বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার গল্প আমরা সাধারণত ধানের ফলন, সারের দাম, সেচের খরচ কিংবা বাজারে চালের দামের মধ্যেই খুঁজি। অথচ এই পুরো ব্যবস্থার নিচে যে ভিত্তিটি নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে সেই মাটির স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের নজর তুলনামূলকভাবে কম।
একটি জমি বছরের পর বছর ফসল দিতে থাকলেই যে সেই জমি সুস্থ আছে, বিষয়টি তেমন নয়। বরং অধিক ফসল উৎপাদনের চাপেই মাটি ধীরে ধীরে তার জৈব পদার্থ, পুষ্টির ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং পানি ধারণক্ষমতা হারাতে পারে। এই কারণেই বাংলাদেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত। আমরা কি শুধু ফসল উৎপাদন করছি, নাকি একই সঙ্গে মাটিকেও পুনর্গঠন করছি?
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। আর আরও প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তা ১ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে। এই চিত্র নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
সার বাড়ছে, কিন্তু মাটির স্বাস্থ্য কি বাড়ছে? এখানেই বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বিশ্বব্যাংক-এর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯১.৯ কেজি সার-পুষ্টি উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।কিন্তু বেশি সার ব্যবহার মানেই বেশি উর্বর মাটি নয়।
সমস্যাটি সারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টির ভারসাম্য, মাটির প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ফসল যখন জমি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরনসহ বিভিন্ন পুষ্টি গ্রহণ করে, সেই পুষ্টির একটি অংশ শস্য ও খড়ের সঙ্গে মাঠের বাইরে চলে যায়। এই ঘাটতি যদি যথাযথভাবে পূরণ না হয়, তাহলে মাটি ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত পুষ্টি হারাতে থাকে।কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মাটির পুষ্টি উপাদান নিঃশেষকরণ’। মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ চলতে থাকে। কিন্তু পুনঃস্থাপন হয় তার চেয়ে কম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নতুন নয়। বিশেষ করে নিবিড় চাষ, একাধিক ফসলের চাপ এবং গৌণ ও অণুপুষ্টির অসম ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় মাটির পুষ্টিগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি নীরব পরিবর্তন ঘটেছে। ফসলের অবশিষ্টাংশের বড় অংশ পশুখাদ্য, জ্বালানি বা অন্য কাজে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। গোবরও আগের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে জমিতে ফেরে না।ফলে যে জৈব পদার্থ স্বাভাবিকভাবে মাটিতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও কমে যাচ্ছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির বাস্তবতা দেশের অনেক অংশের চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, উচ্চ তাপমাত্রা, সীমিত মাটির আর্দ্রতা এবং সেচের ওপর নির্ভরতা সবকিছু একসঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষিকে চাপের মধ্যে রাখে। এ অঞ্চলে একই জমিতে নিবিড়ভাবে ধান, গম, ভুট্টা, আলু কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে শুধু নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়ামনির্ভর চিন্তা যথেষ্ট নয়। সালফার, জিংক, বোরনসহ গৌণ ও অণুপুষ্টির ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়া।
বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় মাটির স্বাস্থ্যকে শুধু মাটি উর্বরকরণ ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার প্রশ্ন। কারণ সুস্থ, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি তুলনামূলকভাবে বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। খরার সময় এই বৈশিষ্ট্য ফসলকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। মাটির অসুখের চিকিৎসা শুধু কিন্তু ইউরিয়া নয়। যে কারণে আধুনিক কৃষিতে এখন শুধু “কত কেজি সার দেব”এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন জমিতে, কোন ফসলে, কোন পুষ্টি, কতটুকু এবং কখন প্রয়োজন?
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর সার সুপারিশমালা হাতবই ২০২৪-এও মাটির অবস্থা, স্থানভেদ এবং পরীক্ষাভিত্তিক সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, জৈব অনুজীব সার, জৈব অঙ্গার, চুন প্রয়োগ, পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের দক্ষতা এবং কৃষিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের কার্যকারিতা-এর মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা মাঠপর্যায়ে আরও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অর্থ রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া নয়; বরং রাসায়নিক সার, গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, ডালজাতীয় ফসল এবং প্রয়োজনমতো জৈবসার—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার।
তৃতীয়ত, কৃষকের কাছে শুধু সার পৌঁছানো নয়, মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ও প্রণোদনাও পৌঁছাতে হবে।
চতুর্থত, শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটির স্বাস্থ্য পুনর্গঠনকারী ফসল বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা-কে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করতে হবে।
এক. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মাটি পরীক্ষার সেবা বাড়াতে হবে। মাটি পরীক্ষা যেন প্রকল্পনির্ভর বা কাগুজে কাজ না হয়ে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ হয়।
দুই. শুধু রাসায়নিক সারে ভর্তুকি নয়, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা-এও প্রণোদনা দিতে হবে। কম্পোস্ট, সবুজ সার, গোবরের কার্যকর ব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে জৈব উপাদান তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো দরকার।
তিন. ঢালাও মাত্রা-এর বদলে জমি-নির্দিষ্ট সার সুপারিশ চালু করতে হবে। একই ফসল হলেও ভিন্ন মাটি, ভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল ও ভিন্ন পুষ্টি অবস্থায় একই মাত্রার সার বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
চার. শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটি পুনরূদ্ধারকারী ফসল বাড়াতে হবে। শুধু উচ্চ পুষ্টি-গ্রাহী ফসলের পুনরাবৃত্তি না করে এমন ফসল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মাটির ভারসাম্য পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
পাঁচ. শস্যের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সম্পূর্ণ অপসারণ কমিয়ে অবশিষ্টাংশ বা বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাড়াতে হবে। যতটা সম্ভব ফসলের অবশিষ্টাংশকে মাটির সম্পদ হিসেবে ফিরিয়ে দিতে হবে।
ছয়. বরেন্দ্রসহ পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চলে জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, মাটি ঢাকা পদ্ধতি এবং পানি সাশ্রয়ী সেচ-কে একসঙ্গে নিতে হবে। এখানে মাটির স্বাস্থ্য ও পানির দক্ষ ব্যবহারকে আলাদা করে দেখা যাবে না।
সাত. কৃষি সম্প্রসারণে ফলনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য নির্দেশক পর্যবেক্ষণ শুরু করতে হবে। শুধু কত টন ফসল হলো, তা নয় মাটির জৈব পদার্থ, অম্লত্ব, পুষ্টির ভারসাম্য ও পানি ধারণক্ষমতার পরিবর্তনও নীতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
যে মাটিতে সেই জাতটি জন্মাবে, সেই মাটিকেও সহনশীল হতে হবে। সুস্থ মাটি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং প্রতিকূল পরিবেশে ফসলকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেয়। তাই জলবায়ু-সপ্রতিভ কৃষি-এর আলোচনায় মাটির স্বাস্থ্য-কে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। এখন আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এই উৎপাদনকে টেকসই করা। কোনো জমি আজ ৬ টন ধান দিল কি না, সেটিই তার স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। সেই জমি আরও ২০ বছর একই উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিও খাদ্যনিরাপত্তার হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
দেবে ভোক্তা উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যমূল্যের মাধ্যমে। দেবে জাতীয় অর্থনীতি বাড়তি কৃষি-ইনপুট ও সহায়তার মাধ্যমে। আর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কম উৎপাদনক্ষম কৃষিজমির মাধ্যমে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ। যে মাটি আমাদের প্রতিদিনের ভাতের থালা ভরে দিচ্ছে, সেই মাটিকে আমরা কতটুকু ফিরিয়ে দিচ্ছি? কারণ খাদ্যনিরাপত্তার শেষ লড়াইটি শুধু বাজারে নয়, সারের গুদামেও নয়। শেষ লড়াইটি হবে মাটির ভেতরে।মাটি ক্ষুধার্ত রেখে কোনো দেশ দীর্ঘদিন খাদ্যে নিরাপদ থাকতে পারে না।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার গল্প আমরা সাধারণত ধানের ফলন, সারের দাম, সেচের খরচ কিংবা বাজারে চালের দামের মধ্যেই খুঁজি। অথচ এই পুরো ব্যবস্থার নিচে যে ভিত্তিটি নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে সেই মাটির স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের নজর তুলনামূলকভাবে কম।
একটি জমি বছরের পর বছর ফসল দিতে থাকলেই যে সেই জমি সুস্থ আছে, বিষয়টি তেমন নয়। বরং অধিক ফসল উৎপাদনের চাপেই মাটি ধীরে ধীরে তার জৈব পদার্থ, পুষ্টির ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং পানি ধারণক্ষমতা হারাতে পারে। এই কারণেই বাংলাদেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত। আমরা কি শুধু ফসল উৎপাদন করছি, নাকি একই সঙ্গে মাটিকেও পুনর্গঠন করছি?
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। আর আরও প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তা ১ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে। এই চিত্র নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
সার বাড়ছে, কিন্তু মাটির স্বাস্থ্য কি বাড়ছে? এখানেই বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বিশ্বব্যাংক-এর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯১.৯ কেজি সার-পুষ্টি উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।কিন্তু বেশি সার ব্যবহার মানেই বেশি উর্বর মাটি নয়।
সমস্যাটি সারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টির ভারসাম্য, মাটির প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ফসল যখন জমি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরনসহ বিভিন্ন পুষ্টি গ্রহণ করে, সেই পুষ্টির একটি অংশ শস্য ও খড়ের সঙ্গে মাঠের বাইরে চলে যায়। এই ঘাটতি যদি যথাযথভাবে পূরণ না হয়, তাহলে মাটি ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত পুষ্টি হারাতে থাকে।কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মাটির পুষ্টি উপাদান নিঃশেষকরণ’। মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ চলতে থাকে। কিন্তু পুনঃস্থাপন হয় তার চেয়ে কম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নতুন নয়। বিশেষ করে নিবিড় চাষ, একাধিক ফসলের চাপ এবং গৌণ ও অণুপুষ্টির অসম ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় মাটির পুষ্টিগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি নীরব পরিবর্তন ঘটেছে। ফসলের অবশিষ্টাংশের বড় অংশ পশুখাদ্য, জ্বালানি বা অন্য কাজে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। গোবরও আগের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে জমিতে ফেরে না।ফলে যে জৈব পদার্থ স্বাভাবিকভাবে মাটিতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও কমে যাচ্ছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির বাস্তবতা দেশের অনেক অংশের চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, উচ্চ তাপমাত্রা, সীমিত মাটির আর্দ্রতা এবং সেচের ওপর নির্ভরতা সবকিছু একসঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষিকে চাপের মধ্যে রাখে। এ অঞ্চলে একই জমিতে নিবিড়ভাবে ধান, গম, ভুট্টা, আলু কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে শুধু নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়ামনির্ভর চিন্তা যথেষ্ট নয়। সালফার, জিংক, বোরনসহ গৌণ ও অণুপুষ্টির ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়া।
বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় মাটির স্বাস্থ্যকে শুধু মাটি উর্বরকরণ ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার প্রশ্ন। কারণ সুস্থ, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি তুলনামূলকভাবে বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। খরার সময় এই বৈশিষ্ট্য ফসলকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। মাটির অসুখের চিকিৎসা শুধু কিন্তু ইউরিয়া নয়। যে কারণে আধুনিক কৃষিতে এখন শুধু “কত কেজি সার দেব”এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন জমিতে, কোন ফসলে, কোন পুষ্টি, কতটুকু এবং কখন প্রয়োজন?
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর সার সুপারিশমালা হাতবই ২০২৪-এও মাটির অবস্থা, স্থানভেদ এবং পরীক্ষাভিত্তিক সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, জৈব অনুজীব সার, জৈব অঙ্গার, চুন প্রয়োগ, পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের দক্ষতা এবং কৃষিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের কার্যকারিতা-এর মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা মাঠপর্যায়ে আরও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অর্থ রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া নয়; বরং রাসায়নিক সার, গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, ডালজাতীয় ফসল এবং প্রয়োজনমতো জৈবসার—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার।
তৃতীয়ত, কৃষকের কাছে শুধু সার পৌঁছানো নয়, মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ও প্রণোদনাও পৌঁছাতে হবে।
চতুর্থত, শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটির স্বাস্থ্য পুনর্গঠনকারী ফসল বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা-কে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করতে হবে।
এক. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মাটি পরীক্ষার সেবা বাড়াতে হবে। মাটি পরীক্ষা যেন প্রকল্পনির্ভর বা কাগুজে কাজ না হয়ে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ হয়।
দুই. শুধু রাসায়নিক সারে ভর্তুকি নয়, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা-এও প্রণোদনা দিতে হবে। কম্পোস্ট, সবুজ সার, গোবরের কার্যকর ব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে জৈব উপাদান তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো দরকার।
তিন. ঢালাও মাত্রা-এর বদলে জমি-নির্দিষ্ট সার সুপারিশ চালু করতে হবে। একই ফসল হলেও ভিন্ন মাটি, ভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল ও ভিন্ন পুষ্টি অবস্থায় একই মাত্রার সার বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
চার. শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটি পুনরূদ্ধারকারী ফসল বাড়াতে হবে। শুধু উচ্চ পুষ্টি-গ্রাহী ফসলের পুনরাবৃত্তি না করে এমন ফসল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মাটির ভারসাম্য পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
পাঁচ. শস্যের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সম্পূর্ণ অপসারণ কমিয়ে অবশিষ্টাংশ বা বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাড়াতে হবে। যতটা সম্ভব ফসলের অবশিষ্টাংশকে মাটির সম্পদ হিসেবে ফিরিয়ে দিতে হবে।
ছয়. বরেন্দ্রসহ পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চলে জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, মাটি ঢাকা পদ্ধতি এবং পানি সাশ্রয়ী সেচ-কে একসঙ্গে নিতে হবে। এখানে মাটির স্বাস্থ্য ও পানির দক্ষ ব্যবহারকে আলাদা করে দেখা যাবে না।
সাত. কৃষি সম্প্রসারণে ফলনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য নির্দেশক পর্যবেক্ষণ শুরু করতে হবে। শুধু কত টন ফসল হলো, তা নয় মাটির জৈব পদার্থ, অম্লত্ব, পুষ্টির ভারসাম্য ও পানি ধারণক্ষমতার পরিবর্তনও নীতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
যে মাটিতে সেই জাতটি জন্মাবে, সেই মাটিকেও সহনশীল হতে হবে। সুস্থ মাটি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং প্রতিকূল পরিবেশে ফসলকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেয়। তাই জলবায়ু-সপ্রতিভ কৃষি-এর আলোচনায় মাটির স্বাস্থ্য-কে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। এখন আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এই উৎপাদনকে টেকসই করা। কোনো জমি আজ ৬ টন ধান দিল কি না, সেটিই তার স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। সেই জমি আরও ২০ বছর একই উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিও খাদ্যনিরাপত্তার হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
দেবে ভোক্তা উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যমূল্যের মাধ্যমে। দেবে জাতীয় অর্থনীতি বাড়তি কৃষি-ইনপুট ও সহায়তার মাধ্যমে। আর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কম উৎপাদনক্ষম কৃষিজমির মাধ্যমে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ। যে মাটি আমাদের প্রতিদিনের ভাতের থালা ভরে দিচ্ছে, সেই মাটিকে আমরা কতটুকু ফিরিয়ে দিচ্ছি? কারণ খাদ্যনিরাপত্তার শেষ লড়াইটি শুধু বাজারে নয়, সারের গুদামেও নয়। শেষ লড়াইটি হবে মাটির ভেতরে।মাটি ক্ষুধার্ত রেখে কোনো দেশ দীর্ঘদিন খাদ্যে নিরাপদ থাকতে পারে না।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

আপনার মতামত লিখুন