বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন অথচ আয়কর দেওয়ার মতো আয় নেই; এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে অনেকেই ‘জিরো রিটার্ন’ বা শূন্য রিটার্ন জমা দিতে চান না। আবার অনেকের বেতন থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়া হলেও রিটার্নে কর পরিশোধের পরিমাণ শূন্য হতে পারে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: জিরো রিটার্ন মানেই আয়, বেতন বা সম্পদের তথ্য শূন্য দেখানো নয়। প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন না করে আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর হিসাব করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। বেসরকারি চাকরিজীবীরা কীভাবে ঘরে বসে সহজেই অনলাইনে এই রিটার্ন দাখিল করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ধাপগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
শুরুতেই বুঝে নেওয়া দরকার কারা মূলত জিরো রিটার্ন দিতে পারবেন। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ভিন্ন ভিন্ন নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণ পুরুষ করদাতার জন্য ৪ লাখ টাকা, নারী ও ৬৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সের করদাতার জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতার জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত “জুলাই যোদ্ধা” করদাতার করমুক্ত সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবক অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ছাড় পাবেন। করমুক্ত সীমার মধ্যে আয় থাকলে কর শূন্য হতে পারে। তবে আয় করমুক্ত সীমা ছাড়ালে ২০২৬-২৭ করবর্ষে অবস্থান নির্বিশেষে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর প্রযোজ্য হতে পারে। তাই কেবল বেতন পেলেই ‘জিরো রিটার্ন’ দেওয়া যাবে; এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি থাকা জরুরি। রিটার্ন দেওয়ার আগে বেতন সনদ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, বিনিয়োগের কাগজপত্র, সম্পদ ও দায়ের হিসাব এবং উৎসে কর কাটা হলে তার প্রমাণ হাতের কাছে রাখুন। এ বছর অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে সাধারণত কাগজপত্র আপলোড করতে হয় না; তবে তথ্য পূরণের সময় সঠিক হিসাব দেখে নিতে হবে।
প্রথম ধাপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন ওয়েবসাইট etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করে ‘eReturn’ অপশনে যেতে হবে। আগে নিবন্ধন করা না থাকলে ‘I am not registered yet’ অপশনে ক্লিক করে ১২ ডিজিটের ই-টিআইএন ও নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিতে হবে। মোবাইলে আসা ওটিপি যাচাই করে পাসওয়ার্ড সেট করার পর টিআইএন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে হবে।
লগইন করার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ‘Return Submission’ বা রিটার্ন জমার অপশনে গিয়ে ২০২৬-২৭ করবর্ষ নির্বাচন করতে হবে। এর ফলে আয়বর্ষ হিসেবে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৫-এর আয় প্রদর্শিত হবে। নিজের আবাসিক অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন-সংক্রান্ত তথ্য পূরণ করার পর ‘Heads of Income’ অংশে ‘Income from Employment’ নির্বাচন করতে হবে। এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি থেকে পাওয়া বেতন, বোনাস, ভাতা ও অন্যান্য প্রযোজ্য সুবিধার তথ্য দিতে হবে। বেতন সনদ দেখে করযোগ্য ও করমুক্ত অংশ আলাদা করে সঠিক অঙ্ক লিখতে হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে বিনিয়োগ বা কর রেয়াত পাওয়ার যোগ্য খরচ, উৎসে কর্তিত করের তথ্য, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাটসহ সম্পদের বিবরণ এবং ঋণ বা অন্যান্য দায় ও পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। আয় শূন্য না হলে সম্পদ ও ব্যয়ের ঘরেও শূন্য লিখে দেওয়া যাবে না।
সবশেষে সব তথ্য পূরণ হলে সিস্টেমে করের হিসাব যাচাই করে ‘Submit’ করতে হবে। কর প্রদেয় না থাকলে শূন্য দেখাতে পারে এবং কর বাকি থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হবে। জমা সম্পন্ন হলে অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ, ট্যাক্স সার্টিফিকেট ও রিটার্নের কপি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে হবে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হলেও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর শূন্য দেখানোর জন্য আয়, সম্পদ বা ব্যয়ের তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা যাবে না; বরং প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ভুল রিটার্ন জমা দিতে হবে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন অথচ আয়কর দেওয়ার মতো আয় নেই; এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে অনেকেই ‘জিরো রিটার্ন’ বা শূন্য রিটার্ন জমা দিতে চান না। আবার অনেকের বেতন থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়া হলেও রিটার্নে কর পরিশোধের পরিমাণ শূন্য হতে পারে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: জিরো রিটার্ন মানেই আয়, বেতন বা সম্পদের তথ্য শূন্য দেখানো নয়। প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন না করে আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর হিসাব করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। বেসরকারি চাকরিজীবীরা কীভাবে ঘরে বসে সহজেই অনলাইনে এই রিটার্ন দাখিল করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ধাপগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
শুরুতেই বুঝে নেওয়া দরকার কারা মূলত জিরো রিটার্ন দিতে পারবেন। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ভিন্ন ভিন্ন নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণ পুরুষ করদাতার জন্য ৪ লাখ টাকা, নারী ও ৬৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সের করদাতার জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতার জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত “জুলাই যোদ্ধা” করদাতার করমুক্ত সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবক অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ছাড় পাবেন। করমুক্ত সীমার মধ্যে আয় থাকলে কর শূন্য হতে পারে। তবে আয় করমুক্ত সীমা ছাড়ালে ২০২৬-২৭ করবর্ষে অবস্থান নির্বিশেষে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর প্রযোজ্য হতে পারে। তাই কেবল বেতন পেলেই ‘জিরো রিটার্ন’ দেওয়া যাবে; এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি থাকা জরুরি। রিটার্ন দেওয়ার আগে বেতন সনদ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, বিনিয়োগের কাগজপত্র, সম্পদ ও দায়ের হিসাব এবং উৎসে কর কাটা হলে তার প্রমাণ হাতের কাছে রাখুন। এ বছর অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে সাধারণত কাগজপত্র আপলোড করতে হয় না; তবে তথ্য পূরণের সময় সঠিক হিসাব দেখে নিতে হবে।
প্রথম ধাপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন ওয়েবসাইট etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করে ‘eReturn’ অপশনে যেতে হবে। আগে নিবন্ধন করা না থাকলে ‘I am not registered yet’ অপশনে ক্লিক করে ১২ ডিজিটের ই-টিআইএন ও নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিতে হবে। মোবাইলে আসা ওটিপি যাচাই করে পাসওয়ার্ড সেট করার পর টিআইএন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে হবে।
লগইন করার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ‘Return Submission’ বা রিটার্ন জমার অপশনে গিয়ে ২০২৬-২৭ করবর্ষ নির্বাচন করতে হবে। এর ফলে আয়বর্ষ হিসেবে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৫-এর আয় প্রদর্শিত হবে। নিজের আবাসিক অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন-সংক্রান্ত তথ্য পূরণ করার পর ‘Heads of Income’ অংশে ‘Income from Employment’ নির্বাচন করতে হবে। এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি থেকে পাওয়া বেতন, বোনাস, ভাতা ও অন্যান্য প্রযোজ্য সুবিধার তথ্য দিতে হবে। বেতন সনদ দেখে করযোগ্য ও করমুক্ত অংশ আলাদা করে সঠিক অঙ্ক লিখতে হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে বিনিয়োগ বা কর রেয়াত পাওয়ার যোগ্য খরচ, উৎসে কর্তিত করের তথ্য, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাটসহ সম্পদের বিবরণ এবং ঋণ বা অন্যান্য দায় ও পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। আয় শূন্য না হলে সম্পদ ও ব্যয়ের ঘরেও শূন্য লিখে দেওয়া যাবে না।
সবশেষে সব তথ্য পূরণ হলে সিস্টেমে করের হিসাব যাচাই করে ‘Submit’ করতে হবে। কর প্রদেয় না থাকলে শূন্য দেখাতে পারে এবং কর বাকি থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হবে। জমা সম্পন্ন হলে অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ, ট্যাক্স সার্টিফিকেট ও রিটার্নের কপি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে হবে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হলেও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর শূন্য দেখানোর জন্য আয়, সম্পদ বা ব্যয়ের তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা যাবে না; বরং প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ভুল রিটার্ন জমা দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন