সংবাদ

হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা


কানন পুরকায়স্থ
কানন পুরকায়স্থ
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
হিমবাহ ধসে বিধ্বস্ত নেপাল

গত ১ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকার কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ হিমালয়ে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত বরাবর বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়, যাতে শত শত বিদেশি পর্যটকসহ ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৪,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন এবং ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। চীন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৬১ জন বিদেশিসহ নিখোঁজ ৫৪৬ জনের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে যে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) রাসুয়া এবং নুয়াকোটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধাদিঙ, গোর্খা এবং চিতওয়ানকে মাঝারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নেপাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে গ্রামগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘নদীতে ২০ মিলিয়ন ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি ছিল এবং তা ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা সুনামির মতো।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অঞ্চলের নদীগুলোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে পরবর্তীতে আরও আকস্মিকভাবে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দেখেছি যে, যখন শিলা ও বরফের বিশাল স্তূপ এমন বিস্ফোরণের সঙ্গে মাটিতে আঘাত করে, তখন তা পানিতে রূপান্তরিত হয়। ২,০০০ ফুট চওড়া শিলায় সঞ্চিত সমস্ত স্থিতিশক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যে গতিশক্তি এবং তরলে রূপান্তরিত হয়।

হিমালয় অঞ্চলে এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত জুলাই মাসে, লেন্ডে খোলা নদীর সীমান্তে একটি ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ নদীর পানির স্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটায়। ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ১৭,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক হ্রদে একটি ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট বন্যা বাংলাদেশের তিস্তা নদী বরাবর ৩৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ২০২১ সালে, ভারতেরই চামোলির কাছে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ঘন লিটার পানি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং এতে ৭০ জন নিহত হন।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। এটি উল্লেখ্য যে, ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক কার্যকলাপ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পীয় সংকেত একই রকম হয় না। মূল পার্থক্য হলো, ভূমিকম্পে পি-তরঙ্গ নামে পরিচিত তীক্ষ্ণ, আকস্মিক প্রাথমিক সংকেত এবং এস-তরঙ্গ নামে পরিচিত স্পষ্ট উচ্চ কম্পাঙ্কের গৌণ সংকেত উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, বিস্ফোরণের মতো অন্যান্য ঘটনায় আরও শক্তিশালী সংকোচন ঘটে এবং আগ্নেয়গিরি বা ভূমিধসে একটানা, ধীর গড়গড় শব্দে সংকেত পাওয়া যায়। কিন্তু নেপালি কর্তৃপক্ষ যে ভূকম্পীয় সংকেত পেয়েছিল, তা ভূমিকম্পের সঙ্গে মেলেনি, যা জনসাধারণকে সতর্ক করতে পারত, এবং ভাটির নদীগুলোর জলমাপক যন্ত্রগুলোও কোনো ভয়াবহ বন্যার জন্য তৈরি করা হয়নি। যদি কোনো যোগাযোগ টাওয়ার ভেঙে পড়ত, তাহলে নেপালি কর্তৃপক্ষকে বাসিন্দাদের সতর্ক করার জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হতো। বর্তমান আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের দুর্যোগে জীবন বাঁচাতে হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা সেন্সর স্থাপন করতে হবে।

দ্য নেচার পত্রিকা তাদের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় জানিয়েছে যে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইট থেকে ৮ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সংগৃহীত রাডার ডেটা থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, দৃশ্যমান ধস এলাকার কাছে হিমবাহ-শিলা ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছিল, যার গতিবেগ ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১০ মিলিমিটার। প্রকৃতপক্ষে, এটি ধসে পড়ার এবং একটি মারাত্মক আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি হিমবাহ-শিলাপুঞ্জের ত্বরান্বিত গতিকে প্রকাশ করে। আমরা দুটি পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবতে পারি। হয় দুর্যোগটি একটি বিশাল ভূমিধসের মাধ্যমে শুরু হতে পারে, যা হিমবাহের একটি অংশকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়, অথবা হিমবাহটি প্রথমে ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে শিলাগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসে পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আমি দ্বিতীয় বিকল্পটিই ধরে নিচ্ছি; এর অর্থ হলো প্রথমে হিমবাহের ধস।

যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, এই ধরনের দুর্যোগ আবার ঘটতে পারে। এই বছর, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ‘লিমিটিং ওভারশুট’ (২০২৬) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির যুগে প্রবেশের পরিণতি এবং উপলব্ধ বিকল্পগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি গতিশীল পথ, যা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং পরবর্তী তাপমাত্রা হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিবেদনটিতে উচ্চ মাত্রার উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ও প্রভাব, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন সীমিত করতে এবং তাপমাত্রা হ্রাসে সক্ষম করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশমন পথ, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন ও হ্রাসের পথে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন ও উন্নয়ন পদ্ধতিগুলোকে কীভাবে সাড়া দিতে হবে, তা অন্বেষণ করা হয়েছে। প্রমাণগুলো ধারাবাহিকভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, উচ্চতর সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বৃহত্তর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউএনইপির প্রতিবেদনে হিমালয় এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে, যার মধ্যে নেপালও অন্তর্ভুক্ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এতে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, পানিসম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্রের সেবা সম্পর্কিত গবেষণা এবং পার্বত্য অঞ্চলে পানি, শক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হিমবাহের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্য হিমালয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং কৃষি, জলবিদ্যুৎ ও পানীয় জলের জন্য হিমবাহের গলিত জলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই গবেষণাগুলো নেপালের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নেপালে কৃষি ব্যবস্থাপনায় হিমবাহের গলিত পানির প্রয়োজন হলেও, দেশটি এর আকস্মিক বিস্ফোরণ চায় না। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে শুধুমাত্র নেপালেই আনুমানিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। নেপাল সরকার জলবায়ু দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য জাতিসংঘের তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।

সর্বোপরি, এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলার জন্য বিদ্যমান পর্যবেক্ষণ কৌশল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট নয়। নেপালের জন্য একটি জাতীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, চীন, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়ে গঠিত একটি বহুজাতিক হিমালয় অঞ্চল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পূর্বাভাস বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে অঞ্চল থেকে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে, তা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি বা তার ওপারে অবস্থিত। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত পরিস্থিতি, যেখানে কার্যকর সতর্কবার্তা দেশগুলোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ এবং বিপদ সম্পর্কিত তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী অধ্যাপক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

গত ১ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকার কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ হিমালয়ে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত বরাবর বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়, যাতে শত শত বিদেশি পর্যটকসহ ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৪,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন এবং ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। চীন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৬১ জন বিদেশিসহ নিখোঁজ ৫৪৬ জনের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে যে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) রাসুয়া এবং নুয়াকোটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধাদিঙ, গোর্খা এবং চিতওয়ানকে মাঝারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নেপাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে গ্রামগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘নদীতে ২০ মিলিয়ন ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি ছিল এবং তা ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা সুনামির মতো।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অঞ্চলের নদীগুলোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে পরবর্তীতে আরও আকস্মিকভাবে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দেখেছি যে, যখন শিলা ও বরফের বিশাল স্তূপ এমন বিস্ফোরণের সঙ্গে মাটিতে আঘাত করে, তখন তা পানিতে রূপান্তরিত হয়। ২,০০০ ফুট চওড়া শিলায় সঞ্চিত সমস্ত স্থিতিশক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যে গতিশক্তি এবং তরলে রূপান্তরিত হয়।

হিমালয় অঞ্চলে এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত জুলাই মাসে, লেন্ডে খোলা নদীর সীমান্তে একটি ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ নদীর পানির স্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটায়। ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ১৭,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক হ্রদে একটি ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট বন্যা বাংলাদেশের তিস্তা নদী বরাবর ৩৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ২০২১ সালে, ভারতেরই চামোলির কাছে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ঘন লিটার পানি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং এতে ৭০ জন নিহত হন।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। এটি উল্লেখ্য যে, ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক কার্যকলাপ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পীয় সংকেত একই রকম হয় না। মূল পার্থক্য হলো, ভূমিকম্পে পি-তরঙ্গ নামে পরিচিত তীক্ষ্ণ, আকস্মিক প্রাথমিক সংকেত এবং এস-তরঙ্গ নামে পরিচিত স্পষ্ট উচ্চ কম্পাঙ্কের গৌণ সংকেত উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, বিস্ফোরণের মতো অন্যান্য ঘটনায় আরও শক্তিশালী সংকোচন ঘটে এবং আগ্নেয়গিরি বা ভূমিধসে একটানা, ধীর গড়গড় শব্দে সংকেত পাওয়া যায়। কিন্তু নেপালি কর্তৃপক্ষ যে ভূকম্পীয় সংকেত পেয়েছিল, তা ভূমিকম্পের সঙ্গে মেলেনি, যা জনসাধারণকে সতর্ক করতে পারত, এবং ভাটির নদীগুলোর জলমাপক যন্ত্রগুলোও কোনো ভয়াবহ বন্যার জন্য তৈরি করা হয়নি। যদি কোনো যোগাযোগ টাওয়ার ভেঙে পড়ত, তাহলে নেপালি কর্তৃপক্ষকে বাসিন্দাদের সতর্ক করার জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হতো। বর্তমান আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের দুর্যোগে জীবন বাঁচাতে হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা সেন্সর স্থাপন করতে হবে।

দ্য নেচার পত্রিকা তাদের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় জানিয়েছে যে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইট থেকে ৮ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সংগৃহীত রাডার ডেটা থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, দৃশ্যমান ধস এলাকার কাছে হিমবাহ-শিলা ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছিল, যার গতিবেগ ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১০ মিলিমিটার। প্রকৃতপক্ষে, এটি ধসে পড়ার এবং একটি মারাত্মক আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি হিমবাহ-শিলাপুঞ্জের ত্বরান্বিত গতিকে প্রকাশ করে। আমরা দুটি পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবতে পারি। হয় দুর্যোগটি একটি বিশাল ভূমিধসের মাধ্যমে শুরু হতে পারে, যা হিমবাহের একটি অংশকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়, অথবা হিমবাহটি প্রথমে ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে শিলাগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসে পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আমি দ্বিতীয় বিকল্পটিই ধরে নিচ্ছি; এর অর্থ হলো প্রথমে হিমবাহের ধস।

যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, এই ধরনের দুর্যোগ আবার ঘটতে পারে। এই বছর, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ‘লিমিটিং ওভারশুট’ (২০২৬) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির যুগে প্রবেশের পরিণতি এবং উপলব্ধ বিকল্পগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি গতিশীল পথ, যা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং পরবর্তী তাপমাত্রা হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিবেদনটিতে উচ্চ মাত্রার উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ও প্রভাব, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন সীমিত করতে এবং তাপমাত্রা হ্রাসে সক্ষম করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশমন পথ, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন ও হ্রাসের পথে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন ও উন্নয়ন পদ্ধতিগুলোকে কীভাবে সাড়া দিতে হবে, তা অন্বেষণ করা হয়েছে। প্রমাণগুলো ধারাবাহিকভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, উচ্চতর সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বৃহত্তর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউএনইপির প্রতিবেদনে হিমালয় এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে, যার মধ্যে নেপালও অন্তর্ভুক্ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এতে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, পানিসম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্রের সেবা সম্পর্কিত গবেষণা এবং পার্বত্য অঞ্চলে পানি, শক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হিমবাহের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্য হিমালয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং কৃষি, জলবিদ্যুৎ ও পানীয় জলের জন্য হিমবাহের গলিত জলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই গবেষণাগুলো নেপালের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নেপালে কৃষি ব্যবস্থাপনায় হিমবাহের গলিত পানির প্রয়োজন হলেও, দেশটি এর আকস্মিক বিস্ফোরণ চায় না। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে শুধুমাত্র নেপালেই আনুমানিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। নেপাল সরকার জলবায়ু দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য জাতিসংঘের তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।

সর্বোপরি, এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলার জন্য বিদ্যমান পর্যবেক্ষণ কৌশল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট নয়। নেপালের জন্য একটি জাতীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, চীন, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়ে গঠিত একটি বহুজাতিক হিমালয় অঞ্চল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পূর্বাভাস বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে অঞ্চল থেকে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে, তা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি বা তার ওপারে অবস্থিত। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত পরিস্থিতি, যেখানে কার্যকর সতর্কবার্তা দেশগুলোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ এবং বিপদ সম্পর্কিত তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী অধ্যাপক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত