সংবাদ

অ্যালঝাইমার্স রোগীর যত্নে পরিবারের করণীয়


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

অ্যালঝাইমার্স রোগীর যত্নে পরিবারের করণীয়

বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোথায় চাবি রেখেছেন, বাজার থেকে কী আনতে হবে কিংবা ঘরে ঢুকে কী নিতে এসেছিলেন- এমন ছোটখাটো ভুল যে কারও হতে পারে। কিন্তু ভুলে যাওয়ার মাত্রা যখন দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তখন সেটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

পরিচিত মানুষ বা জায়গা চিনতে না পারা, কথা বলতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়া, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন- এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অ্যালঝাইমার্স শুধু একজন মানুষের স্মৃতিকে প্রভাবিত করে না, ধীরে ধীরে বদলে দেয় তার চারপাশের মানুষের জীবনও।

স্মৃতি হারালে বদলে যায় সম্পর্কের ধরন

অ্যালঝাইমার্সের অগ্রগতির সঙ্গে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একপর্যায়ে দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষকেও চিনতে অসুবিধা হতে পারে।

পরিবারের জন্য এই পরিবর্তন মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যে মা সারাজীবন সন্তানকে চিনেছেন, একসময় হয়তো তাঁর নাম মনে করতে পারছেন না। যে বাবা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের খোঁজ রাখতেন, তিনি নিজের ঘর বা কাছের মানুষকে চিনতে সমস্যায় পড়ছেনএমন পরিস্থিতি পরিবারের সদস্যদের জন্য গভীর কষ্টের হতে পারে।

তবে এসব আচরণ রোগীর ইচ্ছাকৃত নয়। মস্তিষ্কের পরিবর্তনের কারণে তিনি একই প্রশ্ন বারবার করতে পারেন কিংবা একই কথা পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। অ্যালঝাইমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ধরনের পুনরাবৃত্তির পেছনে নিরাপত্তা, পরিচিতি বা কোনো উদ্বেগ প্রকাশের প্রয়োজনও থাকতে পারে।

মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন ঘটে

অ্যালঝাইমার্সের সঙ্গে মস্তিষ্কে অ্যামিলয়েড টাউ প্রোটিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন জমাট বাঁধার সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে ধীরে ধীরে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর প্রভাব পড়ে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের ওপর। তবে সব ডিমেনশিয়ার কারণ অ্যালঝাইমার্স নয়। স্ট্রোক, মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক কারণেও ডিমেনশিয়া হতে পারে।

সারাক্ষণ নজরদারির বাস্তবতা

রোগ বাড়ার সঙ্গে সময় স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ একা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। রান্নাঘর, বাথরুম বা সিঁড়ির মতো জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

কারণে পরিবারের কাউকে অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে রোগীর সঙ্গে থাকতে হয়। এই দায়িত্ব একটানা চলতে থাকলে পরিচর্যাকারীর ঘুম, চাকরি, ব্যক্তিগত সময় এবং সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সন্ধ্যার পর বাড়তে পারে অস্থিরতা

কিছু ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, ভয়, সন্দেহ কিংবা বিরক্তি বেড়ে যেতে পারে। অবস্থাকে সানডাউনিং বলা হয়।

রাতে ঘুমের সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। রোগীর পাশাপাশি পরিবারের পরিচর্যাকারীরাও পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে পারেন।

একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় বারবার

একই প্রশ্ন বারবার করা, খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার খাবার চাওয়া কিংবা একই ঘটনা বারবার জানতে চাওয়া পরিচর্যাকারীর জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে বারবার ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা না করে শান্তভাবে উত্তর দেওয়া বেশি সহায়ক।

কারণ তিনি ইচ্ছা করে একই কথা বলছেন না। রোগের প্রভাবে স্মৃতি চিন্তার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসায় এমন আচরণ হতে পারে।

রোগীর পাশাপাশি যত্ন দরকার পরিচর্যাকারীরও

অ্যালঝাইমার্সের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে অনেক সময় নজর দিতে পারেন না। ঘুমের ঘাটতি, একটানা দায়িত্ব, সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ধীরে ধীরে তাদের ওপরও চাপ তৈরি করে।

তাই রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীর জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের বিশ্রামের জন্য সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কোনো স্মৃতির সমস্যা বা আচরণগত পরিবর্তনকে শুধুবয়স হয়েছেবলে এড়িয়ে না যাওয়া। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ রোগ নির্ণয় হলে রোগী এবং পরিবার- দুই পক্ষই ভবিষ্যতের পরিস্থিতির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে।

অ্যালঝাইমার্সের লড়াই তাই শুধু ওষুধ বা চিকিৎসার নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ধৈর্য, নিরাপত্তা, বোঝাপড়া এবং মর্যাদা। রোগী হয়তো ধীরে ধীরে অনেক কিছু ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর প্রতি যত্ন সম্মান যেন পরিবারের কেউ ভুলে না যান।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অ্যালঝাইমার্স রোগীর যত্নে পরিবারের করণীয়

প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোথায় চাবি রেখেছেন, বাজার থেকে কী আনতে হবে কিংবা ঘরে ঢুকে কী নিতে এসেছিলেন- এমন ছোটখাটো ভুল যে কারও হতে পারে। কিন্তু ভুলে যাওয়ার মাত্রা যখন দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তখন সেটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

পরিচিত মানুষ বা জায়গা চিনতে না পারা, কথা বলতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়া, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন- এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অ্যালঝাইমার্স শুধু একজন মানুষের স্মৃতিকে প্রভাবিত করে না, ধীরে ধীরে বদলে দেয় তার চারপাশের মানুষের জীবনও।

স্মৃতি হারালে বদলে যায় সম্পর্কের ধরন

অ্যালঝাইমার্সের অগ্রগতির সঙ্গে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একপর্যায়ে দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষকেও চিনতে অসুবিধা হতে পারে।

পরিবারের জন্য এই পরিবর্তন মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যে মা সারাজীবন সন্তানকে চিনেছেন, একসময় হয়তো তাঁর নাম মনে করতে পারছেন না। যে বাবা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের খোঁজ রাখতেন, তিনি নিজের ঘর বা কাছের মানুষকে চিনতে সমস্যায় পড়ছেনএমন পরিস্থিতি পরিবারের সদস্যদের জন্য গভীর কষ্টের হতে পারে।

তবে এসব আচরণ রোগীর ইচ্ছাকৃত নয়। মস্তিষ্কের পরিবর্তনের কারণে তিনি একই প্রশ্ন বারবার করতে পারেন কিংবা একই কথা পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। অ্যালঝাইমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ধরনের পুনরাবৃত্তির পেছনে নিরাপত্তা, পরিচিতি বা কোনো উদ্বেগ প্রকাশের প্রয়োজনও থাকতে পারে।

মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন ঘটে

অ্যালঝাইমার্সের সঙ্গে মস্তিষ্কে অ্যামিলয়েড টাউ প্রোটিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন জমাট বাঁধার সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে ধীরে ধীরে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর প্রভাব পড়ে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের ওপর। তবে সব ডিমেনশিয়ার কারণ অ্যালঝাইমার্স নয়। স্ট্রোক, মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক কারণেও ডিমেনশিয়া হতে পারে।

সারাক্ষণ নজরদারির বাস্তবতা

রোগ বাড়ার সঙ্গে সময় স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ একা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। রান্নাঘর, বাথরুম বা সিঁড়ির মতো জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

কারণে পরিবারের কাউকে অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে রোগীর সঙ্গে থাকতে হয়। এই দায়িত্ব একটানা চলতে থাকলে পরিচর্যাকারীর ঘুম, চাকরি, ব্যক্তিগত সময় এবং সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সন্ধ্যার পর বাড়তে পারে অস্থিরতা

কিছু ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, ভয়, সন্দেহ কিংবা বিরক্তি বেড়ে যেতে পারে। অবস্থাকে সানডাউনিং বলা হয়।

রাতে ঘুমের সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। রোগীর পাশাপাশি পরিবারের পরিচর্যাকারীরাও পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে পারেন।

একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় বারবার

একই প্রশ্ন বারবার করা, খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার খাবার চাওয়া কিংবা একই ঘটনা বারবার জানতে চাওয়া পরিচর্যাকারীর জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে বারবার ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা না করে শান্তভাবে উত্তর দেওয়া বেশি সহায়ক।

কারণ তিনি ইচ্ছা করে একই কথা বলছেন না। রোগের প্রভাবে স্মৃতি চিন্তার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসায় এমন আচরণ হতে পারে।

রোগীর পাশাপাশি যত্ন দরকার পরিচর্যাকারীরও

অ্যালঝাইমার্সের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে অনেক সময় নজর দিতে পারেন না। ঘুমের ঘাটতি, একটানা দায়িত্ব, সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ধীরে ধীরে তাদের ওপরও চাপ তৈরি করে।

তাই রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীর জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের বিশ্রামের জন্য সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কোনো স্মৃতির সমস্যা বা আচরণগত পরিবর্তনকে শুধুবয়স হয়েছেবলে এড়িয়ে না যাওয়া। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ রোগ নির্ণয় হলে রোগী এবং পরিবার- দুই পক্ষই ভবিষ্যতের পরিস্থিতির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে।

অ্যালঝাইমার্সের লড়াই তাই শুধু ওষুধ বা চিকিৎসার নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ধৈর্য, নিরাপত্তা, বোঝাপড়া এবং মর্যাদা। রোগী হয়তো ধীরে ধীরে অনেক কিছু ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর প্রতি যত্ন সম্মান যেন পরিবারের কেউ ভুলে না যান।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত