সংবাদ

অনুবাদ গল্প

একটা হানাবাড়ি



একটা হানাবাড়ি


ঘুম থেকে জাগলেই শুনতে পাবে একটা দম্পতি যেন ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে। তাঁরা চলেফিরে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘরে, হাতে হাত ধরা, কোথাও কিছু তুলে ধরছে, কোথাও ছেড়ে দিচ্ছে হাত, ঠিক যেন মনে হয় একটা ভৌতিক যুগল।

“এখানেই আমরা সেটা রেখেছিলাম”, ভদ্রমহিলা বললেন। এখন ভদ্রলোক বললেন, “কিন্তু, এখানেও”!

ভদ্রমহিলা গুনগুন করে বললেন, “এটা তো দোতলা”।

ভদ্রলোক বললেন, “বাগানের ভিতরও।”

তখন তারা মিলিত কণ্ঠে বললেন, “চুপ্, চুপ্, নাহলে ওরা জেগে যেতে পারে।”

“তার মানে এটা নয় যে, তুমিই আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছো। আহ্, সেটা নয়।” “তারা এটা খুঁজে বেড়াচ্ছে, পর্দাটাও নামিয়ে দিচ্ছে তারা” কেউ কেউ একথা বলতে পারে, অথবা এটা পড়তে পারে এক কিংবা দুই পৃষ্ঠায়। “এখন ওটা খুঁজে পেয়েছে” একজন তার পেন্সিলের লেখা থামিয়ে দিতে পারে মার্জিনের ওপর। আর তখন, পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে, উঠে প’ড়ে নিজে নিজেই দেখতে পারে, বাড়িটি সম্পূর্ণ জনমাবনহীন, দরজাগুলো দাঁড়িয়ে আছে অর্গল মুক্ত অবস্থায়, শুধু ঘুঘুগুলো একটানা ডেকে যাচ্ছে আর খড় কাটা যন্ত্রের চলার শব্দ ভেসে আসছে খামার থেকে। “আমি কেন এসছি এখানে? আমি কী খুঁজে পেতে চেয়েছি?” আমার হাত দু’টো ছিল শূন্য। “সম্ভবত সেগুলো তখন ছিল উপরে কি?” ওপরে তাকের ওপর রাখা ছিল আপেলগুলো। তাই নেমে এলাম নিচে, বাগানটা আগের মতোই স্তব্ধ, শুধু বইটা গড়িয়ে পড়েছে ঘাসের ভিতর।

কিন্তু তারা ওটা খুঁজে পেল বসার ঘরে। এমনভাবে সেটা রাখা ছিল যা সহজেই চোখে পড়ে। জানলার কাচে দেখা যাচ্ছিল আপেলের প্রতিবিম্ব, গোলাপের প্রতিবিম্ব; কাচের ভিতর সব পাতাগুলোকে সবুজ দেখাচ্ছিল। জানলাটা বসার ঘরের ভিতরের দিকে সরে এলো, আপেলটার হলুদ পিঠটা শুধু দেখা যাচ্ছিল। তবু, মুহূর্তক্ষণ পর, দরজাটা খুলে গেল, সেটা সরে এলো ঘরের মাঝের দিকে, দেয়ালের গায়ে ঝুলছিল একটা লকেটের মতো বস্তু— কী সেটা? আমার হাত ছিল শূন্য। একটা থ্রাস পলাতকা ছায়া ফেলে গালিচাটা পেরিয়ে গেল। গভীর স্তব্ধতার তলদেশ থেকে ভেসে এলো ঘুঘুর ডাকের বুদ্বুদ্গুলো। বাড়ির নাড়ীর স্পন্দন কানে আসছিল, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”। “গুপ্তধনটা মাটির গভীরে প্রোথিত; ঘরটি...” অল্প সময় পরেই থেমে গেল নাড়ীর স্পন্দন। ওহো, ওটাই কি ছিল লুকানো গুপ্তধন?

মুহূর্তকাল পরই ম্লান হয়ে এলো আলোটা। বাইরে বাগানে তখন কি? কিন্তু বাগানের তরুরাজি তখন আঁধার বুনে চলেছিল সূর্যের অস্থির আলোকরশ্মি দিয়ে। সেটি ছিল অতি সূক্ষ্ম, অতি বিরল একটি আলোর দ্যুতি, স্নিগ্ধভাবে যেন প্রবেশ করেছিল ভূ-অভ্যন্তরে। কাছের ওপাশে এই দীপ্তিকেই আমি খুঁজছিলাম। কাচটাই ছিল মৃত্যু; মৃত্যু ছিল আমাদের দু’জনের মাঝখানে, প্রথমে আসবে ভদ্রমহিলার কাছে, শত শত বছর পূর্বে, পিছনে পড়ে থাকবে শূন্য বাড়িটা, সব জানলা বন্ধ, ঘরগুলো সব অন্ধকার। ভদ্রলোক এই বাড়ি, এই ভদ্রমহিলাকে ছেড়ে চলে গেলেন উত্তরে, তারপর পূর্বে, সেখানে গিয়ে দক্ষিণের আকাশে ফুটে ওঠা নক্ষত্রদের দেখলেন, সেখানে তিনি খুঁজলেন তার বাড়ি, সেটা তিনি খুঁজে পেলেন নিচে, পাহাড়ের ঢালে। বাড়িটার হৃদস্পন্দন বলে উঠলো, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই।” “গুপ্তধনটা আপনার।”

রাজপথ বেয়ে গর্জন করতে করতে ছুটে গেল বাতাস। সেই বাতাসে আন্দোলিত হতে লাগলো গাছেরা। বৃষ্টিতে চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে, বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিট্কে পড়তে লাগলো এদিক ওদিক। কিন্তু প্রদীপটির আলোর ছটা সোজা এসে পড়ছিল জানলা থেকে নিচে। মোমবাতিটি জ্বলছিল তার শিখাটিকে স্থির এবং অকম্পিত রেখে। সেই ভূতুড়ে দম্পত্তি এলোমেলোভাবে পরিভ্রমণ করছিল বাড়িটির জানলা ও দরজার ভিতর দিয়ে, সেইসাথে ফিস্ফিস্ করে কথা বলছিল, যাতে আমরা ঘুম ভেঙ্গে জেগে না উঠি। এতেই তারা খুঁজে নিচ্ছিল তাদের আনন্দ।

ভদ্রমহিলা বলল, “এখানে আমরা নিদ্রা যেতাম”। ভদ্রলোক বলল, “অসংখ্য চুম্বন বিনিময় হতো”।

—“নিদ্রা ভেঙ্গে জেগে উঠতাম সকালে—”

—“গাছেদের ভিতর দিয়ে দেখা যেত রুপালি আলো—”

—“উপরে—”।

—“বাগানের ভিতর—”।

—“গ্রীষ্মের দিনগুলো যখন এগিয়ে আসতো—”।

—শীতকালে যখন তুষারপাত হতো—”।

দূরে জানলাগুলো খটাং খটাং ক’রে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, যেন কেউ আস্তে করে নাড়ীর স্পন্দন তুলছিল।

তারা কাছে এগিয়ে এলো, থামলো তারা দরজার সামনে এসে। বাতাসের গতিবেগ হ্রাস পেল, বৃষ্টির জল রুপালি রং মেখে গড়িয়ে নামছিল জানলার কাচ বেয়ে। আমাদের চোখে নামে অন্ধকার, আমাদের পিছনে কারও পদশব্দ শোনা যাচ্ছিল না; আমরা কোনো অশরীরী নারীকে তার আলখাল্লা তুলে ধরতে দেখলাম না। পুরুষটি তার হাত দিয়ে আড়াল করছিল প্রদীপটি। সে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “দেখুন। তারা নিদ্রিত। তাদের ঠোঁটে লেগে আছে ভালোবাসার ছোঁয়া।”

নিচের দিক ঝুঁকে তাদের রুপোর প্রদীপটা তুলে ধরলো আমাদের মাথার ওপর, তারপর তারা দীর্ঘসময় গভীরভাবে তাকিয়ে থাকলো আমাদের দিকে। তারা সেইভাবেই থাকলো অনেকটা সময়। সরলরেখায় প্রবাহিত হচ্ছিল বাতাস, প্রদীপের শিখাটা সামান্য নিচের দিকে নুয়ে পড়লো। বুনো চাঁদের আলো এসে পড়ছিল দেয়াল আর মেঝের ওপর, আর সেই নুয়ে পড়া বাঁকা মুখটার ওপর। মুখে তার গভীর চিন্তার ছাপ। তাই নিয়ে তারা ঘুমন্ত মুখগুলোর মধ্যে সন্ধান করছিল একটা গোপন আনন্দ।

বাড়ির নাড়ী স্পন্দিত হচ্ছিল, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “বহু বছর পর তুমি খুঁজে পেলে আমায়”। সেই নারী ফিস্ফিস্ করে বললো, “এখানে, এই বাগানের মধ্যে ঘুমাচ্ছে, বই পড়ছে, হাসছে, হাতে নিয়ে আপেল লোফালুফি করছে। এখানেই আমরা রেখে গিয়েছিলাম আমাদের গুপ্তধন—”।

নিচু হয়ে গেল সে, তাতে তার প্রদীপ একটু উঁচু হলো আমাদের চোখের ওপরে।  “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”! বলে বাড়ির নাড়ী উন্মাদের মতো স্পন্দিত হলো। জেগে উঠে, আমি কেঁদে ফেললাম, “ওহ্, এই কি তোমার গুপ্তধন? আলোয় উদ্ভাসিত হৃদয়।”


[লেখক পরিচিতি: ভার্জিনিয়া উল্ফ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজ কথাসাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উল্ফের জন্ম ১৮৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ। তিনি ছিলেন একজন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক। তাঁর লেখায় চেতনাপ্রবাহের বর্ণনাশৈলী আরও গভীরভাবে প্রাণ পায়। তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে স্মৃতি ও অন্তর্জগৎ। তিনি ছিলেন একজন নারীবাদী চিন্তারও অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর রচনা তাঁর সময়কালের ও বর্তমানের লেখকদেরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

তাঁর কোনো প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ছিল না। কারণ তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। কিন্তু তাঁর সে প্রথাগত শিক্ষার অভাব বিপুলভাবে পূরণ করে দিয়েছিল তাঁর পারিবারিক গ্রন্থাগারে রাখা বিভিন্ন ভাষার অমূল্য সব গ্রন্থরাজি। তিনি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানুষের বাইরের জীবনের চেয়ে তার মানসিক জগৎ অনেক বেশি জটিল এবং শিল্পসম্ভাবনাময়। এ সবই তিনি তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে পাঠকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাই আজও পাঠকেরা তাঁর লেখার প্রতি সমানভাবে আকর্ষণ বোধ করেন। এটাই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে অমর ক’রে রেখেছে।]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একটা হানাবাড়ি

প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


ঘুম থেকে জাগলেই শুনতে পাবে একটা দম্পতি যেন ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে। তাঁরা চলেফিরে বেড়াচ্ছে এঘর থেকে ওঘরে, হাতে হাত ধরা, কোথাও কিছু তুলে ধরছে, কোথাও ছেড়ে দিচ্ছে হাত, ঠিক যেন মনে হয় একটা ভৌতিক যুগল।

“এখানেই আমরা সেটা রেখেছিলাম”, ভদ্রমহিলা বললেন। এখন ভদ্রলোক বললেন, “কিন্তু, এখানেও”!

ভদ্রমহিলা গুনগুন করে বললেন, “এটা তো দোতলা”।

ভদ্রলোক বললেন, “বাগানের ভিতরও।”

তখন তারা মিলিত কণ্ঠে বললেন, “চুপ্, চুপ্, নাহলে ওরা জেগে যেতে পারে।”

“তার মানে এটা নয় যে, তুমিই আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছো। আহ্, সেটা নয়।” “তারা এটা খুঁজে বেড়াচ্ছে, পর্দাটাও নামিয়ে দিচ্ছে তারা” কেউ কেউ একথা বলতে পারে, অথবা এটা পড়তে পারে এক কিংবা দুই পৃষ্ঠায়। “এখন ওটা খুঁজে পেয়েছে” একজন তার পেন্সিলের লেখা থামিয়ে দিতে পারে মার্জিনের ওপর। আর তখন, পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে, উঠে প’ড়ে নিজে নিজেই দেখতে পারে, বাড়িটি সম্পূর্ণ জনমাবনহীন, দরজাগুলো দাঁড়িয়ে আছে অর্গল মুক্ত অবস্থায়, শুধু ঘুঘুগুলো একটানা ডেকে যাচ্ছে আর খড় কাটা যন্ত্রের চলার শব্দ ভেসে আসছে খামার থেকে। “আমি কেন এসছি এখানে? আমি কী খুঁজে পেতে চেয়েছি?” আমার হাত দু’টো ছিল শূন্য। “সম্ভবত সেগুলো তখন ছিল উপরে কি?” ওপরে তাকের ওপর রাখা ছিল আপেলগুলো। তাই নেমে এলাম নিচে, বাগানটা আগের মতোই স্তব্ধ, শুধু বইটা গড়িয়ে পড়েছে ঘাসের ভিতর।

কিন্তু তারা ওটা খুঁজে পেল বসার ঘরে। এমনভাবে সেটা রাখা ছিল যা সহজেই চোখে পড়ে। জানলার কাচে দেখা যাচ্ছিল আপেলের প্রতিবিম্ব, গোলাপের প্রতিবিম্ব; কাচের ভিতর সব পাতাগুলোকে সবুজ দেখাচ্ছিল। জানলাটা বসার ঘরের ভিতরের দিকে সরে এলো, আপেলটার হলুদ পিঠটা শুধু দেখা যাচ্ছিল। তবু, মুহূর্তক্ষণ পর, দরজাটা খুলে গেল, সেটা সরে এলো ঘরের মাঝের দিকে, দেয়ালের গায়ে ঝুলছিল একটা লকেটের মতো বস্তু— কী সেটা? আমার হাত ছিল শূন্য। একটা থ্রাস পলাতকা ছায়া ফেলে গালিচাটা পেরিয়ে গেল। গভীর স্তব্ধতার তলদেশ থেকে ভেসে এলো ঘুঘুর ডাকের বুদ্বুদ্গুলো। বাড়ির নাড়ীর স্পন্দন কানে আসছিল, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”। “গুপ্তধনটা মাটির গভীরে প্রোথিত; ঘরটি...” অল্প সময় পরেই থেমে গেল নাড়ীর স্পন্দন। ওহো, ওটাই কি ছিল লুকানো গুপ্তধন?

মুহূর্তকাল পরই ম্লান হয়ে এলো আলোটা। বাইরে বাগানে তখন কি? কিন্তু বাগানের তরুরাজি তখন আঁধার বুনে চলেছিল সূর্যের অস্থির আলোকরশ্মি দিয়ে। সেটি ছিল অতি সূক্ষ্ম, অতি বিরল একটি আলোর দ্যুতি, স্নিগ্ধভাবে যেন প্রবেশ করেছিল ভূ-অভ্যন্তরে। কাছের ওপাশে এই দীপ্তিকেই আমি খুঁজছিলাম। কাচটাই ছিল মৃত্যু; মৃত্যু ছিল আমাদের দু’জনের মাঝখানে, প্রথমে আসবে ভদ্রমহিলার কাছে, শত শত বছর পূর্বে, পিছনে পড়ে থাকবে শূন্য বাড়িটা, সব জানলা বন্ধ, ঘরগুলো সব অন্ধকার। ভদ্রলোক এই বাড়ি, এই ভদ্রমহিলাকে ছেড়ে চলে গেলেন উত্তরে, তারপর পূর্বে, সেখানে গিয়ে দক্ষিণের আকাশে ফুটে ওঠা নক্ষত্রদের দেখলেন, সেখানে তিনি খুঁজলেন তার বাড়ি, সেটা তিনি খুঁজে পেলেন নিচে, পাহাড়ের ঢালে। বাড়িটার হৃদস্পন্দন বলে উঠলো, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই।” “গুপ্তধনটা আপনার।”

রাজপথ বেয়ে গর্জন করতে করতে ছুটে গেল বাতাস। সেই বাতাসে আন্দোলিত হতে লাগলো গাছেরা। বৃষ্টিতে চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে, বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিট্কে পড়তে লাগলো এদিক ওদিক। কিন্তু প্রদীপটির আলোর ছটা সোজা এসে পড়ছিল জানলা থেকে নিচে। মোমবাতিটি জ্বলছিল তার শিখাটিকে স্থির এবং অকম্পিত রেখে। সেই ভূতুড়ে দম্পত্তি এলোমেলোভাবে পরিভ্রমণ করছিল বাড়িটির জানলা ও দরজার ভিতর দিয়ে, সেইসাথে ফিস্ফিস্ করে কথা বলছিল, যাতে আমরা ঘুম ভেঙ্গে জেগে না উঠি। এতেই তারা খুঁজে নিচ্ছিল তাদের আনন্দ।

ভদ্রমহিলা বলল, “এখানে আমরা নিদ্রা যেতাম”। ভদ্রলোক বলল, “অসংখ্য চুম্বন বিনিময় হতো”।

—“নিদ্রা ভেঙ্গে জেগে উঠতাম সকালে—”

—“গাছেদের ভিতর দিয়ে দেখা যেত রুপালি আলো—”

—“উপরে—”।

—“বাগানের ভিতর—”।

—“গ্রীষ্মের দিনগুলো যখন এগিয়ে আসতো—”।

—শীতকালে যখন তুষারপাত হতো—”।

দূরে জানলাগুলো খটাং খটাং ক’রে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, যেন কেউ আস্তে করে নাড়ীর স্পন্দন তুলছিল।

তারা কাছে এগিয়ে এলো, থামলো তারা দরজার সামনে এসে। বাতাসের গতিবেগ হ্রাস পেল, বৃষ্টির জল রুপালি রং মেখে গড়িয়ে নামছিল জানলার কাচ বেয়ে। আমাদের চোখে নামে অন্ধকার, আমাদের পিছনে কারও পদশব্দ শোনা যাচ্ছিল না; আমরা কোনো অশরীরী নারীকে তার আলখাল্লা তুলে ধরতে দেখলাম না। পুরুষটি তার হাত দিয়ে আড়াল করছিল প্রদীপটি। সে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “দেখুন। তারা নিদ্রিত। তাদের ঠোঁটে লেগে আছে ভালোবাসার ছোঁয়া।”

নিচের দিক ঝুঁকে তাদের রুপোর প্রদীপটা তুলে ধরলো আমাদের মাথার ওপর, তারপর তারা দীর্ঘসময় গভীরভাবে তাকিয়ে থাকলো আমাদের দিকে। তারা সেইভাবেই থাকলো অনেকটা সময়। সরলরেখায় প্রবাহিত হচ্ছিল বাতাস, প্রদীপের শিখাটা সামান্য নিচের দিকে নুয়ে পড়লো। বুনো চাঁদের আলো এসে পড়ছিল দেয়াল আর মেঝের ওপর, আর সেই নুয়ে পড়া বাঁকা মুখটার ওপর। মুখে তার গভীর চিন্তার ছাপ। তাই নিয়ে তারা ঘুমন্ত মুখগুলোর মধ্যে সন্ধান করছিল একটা গোপন আনন্দ।

বাড়ির নাড়ী স্পন্দিত হচ্ছিল, “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “বহু বছর পর তুমি খুঁজে পেলে আমায়”। সেই নারী ফিস্ফিস্ করে বললো, “এখানে, এই বাগানের মধ্যে ঘুমাচ্ছে, বই পড়ছে, হাসছে, হাতে নিয়ে আপেল লোফালুফি করছে। এখানেই আমরা রেখে গিয়েছিলাম আমাদের গুপ্তধন—”।

নিচু হয়ে গেল সে, তাতে তার প্রদীপ একটু উঁচু হলো আমাদের চোখের ওপরে।  “ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই”! বলে বাড়ির নাড়ী উন্মাদের মতো স্পন্দিত হলো। জেগে উঠে, আমি কেঁদে ফেললাম, “ওহ্, এই কি তোমার গুপ্তধন? আলোয় উদ্ভাসিত হৃদয়।”


[লেখক পরিচিতি: ভার্জিনিয়া উল্ফ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজ কথাসাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উল্ফের জন্ম ১৮৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ। তিনি ছিলেন একজন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক। তাঁর লেখায় চেতনাপ্রবাহের বর্ণনাশৈলী আরও গভীরভাবে প্রাণ পায়। তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে স্মৃতি ও অন্তর্জগৎ। তিনি ছিলেন একজন নারীবাদী চিন্তারও অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর রচনা তাঁর সময়কালের ও বর্তমানের লেখকদেরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

তাঁর কোনো প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ছিল না। কারণ তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। কিন্তু তাঁর সে প্রথাগত শিক্ষার অভাব বিপুলভাবে পূরণ করে দিয়েছিল তাঁর পারিবারিক গ্রন্থাগারে রাখা বিভিন্ন ভাষার অমূল্য সব গ্রন্থরাজি। তিনি তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানুষের বাইরের জীবনের চেয়ে তার মানসিক জগৎ অনেক বেশি জটিল এবং শিল্পসম্ভাবনাময়। এ সবই তিনি তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে পাঠকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাই আজও পাঠকেরা তাঁর লেখার প্রতি সমানভাবে আকর্ষণ বোধ করেন। এটাই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে অমর ক’রে রেখেছে।]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত