সংবাদ

পর্ব-২

মক্কাচুক্তি: ঢাকার সিদ্ধান্তে কি বদলাবে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ?


দীপক মুখার্জী
দীপক মুখার্জী প্রতিনিধি, কলকাতা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম

মক্কাচুক্তি: ঢাকার সিদ্ধান্তে কি বদলাবে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ?
শশী থারুর বিশ্লেষণ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম অধ্যায়ে মূল সমীকরণ ছিল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে। কিন্তু এখন এই ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখনও চুক্তির সদস্য নয়, কিন্তু ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার ইঙ্গিত এসেছে এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলিতে ঢাকার মনোভাব যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়, তা স্পষ্ট। ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনও ঝুঁকির মুখে পড়বে না এবং এর ফলে অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সীমিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঢাকা সম্ভাব্য সদস্যপদকে কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে নয়, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখাতে চাইছে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় তার অবস্থান তৈরি হবে। আর পাকিস্তান ভারতের প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। ফলে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি নিছক আরেকটি দেশের আন্তর্জাতিক জোটে যোগদানের ঘটনা হিসেবে দেখবে না। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিবেশে এর কৌশলগত তাৎপর্য অনেক বেশি।

তবে এখানেও সরলীকরণ বিপজ্জনক। বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেই যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও যৌথ সামরিক অবস্থান গ্রহণ করবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্ক, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নদীর জল এবং বঙ্গোপসাগর–সবকিছুই ঢাকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের অংশ। ফলে কোনও নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দিলেও ভারতকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত হবে না।

বরং বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ঢাকা যদি মক্কা কাঠামোয় প্রবেশ করে, তাহলে একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দরজাও খুলতে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহির্মুখী এবং রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে কোনও নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের non-alignment বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা হতে পারে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে নয়াদিল্লি কীভাবে মোকাবিলা করবে। যদি ভারত এটিকে সরাসরি পাকিস্তান-সমর্থিত বা ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, যদি ভারত বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে তার বহুমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তব ক্ষেত্রগুলিকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এখানেই শশী থারুরের প্রথম পর্বের যুক্তি দ্বিতীয় পর্বে এসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, ভারতের উত্তর হওয়া উচিত Gulf-কে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং Gulf-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রযোজ্য হতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় নিজের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে, তাহলে কোনও নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ভারতবিরোধী অক্ষ হিসেবে রূপ নেওয়া কঠিন হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে। কারণ এতে মক্কা চুক্তির ভৌগোলিক পরিসর পশ্চিম এশিয়া থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পাকিস্তান তখন শুধু সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকবে। এর ফলে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ও মুসলিম বিশ্বের ফোরামগুলিতে আরও বেশি কূটনৈতিক leverage পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর–চুক্তিতে যোগ দিয়ে ঢাকা কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াবে, নাকি নতুন নির্ভরতা তৈরি করবে? একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সহযোগিতার সুযোগ দেয় না; প্রয়োজনে অংশীদারের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রেও অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা বাস্তবে কতটা হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চুক্তির বিস্তারিত operational framework-ও প্রকাশ্যে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি।

এই কারণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হতে পারে কোনও তাড়াহুড়ো না করে চুক্তির বাস্তব শর্ত, সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সীমা পরিষ্কারভাবে যাচাই করা। কারণ “collective defence” কথাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও বাস্তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, threat perception এবং সামরিক সক্ষমতা আলাদা।

ভারতের জন্যও একই শিক্ষা। বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বা চাপ নয়, প্রয়োজন কৌশলগত সংলাপ। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষেত্রগুলি সরাসরি দুই দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত–বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী ও বঙ্গোপসাগর–সেগুলিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশকে কোনও জোট থেকে দূরে রাখার চেয়ে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা বেশি কার্যকর, যাতে সেই দেশ বহুমুখী অংশীদারিত্ব বজায় রেখেও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা চুক্তিকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে এর আসল ভূরাজনৈতিক চরিত্র আড়ালে চলে যাবে। এটি একইসঙ্গে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত autonomy-র প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, তার সিদ্ধান্তও ধর্মীয় আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান মক্কা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করবে–এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটিকে অবধারিতভাবে ভারতবিরোধী সামরিক অক্ষে পরিণত করবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক কূটনৈতিক পরীক্ষার সূচনা। পাকিস্তান চাইবে এর মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াতে, সৌদি আরব চাইবে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সম্প্রসারিত করতে, তুরস্ক চাইবে নিজের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে, আর বাংলাদেশ চাইবে নতুন অংশীদারিত্বের সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে।

ভারতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ঠেকানো নয়; বরং এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যাতে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে তার মৌলিক সম্পর্ককে দুর্বল না করে। আর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা–মক্কা চুক্তিতে প্রবেশ করে কতটা নতুন কৌশলগত সুযোগ পাওয়া যাবে, আর সেই সুযোগের বিনিময়ে কতটা কূটনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।

মক্কা চুক্তির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু রিয়াদ, আঙ্কারা বা ইসলামাবাদে লেখা হবে না। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হবে ঢাকাতেও। আর সেই সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়–পুরো দক্ষিণ এশিয়ার।

আরো পড়ুন...

মক্কা চুক্তি: ভারতের সামনে নতুন সমীকরণ


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মক্কাচুক্তি: ঢাকার সিদ্ধান্তে কি বদলাবে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ?

প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম অধ্যায়ে মূল সমীকরণ ছিল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে। কিন্তু এখন এই ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখনও চুক্তির সদস্য নয়, কিন্তু ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার ইঙ্গিত এসেছে এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলিতে ঢাকার মনোভাব যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়, তা স্পষ্ট। ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনও ঝুঁকির মুখে পড়বে না এবং এর ফলে অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সীমিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঢাকা সম্ভাব্য সদস্যপদকে কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে নয়, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখাতে চাইছে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় তার অবস্থান তৈরি হবে। আর পাকিস্তান ভারতের প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। ফলে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি নিছক আরেকটি দেশের আন্তর্জাতিক জোটে যোগদানের ঘটনা হিসেবে দেখবে না। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিবেশে এর কৌশলগত তাৎপর্য অনেক বেশি।

তবে এখানেও সরলীকরণ বিপজ্জনক। বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেই যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও যৌথ সামরিক অবস্থান গ্রহণ করবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্ক, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নদীর জল এবং বঙ্গোপসাগর–সবকিছুই ঢাকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের অংশ। ফলে কোনও নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দিলেও ভারতকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত হবে না।

বরং বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ঢাকা যদি মক্কা কাঠামোয় প্রবেশ করে, তাহলে একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দরজাও খুলতে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহির্মুখী এবং রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে কোনও নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের non-alignment বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা হতে পারে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে নয়াদিল্লি কীভাবে মোকাবিলা করবে। যদি ভারত এটিকে সরাসরি পাকিস্তান-সমর্থিত বা ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, যদি ভারত বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে তার বহুমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তব ক্ষেত্রগুলিকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এখানেই শশী থারুরের প্রথম পর্বের যুক্তি দ্বিতীয় পর্বে এসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, ভারতের উত্তর হওয়া উচিত Gulf-কে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং Gulf-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রযোজ্য হতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় নিজের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে, তাহলে কোনও নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ভারতবিরোধী অক্ষ হিসেবে রূপ নেওয়া কঠিন হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে। কারণ এতে মক্কা চুক্তির ভৌগোলিক পরিসর পশ্চিম এশিয়া থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পাকিস্তান তখন শুধু সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকবে। এর ফলে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ও মুসলিম বিশ্বের ফোরামগুলিতে আরও বেশি কূটনৈতিক leverage পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর–চুক্তিতে যোগ দিয়ে ঢাকা কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াবে, নাকি নতুন নির্ভরতা তৈরি করবে? একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সহযোগিতার সুযোগ দেয় না; প্রয়োজনে অংশীদারের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রেও অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা বাস্তবে কতটা হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চুক্তির বিস্তারিত operational framework-ও প্রকাশ্যে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি।

এই কারণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হতে পারে কোনও তাড়াহুড়ো না করে চুক্তির বাস্তব শর্ত, সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সীমা পরিষ্কারভাবে যাচাই করা। কারণ “collective defence” কথাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও বাস্তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, threat perception এবং সামরিক সক্ষমতা আলাদা।

ভারতের জন্যও একই শিক্ষা। বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বা চাপ নয়, প্রয়োজন কৌশলগত সংলাপ। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষেত্রগুলি সরাসরি দুই দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত–বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী ও বঙ্গোপসাগর–সেগুলিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশকে কোনও জোট থেকে দূরে রাখার চেয়ে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা বেশি কার্যকর, যাতে সেই দেশ বহুমুখী অংশীদারিত্ব বজায় রেখেও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা চুক্তিকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে এর আসল ভূরাজনৈতিক চরিত্র আড়ালে চলে যাবে। এটি একইসঙ্গে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত autonomy-র প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, তার সিদ্ধান্তও ধর্মীয় আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান মক্কা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করবে–এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটিকে অবধারিতভাবে ভারতবিরোধী সামরিক অক্ষে পরিণত করবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক কূটনৈতিক পরীক্ষার সূচনা। পাকিস্তান চাইবে এর মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াতে, সৌদি আরব চাইবে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সম্প্রসারিত করতে, তুরস্ক চাইবে নিজের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে, আর বাংলাদেশ চাইবে নতুন অংশীদারিত্বের সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে।

ভারতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ঠেকানো নয়; বরং এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যাতে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে তার মৌলিক সম্পর্ককে দুর্বল না করে। আর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা–মক্কা চুক্তিতে প্রবেশ করে কতটা নতুন কৌশলগত সুযোগ পাওয়া যাবে, আর সেই সুযোগের বিনিময়ে কতটা কূটনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।

মক্কা চুক্তির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু রিয়াদ, আঙ্কারা বা ইসলামাবাদে লেখা হবে না। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হবে ঢাকাতেও। আর সেই সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়–পুরো দক্ষিণ এশিয়ার।

আরো পড়ুন...

মক্কা চুক্তি: ভারতের সামনে নতুন সমীকরণ



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত