সময়টা ২০২৬ সাল হলেও হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই মনে হতে পারে আপনি চার দশক পেছনে ফিরে গেছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে এখন সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে নামী সেলিব্রেটি-সবাই নিজেদের হাজির করছেন ৮০ ও ৯০-এর দশকের চেনা অবয়বে। ঢিলেঢালা কলারের রঙিন ক্যাজুয়াল শার্ট, ওভারসাইজড জ্যাকেট, ক্লাসিক হেয়ারস্টাইল আর রেট্রো চশমার সেই চিরচেনা রূপ এখন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সুপারহিট। প্রযুক্তির ভাষায় একে বলা হচ্ছে 'এআই ইয়ারবুক ট্রেন্ড'। কিন্তু হঠাৎ কেন বর্তমান প্রজন্ম চার দশক আগের সেই সময়ে ফিরে যেতে এতটা মরিয়া?
অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন
মূলত দুইটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
থেকে এই ট্রেন্ডটি বর্তমান সমাজকে আলোড়িত করেছে। যারা ৮০ বা ৯০-এর দশকে বড় হয়েছেন,
তাদের জন্য এটি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিরোমন্থন। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় ফেলে আসা
সোনালী শৈশব ও কৈশোরকে রঙিন ফ্রেমে ফিরে পাওয়ার এক আবেগী মাধ্যম এটি।
অন্যদিকে, জেনারেশন জেড (Gen
Z) বা আজকের নতুন প্রজন্ম-যারা সেই সময়ের দিনগুলো দেখেনি-তাদের কাছে এটি সম্পূর্ণ এক
নতুন কৌতূহল ও রোমাঞ্চ। বর্তমান যুগের অতিরিক্ত আধুনিক ফ্যাশনের চেয়ে তখনকার ভিন্টেজ
ও ক্ল্যাসিক লাইফস্টাইল তাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।
নেপথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ম্যাজিক
এই জোয়ারের প্রধান চালিকাশক্তি
হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন এআই অ্যাপ
ও ফিল্টারের কল্যাণে এখন সাধারণ মানুষও কোনো পেশাদার এআই বা ফটোশপ জ্ঞান ছাড়াই মাত্র
কয়েক সেকেন্ডে নিজের ছবিকে আশির দশকের ইয়ারবুক লুকে রূপান্তর করতে পারছেন। বন্ধুদের
সাথে বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত 'ভাইরাল' হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও এই
ট্রেন্ডকে সর্বজনীন করে তুলেছে।
আবেগ ও প্রযুক্তির তুলনামূলক চিত্র
আশির ও নব্বইয়ের দশকে ছবি তোলার ক্ষেত্রে ছিল সহজ-সরল অভিব্যক্তি ও স্বাভাবিক ফ্যাশনের প্রাধান্য। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্টুডিওতে ছবি তোলার পর সেটি প্রিন্ট হয়ে হাতে আসতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হতো। সেই ছবিগুলো পরে অ্যালবামে সংরক্ষণ করা হতো এবং পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে সেসব স্মৃতি দেখার আনন্দ পেতেন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এআই প্রযুক্তি সেই পুরোনো সময়ের আবহকে ফিরিয়ে আনছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে। স্মার্টফোনে তোলা একটি ছবিকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভিন্টেজ ফিল্মের আদলে রূপ দেওয়া যাচ্ছে। পোশাক, পরিবেশ, আলো ও ক্যামেরার ধরন বদলে ছবিতে যোগ করা হচ্ছে নিখুঁত এআই সম্পাদনার ছোঁয়া।
তবে দুই সময়ের আবেগের জায়গায় রয়েছে পার্থক্য। আগের দিনের ছবি ছিল বাস্তব জীবনের স্মৃতি, যা অ্যালবামে বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত থাকত। আর বর্তমানের এআই ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ছে মূলত ভার্চুয়াল দুনিয়ায়—যেখানে লাইক, কমেন্ট ও দ্রুত ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা অনেক সময় ছবির জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করছে।
মুদ্রার ওপিঠ: বিনোদনের আড়ালে
সাইবার ঝুঁকি
এই ট্রেন্ডটি আপাতদৃষ্টিতে কেবলই
আনন্দদায়ক মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ঝুঁকি। তথ্যপ্রযুক্তি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, হুট করে যেকোনো অপরিচিত বা অনিরাপদ এআই অ্যাপে নিজের ছবি
আপলোড করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের 'ফেসিয়াল বায়োমেট্রিক্স' (Facial
Biometrics) এবং ব্যক্তিগত ডেটা ঝুঁকিতে ফেলছেন। অনেক অ্যাপের 'ডেটা পলিসি' বা তথ্য
সুরক্ষা নীতি অত্যন্ত দুর্বল, যা পরবর্তীতে ডিপফেক বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে
অপব্যবহারের পথ তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস ও ফ্যাশন চক্রাকারে ঘোরে-এই ট্রেন্ড যেন তারই এক জীবন্ত প্রমাণ। তবে কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তার ডানায় ভর করে অতীতে ফেরার এই আনন্দকে উদযাপন করার পাশাপাশি নিজেদের ব্যক্তিগত
তথ্যের সুরক্ষার বিষয়েও আমাদের সমানে সচেতন হতে হবে।

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়টা ২০২৬ সাল হলেও হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই মনে হতে পারে আপনি চার দশক পেছনে ফিরে গেছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে এখন সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে নামী সেলিব্রেটি-সবাই নিজেদের হাজির করছেন ৮০ ও ৯০-এর দশকের চেনা অবয়বে। ঢিলেঢালা কলারের রঙিন ক্যাজুয়াল শার্ট, ওভারসাইজড জ্যাকেট, ক্লাসিক হেয়ারস্টাইল আর রেট্রো চশমার সেই চিরচেনা রূপ এখন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সুপারহিট। প্রযুক্তির ভাষায় একে বলা হচ্ছে 'এআই ইয়ারবুক ট্রেন্ড'। কিন্তু হঠাৎ কেন বর্তমান প্রজন্ম চার দশক আগের সেই সময়ে ফিরে যেতে এতটা মরিয়া?
অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন
মূলত দুইটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
থেকে এই ট্রেন্ডটি বর্তমান সমাজকে আলোড়িত করেছে। যারা ৮০ বা ৯০-এর দশকে বড় হয়েছেন,
তাদের জন্য এটি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিরোমন্থন। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় ফেলে আসা
সোনালী শৈশব ও কৈশোরকে রঙিন ফ্রেমে ফিরে পাওয়ার এক আবেগী মাধ্যম এটি।
অন্যদিকে, জেনারেশন জেড (Gen
Z) বা আজকের নতুন প্রজন্ম-যারা সেই সময়ের দিনগুলো দেখেনি-তাদের কাছে এটি সম্পূর্ণ এক
নতুন কৌতূহল ও রোমাঞ্চ। বর্তমান যুগের অতিরিক্ত আধুনিক ফ্যাশনের চেয়ে তখনকার ভিন্টেজ
ও ক্ল্যাসিক লাইফস্টাইল তাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।
নেপথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ম্যাজিক
এই জোয়ারের প্রধান চালিকাশক্তি
হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন এআই অ্যাপ
ও ফিল্টারের কল্যাণে এখন সাধারণ মানুষও কোনো পেশাদার এআই বা ফটোশপ জ্ঞান ছাড়াই মাত্র
কয়েক সেকেন্ডে নিজের ছবিকে আশির দশকের ইয়ারবুক লুকে রূপান্তর করতে পারছেন। বন্ধুদের
সাথে বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত 'ভাইরাল' হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও এই
ট্রেন্ডকে সর্বজনীন করে তুলেছে।
আবেগ ও প্রযুক্তির তুলনামূলক চিত্র
আশির ও নব্বইয়ের দশকে ছবি তোলার ক্ষেত্রে ছিল সহজ-সরল অভিব্যক্তি ও স্বাভাবিক ফ্যাশনের প্রাধান্য। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্টুডিওতে ছবি তোলার পর সেটি প্রিন্ট হয়ে হাতে আসতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হতো। সেই ছবিগুলো পরে অ্যালবামে সংরক্ষণ করা হতো এবং পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে সেসব স্মৃতি দেখার আনন্দ পেতেন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এআই প্রযুক্তি সেই পুরোনো সময়ের আবহকে ফিরিয়ে আনছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে। স্মার্টফোনে তোলা একটি ছবিকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভিন্টেজ ফিল্মের আদলে রূপ দেওয়া যাচ্ছে। পোশাক, পরিবেশ, আলো ও ক্যামেরার ধরন বদলে ছবিতে যোগ করা হচ্ছে নিখুঁত এআই সম্পাদনার ছোঁয়া।
তবে দুই সময়ের আবেগের জায়গায় রয়েছে পার্থক্য। আগের দিনের ছবি ছিল বাস্তব জীবনের স্মৃতি, যা অ্যালবামে বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত থাকত। আর বর্তমানের এআই ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ছে মূলত ভার্চুয়াল দুনিয়ায়—যেখানে লাইক, কমেন্ট ও দ্রুত ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা অনেক সময় ছবির জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করছে।
মুদ্রার ওপিঠ: বিনোদনের আড়ালে
সাইবার ঝুঁকি
এই ট্রেন্ডটি আপাতদৃষ্টিতে কেবলই
আনন্দদায়ক মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ঝুঁকি। তথ্যপ্রযুক্তি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, হুট করে যেকোনো অপরিচিত বা অনিরাপদ এআই অ্যাপে নিজের ছবি
আপলোড করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের 'ফেসিয়াল বায়োমেট্রিক্স' (Facial
Biometrics) এবং ব্যক্তিগত ডেটা ঝুঁকিতে ফেলছেন। অনেক অ্যাপের 'ডেটা পলিসি' বা তথ্য
সুরক্ষা নীতি অত্যন্ত দুর্বল, যা পরবর্তীতে ডিপফেক বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে
অপব্যবহারের পথ তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস ও ফ্যাশন চক্রাকারে ঘোরে-এই ট্রেন্ড যেন তারই এক জীবন্ত প্রমাণ। তবে কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তার ডানায় ভর করে অতীতে ফেরার এই আনন্দকে উদযাপন করার পাশাপাশি নিজেদের ব্যক্তিগত
তথ্যের সুরক্ষার বিষয়েও আমাদের সমানে সচেতন হতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন