ইউরিয়া সার বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় রাসায়নিক সারগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ১৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৯০ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। একই বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি টন ধান উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টন ইউরিয়া সার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়েছে। সরকার প্রতি টন সার ৩৭৯ দশমিক ৫০ থেকে ৪১৮ দশমিক ৩৩ ডলার দরে আমদানি করেছে। ফলে ২০ থেকে ২২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ পদ্ধতিতে জমিতে ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে এর বড় একটি অংশ গাছের কাজে লাগে না; বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ দেশে ইউরিয়া সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি পরীক্ষিত প্রযুক্তি রয়েছে, যার নাম গুটি ইউরিয়া। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের অপচয় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া সার সাশ্রয় হতে পারে, যার আমদানি মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
ইউরিয়া সার মাটির গভীরে প্রয়োগের এই প্রযুক্তি ধান চাষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জলবায়ুবান্ধব পদ্ধতি। এটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন, বিশেষ করে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পারে। একই সঙ্গে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায় এবং ধানের ফলন বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। জমিতে চারা রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন পর মাটির ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। প্রতি চারটি ধানের গোছার জন্য ২ দশমিক ৭ গ্রাম ওজনের একটি গুটি ব্যবহার করা হয়। এতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ কেজি গুটি ইউরিয়া লাগে এবং সাধারণত দ্বিতীয়বার ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। মাটির গভীরে গুটি স্থাপন করায় সার থেকে নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। ফলে ধানের গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন পায়। এতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি কমে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ভালো হয়, কার্যকর কুশি ও শীষের সংখ্যা বাড়ে এবং ধানের দানা পুষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে ফলন বাড়তে পারে। গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারে নাইট্রোজেন সারের অপচয় কমে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় অবদান দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের। তারা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজন উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদনের উপকরণ কেনেন। অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত নির্দেশিকায় গুটি ইউরিয়ার উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রচার ও সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন ওঠে, গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার বাড়লে ইউরিয়া সারের মৌসুমভিত্তিক সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে বলে কি এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষকের কাছে কার্যকর প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলে তারা তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। গুটি ইউরিয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
একসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে আইএফডিসি পাঁচ বছর মেয়াদি এগ্রো-বেইজড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির সময়কাল ছিল সম্ভবত ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার সার ডিলারদের কাছে গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ছিল এবং এ জন্য তারা বিশেষ বরাদ্দে ইউরিয়া সার পেতেন। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে বরাদ্দ করা সারের বড় অংশ গুটি তৈরি না করে গুঁড়া সার হিসেবে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কমে যায়। বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় গুটি ইউরিয়া সহজে পাওয়া যায় না। তাই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা এটি ব্যবহারের সুযোগ পান না। তবে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার কৃষকেরা বহু বছর ধরে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন। তাদের চাহিদার কারণে বাজারটির কয়েকটি গুটি তৈরির যন্ত্র এখনো চালু রয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একবার গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করলে বারবার সার কেনার ঝামেলা কমে। তাদের অভিজ্ঞতায়, আগাছা কম হওয়ায় নিড়ানির শ্রম ও খরচও কম লাগে এবং ধানের ফলন ভালো হয়।
বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম উৎস কৃষি। দেশের মোট নির্গমনে কৃষির অবদান প্রায় ৩৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবিড় ধান চাষ, সার ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ব্যবহার এবং জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪-১৫ সালে ধান চাষের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ কৃষি থেকে নির্গমনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ নিঃশর্ত এবং ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা সাপেক্ষে অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। কৃষিতে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এতে সার আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থাকলেও সরকারি পর্যায়ে এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ধানের মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার কেনার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সঠিক হিসাব ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা প্রয়োজন, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে এই সার সরবরাহ করা সম্ভব কি না। এ জন্য প্রথমেই এলেঙ্গা বাজারে গুটি ইউরিয়া তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন, ব্যবহারকারী কৃষকদের অভিজ্ঞতা যাচাই এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। গবেষণায় এর কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হলে সরকারকে উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রয়োগব্যবস্থা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা এবং যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় গুটি ইউরিয়ার মতো কার্যকর প্রযুক্তিকে কৃষিনীতি ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সার আমদানিতে সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হতে পারে।
[লেখক: কৃষিবিদ]

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
ইউরিয়া সার বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় রাসায়নিক সারগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ১৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৯০ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। একই বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি টন ধান উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টন ইউরিয়া সার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়েছে। সরকার প্রতি টন সার ৩৭৯ দশমিক ৫০ থেকে ৪১৮ দশমিক ৩৩ ডলার দরে আমদানি করেছে। ফলে ২০ থেকে ২২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ পদ্ধতিতে জমিতে ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে এর বড় একটি অংশ গাছের কাজে লাগে না; বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ দেশে ইউরিয়া সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি পরীক্ষিত প্রযুক্তি রয়েছে, যার নাম গুটি ইউরিয়া। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের অপচয় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া সার সাশ্রয় হতে পারে, যার আমদানি মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
ইউরিয়া সার মাটির গভীরে প্রয়োগের এই প্রযুক্তি ধান চাষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জলবায়ুবান্ধব পদ্ধতি। এটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন, বিশেষ করে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পারে। একই সঙ্গে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায় এবং ধানের ফলন বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। জমিতে চারা রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন পর মাটির ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। প্রতি চারটি ধানের গোছার জন্য ২ দশমিক ৭ গ্রাম ওজনের একটি গুটি ব্যবহার করা হয়। এতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ কেজি গুটি ইউরিয়া লাগে এবং সাধারণত দ্বিতীয়বার ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। মাটির গভীরে গুটি স্থাপন করায় সার থেকে নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। ফলে ধানের গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন পায়। এতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি কমে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ভালো হয়, কার্যকর কুশি ও শীষের সংখ্যা বাড়ে এবং ধানের দানা পুষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে ফলন বাড়তে পারে। গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারে নাইট্রোজেন সারের অপচয় কমে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় অবদান দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের। তারা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজন উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদনের উপকরণ কেনেন। অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত নির্দেশিকায় গুটি ইউরিয়ার উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রচার ও সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন ওঠে, গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার বাড়লে ইউরিয়া সারের মৌসুমভিত্তিক সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে বলে কি এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষকের কাছে কার্যকর প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলে তারা তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। গুটি ইউরিয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
একসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে আইএফডিসি পাঁচ বছর মেয়াদি এগ্রো-বেইজড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির সময়কাল ছিল সম্ভবত ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার সার ডিলারদের কাছে গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ছিল এবং এ জন্য তারা বিশেষ বরাদ্দে ইউরিয়া সার পেতেন। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে বরাদ্দ করা সারের বড় অংশ গুটি তৈরি না করে গুঁড়া সার হিসেবে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কমে যায়। বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় গুটি ইউরিয়া সহজে পাওয়া যায় না। তাই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা এটি ব্যবহারের সুযোগ পান না। তবে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার কৃষকেরা বহু বছর ধরে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন। তাদের চাহিদার কারণে বাজারটির কয়েকটি গুটি তৈরির যন্ত্র এখনো চালু রয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একবার গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করলে বারবার সার কেনার ঝামেলা কমে। তাদের অভিজ্ঞতায়, আগাছা কম হওয়ায় নিড়ানির শ্রম ও খরচও কম লাগে এবং ধানের ফলন ভালো হয়।
বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম উৎস কৃষি। দেশের মোট নির্গমনে কৃষির অবদান প্রায় ৩৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবিড় ধান চাষ, সার ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ব্যবহার এবং জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪-১৫ সালে ধান চাষের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ কৃষি থেকে নির্গমনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ নিঃশর্ত এবং ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা সাপেক্ষে অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। কৃষিতে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এতে সার আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থাকলেও সরকারি পর্যায়ে এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ধানের মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার কেনার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সঠিক হিসাব ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা প্রয়োজন, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে এই সার সরবরাহ করা সম্ভব কি না। এ জন্য প্রথমেই এলেঙ্গা বাজারে গুটি ইউরিয়া তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন, ব্যবহারকারী কৃষকদের অভিজ্ঞতা যাচাই এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। গবেষণায় এর কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হলে সরকারকে উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রয়োগব্যবস্থা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা এবং যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় গুটি ইউরিয়ার মতো কার্যকর প্রযুক্তিকে কৃষিনীতি ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সার আমদানিতে সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হতে পারে।
[লেখক: কৃষিবিদ]

আপনার মতামত লিখুন