সংবাদ

মুক্তগদ্য

‘চাঁদ’ যখন শিল্প-সাহিত্যের উপমায়-বর্ণনায়


দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম

‘চাঁদ’ যখন শিল্প-সাহিত্যের উপমায়-বর্ণনায়


আকাশের অপূর্ব অপরূপ চাঁদ। চাঁদকে নিয়ে আমাদের ভাবনা ভালবাসা কম হলো না। বিধাতার এক রহস্যজনক সৃষ্টি আকাশের চাঁদ তারা। মোহনীয় আলোই তাকে ভাল লাগা ভালবাসার কারণ। চাঁদ যদি আলো না দিয়ে শুধু একটা মাটির রঙ পাথর খণ্ড হয়ে ঘুরে বেড়াতো তবে মনে হয় না তাকে কেউ এত ভালবাসতো— তাকে কেউ এত কাছে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে ডাকতো। আকাশে চাঁদ উঠলে চাঁদ নিজে যেমন একটা স্বর্গীয় দেখার বস্তু হয়, তেমনি তার পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জাল বিস্তৃত আলোর নরম রুপালি কনা মনে আনে কোমল অনুভব। মন তখন জেগে ওঠে গানে, আনন্দে, হাসিতে, প্রেমে। মানুষের মনে ফুল ফুটিয়ে দেয় চাঁদ। হৃদয়ের সাথে চাঁদের যেন কোথায় একটা সাংঘাতিক যোগাযোগ। আমার তো মনে হয় চাঁদের কোনো অংশ দিয়ে আমাদের হৃদয়টা বানানো। আমরা চাঁদের যেন কি হই  -- ভীষণ এক আত্মার আত্মীয়।

সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চাঁদের প্রভাব। চাঁদ নিয়ে দু’চারটা কবিতা লেখেননি এমন কবি বিরল। মানব জীবনের শুরু থেকে চাঁদ আমাদের ঘরের জানলায় ওঠে, ভাতের থালায় ওঠে, টিনের চালে, নদীর শরীরে, পুকুরের জলে থই থই করে নাচে। চাঁদের প্রকাশ প্রভাব সবখানে— শুধু মেঘে না ঢেকে দিলেই হয়। খণ্ড খণ্ড মেঘের সাথে চাঁদের লুকোচুরি খেলা, এই আলো এই আঁধারী সেও দেখতে কম ভাললাগার নয়। যা হোক চাঁদের সাহিত্য নিয়ে কিছু বলতে চাই। বিশেষত গানে। এমনিতেই প্রকৃতি তার আকাশে চাঁদকে এঁকে রেখে নীরব আলোর কথার প্রকাশ ঘটিয়ে ব্যাপক সৌন্দর্যের জন্ম দিয়েছেন। আকাশটা যেন বইয়ের একটা পৃষ্ঠা আর চাঁদ তার ওপর লেখা মনোরম শিল্পময় ছন্দোময় একটা গভীর অতলস্পর্শী ভাবনার কবিতা দ্যুতি। তার ওপর আমরা মানুষ কতটা ভাবতে পারি। কতটা ভেবে ভেবে তাকে আবিষ্কার করতে পারি ! আমাদের শৈল্পিক কুশলিপনা কিংবা কবিতা লেখার দক্ষতা কতটা চাঁদকে ধরতে পারে ! হয়ত সামান্যই। হয়ত মাত্র বিন্দু পরিমাণ।

পৃথিবীতে বসে আমরা চাঁদকে দেখেছি নানান মাত্রায়। চাঁদ যে খাবার রুটি হতে পারে এই ভাবনা কি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের আগে এমন বিষণ্নভাবে এত অভাবতাড়িত হয়ে ক্ষুধার্ত চিত্তে কেউ ভাবতে পেরেছে! পারেনি। চাঁদ সবসময় সুন্দরের বস্তু হয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের চোখে। কবি সুকান্ত এমন একসময় এমন একভাবে চাঁদকে দেখলেন— “হে মহাজীবন” কবিতায়— গোল চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। ক্ষুধার্ত মানুষ ছাড়া এটা কেউ ভাবতেই পারে না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সমস্ত চাওয়া পাওয়া খাদ্য পাওয়ার আকুলি বিকুলিতে কাটে। রুটি একটা খাদ্য। দেখতেও গোল। সুতরাং তার কাছে গোল চাঁদ রুটি কিংবা রুটির আকাঙ্ক্ষা হতে পারা স্বাভাবিক। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, চাঁদের গায়ে ছায়া ছায়া কিছু দাগ আছে। সেগুলোকে আমরা চাঁদের কলঙ্ক বলি। একেই যদি বলি হালকা পোড়া রুটি। এই ছায়া যেন আগুনে ঝলসানো পোড়া দাগ— অত্যুক্তি হবে কি? হবে না। সুতরাং কবি সুকান্ত ঐ ক্ষুধার্ত মুহূর্তে পূর্ণিমার চাঁদকে রুটি বলেছেন। মিথ্যে বলেননি। যদিও ঐ ক্ষুধার্ত মানুষটার আশা চাঁদ পূরণ করতে পারে নি। রুটি হয়ে কিংবা খাবার হয়ে তার হাতে এসে লুটিয়ে পড়ে ধরা দেয় নি। খিদেরও উপশম হয়নি।

চাঁদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান আছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি গান— “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো” এই গানটা রবীন্দ্রনাথ ১৯২৯ সালে রচনা করেন। এটি রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের একটি গান। এই গানে রবীন্দ্রনাথ চাঁদকে বহুরূপে চিত্রিত করেছেন। গানের মধ্যে বলছেন— নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা। অর্থাৎ জোছনাকে চন্দনের সাথে তুলনা করলেন। আবার স্বর্গের ফুল পারিজাতের কেশর বলছেন। আবার বলছেন— চাঁদ যেন ইন্দ্রপুরীর কোনো এক রমণীর বাসর প্রদীপ। এইসব উপমা চাঁদকে মহিমান্বিত করেছে। আমাদের কাছে চাঁদ হয়ে উঠেছে অনন্য।

একটা মাত্র গোল চাঁদ। পৃথিবী থেকে তাকিয়ে দেখলে একটা ভাত খাওয়ার থালার চাইতে বড় হবে না। এর শূন্যে ঝুলে থাকা আমাকে প্রচণ্ড রকম বিস্মিত করে। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এর ব্যাস ৩৪৭৪ কিঃ মিটার। পৃথিবী থেকে এর গড় দূরত্ব ৩৮৪৪০০ কিঃ মিটার। কিন্তু মনে হয় কত কাছে। কখনো মনে হয় নারকেল গাছের মাথায় চাঁদটি দাঁড়িয়ে আছে। আবার বিজ্ঞান এও বলছে চাঁদের নিজের নাকি আলো নেই। সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে চাঁদ। বিশ্বাসযোগ্য হয়? বিজ্ঞান না পড়া মানুষ এটা কোনো দিন বিশ্বাস করবে না। আমি যখন কবিতা লিখি তখন বিজ্ঞানের এই কথা আর বিশ্বাস হয় না। বহু কল্পনার রঙে আঁকে কবিরা চাঁদকে নিয়ে। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী এমন এক আবেগ তাড়িত কবিতা লিখলেন চাঁদকে দিয়ে শুরু করে। কবিতাটি একটি বিখ্যাত কবিতা। আমাদের ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে ছিল। সেই  ব্যথাতুর কবিতাটির নাম— “কাজলা দিদি”। “কাজলা দিদি” কবিতাটি শুরু হয় এভাবে— “বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/মাগো আমার শ্লোক বলা কাজলা দিদি কই”। আকাশে চাঁদ উঠেছে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে এমন সময় কবিতা শোনার জন্য ছোট বোন দিদিকে খুঁজছে। কিন্তু দিদি তো নেই। কবিতাটি ব্যথার রসে বোনা। বোন হারা বোনের কান্না ঝরে পড়েছে রুপালি জোছনার ভেতর। কবিতাটি যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত “লেখা” কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি কবিতা। কবিতাটির আংশিক সুরারোপ করে গানও তৈরি করা হয়। সুরারোপ করেন বিখ্যাত সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত। এবং প্রতীমা বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনে থাকি আমরা গানটি।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের অপূর্ব একটি গান রয়েছে চাঁদকে নিয়ে। এখানে চাঁদ নানান মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে।  এই গানে যুক্ত হয়ে আছে মিথ।  প্রেম বিরহ বিচ্ছেদ বেদনা। গানটির আরম্ভ এরকম— “চাঁদ হেরিছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশীতে।”  চাঁদ আকাশে উঠে নিজেই তার মুখ পৃথিবীর জলের দীঘিতে তাকিয়ে দেখছে। “ছুটে তরঙ্গ বাসনা ভঙ্গ সে অঙ্গ পরশীতে”। জলের ঢেউ ছুটে যাচ্ছে চাঁদের প্রতিফলিত রূপ স্পর্শ করার জন্য। রজনী নিজেই চাঁদের জন্য রাত জাগছে।  চকোর পাখি চাঁদের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। পিউ কাহা পিউ কাহা বলে পাপিয়া পুকুরে ফোঁটা পদ্মকে কাঁদাতে সচেষ্ট। পুকুর পাড়ের গাছগুলিও পুকুরে পতিত চাঁদের প্রতিবিম্বকে দেখছে।

এই গানে অদ্ভুত একটা মিথ যুক্ত করেছেন নজরুল। আমরা জানি হিন্দু জ্যোতিষ শাস্ত্রে ২৭ টি নক্ষত্র আছে। গানে উল্লিখিত রয়েছে রোহিনী ও ভরণীর কথা। রোহিনী ছিল চন্দ্র দেবতার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। রোহিণী ভরণী এরাও যেন চাঁদের জন্যে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। জ্যোৎস্না নিশিথে কবির কল্পনায় ধরা পড়েছে এসব।

কবি নাট্যকার ও গীতিকার এই তিন অভিধায় ভূষিত ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সংক্ষেপে ডি এল রায়। তিনি কবিতা ও নাটকের পাশাপাশি পাঁচ শতাধিক গান রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত অনেক গান রয়েছে। ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা— গানটি আমরা খুব বেশি বেশি শুনি। এই গানটিতে দেশ মাতৃকার প্রাণের ছবি লুকানো। দেশের প্রতি মানুষের খাঁটি ভালবাসা দরদিয়া সুরে ঝরে পড়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তিন ধরনের গান রচনা করেন। হাসির গান, স্বদেশীয় গান ও প্রেম পর্যায়ের গান। ধনধান্যে— গানটি স্বদেশীয় পর্যায়ের গান। তাঁর গানে পাশ্চাত্য সুর ও ধ্রুপদ সুর লক্ষ্য করা যায়। যখন তার বয়স মাত্র ১২ তিনি  চাঁদকে নিয়ে একটা গান রচনা করেন— “গগন ভূষণ তুমি জনগণ মনোহারী—/ কোথায় যাও নিশানাথ হে নীল নভোবিহারী।” গানটি সুরারোপ করে তাঁর পিতা কার্তীকেয় চন্দ্র রায়কে (যিনিও একজন সঙ্গীতজ্ঞ) শুনিয়ে পিতার আশীর্বাদ লাভ করেন। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আরো একটা গানে সেই বিখ্যাত চরণগুলি আছে যা চাঁদকে উপলক্ষ্য করে বলা হয়েছে। “আজি এমন চাঁদের আলো / মরি যদি সেও ভালো / সে মরণ স্বর্গ সমান।” গানটি— “আজি এসেছি /আজি  এসেছি  এসেছি বধু হে /নিয়ে এই হাসি রূপ গান।” এই গানের অন্তর্ভুক্ত চরণ। এই কথাগুলিতে কবি বলছেন— চাঁদের এমনই আলো যে এই আলোতে হলে মৃত্যু পর্যন্ত করা যায়। যদি চাঁদের এই আলো গায়ে মেখে মৃত্যু হয় তবে সে মৃত্যু স্বর্গের সমান। অর্থাৎ কিছু চাই না। চাঁদের আলো প্রাপ্তি এমন ঠিকানা পাওয়া যেটা মহা সুখের। মহা আনন্দের। মৃত্যু তুচ্ছ হয়ে যায়। স্বর্গীয় শোভায় চাঁদ আলোকিত করে ধরাকে। এই পৃথিবীতে স্বর্গ নেমে আসে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় গানটিতে নিজেই সুরারোপ করেন।

একটি খুব মায়া ভরা কষ্ট ভরা গান আছে তালাত মাহমুদের কণ্ঠে। অবশ্য এই গান পরে অনেকেই  গেয়েছেন। কিন্তু তালাত মাহমুদের কণ্ঠে যে জাদু আছে তা আর কারো গানে নেই। কমল ঘোষের কথায় গানটিতে সুর করেছিলেন বিখ্যাত সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়। গানটি হলো— “চাঁদের এত আলো— তবু সে আমারে ডাকি— উতলা মাধবী রাতে— মাগিছে হে মোর আঁখি।” চাঁদের এত আলো থাকতেও কবির কল্পনায় তৃষ্ণার্ত চাঁদ। একদা বসন্ত রাতে অস্থির হয়ে কবির চোখের জন্যে পাগল হয়ে গেছে চাঁদ। আসলে সুন্দরের এই একটি সমস্যা। যতক্ষণ না সে নিজেকে অন্যদের কাছে তুলে ধরতে পারছে ততক্ষণ তার সৌন্দর্য বিফল। নারী সেজেগুজে তার রূপকে পুরুষকে বা অন্য নারীর কাছে দেখাতে চায়। ফুল ফুটে ভ্রমরকে কাছে ডাকে। প্রকাশমানতা ও পরিচিতি সৌন্দর্যের একটি অন্যতম চাহিদা।

বাংলা গানের জগতে অনন্য এক নাম  মান্না দে। মান্না দের কণ্ঠে গান শুনে সেই শৈশব থেকে আমরা বড় হয়েছি। তাঁর অপূর্ব গানের শৈলী তাকে জগত বিখ্যাত করেছে। অসংখ্য গান তিনি গেয়েছেন। প্রতিটা গানই প্রায় হিট গান। চাঁদ নিয়েও তার অনেক গান আছে। আমি একটি গানের প্রসঙ্গ টানছি এই জন্য যে, গানটিতে চাঁদকে সম্পূর্ণ রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। “ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে/ কারো নজর লাগতে পারে/ মেঘেদের উড়ো চিঠি/ উড়েও তো আসতে পারে।/ ঝলমল করিও না গো?/ তোমার ওই অত আলো/ বেশি রূপ হলে পরে/ সবখানে থাকাই ভালো।/ এই সবে রাত হয়েছে/ এখনই এমন হলে/ মাঝ রাতে আকাশটাতে/ যাবে যে আগুন জ্বলে/ সেই ফাঁকে তুমিও কখন চুরি যাবে।” এই গানটি লিখেছেন বিখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। সুর করেছেন প্রভাষ দে। গানটি ১৯৭৬ সালে পূজার গান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

যে বিষয়টা বলতে চাই— সমগ্র চাঁদটাই প্রিয়তমার উপমা। প্রিয়তমার রূপ ছড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্না। কবি (গীতিকার) অসহ্য এই রূপের জোছনাকে সামলে রাখতে বলেছেন। কারণ কারো নজর লাগতে পারে। এত রূপ দেখে পাগল যারা তাদের উড়ো চিঠির ভয়ও আছে। এত রূপ যদি এখনই এমন হয় তবে মাঝরাতে মিলনের সময় না জানি কেমন হয়। তখন তো আগুন জ্বলে যাবে। এখানে চাঁদের কোনো ব্যাপারই নেই। গোটাটাই প্রেয়সী প্রিয়তমার রূপের বর্ণনা চাঁদকে উপমায় গেঁথে রেখে। একটি বারবার শোনার মতো অপূর্ব গান।

একা রবীন্দ্রনাথের অনেক গান আছে চাঁদকে নিয়ে। যেমন— আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে, চোখের জলের লাগলো জোয়ার, দুঃখের পারাবারে ও চাঁদ, ও আমার চাঁদের আলো আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে। নজরুল ইসলামের— একাদশীর চাঁদরে ওই রাঙা মেঘের পাশে।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আরো একটা মন প্রাণ মাতাল করা গান আছে। যে গান শুনলে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অন্য ভাবনালোকে। হ্যাঁ, চাঁদকে উপলক্ষ করেই সেই গান। আমি যখন এই গান শুনি, ঘরে থাকতে আর মন চায় না। মায়া আর মায়াহীনতার দোটানা এই গান। কবি চাঁদের আলোর সাথে মিশে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। আর ঘরে ফিরতে চাইছেন না। চাঁদের আলোকে মায়ের ভালোবাসার সাথে তুলনা করেছেন। এই চাঁদের মোহনীয় আলোর মধ্যে যদি মৃত্যুবরণ না করা যায় তবে এর চেয়ে মরণ ভালো। পৃথিবীর সব হিসেব-নিকেশ পাওনা দেনা চুকিয়ে দিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে জোছনার সাদা আলোয় মিশে যেতে চাইছেন কবি। গানটি সম্পূর্ণ তুলে ধরলাম এখানে— “নীল আকাশের অসীম ছেয়ে ছড়িয়ে গেছে চাঁদের আলো /আবার কেন ঘরের ভেতর আবার কেন প্রদীপ জ্বালো /রাখিস নে আর মায়ায় ঘিরে / স্নেহের বাঁধন ছিঁড়ে নেড়ে /উধাও হয়ে মিশিয়ে যাই /এমন রাত আর পাবোনা লো /পাপিয়ার ওই আকুল তানে /আকাশ ভুবন গেল ভেসে  /থামারে  তোর বীনার ধ্বনি /চুপ করে শোন বাইরে এসে / বুক এগিয়ে আসে মরণ মায়ের মত ভালোবেসে /এখন যদি মরতে না পাই তবে আমার মরন ভালো /সাঙ্গ আমার ধুলো খেলা সাঙ্গ আমার বেচাকেনা /ইচ্ছে করে হিসেব-নিকেশ যাহার যাহা পাওনা দেনা /এখন বড়ই ক্লান্ত আমি ওমা কোলে তুলে নে না /যেখানে ওই অসীম সাদায় মিশেছে ওই অসীম কালো।”

চাঁদ নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক আধুনিক গান। ছায়াছবিতে স্থান পেয়েছে বহু বিখ্যাত গান। আমি কিছু গানের প্রথম কলি এখানে তুলে ধরছি। ১. নিশি রাত বাঁকা চাঁদ (ছবির নাম— পৃথিবী আমারে চায়)  ২. ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা (ছবির নাম— সবার উপরে)  ৩. ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে (পুরোনো দিনের গান) ৪. ও চাঁদ মুখে যেন লাগে না গ্রহণ ৫. চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি ৬. তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে (ছবির নাম— রাজধানীর বুকে) ৭. আকাশের চাঁদ মাটির বুকেতে জ্যোৎস্না রং ধরে (ছবির নাম— গুরু দক্ষিণা) ইত্যাদি।

ইত্যাদি ছাড়া আর উপায়ও নেই। কারণ চাঁদ নিয়ে রয়েছে অনেক অনেক গান। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয় বিশ্বের প্রতিটা সাহিত্যে। প্রতিটা অঞ্চলের গানে চাঁদ সমান মর্যাদায় আসীন। চাঁদ  বিষয়বস্তু হয়েছে কখনো উপমানে কখনো উপমিতে। এক বিস্ময়কর সৃষ্টি এই চাঁদ। মহান ভালোলাগার বস্তু। এই চাঁদকে ঘিরে রয়েছে অপার আনন্দের খোরাক। অসীমের পানে ডাক দিয়ে যায়। অনন্ত লোকে পৌঁছে দিতে চায়। চাঁদ এক অপূর্ব বিস্ময়। আমরা কবিতায় গানে নানান ভাবে চাঁদকে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আগামীতেও করে যাব। যতদিন পৃথিবীতে মানুষের হৃদয়ে প্রেমের অস্তিত্ব থাকবে আর চাঁদ আকাশে উঠবে— ততদিন শিল্প-সাহিত্যের নানান উপমা-বর্ণনায় উঠে আসবে চাঁদ।

মা তার ছোট্ট শিশুসন্তান কোলে নিয়ে সুরে সুরে বলছে— “আয়,  আয়,  চাঁদমামা , টিপ দিয়ে যা/ চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা!” এই সাহিত্যের কি তুলনা হয়! একেবারে অবুঝ অবস্থায় মায়ের কোল থেকেই আমাদের চাঁদের সাথে শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


‘চাঁদ’ যখন শিল্প-সাহিত্যের উপমায়-বর্ণনায়

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


আকাশের অপূর্ব অপরূপ চাঁদ। চাঁদকে নিয়ে আমাদের ভাবনা ভালবাসা কম হলো না। বিধাতার এক রহস্যজনক সৃষ্টি আকাশের চাঁদ তারা। মোহনীয় আলোই তাকে ভাল লাগা ভালবাসার কারণ। চাঁদ যদি আলো না দিয়ে শুধু একটা মাটির রঙ পাথর খণ্ড হয়ে ঘুরে বেড়াতো তবে মনে হয় না তাকে কেউ এত ভালবাসতো— তাকে কেউ এত কাছে পাওয়ার আনন্দ নিয়ে ডাকতো। আকাশে চাঁদ উঠলে চাঁদ নিজে যেমন একটা স্বর্গীয় দেখার বস্তু হয়, তেমনি তার পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জাল বিস্তৃত আলোর নরম রুপালি কনা মনে আনে কোমল অনুভব। মন তখন জেগে ওঠে গানে, আনন্দে, হাসিতে, প্রেমে। মানুষের মনে ফুল ফুটিয়ে দেয় চাঁদ। হৃদয়ের সাথে চাঁদের যেন কোথায় একটা সাংঘাতিক যোগাযোগ। আমার তো মনে হয় চাঁদের কোনো অংশ দিয়ে আমাদের হৃদয়টা বানানো। আমরা চাঁদের যেন কি হই  -- ভীষণ এক আত্মার আত্মীয়।

সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চাঁদের প্রভাব। চাঁদ নিয়ে দু’চারটা কবিতা লেখেননি এমন কবি বিরল। মানব জীবনের শুরু থেকে চাঁদ আমাদের ঘরের জানলায় ওঠে, ভাতের থালায় ওঠে, টিনের চালে, নদীর শরীরে, পুকুরের জলে থই থই করে নাচে। চাঁদের প্রকাশ প্রভাব সবখানে— শুধু মেঘে না ঢেকে দিলেই হয়। খণ্ড খণ্ড মেঘের সাথে চাঁদের লুকোচুরি খেলা, এই আলো এই আঁধারী সেও দেখতে কম ভাললাগার নয়। যা হোক চাঁদের সাহিত্য নিয়ে কিছু বলতে চাই। বিশেষত গানে। এমনিতেই প্রকৃতি তার আকাশে চাঁদকে এঁকে রেখে নীরব আলোর কথার প্রকাশ ঘটিয়ে ব্যাপক সৌন্দর্যের জন্ম দিয়েছেন। আকাশটা যেন বইয়ের একটা পৃষ্ঠা আর চাঁদ তার ওপর লেখা মনোরম শিল্পময় ছন্দোময় একটা গভীর অতলস্পর্শী ভাবনার কবিতা দ্যুতি। তার ওপর আমরা মানুষ কতটা ভাবতে পারি। কতটা ভেবে ভেবে তাকে আবিষ্কার করতে পারি ! আমাদের শৈল্পিক কুশলিপনা কিংবা কবিতা লেখার দক্ষতা কতটা চাঁদকে ধরতে পারে ! হয়ত সামান্যই। হয়ত মাত্র বিন্দু পরিমাণ।

পৃথিবীতে বসে আমরা চাঁদকে দেখেছি নানান মাত্রায়। চাঁদ যে খাবার রুটি হতে পারে এই ভাবনা কি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের আগে এমন বিষণ্নভাবে এত অভাবতাড়িত হয়ে ক্ষুধার্ত চিত্তে কেউ ভাবতে পেরেছে! পারেনি। চাঁদ সবসময় সুন্দরের বস্তু হয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের চোখে। কবি সুকান্ত এমন একসময় এমন একভাবে চাঁদকে দেখলেন— “হে মহাজীবন” কবিতায়— গোল চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। ক্ষুধার্ত মানুষ ছাড়া এটা কেউ ভাবতেই পারে না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সমস্ত চাওয়া পাওয়া খাদ্য পাওয়ার আকুলি বিকুলিতে কাটে। রুটি একটা খাদ্য। দেখতেও গোল। সুতরাং তার কাছে গোল চাঁদ রুটি কিংবা রুটির আকাঙ্ক্ষা হতে পারা স্বাভাবিক। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, চাঁদের গায়ে ছায়া ছায়া কিছু দাগ আছে। সেগুলোকে আমরা চাঁদের কলঙ্ক বলি। একেই যদি বলি হালকা পোড়া রুটি। এই ছায়া যেন আগুনে ঝলসানো পোড়া দাগ— অত্যুক্তি হবে কি? হবে না। সুতরাং কবি সুকান্ত ঐ ক্ষুধার্ত মুহূর্তে পূর্ণিমার চাঁদকে রুটি বলেছেন। মিথ্যে বলেননি। যদিও ঐ ক্ষুধার্ত মানুষটার আশা চাঁদ পূরণ করতে পারে নি। রুটি হয়ে কিংবা খাবার হয়ে তার হাতে এসে লুটিয়ে পড়ে ধরা দেয় নি। খিদেরও উপশম হয়নি।

চাঁদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান আছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি গান— “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো” এই গানটা রবীন্দ্রনাথ ১৯২৯ সালে রচনা করেন। এটি রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের একটি গান। এই গানে রবীন্দ্রনাথ চাঁদকে বহুরূপে চিত্রিত করেছেন। গানের মধ্যে বলছেন— নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা। অর্থাৎ জোছনাকে চন্দনের সাথে তুলনা করলেন। আবার স্বর্গের ফুল পারিজাতের কেশর বলছেন। আবার বলছেন— চাঁদ যেন ইন্দ্রপুরীর কোনো এক রমণীর বাসর প্রদীপ। এইসব উপমা চাঁদকে মহিমান্বিত করেছে। আমাদের কাছে চাঁদ হয়ে উঠেছে অনন্য।

একটা মাত্র গোল চাঁদ। পৃথিবী থেকে তাকিয়ে দেখলে একটা ভাত খাওয়ার থালার চাইতে বড় হবে না। এর শূন্যে ঝুলে থাকা আমাকে প্রচণ্ড রকম বিস্মিত করে। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এর ব্যাস ৩৪৭৪ কিঃ মিটার। পৃথিবী থেকে এর গড় দূরত্ব ৩৮৪৪০০ কিঃ মিটার। কিন্তু মনে হয় কত কাছে। কখনো মনে হয় নারকেল গাছের মাথায় চাঁদটি দাঁড়িয়ে আছে। আবার বিজ্ঞান এও বলছে চাঁদের নিজের নাকি আলো নেই। সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে চাঁদ। বিশ্বাসযোগ্য হয়? বিজ্ঞান না পড়া মানুষ এটা কোনো দিন বিশ্বাস করবে না। আমি যখন কবিতা লিখি তখন বিজ্ঞানের এই কথা আর বিশ্বাস হয় না। বহু কল্পনার রঙে আঁকে কবিরা চাঁদকে নিয়ে। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী এমন এক আবেগ তাড়িত কবিতা লিখলেন চাঁদকে দিয়ে শুরু করে। কবিতাটি একটি বিখ্যাত কবিতা। আমাদের ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে ছিল। সেই  ব্যথাতুর কবিতাটির নাম— “কাজলা দিদি”। “কাজলা দিদি” কবিতাটি শুরু হয় এভাবে— “বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/মাগো আমার শ্লোক বলা কাজলা দিদি কই”। আকাশে চাঁদ উঠেছে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে এমন সময় কবিতা শোনার জন্য ছোট বোন দিদিকে খুঁজছে। কিন্তু দিদি তো নেই। কবিতাটি ব্যথার রসে বোনা। বোন হারা বোনের কান্না ঝরে পড়েছে রুপালি জোছনার ভেতর। কবিতাটি যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত “লেখা” কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি কবিতা। কবিতাটির আংশিক সুরারোপ করে গানও তৈরি করা হয়। সুরারোপ করেন বিখ্যাত সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত। এবং প্রতীমা বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনে থাকি আমরা গানটি।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের অপূর্ব একটি গান রয়েছে চাঁদকে নিয়ে। এখানে চাঁদ নানান মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে।  এই গানে যুক্ত হয়ে আছে মিথ।  প্রেম বিরহ বিচ্ছেদ বেদনা। গানটির আরম্ভ এরকম— “চাঁদ হেরিছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশীতে।”  চাঁদ আকাশে উঠে নিজেই তার মুখ পৃথিবীর জলের দীঘিতে তাকিয়ে দেখছে। “ছুটে তরঙ্গ বাসনা ভঙ্গ সে অঙ্গ পরশীতে”। জলের ঢেউ ছুটে যাচ্ছে চাঁদের প্রতিফলিত রূপ স্পর্শ করার জন্য। রজনী নিজেই চাঁদের জন্য রাত জাগছে।  চকোর পাখি চাঁদের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। পিউ কাহা পিউ কাহা বলে পাপিয়া পুকুরে ফোঁটা পদ্মকে কাঁদাতে সচেষ্ট। পুকুর পাড়ের গাছগুলিও পুকুরে পতিত চাঁদের প্রতিবিম্বকে দেখছে।

এই গানে অদ্ভুত একটা মিথ যুক্ত করেছেন নজরুল। আমরা জানি হিন্দু জ্যোতিষ শাস্ত্রে ২৭ টি নক্ষত্র আছে। গানে উল্লিখিত রয়েছে রোহিনী ও ভরণীর কথা। রোহিনী ছিল চন্দ্র দেবতার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। রোহিণী ভরণী এরাও যেন চাঁদের জন্যে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। জ্যোৎস্না নিশিথে কবির কল্পনায় ধরা পড়েছে এসব।

কবি নাট্যকার ও গীতিকার এই তিন অভিধায় ভূষিত ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সংক্ষেপে ডি এল রায়। তিনি কবিতা ও নাটকের পাশাপাশি পাঁচ শতাধিক গান রচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত অনেক গান রয়েছে। ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা— গানটি আমরা খুব বেশি বেশি শুনি। এই গানটিতে দেশ মাতৃকার প্রাণের ছবি লুকানো। দেশের প্রতি মানুষের খাঁটি ভালবাসা দরদিয়া সুরে ঝরে পড়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তিন ধরনের গান রচনা করেন। হাসির গান, স্বদেশীয় গান ও প্রেম পর্যায়ের গান। ধনধান্যে— গানটি স্বদেশীয় পর্যায়ের গান। তাঁর গানে পাশ্চাত্য সুর ও ধ্রুপদ সুর লক্ষ্য করা যায়। যখন তার বয়স মাত্র ১২ তিনি  চাঁদকে নিয়ে একটা গান রচনা করেন— “গগন ভূষণ তুমি জনগণ মনোহারী—/ কোথায় যাও নিশানাথ হে নীল নভোবিহারী।” গানটি সুরারোপ করে তাঁর পিতা কার্তীকেয় চন্দ্র রায়কে (যিনিও একজন সঙ্গীতজ্ঞ) শুনিয়ে পিতার আশীর্বাদ লাভ করেন। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আরো একটা গানে সেই বিখ্যাত চরণগুলি আছে যা চাঁদকে উপলক্ষ্য করে বলা হয়েছে। “আজি এমন চাঁদের আলো / মরি যদি সেও ভালো / সে মরণ স্বর্গ সমান।” গানটি— “আজি এসেছি /আজি  এসেছি  এসেছি বধু হে /নিয়ে এই হাসি রূপ গান।” এই গানের অন্তর্ভুক্ত চরণ। এই কথাগুলিতে কবি বলছেন— চাঁদের এমনই আলো যে এই আলোতে হলে মৃত্যু পর্যন্ত করা যায়। যদি চাঁদের এই আলো গায়ে মেখে মৃত্যু হয় তবে সে মৃত্যু স্বর্গের সমান। অর্থাৎ কিছু চাই না। চাঁদের আলো প্রাপ্তি এমন ঠিকানা পাওয়া যেটা মহা সুখের। মহা আনন্দের। মৃত্যু তুচ্ছ হয়ে যায়। স্বর্গীয় শোভায় চাঁদ আলোকিত করে ধরাকে। এই পৃথিবীতে স্বর্গ নেমে আসে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় গানটিতে নিজেই সুরারোপ করেন।

একটি খুব মায়া ভরা কষ্ট ভরা গান আছে তালাত মাহমুদের কণ্ঠে। অবশ্য এই গান পরে অনেকেই  গেয়েছেন। কিন্তু তালাত মাহমুদের কণ্ঠে যে জাদু আছে তা আর কারো গানে নেই। কমল ঘোষের কথায় গানটিতে সুর করেছিলেন বিখ্যাত সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়। গানটি হলো— “চাঁদের এত আলো— তবু সে আমারে ডাকি— উতলা মাধবী রাতে— মাগিছে হে মোর আঁখি।” চাঁদের এত আলো থাকতেও কবির কল্পনায় তৃষ্ণার্ত চাঁদ। একদা বসন্ত রাতে অস্থির হয়ে কবির চোখের জন্যে পাগল হয়ে গেছে চাঁদ। আসলে সুন্দরের এই একটি সমস্যা। যতক্ষণ না সে নিজেকে অন্যদের কাছে তুলে ধরতে পারছে ততক্ষণ তার সৌন্দর্য বিফল। নারী সেজেগুজে তার রূপকে পুরুষকে বা অন্য নারীর কাছে দেখাতে চায়। ফুল ফুটে ভ্রমরকে কাছে ডাকে। প্রকাশমানতা ও পরিচিতি সৌন্দর্যের একটি অন্যতম চাহিদা।

বাংলা গানের জগতে অনন্য এক নাম  মান্না দে। মান্না দের কণ্ঠে গান শুনে সেই শৈশব থেকে আমরা বড় হয়েছি। তাঁর অপূর্ব গানের শৈলী তাকে জগত বিখ্যাত করেছে। অসংখ্য গান তিনি গেয়েছেন। প্রতিটা গানই প্রায় হিট গান। চাঁদ নিয়েও তার অনেক গান আছে। আমি একটি গানের প্রসঙ্গ টানছি এই জন্য যে, গানটিতে চাঁদকে সম্পূর্ণ রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। “ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে/ কারো নজর লাগতে পারে/ মেঘেদের উড়ো চিঠি/ উড়েও তো আসতে পারে।/ ঝলমল করিও না গো?/ তোমার ওই অত আলো/ বেশি রূপ হলে পরে/ সবখানে থাকাই ভালো।/ এই সবে রাত হয়েছে/ এখনই এমন হলে/ মাঝ রাতে আকাশটাতে/ যাবে যে আগুন জ্বলে/ সেই ফাঁকে তুমিও কখন চুরি যাবে।” এই গানটি লিখেছেন বিখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। সুর করেছেন প্রভাষ দে। গানটি ১৯৭৬ সালে পূজার গান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

যে বিষয়টা বলতে চাই— সমগ্র চাঁদটাই প্রিয়তমার উপমা। প্রিয়তমার রূপ ছড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্না। কবি (গীতিকার) অসহ্য এই রূপের জোছনাকে সামলে রাখতে বলেছেন। কারণ কারো নজর লাগতে পারে। এত রূপ দেখে পাগল যারা তাদের উড়ো চিঠির ভয়ও আছে। এত রূপ যদি এখনই এমন হয় তবে মাঝরাতে মিলনের সময় না জানি কেমন হয়। তখন তো আগুন জ্বলে যাবে। এখানে চাঁদের কোনো ব্যাপারই নেই। গোটাটাই প্রেয়সী প্রিয়তমার রূপের বর্ণনা চাঁদকে উপমায় গেঁথে রেখে। একটি বারবার শোনার মতো অপূর্ব গান।

একা রবীন্দ্রনাথের অনেক গান আছে চাঁদকে নিয়ে। যেমন— আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে, চোখের জলের লাগলো জোয়ার, দুঃখের পারাবারে ও চাঁদ, ও আমার চাঁদের আলো আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে। নজরুল ইসলামের— একাদশীর চাঁদরে ওই রাঙা মেঘের পাশে।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আরো একটা মন প্রাণ মাতাল করা গান আছে। যে গান শুনলে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অন্য ভাবনালোকে। হ্যাঁ, চাঁদকে উপলক্ষ করেই সেই গান। আমি যখন এই গান শুনি, ঘরে থাকতে আর মন চায় না। মায়া আর মায়াহীনতার দোটানা এই গান। কবি চাঁদের আলোর সাথে মিশে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। আর ঘরে ফিরতে চাইছেন না। চাঁদের আলোকে মায়ের ভালোবাসার সাথে তুলনা করেছেন। এই চাঁদের মোহনীয় আলোর মধ্যে যদি মৃত্যুবরণ না করা যায় তবে এর চেয়ে মরণ ভালো। পৃথিবীর সব হিসেব-নিকেশ পাওনা দেনা চুকিয়ে দিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে জোছনার সাদা আলোয় মিশে যেতে চাইছেন কবি। গানটি সম্পূর্ণ তুলে ধরলাম এখানে— “নীল আকাশের অসীম ছেয়ে ছড়িয়ে গেছে চাঁদের আলো /আবার কেন ঘরের ভেতর আবার কেন প্রদীপ জ্বালো /রাখিস নে আর মায়ায় ঘিরে / স্নেহের বাঁধন ছিঁড়ে নেড়ে /উধাও হয়ে মিশিয়ে যাই /এমন রাত আর পাবোনা লো /পাপিয়ার ওই আকুল তানে /আকাশ ভুবন গেল ভেসে  /থামারে  তোর বীনার ধ্বনি /চুপ করে শোন বাইরে এসে / বুক এগিয়ে আসে মরণ মায়ের মত ভালোবেসে /এখন যদি মরতে না পাই তবে আমার মরন ভালো /সাঙ্গ আমার ধুলো খেলা সাঙ্গ আমার বেচাকেনা /ইচ্ছে করে হিসেব-নিকেশ যাহার যাহা পাওনা দেনা /এখন বড়ই ক্লান্ত আমি ওমা কোলে তুলে নে না /যেখানে ওই অসীম সাদায় মিশেছে ওই অসীম কালো।”

চাঁদ নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক আধুনিক গান। ছায়াছবিতে স্থান পেয়েছে বহু বিখ্যাত গান। আমি কিছু গানের প্রথম কলি এখানে তুলে ধরছি। ১. নিশি রাত বাঁকা চাঁদ (ছবির নাম— পৃথিবী আমারে চায়)  ২. ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা (ছবির নাম— সবার উপরে)  ৩. ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে (পুরোনো দিনের গান) ৪. ও চাঁদ মুখে যেন লাগে না গ্রহণ ৫. চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি ৬. তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে (ছবির নাম— রাজধানীর বুকে) ৭. আকাশের চাঁদ মাটির বুকেতে জ্যোৎস্না রং ধরে (ছবির নাম— গুরু দক্ষিণা) ইত্যাদি।

ইত্যাদি ছাড়া আর উপায়ও নেই। কারণ চাঁদ নিয়ে রয়েছে অনেক অনেক গান। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয় বিশ্বের প্রতিটা সাহিত্যে। প্রতিটা অঞ্চলের গানে চাঁদ সমান মর্যাদায় আসীন। চাঁদ  বিষয়বস্তু হয়েছে কখনো উপমানে কখনো উপমিতে। এক বিস্ময়কর সৃষ্টি এই চাঁদ। মহান ভালোলাগার বস্তু। এই চাঁদকে ঘিরে রয়েছে অপার আনন্দের খোরাক। অসীমের পানে ডাক দিয়ে যায়। অনন্ত লোকে পৌঁছে দিতে চায়। চাঁদ এক অপূর্ব বিস্ময়। আমরা কবিতায় গানে নানান ভাবে চাঁদকে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আগামীতেও করে যাব। যতদিন পৃথিবীতে মানুষের হৃদয়ে প্রেমের অস্তিত্ব থাকবে আর চাঁদ আকাশে উঠবে— ততদিন শিল্প-সাহিত্যের নানান উপমা-বর্ণনায় উঠে আসবে চাঁদ।

মা তার ছোট্ট শিশুসন্তান কোলে নিয়ে সুরে সুরে বলছে— “আয়,  আয়,  চাঁদমামা , টিপ দিয়ে যা/ চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা!” এই সাহিত্যের কি তুলনা হয়! একেবারে অবুঝ অবস্থায় মায়ের কোল থেকেই আমাদের চাঁদের সাথে শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত