মুঠোফোনে একটি ভিডিও চালু করতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। একটি ওয়েবসাইট খুলতেও বড়জোর কয়েক মুহূর্ত। অথচ আপনার দেওয়া একটি নির্দেশের পর তথ্যটি কোথা থেকে আসছে, কোন কোন নেটওয়ার্ক পেরিয়ে আপনার ডিভাইসে পৌঁছাচ্ছে-এসবের বেশির ভাগই থেকে যায় চোখের আড়ালে।
ইন্টারনেটকে অনেক সময় তারবিহীন
প্রযুক্তি হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে এর বিশাল অবকাঠামোর বড় অংশই তারের ওপর নির্ভরশীল।
ফোন থেকে মোবাইল টাওয়ার পর্যন্ত সংযোগটি রেডিও তরঙ্গে হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে
তথ্যের যাত্রায় যুক্ত হয় ফাইবার অপটিক কেবল, রাউটার, ডাটা সেন্টার, ক্যাশ সার্ভার এবং
প্রয়োজনে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবল।
ধরা যাক, আপনি ইউটিউবে একটি ভিডিও
চালু করলেন। প্রথমেই আপনার ডিভাইসকে জানতে হবে ভিডিওটির তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে। এই
প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি ডোমেইন ও আইপি ঠিকানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে।
ওয়েবসাইটের নাম মানুষের জন্য
সহজে মনে রাখার মতো হলেও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক মূলত আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে। ডোমেইন
নেম সিস্টেম বা ডিএনএস একটি ডোমেইন নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
আইপি ঠিকানা খুঁজে বের করে দেয়।
ঠিকানা পাওয়ার পর ডিভাইসটি প্রয়োজনীয়
তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সার্ভারের কাছে অনুরোধ পাঠায়। সার্ভারও তখন একসঙ্গে পুরো বিশাল
ফাইল পাঠানোর বদলে ডাটাকে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে পাঠাতে পারে। বিভিন্ন রাউটারের
মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসব প্যাকেট গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেট
ভিন্ন পথেও যেতে পারে। কোনো প্যাকেট পথে হারিয়ে গেলে সেটি পুনরায় পাঠানোর ব্যবস্থাও
রয়েছে। সব প্যাকেট ফোনে পৌঁছানোর পর ডিভাইস সেগুলো সাজিয়ে ভিডিও, ছবি বা ওয়েবপেজ হিসেবে
পর্দায় দেখায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াই এত দ্রুত
ঘটে যে ব্যবহারকারীর কাছে বিষয়টি শুধু একটি ক্লিকের মতো মনে হয়।
আপনার দেখা ভিডিওটি হয়তো কাছেই রাখা আছে
ভিডিও বা ওয়েবসাইটের তথ্য সব
সময় পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মূল সার্ভার থেকে আসতে হয় না। বহুল ব্যবহৃত কনটেন্ট দ্রুত
সরবরাহ করার জন্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে সার্ভার ও ক্যাশ ব্যবস্থা
ব্যবহার করে।
কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা সিডিএন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জনপ্রিয় কনটেন্টের কপি ব্যবহারকারীদের
তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে রাখা হয়। ফলে অনুরোধ পাওয়ার পর দূরের মূল সার্ভারে না
গিয়ে কাছের সার্ভার থেকেই তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
এর সুবিধা হলো ডাটা দ্রুত পৌঁছায়
এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপও কমে। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক সংযোগে সমস্যা থাকলেও
স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত কনটেন্ট অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়।
দেশের সীমানা পেরোতে লাগে সমুদ্রের নিচের কেবল
কনটেন্ট যদি দেশের বাইরে থাকা
কোনো সার্ভার থেকে আনতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে হয়। আর এই আন্তর্জাতিক
যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হলো সাবমেরিন কেবল।
সমুদ্রের তলদেশে বিছানো এসব কেবল
বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশকে যুক্ত করে। কেবলের ভেতরের অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে আলোর
সংকেত ব্যবহার করে তথ্য পরিবাহিত হয়। উপকূলের নির্দিষ্ট ল্যান্ডিং স্টেশনে এসে এসব
কেবল দেশের স্থলভাগের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।
সেখান থেকে ফাইবার নেটওয়ার্কের
মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে যেতে পারে ডাটা সেন্টার, আইএসপি কিংবা ব্যবহারকারীর কাছাকাছি নেটওয়ার্কে।
সাবমেরিন কেবল অবশ্য ঝুঁকিমুক্ত
নয়। জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার সরঞ্জাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিভিন্ন কারিগরি সমস্যায়
এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেবল অচল হলে বিকল্প রুটে ট্রাফিক সরিয়ে
নেওয়া সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা না থাকলে ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে।
মোবাইল ডাটার ক্ষেত্রে টাওয়ারই শেষ গন্তব্য নয়
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়
ফোন ও টাওয়ারের মধ্যে সরাসরি কোনো কেবল থাকে না। ফোন রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কাছের বেস
স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কিন্তু টাওয়ারে পৌঁছেই ডাটার
যাত্রা শেষ হয় না। টাওয়ারকে অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রয়োজন হয়
ব্যাকহল সংযোগ। অনেক ক্ষেত্রে
এর জন্য ফাইবার অপটিক ব্যবহার করা হয়। আবার দুর্গম এলাকায় ফাইবার স্থাপন কঠিন হলে মাইক্রোওয়েভ
লিংকও কাজে লাগানো হয়।
টাওয়ারের ওপরে দেখা গোলাকার ডিশ
অ্যান্টেনাগুলোর একটি কাজ হতে পারে এই মাইক্রোওয়েভ যোগাযোগ স্থাপন করা।
অর্থাৎ, মোবাইল ফোনের সংযোগের
শেষ ধাপটি তারবিহীন হলেও এর পেছনের নেটওয়ার্কের বড় অংশ তারযুক্ত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
চলন্ত অবস্থায় ফোন কীভাবে নেটওয়ার্ক বদলায়
গাড়ি, বাস কিংবা ট্রেনে চলার
সময় ফোন এক জায়গায় স্থির থাকে না। ফলে একই টাওয়ারের আওতায়ও সব সময় থাকা সম্ভব নয়।
মোবাইল নেটওয়ার্ককে বিভিন্ন
‘সেল’-এ ভাগ করা হয়। একটি সেলের দায়িত্বে থাকে নির্দিষ্ট বেস স্টেশন। ব্যবহারকারী এক
এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলে ফোন প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন টাওয়ারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন
করে।
এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন
হলে ব্যবহারকারী তা বুঝতেও পারেন না। তবে কোনো এলাকায় সংকেত দুর্বল হলে বা একই সময়ে
অতিরিক্ত মানুষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে কলের মান খারাপ হওয়া কিংবা ভিডিও বাফারিংয়ের
মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেখানে ফাইবার পৌঁছানো কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট
ইন্টারনেটের সব সংযোগ যে কেবল
ও টাওয়ারের মাধ্যমে দিতে হবে, এমন নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, গভীর সমুদ্র বা কম জনবসতিপূর্ণ
অঞ্চলে প্রচলিত অবকাঠামো তৈরি করা ব্যয়বহুল কিংবা কঠিন হতে পারে। সেখানে স্যাটেলাইট
ইন্টারনেট বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্টারলিংকের মতো সেবা পৃথিবীর
তুলনামূলক কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা বিপুলসংখ্যক ছোট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়ার
চেষ্টা করে। এতে পুরোনো অনেক স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় যোগাযোগের বিলম্ব
কম হতে পারে।
তবে স্যাটেলাইট সংযোগও সব সময়
একই মানের থাকে না। আবহাওয়া, ব্যবহারকারীর অবস্থান, আকাশের দৃশ্যমানতা এবং নেটওয়ার্কে
একই সময়ে কতজন ব্যবহারকারী যুক্ত আছেন—এসব বিষয় এর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্টারনেটের একক মালিক নেই
ইন্টারনেট কোনো একটি কোম্পানি,
সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়। বরং এর বিভিন্ন অংশের মালিক আলাদা।
কোনো প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন কেবলে
বিনিয়োগ করে, কেউ স্থলভাগের ফাইবার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, আবার কেউ মোবাইল টাওয়ার,
সার্ভার বা ডাটা সেন্টার চালায়। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি
প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো রয়েছে।
বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে ট্রানজিট
চুক্তি থাকতে পারে। আবার দুটি নেটওয়ার্ক সরাসরি একে অপরের সঙ্গে ডাটা বিনিময়ও করতে
পারে। দেশের অভ্যন্তরে স্থানীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি
যুক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে ডাটাকে বিদেশি রুটে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না।
ইন্টারনেটের বিলের পুরো টাকা কোথায় যায়
আপনি যে ব্রডব্যান্ড বিল দেন,
তার অর্থ কেবল ইন্টারনেট কোম্পানির লাভ হিসেবে জমা হয় না। গ্রাহকের বাড়ি পর্যন্ত সংযোগ
পৌঁছানো এবং পুরো নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য নানা ধরনের ব্যয় রয়েছে।
ফাইবার ও অন্যান্য কেবল, রাউটার,
সুইচ, টাওয়ার, বিদ্যুৎ, কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকসেবা ও নিরাপত্তার খরচ এর মধ্যে
পড়ে। এর পাশাপাশি দেশীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, ট্রানজিট, ডাটা
সেন্টার, কর, ভ্যাট ও নিয়ন্ত্রক ফিও থাকতে পারে।
তবে ইউটিউবের কোনো ভিডিও দেখলেই
আপনার বিলের নির্দিষ্ট একটি অংশ সরাসরি ইউটিউব বা সাবমেরিন কেবলের মালিকের কাছে যায়—বিষয়টি
এমন নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নেটওয়ার্ক সক্ষমতা, সংযোগ কিংবা অবকাঠামো ব্যবহারের
জন্য নিজেদের চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করে।
স্থানীয় ক্যাশ সার্ভার ও সরাসরি
নেটওয়ার্ক সংযোগের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের প্রয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে
কমে যায়। ফলে একজন গ্রাহকের বিল কীভাবে ভাগ হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট কোনো একক হিসাব নেই।
এক ক্লিকের পেছনে যে বিশাল ব্যবস্থা
ফোনে ভিডিও চালুর সময় ব্যবহারকারী
শুধু পর্দায় একটি ছবি বা ভিডিও দেখতে পান। কিন্তু সেই কনটেন্ট পৌঁছানোর পেছনে কাজ করে
অনেক স্তরের প্রযুক্তি।
ফোন থেকে মোবাইল টাওয়ার, টাওয়ার
থেকে অপারেটরের নেটওয়ার্ক, প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় ফাইবার, আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল,
দূরের বা কাছের ডাটা সেন্টার, ক্যাশ সার্ভার এবং অসংখ্য রাউটার—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে
ইন্টারনেটের অবকাঠামো।
কোথাও রেডিও তরঙ্গ, কোথাও আলোর
সংকেত, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট—বিভিন্ন প্রযুক্তি একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত
হয়ে তথ্যকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
তাই ইন্টারনেটকে শুধু ‘বাতাসে
ভেসে আসা’ কোনো সেবা ভাবলে এর প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। এটি মূলত বিশ্বের অসংখ্য আলাদা
নেটওয়ার্কের সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে একটি সাধারণ ভিডিও চালু হওয়ার পেছনেও কাজ করে
স্থল ও সমুদ্রের বিশাল যোগাযোগ অবকাঠামো।

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুঠোফোনে একটি ভিডিও চালু করতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। একটি ওয়েবসাইট খুলতেও বড়জোর কয়েক মুহূর্ত। অথচ আপনার দেওয়া একটি নির্দেশের পর তথ্যটি কোথা থেকে আসছে, কোন কোন নেটওয়ার্ক পেরিয়ে আপনার ডিভাইসে পৌঁছাচ্ছে-এসবের বেশির ভাগই থেকে যায় চোখের আড়ালে।
ইন্টারনেটকে অনেক সময় তারবিহীন
প্রযুক্তি হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে এর বিশাল অবকাঠামোর বড় অংশই তারের ওপর নির্ভরশীল।
ফোন থেকে মোবাইল টাওয়ার পর্যন্ত সংযোগটি রেডিও তরঙ্গে হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে
তথ্যের যাত্রায় যুক্ত হয় ফাইবার অপটিক কেবল, রাউটার, ডাটা সেন্টার, ক্যাশ সার্ভার এবং
প্রয়োজনে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবল।
ধরা যাক, আপনি ইউটিউবে একটি ভিডিও
চালু করলেন। প্রথমেই আপনার ডিভাইসকে জানতে হবে ভিডিওটির তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে। এই
প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি ডোমেইন ও আইপি ঠিকানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে।
ওয়েবসাইটের নাম মানুষের জন্য
সহজে মনে রাখার মতো হলেও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক মূলত আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে। ডোমেইন
নেম সিস্টেম বা ডিএনএস একটি ডোমেইন নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
আইপি ঠিকানা খুঁজে বের করে দেয়।
ঠিকানা পাওয়ার পর ডিভাইসটি প্রয়োজনীয়
তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সার্ভারের কাছে অনুরোধ পাঠায়। সার্ভারও তখন একসঙ্গে পুরো বিশাল
ফাইল পাঠানোর বদলে ডাটাকে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে পাঠাতে পারে। বিভিন্ন রাউটারের
মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসব প্যাকেট গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেট
ভিন্ন পথেও যেতে পারে। কোনো প্যাকেট পথে হারিয়ে গেলে সেটি পুনরায় পাঠানোর ব্যবস্থাও
রয়েছে। সব প্যাকেট ফোনে পৌঁছানোর পর ডিভাইস সেগুলো সাজিয়ে ভিডিও, ছবি বা ওয়েবপেজ হিসেবে
পর্দায় দেখায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াই এত দ্রুত
ঘটে যে ব্যবহারকারীর কাছে বিষয়টি শুধু একটি ক্লিকের মতো মনে হয়।
আপনার দেখা ভিডিওটি হয়তো কাছেই রাখা আছে
ভিডিও বা ওয়েবসাইটের তথ্য সব
সময় পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মূল সার্ভার থেকে আসতে হয় না। বহুল ব্যবহৃত কনটেন্ট দ্রুত
সরবরাহ করার জন্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে সার্ভার ও ক্যাশ ব্যবস্থা
ব্যবহার করে।
কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা সিডিএন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জনপ্রিয় কনটেন্টের কপি ব্যবহারকারীদের
তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে রাখা হয়। ফলে অনুরোধ পাওয়ার পর দূরের মূল সার্ভারে না
গিয়ে কাছের সার্ভার থেকেই তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
এর সুবিধা হলো ডাটা দ্রুত পৌঁছায়
এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপও কমে। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক সংযোগে সমস্যা থাকলেও
স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত কনটেন্ট অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়।
দেশের সীমানা পেরোতে লাগে সমুদ্রের নিচের কেবল
কনটেন্ট যদি দেশের বাইরে থাকা
কোনো সার্ভার থেকে আনতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে হয়। আর এই আন্তর্জাতিক
যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হলো সাবমেরিন কেবল।
সমুদ্রের তলদেশে বিছানো এসব কেবল
বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশকে যুক্ত করে। কেবলের ভেতরের অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে আলোর
সংকেত ব্যবহার করে তথ্য পরিবাহিত হয়। উপকূলের নির্দিষ্ট ল্যান্ডিং স্টেশনে এসে এসব
কেবল দেশের স্থলভাগের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।
সেখান থেকে ফাইবার নেটওয়ার্কের
মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে যেতে পারে ডাটা সেন্টার, আইএসপি কিংবা ব্যবহারকারীর কাছাকাছি নেটওয়ার্কে।
সাবমেরিন কেবল অবশ্য ঝুঁকিমুক্ত
নয়। জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার সরঞ্জাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিভিন্ন কারিগরি সমস্যায়
এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেবল অচল হলে বিকল্প রুটে ট্রাফিক সরিয়ে
নেওয়া সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা না থাকলে ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে।
মোবাইল ডাটার ক্ষেত্রে টাওয়ারই শেষ গন্তব্য নয়
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়
ফোন ও টাওয়ারের মধ্যে সরাসরি কোনো কেবল থাকে না। ফোন রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কাছের বেস
স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কিন্তু টাওয়ারে পৌঁছেই ডাটার
যাত্রা শেষ হয় না। টাওয়ারকে অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রয়োজন হয়
ব্যাকহল সংযোগ। অনেক ক্ষেত্রে
এর জন্য ফাইবার অপটিক ব্যবহার করা হয়। আবার দুর্গম এলাকায় ফাইবার স্থাপন কঠিন হলে মাইক্রোওয়েভ
লিংকও কাজে লাগানো হয়।
টাওয়ারের ওপরে দেখা গোলাকার ডিশ
অ্যান্টেনাগুলোর একটি কাজ হতে পারে এই মাইক্রোওয়েভ যোগাযোগ স্থাপন করা।
অর্থাৎ, মোবাইল ফোনের সংযোগের
শেষ ধাপটি তারবিহীন হলেও এর পেছনের নেটওয়ার্কের বড় অংশ তারযুক্ত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
চলন্ত অবস্থায় ফোন কীভাবে নেটওয়ার্ক বদলায়
গাড়ি, বাস কিংবা ট্রেনে চলার
সময় ফোন এক জায়গায় স্থির থাকে না। ফলে একই টাওয়ারের আওতায়ও সব সময় থাকা সম্ভব নয়।
মোবাইল নেটওয়ার্ককে বিভিন্ন
‘সেল’-এ ভাগ করা হয়। একটি সেলের দায়িত্বে থাকে নির্দিষ্ট বেস স্টেশন। ব্যবহারকারী এক
এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলে ফোন প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন টাওয়ারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন
করে।
এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন
হলে ব্যবহারকারী তা বুঝতেও পারেন না। তবে কোনো এলাকায় সংকেত দুর্বল হলে বা একই সময়ে
অতিরিক্ত মানুষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে কলের মান খারাপ হওয়া কিংবা ভিডিও বাফারিংয়ের
মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেখানে ফাইবার পৌঁছানো কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট
ইন্টারনেটের সব সংযোগ যে কেবল
ও টাওয়ারের মাধ্যমে দিতে হবে, এমন নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, গভীর সমুদ্র বা কম জনবসতিপূর্ণ
অঞ্চলে প্রচলিত অবকাঠামো তৈরি করা ব্যয়বহুল কিংবা কঠিন হতে পারে। সেখানে স্যাটেলাইট
ইন্টারনেট বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্টারলিংকের মতো সেবা পৃথিবীর
তুলনামূলক কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা বিপুলসংখ্যক ছোট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়ার
চেষ্টা করে। এতে পুরোনো অনেক স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় যোগাযোগের বিলম্ব
কম হতে পারে।
তবে স্যাটেলাইট সংযোগও সব সময়
একই মানের থাকে না। আবহাওয়া, ব্যবহারকারীর অবস্থান, আকাশের দৃশ্যমানতা এবং নেটওয়ার্কে
একই সময়ে কতজন ব্যবহারকারী যুক্ত আছেন—এসব বিষয় এর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্টারনেটের একক মালিক নেই
ইন্টারনেট কোনো একটি কোম্পানি,
সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়। বরং এর বিভিন্ন অংশের মালিক আলাদা।
কোনো প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন কেবলে
বিনিয়োগ করে, কেউ স্থলভাগের ফাইবার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, আবার কেউ মোবাইল টাওয়ার,
সার্ভার বা ডাটা সেন্টার চালায়। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি
প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো রয়েছে।
বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে ট্রানজিট
চুক্তি থাকতে পারে। আবার দুটি নেটওয়ার্ক সরাসরি একে অপরের সঙ্গে ডাটা বিনিময়ও করতে
পারে। দেশের অভ্যন্তরে স্থানীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি
যুক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে ডাটাকে বিদেশি রুটে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না।
ইন্টারনেটের বিলের পুরো টাকা কোথায় যায়
আপনি যে ব্রডব্যান্ড বিল দেন,
তার অর্থ কেবল ইন্টারনেট কোম্পানির লাভ হিসেবে জমা হয় না। গ্রাহকের বাড়ি পর্যন্ত সংযোগ
পৌঁছানো এবং পুরো নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য নানা ধরনের ব্যয় রয়েছে।
ফাইবার ও অন্যান্য কেবল, রাউটার,
সুইচ, টাওয়ার, বিদ্যুৎ, কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকসেবা ও নিরাপত্তার খরচ এর মধ্যে
পড়ে। এর পাশাপাশি দেশীয় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, ট্রানজিট, ডাটা
সেন্টার, কর, ভ্যাট ও নিয়ন্ত্রক ফিও থাকতে পারে।
তবে ইউটিউবের কোনো ভিডিও দেখলেই
আপনার বিলের নির্দিষ্ট একটি অংশ সরাসরি ইউটিউব বা সাবমেরিন কেবলের মালিকের কাছে যায়—বিষয়টি
এমন নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নেটওয়ার্ক সক্ষমতা, সংযোগ কিংবা অবকাঠামো ব্যবহারের
জন্য নিজেদের চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করে।
স্থানীয় ক্যাশ সার্ভার ও সরাসরি
নেটওয়ার্ক সংযোগের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের প্রয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে
কমে যায়। ফলে একজন গ্রাহকের বিল কীভাবে ভাগ হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট কোনো একক হিসাব নেই।
এক ক্লিকের পেছনে যে বিশাল ব্যবস্থা
ফোনে ভিডিও চালুর সময় ব্যবহারকারী
শুধু পর্দায় একটি ছবি বা ভিডিও দেখতে পান। কিন্তু সেই কনটেন্ট পৌঁছানোর পেছনে কাজ করে
অনেক স্তরের প্রযুক্তি।
ফোন থেকে মোবাইল টাওয়ার, টাওয়ার
থেকে অপারেটরের নেটওয়ার্ক, প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় ফাইবার, আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল,
দূরের বা কাছের ডাটা সেন্টার, ক্যাশ সার্ভার এবং অসংখ্য রাউটার—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে
ইন্টারনেটের অবকাঠামো।
কোথাও রেডিও তরঙ্গ, কোথাও আলোর
সংকেত, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট—বিভিন্ন প্রযুক্তি একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত
হয়ে তথ্যকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
তাই ইন্টারনেটকে শুধু ‘বাতাসে
ভেসে আসা’ কোনো সেবা ভাবলে এর প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। এটি মূলত বিশ্বের অসংখ্য আলাদা
নেটওয়ার্কের সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে একটি সাধারণ ভিডিও চালু হওয়ার পেছনেও কাজ করে
স্থল ও সমুদ্রের বিশাল যোগাযোগ অবকাঠামো।

আপনার মতামত লিখুন