২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা নেমে এসেছে বরিশাল নগরীর ব্যস্ত প্যারারা রোডে। চারপাশের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খাঁ খাঁ করছে দৈনিক সমকাল-এর ব্যুরো কার্যালয়। অফিসের পিয়ন ছুটিতে থাকায় চারপাশ সুনসান নিস্তব্ধ। এককালের চেনা নিউজরুমের ভেতরে প্রবেশ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি। দেড় দশকের কাজের স্মৃতিঘেরা সেই চেনা অফিসে প্লাস্টিকের দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।
পকেটে পাওয়া যায় হাতে লেখা পাঁচটি আলাদা সুইসাইড নোট। যে মানুষটি সারাজীবন বরিশালের প্রগতিশীল আন্দোলন ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রদীপ জ্বেলেছেন, তার মৃত্যুর পূর্বে রেখে যাওয়া চিরকুটের প্রতিটি অক্ষর যেন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চাকচিক্যময় পর্দার আড়ালে লুকানো এক অন্ধকার শোষণের প্রমাণ। স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে লেখা তার শেষ আকুতি “পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না”। আর সমকালের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছে লেখা শেষ চিরকুটে ফুটে ওঠে এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার চিত্র ‘যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও’।
সুদীর্ঘ দেড় দশকের কাজের জায়গায় বসে, মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়েও পরিবারের ভবিষ্যৎ অনটন নিয়ে এমন আকুতি এক গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতকে দৃশ্যমান করে তোলে।
আজকের পত্রিকার প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার যখন নিজের অসুস্থতা, পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট আর বেতন না বাড়ার কষ্টে মেঘনা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে লেখেন- “দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক”, তখন তা পুরো সাংবাদিক সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, কিন্তু বিচার হবে কার, বিচার করবে কে?
একইভাবে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট হাতিরঝিল লেক থেকে উদ্ধার করা হয় গাজী টিভির ৩২ বছর বয়সী নিউজ রুম এডিটর সারা রাহানুমার ভাসমান মরদেহ। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারার শেষ পোস্টটি ছিল ‘মরার মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো’।এই নিভে জাওয়া প্রাণ গুলো প্রমাণ করে যে, নিউজরুমের জমকালো বাতির নিচে প্রতিদিন তিল তিল করে রক্তক্ষরণ ঘটছে শত শত সংবাদকর্মীর।
স্বপ্নের পেশায় ছাঁটাই, অনাহার ও ওয়েজবোর্ডের ফাঁকি
সাংবাদিকতা কি পেটের ভাত জোগানোর জন্য সবচেয়ে অনিশ্চিত পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে? পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ মাস বেকার ছিলেন। বয়স বাড়ার পর অন্য কোথাও পুনর্নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। দীর্ঘদিনের পিঠের তীব্র ব্যথার চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম আর্থিক সংস্থানও তাঁর হাতে ছিল না।
গণমাধ্যম মালিকদের এই চরম শ্রম শোষণের আন্তর্জাতিক রূপ দেখা যায় প্রতিবেশী দেশ ভারতেও-যেখানে তামিলনাড়ুর ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার (UNI) ৫৬ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক টি কুমার টানা ৬০ মাস (৫ বছর) বেতন না পেয়ে এবং মেয়ের বাগদানের আর্থিক সংস্থান করতে না পেরে অফিসের নিউজরুমেই আত্মহনন করেছিলেন।
অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে আইনি দণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয়াল থাবা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের (CSA) কালো খড়গের কারণে সাংবাদিকদের সর্বক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৮২ থেকে ২৬৬ জন সাংবাদিককে গণ-অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উসকানির মামলা হয়েছে। হ্যাঁ, এখানে সাংবাদিকদের কিছুটা হলেও দায় রয়েছে। তবে ভেবে দেখতে হবে প্রতিটি নিউজ হাউজের নিজস্ব পলিসি থাকে, সেই পলিসির বাইরে সাংবাদিকরা যেতে পারেন না। তাই তাদের লেখায় নিউজ হাউজের ছাপ থাকে যায়। আর সেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় নিতে হয় ব্যক্তি সাংবাদিককে।
অন্যদিকে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে আসাদুজ্জামান তুহিনের মতো তরুণ সাংবাদিকদের চাঁদাবাজ ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়। গাজীপুরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে তুহিনকে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র একটি অপরাধের ভিডিও রেকর্ড করার কারণে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আদালত ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২৯ বার পিছিয়েছে, যা দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে স্পষ্ট করে।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ফিল্ড রিপোর্টারদের প্রতিনিয়ত লাশ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ট্রমার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু নিউজ রুমে তাদের মানসিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুস সালাম ও মো. রইসুল ইসলাম পরিচালিত ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:
• ১০ শতাংশ ফিল্ড সাংবাদিক প্রবেবল PTSD (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার)-এ ভুগছেন, আর ফ্রন্টলাইন রিপোর্টারদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ ।
• ১৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত এবং মোট ৬৫ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যেই বিষণ্ণতার লক্ষণ বিদ্যমান। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তীব্র বিষণ্নতার হার পুরুষদের তুলনায় দশগুণ বেশি।
• ২০ শতাংশ তীব্র উদ্বেগজনিত ব্যাধি এবং ৩০ শতাংশ চরম মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউটে জর্জরিত।
• পেশাগত ট্রমা নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে ৩০ শতাংশ সাংবাদিক মাদকাসক্তি এবং ৫৫ শতাংশ সমাজবিচ্ছিন্নতার মতো ক্ষতিকর কোপিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
এত বড় মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের বিপরীতে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে শূন্য শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা কাউন্সেলিং সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ সাংবাদিক জীবনে কখনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিউজরুমে নিজের ট্রমা বা কান্না প্রকাশ করাকে অদক্ষতা বা দুর্বলতা বলে খোটা দেওয়া হয়।
সাংবাদিক সংগঠনগুলো যখন দলীয় মেরুকরণে ব্যস্ত, তখন একজন সাধারণ সাংবাদিক চাকরি হারালে বা আইনি জটিলতায় পড়লে পুরোপুরি একাকি হয়ে যান। নিউজ রুমের সহকর্মীরাও নিজের চাকরি বাঁচানোর ভয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন। পুলক চ্যাটার্জি চাকরি হারানোর পরও প্রায় প্রতিদিন নিজের কাছে থাকা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে সমকালের ফাঁকা অফিসে এসে সংবাদপত্র পড়তেন-যা তার পেশার প্রতি গভীর মানসিক টান এবং তীব্র একাকীত্ব কাটানোর এক আকুল ব্যাকুলতাকে নির্দেশ করে।
হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা
আজ যদি গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক দল ও নীতি-নির্ধারকেরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন না করেন-তবে কাল হয়তো আরও একজন পুলক চ্যাটার্জি, আরও একজন সারা রাহানুমা কিংবা বিভুরঞ্জন সরকারের নিথর মরদেহ আমাদের সংবাদকক্ষের দরজায় ঝুলবে। আর সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ এই সমাজ বা গণমাধ্যমের থাকবে না।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা নেমে এসেছে বরিশাল নগরীর ব্যস্ত প্যারারা রোডে। চারপাশের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খাঁ খাঁ করছে দৈনিক সমকাল-এর ব্যুরো কার্যালয়। অফিসের পিয়ন ছুটিতে থাকায় চারপাশ সুনসান নিস্তব্ধ। এককালের চেনা নিউজরুমের ভেতরে প্রবেশ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি। দেড় দশকের কাজের স্মৃতিঘেরা সেই চেনা অফিসে প্লাস্টিকের দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।
পকেটে পাওয়া যায় হাতে লেখা পাঁচটি আলাদা সুইসাইড নোট। যে মানুষটি সারাজীবন বরিশালের প্রগতিশীল আন্দোলন ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রদীপ জ্বেলেছেন, তার মৃত্যুর পূর্বে রেখে যাওয়া চিরকুটের প্রতিটি অক্ষর যেন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চাকচিক্যময় পর্দার আড়ালে লুকানো এক অন্ধকার শোষণের প্রমাণ। স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে লেখা তার শেষ আকুতি “পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না”। আর সমকালের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছে লেখা শেষ চিরকুটে ফুটে ওঠে এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার চিত্র ‘যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও’।
সুদীর্ঘ দেড় দশকের কাজের জায়গায় বসে, মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়েও পরিবারের ভবিষ্যৎ অনটন নিয়ে এমন আকুতি এক গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতকে দৃশ্যমান করে তোলে।
আজকের পত্রিকার প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার যখন নিজের অসুস্থতা, পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট আর বেতন না বাড়ার কষ্টে মেঘনা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে লেখেন- “দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক”, তখন তা পুরো সাংবাদিক সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, কিন্তু বিচার হবে কার, বিচার করবে কে?
একইভাবে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট হাতিরঝিল লেক থেকে উদ্ধার করা হয় গাজী টিভির ৩২ বছর বয়সী নিউজ রুম এডিটর সারা রাহানুমার ভাসমান মরদেহ। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারার শেষ পোস্টটি ছিল ‘মরার মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো’।এই নিভে জাওয়া প্রাণ গুলো প্রমাণ করে যে, নিউজরুমের জমকালো বাতির নিচে প্রতিদিন তিল তিল করে রক্তক্ষরণ ঘটছে শত শত সংবাদকর্মীর।
স্বপ্নের পেশায় ছাঁটাই, অনাহার ও ওয়েজবোর্ডের ফাঁকি
সাংবাদিকতা কি পেটের ভাত জোগানোর জন্য সবচেয়ে অনিশ্চিত পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে? পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ মাস বেকার ছিলেন। বয়স বাড়ার পর অন্য কোথাও পুনর্নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। দীর্ঘদিনের পিঠের তীব্র ব্যথার চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম আর্থিক সংস্থানও তাঁর হাতে ছিল না।
গণমাধ্যম মালিকদের এই চরম শ্রম শোষণের আন্তর্জাতিক রূপ দেখা যায় প্রতিবেশী দেশ ভারতেও-যেখানে তামিলনাড়ুর ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার (UNI) ৫৬ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক টি কুমার টানা ৬০ মাস (৫ বছর) বেতন না পেয়ে এবং মেয়ের বাগদানের আর্থিক সংস্থান করতে না পেরে অফিসের নিউজরুমেই আত্মহনন করেছিলেন।
অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে আইনি দণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয়াল থাবা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের (CSA) কালো খড়গের কারণে সাংবাদিকদের সর্বক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৮২ থেকে ২৬৬ জন সাংবাদিককে গণ-অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উসকানির মামলা হয়েছে। হ্যাঁ, এখানে সাংবাদিকদের কিছুটা হলেও দায় রয়েছে। তবে ভেবে দেখতে হবে প্রতিটি নিউজ হাউজের নিজস্ব পলিসি থাকে, সেই পলিসির বাইরে সাংবাদিকরা যেতে পারেন না। তাই তাদের লেখায় নিউজ হাউজের ছাপ থাকে যায়। আর সেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় নিতে হয় ব্যক্তি সাংবাদিককে।
অন্যদিকে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে আসাদুজ্জামান তুহিনের মতো তরুণ সাংবাদিকদের চাঁদাবাজ ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়। গাজীপুরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে তুহিনকে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র একটি অপরাধের ভিডিও রেকর্ড করার কারণে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আদালত ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২৯ বার পিছিয়েছে, যা দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে স্পষ্ট করে।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ফিল্ড রিপোর্টারদের প্রতিনিয়ত লাশ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ট্রমার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু নিউজ রুমে তাদের মানসিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুস সালাম ও মো. রইসুল ইসলাম পরিচালিত ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:
• ১০ শতাংশ ফিল্ড সাংবাদিক প্রবেবল PTSD (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার)-এ ভুগছেন, আর ফ্রন্টলাইন রিপোর্টারদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ ।
• ১৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত এবং মোট ৬৫ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যেই বিষণ্ণতার লক্ষণ বিদ্যমান। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তীব্র বিষণ্নতার হার পুরুষদের তুলনায় দশগুণ বেশি।
• ২০ শতাংশ তীব্র উদ্বেগজনিত ব্যাধি এবং ৩০ শতাংশ চরম মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউটে জর্জরিত।
• পেশাগত ট্রমা নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে ৩০ শতাংশ সাংবাদিক মাদকাসক্তি এবং ৫৫ শতাংশ সমাজবিচ্ছিন্নতার মতো ক্ষতিকর কোপিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
এত বড় মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের বিপরীতে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে শূন্য শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা কাউন্সেলিং সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ সাংবাদিক জীবনে কখনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিউজরুমে নিজের ট্রমা বা কান্না প্রকাশ করাকে অদক্ষতা বা দুর্বলতা বলে খোটা দেওয়া হয়।
সাংবাদিক সংগঠনগুলো যখন দলীয় মেরুকরণে ব্যস্ত, তখন একজন সাধারণ সাংবাদিক চাকরি হারালে বা আইনি জটিলতায় পড়লে পুরোপুরি একাকি হয়ে যান। নিউজ রুমের সহকর্মীরাও নিজের চাকরি বাঁচানোর ভয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন। পুলক চ্যাটার্জি চাকরি হারানোর পরও প্রায় প্রতিদিন নিজের কাছে থাকা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে সমকালের ফাঁকা অফিসে এসে সংবাদপত্র পড়তেন-যা তার পেশার প্রতি গভীর মানসিক টান এবং তীব্র একাকীত্ব কাটানোর এক আকুল ব্যাকুলতাকে নির্দেশ করে।
হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা
আজ যদি গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক দল ও নীতি-নির্ধারকেরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন না করেন-তবে কাল হয়তো আরও একজন পুলক চ্যাটার্জি, আরও একজন সারা রাহানুমা কিংবা বিভুরঞ্জন সরকারের নিথর মরদেহ আমাদের সংবাদকক্ষের দরজায় ঝুলবে। আর সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ এই সমাজ বা গণমাধ্যমের থাকবে না।

আপনার মতামত লিখুন