাঁরা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ সুপেয় পানির অভাব তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। প্রান্তিক এসব মানুষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সীমিত।

লবণাক্ততার সবচেয়ে বড় শিকার উপকূলের নারীরা। গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি পান করলে প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। এসব জটিলতা মাতৃস্বাস্থ্যকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মাতৃত্বের পাশাপাশি নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য ও ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতাও হুমকির মুখে। সুপেয় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও দূষিত পানি দিয়ে স্যানিটারি কাপড় ধুতে হচ্ছে তাঁদের। অনিরাপদ পরিচ্ছন্নতার কারণে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদি স্ত্রীরোগে ভুগছেন। এসব সমস্যা উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

লবণাক্ত পানির এই আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। প্রতিদিনের গোসল ও পানীয় জলে লবণের আধিক্য তাদের ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপ উপকূলীয় এলাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ। বারবার অসুস্থ হওয়ার কারণে শিশুরা অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। লবণাক্ত পানির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে শাকসবজি ও দেশি ফলের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উঠানের লাউ-কুমড়ার মাচাগুলো অনেক জায়গায় প্রায় শূন্য। ফলের গাছও মরে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের পুষ্টির স্বাভাবিক উৎসগুলো একে একে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

লবণাক্ততার এই সংকট সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি। খাদ্যে লবণের পরিমাণ মানুষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা অতিরিক্ত সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা নিয়মিত বোতলজাত পানি কেনেন কিংবা গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর সেই সুযোগ নেই। সুপেয় পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে নারীদের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, বাড়ে শারীরিক ক্লান্তি এবং কমে বিশ্রাম ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার সময়। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চেপে বসছে। অভিযোজনের নামে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোর সুফলও অনেক সময় হতদরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু উচ্চ রক্তচাপের প্রচলিত চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা যুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং এলাকাভিত্তিক পানি শোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যত বাড়বে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে এবং উপকূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনা ফাঁকা বুলি হয়েই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত বিশ্বের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। অথচ এর চরম মূল্য আজও চুকিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের উপকূলের প্রান্তিক মানুষ।

[লেখক:শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত