“আধুনিক ভারতীয় নারীর জন্য শিক্ষাদর্শ” প্রবন্ধটি রোকেয়ার “Educational Ideals for the Modern Indian Girl”-প্রবন্ধের অনুবাদ। প্রবন্ধটি ১৯৩১ সালের ৫ই মার্চ The Muslman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে বিষয়বস্তু ও দর্শন আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের বাস্তবতায় লেখা। প্রবন্ধে তিনি প্রাচীন ভারতের শিক্ষাপদ্ধতির মাহাত্মের কথা বলেছেন। আবার সেসময়ের ব্রহ্মাণ্যবাদি শিক্ষার ‘সন্ন্যাসব্রতকে’ তিনি অতি-উদাসীন হিসেবেও শনাক্ত করেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার অন্ধ-অনুকরণ না করে যুক্তিবিচারসাপেক্ষে তার ইতিবাচক নির্যাস গ্রহণের প্রতিও তিনি মত দিয়েছেন। প্রয়োজনে উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জন্য একটি সাধারণ শিক্ষা প্রণয়নে প্রতি প্রস্তাব করেন। নারী শিক্ষায় ও শিক্ষাচিন্তা সম্পর্কে রোকেয়ার ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় উক্ত প্রবন্ধে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বাংলাভাষী পাঠকের জন্য প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হলো।]
অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে এক বিশেষ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল, যা তার বৈশিষ্ট্য ও আদর্শের দিক থেকে আধুনিক পশ্চিমা ব্যবস্থা অপেক্ষা স্বতন্ত্র ছিলো। এই ব্যবস্থার মধ্যেই ভারত জন্ম দিয়েছে বহু মহান ব্যক্তি ও সত্যের একনিষ্ঠ সত্যানুসন্ধানীর। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা বিকশিত হয়েছিলো ইতিহাসের আদি পর্যায় থেকে ব্যাকরণ ও গণিত বিজ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমে। এসব কিছুই ভারতকে সামর্থ্য জুগিয়েছিল উচ্চতর দর্শন ও অধিবিদ্যার ক্ষেত্রে নিজের মহিমার স্বাক্ষর রাখতে। তবে এটাও সত্য যে, প্রাচীনকালের মানুষের প্রচলিত জীবনযাত্রার মান ও শর্ত অনেকটা বদলে গেছে, পরিবর্তন হয়েছে। ফলে অপরিহার্য কোনো মৌলিক সংস্কার ও পরিবর্তন ছাড়াই প্রাচীন এসব তত্ত্ব ও অনুশীলনকে হুবহু প্রয়োগ করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত কোনো প্রস্তাব হতে পারে না। হ্যাঁ, আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে যেসব মূল্যবান উপকরণ রয়েছে, তাকে খুঁজে নিতে হবে। নতুন কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি পুরনোর সঙ্গেও নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। পুরনো জ্ঞানকাণ্ড ও মূল্যকে আত্মস্থ করতে হবে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বড় ত্রুটি হলো তা বিদেশি অপরিচিত ভূমির ওপর গড়ে ওঠা ব্যবস্থা। কিন্তু ঐ বিদেশি শিক্ষা, তা আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমনকী তা আমাদের জাতীয় ও সংস্কৃতির স্ততন্ত্র ধারাটিকে বিকশিত করতে অক্ষম, অসমর্থ। আমরা যদি এ বিষয়ে সমন্বয়ের নীতি ও আত্মস্থকরণ বজায় রাখতে পারি, তাহলে তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো কল্যাণকর করে তুলতে পারে।
শিক্ষাকে আমরা যদি জীবনের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করি, অথবা জীবন-যাপনের সম্পূর্ণতা হিসেবে চিন্তা করি, তাহলে বলতে হবে যে, প্রাচীন ভারতের শিক্ষাবিদগণ এর একটি সত্য ও মূল্যবান ধারণা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রাচীন শিক্ষা-কারিকুলাম শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বহু বিষয়কে এ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করেছিলো। এ শিক্ষায় শারীরিক বিকাশে প্রাপ্য গুরুত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে। সেই প্রাচীন দিনগুলোতে বিদ্যালয়ের জন্য দালানকোঠার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যায়ের প্রচলন তেমন একটা জানা যায় না। শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হতো ঘরের বাইরে কোনো গাছের ছায়ায়, প্রাকৃতিক পরিবেশে। এই পরিবেশে যা শেখানো হতো, তা মনের গভীরে নিবিড়ভাবে গেঁথে থাকতো। ছাত্রদের জীবন কাটতো সুস্থ কর্মকাণ্ডে। বিশেষ করে তারা শিক্ষকের গৃহ ও মাঠের কাজ করতো। শিক্ষকের গবাদিপশুর দেখাশোনা ও যত্ন নিত, এমনকী শিক্ষকের জন্য মাধুকরীও সংগ্রহে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেতা। একইভাবে নৈতিক শিক্ষা কোনোভাবেই তাচ্ছিল্য করা হতো না। তখনকার ছাত্র জীবন ছিলো কঠিন ও কঠোর শৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত। স্বাস্থ্যবিধি, নৈতিক, ধর্মীয় অনুশাসন, ও সদাচারণের নিয়মাবলি এসব কঠোর নিয়ম-কানুনের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রদের প্রশ্নাতীত আনুগত্য অর্জন করা প্রত্যাশিত একটি বিষয় ছিলো। আর শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য বিস্তারিত নিয়ম-কানুন ছিলো।
আধুনিক যুগের শিক্ষারও দাবি হলো শিক্ষার্থীর সকল বৃত্তির বিকাশ। বিশেষ করে শারীরিক, নৈতিক ও মানসিক বিকাশ। আমাদের দেশের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যা জানি তা হলো— তখন শিক্ষায় এমনসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো, যাতে করে এসব লক্ষ্য অর্জন করা যায়। যখন বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়নি, এমনকী যখন মানুষের অস্তিত্বের সম্ভাবনাগুলো বিজ্ঞানের বদৌলতে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি, সেসময় তারা শিক্ষার এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানের সভ্য ও অগ্রসরমান প্রজন্মকে অবশ্যই ভারতীয় শিক্ষাপদ্ধতির এই মূল্যকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে। আজ আমাদের আধুনিক শিক্ষায়ও প্রাকৃতিক পরিবেশের খোলা হাওয়ায় শিক্ষাদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রদের শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর বহিরাঙ্গন খেলাধুলার পরামর্শ করা হয়েছে, একইসঙ্গে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নৈতিক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা। এভাবেই আমাদের শিক্ষা তার সঠিক ও যথোপযুক্ত পথে অগ্রসর হয়ে আসছে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, শিক্ষার এসব লক্ষ্য হলো প্রাচীন, তথা পুরনো যুগের। আসলে শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা নতুন নতুন চমকপ্রদ ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি না, বরং ঐতিহ্যিক ও প্রাচীন ব্যবস্থাকেই আমরা বিংশ শতাব্দীর শিক্ষাসংস্কারের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছি। ভারতীয় মনই হয়তো এমন। এভাবেই প্রগতি ত্বরান্বিত হয়ে থাকে। এটা সত্য যে, ভারতীয় মানস নতুন কোনো উদ্ভাবনকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে খুবই ধীরগতিসম্পন্ন। আবার যা কিছু পুরনো ও ঐতিহ্যিক এবং যার উপযোগিতা রয়েছে, সেসবকে ভারতবাসী গ্রহণ করতে সদাপ্রস্তুত থাকে।
এশিয়াটিক সকল জনগোষ্ঠীর প্রবল শক্তিশালী ও প্রধানতম ভাবনার বিষয় ছিলো ধর্ম। প্রারম্ভ থেকে শেষ অবধি প্রাচ্য দর্শন ও সাহিত্য হলো ধর্মীয়। অন্যসব বিষয়ের মতোই ভারতীয় শিক্ষায়ও ধর্ম অনুপ্রবেশ করেছে। প্রাচীনকালের শিক্ষার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো ধর্মশিক্ষা।
ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় একজন তরুণ ব্রাহ্মণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ধর্মযাজক [পুরোহিত] ও অন্যের শিক্ষক হিসেবে তৈরি করার জন্য, যার মাধ্যমে সে তার জীবনের কর্তব্য পালন করতে পারে। আর এভাবেই শিক্ষার স্পিরিচুয়াল দিকটির প্রতি অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হতো। সেসময় [প্রাচীন ভারতে] শিক্ষাতাত্ত্বিক শৃঙ্খলার ধারণাটিকে তারা গোটা জীবনের জন্য প্রসারিত করে রেখেছেন। আসলে এর ভেতর দিয়েই আশ্রমের ধারণা ও একজন ছাত্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ধারণা বিকশিত হয়েছে। যেমন, একজন ছাত্র যিনি গৃহী হবেন ও সন্ন্যাসী সাধক হবেন তাও এখান থেকে নির্ধারিত হতো। একজন ছাত্রকে প্রথমত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এর পর সে দ্বিতীয় পর্যায়ে গৃহী [গৃহস্থ আশ্রম] পর্যায়ে প্রবেশ করতো। তাঁর পারিবারিক জীবনে অনুপ্রবেশের সকল দায়িত্ব সম্পন্ন করা শেষ হলো বাণপ্রস্থ আশ্রমে অনুপ্রবেশ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিকে অরণ্যবাসী তপস্বীর জীবনে প্রবেশ করতে হতো। এই জীবনের সকল দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পন্ন হলে সে সন্ন্যাসী, বা ভাবুক তপস্বী হয়ে উঠতেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা শুধুমাত্র জীবনের প্রস্তুতির জন্য নিবেদিত ছিলো না, বরং তা পরবর্তী জীবনের অস্তিত্বের জন্যও নিবেদিত ছিলো।
বর্তমান এই উপযোগবাদী যুগে, যেখানে ধর্মকে বিবেচনা করা হচ্ছে একেবারে সেকেলে হিসেবে, এবং সকল মনোমুগ্ধকর লক্ষ্যসমূহ অর্জনই হলো ব্যক্তিগত জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ও বৈষয়িক জীবনের সমৃদ্ধি অর্জন, সেরকম পরিস্থিতিতে আমাদের প্রাচীন এইসব আদর্শসমূহ আঁকড়ে ধরে রাখা আরো বেশি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অতীতে ছাত্রদের যেসব মূল্যবোধ শেখানে হতো, তার মতোই বর্তমানেও সত্যিকার মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। জীবনের সকল কর্তব্য ও সম্পর্ক বিষয়ে এবং জীবনের ব্যবহারিক কর্তব্য বিষয়ে ছাত্রদের নির্দেশনা দেওয়া উচিত। ভারতবর্ষের এ সময়ের পের (যা ইউরোপের মধ্যযুগের সমসাময়িক) মানুষের জীবনের প্রতি একটি বিশেষ প্রবণতার জন্ম নিয়েছিলো। সেসময়ের দর্শন তাদেরকে শিখিয়েছে যে, জগত হলো অবাস্তবতা [জগত মায়া] এবং সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা হলো এই পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করা। কিন্তু ইসলাম এরকম চরম পারলৌকিক মগ্নতাকে শক্তভাবে অসমর্থন করেছে। পবিত্র কোরআন-এ সন্ন্যাসজীবনের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছে। কারণ সবাই যদি জাগতিকতার বন্ধন ছিন্ন করে, তাহলে সামজের বন্ধনসমূহ খুব দ্রুতই ভেঙ্গে পড়বে। আমরা মুসলমানগণ প্রতিদিন আল্লাহার কাছে প্রার্থনা করি: “হে আমাদের প্রতিপালক, এই দুনিয়ায় আমাদেরকে কল্যাণ দান করুন, পরকালেও কল্যাণ দান করুন।” আমরা যে শিক্ষা প্রদান করে থাকি, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এই দুই উদ্দেশ্যকে যথাযথ অনুপাতে সমন্বিত করা। আমাদের প্রাচীন যেসব আদর্শ রয়েছে এবং জাতীয় যেসব মহান বীর রয়েছেন, তাঁদের জীবনের উৎকর্ষকে বালিকাদের মনে প্রোথিত করার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের অনেকাংশই সম্পন্ন করতে পারি [সফলভাবে]।
ভারতীয় শিক্ষাদর্শের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক। ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় [প্রাচীন ভারতে কথা বলা হচ্ছে] বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অথবা একদল ছাত্রকে বড় শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে পড়ানোর প্রচলন ছিলো না। সাধারণত শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অল্প কয়েকজন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষকই থাকতেন। এ-কারণে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই শিক্ষকের ব্যক্তিগত মনোযোগ পেতেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একধরনের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠতো, যার উচ্চ নৈতিক প্রভাব ছিলো। একজন শিক্ষাবিদ লিখছেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক অপেক্ষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ কারণে একজন শিক্ষার্থী তার বিদ্যালয় বা কলেজকে মনে করতেন ‘গর্ভধারিণী শিক্ষায়তন’ (alma matter) হিসেবে। ভারতবর্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শিক্ষককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। একজন পাশ্চাত্য শিক্ষার্থী যেভাবে তার ‘গর্ভধারিণী শিক্ষায়তনের’ প্রতি স্নেহ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, ভারতের শিক্ষার্থীরা আজীবন সেই স্নেহ ও শ্রদ্ধা ভক্তি সহকারে তার শিক্ষকের প্রতি নিবেদিত করে থাকে।” বর্তমানের এই গণতান্ত্রিক যুগে যেখানে শিক্ষার লক্ষ হওয়া ব্যাপক প্রসারণ, সেখানে কোনো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়, এমনকী তা বাস্তবসম্মতও নয়। তবে আমরা শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রভাব ও দৃষ্টান্ত ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন করতে পারি। এ কারণে এই মহান দায়িত্বটি শিক্ষকের ওপর অর্পণ করে আমরা সুফল পেতে পারি। আবার শিক্ষকদের কাছ থেকেও উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও অধ্যাত্মিক মান থাকতে হবে। আর এজন্য আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শর্ত ও পরিবেশে কাজ করা, যাতে করে এরকম মানের শিক্ষক পর্যাপ্ত হয়। শিক্ষকতা হলো জগতের মধ্যে সবথেকে মহৎ পেশা। একারণে এ পেশার জন্য দায়িত্ব ও সুযোগ উভয়ই বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বহু শতাব্দী ধরে ভারতে নারী শিক্ষার অবস্থা শোচনীয় ছিলো। অথচ প্রাচীন আর্য যুগে নারীগণ কর্তৃত্ব ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উপনিষদে এমনসব নারীদের কথা বলা হয়েছে, যাঁরা গভীর দার্শনিক সত্য অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এমনকী ঋকবেদের অনেক স্তোত্রের রচয়িতা হিসেবেও তাঁদেরকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। যদিও ঋকবেদে এমনকিছু ইঙ্গিত রয়েছে যেখানে নারীকে নিম্ন-নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলো। সেখানে মনে করা হতো নারীদেরকে পুরুষের অধীনেই থাকা উচিত। এজন্য নারীশিক্ষা আমাদের কাছে সেই প্রাচীন প্রথা ভাঙ্গার সমার্থক মনে হয়েছে, যে প্রথা নারীদেরকে তাদের শিক্ষা থেকে বিরত রেখেছিলো। আর যখনই আমরা এখানে নারী শিক্ষার কথা বলি, তখনই আমরা পাশ্চাত্য পদ্ধতিকে গ্রহণ করার কথা বলি, সেই মোতাবেক তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেবার কথা বলি। অথচ ভারতীয় সকল পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণকে বাদ দিই। এই যে ভুল আমরা করছি, সে বিষয়ে আমরা এখনও সতর্ক নই। অথচ এসব থেকে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে বিরত থাকা উচিত। আমাদের ঐতিহ্যে নারীত্বের যে মহান ও মহৎ আদর্শ বিকশিত হয়েছে, তা ভারতীয় মেয়েদের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া উচিত নয়। যদিও অতীতে আমাদের এই আদর্শ ছিলো সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। এই আদর্শকে আমরা আরো প্রসারিত ও বিস্তৃত করে এর উৎকর্ষ বৃদ্ধি করতে পারি। কিন্তু পাশ্চাত্য রীতি ও প্রথার যে অন্ধ অনুকরণ, কিংবা একে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা— উভয়ই পরিহার করা উচিত। অতীতের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের নারীরা বিদ্যাগত কৃতিত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন না। তাদের [সেসময়ের নারীদের] জীবন ছিলো একেবারে গৃহস্থালীর চৌসীমানায় আবদ্ধ। তারপরও এই দুর্বোধ্য অন্ধকার জীবনের মধ্যে তাঁরা তাঁদের সক্ষমতা অনুসারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কর্তব্য পালনে সচেষ্ট ছিলো। কঠোর পরিশ্রমে তাদের আঙ্গুল ক্ষয়িত হয়ে গেছে। পরিবারের যত্ন নেওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের সুখ বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত শ্রম দেওয়া— এসব কিছুতে তাঁরা মগ্ন থাকতো। কঠিন দুঃখ-কষ্টের সময় নারীরা ছিলেন অনুগত ও অবিচল। মহাভারতে কয়েকটি শব্দেই তার প্রমাণ মেলে : “নীরবতার সঙ্গী হিসেবে নারী, আর উপদেশে পিতা। জীবনের গহীন অরণ্য পাড়ি দেওয়ার সময় নারী যেন এক বিশ্রামের স্থান।”
আমাদের সকল উপায় ও উপকরণের সাহায্যে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করতে হবে। তাঁরা নিজেদেরকে কীভাবে আধুনিক করে তুলতে পারে সে শিক্ষা দিতে হবে। তাদেরকে উপলব্ধি করানো উচিত যে, তাদের ওপর গৃহস্থালি দায়িত্ব অর্র্পণ করা হয়েছে, তার ওপর দেশের সামগ্রিক কল্যাণও নির্ভর করে। চমৎকার সহনশীলতা, বীরত্ব ও শৃঙ্খলার দিক থেকে তারা যেন তাদের নিরক্ষর বোনদের অপেক্ষা পিছিয়ে না পড়েন। আমাদের বালিকাদের কিছু বিষয় শিক্ষা দেওয়া উচিত যে, যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তারা প্রশংসনীয়ভাবে পালন করতে চান, তাহলে সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে এমন ইচ্ছা ও প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করতে হবে, যা হালকা নয়, অগভীর নয়। তাদেরকে এটাও শেখাতে হবে যে, সুখের শিল্প নিহিত রয়েছে শৃঙ্খলার মধ্যে। সেবাই তাঁদের মূলমন্ত্র হতে পারে, যদিও এ সেবা হয়তো ‘এ দৃঢ় সংকল্পের বেশি কিছু নাও হতে পারে। আমরা বিশ্বের মোট দুঃখের পরিমাণের সঙ্গে নিজের ক্ষণস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস আর যোগ না করি’।
প্রাচীন ভারতে শিল্পকলা ও কারুশিল্প কখনই উপেক্ষিত ছিলো না। বর্ণপ্রথা, যা নিজে অনেক সমস্যা ও অসুবিধায় আক্রান্ত, তা সত্ত্বেও এসব শিল্পের বিকাশে এই বর্ণপ্রথা সহায়তা করেছিলো। এসব কাজের মান বজায় রাখতে তা সাহায্য করেছিলো। এসব বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা ও নৈপুণ্য বাবার কাছ থেকে পুত্রের কাছে হস্তান্তরিত হতো। বাস্তব জিনিসপত্রাদি নাড়াচাড়া করে, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এবং নিজের অজান্তেই তার পিতার কাছ থেকে ছেলে এ পেশার গোপন কৌশলাদি শিখে নিতো। রাজা ও মহান অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাও এসব চমৎকার সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে প্রেরণা হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলো। অথচ আমরা লক্ষ করছি যে, এই ‘বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের’ ঐতিহ্য আজ ভারত থেকে [প্রায়] বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ছেলে-মেয়েরা কোন ধরনের পেশা গ্রহণের উপযুক্ত, কিংবা কোন ধরনের পেশা গ্রহণ করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে আজাকালকার পিতা-মাতা কোনো চিন্তাই করেন না। পিতা-মাতার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো যেন তাদের সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ডিগ্রির স্বীকৃতিচিহ্ন অর্জন করতে পারে। এই যে পরিস্থিতি, তা নিয়ে বিচারপতি আকবরের কবিতা থেকে উদ্বৃতি উল্লেখ করার ইচ্ছা হচ্ছে: “তিফ্লে মেঁ আ সকেগা কেয়া বাপ কা আতওয়ার কি/দুধ তো ডিব্বে কা হ্যায়, তালিম হ্যায় সিকার কি।” শিশু তার পিতা-মাতার চরিত্রের গন্ধ পাবে কীভাবে? তার খাবারের দুধ তো কৌটার, আর শিক্ষা পায় সরকারের।
প্রাচীন ঐতিহ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার যে রেওয়াজ ছিলো, তা আবার নতুন করে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পরিবর্তিত বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এটাও ভাবতে হবে যে, ভারতের ভবিষ্যত এই বালিকাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে। আর তাই এর শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশের বিষয়টি একটি স্থায়ী গুরুত্বের বিষয়। কিন্তু ভারতকে পাশ্চাত্য থেকে অবশ্যই অনেক কিছু শিখতে হবে। সেসব শিক্ষাকে আমাদের উপযোগী করে নিতে হবে। আর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনা না করে পাশ্চাত্য শিক্ষা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি মস্ত ভুল কাজ হবে। ভারতের সেই স্বর্ণযুগের চিন্তা ও পদ্ধতির পুরোনো ঐতিহ্যের যেসব ভালো উপাদান রয়েছে, তাকে ধরে রাখতে হবে। ধারণা ও আবেগের মধ্যে যে সামাজিক উত্তরাধিকার রয়েছে, তাকে ধরে রাখতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে। একইসঙ্গে পাশ্চাত্য চিন্তার যা কিছু উপযোগী ও উপকারী সেসব কিছুকে গ্রহণ করে এক নতুন ধারার শিক্ষাচর্চা ও শিক্ষা ঐতিহ্য গড়ে তুলতে হবে, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয়কে অতিক্রম করে যেতে পারে।
খুব সংক্ষেপে যদি বলি, তাহলে দাঁড়ায় যে, আমাদের বালিকারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই অর্জন করবেন না, বরং তারা হয়ে উঠবে একজন আদর্শ কন্যা, আদর্শ স্ত্রী ও মা। অথবা বলতে পারি যে, তাদেরকে হতে হবে অনুগত কন্যা, স্নেহময়ী ভগ্নি, কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী ও শিক্ষাদায়িনী।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
“আধুনিক ভারতীয় নারীর জন্য শিক্ষাদর্শ” প্রবন্ধটি রোকেয়ার “Educational Ideals for the Modern Indian Girl”-প্রবন্ধের অনুবাদ। প্রবন্ধটি ১৯৩১ সালের ৫ই মার্চ The Muslman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে বিষয়বস্তু ও দর্শন আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগের বাস্তবতায় লেখা। প্রবন্ধে তিনি প্রাচীন ভারতের শিক্ষাপদ্ধতির মাহাত্মের কথা বলেছেন। আবার সেসময়ের ব্রহ্মাণ্যবাদি শিক্ষার ‘সন্ন্যাসব্রতকে’ তিনি অতি-উদাসীন হিসেবেও শনাক্ত করেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার অন্ধ-অনুকরণ না করে যুক্তিবিচারসাপেক্ষে তার ইতিবাচক নির্যাস গ্রহণের প্রতিও তিনি মত দিয়েছেন। প্রয়োজনে উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জন্য একটি সাধারণ শিক্ষা প্রণয়নে প্রতি প্রস্তাব করেন। নারী শিক্ষায় ও শিক্ষাচিন্তা সম্পর্কে রোকেয়ার ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় উক্ত প্রবন্ধে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বাংলাভাষী পাঠকের জন্য প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হলো।]
অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে এক বিশেষ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল, যা তার বৈশিষ্ট্য ও আদর্শের দিক থেকে আধুনিক পশ্চিমা ব্যবস্থা অপেক্ষা স্বতন্ত্র ছিলো। এই ব্যবস্থার মধ্যেই ভারত জন্ম দিয়েছে বহু মহান ব্যক্তি ও সত্যের একনিষ্ঠ সত্যানুসন্ধানীর। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা বিকশিত হয়েছিলো ইতিহাসের আদি পর্যায় থেকে ব্যাকরণ ও গণিত বিজ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমে। এসব কিছুই ভারতকে সামর্থ্য জুগিয়েছিল উচ্চতর দর্শন ও অধিবিদ্যার ক্ষেত্রে নিজের মহিমার স্বাক্ষর রাখতে। তবে এটাও সত্য যে, প্রাচীনকালের মানুষের প্রচলিত জীবনযাত্রার মান ও শর্ত অনেকটা বদলে গেছে, পরিবর্তন হয়েছে। ফলে অপরিহার্য কোনো মৌলিক সংস্কার ও পরিবর্তন ছাড়াই প্রাচীন এসব তত্ত্ব ও অনুশীলনকে হুবহু প্রয়োগ করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত কোনো প্রস্তাব হতে পারে না। হ্যাঁ, আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে যেসব মূল্যবান উপকরণ রয়েছে, তাকে খুঁজে নিতে হবে। নতুন কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি পুরনোর সঙ্গেও নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। পুরনো জ্ঞানকাণ্ড ও মূল্যকে আত্মস্থ করতে হবে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বড় ত্রুটি হলো তা বিদেশি অপরিচিত ভূমির ওপর গড়ে ওঠা ব্যবস্থা। কিন্তু ঐ বিদেশি শিক্ষা, তা আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমনকী তা আমাদের জাতীয় ও সংস্কৃতির স্ততন্ত্র ধারাটিকে বিকশিত করতে অক্ষম, অসমর্থ। আমরা যদি এ বিষয়ে সমন্বয়ের নীতি ও আত্মস্থকরণ বজায় রাখতে পারি, তাহলে তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো কল্যাণকর করে তুলতে পারে।
শিক্ষাকে আমরা যদি জীবনের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করি, অথবা জীবন-যাপনের সম্পূর্ণতা হিসেবে চিন্তা করি, তাহলে বলতে হবে যে, প্রাচীন ভারতের শিক্ষাবিদগণ এর একটি সত্য ও মূল্যবান ধারণা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রাচীন শিক্ষা-কারিকুলাম শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বহু বিষয়কে এ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করেছিলো। এ শিক্ষায় শারীরিক বিকাশে প্রাপ্য গুরুত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে। সেই প্রাচীন দিনগুলোতে বিদ্যালয়ের জন্য দালানকোঠার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যায়ের প্রচলন তেমন একটা জানা যায় না। শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হতো ঘরের বাইরে কোনো গাছের ছায়ায়, প্রাকৃতিক পরিবেশে। এই পরিবেশে যা শেখানো হতো, তা মনের গভীরে নিবিড়ভাবে গেঁথে থাকতো। ছাত্রদের জীবন কাটতো সুস্থ কর্মকাণ্ডে। বিশেষ করে তারা শিক্ষকের গৃহ ও মাঠের কাজ করতো। শিক্ষকের গবাদিপশুর দেখাশোনা ও যত্ন নিত, এমনকী শিক্ষকের জন্য মাধুকরীও সংগ্রহে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেতা। একইভাবে নৈতিক শিক্ষা কোনোভাবেই তাচ্ছিল্য করা হতো না। তখনকার ছাত্র জীবন ছিলো কঠিন ও কঠোর শৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত। স্বাস্থ্যবিধি, নৈতিক, ধর্মীয় অনুশাসন, ও সদাচারণের নিয়মাবলি এসব কঠোর নিয়ম-কানুনের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রদের প্রশ্নাতীত আনুগত্য অর্জন করা প্রত্যাশিত একটি বিষয় ছিলো। আর শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য বিস্তারিত নিয়ম-কানুন ছিলো।
আধুনিক যুগের শিক্ষারও দাবি হলো শিক্ষার্থীর সকল বৃত্তির বিকাশ। বিশেষ করে শারীরিক, নৈতিক ও মানসিক বিকাশ। আমাদের দেশের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যা জানি তা হলো— তখন শিক্ষায় এমনসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো, যাতে করে এসব লক্ষ্য অর্জন করা যায়। যখন বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়নি, এমনকী যখন মানুষের অস্তিত্বের সম্ভাবনাগুলো বিজ্ঞানের বদৌলতে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি, সেসময় তারা শিক্ষার এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানের সভ্য ও অগ্রসরমান প্রজন্মকে অবশ্যই ভারতীয় শিক্ষাপদ্ধতির এই মূল্যকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে। আজ আমাদের আধুনিক শিক্ষায়ও প্রাকৃতিক পরিবেশের খোলা হাওয়ায় শিক্ষাদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রদের শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর বহিরাঙ্গন খেলাধুলার পরামর্শ করা হয়েছে, একইসঙ্গে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নৈতিক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা। এভাবেই আমাদের শিক্ষা তার সঠিক ও যথোপযুক্ত পথে অগ্রসর হয়ে আসছে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, শিক্ষার এসব লক্ষ্য হলো প্রাচীন, তথা পুরনো যুগের। আসলে শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা নতুন নতুন চমকপ্রদ ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি না, বরং ঐতিহ্যিক ও প্রাচীন ব্যবস্থাকেই আমরা বিংশ শতাব্দীর শিক্ষাসংস্কারের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছি। ভারতীয় মনই হয়তো এমন। এভাবেই প্রগতি ত্বরান্বিত হয়ে থাকে। এটা সত্য যে, ভারতীয় মানস নতুন কোনো উদ্ভাবনকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে খুবই ধীরগতিসম্পন্ন। আবার যা কিছু পুরনো ও ঐতিহ্যিক এবং যার উপযোগিতা রয়েছে, সেসবকে ভারতবাসী গ্রহণ করতে সদাপ্রস্তুত থাকে।
এশিয়াটিক সকল জনগোষ্ঠীর প্রবল শক্তিশালী ও প্রধানতম ভাবনার বিষয় ছিলো ধর্ম। প্রারম্ভ থেকে শেষ অবধি প্রাচ্য দর্শন ও সাহিত্য হলো ধর্মীয়। অন্যসব বিষয়ের মতোই ভারতীয় শিক্ষায়ও ধর্ম অনুপ্রবেশ করেছে। প্রাচীনকালের শিক্ষার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো ধর্মশিক্ষা।
ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় একজন তরুণ ব্রাহ্মণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ধর্মযাজক [পুরোহিত] ও অন্যের শিক্ষক হিসেবে তৈরি করার জন্য, যার মাধ্যমে সে তার জীবনের কর্তব্য পালন করতে পারে। আর এভাবেই শিক্ষার স্পিরিচুয়াল দিকটির প্রতি অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হতো। সেসময় [প্রাচীন ভারতে] শিক্ষাতাত্ত্বিক শৃঙ্খলার ধারণাটিকে তারা গোটা জীবনের জন্য প্রসারিত করে রেখেছেন। আসলে এর ভেতর দিয়েই আশ্রমের ধারণা ও একজন ছাত্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ধারণা বিকশিত হয়েছে। যেমন, একজন ছাত্র যিনি গৃহী হবেন ও সন্ন্যাসী সাধক হবেন তাও এখান থেকে নির্ধারিত হতো। একজন ছাত্রকে প্রথমত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এর পর সে দ্বিতীয় পর্যায়ে গৃহী [গৃহস্থ আশ্রম] পর্যায়ে প্রবেশ করতো। তাঁর পারিবারিক জীবনে অনুপ্রবেশের সকল দায়িত্ব সম্পন্ন করা শেষ হলো বাণপ্রস্থ আশ্রমে অনুপ্রবেশ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিকে অরণ্যবাসী তপস্বীর জীবনে প্রবেশ করতে হতো। এই জীবনের সকল দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পন্ন হলে সে সন্ন্যাসী, বা ভাবুক তপস্বী হয়ে উঠতেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা শুধুমাত্র জীবনের প্রস্তুতির জন্য নিবেদিত ছিলো না, বরং তা পরবর্তী জীবনের অস্তিত্বের জন্যও নিবেদিত ছিলো।
বর্তমান এই উপযোগবাদী যুগে, যেখানে ধর্মকে বিবেচনা করা হচ্ছে একেবারে সেকেলে হিসেবে, এবং সকল মনোমুগ্ধকর লক্ষ্যসমূহ অর্জনই হলো ব্যক্তিগত জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ও বৈষয়িক জীবনের সমৃদ্ধি অর্জন, সেরকম পরিস্থিতিতে আমাদের প্রাচীন এইসব আদর্শসমূহ আঁকড়ে ধরে রাখা আরো বেশি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অতীতে ছাত্রদের যেসব মূল্যবোধ শেখানে হতো, তার মতোই বর্তমানেও সত্যিকার মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। জীবনের সকল কর্তব্য ও সম্পর্ক বিষয়ে এবং জীবনের ব্যবহারিক কর্তব্য বিষয়ে ছাত্রদের নির্দেশনা দেওয়া উচিত। ভারতবর্ষের এ সময়ের পের (যা ইউরোপের মধ্যযুগের সমসাময়িক) মানুষের জীবনের প্রতি একটি বিশেষ প্রবণতার জন্ম নিয়েছিলো। সেসময়ের দর্শন তাদেরকে শিখিয়েছে যে, জগত হলো অবাস্তবতা [জগত মায়া] এবং সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা হলো এই পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করা। কিন্তু ইসলাম এরকম চরম পারলৌকিক মগ্নতাকে শক্তভাবে অসমর্থন করেছে। পবিত্র কোরআন-এ সন্ন্যাসজীবনের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছে। কারণ সবাই যদি জাগতিকতার বন্ধন ছিন্ন করে, তাহলে সামজের বন্ধনসমূহ খুব দ্রুতই ভেঙ্গে পড়বে। আমরা মুসলমানগণ প্রতিদিন আল্লাহার কাছে প্রার্থনা করি: “হে আমাদের প্রতিপালক, এই দুনিয়ায় আমাদেরকে কল্যাণ দান করুন, পরকালেও কল্যাণ দান করুন।” আমরা যে শিক্ষা প্রদান করে থাকি, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এই দুই উদ্দেশ্যকে যথাযথ অনুপাতে সমন্বিত করা। আমাদের প্রাচীন যেসব আদর্শ রয়েছে এবং জাতীয় যেসব মহান বীর রয়েছেন, তাঁদের জীবনের উৎকর্ষকে বালিকাদের মনে প্রোথিত করার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের অনেকাংশই সম্পন্ন করতে পারি [সফলভাবে]।
ভারতীয় শিক্ষাদর্শের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক। ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় [প্রাচীন ভারতে কথা বলা হচ্ছে] বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অথবা একদল ছাত্রকে বড় শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে পড়ানোর প্রচলন ছিলো না। সাধারণত শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অল্প কয়েকজন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষকই থাকতেন। এ-কারণে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই শিক্ষকের ব্যক্তিগত মনোযোগ পেতেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একধরনের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠতো, যার উচ্চ নৈতিক প্রভাব ছিলো। একজন শিক্ষাবিদ লিখছেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক অপেক্ষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ কারণে একজন শিক্ষার্থী তার বিদ্যালয় বা কলেজকে মনে করতেন ‘গর্ভধারিণী শিক্ষায়তন’ (alma matter) হিসেবে। ভারতবর্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শিক্ষককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। একজন পাশ্চাত্য শিক্ষার্থী যেভাবে তার ‘গর্ভধারিণী শিক্ষায়তনের’ প্রতি স্নেহ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, ভারতের শিক্ষার্থীরা আজীবন সেই স্নেহ ও শ্রদ্ধা ভক্তি সহকারে তার শিক্ষকের প্রতি নিবেদিত করে থাকে।” বর্তমানের এই গণতান্ত্রিক যুগে যেখানে শিক্ষার লক্ষ হওয়া ব্যাপক প্রসারণ, সেখানে কোনো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়, এমনকী তা বাস্তবসম্মতও নয়। তবে আমরা শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রভাব ও দৃষ্টান্ত ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন করতে পারি। এ কারণে এই মহান দায়িত্বটি শিক্ষকের ওপর অর্পণ করে আমরা সুফল পেতে পারি। আবার শিক্ষকদের কাছ থেকেও উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও অধ্যাত্মিক মান থাকতে হবে। আর এজন্য আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শর্ত ও পরিবেশে কাজ করা, যাতে করে এরকম মানের শিক্ষক পর্যাপ্ত হয়। শিক্ষকতা হলো জগতের মধ্যে সবথেকে মহৎ পেশা। একারণে এ পেশার জন্য দায়িত্ব ও সুযোগ উভয়ই বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বহু শতাব্দী ধরে ভারতে নারী শিক্ষার অবস্থা শোচনীয় ছিলো। অথচ প্রাচীন আর্য যুগে নারীগণ কর্তৃত্ব ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উপনিষদে এমনসব নারীদের কথা বলা হয়েছে, যাঁরা গভীর দার্শনিক সত্য অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এমনকী ঋকবেদের অনেক স্তোত্রের রচয়িতা হিসেবেও তাঁদেরকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। যদিও ঋকবেদে এমনকিছু ইঙ্গিত রয়েছে যেখানে নারীকে নিম্ন-নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলো। সেখানে মনে করা হতো নারীদেরকে পুরুষের অধীনেই থাকা উচিত। এজন্য নারীশিক্ষা আমাদের কাছে সেই প্রাচীন প্রথা ভাঙ্গার সমার্থক মনে হয়েছে, যে প্রথা নারীদেরকে তাদের শিক্ষা থেকে বিরত রেখেছিলো। আর যখনই আমরা এখানে নারী শিক্ষার কথা বলি, তখনই আমরা পাশ্চাত্য পদ্ধতিকে গ্রহণ করার কথা বলি, সেই মোতাবেক তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেবার কথা বলি। অথচ ভারতীয় সকল পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণকে বাদ দিই। এই যে ভুল আমরা করছি, সে বিষয়ে আমরা এখনও সতর্ক নই। অথচ এসব থেকে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে বিরত থাকা উচিত। আমাদের ঐতিহ্যে নারীত্বের যে মহান ও মহৎ আদর্শ বিকশিত হয়েছে, তা ভারতীয় মেয়েদের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া উচিত নয়। যদিও অতীতে আমাদের এই আদর্শ ছিলো সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। এই আদর্শকে আমরা আরো প্রসারিত ও বিস্তৃত করে এর উৎকর্ষ বৃদ্ধি করতে পারি। কিন্তু পাশ্চাত্য রীতি ও প্রথার যে অন্ধ অনুকরণ, কিংবা একে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা— উভয়ই পরিহার করা উচিত। অতীতের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের নারীরা বিদ্যাগত কৃতিত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন না। তাদের [সেসময়ের নারীদের] জীবন ছিলো একেবারে গৃহস্থালীর চৌসীমানায় আবদ্ধ। তারপরও এই দুর্বোধ্য অন্ধকার জীবনের মধ্যে তাঁরা তাঁদের সক্ষমতা অনুসারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কর্তব্য পালনে সচেষ্ট ছিলো। কঠোর পরিশ্রমে তাদের আঙ্গুল ক্ষয়িত হয়ে গেছে। পরিবারের যত্ন নেওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের সুখ বৃদ্ধির জন্য নিবেদিত শ্রম দেওয়া— এসব কিছুতে তাঁরা মগ্ন থাকতো। কঠিন দুঃখ-কষ্টের সময় নারীরা ছিলেন অনুগত ও অবিচল। মহাভারতে কয়েকটি শব্দেই তার প্রমাণ মেলে : “নীরবতার সঙ্গী হিসেবে নারী, আর উপদেশে পিতা। জীবনের গহীন অরণ্য পাড়ি দেওয়ার সময় নারী যেন এক বিশ্রামের স্থান।”
আমাদের সকল উপায় ও উপকরণের সাহায্যে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করতে হবে। তাঁরা নিজেদেরকে কীভাবে আধুনিক করে তুলতে পারে সে শিক্ষা দিতে হবে। তাদেরকে উপলব্ধি করানো উচিত যে, তাদের ওপর গৃহস্থালি দায়িত্ব অর্র্পণ করা হয়েছে, তার ওপর দেশের সামগ্রিক কল্যাণও নির্ভর করে। চমৎকার সহনশীলতা, বীরত্ব ও শৃঙ্খলার দিক থেকে তারা যেন তাদের নিরক্ষর বোনদের অপেক্ষা পিছিয়ে না পড়েন। আমাদের বালিকাদের কিছু বিষয় শিক্ষা দেওয়া উচিত যে, যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তারা প্রশংসনীয়ভাবে পালন করতে চান, তাহলে সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে এমন ইচ্ছা ও প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করতে হবে, যা হালকা নয়, অগভীর নয়। তাদেরকে এটাও শেখাতে হবে যে, সুখের শিল্প নিহিত রয়েছে শৃঙ্খলার মধ্যে। সেবাই তাঁদের মূলমন্ত্র হতে পারে, যদিও এ সেবা হয়তো ‘এ দৃঢ় সংকল্পের বেশি কিছু নাও হতে পারে। আমরা বিশ্বের মোট দুঃখের পরিমাণের সঙ্গে নিজের ক্ষণস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস আর যোগ না করি’।
প্রাচীন ভারতে শিল্পকলা ও কারুশিল্প কখনই উপেক্ষিত ছিলো না। বর্ণপ্রথা, যা নিজে অনেক সমস্যা ও অসুবিধায় আক্রান্ত, তা সত্ত্বেও এসব শিল্পের বিকাশে এই বর্ণপ্রথা সহায়তা করেছিলো। এসব কাজের মান বজায় রাখতে তা সাহায্য করেছিলো। এসব বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা ও নৈপুণ্য বাবার কাছ থেকে পুত্রের কাছে হস্তান্তরিত হতো। বাস্তব জিনিসপত্রাদি নাড়াচাড়া করে, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এবং নিজের অজান্তেই তার পিতার কাছ থেকে ছেলে এ পেশার গোপন কৌশলাদি শিখে নিতো। রাজা ও মহান অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাও এসব চমৎকার সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে প্রেরণা হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলো। অথচ আমরা লক্ষ করছি যে, এই ‘বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের’ ঐতিহ্য আজ ভারত থেকে [প্রায়] বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ছেলে-মেয়েরা কোন ধরনের পেশা গ্রহণের উপযুক্ত, কিংবা কোন ধরনের পেশা গ্রহণ করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে আজাকালকার পিতা-মাতা কোনো চিন্তাই করেন না। পিতা-মাতার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো যেন তাদের সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ডিগ্রির স্বীকৃতিচিহ্ন অর্জন করতে পারে। এই যে পরিস্থিতি, তা নিয়ে বিচারপতি আকবরের কবিতা থেকে উদ্বৃতি উল্লেখ করার ইচ্ছা হচ্ছে: “তিফ্লে মেঁ আ সকেগা কেয়া বাপ কা আতওয়ার কি/দুধ তো ডিব্বে কা হ্যায়, তালিম হ্যায় সিকার কি।” শিশু তার পিতা-মাতার চরিত্রের গন্ধ পাবে কীভাবে? তার খাবারের দুধ তো কৌটার, আর শিক্ষা পায় সরকারের।
প্রাচীন ঐতিহ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার যে রেওয়াজ ছিলো, তা আবার নতুন করে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পরিবর্তিত বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এটাও ভাবতে হবে যে, ভারতের ভবিষ্যত এই বালিকাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে। আর তাই এর শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশের বিষয়টি একটি স্থায়ী গুরুত্বের বিষয়। কিন্তু ভারতকে পাশ্চাত্য থেকে অবশ্যই অনেক কিছু শিখতে হবে। সেসব শিক্ষাকে আমাদের উপযোগী করে নিতে হবে। আর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনা না করে পাশ্চাত্য শিক্ষা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি মস্ত ভুল কাজ হবে। ভারতের সেই স্বর্ণযুগের চিন্তা ও পদ্ধতির পুরোনো ঐতিহ্যের যেসব ভালো উপাদান রয়েছে, তাকে ধরে রাখতে হবে। ধারণা ও আবেগের মধ্যে যে সামাজিক উত্তরাধিকার রয়েছে, তাকে ধরে রাখতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে। একইসঙ্গে পাশ্চাত্য চিন্তার যা কিছু উপযোগী ও উপকারী সেসব কিছুকে গ্রহণ করে এক নতুন ধারার শিক্ষাচর্চা ও শিক্ষা ঐতিহ্য গড়ে তুলতে হবে, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয়কে অতিক্রম করে যেতে পারে।
খুব সংক্ষেপে যদি বলি, তাহলে দাঁড়ায় যে, আমাদের বালিকারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই অর্জন করবেন না, বরং তারা হয়ে উঠবে একজন আদর্শ কন্যা, আদর্শ স্ত্রী ও মা। অথবা বলতে পারি যে, তাদেরকে হতে হবে অনুগত কন্যা, স্নেহময়ী ভগ্নি, কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী ও শিক্ষাদায়িনী।

আপনার মতামত লিখুন