(পূর্ব প্রকাশের পর)
তিন.
উপজেলা সদরের থেকে যে পাকা রাস্তাটা বেশ ঘুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের দিকে গেছে, সেটা থেকে আগে অনুতপুর পর্যন্ত একটা উঁচু কাঁচা রাস্তা ছিল। পথটা মেঠোপথ হলেও রিকশা, সাইকেল ও ভ্যানগাড়ি চলত। মাঝেমধ্যে সিএনজিও আসত। অনুতপুরের এই রাস্তাটা পাকা করা হবে, এ কথা বেশ কয়েক বছর ধরে বলাবলি হচ্ছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগে রাস্তাটা পাকা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু রাস্তা আর পাকা হচ্ছিল না। কিন্তু গত বছর সেই কাঁচা রাস্তাটাই বর্ধিত করা হয়েছে অনুতপুর থেকে মীরবহরি, মোল্লাকান্দি ও আঁধারিয়া গ্রাম পেরিয়ে কদমতলি পর্যন্ত। এ বছর সুদিনের শুরুতেই কাজ ধরে রাস্তাটা আরও এগিয়ে গেছে। এখনও কাজ চলছে বেশ। বুইদ্দার বিল, হনুজার বিলের বুক চিরে রাস্তাটা গিয়ে ঠেকবে সেই মুরাদনগর গোমতী বেড়িবাঁধে।
আনিস এখন সেই পথটা ধরেই মোটর সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। বছরখানেক হলো সে একটা মোটর সাইকেল কিনেছে। হোন্ডা এনএক্স। খুব বেশি দাম দিয়ে কিনেনি। সেকেন্ডহ্যান্ড। ঢাকা শহরে চলতে হলে একটা মোটর সাইকেল লাগে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা করতে গেলে। সে বছর দেড়েক আগে একটা পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদকের সহকারি হিসেবে যোগ দিয়েছে। এর আগে কোথাও পত্রিকায় চাকরি করেনি। অনুতপুর স্কুলে শিক্ষকতা করেছে। শিক্ষকতা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে পত্রিকায় চাকরি নিতে তার যে খুব একটা কষ্ট হয়েছে, তা নয়। গ্রামে থাকতেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখত। বেশ নামও করেছিল। তাই পত্রিকার চাকরিটা সহজেই জুটে গেছে। কিন্তু তার সেই চাকরিটার প্রয়োজন ছিল না। গ্রামে তার প্রচুর জমিজমা। জমিগুলো বর্গায় দিয়ে যে আয় আসে, তা দিয়ে সে অনায়েসে ঢাকা শহরে নিশ্চিন্তে চলতে পারে। এমনকি জমিজমার সামান্য কিছু অংশ বিক্রি করলে একটা অ্যাপার্টমেন্টও কিনে ফেলতে পারে। কিন্তু সে তা করেনি। সে ফার্মগেট ঘেঁষা নাখালপাড়ায় একটা এক বেডরুমের চিলেকোঠা ভাড়া নিয়েছে। চিলেকোঠাটা অবশ্য পুরোনো দালানের ওপর নয়, নতুন তকতকে একটা উঁচু ছয়তলা দালানের ওপর। ওটাকে ঠিক চিলেকোঠা বলা যায় না। ছাদের ওপর স্টুডিও এপার্টমেন্ট বলাই শ্রেয়। ছয়তলায় উঠতে লিফট আছে।
আনিস সাহিত্য সম্পাদকের সহকারি হিসেবে যোগ দিলেও তাকেই মূলত সব কাজ করতে হয়। লেখা নির্বাচন, প্রুফ দেখা, পত্রিকার গেটআপ-মেকআপ দেখা, এমনকি বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের লেখা সংগ্রহ করতে তার বাসায় বাসায় যাওয়া। মাঝেমধ্যে সে এসব কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। কখনও কখনও ভাবে, পত্রিকার চাকরির চেয়ে তার অনুতপুর স্কুলের চাকরিটাই ভালো ছিল। বেশ কবিতা লিখতে পারত। আজকাল অন্যের লেখা পড়তে পড়তেই দিন যায়। তার খুব বেশি কবিতা লেখা হচ্ছে না। এছাড়া সে ঢাকা শহরে এসে আরেকটা ব্যাপার দেখেছে, এখানে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে দলাদলিটা খুব বেশি। শুধু এটাই নয়, এখানে কেউ যদি কাউকে ছাড়িয়ে যায়, এজন্য একজন আরেকজনের পা খামচে ধরে টেনে রাখে। যা তাকে পীড়া দেয়। গ্রামে থেকে সে মোটেও তা বুঝতে পারেনি। অথচ বছর তিনেক আগে এক বড় কবি তাকে বলেছিলেন, ‘আনিস, কবিতা লিখতে হলে ঢাকা শহরে আসো। তোমার মধ্যে বড় কবি হওয়ার প্রতিভা আছে। প্রান্তিকের কবিরা কখনও বড় কবি হতে পারে না...।’
আনিস জানে, প্রান্তিকের অনেক কবিই বড় কবি হয়েছে। তারপরও একটা মোহ কাজ করেছে। ঢাকা শহরের মোহ। সে একটা কথা ভেবেছে, যেখানে বসেই সে কবিতা লিখুক, তাকে তো ঢাকার পত্রিকাগুলোর সাহিত্যের পাতাতে পাঠাতে হচ্ছে। তাই তার মা রাহেলা খানম মারা যাবার পর বছর দেড়েক আগে স্কুলের চাকরিটায় ইস্তফা দিয়ে ঢাকা শহরে চলে আসে।
আনিসের মা রাহেলা খানমের মৃত্যুটা স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছে। নানা রোগে ভুগছিল তার মা। একে তো পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন, তার ওপর শেষের দিকে খুব শ্বাসকষ্ট হতো। কয়েকবার যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল। কুমিল্লার বড় ডাক্তার, এমনকি দু-দু’বার সে তার মাকে ঢাকাতেও নিয়ে গিয়েছিল। একরাতে ঘুমের মধ্যেই তার মা মারা যায়। তখন সে আঁধারিয়া গ্রামে তার বাড়িতেই, মা’র একদম সিথানের কাছে বসেছিল।
রাহেলা খানম মারা যাবার পরই আনিস বাড়িতে আর মন টেকাতে পারেনি। অল্প কয়েক মাসের সিদ্ধান্তে স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেয়। তারপর সরাসরি ঢাকাতে পাড়ি জমায়। ঢাকাতে আসার পর সে যে খুব সুখের দিন কাটাতে শুরু করে, তা নয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার ভেতর হতাশা এসে ভিড় করে। বারবার তার মনে হতে থাকে, সে ঢাকা শহরে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল করেছে। তার তখন কবিতা লিখতে ইচ্ছে করত না। সে কোথাও কবিতা বিষয়ক আলাপ করতে আনন্দ পেতো না। আগে সুন্দর কোনো কিছু দেখে যেমন মুগ্ধ হতো, সেটা সে হতে পারত না। মাস যেতেই একটা সময় সিদ্ধান্ত নেয়, সে গ্রামে ফিরে যাবে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সত্যি সত্যি আনিস তার আঁধারিয়া গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু গ্রামে এসেই তার মনে হয়, ঢাকা শহর তাকে আবার কী এক অমোঘ আকর্ষণে টানছে। সে বুঝতে পারে, ঢাকা শহরের ভেতর অদ্ভুত এক মোহ আছে। এত যে ব্যস্ত জীবন, এত যে যানজট, নোংরা, ধূলি উড়ছে সর্বত্র, ভাঙারির আখড়া, তারপরও যেন কী এক মায়ায় টানছে তাকে। জীবন বিধ্বস্ত করে, কিন্তু শহরটকে ছেড়ে যাওয়া যায় না। ফিরে আসতে হয় বারবার।
এভাবে দেড়টি বছর হয়ে যায়। আনিস থেকে যায় ঢাকা শহরের মাটি কামড়ে। আজকাল সে গ্রামে আসে ঠিকই, কিন্তু সে আসে অতিথি হয়ে। কয়েকদিন থাকে, জমিজমার ভাগচাষ ও টাকা পয়সার হিসেব করে। আবার ফিরে যায় সেই ঢাকা শহরে।
আনিস এসব চিন্তার মধ্যেই না থেমে মোটর সাইকেল নিয়ে মীরবহরি বাজার পেরিয়ে আঁধারিয়া গ্রামে ঢুকে গেল। মাটি বসে গেলেও রাস্তাটা এখনও সমতল নয়। তাই সে মোটর সাইকেলে ঝাঁকুনি খাচ্ছে বেশি। তারপরও এই পথটা ধরে তার গ্রামে ঢুকতে বেশ ভালো লাগছে। তাদের এই ভাটি অঞ্চলের কয়েকটা গ্রাম এই রাস্তাটার কারণে সত্যি অনেক এগিয়ে যাবে। মানুষের জীবনব্যবস্থার অনেক উন্নত হবে। রাস্তা যত উঁচু করে করা হচ্ছে, এতে বর্ষার মওসুমে রাস্তাটা আর জোয়ারের জলে ঢুবে যাবে না। রাস্তাটা ধরে ভাটি অঞ্চলের গ্রামগুলোতে মানুষজনের চলাচলের কোনো অসুবিধা হবে না। তখন গ্রামের মানুষের নৌকার ব্যবহার করবে শুধুমাত্র মাছ ধরা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য।
আঁধারিয়া গ্রামে নতুন রাস্তা থেকে এখনও কোনো পথ কোনো বাড়ি বা পাড়ার দিকে নেমে যায়নি। জমির সরু আইল ধরে যেতে হয়। হয়তো রাস্তাটা পুরোপুরি হয়ে গেলে বিভিন্ন পাড়ার দিকে মাটির পথগুলো ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বা মেম্বররাই করে দিবে। এই ছোট ছোট পথ তৈরি করার কাজ সাধারণত গ্রামের লোকজন কাজের বিনিময়ে খাদ্যে বা কাবিখা’র মাধ্যমে করে দেয়।
আনিসের মোটর সাইকেলটা গোত্তা মেরে জমির আইলে নেমে এল। তাদের বাড়িটা নতুন রাস্তা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বড়জোর আধা কিলোমিটার হবে। নতুন রাস্তা থেকেই তাদের টিনশেড দালানটা গাছের ফাঁক থেকে উঁকি মারতে দেখা যায়। সে সেদিকে তাকাল। এবার সে ঠিক দুই মাস পর এল। আগে মাসে একবার হলেও এসেছে। এবারই দেরি হলো।
আনিস বেশিক্ষণ দূরে তাকিয়ে থাকতে পারল না। জমির আইলটা অত্যধিক সরু বলে মোটর সাইকেলটা সে ঠিকমতো চালাতে পারছিল না। বারবার চাকা আইল ছেড়ে জমিতে নেমে যাচ্ছিল। তারপরও সে আস্তে আস্তে আরও কিছুক্ষণ চালাল।
ক্ষেতের আইলের দু-ধারে বিস্তীর্ণ সরিষার ক্ষেত। হলুদ ফুল ফুটেছে। হলুদ ফুলের ওপর উত্তরের মৃদুমন্দ বাতাস হিল্লোল তুলছে। দৃষ্টি আটকে যাওয়ার মতো হিল্লোল। যেন কোনো শ্যামলা যুবতী হলুদ শাড়ি পরে নাচের তরঙ্গ তুলছে। কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে দেখতে। এই নৃত্যের লহরি দেখে আনিসের তখনই সেতারা বেগমের কথা মনে পড়ে গেল। আর ঠিক তখনই তার মোটর সাইকেলটা ক্ষেতের আইল ছেড়ে সরিষার খেতে নেমে গেল। সে লাফ দিয়ে মোটর সাইকেল থেকে নেমে গেল। মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল সঙ্গে সঙ্গে।
সেতারা বেগম মারা গেছে আড়াই বছরের ওপরে হয়ে গেল। আনিস হিসেব করে দেখল, প্রায় দুই বছর সাত মাস। সে সেতারা বেগমকে নিয়ে ঠিক ভাবতে চায় না, তারপরও তার ভাবনার ভেতর মনের অজান্তে সেতারা বেগমের চেহারাটা চলে আসে। এখনও ঠিক সেভাবেই চলে এল।
আনিসের মনে পড়ল, বছর চারেক আগে এমনই এই শীতের সকালে সে সেতারা বেগমকে এই সরিষার ক্ষেতের আইলে দেখতে পায়। পরনে হলুদ শাড়ি। খোলা চুল। চুলগুলো উড়ছিল উত্তরের হাওয়ায়। সেদিন সকালে সে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে মীরবহরি বাজারে গিয়েছিল। মীরবহরি বাজারে মিষ্টির দোকানের যোগেশ পোদ্দার সকালবেলায় গরম গরম জিলাপি ভাজে। গুড়ের জিলাপি। ছোটবেলায় মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসাযাওয়ার পথে সে সেই মিষ্টান্নভাণ্ডারে জিলাপি খেতে যেত। শুধু জিলাপি না, গজা, নিমকি, কখনও আস্ত একটা রসগোল্লা। সে অনুতপুর স্কুল পড়ানোর সময় বাড়ি এলেও মাঝেমধ্যে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে গরম গরম জিলাপি খেতে যেত। কাগজের ঠোঙায় করে তার মা’র জন্য নিয়ে আসত। যদিও তার মা জিলাপি থাক দূরের কথা সাধারণ খাবারটাই ঠিকমতো খেতে পারত না। মুখের অর্ধেকাংশ বেঁকে গিয়েছিল। তারপরও জিলাপি আনলে মা বেশ খুশি হতো।
আনিস সেই সকালেও যোগেশ পোদ্দারের দোকান থেকে মা’র জন্য ঠোঙায় গরম জিলাপি নিয়ে বাড়ি ফিরছিল আর আনমনে নতুন একটা কবিতার ছন্দ সাজাচ্ছিল। ঠিক তখনই সেতারা বেগম ডেকে ওঠে, ‘এই আনিস ভাই।’
আনিস সেতারা বেগমকে খেয়াল করেনি। এমন সময় সেতারা বেগম সরিষা ক্ষেতে থাকবে, সেটাও সে ভাবেনি। সে কিছুটা চমকে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণই সামলে উঠে হাসে।
সেতারা বেগম জিজ্ঞেস করে, ‘আনিস ভাই, এই সক্কালবেলা কই থাইকা ফিরতাছেন?’
আনিস বলে, ‘মীরবহরি বাজারে গিয়েছিলাম। তুমি এখানে?’
‘হ, সইরষা ফুল তুলতে আইছিলাম, বাড়িত নিয়া বড়া বানাইমু। আপনে খাইতে আইবেন?
‘আসব না হয়। সরিষা ফুলের বড়া আমার খুব পছন্দ।’
‘আইচ্ছা, সইন্ধ্যাবেলা আইসেন। আমি রাইখা দিমু। আপনের হাতের ঠোঙায় কী অইডা?’
‘জিলাপি। যোগেশ পোদ্দারে দোকানের।’
‘কন কী, জিলাপি! কতদিন জিলাপি খাই না’— বলেই সেতারা বেগম খলবল হেসে কিছুটা হামলে পড়ে ঠোঙাটা খাবলে নেয়।
সেতারা বেগমের এই আচরণে আনিস ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। চারিদিকে বুইদ্দার বিল ভরতি কামলারা কাজ করছিল। কেউ কেউ ক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছিল, কেউ কেউ বাজারে বিক্রি করবে বলে শাকসবজি তুলছিল। এদের বেশিরভাগই আঁধারিয়া গ্রামের। সে খুব অপ্রস্তুত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকায়। এছাড়া সে ভাবেনি, সেতারা বেগম হঠাৎ এভাবে জিলাপি ঠোঙাটা খাবলে নিবে। তাই সে বিব্রত হয়ে বলে বসে, ‘এই, এই, এটা কী ধরনের কাজ করলে, হ্যাঁ? এমন হাতাহাতি করলে কেন?
সেতারা বেগম হাসে— হিহি, হিহি।
সেতারা বেগমের হাসি দেখে আনিসের আরও গা জ্বলে যায়। সে ধমক দিয়ে বলে, ‘এমনে হাসবে না। আর এধরনের কাজ কখনও করবে না। দেখ না, বুইদ্দার বিল ভরতি ক্ষেতকামলারা তাকিয়ে আছে। দাও, আমার ঠোঙাটা দাও।’
সেতারা বেগম হয়তো আনিসের কাছ থেকে এমনটা আশা করেনি। তাই সে প্রথমে থতমত খেয়ে যায় হাসি থামিয়ে ফেলে। পরক্ষণ চেহারাটা কালো করে জিলাপির ঠোঙাটা আনিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
আনিসের মনে আছে, এরপর সেতারা বেগম পুরো দুই সপ্তাহ তার সঙ্গে কথা বলেনি। বেশ অভিমান করেছিল। কাছে পর্যন্ত ভিড়তে দেয়নি। তাকে মানাতে কয়েকবার সে ওই বাড়িতে গিয়েছিল। এক সন্ধ্যায় যোগেশ পোদ্দারের দোকান থেকে বড় এক ঠোঙায় গুড়ের জিলাপি কিনে নিয়ে তার অভিমান ভাঙায়।
আনিস ভাবল, সময় কত দ্রুত চলে যায়। চারটি বছর...! ঢাকার চিলেকোঠায় সে এখনও সেতারা বেগমকে নিয়ে ভাবতে বসে কবিতা লিখে। কিন্তু সেই কবিতা আর প্রেমের কবিতা হয় না। কোনো গ্রাম্যমিথ টেনে আনে না সে। থাকে না উত্তরের সরিষা ক্ষেতের হিল্লোল, বুইদ্দার বিলের সিঁথিকাটা ঢেউ বা গোমতী নদীর কলতান। সে আজকাল তাকে নিয়ে লিখতে বসে পরাবাস্তবতার কবিতা লিখে।
আনিস মনসুর পাগলাকে নিয়েও ভাবে। তার জন্য সে শুরু থেকেই একজন উকিল রেখেছে। উকিলের টাকাপয়সা সে নিজেই দেয়। কিন্তু কয়েকবার কোর্টে তোলার পরও তার জামিন হয়নি। আদালতের আদেশে সে জেলে আছে। তার বিরুদ্ধে এখনও নাকি তদন্ত চলছে।
আনিস একবার মনসুর পাগলাকে দেখতে জেলে গিয়েছিল। জেলে সে তার খানিকটা পরিবর্তন দেখেছে। সেই পরিবর্তন ভালো না খারাপ, সে ঠিক বুঝতে পারেনি। মনসুর পাগলা তার সঙ্গে সেদিন একটা কথাও বলেনি, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল। তার সেই তাকানো ছিল ভয়ের।
আনিসের মনে হয়েছিল, মনসুর পাগলা যেন বিদীর্ণ দৃষ্টিতে তার ভেতরটা ছেদ করে সেতারা বেগমকে খুঁজছে! তার এমনটা কেন মনে হয়েছিল, সে জানে না। তার জানামতে মনসুর পাগলা কখনই সেতারা বেগমের সঙ্গে তাকে দেখেনি। সে মনসুর পাগলার পুনোয়ারা মস্তানের দরগার অবস্থান জেনেই সেতারা বেগমের সঙ্গে মিলিত হতো।
আনিস এরপর আর জেলখানায় কখনও যায়নি। কিন্তু মনসুর পাগলার কেস লড়তে উকিলের টাকাটা ঠিকই দিয়ে আসছে।
আনিস আর মোটর সাইকেলের ওপর বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো না। সে ক্ষেতের আইল ধরে ঠেলে ঠেলেই বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করল। এখন সরিষার ক্ষেত পেছনে পড়ে গেছে। তার দু’পাশে এখন বাঁধাকপি ও ফুলকপির ক্ষেত। খানিকটা দূরে ক্ষীরা ক্ষেতে। ক্ষীরাই গাছে হলুদ ফুল আর কচি কচি ক্ষীরা এসেছে। তার কচি ক্ষীরা খেতে খুব পছন্দ। সে দিঘল দৃষ্টিতে সেদিকে তাকালেও ক্ষীরা ক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেল না।
আনিস মোটর সাইকেলটা ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে তাদের বাড়ি ঘেঁষা বুইদ্দার খালের কাছাকাছি চলে এল। খালটা এখন অবশ্য শুকনো। মানুষজন এখন খালের ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হতে পারে। যদিও ভুঁইয়াবাড়ি থেকে বুইদ্দার বিলে আসতে-যেতে একটা কাঠের পুল আছে, কিন্তু পুলটার মাঝখানে কাঠ উঠে গেছে।
আনিস দৃষ্টি বাড়াতেই দেখল, তাদের বছরবাঁধা কামলা বশির বাইর বাড়িতে বিচুলি কেটে গরুগুলোকে খাওয়াচ্ছে।
আনিসকে দেখেই বশির খালের ভেতর দিয়ে দৌড়ে এল। বলল, ‘ভাইজান, আইছেন। ভালা হইছে। আমি আপনের অপেক্ষাই করতে ছিলাম।’
আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, গতকাল তোর ফোন পেয়েই তো আজ সকাল-সকাল আসলাম। এক কাজ কর, মোটর সাইকেলটা ঠেলে খালটা পার কর। বিলের আধাআধি থেকে টেনে নিয়ে এসেছি।’
‘কী হইছে, হোন্ডা নষ্ট হইয়া গেছে?’
‘না, নষ্ট হয়নি।’
‘তাইলে?’
‘তোরে যেটা করতে বলছি সেটা কর। এত প্রশ্ন করবি না।’
‘জি, ভাইজান।’ু বলেই বশির আনিসের কাছ থেকে মোটর সাইকেলটা নিয়ে খালের ভেতর দিয়ে ঠেলতে শুরু করল। খালের ভেতরটা শুকনো হলেও এবড়োথেবড়ো ছোট ছোট খাদ আছে। তারপরও বশিরের মোটর সাইকেলটা খালের ভেতর দিয়ে পাড়ে ঠেলে তুলতে কোনো সমস্যা হলো না।
আনিস পাশাপাশি আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার খুলে বল, কী হয়েছে?’
বশির মোটর সাইকেলটা বারান্দার একপাশে দাঁড়া করিয়ে একটা ভারি শ্বাস ফেলে বলল, ভাইজান, আপনাগো দক্ষিণের বড় জমিটায় উত্তর পাড়ার রমজান আলী যে বর্গায় বান্ধাকপি চাষ করছে না, হেয় মিছা কথা কইতাছে।
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘কী মিথ্যা কথা?’
‘হেয় ক্ষেত থাইকা অর্ধেক বান্ধাকপি তুইলা নিয়া মীরবহরি হাটে বেইচা অখন আমারে দেড় হাজার ট্যাকা দিছে। কইতাছে, বান্ধাকপির ভিতরে নাকি পোকা আছিল। হের লাইগা নাকি সস্তায় বেচতে হইছে।’
‘তাই নাকি?’
‘হ, ভাইজান।’
‘তয় রমজান আলীর মিথ্যা কথাটা কী?’
‘আমি মীরবহরি বাজারে পরদিন খবর নিয়া জানতে পারছি, হেয় বারো হাজার ট্যাকার বান্ধাকপি বেচছে।’
‘বলিস কী? রমজান আলী এতবড় মিথ্যা কথা বলল?’
‘হ ভাইজান। আমি যখন রমজান আলীরে হেই কথা জিগাইছি, হেয় স্বীকারই করে নাই। উলটা আমার ওপর ক্ষেইপা গেছে। পরে দিশা না পাইয়া আপনেরে আইতে কইলাম।’
‘আমাকে আসতে বলেছিস, ভালো করেছিস। আমি এমনিতেই আসতাম। দেখি, একটু পরে রমজান আলীর বাড়িতে যাব। তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করব।’
বশির মিয়া বলল, ‘ভাইজান, আপনে হের বাড়িত যাইবেন ক্যান? আমি ডাইকা নিয়া আসমু। আপনে ঢাকা থাইকা আইছেন। একটু জিরান।’
আনিস মৃদু হেসে বলল, ‘ঠিক আছে, বশির। তুই যা, রমজান আলীকে ডেকে নিয়ে আস।’
বশির মিয়া বলল, ‘জে ভাইজান।’ু বলেই সে উত্তর পাড়ার দিকে হাঁটা ধরল।
আনিস বশিরের গমনপথের দিকে তাকিয়ে তাদের দিঘল বারান্দায় একটা চেয়ার টেনে বসল। সে খুব ক্লান্ত, তা নয়। খুব সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছে বলে রাস্তাঘাটে যানজট কম ছিল। সে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই চলে এসেছে। যানজট থাকলে সাধারণত দুই থেকে আড়াইঘণ্টা লাগে। কখনও কখনও আরও বেশি সময়ও লেগে যায়। বর্ষাকালের চিত্রটা অবশ্য অন্য। ঢাকা শহর থেকে ফিরে উপজেলা সদর থেকে নৌকা নিতে হয় বলে অর্ধেকদিন চলে যায়। তবে এ বছর থেকে তাকে আর উপজেলা সদর থেকে নৌকা নিতে হবে না। মোটর সাইকেলে উঁচু আইল ধরে একেবারে বাড়ির কাছাকাছি চলে আসতে পারবে।
আনিস চেয়ারের পেছনে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বাড়ির এদিকওদিক তাকাল। বশির বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার করে রেখেছে। বেশ বিশ্বস্ত সে। একটু সহজসরল, এই যা। তার ইচ্ছে আছে, বশিরকে একটা বিয়ে করাবে। বাড়ির একপাশে একটা ঘর তুলে দিবে। সে জানে, তার আর ঢাকা শহর ছাড়া হবে না। গ্রামে স্থায়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা আর মাথায় আসে না।
বাড়িঘর পরিষ্কার হলেও বাড়িটা আনিসের কাছে কেন জানি খালিখালি লাগছে। এটা অবশ্য যতবারই সে বাড়ি আসে, ততবারই তার এরকম খালি লাগে। তাদের বাড়িটা যে কোনোকালে মানুষজনে ভরাট ছিল, তা নয়। ডাঙর হতে না হতেই সে দেখে আসছে, তার মা রাহেলা খানম পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকত। তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া সকাল থেকে রাতের অনেকটা অব্দি মীরবহরি বাজারে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকত। সার-কীটনাশকের দোকান ছিল। ব্যবসা ও টাকাপয়সার প্রতি যতটুকু নেশা ছিল, এর বিন্দুমাত্র নেশা ছিল না ঘরের প্রতি। এমনকি তার প্রতিও না।
সুন্দর ভুঁইয়ার সঙ্গে আনিসের সম্পর্কটা ছিল যোজন যোজন দূরত্বের। অথচ একই বাড়িতে তাদের বসবাস ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে, তার বাবা যখন বাড়ি ফিরত, তখন সে বিছানায়, ঘুমের অতলে। আবার সকালে যখন দোকানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যেত তখনও সে ঘুমে। দিনের বেলায় খুব কমই তাদের দেখা হতো। আনিস পারতে দোকানে যেত না। তার দোকানে যেত ভালোও লাগত না। এছাড়া তার দোকানে যাওয়াটা তার বাবা মনে হয় পছন্দও করত না।
আনিসের মাঝেমধ্যে মনে হতো, তার বাবা সংসারের প্রতি বিরক্ত হয়ে ইচ্ছে করেই যেন সারাদিন দোকানে পড়ে থাকত। তার মা’র সঙ্গে তার বাবাকে কখনও হেসে কথা বলতে দেখেনি। এক খাটে ঘুমাত না। একসময় মারত, কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পর আর মারেনি। আর মারবে কী, তার মা’র রাহেলা খানমের উচ্চবাচ্য করার ক্ষমতাই ছিল না। দিনের বেশিরভাগ সময় বিছানায় পড়ে থাকত। কখনও চেয়ারে বসানো হলে ঘাড় কাঁত করে চোখ মেলে বসে থাকত। তবে তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া জীবনে দুটো অবাক কাজ করেছে। কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেয়নি। যদিও একবার খবর চাউর হয়েছিল, মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনকে তার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে...। কিন্তু খবরটা খবরই থেকে যায়। বাস্তবে ঘটেনি। তার বাবার দ্বিতীয় কাজ ছিল, সংসারের প্রতি টান না থাকলেও বুইদ্দার বিলে বিঘার পর বিঘা জমি কিনে রাখা। বাজারে সার-কীটনাশকের ব্যবসাটাও ধরে রেখেছিল ঠিকমতো।
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আবার দিঘল দৃষ্টি মেলে বাড়ির এদিক-ওদিক তাকাল। সামান্য দূরে গরুগুলো বিছুলি খাচ্ছে শব্দ করে। গাছে অসংখ্য পাখি ডাকছে। দূরে কেউ ক্ষেতে কাজ করতে করতে গান গাচ্ছে। মারফতি গান। বুইদ্দার বিলের বিস্তীর্ণ হলুদ ফুল ফোঁটা সরিষা ক্ষেতকে দূর থেকে আরও অপূর্ব লাগছে। সকালের স্নিগ্ধতা তখনও। হলুদ রোদে একটু একটু শীতও লাগছে।
আনিস ভাবল, তার এই হাহাকার আর কিছুর জন্য নয়, তার মা’র জন্য। অনুতপুর স্কুলে যখন সে পড়াত, তখনও মা’র টানে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে চলে আসত। এই পৃথিবীতে তার মা’টাই ছিল তার সবচেয়ে আপন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল। তার মা’র মাথাটাও মাঝেমধ্যে ঠিকমতো কাজ করত না। তারপরও তাকে পেলে বাম হাতে পিঠ মুছত আর হাসত, মাথা মুছত, গালে স্পর্শ করে কেঁদে ফেলত। সহজে মুখে কিছু বলত না। এখনও সে মা’র টানেই বাড়িতে আসে। মা নেই, কিন্তু সে একদঙ্গল হাহাকার নিয়ে ঢাকায় ফিরে যায়...!
আনিসের ফোনটা বেজে উঠল। সে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনে দেখল, এডভোকেট আতিকুল হকের ফোন। এডভোকেট আতিকুল হক মাঝেমধ্যেই তাকে ফোন দেয়। মনসুর পাগলার কেসের অগ্রগতি জানায়। টাকাপয়সার প্রয়োজন হলে চেয়ে নেয়।
আনিস হ্যালো বলল। ওপাশ থেকে এডভোকেট আতিকুল হকের উচ্ছ্বাসের গলা ভেসে এল, ‘আনিস সাহেব, একটা সুখবর আছে।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কী সুখবর?’
এডভোকেট আতিকুল হক বললেন, ‘মনসুর আলীর জামিন মঞ্জুর হয়েছে।’ ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
তিন.
উপজেলা সদরের থেকে যে পাকা রাস্তাটা বেশ ঘুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের দিকে গেছে, সেটা থেকে আগে অনুতপুর পর্যন্ত একটা উঁচু কাঁচা রাস্তা ছিল। পথটা মেঠোপথ হলেও রিকশা, সাইকেল ও ভ্যানগাড়ি চলত। মাঝেমধ্যে সিএনজিও আসত। অনুতপুরের এই রাস্তাটা পাকা করা হবে, এ কথা বেশ কয়েক বছর ধরে বলাবলি হচ্ছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগে রাস্তাটা পাকা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু রাস্তা আর পাকা হচ্ছিল না। কিন্তু গত বছর সেই কাঁচা রাস্তাটাই বর্ধিত করা হয়েছে অনুতপুর থেকে মীরবহরি, মোল্লাকান্দি ও আঁধারিয়া গ্রাম পেরিয়ে কদমতলি পর্যন্ত। এ বছর সুদিনের শুরুতেই কাজ ধরে রাস্তাটা আরও এগিয়ে গেছে। এখনও কাজ চলছে বেশ। বুইদ্দার বিল, হনুজার বিলের বুক চিরে রাস্তাটা গিয়ে ঠেকবে সেই মুরাদনগর গোমতী বেড়িবাঁধে।
আনিস এখন সেই পথটা ধরেই মোটর সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। বছরখানেক হলো সে একটা মোটর সাইকেল কিনেছে। হোন্ডা এনএক্স। খুব বেশি দাম দিয়ে কিনেনি। সেকেন্ডহ্যান্ড। ঢাকা শহরে চলতে হলে একটা মোটর সাইকেল লাগে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা করতে গেলে। সে বছর দেড়েক আগে একটা পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদকের সহকারি হিসেবে যোগ দিয়েছে। এর আগে কোথাও পত্রিকায় চাকরি করেনি। অনুতপুর স্কুলে শিক্ষকতা করেছে। শিক্ষকতা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে পত্রিকায় চাকরি নিতে তার যে খুব একটা কষ্ট হয়েছে, তা নয়। গ্রামে থাকতেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখত। বেশ নামও করেছিল। তাই পত্রিকার চাকরিটা সহজেই জুটে গেছে। কিন্তু তার সেই চাকরিটার প্রয়োজন ছিল না। গ্রামে তার প্রচুর জমিজমা। জমিগুলো বর্গায় দিয়ে যে আয় আসে, তা দিয়ে সে অনায়েসে ঢাকা শহরে নিশ্চিন্তে চলতে পারে। এমনকি জমিজমার সামান্য কিছু অংশ বিক্রি করলে একটা অ্যাপার্টমেন্টও কিনে ফেলতে পারে। কিন্তু সে তা করেনি। সে ফার্মগেট ঘেঁষা নাখালপাড়ায় একটা এক বেডরুমের চিলেকোঠা ভাড়া নিয়েছে। চিলেকোঠাটা অবশ্য পুরোনো দালানের ওপর নয়, নতুন তকতকে একটা উঁচু ছয়তলা দালানের ওপর। ওটাকে ঠিক চিলেকোঠা বলা যায় না। ছাদের ওপর স্টুডিও এপার্টমেন্ট বলাই শ্রেয়। ছয়তলায় উঠতে লিফট আছে।
আনিস সাহিত্য সম্পাদকের সহকারি হিসেবে যোগ দিলেও তাকেই মূলত সব কাজ করতে হয়। লেখা নির্বাচন, প্রুফ দেখা, পত্রিকার গেটআপ-মেকআপ দেখা, এমনকি বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের লেখা সংগ্রহ করতে তার বাসায় বাসায় যাওয়া। মাঝেমধ্যে সে এসব কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। কখনও কখনও ভাবে, পত্রিকার চাকরির চেয়ে তার অনুতপুর স্কুলের চাকরিটাই ভালো ছিল। বেশ কবিতা লিখতে পারত। আজকাল অন্যের লেখা পড়তে পড়তেই দিন যায়। তার খুব বেশি কবিতা লেখা হচ্ছে না। এছাড়া সে ঢাকা শহরে এসে আরেকটা ব্যাপার দেখেছে, এখানে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে দলাদলিটা খুব বেশি। শুধু এটাই নয়, এখানে কেউ যদি কাউকে ছাড়িয়ে যায়, এজন্য একজন আরেকজনের পা খামচে ধরে টেনে রাখে। যা তাকে পীড়া দেয়। গ্রামে থেকে সে মোটেও তা বুঝতে পারেনি। অথচ বছর তিনেক আগে এক বড় কবি তাকে বলেছিলেন, ‘আনিস, কবিতা লিখতে হলে ঢাকা শহরে আসো। তোমার মধ্যে বড় কবি হওয়ার প্রতিভা আছে। প্রান্তিকের কবিরা কখনও বড় কবি হতে পারে না...।’
আনিস জানে, প্রান্তিকের অনেক কবিই বড় কবি হয়েছে। তারপরও একটা মোহ কাজ করেছে। ঢাকা শহরের মোহ। সে একটা কথা ভেবেছে, যেখানে বসেই সে কবিতা লিখুক, তাকে তো ঢাকার পত্রিকাগুলোর সাহিত্যের পাতাতে পাঠাতে হচ্ছে। তাই তার মা রাহেলা খানম মারা যাবার পর বছর দেড়েক আগে স্কুলের চাকরিটায় ইস্তফা দিয়ে ঢাকা শহরে চলে আসে।
আনিসের মা রাহেলা খানমের মৃত্যুটা স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছে। নানা রোগে ভুগছিল তার মা। একে তো পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন, তার ওপর শেষের দিকে খুব শ্বাসকষ্ট হতো। কয়েকবার যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল। কুমিল্লার বড় ডাক্তার, এমনকি দু-দু’বার সে তার মাকে ঢাকাতেও নিয়ে গিয়েছিল। একরাতে ঘুমের মধ্যেই তার মা মারা যায়। তখন সে আঁধারিয়া গ্রামে তার বাড়িতেই, মা’র একদম সিথানের কাছে বসেছিল।
রাহেলা খানম মারা যাবার পরই আনিস বাড়িতে আর মন টেকাতে পারেনি। অল্প কয়েক মাসের সিদ্ধান্তে স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেয়। তারপর সরাসরি ঢাকাতে পাড়ি জমায়। ঢাকাতে আসার পর সে যে খুব সুখের দিন কাটাতে শুরু করে, তা নয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার ভেতর হতাশা এসে ভিড় করে। বারবার তার মনে হতে থাকে, সে ঢাকা শহরে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল করেছে। তার তখন কবিতা লিখতে ইচ্ছে করত না। সে কোথাও কবিতা বিষয়ক আলাপ করতে আনন্দ পেতো না। আগে সুন্দর কোনো কিছু দেখে যেমন মুগ্ধ হতো, সেটা সে হতে পারত না। মাস যেতেই একটা সময় সিদ্ধান্ত নেয়, সে গ্রামে ফিরে যাবে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সত্যি সত্যি আনিস তার আঁধারিয়া গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু গ্রামে এসেই তার মনে হয়, ঢাকা শহর তাকে আবার কী এক অমোঘ আকর্ষণে টানছে। সে বুঝতে পারে, ঢাকা শহরের ভেতর অদ্ভুত এক মোহ আছে। এত যে ব্যস্ত জীবন, এত যে যানজট, নোংরা, ধূলি উড়ছে সর্বত্র, ভাঙারির আখড়া, তারপরও যেন কী এক মায়ায় টানছে তাকে। জীবন বিধ্বস্ত করে, কিন্তু শহরটকে ছেড়ে যাওয়া যায় না। ফিরে আসতে হয় বারবার।
এভাবে দেড়টি বছর হয়ে যায়। আনিস থেকে যায় ঢাকা শহরের মাটি কামড়ে। আজকাল সে গ্রামে আসে ঠিকই, কিন্তু সে আসে অতিথি হয়ে। কয়েকদিন থাকে, জমিজমার ভাগচাষ ও টাকা পয়সার হিসেব করে। আবার ফিরে যায় সেই ঢাকা শহরে।
আনিস এসব চিন্তার মধ্যেই না থেমে মোটর সাইকেল নিয়ে মীরবহরি বাজার পেরিয়ে আঁধারিয়া গ্রামে ঢুকে গেল। মাটি বসে গেলেও রাস্তাটা এখনও সমতল নয়। তাই সে মোটর সাইকেলে ঝাঁকুনি খাচ্ছে বেশি। তারপরও এই পথটা ধরে তার গ্রামে ঢুকতে বেশ ভালো লাগছে। তাদের এই ভাটি অঞ্চলের কয়েকটা গ্রাম এই রাস্তাটার কারণে সত্যি অনেক এগিয়ে যাবে। মানুষের জীবনব্যবস্থার অনেক উন্নত হবে। রাস্তা যত উঁচু করে করা হচ্ছে, এতে বর্ষার মওসুমে রাস্তাটা আর জোয়ারের জলে ঢুবে যাবে না। রাস্তাটা ধরে ভাটি অঞ্চলের গ্রামগুলোতে মানুষজনের চলাচলের কোনো অসুবিধা হবে না। তখন গ্রামের মানুষের নৌকার ব্যবহার করবে শুধুমাত্র মাছ ধরা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য।
আঁধারিয়া গ্রামে নতুন রাস্তা থেকে এখনও কোনো পথ কোনো বাড়ি বা পাড়ার দিকে নেমে যায়নি। জমির সরু আইল ধরে যেতে হয়। হয়তো রাস্তাটা পুরোপুরি হয়ে গেলে বিভিন্ন পাড়ার দিকে মাটির পথগুলো ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বা মেম্বররাই করে দিবে। এই ছোট ছোট পথ তৈরি করার কাজ সাধারণত গ্রামের লোকজন কাজের বিনিময়ে খাদ্যে বা কাবিখা’র মাধ্যমে করে দেয়।
আনিসের মোটর সাইকেলটা গোত্তা মেরে জমির আইলে নেমে এল। তাদের বাড়িটা নতুন রাস্তা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বড়জোর আধা কিলোমিটার হবে। নতুন রাস্তা থেকেই তাদের টিনশেড দালানটা গাছের ফাঁক থেকে উঁকি মারতে দেখা যায়। সে সেদিকে তাকাল। এবার সে ঠিক দুই মাস পর এল। আগে মাসে একবার হলেও এসেছে। এবারই দেরি হলো।
আনিস বেশিক্ষণ দূরে তাকিয়ে থাকতে পারল না। জমির আইলটা অত্যধিক সরু বলে মোটর সাইকেলটা সে ঠিকমতো চালাতে পারছিল না। বারবার চাকা আইল ছেড়ে জমিতে নেমে যাচ্ছিল। তারপরও সে আস্তে আস্তে আরও কিছুক্ষণ চালাল।
ক্ষেতের আইলের দু-ধারে বিস্তীর্ণ সরিষার ক্ষেত। হলুদ ফুল ফুটেছে। হলুদ ফুলের ওপর উত্তরের মৃদুমন্দ বাতাস হিল্লোল তুলছে। দৃষ্টি আটকে যাওয়ার মতো হিল্লোল। যেন কোনো শ্যামলা যুবতী হলুদ শাড়ি পরে নাচের তরঙ্গ তুলছে। কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছে দেখতে। এই নৃত্যের লহরি দেখে আনিসের তখনই সেতারা বেগমের কথা মনে পড়ে গেল। আর ঠিক তখনই তার মোটর সাইকেলটা ক্ষেতের আইল ছেড়ে সরিষার খেতে নেমে গেল। সে লাফ দিয়ে মোটর সাইকেল থেকে নেমে গেল। মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল সঙ্গে সঙ্গে।
সেতারা বেগম মারা গেছে আড়াই বছরের ওপরে হয়ে গেল। আনিস হিসেব করে দেখল, প্রায় দুই বছর সাত মাস। সে সেতারা বেগমকে নিয়ে ঠিক ভাবতে চায় না, তারপরও তার ভাবনার ভেতর মনের অজান্তে সেতারা বেগমের চেহারাটা চলে আসে। এখনও ঠিক সেভাবেই চলে এল।
আনিসের মনে পড়ল, বছর চারেক আগে এমনই এই শীতের সকালে সে সেতারা বেগমকে এই সরিষার ক্ষেতের আইলে দেখতে পায়। পরনে হলুদ শাড়ি। খোলা চুল। চুলগুলো উড়ছিল উত্তরের হাওয়ায়। সেদিন সকালে সে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে মীরবহরি বাজারে গিয়েছিল। মীরবহরি বাজারে মিষ্টির দোকানের যোগেশ পোদ্দার সকালবেলায় গরম গরম জিলাপি ভাজে। গুড়ের জিলাপি। ছোটবেলায় মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসাযাওয়ার পথে সে সেই মিষ্টান্নভাণ্ডারে জিলাপি খেতে যেত। শুধু জিলাপি না, গজা, নিমকি, কখনও আস্ত একটা রসগোল্লা। সে অনুতপুর স্কুল পড়ানোর সময় বাড়ি এলেও মাঝেমধ্যে যোগেশ পোদ্দারের মিষ্টান্নভাণ্ডারে গরম গরম জিলাপি খেতে যেত। কাগজের ঠোঙায় করে তার মা’র জন্য নিয়ে আসত। যদিও তার মা জিলাপি থাক দূরের কথা সাধারণ খাবারটাই ঠিকমতো খেতে পারত না। মুখের অর্ধেকাংশ বেঁকে গিয়েছিল। তারপরও জিলাপি আনলে মা বেশ খুশি হতো।
আনিস সেই সকালেও যোগেশ পোদ্দারের দোকান থেকে মা’র জন্য ঠোঙায় গরম জিলাপি নিয়ে বাড়ি ফিরছিল আর আনমনে নতুন একটা কবিতার ছন্দ সাজাচ্ছিল। ঠিক তখনই সেতারা বেগম ডেকে ওঠে, ‘এই আনিস ভাই।’
আনিস সেতারা বেগমকে খেয়াল করেনি। এমন সময় সেতারা বেগম সরিষা ক্ষেতে থাকবে, সেটাও সে ভাবেনি। সে কিছুটা চমকে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণই সামলে উঠে হাসে।
সেতারা বেগম জিজ্ঞেস করে, ‘আনিস ভাই, এই সক্কালবেলা কই থাইকা ফিরতাছেন?’
আনিস বলে, ‘মীরবহরি বাজারে গিয়েছিলাম। তুমি এখানে?’
‘হ, সইরষা ফুল তুলতে আইছিলাম, বাড়িত নিয়া বড়া বানাইমু। আপনে খাইতে আইবেন?
‘আসব না হয়। সরিষা ফুলের বড়া আমার খুব পছন্দ।’
‘আইচ্ছা, সইন্ধ্যাবেলা আইসেন। আমি রাইখা দিমু। আপনের হাতের ঠোঙায় কী অইডা?’
‘জিলাপি। যোগেশ পোদ্দারে দোকানের।’
‘কন কী, জিলাপি! কতদিন জিলাপি খাই না’— বলেই সেতারা বেগম খলবল হেসে কিছুটা হামলে পড়ে ঠোঙাটা খাবলে নেয়।
সেতারা বেগমের এই আচরণে আনিস ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। চারিদিকে বুইদ্দার বিল ভরতি কামলারা কাজ করছিল। কেউ কেউ ক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছিল, কেউ কেউ বাজারে বিক্রি করবে বলে শাকসবজি তুলছিল। এদের বেশিরভাগই আঁধারিয়া গ্রামের। সে খুব অপ্রস্তুত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকায়। এছাড়া সে ভাবেনি, সেতারা বেগম হঠাৎ এভাবে জিলাপি ঠোঙাটা খাবলে নিবে। তাই সে বিব্রত হয়ে বলে বসে, ‘এই, এই, এটা কী ধরনের কাজ করলে, হ্যাঁ? এমন হাতাহাতি করলে কেন?
সেতারা বেগম হাসে— হিহি, হিহি।
সেতারা বেগমের হাসি দেখে আনিসের আরও গা জ্বলে যায়। সে ধমক দিয়ে বলে, ‘এমনে হাসবে না। আর এধরনের কাজ কখনও করবে না। দেখ না, বুইদ্দার বিল ভরতি ক্ষেতকামলারা তাকিয়ে আছে। দাও, আমার ঠোঙাটা দাও।’
সেতারা বেগম হয়তো আনিসের কাছ থেকে এমনটা আশা করেনি। তাই সে প্রথমে থতমত খেয়ে যায় হাসি থামিয়ে ফেলে। পরক্ষণ চেহারাটা কালো করে জিলাপির ঠোঙাটা আনিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
আনিসের মনে আছে, এরপর সেতারা বেগম পুরো দুই সপ্তাহ তার সঙ্গে কথা বলেনি। বেশ অভিমান করেছিল। কাছে পর্যন্ত ভিড়তে দেয়নি। তাকে মানাতে কয়েকবার সে ওই বাড়িতে গিয়েছিল। এক সন্ধ্যায় যোগেশ পোদ্দারের দোকান থেকে বড় এক ঠোঙায় গুড়ের জিলাপি কিনে নিয়ে তার অভিমান ভাঙায়।
আনিস ভাবল, সময় কত দ্রুত চলে যায়। চারটি বছর...! ঢাকার চিলেকোঠায় সে এখনও সেতারা বেগমকে নিয়ে ভাবতে বসে কবিতা লিখে। কিন্তু সেই কবিতা আর প্রেমের কবিতা হয় না। কোনো গ্রাম্যমিথ টেনে আনে না সে। থাকে না উত্তরের সরিষা ক্ষেতের হিল্লোল, বুইদ্দার বিলের সিঁথিকাটা ঢেউ বা গোমতী নদীর কলতান। সে আজকাল তাকে নিয়ে লিখতে বসে পরাবাস্তবতার কবিতা লিখে।
আনিস মনসুর পাগলাকে নিয়েও ভাবে। তার জন্য সে শুরু থেকেই একজন উকিল রেখেছে। উকিলের টাকাপয়সা সে নিজেই দেয়। কিন্তু কয়েকবার কোর্টে তোলার পরও তার জামিন হয়নি। আদালতের আদেশে সে জেলে আছে। তার বিরুদ্ধে এখনও নাকি তদন্ত চলছে।
আনিস একবার মনসুর পাগলাকে দেখতে জেলে গিয়েছিল। জেলে সে তার খানিকটা পরিবর্তন দেখেছে। সেই পরিবর্তন ভালো না খারাপ, সে ঠিক বুঝতে পারেনি। মনসুর পাগলা তার সঙ্গে সেদিন একটা কথাও বলেনি, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল। তার সেই তাকানো ছিল ভয়ের।
আনিসের মনে হয়েছিল, মনসুর পাগলা যেন বিদীর্ণ দৃষ্টিতে তার ভেতরটা ছেদ করে সেতারা বেগমকে খুঁজছে! তার এমনটা কেন মনে হয়েছিল, সে জানে না। তার জানামতে মনসুর পাগলা কখনই সেতারা বেগমের সঙ্গে তাকে দেখেনি। সে মনসুর পাগলার পুনোয়ারা মস্তানের দরগার অবস্থান জেনেই সেতারা বেগমের সঙ্গে মিলিত হতো।
আনিস এরপর আর জেলখানায় কখনও যায়নি। কিন্তু মনসুর পাগলার কেস লড়তে উকিলের টাকাটা ঠিকই দিয়ে আসছে।
আনিস আর মোটর সাইকেলের ওপর বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো না। সে ক্ষেতের আইল ধরে ঠেলে ঠেলেই বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করল। এখন সরিষার ক্ষেত পেছনে পড়ে গেছে। তার দু’পাশে এখন বাঁধাকপি ও ফুলকপির ক্ষেত। খানিকটা দূরে ক্ষীরা ক্ষেতে। ক্ষীরাই গাছে হলুদ ফুল আর কচি কচি ক্ষীরা এসেছে। তার কচি ক্ষীরা খেতে খুব পছন্দ। সে দিঘল দৃষ্টিতে সেদিকে তাকালেও ক্ষীরা ক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেল না।
আনিস মোটর সাইকেলটা ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে তাদের বাড়ি ঘেঁষা বুইদ্দার খালের কাছাকাছি চলে এল। খালটা এখন অবশ্য শুকনো। মানুষজন এখন খালের ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হতে পারে। যদিও ভুঁইয়াবাড়ি থেকে বুইদ্দার বিলে আসতে-যেতে একটা কাঠের পুল আছে, কিন্তু পুলটার মাঝখানে কাঠ উঠে গেছে।
আনিস দৃষ্টি বাড়াতেই দেখল, তাদের বছরবাঁধা কামলা বশির বাইর বাড়িতে বিচুলি কেটে গরুগুলোকে খাওয়াচ্ছে।
আনিসকে দেখেই বশির খালের ভেতর দিয়ে দৌড়ে এল। বলল, ‘ভাইজান, আইছেন। ভালা হইছে। আমি আপনের অপেক্ষাই করতে ছিলাম।’
আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, গতকাল তোর ফোন পেয়েই তো আজ সকাল-সকাল আসলাম। এক কাজ কর, মোটর সাইকেলটা ঠেলে খালটা পার কর। বিলের আধাআধি থেকে টেনে নিয়ে এসেছি।’
‘কী হইছে, হোন্ডা নষ্ট হইয়া গেছে?’
‘না, নষ্ট হয়নি।’
‘তাইলে?’
‘তোরে যেটা করতে বলছি সেটা কর। এত প্রশ্ন করবি না।’
‘জি, ভাইজান।’ু বলেই বশির আনিসের কাছ থেকে মোটর সাইকেলটা নিয়ে খালের ভেতর দিয়ে ঠেলতে শুরু করল। খালের ভেতরটা শুকনো হলেও এবড়োথেবড়ো ছোট ছোট খাদ আছে। তারপরও বশিরের মোটর সাইকেলটা খালের ভেতর দিয়ে পাড়ে ঠেলে তুলতে কোনো সমস্যা হলো না।
আনিস পাশাপাশি আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার খুলে বল, কী হয়েছে?’
বশির মোটর সাইকেলটা বারান্দার একপাশে দাঁড়া করিয়ে একটা ভারি শ্বাস ফেলে বলল, ভাইজান, আপনাগো দক্ষিণের বড় জমিটায় উত্তর পাড়ার রমজান আলী যে বর্গায় বান্ধাকপি চাষ করছে না, হেয় মিছা কথা কইতাছে।
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘কী মিথ্যা কথা?’
‘হেয় ক্ষেত থাইকা অর্ধেক বান্ধাকপি তুইলা নিয়া মীরবহরি হাটে বেইচা অখন আমারে দেড় হাজার ট্যাকা দিছে। কইতাছে, বান্ধাকপির ভিতরে নাকি পোকা আছিল। হের লাইগা নাকি সস্তায় বেচতে হইছে।’
‘তাই নাকি?’
‘হ, ভাইজান।’
‘তয় রমজান আলীর মিথ্যা কথাটা কী?’
‘আমি মীরবহরি বাজারে পরদিন খবর নিয়া জানতে পারছি, হেয় বারো হাজার ট্যাকার বান্ধাকপি বেচছে।’
‘বলিস কী? রমজান আলী এতবড় মিথ্যা কথা বলল?’
‘হ ভাইজান। আমি যখন রমজান আলীরে হেই কথা জিগাইছি, হেয় স্বীকারই করে নাই। উলটা আমার ওপর ক্ষেইপা গেছে। পরে দিশা না পাইয়া আপনেরে আইতে কইলাম।’
‘আমাকে আসতে বলেছিস, ভালো করেছিস। আমি এমনিতেই আসতাম। দেখি, একটু পরে রমজান আলীর বাড়িতে যাব। তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করব।’
বশির মিয়া বলল, ‘ভাইজান, আপনে হের বাড়িত যাইবেন ক্যান? আমি ডাইকা নিয়া আসমু। আপনে ঢাকা থাইকা আইছেন। একটু জিরান।’
আনিস মৃদু হেসে বলল, ‘ঠিক আছে, বশির। তুই যা, রমজান আলীকে ডেকে নিয়ে আস।’
বশির মিয়া বলল, ‘জে ভাইজান।’ু বলেই সে উত্তর পাড়ার দিকে হাঁটা ধরল।
আনিস বশিরের গমনপথের দিকে তাকিয়ে তাদের দিঘল বারান্দায় একটা চেয়ার টেনে বসল। সে খুব ক্লান্ত, তা নয়। খুব সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছে বলে রাস্তাঘাটে যানজট কম ছিল। সে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই চলে এসেছে। যানজট থাকলে সাধারণত দুই থেকে আড়াইঘণ্টা লাগে। কখনও কখনও আরও বেশি সময়ও লেগে যায়। বর্ষাকালের চিত্রটা অবশ্য অন্য। ঢাকা শহর থেকে ফিরে উপজেলা সদর থেকে নৌকা নিতে হয় বলে অর্ধেকদিন চলে যায়। তবে এ বছর থেকে তাকে আর উপজেলা সদর থেকে নৌকা নিতে হবে না। মোটর সাইকেলে উঁচু আইল ধরে একেবারে বাড়ির কাছাকাছি চলে আসতে পারবে।
আনিস চেয়ারের পেছনে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বাড়ির এদিকওদিক তাকাল। বশির বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার করে রেখেছে। বেশ বিশ্বস্ত সে। একটু সহজসরল, এই যা। তার ইচ্ছে আছে, বশিরকে একটা বিয়ে করাবে। বাড়ির একপাশে একটা ঘর তুলে দিবে। সে জানে, তার আর ঢাকা শহর ছাড়া হবে না। গ্রামে স্থায়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা আর মাথায় আসে না।
বাড়িঘর পরিষ্কার হলেও বাড়িটা আনিসের কাছে কেন জানি খালিখালি লাগছে। এটা অবশ্য যতবারই সে বাড়ি আসে, ততবারই তার এরকম খালি লাগে। তাদের বাড়িটা যে কোনোকালে মানুষজনে ভরাট ছিল, তা নয়। ডাঙর হতে না হতেই সে দেখে আসছে, তার মা রাহেলা খানম পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকত। তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া সকাল থেকে রাতের অনেকটা অব্দি মীরবহরি বাজারে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকত। সার-কীটনাশকের দোকান ছিল। ব্যবসা ও টাকাপয়সার প্রতি যতটুকু নেশা ছিল, এর বিন্দুমাত্র নেশা ছিল না ঘরের প্রতি। এমনকি তার প্রতিও না।
সুন্দর ভুঁইয়ার সঙ্গে আনিসের সম্পর্কটা ছিল যোজন যোজন দূরত্বের। অথচ একই বাড়িতে তাদের বসবাস ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে, তার বাবা যখন বাড়ি ফিরত, তখন সে বিছানায়, ঘুমের অতলে। আবার সকালে যখন দোকানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যেত তখনও সে ঘুমে। দিনের বেলায় খুব কমই তাদের দেখা হতো। আনিস পারতে দোকানে যেত না। তার দোকানে যেত ভালোও লাগত না। এছাড়া তার দোকানে যাওয়াটা তার বাবা মনে হয় পছন্দও করত না।
আনিসের মাঝেমধ্যে মনে হতো, তার বাবা সংসারের প্রতি বিরক্ত হয়ে ইচ্ছে করেই যেন সারাদিন দোকানে পড়ে থাকত। তার মা’র সঙ্গে তার বাবাকে কখনও হেসে কথা বলতে দেখেনি। এক খাটে ঘুমাত না। একসময় মারত, কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পর আর মারেনি। আর মারবে কী, তার মা’র রাহেলা খানমের উচ্চবাচ্য করার ক্ষমতাই ছিল না। দিনের বেশিরভাগ সময় বিছানায় পড়ে থাকত। কখনও চেয়ারে বসানো হলে ঘাড় কাঁত করে চোখ মেলে বসে থাকত। তবে তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া জীবনে দুটো অবাক কাজ করেছে। কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেয়নি। যদিও একবার খবর চাউর হয়েছিল, মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুনকে তার বাবা বিয়ে করতে যাচ্ছে...। কিন্তু খবরটা খবরই থেকে যায়। বাস্তবে ঘটেনি। তার বাবার দ্বিতীয় কাজ ছিল, সংসারের প্রতি টান না থাকলেও বুইদ্দার বিলে বিঘার পর বিঘা জমি কিনে রাখা। বাজারে সার-কীটনাশকের ব্যবসাটাও ধরে রেখেছিল ঠিকমতো।
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আবার দিঘল দৃষ্টি মেলে বাড়ির এদিক-ওদিক তাকাল। সামান্য দূরে গরুগুলো বিছুলি খাচ্ছে শব্দ করে। গাছে অসংখ্য পাখি ডাকছে। দূরে কেউ ক্ষেতে কাজ করতে করতে গান গাচ্ছে। মারফতি গান। বুইদ্দার বিলের বিস্তীর্ণ হলুদ ফুল ফোঁটা সরিষা ক্ষেতকে দূর থেকে আরও অপূর্ব লাগছে। সকালের স্নিগ্ধতা তখনও। হলুদ রোদে একটু একটু শীতও লাগছে।
আনিস ভাবল, তার এই হাহাকার আর কিছুর জন্য নয়, তার মা’র জন্য। অনুতপুর স্কুলে যখন সে পড়াত, তখনও মা’র টানে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে চলে আসত। এই পৃথিবীতে তার মা’টাই ছিল তার সবচেয়ে আপন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল। তার মা’র মাথাটাও মাঝেমধ্যে ঠিকমতো কাজ করত না। তারপরও তাকে পেলে বাম হাতে পিঠ মুছত আর হাসত, মাথা মুছত, গালে স্পর্শ করে কেঁদে ফেলত। সহজে মুখে কিছু বলত না। এখনও সে মা’র টানেই বাড়িতে আসে। মা নেই, কিন্তু সে একদঙ্গল হাহাকার নিয়ে ঢাকায় ফিরে যায়...!
আনিসের ফোনটা বেজে উঠল। সে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনে দেখল, এডভোকেট আতিকুল হকের ফোন। এডভোকেট আতিকুল হক মাঝেমধ্যেই তাকে ফোন দেয়। মনসুর পাগলার কেসের অগ্রগতি জানায়। টাকাপয়সার প্রয়োজন হলে চেয়ে নেয়।
আনিস হ্যালো বলল। ওপাশ থেকে এডভোকেট আতিকুল হকের উচ্ছ্বাসের গলা ভেসে এল, ‘আনিস সাহেব, একটা সুখবর আছে।’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কী সুখবর?’
এডভোকেট আতিকুল হক বললেন, ‘মনসুর আলীর জামিন মঞ্জুর হয়েছে।’ ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন