ভোর হয়। জানালার বাইরে কাক ডাকছে, রিকশার ঘণ্টা বাজছে, দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। ঘরে একটা মৃদু আলো, পাখার শব্দ, বিছানায় শুয়ে থাকা শরীর। কিন্তু মন কোথায়? মন তখন ঘুমিয়ে নেই, আবার জাগেওনি। মন তখন ফোনের স্ক্রিনে, গতকালের কোনো কথায়, আজকের কোনো দুশ্চিন্তায়, এমন এক জায়গায় যেখানে শরীর নেই। এই যে শরীর আর মনের মাঝে চিরকালীন বিচ্ছেদ, এটাই কি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে? মানুষ জেগে ওঠে, চা খায়, অফিসে যায়, কথা বলে, হাসে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা কি আদৌ জেগে ওঠে? নাকি সারাটা দিন শুধু একটা শরীর চলাচল করে, আর ভেতরে থাকে ঘুমন্ত এক অস্তিত্ব?
শহরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকান। তার জুতো পুরনো, শার্টের কলার ময়লা, চোখে একটা অপেক্ষা। কিসের অপেক্ষা? সে নিজেও জানে না। হয়তো কোনো কাজের, হয়তো কোনো ফোনের, হয়তো এমন কিছুর যা কখনো আসবে না। বাসে বসে থাকা তরুণীটার হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে, অথচ তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি নেই। সে দেখছে অন্য কারো ছবি, অন্য কারো খাওয়া, অন্য কারো ঘুরতে যাওয়া, অন্য কারো সুখ। নিজের জীবনটা চোখের সামনে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে দেখছে না। এই যে অন্যের জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবন হারিয়ে ফেলা, এটাই আজকের সবচেয়ে সাধারণ অসুখ। কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু সবাই ভোগে।
একটা সময় ছিল, মানুষ সূর্য ডোবার সময় বারান্দায় বসে থাকত। শুধু বসে থাকত, কিছুই করত না। আকাশের রং বদলাতে দেখত, পাখিদের ফিরে আসতে দেখত, প্রতিবেশীর দরজায় সন্ধ্যার বাতি জ্বলতে দেখত। তখন সময় ছিল ভারী, গভীর, বাস্তব। এখন মানুষ সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ফোন ক্যামেরা খোলে, একটা ছবি তোলে, পোস্ট দেয়, তারপর আবার স্ক্রল শুরু করে। সে আকাশটা দেখল, কিন্তু দেখল না। সে ছবি রাখল, কিন্তু মুহূর্তটা তার হাত থেকে গড়িয়ে পড়ল। এই যে দেখা আর না দেখার মাঝের ফারাক, এটাই সব হারানোর শুরু। মানুষ এখন সবকিছু রেকর্ড করে, কিন্তু কিছুই অনুভব করে না। তার ফোনে হাজারো মুহূর্ত জমা আছে, কিন্তু তার স্মৃতিতে কিছু নেই।
আজকাল বন্ধুরা দেখা করলে প্রথমে হাত মেলায়, তারপর কেউ একজন ফোন বের করে। কথা শুরুর আগেই স্ক্রিনে চোখ। পাশে বসা মানুষটার চেয়ে দূরের কোনো মানুষের খবর তখন বেশি জরুরি হয়ে যায়। এই দৃশ্য এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে কেউ খারাপও ভাবে না। অথচ ভাবা দরকার ছিল। যে মানুষটা তোমার সামনে বসে হাসছে, তার মনের ভেতরে হয়তো গভীর এক কষ্ট, হয়তো সে কিছু বলতে এসেছিল, হয়তো সে শুধু চেয়েছিল কেউ তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করুক, কেমন আছ? কিন্তু কেউ তাকায় না, কেউ জিজ্ঞেস করে না, কারণ সবাই ব্যস্ত। সবাই ব্যস্ত নিজের স্ক্রিনে, নিজের জগতে, নিজের অস্তিত্বহীন ব্যস্ততায়। ফলে মানুষটা ফিরে যায়, তার কষ্টটা নিয়েই, তার কথা না বলা কথাগুলো নিয়েই। আমরা প্রতিদিন একে অপরকে হারাচ্ছি, অথচ পাশে বসেই আছি।
রাতের বেলা ঘরে ফিরে শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন অস্থির। ঘুম আসে না। ফোন হাতে নিলে মনে হয় কিছুক্ষণ স্ক্রল করলে ঘুম আসবে, কিন্তু আসে না। বরং চোখ জ্বালা করে, মাথা ভারী হয়, ভেতরে এক অস্বস্তি জমে। তবুও ফোন ছাড়া হয় না। কারণ ফোন ছাড়লে সেই নীরবতার মুখোমুখি হতে হয়, যে নীরবতায় শুধু নিজের ভেতরের শব্দগুলো শোনা যায়। মানুষ সেই শব্দ শুনতে ভয় পায়। কারণ সেই শব্দগুলো সত্য, আর সত্য সবসময় আরামদায়ক নয়। সেই শব্দগুলো বলে, তুমি হারিয়ে যাচ্ছ। তুমি আসলে বাঁচছ না। তুমি শুধু দিন গুনছ। তুমি যাকে জীবন বলছ, সেটা আসলে একটা অভ্যাস, বাঁচার ভান। এই কথাগুলো শুনতে কষ্ট হয়, তাই মানুষ শব্দ দিয়ে নীরবতাকে ঢেকে রাখে। অথচ এই নীরবতাই একমাত্র জায়গা যেখানে মানুষ নিজের সাথে দেখা করতে পারে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমরা আসলে কার জন্য এত ছুটছি? কাকে দেখানোর জন্য? কে বলেছে জীবন এত দ্রুত হতে হবে? কে বলেছে প্রতিটি মুহূর্তে কিছু না কিছু করতে হবে? এই দৌড়ের শেষে কী আছে? কিছুই নেই। শুধু ক্লান্তি, শূন্যতা, আর একটা অজানা আফসোস। অথচ আমরা থামি না। থামতে ভয় পাই। কারণ থামলে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, আমি কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর নেই বলেই আমরা দৌড়ে থাকি, যেন দৌড়ানোটাই উত্তর। কিন্তু দৌড় তো কখনো গন্তব্য নয়, দৌড় তো শুধু পথ। পথের শেষে পৌঁছতে হলে মাঝে মাঝে থামতে হয়, দিক দেখতে হয়, শ্বাস নিতে হয়। আমরা শ্বাস নিচ্ছি, কিন্তু বাঁচছি না। নিঃশ্বাসের সংখ্যা আর জীবনের গভীরতা এক জিনিস নয়। কেউ নব্বই বছর শ্বাস নিয়ে জন্মের মতোই মরে যায়, আবার কেউ অল্প বয়সে বেঁচে ওঠে সত্যিকার অর্থে। এই বেঁচে ওঠা কোনো বয়সের ব্যাপার নয়, এটা সচেতনতার ব্যাপার। যে মানুষ নিজের অস্তিত্বের গভীরে নামতে পারে, সে-ই আসলে বাঁচে। বাকিরা শুধু অপেক্ষা করে, মৃত্যুর জন্য।
পৃথিবীটা এখন অদ্ভুত সুন্দর আর অদ্ভুত একা। বৃষ্টি পড়লে মানুষ জানালায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজে না। পাখির ডাক শুনে ভিডিও বানায়, কিন্তু পাখির দিকে তাকিয়ে থাকে না। সূর্যাস্ত দেখে স্টোরি দেয়, কিন্তু মুহূর্তটা উপভোগ করে না। আমরা সব সৌন্দর্যকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছি, দেখানোর জিনিস বানিয়ে ফেলেছি। অথচ সৌন্দর্য তো দেখানোর জন্য নয়, অনুভবের জন্য। কুরআনের আয়াতে আছে, আকাশ আর জমিনে কত নিদর্শন, যারা চিন্তা করে তারা তা বোঝে। চিন্তা করা মানে থেমে যাওয়া, তাকানো, নীরব হওয়া। আমরা নীরব হতে পারি না বলেই নিদর্শনগুলো দেখতে পাই না। আমাদের চারপাশে আল্লাহর আয়াত ছড়িয়ে আছে, কিন্তু আমাদের চোখ ব্যস্ত, মন ব্যস্ত, হৃদয় ব্যস্ত। ফলে এত কাছে থেকেও আমরা বহু দূরে।
একসময় মানুষ সন্তানকে কোলে নিয়ে গল্প বলত, সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে পারত তার মনের কথা। এখন সন্তান ফোনে গেম খেলে, বাবা অফিসের মেইলে ব্যস্ত, মা ভিডিও দেখেন। সবাই এক ছাদের নিচে, কিন্তু কেউ কারও কাছে নেই। অথচ এই পরিবারই তো ছিল একসময় শান্তির জায়গা। এখন শান্তি মানে সবাই নিজের নিজের স্ক্রিনে ডুবে থাকা, কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না। এই নিরিবিলি কোনো সম্পর্ক নয়, এটা বিচ্ছিন্নতা। অথচ আমরা একে স্বাচ্ছন্দ্য বলি। যে ঘরে কথার শব্দ নেই, হাসির শব্দ নেই, গল্পের শব্দ নেই, সে ঘর কখনো সত্যিকারের ঘর হয় না, সে ঘর শুধুই একটা কাঠ পাথরের খাঁচা। খাঁচায় মানুষ থাকে, কিন্তু মন থাকে না। মন থাকে স্ক্রিনে, স্ক্রিনের ওপারের কোনো আলোতে, যেখানে আসলে কিছুই নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়তো এই, মানুষ বেঁচে থাকা সত্ত্বেও নিজের জীবন থেকে অনুপস্থিত থাকা। নিজের সন্তানের হাসি, নিজের মায়ের ক্লান্তি, নিজের বন্ধুর কষ্ট, নিজের মনের ডাক, আল্লাহর আয়াত, আকাশের তারা, বৃষ্টির গন্ধ, সবকিছু চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও কিছুই দেখা হয় না। এই না দেখা এক ধরনের অন্ধত্ব, যার কোনো চিকিৎসা নেই, শুধু আছে জাগরণ। জাগরণ মানে হঠাৎ কোনো এক ভোরে চোখ খুলে অনুভব করা, আমি বেঁচে আছি, আমার চারপাশে জীবন, আমার ভেতরে প্রাণ, আমার রব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই অনুভূতি আসে না শব্দের জোরে, আসে থেমে যাওয়ায়। থেমে যাও। ফোনটা রেখে দাও। জানালার পাশে দাঁড়াও। শুধু দেখো। কিছু বলো না। কিছু ভাবো না। শুধু দেখো। দেখতে দেখতে একদিন বুকের ভেতর থেকে একটা সত্য উঠে আসবে, আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি আর হারাতে চাই না। আমি ফিরে আসতে চাই। এই মুহূর্তে। এখানে। এখন।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভোর হয়। জানালার বাইরে কাক ডাকছে, রিকশার ঘণ্টা বাজছে, দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। ঘরে একটা মৃদু আলো, পাখার শব্দ, বিছানায় শুয়ে থাকা শরীর। কিন্তু মন কোথায়? মন তখন ঘুমিয়ে নেই, আবার জাগেওনি। মন তখন ফোনের স্ক্রিনে, গতকালের কোনো কথায়, আজকের কোনো দুশ্চিন্তায়, এমন এক জায়গায় যেখানে শরীর নেই। এই যে শরীর আর মনের মাঝে চিরকালীন বিচ্ছেদ, এটাই কি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে? মানুষ জেগে ওঠে, চা খায়, অফিসে যায়, কথা বলে, হাসে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা কি আদৌ জেগে ওঠে? নাকি সারাটা দিন শুধু একটা শরীর চলাচল করে, আর ভেতরে থাকে ঘুমন্ত এক অস্তিত্ব?
শহরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকান। তার জুতো পুরনো, শার্টের কলার ময়লা, চোখে একটা অপেক্ষা। কিসের অপেক্ষা? সে নিজেও জানে না। হয়তো কোনো কাজের, হয়তো কোনো ফোনের, হয়তো এমন কিছুর যা কখনো আসবে না। বাসে বসে থাকা তরুণীটার হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে, অথচ তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি নেই। সে দেখছে অন্য কারো ছবি, অন্য কারো খাওয়া, অন্য কারো ঘুরতে যাওয়া, অন্য কারো সুখ। নিজের জীবনটা চোখের সামনে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে দেখছে না। এই যে অন্যের জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবন হারিয়ে ফেলা, এটাই আজকের সবচেয়ে সাধারণ অসুখ। কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু সবাই ভোগে।
একটা সময় ছিল, মানুষ সূর্য ডোবার সময় বারান্দায় বসে থাকত। শুধু বসে থাকত, কিছুই করত না। আকাশের রং বদলাতে দেখত, পাখিদের ফিরে আসতে দেখত, প্রতিবেশীর দরজায় সন্ধ্যার বাতি জ্বলতে দেখত। তখন সময় ছিল ভারী, গভীর, বাস্তব। এখন মানুষ সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ফোন ক্যামেরা খোলে, একটা ছবি তোলে, পোস্ট দেয়, তারপর আবার স্ক্রল শুরু করে। সে আকাশটা দেখল, কিন্তু দেখল না। সে ছবি রাখল, কিন্তু মুহূর্তটা তার হাত থেকে গড়িয়ে পড়ল। এই যে দেখা আর না দেখার মাঝের ফারাক, এটাই সব হারানোর শুরু। মানুষ এখন সবকিছু রেকর্ড করে, কিন্তু কিছুই অনুভব করে না। তার ফোনে হাজারো মুহূর্ত জমা আছে, কিন্তু তার স্মৃতিতে কিছু নেই।
আজকাল বন্ধুরা দেখা করলে প্রথমে হাত মেলায়, তারপর কেউ একজন ফোন বের করে। কথা শুরুর আগেই স্ক্রিনে চোখ। পাশে বসা মানুষটার চেয়ে দূরের কোনো মানুষের খবর তখন বেশি জরুরি হয়ে যায়। এই দৃশ্য এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে কেউ খারাপও ভাবে না। অথচ ভাবা দরকার ছিল। যে মানুষটা তোমার সামনে বসে হাসছে, তার মনের ভেতরে হয়তো গভীর এক কষ্ট, হয়তো সে কিছু বলতে এসেছিল, হয়তো সে শুধু চেয়েছিল কেউ তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করুক, কেমন আছ? কিন্তু কেউ তাকায় না, কেউ জিজ্ঞেস করে না, কারণ সবাই ব্যস্ত। সবাই ব্যস্ত নিজের স্ক্রিনে, নিজের জগতে, নিজের অস্তিত্বহীন ব্যস্ততায়। ফলে মানুষটা ফিরে যায়, তার কষ্টটা নিয়েই, তার কথা না বলা কথাগুলো নিয়েই। আমরা প্রতিদিন একে অপরকে হারাচ্ছি, অথচ পাশে বসেই আছি।
রাতের বেলা ঘরে ফিরে শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন অস্থির। ঘুম আসে না। ফোন হাতে নিলে মনে হয় কিছুক্ষণ স্ক্রল করলে ঘুম আসবে, কিন্তু আসে না। বরং চোখ জ্বালা করে, মাথা ভারী হয়, ভেতরে এক অস্বস্তি জমে। তবুও ফোন ছাড়া হয় না। কারণ ফোন ছাড়লে সেই নীরবতার মুখোমুখি হতে হয়, যে নীরবতায় শুধু নিজের ভেতরের শব্দগুলো শোনা যায়। মানুষ সেই শব্দ শুনতে ভয় পায়। কারণ সেই শব্দগুলো সত্য, আর সত্য সবসময় আরামদায়ক নয়। সেই শব্দগুলো বলে, তুমি হারিয়ে যাচ্ছ। তুমি আসলে বাঁচছ না। তুমি শুধু দিন গুনছ। তুমি যাকে জীবন বলছ, সেটা আসলে একটা অভ্যাস, বাঁচার ভান। এই কথাগুলো শুনতে কষ্ট হয়, তাই মানুষ শব্দ দিয়ে নীরবতাকে ঢেকে রাখে। অথচ এই নীরবতাই একমাত্র জায়গা যেখানে মানুষ নিজের সাথে দেখা করতে পারে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমরা আসলে কার জন্য এত ছুটছি? কাকে দেখানোর জন্য? কে বলেছে জীবন এত দ্রুত হতে হবে? কে বলেছে প্রতিটি মুহূর্তে কিছু না কিছু করতে হবে? এই দৌড়ের শেষে কী আছে? কিছুই নেই। শুধু ক্লান্তি, শূন্যতা, আর একটা অজানা আফসোস। অথচ আমরা থামি না। থামতে ভয় পাই। কারণ থামলে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, আমি কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর নেই বলেই আমরা দৌড়ে থাকি, যেন দৌড়ানোটাই উত্তর। কিন্তু দৌড় তো কখনো গন্তব্য নয়, দৌড় তো শুধু পথ। পথের শেষে পৌঁছতে হলে মাঝে মাঝে থামতে হয়, দিক দেখতে হয়, শ্বাস নিতে হয়। আমরা শ্বাস নিচ্ছি, কিন্তু বাঁচছি না। নিঃশ্বাসের সংখ্যা আর জীবনের গভীরতা এক জিনিস নয়। কেউ নব্বই বছর শ্বাস নিয়ে জন্মের মতোই মরে যায়, আবার কেউ অল্প বয়সে বেঁচে ওঠে সত্যিকার অর্থে। এই বেঁচে ওঠা কোনো বয়সের ব্যাপার নয়, এটা সচেতনতার ব্যাপার। যে মানুষ নিজের অস্তিত্বের গভীরে নামতে পারে, সে-ই আসলে বাঁচে। বাকিরা শুধু অপেক্ষা করে, মৃত্যুর জন্য।
পৃথিবীটা এখন অদ্ভুত সুন্দর আর অদ্ভুত একা। বৃষ্টি পড়লে মানুষ জানালায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজে না। পাখির ডাক শুনে ভিডিও বানায়, কিন্তু পাখির দিকে তাকিয়ে থাকে না। সূর্যাস্ত দেখে স্টোরি দেয়, কিন্তু মুহূর্তটা উপভোগ করে না। আমরা সব সৌন্দর্যকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছি, দেখানোর জিনিস বানিয়ে ফেলেছি। অথচ সৌন্দর্য তো দেখানোর জন্য নয়, অনুভবের জন্য। কুরআনের আয়াতে আছে, আকাশ আর জমিনে কত নিদর্শন, যারা চিন্তা করে তারা তা বোঝে। চিন্তা করা মানে থেমে যাওয়া, তাকানো, নীরব হওয়া। আমরা নীরব হতে পারি না বলেই নিদর্শনগুলো দেখতে পাই না। আমাদের চারপাশে আল্লাহর আয়াত ছড়িয়ে আছে, কিন্তু আমাদের চোখ ব্যস্ত, মন ব্যস্ত, হৃদয় ব্যস্ত। ফলে এত কাছে থেকেও আমরা বহু দূরে।
একসময় মানুষ সন্তানকে কোলে নিয়ে গল্প বলত, সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে পারত তার মনের কথা। এখন সন্তান ফোনে গেম খেলে, বাবা অফিসের মেইলে ব্যস্ত, মা ভিডিও দেখেন। সবাই এক ছাদের নিচে, কিন্তু কেউ কারও কাছে নেই। অথচ এই পরিবারই তো ছিল একসময় শান্তির জায়গা। এখন শান্তি মানে সবাই নিজের নিজের স্ক্রিনে ডুবে থাকা, কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না। এই নিরিবিলি কোনো সম্পর্ক নয়, এটা বিচ্ছিন্নতা। অথচ আমরা একে স্বাচ্ছন্দ্য বলি। যে ঘরে কথার শব্দ নেই, হাসির শব্দ নেই, গল্পের শব্দ নেই, সে ঘর কখনো সত্যিকারের ঘর হয় না, সে ঘর শুধুই একটা কাঠ পাথরের খাঁচা। খাঁচায় মানুষ থাকে, কিন্তু মন থাকে না। মন থাকে স্ক্রিনে, স্ক্রিনের ওপারের কোনো আলোতে, যেখানে আসলে কিছুই নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়তো এই, মানুষ বেঁচে থাকা সত্ত্বেও নিজের জীবন থেকে অনুপস্থিত থাকা। নিজের সন্তানের হাসি, নিজের মায়ের ক্লান্তি, নিজের বন্ধুর কষ্ট, নিজের মনের ডাক, আল্লাহর আয়াত, আকাশের তারা, বৃষ্টির গন্ধ, সবকিছু চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও কিছুই দেখা হয় না। এই না দেখা এক ধরনের অন্ধত্ব, যার কোনো চিকিৎসা নেই, শুধু আছে জাগরণ। জাগরণ মানে হঠাৎ কোনো এক ভোরে চোখ খুলে অনুভব করা, আমি বেঁচে আছি, আমার চারপাশে জীবন, আমার ভেতরে প্রাণ, আমার রব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই অনুভূতি আসে না শব্দের জোরে, আসে থেমে যাওয়ায়। থেমে যাও। ফোনটা রেখে দাও। জানালার পাশে দাঁড়াও। শুধু দেখো। কিছু বলো না। কিছু ভাবো না। শুধু দেখো। দেখতে দেখতে একদিন বুকের ভেতর থেকে একটা সত্য উঠে আসবে, আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি আর হারাতে চাই না। আমি ফিরে আসতে চাই। এই মুহূর্তে। এখানে। এখন।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন