ফরিদপুরে এসে কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে যাবেন না, এমন বেরসিক মানুষ পাওয়া কঠিন। এর আগেও দুয়েকবার কবির জন্মভিটায় এসেছি। এবার পরিবেশটা বেশ অতিথিবান্ধব বলে মনে হয়েছে। বাড়িটির ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো ঘর এবং ঘরের বারান্দায় কবির স্মৃতিধর্মী লেখা ও কবিতা দিয়ে আঁকা আলপনার মতো উদ্ধৃতিগুলো আগ্রহী অতিথি ও পর্যটকদের একটু দাঁড়াতে বাধ্য করে। মধুকবি মাইকেলের ‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল’ পঙ্ক্তিটির মতো। কবি জসীমউদ্দীনের শৈশব-কৈশোরের কথা তার বাড়ির ঘরের বেড়ায় উৎকীর্ণ করা আছে। বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা, ডালিমগাছ—এসবও সেখানে রয়েছে। গতকাল বিকেলটা শরতের মনোরম আবহাওয়ায় পল্লীকবির বাড়ির সামনের কুমার নদের পাড়ে বেড়াতে আসা নানা শ্রেণির মানুষের পদচারণা ও চা-চক্রের মধ্য দিয়ে বেশ ভালো কেটেছে। আমার কন্যা, নাতনি, ছোট ছেলে ও জামাতা সঙ্গে ছিল। জামাতা ফরিদপুর জেলা প্রশাসনে কর্মরত একজন কর্মকর্তা। সে সুবাদেই সেখানে বেড়াতে যাওয়া।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বাংলা ভাষার একজন মৌলিক কবি; তিনি ছিলেন মা, মাটি ও মানুষের কবি। বিশ, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির বাস্তব চিত্রকল্প উঠে এসেছে তার কাব্যে, ছন্দে ও গানে। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ভাষাবিদ ও গবেষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। কলকাতা ও ঢাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। দুজনের বয়স কাছাকাছি ছিল। তাদের জীবনাবসানও একই বছরে, ১৯৭৬ সালে। কবি হিসেবে নজরুল ইসলাম বেহিসাবি, অবৈষয়িক ও বোহেমিয়ান স্বভাবের হলেও জসীমউদ্দীন ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সারা জীবন পরিকল্পিত পথে হেঁটেছেন এবং বিষয়-সম্পদের প্রতিও খেয়াল রেখেছেন।
২.
কথিত আছে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে ঢাকা বিভাগের আওতাধীন এলাকা থেকে তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। সে সময় কাজী নজরুল ইসলাম পল্লীকবির সঙ্গে এই কুমার নদ দিয়ে নৌকায় তার বাড়িতে এসেছিলেন। সেই নির্বাচনে কাজী নজরুল পরাজিত হয়েছিলেন। এমনকি জামানতও হারিয়েছিলেন। কবির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের মূল অভিযোগ ছিল, তিনি নাস্তিক, কাফের, শ্যামাসংগীত লেখেন ইত্যাদি। নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ফরিদপুরের মুসলিম লীগ প্রার্থী মওলবি তমিজউদ্দীন আহমদ। অবশ্য কবিকে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদসহ অনেকে। তিনি তা শোনেননি, জেদ ধরেছিলেন। বলেছিলেন, মানুষ তার নামের ওপর ভোট দেবে। তবে নির্বাচনে আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়। নির্বাচনী সফরের প্রধান সঙ্গীদের অন্যতম ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন।
৩.
ফরিদপুরে ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি, লেখক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ূন কবিরের পৈতৃক ভিটা দর্শন করলাম। জানলাম, শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১ একর ৬৩ শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি তার মৃত্যুর পর তার ভাইয়েরা মিলে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে নারীশিক্ষার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর পৌরসভার কাছে ‘কবিরবাগ’ নামে হস্তান্তর করে দেন। উল্লেখ্য, তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট ১৯৬৯ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর। এখানে বর্তমানে সাজেদা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। বাড়িটি ঘুরে দেখলাম। প্রধান শিক্ষক জানালেন, এখানে হুমায়ূন কবিরের বাবা আবুল খায়ের কবিরউদ্দীন আহমেদের কবর রয়েছে। কবরটিও দেখা হলো। এপিটাফ থেকে জানা যায়, তিনি ১৯৫০ সালে পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন খান বাহাদুর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
হুমায়ূন কবির ১৯০৬ সালে ফরিদপুর শহরের অদূরে কোমরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ মেধার স্মারক ও কিংবদন্তিতুল্য। ছাত্রজীবনের সব স্তরেই তার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিসহ একাধিক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইংরেজি ভাষায় তার পাণ্ডিত্য ছিল অপরিসীম।
হুমায়ূন কবির স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের একান্ত সচিব হিসেবে রাজনৈতিক মহলে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় সর্বভারতীয় শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। নেহরুর প্রয়াণের পর তিনি শিক্ষাসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ষাটের দশকে তিনি রাজ্যসভা ও লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
৪.
বাঙালি ও মুসলিম হুমায়ূন কবির কংগ্রেসের রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণী চিন্তক হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। শিক্ষা ও সমাজ গবেষণায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষামন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বিজ্ঞান গবেষণা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী—এমন নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে গবেষণাধর্মী বই রচনা করেছেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় মুসলমানদের রাজনীতি বিষয়ে বই লেখেন। তার একমাত্র উপন্যাস ‘নদী ও নারী’ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পূর্ব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে পদ্মার চর ও প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের আখ্যান এই উপন্যাসের সারবস্তু। মার্কসবাদ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিয়েও তার নিবিড় গবেষণা ছিল।
কবি হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি না থাকলেও ১৯৪৫ সালে ‘দ্য পোয়েট্রি অব বেঙ্গল’ নামে সমালোচনাগ্রন্থ লিখে কবি ও লেখক মহলে আলোচিত হয়েছিলেন। তার একাধিক কবিতার বই আজও বাঙালি পাঠকের নজরে রয়েছে। হুমায়ূন কবিরের ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি ষাট ও সত্তরের দশকে কে না পড়েছেন? কবিতাটি আজও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। জোয়ার-ভাটার নদী কত জীবন কেড়ে নিয়ে যায়, তার হিসাব কে রাখে? আমাদের শৈশবের সেই কবিতা—
‘শোন্ মা আমিনা রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল
এলো মেঘনার জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।’
এ কথা সবাই জানেন, ইংরেজ কবি চার্লস কিংসলির ‘দ্য স্যান্ডস অব ডি’ কবিতার অনুসরণে কবি হুমায়ূন কবির ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি লিখেছিলেন। এমন আরও অনেক বিখ্যাত কবিতার স্রষ্টা কবি হুমায়ূন কবির। ভাবছিলাম, হুমায়ূন কবির কি আজকের প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক অজানা বাঙালি কবির নাম?
[লেখক: গল্পকার]

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
ফরিদপুরে এসে কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে যাবেন না, এমন বেরসিক মানুষ পাওয়া কঠিন। এর আগেও দুয়েকবার কবির জন্মভিটায় এসেছি। এবার পরিবেশটা বেশ অতিথিবান্ধব বলে মনে হয়েছে। বাড়িটির ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো ঘর এবং ঘরের বারান্দায় কবির স্মৃতিধর্মী লেখা ও কবিতা দিয়ে আঁকা আলপনার মতো উদ্ধৃতিগুলো আগ্রহী অতিথি ও পর্যটকদের একটু দাঁড়াতে বাধ্য করে। মধুকবি মাইকেলের ‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল’ পঙ্ক্তিটির মতো। কবি জসীমউদ্দীনের শৈশব-কৈশোরের কথা তার বাড়ির ঘরের বেড়ায় উৎকীর্ণ করা আছে। বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা, ডালিমগাছ—এসবও সেখানে রয়েছে। গতকাল বিকেলটা শরতের মনোরম আবহাওয়ায় পল্লীকবির বাড়ির সামনের কুমার নদের পাড়ে বেড়াতে আসা নানা শ্রেণির মানুষের পদচারণা ও চা-চক্রের মধ্য দিয়ে বেশ ভালো কেটেছে। আমার কন্যা, নাতনি, ছোট ছেলে ও জামাতা সঙ্গে ছিল। জামাতা ফরিদপুর জেলা প্রশাসনে কর্মরত একজন কর্মকর্তা। সে সুবাদেই সেখানে বেড়াতে যাওয়া।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বাংলা ভাষার একজন মৌলিক কবি; তিনি ছিলেন মা, মাটি ও মানুষের কবি। বিশ, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির বাস্তব চিত্রকল্প উঠে এসেছে তার কাব্যে, ছন্দে ও গানে। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ভাষাবিদ ও গবেষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। কলকাতা ও ঢাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। দুজনের বয়স কাছাকাছি ছিল। তাদের জীবনাবসানও একই বছরে, ১৯৭৬ সালে। কবি হিসেবে নজরুল ইসলাম বেহিসাবি, অবৈষয়িক ও বোহেমিয়ান স্বভাবের হলেও জসীমউদ্দীন ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সারা জীবন পরিকল্পিত পথে হেঁটেছেন এবং বিষয়-সম্পদের প্রতিও খেয়াল রেখেছেন।
২.
কথিত আছে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে ঢাকা বিভাগের আওতাধীন এলাকা থেকে তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। সে সময় কাজী নজরুল ইসলাম পল্লীকবির সঙ্গে এই কুমার নদ দিয়ে নৌকায় তার বাড়িতে এসেছিলেন। সেই নির্বাচনে কাজী নজরুল পরাজিত হয়েছিলেন। এমনকি জামানতও হারিয়েছিলেন। কবির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের মূল অভিযোগ ছিল, তিনি নাস্তিক, কাফের, শ্যামাসংগীত লেখেন ইত্যাদি। নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ফরিদপুরের মুসলিম লীগ প্রার্থী মওলবি তমিজউদ্দীন আহমদ। অবশ্য কবিকে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদসহ অনেকে। তিনি তা শোনেননি, জেদ ধরেছিলেন। বলেছিলেন, মানুষ তার নামের ওপর ভোট দেবে। তবে নির্বাচনে আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়। নির্বাচনী সফরের প্রধান সঙ্গীদের অন্যতম ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন।
৩.
ফরিদপুরে ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি, লেখক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ূন কবিরের পৈতৃক ভিটা দর্শন করলাম। জানলাম, শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১ একর ৬৩ শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি তার মৃত্যুর পর তার ভাইয়েরা মিলে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে নারীশিক্ষার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর পৌরসভার কাছে ‘কবিরবাগ’ নামে হস্তান্তর করে দেন। উল্লেখ্য, তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট ১৯৬৯ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর। এখানে বর্তমানে সাজেদা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। বাড়িটি ঘুরে দেখলাম। প্রধান শিক্ষক জানালেন, এখানে হুমায়ূন কবিরের বাবা আবুল খায়ের কবিরউদ্দীন আহমেদের কবর রয়েছে। কবরটিও দেখা হলো। এপিটাফ থেকে জানা যায়, তিনি ১৯৫০ সালে পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন খান বাহাদুর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
হুমায়ূন কবির ১৯০৬ সালে ফরিদপুর শহরের অদূরে কোমরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ মেধার স্মারক ও কিংবদন্তিতুল্য। ছাত্রজীবনের সব স্তরেই তার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিসহ একাধিক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইংরেজি ভাষায় তার পাণ্ডিত্য ছিল অপরিসীম।
হুমায়ূন কবির স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের একান্ত সচিব হিসেবে রাজনৈতিক মহলে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় সর্বভারতীয় শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। নেহরুর প্রয়াণের পর তিনি শিক্ষাসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ষাটের দশকে তিনি রাজ্যসভা ও লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
৪.
বাঙালি ও মুসলিম হুমায়ূন কবির কংগ্রেসের রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণী চিন্তক হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। শিক্ষা ও সমাজ গবেষণায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষামন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বিজ্ঞান গবেষণা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী—এমন নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে গবেষণাধর্মী বই রচনা করেছেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় মুসলমানদের রাজনীতি বিষয়ে বই লেখেন। তার একমাত্র উপন্যাস ‘নদী ও নারী’ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পূর্ব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে পদ্মার চর ও প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের আখ্যান এই উপন্যাসের সারবস্তু। মার্কসবাদ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিয়েও তার নিবিড় গবেষণা ছিল।
কবি হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি না থাকলেও ১৯৪৫ সালে ‘দ্য পোয়েট্রি অব বেঙ্গল’ নামে সমালোচনাগ্রন্থ লিখে কবি ও লেখক মহলে আলোচিত হয়েছিলেন। তার একাধিক কবিতার বই আজও বাঙালি পাঠকের নজরে রয়েছে। হুমায়ূন কবিরের ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি ষাট ও সত্তরের দশকে কে না পড়েছেন? কবিতাটি আজও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। জোয়ার-ভাটার নদী কত জীবন কেড়ে নিয়ে যায়, তার হিসাব কে রাখে? আমাদের শৈশবের সেই কবিতা—
‘শোন্ মা আমিনা রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল
এলো মেঘনার জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।’
এ কথা সবাই জানেন, ইংরেজ কবি চার্লস কিংসলির ‘দ্য স্যান্ডস অব ডি’ কবিতার অনুসরণে কবি হুমায়ূন কবির ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি লিখেছিলেন। এমন আরও অনেক বিখ্যাত কবিতার স্রষ্টা কবি হুমায়ূন কবির। ভাবছিলাম, হুমায়ূন কবির কি আজকের প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক অজানা বাঙালি কবির নাম?
[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন