ফেনীর সোনাগাজীতে আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে "ন্যূনতম তথ্য-প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও" মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ায় বিচারিক আদালতের বিচারকের তীব্র সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে পর্যবেক্ষণ প্রদান করে বিচারক বেঞ্চ বলেন, "একটি সভ্য সমাজে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা আশা করা যায় না। ন্যূনতম প্রমাণ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।"
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্ট তাদের রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, মামলায় খালাস পাওয়া শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দীনের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন, যার ফলে অসংবেদনশীল এই রায়ের কারণে আসামিদের দীর্ঘ সাতটি বছর কনডেম সেলে কাটাতে হয়েছে এবং তাদের পরিবারগুলো ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
আদালত আরও বলেন, "ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। দণ্ডবিধি ও সাজা প্রদানসংক্রান্ত বিধিমালার মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত না করা পর্যন্ত ওই বিচারককে দায়রা আদালতের বিচারিক কাজ পরিচালনা থেকে দূরে রাখা শ্রেয়।"
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে আসে ঘটনার মূল পেছনের বিবরণ। এতে বলা হয়, নুসরাতকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার পরিকল্পনা ও নির্দেশ বাস্তবায়নে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরউদ্দিন মূল সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নুসরাত মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শামীম, নুরউদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। আদালত নুসরাতের মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিকে ‘ত্রুটিহীন’ ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতার বিচারে পুরোপুরি সঠিক বলে উল্লেখ করেন।
ঐ জবানবন্দিতে চারজনের সরাসরি জড়িত থাকার স্পষ্ট তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডিতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল জানিয়ে আদালত বলেন, রিমান্ডে নির্যাতন করার কোনো অকাট্য তথ্য নথিতে নেই, তাই শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেই জবানবন্দি অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট এই মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা এবং শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।
অন্যদিকে পর্যালোচনায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় ১০ জনকে খালাস প্রদান করা হয় এবং চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত চার আসামি হলেন নুরউদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের এবং উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।
মৃত্যুদণ্ড থেকে পূর্ণ খালাস পাওয়া ১০ জন হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, স্থানীয় কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম এবং মহি উদ্দিন শাকিল।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল, যখন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ওই বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু নির্যাতনের গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তিতে একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করলে এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি ও রায় প্রদান সম্পন্ন হয়।

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফেনীর সোনাগাজীতে আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে "ন্যূনতম তথ্য-প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও" মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ায় বিচারিক আদালতের বিচারকের তীব্র সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে পর্যবেক্ষণ প্রদান করে বিচারক বেঞ্চ বলেন, "একটি সভ্য সমাজে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা আশা করা যায় না। ন্যূনতম প্রমাণ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।"
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্ট তাদের রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, মামলায় খালাস পাওয়া শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দীনের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন, যার ফলে অসংবেদনশীল এই রায়ের কারণে আসামিদের দীর্ঘ সাতটি বছর কনডেম সেলে কাটাতে হয়েছে এবং তাদের পরিবারগুলো ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
আদালত আরও বলেন, "ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। দণ্ডবিধি ও সাজা প্রদানসংক্রান্ত বিধিমালার মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত না করা পর্যন্ত ওই বিচারককে দায়রা আদালতের বিচারিক কাজ পরিচালনা থেকে দূরে রাখা শ্রেয়।"
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে আসে ঘটনার মূল পেছনের বিবরণ। এতে বলা হয়, নুসরাতকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার পরিকল্পনা ও নির্দেশ বাস্তবায়নে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরউদ্দিন মূল সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নুসরাত মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শামীম, নুরউদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। আদালত নুসরাতের মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিকে ‘ত্রুটিহীন’ ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতার বিচারে পুরোপুরি সঠিক বলে উল্লেখ করেন।
ঐ জবানবন্দিতে চারজনের সরাসরি জড়িত থাকার স্পষ্ট তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডিতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল জানিয়ে আদালত বলেন, রিমান্ডে নির্যাতন করার কোনো অকাট্য তথ্য নথিতে নেই, তাই শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেই জবানবন্দি অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট এই মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা এবং শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।
অন্যদিকে পর্যালোচনায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় ১০ জনকে খালাস প্রদান করা হয় এবং চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত চার আসামি হলেন নুরউদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের এবং উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।
মৃত্যুদণ্ড থেকে পূর্ণ খালাস পাওয়া ১০ জন হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, স্থানীয় কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম এবং মহি উদ্দিন শাকিল।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল, যখন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ওই বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু নির্যাতনের গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তিতে একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করলে এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি ও রায় প্রদান সম্পন্ন হয়।

আপনার মতামত লিখুন