সংবাদ

৫৫ বছরেই নিঃস্ব, ৫১০ বছরেও সমৃদ্ধ


মীর আব্দুল আলীম
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

৫৫ বছরেই নিঃস্ব, ৫১০ বছরেও সমৃদ্ধ
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়

যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল মেল’ পার করে ফেলেছে আস্ত পাঁচ-পাঁচটি শতাব্দী। ৫১০ বছর বয়সেও তারা আধুনিক ও লাভজনক। আর মাত্র ৫৫ বছরে পা দিয়েই নিঃশ্বাসের শেষ টান গুনছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। বিভাগীয় শহর থেকে জেলা, উপজেলা হয়ে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম ছড়িয়ে রয়েছে দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর। সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর নিজস্ব সম্পদ। খাতায়-কলমে যা এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য; বাস্তবে তা কেবল অতীত গৌরবের এক ফাঁকা কঙ্কাল। ডাক বিভাগ আজ এক চরম দেউলিয়াত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক হাহাকারের নামান্তর মাত্র।

বিলেতের রয়্যাল মেল যেখানে পুরো লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে নিজের ছাতার তলায় এনে ব্যবসার অভিমুখ বদলে নিল, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো ছবি। ডাক বিভাগের ছায়ায় বেসরকারি কুরিয়ারের ভাড়া রমরমা বাড়ল, আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগকে ঠেলে দেওয়া হলো অন্ধকূপের দিকে। এমন স্বর্ণপ্রসূ নেটওয়ার্ক হাতে থাকা সত্ত্বেও কেন আজ মৃত্যুঘণ্টা বাজছে সরকারি ডাক সেবার? এ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক নির্মম, নীরব নিধনযজ্ঞ।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই করুণ পরিণতি কি শুধুই ব্যর্থতা, নাকি বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবসাগুলোকে চাঙ্গা করতে ডাক বিভাগকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার কোনো ষড়যন্ত্র? যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল যেভাবে পুরো দেশের লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে যুগোপযোগী ব্যবসায় রূপান্তর করেছে, বাংলাদেশেও ডাক বিভাগের অধীনেই বেসরকারি কুরিয়ারগুলোকে পরিচালনা করে বিশাল রাজস্ব আয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে উল্টো সরকারি ডাক বিভাগকে তিল তিল করে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেই খালি মাঠে রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। এমন সুসংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও প্রাচুর্য থাকার পরও ডাক বিভাগ কেন আজ নিঃস্ব ও মৃত্যুপথযাত্রী?

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সংকটকে কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্রের একটি বিশাল সম্পদকে অকার্যকর করে রাখার গল্প। পৃথিবীর অনেক দেশ নতুন করে জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। আর বাংলাদেশ এমন একটি নেটওয়ার্কের মালিক, যা স্বাধীনতারও আগে থেকে গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশের ডাক বিভাগ একই সময়ে সেই গতিতে এগোতে পারেনি। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি সেবা নেটওয়ার্ক হওয়া সত্ত্বেও ডাক বিভাগের বিশাল সম্ভাবনা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি। যে প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্স, জাতীয় লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল জনসেবার প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারত, সেটি আজও তার প্রকৃত সক্ষমতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তাই এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রশাসনিক নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যাতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও রয়্যাল মেইলের মতো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক ও লাভজনক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল আজ শুধু একটি ডাক সেবা প্রতিষ্ঠান নয়; প্রচলিত চিঠি পরিবহনের গণ্ডি পেরিয়ে তারা পার্সেল ডেলিভারি, ই-কমার্স লজিস্টিকস, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় সোর্টিং, ব্যবসায়িক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবাকে একীভূত করে নিজেদের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। সময়ের পরিবর্তনকে তারা সংকট হিসেবে নয়, নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সামনেও একই সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত। দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘরকে কেন্দ্র করে ই-কমার্স পণ্য পরিবহন, সরকারি ও বেসরকারি নথি সরবরাহ, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিপণন, পোস্টাল ব্যাংকিং, সরকারি ভাতা বিতরণ, ইউটিলিটি বিল গ্রহণ, ডিজিটাল সরকারি সেবা, এমনকি গ্রামীণ লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি আধুনিক বহুমুখী সেবাকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। প্রয়োজন কেবল দূরদর্শী পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সঠিক সংস্কার ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও শুধু লোকসানের গ্লানি থেকে মুক্তিই পাবে না, বরং রাষ্ট্রের অন্যতম লাভজনক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে সক্ষম হবে। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকঘরের উপস্থিতি রয়েছে। এমন বহু এলাকা আছে, যেখানে কোনো বড় বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শাখা নেই; কিন্তু ডাক বিভাগের নিজস্ব অফিস রয়েছে। এই ভৌগোলিক বিস্তারই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথচ এই শক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অব্যবহৃত রাখা হয়েছে।

একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজ যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন করে সারা দেশে ১০ হাজার অফিস, হাজার হাজার কর্মী এবং প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানোর মতো একটি জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, তাহলে কত অর্থ ব্যয় হবে? জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, জনবল নিয়োগ, যানবাহন, প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে সেই ব্যয় হবে কয়েক লাখ কোটি টাকা। অথচ সেই অবকাঠামোর বড় অংশ আজ রাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্পদের অনেকটাই অলস পড়ে আছে। বহু ডাকঘরের ভবন জরাজীর্ণ, অনেক স্থানে পর্যাপ্ত জনবল নেই, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, আর যেখানে প্রযুক্তি পৌঁছেছে, সেখানেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে জনগণের আস্থা কমেছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে বেসরকারি খাত।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের সম্পদ যতদিন অব্যবহৃত থাকবে, ততদিন তার আর্থিক মূল্যই শুধু কমবে না; জনগণের আস্থাও ক্ষয় হবে।

আজ বিশ্বব্যাপী লজিস্টিকস শিল্পকে আগামী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ই-কমার্সের বিস্তার, অনলাইন ব্যবসা, কৃষিপণ্য বিপণন এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি পার্সেল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। এই বাজারে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ডাক বিভাগ। কারণ তাদের রয়েছে অবকাঠামো, জনবল, অভিজ্ঞতা এবং সারা দেশে বিস্তৃত উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারত, সেটিই আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্ভাগ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও এক গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতি। বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে যদি নতুনভাবে ভাবা যায়, তাহলে এটি কেবল একটি ডাক পরিবহনকারী সংস্থা থাকবে না; এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় লজিস্টিকস করপোরেশন, সবচেয়ে বড় গ্রামীণ ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারি ডেলিভারি নেটওয়ার্ক। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যেই সেই পথেই হাঁটছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?

বাংলাদেশের ডাক বিভাগের ইতিহাস শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের জনগণের সঙ্গে সংযোগের ইতিহাস। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ডাকঘর ছিল আস্থা, নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রতীক। চাকরির নিয়োগপত্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি চিঠি, আদালতের সমন, মানি অর্ডার, সঞ্চয়পত্র কিংবা প্রবাসী স্বজনের পাঠানো সংবাদ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ডাকঘর। আজ সেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অস্তিত্বসংকটে। অথচ এই সংকট অবকাঠামোর নয়। দেশের প্রায় ৯,৮৮৬টি ডাকঘর, ৪০ হাজারের বেশি জনবল এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি ও স্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখনো দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি নেটওয়ার্ক। নতুন করে এমন একটি অবকাঠামো গড়তে গেলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু বিদ্যমান সম্পদকে যুগোপযোগী করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অবহেলা করা হয়েছে।

অনেকে মনে করেন, স্মার্টফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিঠির সংখ্যা কমেছে, কিন্তু পার্সেল, ই-কমার্স এবং লজিস্টিকস সেবার চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি ডাক বিভাগের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং প্রযুক্তিই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সেটিই প্রমাণ করেছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল, ভারতের ইন্ডিয়া পোস্ট, জাপান পোস্ট কিংবা জার্মানির ডয়চে পোস্ট সবাই নিজেদের আধুনিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। তারা শুধু চিঠি বহন করে না; তারা পার্সেল পরিবহন, ই-কমার্স, আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং গ্রাহকসেবার সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশেও সেই সুযোগ ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু বিভিন্ন মহল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ডাক বিভাগকে আধুনিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়নি। একই সময়ে বেসরকারি কুরিয়ার খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে তারা লাভ করছে অথচ ডাক বিভাগের নিজস্ব সম্পদ থাকার পরও সেটা হচ্ছে না। কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার না হলেও বেসরকারি খাত বিশাল বাজার দখল করেছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, কারণ রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়।

আজ দেশের ই-কমার্স বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পার্সেল দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজারের কতটুকু রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে? উত্তর অত্যন্ত হতাশাজনক। অথচ সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, আদালত, শিক্ষা বোর্ড, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ভূমি অফিস এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র ও পার্সেল ডাক বিভাগের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে প্রেরণের ব্যবস্থা করা গেলে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব। এর পাশাপাশি প্রতিটি ডাকঘরকে ই-কমার্সের পিক-আপ ও ড্রপ-অফ সেন্টারে পরিণত করা যেতে পারে। গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা কিংবা হস্তশিল্প প্রস্তুতকারক সহজেই তাঁদের পণ্য দেশের যেকোনো স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তেমনি ডাক বিভাগও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। শুধু পার্সেল নয়, ডাকঘরকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশে পোস্টাল ব্যাংকিং অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশেও ডাকঘরের সঞ্চয়ী কার্যক্রমকে আধুনিক ডিজিটাল পোস্টাল ব্যাংকে রূপান্তর করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সহজ হবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রতিটি পার্সেলের জন্য রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক যেন মুহূর্তেই জানতে পারেন তাঁর পার্সেল কোথায় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। গাফিলতির ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি এবং দক্ষতার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

একটি বাস্তবসম্মত পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ডাক বিভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রথম বছরে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, দ্বিতীয় বছরে সরকারি ডাক পরিবহনের মূল দায়িত্ব ডাক বিভাগের হাতে দেওয়া, তৃতীয় বছরে ই-কমার্স লজিস্টিকস হাব হিসেবে ডাকঘরগুলোকে গড়ে তোলা এবং পরবর্তী দুই বছরে পোস্টাল ব্যাংকিং ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাবলম্বী করা যেতে পারে। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানেরও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিযোগিতা থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়। একটি ঐতিহাসিক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল রেখে বাজারকে একতরফাভাবে অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক হতে পারে না।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি দেশের অন্যতম মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। এই সম্পদকে পুনরুজ্জীবিত করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, ডিজিটাল বাণিজ্য, সরকারি সেবা এবং জাতীয় লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রশাসন, আধুনিক প্রযুক্তি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ডাক বিভাগের পুনর্জাগরণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়ন, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠনের এক নতুন অধ্যায়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


৫৫ বছরেই নিঃস্ব, ৫১০ বছরেও সমৃদ্ধ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল মেল’ পার করে ফেলেছে আস্ত পাঁচ-পাঁচটি শতাব্দী। ৫১০ বছর বয়সেও তারা আধুনিক ও লাভজনক। আর মাত্র ৫৫ বছরে পা দিয়েই নিঃশ্বাসের শেষ টান গুনছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। বিভাগীয় শহর থেকে জেলা, উপজেলা হয়ে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম ছড়িয়ে রয়েছে দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর। সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর নিজস্ব সম্পদ। খাতায়-কলমে যা এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য; বাস্তবে তা কেবল অতীত গৌরবের এক ফাঁকা কঙ্কাল। ডাক বিভাগ আজ এক চরম দেউলিয়াত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক হাহাকারের নামান্তর মাত্র।

বিলেতের রয়্যাল মেল যেখানে পুরো লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে নিজের ছাতার তলায় এনে ব্যবসার অভিমুখ বদলে নিল, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো ছবি। ডাক বিভাগের ছায়ায় বেসরকারি কুরিয়ারের ভাড়া রমরমা বাড়ল, আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগকে ঠেলে দেওয়া হলো অন্ধকূপের দিকে। এমন স্বর্ণপ্রসূ নেটওয়ার্ক হাতে থাকা সত্ত্বেও কেন আজ মৃত্যুঘণ্টা বাজছে সরকারি ডাক সেবার? এ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক নির্মম, নীরব নিধনযজ্ঞ।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই করুণ পরিণতি কি শুধুই ব্যর্থতা, নাকি বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবসাগুলোকে চাঙ্গা করতে ডাক বিভাগকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার কোনো ষড়যন্ত্র? যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল যেভাবে পুরো দেশের লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে যুগোপযোগী ব্যবসায় রূপান্তর করেছে, বাংলাদেশেও ডাক বিভাগের অধীনেই বেসরকারি কুরিয়ারগুলোকে পরিচালনা করে বিশাল রাজস্ব আয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে উল্টো সরকারি ডাক বিভাগকে তিল তিল করে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেই খালি মাঠে রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। এমন সুসংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও প্রাচুর্য থাকার পরও ডাক বিভাগ কেন আজ নিঃস্ব ও মৃত্যুপথযাত্রী?

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সংকটকে কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্রের একটি বিশাল সম্পদকে অকার্যকর করে রাখার গল্প। পৃথিবীর অনেক দেশ নতুন করে জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। আর বাংলাদেশ এমন একটি নেটওয়ার্কের মালিক, যা স্বাধীনতারও আগে থেকে গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশের ডাক বিভাগ একই সময়ে সেই গতিতে এগোতে পারেনি। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি সেবা নেটওয়ার্ক হওয়া সত্ত্বেও ডাক বিভাগের বিশাল সম্ভাবনা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি। যে প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্স, জাতীয় লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল জনসেবার প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারত, সেটি আজও তার প্রকৃত সক্ষমতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তাই এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রশাসনিক নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যাতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও রয়্যাল মেইলের মতো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক ও লাভজনক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল আজ শুধু একটি ডাক সেবা প্রতিষ্ঠান নয়; প্রচলিত চিঠি পরিবহনের গণ্ডি পেরিয়ে তারা পার্সেল ডেলিভারি, ই-কমার্স লজিস্টিকস, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় সোর্টিং, ব্যবসায়িক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবাকে একীভূত করে নিজেদের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। সময়ের পরিবর্তনকে তারা সংকট হিসেবে নয়, নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সামনেও একই সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত। দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘরকে কেন্দ্র করে ই-কমার্স পণ্য পরিবহন, সরকারি ও বেসরকারি নথি সরবরাহ, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিপণন, পোস্টাল ব্যাংকিং, সরকারি ভাতা বিতরণ, ইউটিলিটি বিল গ্রহণ, ডিজিটাল সরকারি সেবা, এমনকি গ্রামীণ লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি আধুনিক বহুমুখী সেবাকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। প্রয়োজন কেবল দূরদর্শী পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সঠিক সংস্কার ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও শুধু লোকসানের গ্লানি থেকে মুক্তিই পাবে না, বরং রাষ্ট্রের অন্যতম লাভজনক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে সক্ষম হবে। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকঘরের উপস্থিতি রয়েছে। এমন বহু এলাকা আছে, যেখানে কোনো বড় বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শাখা নেই; কিন্তু ডাক বিভাগের নিজস্ব অফিস রয়েছে। এই ভৌগোলিক বিস্তারই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথচ এই শক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অব্যবহৃত রাখা হয়েছে।

একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজ যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন করে সারা দেশে ১০ হাজার অফিস, হাজার হাজার কর্মী এবং প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানোর মতো একটি জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, তাহলে কত অর্থ ব্যয় হবে? জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, জনবল নিয়োগ, যানবাহন, প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে সেই ব্যয় হবে কয়েক লাখ কোটি টাকা। অথচ সেই অবকাঠামোর বড় অংশ আজ রাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্পদের অনেকটাই অলস পড়ে আছে। বহু ডাকঘরের ভবন জরাজীর্ণ, অনেক স্থানে পর্যাপ্ত জনবল নেই, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, আর যেখানে প্রযুক্তি পৌঁছেছে, সেখানেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে জনগণের আস্থা কমেছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে বেসরকারি খাত।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের সম্পদ যতদিন অব্যবহৃত থাকবে, ততদিন তার আর্থিক মূল্যই শুধু কমবে না; জনগণের আস্থাও ক্ষয় হবে।

আজ বিশ্বব্যাপী লজিস্টিকস শিল্পকে আগামী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ই-কমার্সের বিস্তার, অনলাইন ব্যবসা, কৃষিপণ্য বিপণন এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি পার্সেল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। এই বাজারে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ডাক বিভাগ। কারণ তাদের রয়েছে অবকাঠামো, জনবল, অভিজ্ঞতা এবং সারা দেশে বিস্তৃত উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারত, সেটিই আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্ভাগ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও এক গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতি। বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে যদি নতুনভাবে ভাবা যায়, তাহলে এটি কেবল একটি ডাক পরিবহনকারী সংস্থা থাকবে না; এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় লজিস্টিকস করপোরেশন, সবচেয়ে বড় গ্রামীণ ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারি ডেলিভারি নেটওয়ার্ক। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যেই সেই পথেই হাঁটছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?

বাংলাদেশের ডাক বিভাগের ইতিহাস শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের জনগণের সঙ্গে সংযোগের ইতিহাস। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ডাকঘর ছিল আস্থা, নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রতীক। চাকরির নিয়োগপত্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি চিঠি, আদালতের সমন, মানি অর্ডার, সঞ্চয়পত্র কিংবা প্রবাসী স্বজনের পাঠানো সংবাদ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ডাকঘর। আজ সেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অস্তিত্বসংকটে। অথচ এই সংকট অবকাঠামোর নয়। দেশের প্রায় ৯,৮৮৬টি ডাকঘর, ৪০ হাজারের বেশি জনবল এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি ও স্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখনো দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি নেটওয়ার্ক। নতুন করে এমন একটি অবকাঠামো গড়তে গেলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু বিদ্যমান সম্পদকে যুগোপযোগী করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অবহেলা করা হয়েছে।

অনেকে মনে করেন, স্মার্টফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিঠির সংখ্যা কমেছে, কিন্তু পার্সেল, ই-কমার্স এবং লজিস্টিকস সেবার চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি ডাক বিভাগের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং প্রযুক্তিই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সেটিই প্রমাণ করেছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল, ভারতের ইন্ডিয়া পোস্ট, জাপান পোস্ট কিংবা জার্মানির ডয়চে পোস্ট সবাই নিজেদের আধুনিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। তারা শুধু চিঠি বহন করে না; তারা পার্সেল পরিবহন, ই-কমার্স, আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং গ্রাহকসেবার সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশেও সেই সুযোগ ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু বিভিন্ন মহল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ডাক বিভাগকে আধুনিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়নি। একই সময়ে বেসরকারি কুরিয়ার খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে তারা লাভ করছে অথচ ডাক বিভাগের নিজস্ব সম্পদ থাকার পরও সেটা হচ্ছে না। কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার না হলেও বেসরকারি খাত বিশাল বাজার দখল করেছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, কারণ রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়।

আজ দেশের ই-কমার্স বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পার্সেল দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজারের কতটুকু রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে? উত্তর অত্যন্ত হতাশাজনক। অথচ সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, আদালত, শিক্ষা বোর্ড, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ভূমি অফিস এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র ও পার্সেল ডাক বিভাগের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে প্রেরণের ব্যবস্থা করা গেলে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব। এর পাশাপাশি প্রতিটি ডাকঘরকে ই-কমার্সের পিক-আপ ও ড্রপ-অফ সেন্টারে পরিণত করা যেতে পারে। গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা কিংবা হস্তশিল্প প্রস্তুতকারক সহজেই তাঁদের পণ্য দেশের যেকোনো স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তেমনি ডাক বিভাগও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। শুধু পার্সেল নয়, ডাকঘরকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশে পোস্টাল ব্যাংকিং অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশেও ডাকঘরের সঞ্চয়ী কার্যক্রমকে আধুনিক ডিজিটাল পোস্টাল ব্যাংকে রূপান্তর করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সহজ হবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রতিটি পার্সেলের জন্য রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক যেন মুহূর্তেই জানতে পারেন তাঁর পার্সেল কোথায় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। গাফিলতির ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি এবং দক্ষতার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

একটি বাস্তবসম্মত পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ডাক বিভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রথম বছরে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, দ্বিতীয় বছরে সরকারি ডাক পরিবহনের মূল দায়িত্ব ডাক বিভাগের হাতে দেওয়া, তৃতীয় বছরে ই-কমার্স লজিস্টিকস হাব হিসেবে ডাকঘরগুলোকে গড়ে তোলা এবং পরবর্তী দুই বছরে পোস্টাল ব্যাংকিং ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাবলম্বী করা যেতে পারে। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানেরও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিযোগিতা থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়। একটি ঐতিহাসিক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল রেখে বাজারকে একতরফাভাবে অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক হতে পারে না।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি দেশের অন্যতম মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। এই সম্পদকে পুনরুজ্জীবিত করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, ডিজিটাল বাণিজ্য, সরকারি সেবা এবং জাতীয় লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রশাসন, আধুনিক প্রযুক্তি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ডাক বিভাগের পুনর্জাগরণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়ন, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠনের এক নতুন অধ্যায়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত