এটি একটি গল্প! নাকি অভিশপ্ত মহাফেজখানা!
মামুন হুসাইনের গল্প ‘জলছাপের চিত্রশালা’ পড়তে বসে প্রথমেই মনে হয় প্রচলিত অর্থে এটি কোনো গল্প নয়। এ যেন এক দীর্ঘ-রক্তাক্ত ঘোরলাগা লেখ্যাগার (রেকর্ডরুম)!
অন্যান্য লেখার মতোই মামুন হুসাইনের এই গল্পে ‘মৃত্যু’ কোনো ঘটনা নয়— ‘মৃত্যু’কে এখানে একটি ভাষা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে দুঃখও কোনো অনুভূতি নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গবেষণা প্রকল্প এবং অর্থনীতি।
গল্পের শুরু হয় এক সাঁওতালি প্রবাদ দিয়ে।
‘অল খনাঃ থুতি গে সরেসা।’
(লিখে রাখার চেয়ে মুখে বলা অনেক ভাল)
প্রবাদ দিয়ে শুরু করে লেখক যেন পুরো গল্পের বিষয়ের বিরুদ্ধেই এক নীরব অভিযোগ জানিয়ে রাখলেন। অভিনাথ মারান্তি ও রবি মারান্তির মৃত্যুর বিষয়বস্তু নিয়ে গল্পের চলন। এখানে একটা কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসা এসে উপস্থিত হয়। লেখা কি সত্যিই স্মৃতি রক্ষা করে? নাকি মৃত মানুষদের দ্বিতীয়বার হত্যা করে। এটি কি কালির আঁচড়ে বা পরিসংখ্যানের কলামে বা বৃহৎ কোনো গবেষণা প্রতিবেদনের প্যারাগ্রাফে আবারো রচিত হয় দ্বিতীয় বা তৃতীর মৃত্যুর আখ্যান!
মামুন হুসাইনের এই গল্প বলার ভঙ্গি অনেকটা প্লাবন সদৃশ। গল্পে দীর্ঘ, জটিল, বিরাম চিহ্নবিহীন চিত্রকল্প এসে উপস্থিত হয় একের পর এক। শব্দরাশি, ধুলোবালি, ধানের বীজ, মাছের কানকো— এইসব শব্দ ব্যবহারকে কৌশলগত বিবৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এগুলোকে সাজানো-গোছানো বর্ণনা না বলে সমষ্টিগত প্রলাপ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। এখানে ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর পরিণত হয়েছে সমষ্টির কণ্ঠস্বরে। বর্তমান মিশে গেছে অতীতে। পুরাণ মিশেছে দলিলে।
‘কানে কানে কথা হয়’— এটিই পুরো গল্পে বার বার ফিরে আসে। এটা যেন গ্রামের জনশ্রুতি বা মুখে মুখে চালু হওয়া বিলাপ। এই আঙ্গিকগত বর্ণনাটি অত্যন্ত সচেতনভাবে লেখক করেছেন। কারণ এই গল্পের সংকটই হচ্ছে এক প্রান্তিক ভাষা বঞ্চিত জনগোষ্ঠির মানুষের মৃত্যুর বিষয় নিয়ে। কীভাবে এই মৃত্যুর বিবরণ তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ ভাষায় প্রকাশ করা হবে! লেখক এই বিষরে নীরব। গল্পের কোথাও এর উত্তর দেবার চেষ্টা করা হয়নি। এখানে লেখক যা করেছেন তা বুঝে নিতে পাঠকের কোনো অসুবিধা হয় না। গল্পকার এখানে যে বিষয়টিকে বেছে নিয়েছেন তা হলো— তিনি নিজের গল্পের বর্ণনাকেই করেছেন অস্থির, বহুমুখী এবং স্ববিরোধিতায় ভরপুর। ভাষার এই নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার কোনো সহজ কাজ নয়। একজন দক্ষ গল্পকার ছাড়া একাজ করতে এলে পুরো বিষয়টি এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
গল্পের কেন্দ্রে আছেন দুই সহদোর ভাই। সাঁওতাল কৃষক তারা। অভিনাথ মারান্ডি এবং রাবি মারান্ডি। এরা চাষের জমিতে জল না পেয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু লেখক এই আত্মহত্যাকে কখনোই একটি বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত ট্রাজেডি হিসেবে দেখাতে রাজি নন। বরং এই মৃত্যুকে তিনি সাজিয়েছেন পুরো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সহিংসতার ব্যবচ্ছেদের ভেতর দিয়ে। গভীর নলকূপের দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচলন ব্যবস্থা, মহাজনী ঋণের জাল, সারের ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধি, জমির উৎপাদনশীলতার হ্রাস, জমি বেদখল বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনাবৃষ্টির বিষয় এখানে উপস্থিত হয়েছে। ‘প্রতি ত্রিশ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করছে’— এই পরিসংখ্যানধর্মী বাক্যটি যখন গল্পের কাব্যিক ঘোরের মাঝে হঠাৎই এসে পড়ে— তখন এটিকে চাবুকের এক ঘা বলে মনে হয়। পরিসংখ্যানগত এই সংঘর্ষই যেন বলে দেয়— এই মৃত্যু কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক কাঠামোগত পুঁজিতান্ত্রিক কৃষিনীতির ফসল।
অভিনাথের শেষ বেলার কথা ছিল খুবই মর্মস্পর্শী। যা পুলিশের হাতে চলে গিয়েছিল। ‘মনে খুব দুঃখ লাগলো, জমি শুষ্ক থাকায়!’ এই শব্দগুলো যেন পুরো গল্পের ভার বহন করে।
রাষ্ট্রযন্ত্র, গবেষক, সাংবাদিক বা এনজিও কর্মী— সবাই এই মৃত্যুর কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। জটিল তত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং কাঠামোগত বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে খোঁজ চলে— চলে গভীর অনুসন্ধান! অথচ মৃত মানুষটি নিজে তার বেঁচে থাকার নির্মম যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছেন এক আশ্চর্য সারল্যে!
এই সারল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানই লেখকের সবচেয়ে তীক্ষ্ম সমালোচনার জায়গা।
গল্পের সবচেয়ে সাহসী এবং নিষ্ঠুর নির্মোহ অংশটি সম্ভবত সেই দীর্ঘ পর্ব— যেখানে লেখক, গবেষক, নৃতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের একটি দলকে ‘নিমঘটু’ গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাদের বলা হয় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং রিপোর্ট প্রস্তুত করতে। এখানে গল্পকার যা করেছেন তা হলো এক ধরনের নির্মম আত্মসমালোচনামূলক অ্যানথ্রোপলজিক্যাল স্যাটায়ার! রেস্ট হাউজে থাকা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা একদিকে দুইজন সাঁওতালের আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে প্রশ্নাবলি তৈরি করে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করছেন— আপনি প্রকৃতির পূজারি/হিন্দু/খ্রিস্টান/বৌদ্ধ? আবার নির্জন কোনো সময়ে নিজেরাই লিপ্ত হচ্ছেন ভায়াগ্রা, মদ, যৌনতা এবং কলকাতার নাইট ক্লাবের স্মৃতিচারণে! এই বৈপরীত্যের সাথে দুঃখ এবং গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান বনাম সেই সব বুদ্ধিজীবীর নিজস্ব অন্ধকার অবক্ষয়িত বিচ্ছিন্ন জীবন দেখিয়েছেন গল্পকার। এখনে তিনি বিষয়গুলোকে পাশাপাশি রেখেছেন। এই পাশাপাশি অবস্থান দেখে পাঠক পড়ে যান এক গভীর অস্বস্তির ভেতর।
‘ফিনানসিয়াল আটোবায়োগ্রাফি’ লেখার প্রস্তাব বা ‘ডোনার মোটিভেট’ করার চিন্তা বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি নস্টালজিয়া মেশানো যৌন পার্যটনের স্মৃতি এবং ‘২০০৮-এ নেপালে মাওবাদীরা ক্ষমতার এলে মাওবাদীদের আন্ডারগ্রাউন্ড সেল ছিল কাঠমন্ডুর ব্রথেল’— এই সকল উপাদান একত্র করে গল্পকার এক ভয়ংকর সত্য উন্মোচন করেছেন। প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা আজকের এই সমাজে যেন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক মানুষের দুঃখগুলো যারা লিপিবদ্ধ করছেন তারা নিজেরাই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি সুবিধাবাদী অংশ। রিপোর্টটি প্রস্তুতির ক্ষমতাপ্রাপ্ত বড় অধ্যাপকের আপত্তি— ‘সরাসরি ওয়ার্ল্ড ট্রেড এর কথা রিপোর্টে প্রাসঙ্গিক কর না।’ এটি অত্যন্ত তীক্ষœ একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এখানে গল্পকার খুবই স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে— কীভাবে কাঠামোগত সহিংসতার প্রকৃত উৎসগুলো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাতেও কার বা কাদের লেজুড়বৃত্তিতে পদ্ধতিগতভাবে অদৃশ্য করে দেয়া হয়।
এইসব নির্মম রাজনৈতিক-সামাজিক সমালোচনার বিপরীতে লেখক এই গল্পে আরেকটি স্তর দাঁড় করেছেন। সাঁওতাল সৃষ্টি তত্ত্ব, লোককথা এবং তাদের ঐতিহাসিক সব স্মৃতি, পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ির সৃষ্টি আখ্যান, মারাং বুরুর দর্শন, ১৮৫৫ সালের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা সিধু ও কানুর বিষয়, ইলামিত্রের বা মহাশ্বেতা দেবীর ১৯৯৬ সালে পুনরায় এই অঞ্চলে আগমনের বর্ণনা পাঠককে সত্যের সাথে ইতিহাস অনুসন্ধানের পথে ধাবিত করে। এগুলোর সংযোজন মৃত ‘অভিনাথ ও রাবি মারান্ডি’র অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এইভাবে লেখক ইতিহাসের কিছুটা দায় সম্পাদন করেন। যে জনগোষ্ঠিকে গবেষকরা কেবল প্রশ্নপত্রের উত্তরদাতা বা পরিসংখ্যানের কলামে লিপিবদ্ধ করেছেন সেখানে এই সাঁওতাল আদিবাসীদের সুবিশাল, প্রাচীন, আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ ভুবন বা বোঙা, মাঝি থান, কারাম পরব বা সোহরাই উৎসব তাদের রিপোর্টে কোনোদিন ধরা পড়বে না। ‘বারা অর্থ দুই’ এবং তা যে কোনো ভাবেই ‘বারো’ (১২) নয় কিম্বা আলফ্রেড সরেনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার প্রসঙ্গটি এই গল্পে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই মৃত্যুগুলোকে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতায় স্থাপন করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় অবহেলাকে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির নিরবচ্ছিন্ন প্রান্তিকীকরণের অন্যতম কারণ হিসেবে পাঠক ভাবতে পারেন। তবে গল্পকার এখানে কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি।
গল্পের এক অসাধারণ স্তর হলো— সাঁওতাল লোকধর্ম (বোঙা উপাসনা) এবং খ্রিস্ট ধর্মের সহাবস্থান ও দ্বন্দ্ব। ঔপনিবেশিক মিশনারি কার্যক্রমের ফলে নিমঘটু গ্রামের সাঁওতাল জীবনে ফাদার, সিস্টার, বিশপ, বাপ্তিস্ম, ক্রুশচিহ্নসহ বহু খ্রিস্টীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। অথচ এরপরও সাঁওতালদের পুরনো লোকধর্মকে তারা কোনোভাবেই মুছে ফেলতে পারেনি। বরং দুইটি বিশ্বাস পাশাপাশি সহাবস্থান করেছে। অভিনাথ ও রাবির মৃত্যুশয্যায় একদিকে যেমন খ্রিস্টীয় প্রার্থনা ও পবিত্র রুটির উল্লেখ আসে, তেমনি অন্যদিকে সাদা ঘুঘু পাখির রূপে আত্মার উড়ে যাওযার যে চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে— তা একই সঙ্গে খ্রিস্টীয় পবিত্র আত্মা এবং সাঁওতাল লোক বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত ধর্মীয় ভাষা মৃত্যুকে একটি মাত্র ধর্মীয় কাঠামোয় বন্দি না করে দ্বৈত বিশ্বাসের মিলনের ক্ষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জল এই গল্পের কেন্দ্রিয় প্রতীক। একই সঙ্গে জল জীবনদায়ী এবং আকাঙ্ক্ষিত হলেও তা অনুপস্থিত ও দুর্লভ। জলহীনতা এখানে কেবল কৃষি সংকট নয়, বরং এটিকে একটি অস্তিত্বগত শূন্যতার রূপক হিসেবে দেখানো হয়েছে। মৃত মানুষের হাতে ঘড়ির প্রতীকটিও অসাধারণ বর্ণনায় প্রকাশ করা হয়েছে।
‘সময় কি থেমে গেছে’ নাকি চলছে অনন্তকাল’— এই জিজ্ঞাসা যেন পুরো জনপদের ভাগ্যের রূপক হয়ে উঠেছে।
মামুন হুসাইনের লেখা ‘জলছাপের চিত্রশালা’য় লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন। এর কোনো সহজ উত্তর নেই। আমরা পাঠক-লেখক-গবেষক-বুদ্ধিজীবী সমাজ কি সত্যিই অভিনাথ ও রাবি মারান্ডির ‘বিষ কেনার গোপন ঋণ পরিশোধ করতে পেরেছি?’ শেষ পর্যন্ত লেখক আমাদের কোনো উত্তর দেন না। বরং গল্পকার হিসেবে তিনি রেখে গেছেন এক গভীর ও অস্বস্তিকর সচেতনতা। আমরা যতই লিখি, যতই বিশ্লেষণ করি— প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত যন্ত্রণা আমাদের ভাষার নাগালের বাইরেই থেকে যায়। গল্পে ‘মৃত্যু’র ঘটনাটি একটি ভাষা। সে ভাষা বোঝার মতো যোগ্যতা আমাদের এখনো হয়নি। এই অযোগ্যতা নিয়েই আমরা দিনপাত করে চলেছি যুগের পর যুগ।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এটি একটি গল্প! নাকি অভিশপ্ত মহাফেজখানা!
মামুন হুসাইনের গল্প ‘জলছাপের চিত্রশালা’ পড়তে বসে প্রথমেই মনে হয় প্রচলিত অর্থে এটি কোনো গল্প নয়। এ যেন এক দীর্ঘ-রক্তাক্ত ঘোরলাগা লেখ্যাগার (রেকর্ডরুম)!
অন্যান্য লেখার মতোই মামুন হুসাইনের এই গল্পে ‘মৃত্যু’ কোনো ঘটনা নয়— ‘মৃত্যু’কে এখানে একটি ভাষা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে দুঃখও কোনো অনুভূতি নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গবেষণা প্রকল্প এবং অর্থনীতি।
গল্পের শুরু হয় এক সাঁওতালি প্রবাদ দিয়ে।
‘অল খনাঃ থুতি গে সরেসা।’
(লিখে রাখার চেয়ে মুখে বলা অনেক ভাল)
প্রবাদ দিয়ে শুরু করে লেখক যেন পুরো গল্পের বিষয়ের বিরুদ্ধেই এক নীরব অভিযোগ জানিয়ে রাখলেন। অভিনাথ মারান্তি ও রবি মারান্তির মৃত্যুর বিষয়বস্তু নিয়ে গল্পের চলন। এখানে একটা কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসা এসে উপস্থিত হয়। লেখা কি সত্যিই স্মৃতি রক্ষা করে? নাকি মৃত মানুষদের দ্বিতীয়বার হত্যা করে। এটি কি কালির আঁচড়ে বা পরিসংখ্যানের কলামে বা বৃহৎ কোনো গবেষণা প্রতিবেদনের প্যারাগ্রাফে আবারো রচিত হয় দ্বিতীয় বা তৃতীর মৃত্যুর আখ্যান!
মামুন হুসাইনের এই গল্প বলার ভঙ্গি অনেকটা প্লাবন সদৃশ। গল্পে দীর্ঘ, জটিল, বিরাম চিহ্নবিহীন চিত্রকল্প এসে উপস্থিত হয় একের পর এক। শব্দরাশি, ধুলোবালি, ধানের বীজ, মাছের কানকো— এইসব শব্দ ব্যবহারকে কৌশলগত বিবৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এগুলোকে সাজানো-গোছানো বর্ণনা না বলে সমষ্টিগত প্রলাপ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। এখানে ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর পরিণত হয়েছে সমষ্টির কণ্ঠস্বরে। বর্তমান মিশে গেছে অতীতে। পুরাণ মিশেছে দলিলে।
‘কানে কানে কথা হয়’— এটিই পুরো গল্পে বার বার ফিরে আসে। এটা যেন গ্রামের জনশ্রুতি বা মুখে মুখে চালু হওয়া বিলাপ। এই আঙ্গিকগত বর্ণনাটি অত্যন্ত সচেতনভাবে লেখক করেছেন। কারণ এই গল্পের সংকটই হচ্ছে এক প্রান্তিক ভাষা বঞ্চিত জনগোষ্ঠির মানুষের মৃত্যুর বিষয় নিয়ে। কীভাবে এই মৃত্যুর বিবরণ তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ ভাষায় প্রকাশ করা হবে! লেখক এই বিষরে নীরব। গল্পের কোথাও এর উত্তর দেবার চেষ্টা করা হয়নি। এখানে লেখক যা করেছেন তা বুঝে নিতে পাঠকের কোনো অসুবিধা হয় না। গল্পকার এখানে যে বিষয়টিকে বেছে নিয়েছেন তা হলো— তিনি নিজের গল্পের বর্ণনাকেই করেছেন অস্থির, বহুমুখী এবং স্ববিরোধিতায় ভরপুর। ভাষার এই নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার কোনো সহজ কাজ নয়। একজন দক্ষ গল্পকার ছাড়া একাজ করতে এলে পুরো বিষয়টি এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
গল্পের কেন্দ্রে আছেন দুই সহদোর ভাই। সাঁওতাল কৃষক তারা। অভিনাথ মারান্ডি এবং রাবি মারান্ডি। এরা চাষের জমিতে জল না পেয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু লেখক এই আত্মহত্যাকে কখনোই একটি বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত ট্রাজেডি হিসেবে দেখাতে রাজি নন। বরং এই মৃত্যুকে তিনি সাজিয়েছেন পুরো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সহিংসতার ব্যবচ্ছেদের ভেতর দিয়ে। গভীর নলকূপের দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচলন ব্যবস্থা, মহাজনী ঋণের জাল, সারের ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধি, জমির উৎপাদনশীলতার হ্রাস, জমি বেদখল বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনাবৃষ্টির বিষয় এখানে উপস্থিত হয়েছে। ‘প্রতি ত্রিশ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করছে’— এই পরিসংখ্যানধর্মী বাক্যটি যখন গল্পের কাব্যিক ঘোরের মাঝে হঠাৎই এসে পড়ে— তখন এটিকে চাবুকের এক ঘা বলে মনে হয়। পরিসংখ্যানগত এই সংঘর্ষই যেন বলে দেয়— এই মৃত্যু কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক কাঠামোগত পুঁজিতান্ত্রিক কৃষিনীতির ফসল।
অভিনাথের শেষ বেলার কথা ছিল খুবই মর্মস্পর্শী। যা পুলিশের হাতে চলে গিয়েছিল। ‘মনে খুব দুঃখ লাগলো, জমি শুষ্ক থাকায়!’ এই শব্দগুলো যেন পুরো গল্পের ভার বহন করে।
রাষ্ট্রযন্ত্র, গবেষক, সাংবাদিক বা এনজিও কর্মী— সবাই এই মৃত্যুর কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। জটিল তত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং কাঠামোগত বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে খোঁজ চলে— চলে গভীর অনুসন্ধান! অথচ মৃত মানুষটি নিজে তার বেঁচে থাকার নির্মম যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছেন এক আশ্চর্য সারল্যে!
এই সারল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানই লেখকের সবচেয়ে তীক্ষ্ম সমালোচনার জায়গা।
গল্পের সবচেয়ে সাহসী এবং নিষ্ঠুর নির্মোহ অংশটি সম্ভবত সেই দীর্ঘ পর্ব— যেখানে লেখক, গবেষক, নৃতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের একটি দলকে ‘নিমঘটু’ গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাদের বলা হয় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং রিপোর্ট প্রস্তুত করতে। এখানে গল্পকার যা করেছেন তা হলো এক ধরনের নির্মম আত্মসমালোচনামূলক অ্যানথ্রোপলজিক্যাল স্যাটায়ার! রেস্ট হাউজে থাকা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা একদিকে দুইজন সাঁওতালের আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে প্রশ্নাবলি তৈরি করে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করছেন— আপনি প্রকৃতির পূজারি/হিন্দু/খ্রিস্টান/বৌদ্ধ? আবার নির্জন কোনো সময়ে নিজেরাই লিপ্ত হচ্ছেন ভায়াগ্রা, মদ, যৌনতা এবং কলকাতার নাইট ক্লাবের স্মৃতিচারণে! এই বৈপরীত্যের সাথে দুঃখ এবং গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান বনাম সেই সব বুদ্ধিজীবীর নিজস্ব অন্ধকার অবক্ষয়িত বিচ্ছিন্ন জীবন দেখিয়েছেন গল্পকার। এখনে তিনি বিষয়গুলোকে পাশাপাশি রেখেছেন। এই পাশাপাশি অবস্থান দেখে পাঠক পড়ে যান এক গভীর অস্বস্তির ভেতর।
‘ফিনানসিয়াল আটোবায়োগ্রাফি’ লেখার প্রস্তাব বা ‘ডোনার মোটিভেট’ করার চিন্তা বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি নস্টালজিয়া মেশানো যৌন পার্যটনের স্মৃতি এবং ‘২০০৮-এ নেপালে মাওবাদীরা ক্ষমতার এলে মাওবাদীদের আন্ডারগ্রাউন্ড সেল ছিল কাঠমন্ডুর ব্রথেল’— এই সকল উপাদান একত্র করে গল্পকার এক ভয়ংকর সত্য উন্মোচন করেছেন। প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা আজকের এই সমাজে যেন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক মানুষের দুঃখগুলো যারা লিপিবদ্ধ করছেন তারা নিজেরাই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি সুবিধাবাদী অংশ। রিপোর্টটি প্রস্তুতির ক্ষমতাপ্রাপ্ত বড় অধ্যাপকের আপত্তি— ‘সরাসরি ওয়ার্ল্ড ট্রেড এর কথা রিপোর্টে প্রাসঙ্গিক কর না।’ এটি অত্যন্ত তীক্ষœ একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এখানে গল্পকার খুবই স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে— কীভাবে কাঠামোগত সহিংসতার প্রকৃত উৎসগুলো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাতেও কার বা কাদের লেজুড়বৃত্তিতে পদ্ধতিগতভাবে অদৃশ্য করে দেয়া হয়।
এইসব নির্মম রাজনৈতিক-সামাজিক সমালোচনার বিপরীতে লেখক এই গল্পে আরেকটি স্তর দাঁড় করেছেন। সাঁওতাল সৃষ্টি তত্ত্ব, লোককথা এবং তাদের ঐতিহাসিক সব স্মৃতি, পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ির সৃষ্টি আখ্যান, মারাং বুরুর দর্শন, ১৮৫৫ সালের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা সিধু ও কানুর বিষয়, ইলামিত্রের বা মহাশ্বেতা দেবীর ১৯৯৬ সালে পুনরায় এই অঞ্চলে আগমনের বর্ণনা পাঠককে সত্যের সাথে ইতিহাস অনুসন্ধানের পথে ধাবিত করে। এগুলোর সংযোজন মৃত ‘অভিনাথ ও রাবি মারান্ডি’র অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এইভাবে লেখক ইতিহাসের কিছুটা দায় সম্পাদন করেন। যে জনগোষ্ঠিকে গবেষকরা কেবল প্রশ্নপত্রের উত্তরদাতা বা পরিসংখ্যানের কলামে লিপিবদ্ধ করেছেন সেখানে এই সাঁওতাল আদিবাসীদের সুবিশাল, প্রাচীন, আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ ভুবন বা বোঙা, মাঝি থান, কারাম পরব বা সোহরাই উৎসব তাদের রিপোর্টে কোনোদিন ধরা পড়বে না। ‘বারা অর্থ দুই’ এবং তা যে কোনো ভাবেই ‘বারো’ (১২) নয় কিম্বা আলফ্রেড সরেনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার প্রসঙ্গটি এই গল্পে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই মৃত্যুগুলোকে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতায় স্থাপন করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় অবহেলাকে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির নিরবচ্ছিন্ন প্রান্তিকীকরণের অন্যতম কারণ হিসেবে পাঠক ভাবতে পারেন। তবে গল্পকার এখানে কোনো পক্ষ অবলম্বন করেননি।
গল্পের এক অসাধারণ স্তর হলো— সাঁওতাল লোকধর্ম (বোঙা উপাসনা) এবং খ্রিস্ট ধর্মের সহাবস্থান ও দ্বন্দ্ব। ঔপনিবেশিক মিশনারি কার্যক্রমের ফলে নিমঘটু গ্রামের সাঁওতাল জীবনে ফাদার, সিস্টার, বিশপ, বাপ্তিস্ম, ক্রুশচিহ্নসহ বহু খ্রিস্টীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে। অথচ এরপরও সাঁওতালদের পুরনো লোকধর্মকে তারা কোনোভাবেই মুছে ফেলতে পারেনি। বরং দুইটি বিশ্বাস পাশাপাশি সহাবস্থান করেছে। অভিনাথ ও রাবির মৃত্যুশয্যায় একদিকে যেমন খ্রিস্টীয় প্রার্থনা ও পবিত্র রুটির উল্লেখ আসে, তেমনি অন্যদিকে সাদা ঘুঘু পাখির রূপে আত্মার উড়ে যাওযার যে চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে— তা একই সঙ্গে খ্রিস্টীয় পবিত্র আত্মা এবং সাঁওতাল লোক বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত ধর্মীয় ভাষা মৃত্যুকে একটি মাত্র ধর্মীয় কাঠামোয় বন্দি না করে দ্বৈত বিশ্বাসের মিলনের ক্ষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জল এই গল্পের কেন্দ্রিয় প্রতীক। একই সঙ্গে জল জীবনদায়ী এবং আকাঙ্ক্ষিত হলেও তা অনুপস্থিত ও দুর্লভ। জলহীনতা এখানে কেবল কৃষি সংকট নয়, বরং এটিকে একটি অস্তিত্বগত শূন্যতার রূপক হিসেবে দেখানো হয়েছে। মৃত মানুষের হাতে ঘড়ির প্রতীকটিও অসাধারণ বর্ণনায় প্রকাশ করা হয়েছে।
‘সময় কি থেমে গেছে’ নাকি চলছে অনন্তকাল’— এই জিজ্ঞাসা যেন পুরো জনপদের ভাগ্যের রূপক হয়ে উঠেছে।
মামুন হুসাইনের লেখা ‘জলছাপের চিত্রশালা’য় লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন। এর কোনো সহজ উত্তর নেই। আমরা পাঠক-লেখক-গবেষক-বুদ্ধিজীবী সমাজ কি সত্যিই অভিনাথ ও রাবি মারান্ডির ‘বিষ কেনার গোপন ঋণ পরিশোধ করতে পেরেছি?’ শেষ পর্যন্ত লেখক আমাদের কোনো উত্তর দেন না। বরং গল্পকার হিসেবে তিনি রেখে গেছেন এক গভীর ও অস্বস্তিকর সচেতনতা। আমরা যতই লিখি, যতই বিশ্লেষণ করি— প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত যন্ত্রণা আমাদের ভাষার নাগালের বাইরেই থেকে যায়। গল্পে ‘মৃত্যু’র ঘটনাটি একটি ভাষা। সে ভাষা বোঝার মতো যোগ্যতা আমাদের এখনো হয়নি। এই অযোগ্যতা নিয়েই আমরা দিনপাত করে চলেছি যুগের পর যুগ।

আপনার মতামত লিখুন