‘ঝগড়া’ এবং ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ গল্পের প্রয়োগধর্মী পাঠ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ গল্পে আখ্যানের নির্মাণ, পুনরাবৃত্তি, পুরাণ-ইঙ্গিত, বাস্তবতা ও অবাস্তবতার মিশ্রণ এবং সামাজিক ব্যঙ্গ অসাধারণ ভঙ্গিতে নির্মিত হয়েছে বলে স্বীকৃত। রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজম, দুটো পদ্ধতি প্রয়োগ করে গল্পটা পাঠ করতে চাই। এটি ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে (অন্যপ্রকাশ, ২০০৫)। একইসঙ্গে পাঠ করতে চাই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝগড়া’ গল্পটিও (‘বিভূতিভূষণ গল্পসমগ্র’, কলকাতা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.)
রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজমের মৌল ধারণাগুলো আমরা আলোচনা করেছি। এবার দেখা যাক, বাস্তবে উল্লিখিত দুটি গল্পকে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। বলে রাখা ভালো, দুটি গল্প ভিন্ন সময়ে লেখা এবং ভিন্ন প্রকৃতির; বিষয় ও আঙ্গিক আলাদা। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে হলে শুধু ‘কী ঘটেছে’ জানলেই যথেষ্ট নয়; দেখতে হবে কীভাবে ঘটনাগুলো বলা হয়েছে, কীভাবে চরিত্র ও দৃশ্য সাজানো হয়েছে, কোন শব্দ বা চিত্রকল্প পুনরাবৃত্ত হয়েছে এবং গল্পের বিভিন্ন উপাদান কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝগড়া’: ফরমালিস্ট পাঠ
‘ঝগড়া’ গল্পের কেন্দ্রে আছেন কেশব গাঙ্গুলী, অবসরপ্রাপ্ত এক দরিদ্র বৃদ্ধ। তিনি সংসারের ভেতর ক্রমশ একা হয়ে পড়েছেন। গল্পের সূচনাতেই তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে বিরোধ এবং নিজের প্রতি অবহেলার দৃশ্য এবং ভিন্ন রকম কষ্টকর অনুভূতি সামনে আসে। একটা দৃশ্যপটে আমরা চোখ বোলাতে পারি।
“স্ত্রী মুক্তকেশী বললে— অমন আপদ থাকলেও যা, না-থাকলেও তা।
কেশব গাঙ্গুলী রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললেন, আমি তোদের ভাত আর খাব না— চললাম।
মুক্তকেশী ও ছোটো মেয়ে ময়না একসঙ্গে বলে উঠল— যাও ন— যাও।
ময়না বললে— আর বাড়ি ঢুকো না। মনে থাকে যেন।
শুনে বিশ্বাস হবে না জানি, কিন্তু একেবারে নির্জলা সত্যি। আপন মেয়ে বুড়ো বাবাকে ছাতি তুলে মারতে যায়!
কেশব গাঙ্গুলী রাত্রে বাইরের ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে শুয়ে রইলেন। কেউ এসে খেতে ডাকলে না— মাও না, মেয়েরাও না। সত্যিই কেউ ডাকতে আসবে না, এটা কেশব বুঝতে পারেননি, ধারণা করতে পারেননি। তাই ঘটে গেল অবশেষে। না খেয়ে সমস্ত রাত কাটল কেশব গাঙ্গুলীর— নিজের পৈতৃক ভিটেতে, স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমানে। উঃ, এ কথা ভাবতে পারা যায়?
কেশব গাঙ্গুলী সত্যি কখনো ভাবেননি যে, এতটা তিনি হেনস্থার পাত্র তাঁর সংসারে। মেয়েরা বা স্ত্রী তাঁকে কেউ ভালোবাসে না, এ তিনি অনেকদিন থেকেই জানেন। কিন্তু তার বহর যে এতটা, তা তিনি ধারণা করবেন কীভাবে?
ক্ষুধায় ও মশার কামড়ের যন্ত্রণায় সারারাত কেটে গেল ছটফট করে।...”
কেশব গাঙ্গুলীর এই দুঃখের সামাজিক কারণ কী?
কেন প্রিয়জনেরা তাকে অপমান করেছে?
রুশ ফরমালিস্টের কাছে দুটোই প্রথম প্রশ্ন হবে না। বরং প্রশ্ন হবে, এই দুঃখকে লেখক কীভাবে গল্পে রূপ দিয়েছেন? এখানেই ‘ঝগড়া’ গল্পের নির্মাণশৈলী লক্ষ করার মতো। গল্পের ঘটনাগুলো মোটামুটি সরল কালক্রম অনুসরণ করলেও লেখক বর্তমানের সঙ্গে অতীতকে পাশাপাশি এনে কেশবের জীবনের দুই সময়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। বর্তমানের বৃদ্ধ কেশব এবং অতীতের তরুণ কেশব; দুই অবস্থানের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য।
একসময় যে মানুষটির সামনে ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, বর্তমানে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফলে গল্পের নির্মাণে শুধু ঘটনা নয়, সময়ের ব্যবধানও অনন্য শিল্পকৌশলে পরিণত হয়েছে। ফরমালিস্ট পাঠে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো, ‘অতীত’ এখানে শুধুমাত্র তথ্যবহ নয়; বর্তমানের অনুভূতিকে তীব্র করার জন্য ব্যবহৃত এক নির্মাণকৌশল।
পুনরাবৃত্তি ও মোটিফ: গল্পের নামই ‘ঝগড়া’। ঝগড়া এখানে এক ধরনের মোটিফ বা বারবার ফিরে আসা বিশেষ ধারণা চিত্র। ফলে প্রথম থেকেই পাঠকের দৃষ্টি আটকে যায় সংঘাতের দিকে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, বোঝা যায়, ঝগড়া শুধু পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক বিরোধ নয়; ধীরে ধীরে কেশবের সমগ্র জীবন-অভিজ্ঞতার এক মোটিফে পরিণত হয়। সংসারের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া, আপনজনের সঙ্গে দূরত্ব, নিজের অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে অদৃশ্য সংঘাত, সব মিলিয়ে ‘ঝগড়া’ নির্দিষ্ট টুকরো ঘটনা থেকে বিস্তৃত হয়ে জীবনের এক বিশাল অস্তিত্বের ঘোষণা দেয়। ফরমালিস্ট পাঠ এখানে দেখবে, কীভাবে কোনো সাধারণ শব্দ গল্পের বিভিন্ন স্তরে পুনরাবৃত্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিল্প-উপাদানে পরিণত হয়েছে।
স্থান ও স্মৃতির সম্পর্ক: গল্পের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকৌশল হলো স্থানকে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা। স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, গাছ কিংবা পুরোনো পরিচিত পরিবেশ কেবল পটভূমি নয়; এসব কেশবের অতীতকে বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনে।
বিশেষ করে পুরোনো পরিবেশে ফিরে এসে কেশবের নিজের তরুণ বয়সকে স্মরণ করার মুহূর্তটা লক্ষণীয়। বর্তমানের বৃদ্ধ মানুষটি মুহূর্তের জন্য অতীতের তরুণ হয়ে যান। অর্থাৎ এখানে স্থান, স্মৃতি, অতীত, বর্তমান— এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গল্পের আবেগ তৈরি হয়েছে। ফরমালিস্ট বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, এই নির্মাণের মধ্য দিয়ে গল্পের মোটিফগুলোর পারস্পরিক বিন্যাস সুসজ্জিত হয়েছে।
অচেনাকরণ: ‘ঝগড়া’ গল্পে অচেনাকরণ সরাসরি চমকপ্রদ ভাষার মাধ্যমে নয়; বরং পরিচিত জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখানোর বা চেনা বিষয়কে অচেনা করে কাজ করে। বৃদ্ধ বয়সে সংসারের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্কটা বেশ পরিচিত অভিজ্ঞতা। কিন্তু বিভূতিভূষণ সেই পরিচিত অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে নির্মাণ করলেন যে পাঠক কেবল এক বৃদ্ধের পারিবারিক অশান্তি দেখেন না; দেখতে পায় হারিয়ে যাওয়া যৌবন, অপূর্ণতা, একাকীত্ব এবং জীবনের ক্ষয়। তাই পরিচিত ‘সংসার’ গল্পের শিল্পরূপে অপরিচিত ও নতুন হয়ে ওঠে।
‘ঝগড়া’: নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ: এবার একই গল্পকে নিউ ক্রিটিসিজমের আলোকে পড়লে আমাদের দৃষ্টি আরও নিবিড়ভাবে গল্পের ভেতরের শব্দ, বৈপরীত্য, প্রতীক, চিত্রকল্প ও অর্থের আন্তঃসম্পর্কের দিকে যাবে।
বর্তমান বনাম অতীত: গল্পটির অন্যতম কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য হলো, তরুণ কেশব বনাম বৃদ্ধ কেশব। একদিকে আশা, শক্তি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ; অন্যদিকে ক্ষয়, একাকীত্ব, অবহেলা ও অতীতের স্মৃতি। এই বৈপরীত্যই গল্পের আবেগ গভীর করে। লেখক সরাসরি ‘জীবন ক্ষণস্থায়ী’ বলেন না; বরং অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি রেখে পাঠককে সেই সত্য অনুভব করান। গল্প পাঠ শেষ হলে পাঠক গতানুগতির জীবনের ভেতর থেকে অন্য আলোর সন্ধান পেয়ে যান; নতুন অনুভবের ঋদ্ধ হন।
পরিবার বনাম একাকীত্ব: আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য হলো, ‘পরিবারের মধ্যে থাকা’ বনাম ‘পরিবারের বাইরের হয়ে যাওয়া’। কেশব শারীরিকভাবে পরিবারের অংশ, কিন্তু মানসিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। ফলে ‘বাড়ি’ শুধু আশ্রয়ের স্থান নয়; একই সঙ্গে তাঁর একাকীত্বের স্থানও হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত অর্থ শুধু গল্পের নান্দনিক শক্তি বাড়ায়নি, সাহিত্যশিল্পও উপহার দিয়েছে।
স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মের তাৎপর্য: স্টেশন চলমান জগতের প্রতীকী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়; মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। অথচ কেশবের জীবনে ‘অতীত’ যেন স্থির হয়ে আছে। ফলে স্টেশনকে শুধু বাস্তব স্থান হিসেবে পড়লে গল্পের একটা স্তর পাওয়া যায়; কিন্তু এর সঙ্গে কেশবের জীবন ও স্মৃতির সম্পর্ক বিবেচনা করলে আরেকটা স্তর উন্মোচিত হয়; সূক্ষ্ম বৈপরীত্য তৈরি হয়। তা হলো, পৃথিবী এগিয়ে যায়, মানুষটি স্মৃতির মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে।
নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কেশবের অতীতে ফিরে যাওয়া: গল্পের প্রধান চরিত্রের এই ফিরে যাওয়া শুধু স্মৃতিচারণ নয়; গল্পের কেন্দ্রীয় চিত্রকল্পও। মানুষ বাস্তবে অতীতে ফিরে যেতে পারে না, কিন্তু স্মৃতি তাকে সাময়িকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই অসম্ভব প্রত্যাবর্তনই গল্পে এক ধরনের বিষাদময় সৌন্দর্য তৈরি করে।
অতএব, ‘ঝগড়া’কে শুধু পারিবারিক কলহের গল্প হিসেবে পড়লে তার এক স্তর পাওয়া যায়; কিন্তু গল্পের ভেতরের বৈপরীত্য ও চিত্রকল্পগুলোকে একত্রে পড়লে তা হয়ে ওঠে সময়, বার্ধক্য, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’: ফরমালিস্ট পাঠ: গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে ইমান নামের এক দরিদ্র কিশোর, তার ঘুড়ির প্রতি আকর্ষণ, শ্রমজীবী পরিবেশ এবং এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠা, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
গল্পটির নাম থেকেই ফরমালিস্ট পাঠের প্রথম সূত্র পাওয়া যায়, ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’।
গ্রিক পুরাণের ডিডেলাস এবং ইকারুসের কাহিনির সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্ক তৈরি করে লেখক প্রথমেই আন্তঃপাঠের কাঠামো নির্মাণ করেন। কিন্তু গল্পটা পুরাণের পুনর্কথন নয়; পুরাণের কাঠামোকে বাংলাদেশের দরিদ্র বাস্তবতার মধ্যে নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গল্পের নির্মাণ: গল্পটি সরলরৈখিকভাবে শুধু ইমানের জীবন বয়ান করে যায় না। এর মধ্যে অতীতের ঘটনা, পারিবারিক স্মৃতি, ঘুড়ির ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা এবং বর্তমান ঘটনার স্তর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে গল্পটির ‘ফাবুলা’ এবং ‘সুজে’ এক নয়। ঘটনাগুলো যদি কালানুক্রমে সাজানো হয়, তাহলে এক সরল জীবনকাহিনি পাওয়া যায়। কিন্তু লেখক যেভাবে তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ করেন, তাতে পাঠকের সামনে তৈরি হয় রহস্য, কৌতূহল ও প্রত্যাশা। ফরমালিস্ট বিশ্লেষণে এই তথ্য-প্রদানের কৌশলই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরীতি।
“ইমানের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই দেখে হোসেন মিয়া রাগ দেখালেন খুব, যদিও তার রাগার কোনো কারণ নেই, এমনকি (পৃথিবীতে সত্যধর্ম আছে এটা ধরে নিলেও) রাগার তার অধিকারও নেই। কারণ ইমান তার গ্যারেজের কর্মচারি হলেও আজ ছুটির দিন, তদুপরি সময়টা বিকাল। ছুটির দিন হলেও সকালে ঘণ্টা তিনেক ইমান খেটেছে। তার সঙ্গে কোনো এক সময়ে হোসেন মিয়ার যে মৌখিক চুক্তি হয়েছিল-যা ইমানের ঘুড়িটার মতই পলকা, এবং তার অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা হাড়গুলোর মতই ভঙ্গুর— সে অনুযায়ী এই তিন ঘণ্টার কাজও অতিরিক্ত। কিন্তু ভাই, পৃথিবীতে সত্যধর্ম নাই, সেজন্য অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ইমান পাবে না। বরং তাকে শুনতে হবে, ‘তুই কি একটা বাইচ্চা নাকি যে খালি গুড্ডি উড়াইবি? রাখ। গুড্ডি লাটাই রাখ। হাত লাগা। প্লাসটা খুইজ্যা দে’।”
এই শুরুর শেষ পরিণতি কী?
কীভাবে পাঠকের মনে প্রবল কৌতূহল এবং টানটান রহস্য ঘনীভূত হয়?
গল্পের সরল জীবন কাহিনির শেষাংশ থেকে বোঝা যায়, সত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার উড্ডয়ন ও পতনের সঙ্গে অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কথা।
“...আইনের বন্ধুরা স্বীকার করলেন, দাগী ইমানকে একটা পোঁটলা ছুঁড়ে দিতে গিয়েই বস্তুত আছমা নামের মেয়েটি রেলিং থেকে টলে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। অতএব, সত্যধর্ম দাবি করে, ছেলেটি অন্তত তার দুষ্ট, বিক্ষিপ্ত, বিকৃত অপরাধী মন নিয়ে কিছুদিনের জন্য সমাজের পূতপবিত্র গণ্ডি থেকে দূরে থাকুক।’
ঘুড়ি : পুনরাবৃত্ত মোটিফ: গল্পের কেন্দ্রীয় মোটিফই এই ঘুড়ি। প্রথমে ঘুড়ি আনন্দের প্রতীক। দরিদ্র জীবনের কঠোর বাস্তবতার মধ্যে ইমানের সামান্য মুক্তি প্রকাশ করে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ঘুড়ির অর্থ বদলাতে থাকে। এটি হয়ে ওঠে আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা, ঝুঁকি এবং পতনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ভিন্নধারার চিত্র। অর্থাৎ একটা বস্তু গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। ফরমালিস্ট পাঠে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল কথা কেবল প্রতীকের আভিধানিক অর্থ থেকে আসে না; গল্পের ভেতরে প্রতীকের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার ও অবস্থান তার অর্থ তৈরি করে।
ডিডেলাস ও ইকারুস : আন্তঃপাঠ: গল্পের নাম গ্রিক পুরাণকে সক্রিয় করে। ডিডেলাস নিজের পুত্র ইকারুসকে নিয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য ডানা তৈরি করেছিলেন। সেই পুরাণকাঠামো গল্পে নতুন অর্থ পায়। এখানে প্রশ্ন ওঠে, ইমান কি ইকারুস? সেতু মিয়া কি ডিডেলাস? নাকি পাঠকই পুরাণের এই সম্পর্ক গল্পের ওপর আরোপ করছেন? গল্পের নির্মাণ নিজেই এই প্রশ্নকে উন্মুক্ত রাখে। এমনকি গল্পের ভেতরেই ইঙ্গিত রয়েছে, অশিক্ষিত সেতু মিয়ার আচরণের ওপর শিক্ষিত পাঠক নিজের পুরাণগত ধারণা চাপিয়ে দিতে পারেন। এখানে গল্পের নির্মাণ পাঠককে নিজের ব্যাখ্যা সম্পর্কেও সচেতন করে তোলে।
গল্পের ভেতরে গল্প: সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পকথনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, গল্প বলার ভেতরেই আরেকটা গল্পের জন্ম দেওয়া। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তেও এই প্রবণতা কাজ করেছে। ফলে গল্পের আখ্যান সরল পথে এগোয় না; এক কাহিনির ভেতর অন্য কাহিনি এসে মূল কাহিনির অর্থকে সম্প্রসারিত করে। এখানে ফরমালিস্ট পাঠের প্রশ্ন হবে, কেন এই অতিরিক্ত কাহিনি? কেন এই স্মৃতি? কেন পুরাণের উল্লেখ? কেন গল্পের ঘটনাগুলো এই ক্রমে বলা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গল্পের শিল্পকৌশল ধরা পড়ে।
‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’: নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ: নিউ ক্রিটিসিজমের আলোকে গল্পটি পড়লে কয়েকটা শক্তিশালী বৈপরীত্য সামনে আসে।
ঘুড়ি বনাম মাটি: গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব সম্ভবত, আকাশ বনাম মাটি। ঘুড়ি আকাশে উঠতে চায়; ইমানের জীবন তাকে মাটিতে বেঁধে রাখে। ঘুড়ি উড়ে যাওয়া মানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু ইমানের সামাজিক অবস্থান তাকে শ্রম, দারিদ্র্য ও ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে রাখে। এই দ্বন্দ্ব গল্পের কেন্দ্রীয় নান্দনিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
স্বাধীনতা বনাম নিয়ন্ত্রণ: ইমানের ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ এবং হোসেন মিয়ার কর্তৃত্বের মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়, তা কেবল একজন মালিক ও কর্মচারীর সম্পর্ক নয়; স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বনাম সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গভীর বৈপরীত্য প্রকাশ করে।
ইমানের হাতে ঘুড়ি মানে আকাশের দিকে তাকানো। কিন্তু তার জীবন বাস্তবে অন্যের নির্দেশে পরিচালিত। এই দ্বন্দ্ব গল্পের প্রতিটি স্তরে ফিরে আসে।
উড্ডয়ন বনাম পতন: ডিডেলাস-ইকারুসের পুরাণকে সামনে রেখে ‘উড্ডয়ন’ এবং ‘পতন’ মূলত কেন্দ্রীয় দ্বৈততা তৈরি করে।
উড়ে যাওয়া যেমন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, তেমনি অতিরিক্ত উচ্চতার বিপদও বহন করে। ফলে ঘুড়ি একই সঙ্গে আনন্দ ও বিপদের চিহ্ন।
এখানে নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ দেখবে, গল্পের বিভিন্ন ঘটনা কীভাবে এই দ্বৈততার চারপাশে সংগঠিত হয়েছে।
সত্য বনাম সামাজিক সত্য: গল্পের আরেকটা বৈপরীত্য হলো, যা সত্যিই ঘটেছে বনাম সমাজ যাকে সত্য বলে গ্রহণ করে। ইমান কোনো অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া তাকে নিরাপদ করে না। বরং সামাজিক ও ক্ষমতার কাঠামো শেষ পর্যন্ত সত্যের অর্থ বদলে দিতে পারে। এখানে শুধু বালকের বিপদের গল্প নয়; সত্য কীভাবে ক্ষমতার দ্বারা নির্মিত হতে পারে, সেই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়।
নামের তাৎপর্য: ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ নামটাও নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ‘ঘুড়ি’ হলে গল্পের অর্থ এক ধরনের বাস্তব ও প্রতীকী সীমায় থাকত। কিন্তু ‘ডিডেলাস’ শব্দ যুক্ত হওয়ায় ঘুড়ি পুরাণের পরিসর পায়। দেশজ এক বস্তু, ঘুড়ি কী অসামান্য দক্ষতায় পরিচিত বিশ্বজনীন পুরাণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা দেখার সুযোগ ঘটে এই গল্পের মধ্য দিয়ে। ফলে গল্পের স্থানীয় বাস্তবতা এবং বিশ্বসাহিত্যের পুরাণ একই নান্দনিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে।
দুটি গল্পের তুলনামূলক পাঠ: এখন দেখা যাক, একই ফরমালিস্ট ও নিউ ক্রিটিক্যাল পদ্ধতি প্রয়োগ করেও দুটি গল্প থেকে কীভাবে ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ‘ঝগড়া’তে প্রধান শিল্পকেন্দ্র হলো স্মৃতি, সময়, বার্ধক্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং অতীত-বর্তমানের বৈপরীত্য। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তে প্রধান শিল্পকেন্দ্র হলো ঘুড়ি, আকাশ-মাটি, স্বাধীনতা-নিয়ন্ত্রণ, উড্ডয়ন-পতন এবং সত্য-ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ফরমালিস্ট পাঠে, ‘ঝগড়া’র ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করি, স্মৃতির বিন্যাস, অতীত ও বর্তমানের বিনিময়, স্থান ও সময়ের ব্যবহার এবং ‘ঝগড়া’ মোটিফের পুনরাবৃত্তি। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’র ক্ষেত্রে লক্ষ করি গল্পের ভেতর গল্প, পুরাণের অন্তর্ভুক্তি, তথ্যের ক্রমবিন্যাস, ঘুড়ির পুনরাবৃত্তি এবং আখ্যানের স্তরবিন্যাস।
অন্যদিকে নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে ‘ঝগড়া’তে দেখার সুযোগ পাই যৌবন/বার্ধক্য, পরিবার/একাকীত্ব, অতীত/বর্তমান, চলমান পৃথিবী/স্থির মানুষ। এসব বৈপরীত্য সাহিত্যশিল্পের ঐশ্বর্যও। আবার ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তে পাই আকাশ/মাটি, স্বাধীনতা/নিয়ন্ত্রণ, উড্ডয়ন/পতন, সত্য/ক্ষমতা। এসব বৈপরীত্যও সাহিত্যশস্য উপহার দেয়। এখানে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। একই পদ্ধতি দুটি গল্পে প্রয়োগ করা হলেও ফল এক হয় না। কারণ তত্ত্ব গল্পের অর্থ আগে থেকে নির্ধারণ করে দেয় না; বরং গল্পের নিজস্ব নির্মাণকে পড়ার জন্য একটি দৃষ্টিকোণ তৈরি করে।
এই প্রয়োগ থেকে কী শিক্ষা পাব? : পাঠক কিংবা লেখক হিসেবে দেখব, দুটো গল্পের এই পাঠ সাহিত্য বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় মৌলিক পদ্ধতি শেখায়। কোনো গল্প বিশ্লেষণ করার সময় প্রথমে জানতে হবে, কী বলা হয়েছে? তারপর প্রশ্ন করতে হবে, কীভাবে বলা হয়েছে? আর তার পরের প্রশ্ন, কেন ঠিক এভাবেই বলা হয়েছে? রুশ ফরমালিজম মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে, গল্পের নির্মাণ, কৌশল, বিন্যাস, পুনরাবৃত্তি, অচেনাকরণ ও আখ্যানগত ব্যবস্থার দিকে তাকাতে আমাদের শেখায়। কিন্তু নিউ ক্রিটিসিজম তৃতীয় স্তরে নিয়ে যায়। ভাষা, প্রতীক, বৈপরীত্য, বিদ্রুপ, দ্ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে গল্পের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আবিষ্কার করতে সাহায্য করে। ফলে ‘ঝগড়া’ কেবল একজন বৃদ্ধের পারিবারিক অশান্তির গল্প থাকে না; আর ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ কেবল এক দরিদ্র বালকের ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প থাকে না। শিল্পের নির্মাণ বিশ্লেষণ করলে কাহিনির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থের স্তরগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এটাই রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজমের প্রয়োগধর্মী পাঠের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
গ্রন্থঋণ:
১. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প; ঢাকা, অন্যপ্রকাশ, ২০০৫।
২. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, গল্পসমগ্র; কলকাতা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘ঝগড়া’ এবং ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ গল্পের প্রয়োগধর্মী পাঠ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ গল্পে আখ্যানের নির্মাণ, পুনরাবৃত্তি, পুরাণ-ইঙ্গিত, বাস্তবতা ও অবাস্তবতার মিশ্রণ এবং সামাজিক ব্যঙ্গ অসাধারণ ভঙ্গিতে নির্মিত হয়েছে বলে স্বীকৃত। রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজম, দুটো পদ্ধতি প্রয়োগ করে গল্পটা পাঠ করতে চাই। এটি ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে (অন্যপ্রকাশ, ২০০৫)। একইসঙ্গে পাঠ করতে চাই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝগড়া’ গল্পটিও (‘বিভূতিভূষণ গল্পসমগ্র’, কলকাতা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.)
রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজমের মৌল ধারণাগুলো আমরা আলোচনা করেছি। এবার দেখা যাক, বাস্তবে উল্লিখিত দুটি গল্পকে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। বলে রাখা ভালো, দুটি গল্প ভিন্ন সময়ে লেখা এবং ভিন্ন প্রকৃতির; বিষয় ও আঙ্গিক আলাদা। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে হলে শুধু ‘কী ঘটেছে’ জানলেই যথেষ্ট নয়; দেখতে হবে কীভাবে ঘটনাগুলো বলা হয়েছে, কীভাবে চরিত্র ও দৃশ্য সাজানো হয়েছে, কোন শব্দ বা চিত্রকল্প পুনরাবৃত্ত হয়েছে এবং গল্পের বিভিন্ন উপাদান কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঝগড়া’: ফরমালিস্ট পাঠ
‘ঝগড়া’ গল্পের কেন্দ্রে আছেন কেশব গাঙ্গুলী, অবসরপ্রাপ্ত এক দরিদ্র বৃদ্ধ। তিনি সংসারের ভেতর ক্রমশ একা হয়ে পড়েছেন। গল্পের সূচনাতেই তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে বিরোধ এবং নিজের প্রতি অবহেলার দৃশ্য এবং ভিন্ন রকম কষ্টকর অনুভূতি সামনে আসে। একটা দৃশ্যপটে আমরা চোখ বোলাতে পারি।
“স্ত্রী মুক্তকেশী বললে— অমন আপদ থাকলেও যা, না-থাকলেও তা।
কেশব গাঙ্গুলী রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললেন, আমি তোদের ভাত আর খাব না— চললাম।
মুক্তকেশী ও ছোটো মেয়ে ময়না একসঙ্গে বলে উঠল— যাও ন— যাও।
ময়না বললে— আর বাড়ি ঢুকো না। মনে থাকে যেন।
শুনে বিশ্বাস হবে না জানি, কিন্তু একেবারে নির্জলা সত্যি। আপন মেয়ে বুড়ো বাবাকে ছাতি তুলে মারতে যায়!
কেশব গাঙ্গুলী রাত্রে বাইরের ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে শুয়ে রইলেন। কেউ এসে খেতে ডাকলে না— মাও না, মেয়েরাও না। সত্যিই কেউ ডাকতে আসবে না, এটা কেশব বুঝতে পারেননি, ধারণা করতে পারেননি। তাই ঘটে গেল অবশেষে। না খেয়ে সমস্ত রাত কাটল কেশব গাঙ্গুলীর— নিজের পৈতৃক ভিটেতে, স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমানে। উঃ, এ কথা ভাবতে পারা যায়?
কেশব গাঙ্গুলী সত্যি কখনো ভাবেননি যে, এতটা তিনি হেনস্থার পাত্র তাঁর সংসারে। মেয়েরা বা স্ত্রী তাঁকে কেউ ভালোবাসে না, এ তিনি অনেকদিন থেকেই জানেন। কিন্তু তার বহর যে এতটা, তা তিনি ধারণা করবেন কীভাবে?
ক্ষুধায় ও মশার কামড়ের যন্ত্রণায় সারারাত কেটে গেল ছটফট করে।...”
কেশব গাঙ্গুলীর এই দুঃখের সামাজিক কারণ কী?
কেন প্রিয়জনেরা তাকে অপমান করেছে?
রুশ ফরমালিস্টের কাছে দুটোই প্রথম প্রশ্ন হবে না। বরং প্রশ্ন হবে, এই দুঃখকে লেখক কীভাবে গল্পে রূপ দিয়েছেন? এখানেই ‘ঝগড়া’ গল্পের নির্মাণশৈলী লক্ষ করার মতো। গল্পের ঘটনাগুলো মোটামুটি সরল কালক্রম অনুসরণ করলেও লেখক বর্তমানের সঙ্গে অতীতকে পাশাপাশি এনে কেশবের জীবনের দুই সময়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। বর্তমানের বৃদ্ধ কেশব এবং অতীতের তরুণ কেশব; দুই অবস্থানের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য।
একসময় যে মানুষটির সামনে ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, বর্তমানে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফলে গল্পের নির্মাণে শুধু ঘটনা নয়, সময়ের ব্যবধানও অনন্য শিল্পকৌশলে পরিণত হয়েছে। ফরমালিস্ট পাঠে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো, ‘অতীত’ এখানে শুধুমাত্র তথ্যবহ নয়; বর্তমানের অনুভূতিকে তীব্র করার জন্য ব্যবহৃত এক নির্মাণকৌশল।
পুনরাবৃত্তি ও মোটিফ: গল্পের নামই ‘ঝগড়া’। ঝগড়া এখানে এক ধরনের মোটিফ বা বারবার ফিরে আসা বিশেষ ধারণা চিত্র। ফলে প্রথম থেকেই পাঠকের দৃষ্টি আটকে যায় সংঘাতের দিকে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, বোঝা যায়, ঝগড়া শুধু পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক বিরোধ নয়; ধীরে ধীরে কেশবের সমগ্র জীবন-অভিজ্ঞতার এক মোটিফে পরিণত হয়। সংসারের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া, আপনজনের সঙ্গে দূরত্ব, নিজের অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে অদৃশ্য সংঘাত, সব মিলিয়ে ‘ঝগড়া’ নির্দিষ্ট টুকরো ঘটনা থেকে বিস্তৃত হয়ে জীবনের এক বিশাল অস্তিত্বের ঘোষণা দেয়। ফরমালিস্ট পাঠ এখানে দেখবে, কীভাবে কোনো সাধারণ শব্দ গল্পের বিভিন্ন স্তরে পুনরাবৃত্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিল্প-উপাদানে পরিণত হয়েছে।
স্থান ও স্মৃতির সম্পর্ক: গল্পের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকৌশল হলো স্থানকে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা। স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, গাছ কিংবা পুরোনো পরিচিত পরিবেশ কেবল পটভূমি নয়; এসব কেশবের অতীতকে বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনে।
বিশেষ করে পুরোনো পরিবেশে ফিরে এসে কেশবের নিজের তরুণ বয়সকে স্মরণ করার মুহূর্তটা লক্ষণীয়। বর্তমানের বৃদ্ধ মানুষটি মুহূর্তের জন্য অতীতের তরুণ হয়ে যান। অর্থাৎ এখানে স্থান, স্মৃতি, অতীত, বর্তমান— এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গল্পের আবেগ তৈরি হয়েছে। ফরমালিস্ট বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, এই নির্মাণের মধ্য দিয়ে গল্পের মোটিফগুলোর পারস্পরিক বিন্যাস সুসজ্জিত হয়েছে।
অচেনাকরণ: ‘ঝগড়া’ গল্পে অচেনাকরণ সরাসরি চমকপ্রদ ভাষার মাধ্যমে নয়; বরং পরিচিত জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখানোর বা চেনা বিষয়কে অচেনা করে কাজ করে। বৃদ্ধ বয়সে সংসারের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্কটা বেশ পরিচিত অভিজ্ঞতা। কিন্তু বিভূতিভূষণ সেই পরিচিত অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে নির্মাণ করলেন যে পাঠক কেবল এক বৃদ্ধের পারিবারিক অশান্তি দেখেন না; দেখতে পায় হারিয়ে যাওয়া যৌবন, অপূর্ণতা, একাকীত্ব এবং জীবনের ক্ষয়। তাই পরিচিত ‘সংসার’ গল্পের শিল্পরূপে অপরিচিত ও নতুন হয়ে ওঠে।
‘ঝগড়া’: নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ: এবার একই গল্পকে নিউ ক্রিটিসিজমের আলোকে পড়লে আমাদের দৃষ্টি আরও নিবিড়ভাবে গল্পের ভেতরের শব্দ, বৈপরীত্য, প্রতীক, চিত্রকল্প ও অর্থের আন্তঃসম্পর্কের দিকে যাবে।
বর্তমান বনাম অতীত: গল্পটির অন্যতম কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য হলো, তরুণ কেশব বনাম বৃদ্ধ কেশব। একদিকে আশা, শক্তি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ; অন্যদিকে ক্ষয়, একাকীত্ব, অবহেলা ও অতীতের স্মৃতি। এই বৈপরীত্যই গল্পের আবেগ গভীর করে। লেখক সরাসরি ‘জীবন ক্ষণস্থায়ী’ বলেন না; বরং অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি রেখে পাঠককে সেই সত্য অনুভব করান। গল্প পাঠ শেষ হলে পাঠক গতানুগতির জীবনের ভেতর থেকে অন্য আলোর সন্ধান পেয়ে যান; নতুন অনুভবের ঋদ্ধ হন।
পরিবার বনাম একাকীত্ব: আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য হলো, ‘পরিবারের মধ্যে থাকা’ বনাম ‘পরিবারের বাইরের হয়ে যাওয়া’। কেশব শারীরিকভাবে পরিবারের অংশ, কিন্তু মানসিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। ফলে ‘বাড়ি’ শুধু আশ্রয়ের স্থান নয়; একই সঙ্গে তাঁর একাকীত্বের স্থানও হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত অর্থ শুধু গল্পের নান্দনিক শক্তি বাড়ায়নি, সাহিত্যশিল্পও উপহার দিয়েছে।
স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মের তাৎপর্য: স্টেশন চলমান জগতের প্রতীকী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়; মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। অথচ কেশবের জীবনে ‘অতীত’ যেন স্থির হয়ে আছে। ফলে স্টেশনকে শুধু বাস্তব স্থান হিসেবে পড়লে গল্পের একটা স্তর পাওয়া যায়; কিন্তু এর সঙ্গে কেশবের জীবন ও স্মৃতির সম্পর্ক বিবেচনা করলে আরেকটা স্তর উন্মোচিত হয়; সূক্ষ্ম বৈপরীত্য তৈরি হয়। তা হলো, পৃথিবী এগিয়ে যায়, মানুষটি স্মৃতির মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে।
নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কেশবের অতীতে ফিরে যাওয়া: গল্পের প্রধান চরিত্রের এই ফিরে যাওয়া শুধু স্মৃতিচারণ নয়; গল্পের কেন্দ্রীয় চিত্রকল্পও। মানুষ বাস্তবে অতীতে ফিরে যেতে পারে না, কিন্তু স্মৃতি তাকে সাময়িকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই অসম্ভব প্রত্যাবর্তনই গল্পে এক ধরনের বিষাদময় সৌন্দর্য তৈরি করে।
অতএব, ‘ঝগড়া’কে শুধু পারিবারিক কলহের গল্প হিসেবে পড়লে তার এক স্তর পাওয়া যায়; কিন্তু গল্পের ভেতরের বৈপরীত্য ও চিত্রকল্পগুলোকে একত্রে পড়লে তা হয়ে ওঠে সময়, বার্ধক্য, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’: ফরমালিস্ট পাঠ: গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে ইমান নামের এক দরিদ্র কিশোর, তার ঘুড়ির প্রতি আকর্ষণ, শ্রমজীবী পরিবেশ এবং এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠা, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
গল্পটির নাম থেকেই ফরমালিস্ট পাঠের প্রথম সূত্র পাওয়া যায়, ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’।
গ্রিক পুরাণের ডিডেলাস এবং ইকারুসের কাহিনির সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্ক তৈরি করে লেখক প্রথমেই আন্তঃপাঠের কাঠামো নির্মাণ করেন। কিন্তু গল্পটা পুরাণের পুনর্কথন নয়; পুরাণের কাঠামোকে বাংলাদেশের দরিদ্র বাস্তবতার মধ্যে নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গল্পের নির্মাণ: গল্পটি সরলরৈখিকভাবে শুধু ইমানের জীবন বয়ান করে যায় না। এর মধ্যে অতীতের ঘটনা, পারিবারিক স্মৃতি, ঘুড়ির ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা এবং বর্তমান ঘটনার স্তর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে গল্পটির ‘ফাবুলা’ এবং ‘সুজে’ এক নয়। ঘটনাগুলো যদি কালানুক্রমে সাজানো হয়, তাহলে এক সরল জীবনকাহিনি পাওয়া যায়। কিন্তু লেখক যেভাবে তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ করেন, তাতে পাঠকের সামনে তৈরি হয় রহস্য, কৌতূহল ও প্রত্যাশা। ফরমালিস্ট বিশ্লেষণে এই তথ্য-প্রদানের কৌশলই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরীতি।
“ইমানের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই দেখে হোসেন মিয়া রাগ দেখালেন খুব, যদিও তার রাগার কোনো কারণ নেই, এমনকি (পৃথিবীতে সত্যধর্ম আছে এটা ধরে নিলেও) রাগার তার অধিকারও নেই। কারণ ইমান তার গ্যারেজের কর্মচারি হলেও আজ ছুটির দিন, তদুপরি সময়টা বিকাল। ছুটির দিন হলেও সকালে ঘণ্টা তিনেক ইমান খেটেছে। তার সঙ্গে কোনো এক সময়ে হোসেন মিয়ার যে মৌখিক চুক্তি হয়েছিল-যা ইমানের ঘুড়িটার মতই পলকা, এবং তার অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা হাড়গুলোর মতই ভঙ্গুর— সে অনুযায়ী এই তিন ঘণ্টার কাজও অতিরিক্ত। কিন্তু ভাই, পৃথিবীতে সত্যধর্ম নাই, সেজন্য অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ইমান পাবে না। বরং তাকে শুনতে হবে, ‘তুই কি একটা বাইচ্চা নাকি যে খালি গুড্ডি উড়াইবি? রাখ। গুড্ডি লাটাই রাখ। হাত লাগা। প্লাসটা খুইজ্যা দে’।”
এই শুরুর শেষ পরিণতি কী?
কীভাবে পাঠকের মনে প্রবল কৌতূহল এবং টানটান রহস্য ঘনীভূত হয়?
গল্পের সরল জীবন কাহিনির শেষাংশ থেকে বোঝা যায়, সত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার উড্ডয়ন ও পতনের সঙ্গে অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কথা।
“...আইনের বন্ধুরা স্বীকার করলেন, দাগী ইমানকে একটা পোঁটলা ছুঁড়ে দিতে গিয়েই বস্তুত আছমা নামের মেয়েটি রেলিং থেকে টলে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। অতএব, সত্যধর্ম দাবি করে, ছেলেটি অন্তত তার দুষ্ট, বিক্ষিপ্ত, বিকৃত অপরাধী মন নিয়ে কিছুদিনের জন্য সমাজের পূতপবিত্র গণ্ডি থেকে দূরে থাকুক।’
ঘুড়ি : পুনরাবৃত্ত মোটিফ: গল্পের কেন্দ্রীয় মোটিফই এই ঘুড়ি। প্রথমে ঘুড়ি আনন্দের প্রতীক। দরিদ্র জীবনের কঠোর বাস্তবতার মধ্যে ইমানের সামান্য মুক্তি প্রকাশ করে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ঘুড়ির অর্থ বদলাতে থাকে। এটি হয়ে ওঠে আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা, ঝুঁকি এবং পতনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ভিন্নধারার চিত্র। অর্থাৎ একটা বস্তু গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। ফরমালিস্ট পাঠে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল কথা কেবল প্রতীকের আভিধানিক অর্থ থেকে আসে না; গল্পের ভেতরে প্রতীকের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার ও অবস্থান তার অর্থ তৈরি করে।
ডিডেলাস ও ইকারুস : আন্তঃপাঠ: গল্পের নাম গ্রিক পুরাণকে সক্রিয় করে। ডিডেলাস নিজের পুত্র ইকারুসকে নিয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য ডানা তৈরি করেছিলেন। সেই পুরাণকাঠামো গল্পে নতুন অর্থ পায়। এখানে প্রশ্ন ওঠে, ইমান কি ইকারুস? সেতু মিয়া কি ডিডেলাস? নাকি পাঠকই পুরাণের এই সম্পর্ক গল্পের ওপর আরোপ করছেন? গল্পের নির্মাণ নিজেই এই প্রশ্নকে উন্মুক্ত রাখে। এমনকি গল্পের ভেতরেই ইঙ্গিত রয়েছে, অশিক্ষিত সেতু মিয়ার আচরণের ওপর শিক্ষিত পাঠক নিজের পুরাণগত ধারণা চাপিয়ে দিতে পারেন। এখানে গল্পের নির্মাণ পাঠককে নিজের ব্যাখ্যা সম্পর্কেও সচেতন করে তোলে।
গল্পের ভেতরে গল্প: সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পকথনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, গল্প বলার ভেতরেই আরেকটা গল্পের জন্ম দেওয়া। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তেও এই প্রবণতা কাজ করেছে। ফলে গল্পের আখ্যান সরল পথে এগোয় না; এক কাহিনির ভেতর অন্য কাহিনি এসে মূল কাহিনির অর্থকে সম্প্রসারিত করে। এখানে ফরমালিস্ট পাঠের প্রশ্ন হবে, কেন এই অতিরিক্ত কাহিনি? কেন এই স্মৃতি? কেন পুরাণের উল্লেখ? কেন গল্পের ঘটনাগুলো এই ক্রমে বলা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গল্পের শিল্পকৌশল ধরা পড়ে।
‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’: নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ: নিউ ক্রিটিসিজমের আলোকে গল্পটি পড়লে কয়েকটা শক্তিশালী বৈপরীত্য সামনে আসে।
ঘুড়ি বনাম মাটি: গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব সম্ভবত, আকাশ বনাম মাটি। ঘুড়ি আকাশে উঠতে চায়; ইমানের জীবন তাকে মাটিতে বেঁধে রাখে। ঘুড়ি উড়ে যাওয়া মানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু ইমানের সামাজিক অবস্থান তাকে শ্রম, দারিদ্র্য ও ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে রাখে। এই দ্বন্দ্ব গল্পের কেন্দ্রীয় নান্দনিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
স্বাধীনতা বনাম নিয়ন্ত্রণ: ইমানের ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ এবং হোসেন মিয়ার কর্তৃত্বের মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়, তা কেবল একজন মালিক ও কর্মচারীর সম্পর্ক নয়; স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বনাম সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গভীর বৈপরীত্য প্রকাশ করে।
ইমানের হাতে ঘুড়ি মানে আকাশের দিকে তাকানো। কিন্তু তার জীবন বাস্তবে অন্যের নির্দেশে পরিচালিত। এই দ্বন্দ্ব গল্পের প্রতিটি স্তরে ফিরে আসে।
উড্ডয়ন বনাম পতন: ডিডেলাস-ইকারুসের পুরাণকে সামনে রেখে ‘উড্ডয়ন’ এবং ‘পতন’ মূলত কেন্দ্রীয় দ্বৈততা তৈরি করে।
উড়ে যাওয়া যেমন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, তেমনি অতিরিক্ত উচ্চতার বিপদও বহন করে। ফলে ঘুড়ি একই সঙ্গে আনন্দ ও বিপদের চিহ্ন।
এখানে নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠ দেখবে, গল্পের বিভিন্ন ঘটনা কীভাবে এই দ্বৈততার চারপাশে সংগঠিত হয়েছে।
সত্য বনাম সামাজিক সত্য: গল্পের আরেকটা বৈপরীত্য হলো, যা সত্যিই ঘটেছে বনাম সমাজ যাকে সত্য বলে গ্রহণ করে। ইমান কোনো অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া তাকে নিরাপদ করে না। বরং সামাজিক ও ক্ষমতার কাঠামো শেষ পর্যন্ত সত্যের অর্থ বদলে দিতে পারে। এখানে শুধু বালকের বিপদের গল্প নয়; সত্য কীভাবে ক্ষমতার দ্বারা নির্মিত হতে পারে, সেই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়।
নামের তাৎপর্য: ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ নামটাও নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ‘ঘুড়ি’ হলে গল্পের অর্থ এক ধরনের বাস্তব ও প্রতীকী সীমায় থাকত। কিন্তু ‘ডিডেলাস’ শব্দ যুক্ত হওয়ায় ঘুড়ি পুরাণের পরিসর পায়। দেশজ এক বস্তু, ঘুড়ি কী অসামান্য দক্ষতায় পরিচিত বিশ্বজনীন পুরাণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা দেখার সুযোগ ঘটে এই গল্পের মধ্য দিয়ে। ফলে গল্পের স্থানীয় বাস্তবতা এবং বিশ্বসাহিত্যের পুরাণ একই নান্দনিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে।
দুটি গল্পের তুলনামূলক পাঠ: এখন দেখা যাক, একই ফরমালিস্ট ও নিউ ক্রিটিক্যাল পদ্ধতি প্রয়োগ করেও দুটি গল্প থেকে কীভাবে ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ‘ঝগড়া’তে প্রধান শিল্পকেন্দ্র হলো স্মৃতি, সময়, বার্ধক্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং অতীত-বর্তমানের বৈপরীত্য। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তে প্রধান শিল্পকেন্দ্র হলো ঘুড়ি, আকাশ-মাটি, স্বাধীনতা-নিয়ন্ত্রণ, উড্ডয়ন-পতন এবং সত্য-ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ফরমালিস্ট পাঠে, ‘ঝগড়া’র ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করি, স্মৃতির বিন্যাস, অতীত ও বর্তমানের বিনিময়, স্থান ও সময়ের ব্যবহার এবং ‘ঝগড়া’ মোটিফের পুনরাবৃত্তি। ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’র ক্ষেত্রে লক্ষ করি গল্পের ভেতর গল্প, পুরাণের অন্তর্ভুক্তি, তথ্যের ক্রমবিন্যাস, ঘুড়ির পুনরাবৃত্তি এবং আখ্যানের স্তরবিন্যাস।
অন্যদিকে নিউ ক্রিটিক্যাল পাঠে ‘ঝগড়া’তে দেখার সুযোগ পাই যৌবন/বার্ধক্য, পরিবার/একাকীত্ব, অতীত/বর্তমান, চলমান পৃথিবী/স্থির মানুষ। এসব বৈপরীত্য সাহিত্যশিল্পের ঐশ্বর্যও। আবার ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’তে পাই আকাশ/মাটি, স্বাধীনতা/নিয়ন্ত্রণ, উড্ডয়ন/পতন, সত্য/ক্ষমতা। এসব বৈপরীত্যও সাহিত্যশস্য উপহার দেয়। এখানে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। একই পদ্ধতি দুটি গল্পে প্রয়োগ করা হলেও ফল এক হয় না। কারণ তত্ত্ব গল্পের অর্থ আগে থেকে নির্ধারণ করে দেয় না; বরং গল্পের নিজস্ব নির্মাণকে পড়ার জন্য একটি দৃষ্টিকোণ তৈরি করে।
এই প্রয়োগ থেকে কী শিক্ষা পাব? : পাঠক কিংবা লেখক হিসেবে দেখব, দুটো গল্পের এই পাঠ সাহিত্য বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় মৌলিক পদ্ধতি শেখায়। কোনো গল্প বিশ্লেষণ করার সময় প্রথমে জানতে হবে, কী বলা হয়েছে? তারপর প্রশ্ন করতে হবে, কীভাবে বলা হয়েছে? আর তার পরের প্রশ্ন, কেন ঠিক এভাবেই বলা হয়েছে? রুশ ফরমালিজম মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে, গল্পের নির্মাণ, কৌশল, বিন্যাস, পুনরাবৃত্তি, অচেনাকরণ ও আখ্যানগত ব্যবস্থার দিকে তাকাতে আমাদের শেখায়। কিন্তু নিউ ক্রিটিসিজম তৃতীয় স্তরে নিয়ে যায়। ভাষা, প্রতীক, বৈপরীত্য, বিদ্রুপ, দ্ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে গল্পের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আবিষ্কার করতে সাহায্য করে। ফলে ‘ঝগড়া’ কেবল একজন বৃদ্ধের পারিবারিক অশান্তির গল্প থাকে না; আর ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ কেবল এক দরিদ্র বালকের ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প থাকে না। শিল্পের নির্মাণ বিশ্লেষণ করলে কাহিনির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থের স্তরগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এটাই রুশ ফরমালিজম ও নিউ ক্রিটিসিজমের প্রয়োগধর্মী পাঠের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
গ্রন্থঋণ:
১. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প; ঢাকা, অন্যপ্রকাশ, ২০০৫।
২. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, গল্পসমগ্র; কলকাতা, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.।

আপনার মতামত লিখুন