সংবাদ

ভুয়া তথ্যের বিস্তারে ভারতীয় গণমাধ্যম নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছেই


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

ভুয়া তথ্যের বিস্তারে ভারতীয় গণমাধ্যম নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছেই
ছবি: এআই

অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার নিয়ে ভারতকে ঘিরে কয়েক বছর ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেশটির নাগরিকদের অনলাইনে ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ঘিরে ভুল, বিভ্রান্তিকর কিংবা যাচাই না করা তথ্য প্রচারের অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এসেছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত মাইক্রোসফটের ‘ডিজিটাল সিভিলিটি ইনডেক্স ২০১৮’-এর ভারতীয় তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ ভারতীয় জানিয়েছেন, তারা অনলাইনে ‘ফেক নিউজ’-এর মুখোমুখি হয়েছেন। বৈশ্বিক গড় ছিল ৫৭ শতাংশ। একই জরিপে ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতারণামূলক তথ্য বা ‘হোক্স’-এর মুখোমুখি হওয়ার হার ভারতে ছিল ৫৪ শতাংশ, বৈশ্বিক গড় ৫০ শতাংশ। জরিপটি ২২টি দেশের অনলাইন ব্যবহারকারীদের নিয়ে করা হয়েছিল।

অর্থাৎ, মাইক্রোসফটের ওই জরিপ থেকে ভারতকে ‘বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভুয়া খবর ছড়ানো দেশ’ বলা যায় না। বরং বলা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ভারতীয়দের মধ্যে অনলাইনে ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি ছিল।

২০২৬ সালের ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট’-এও ভারতের সংবাদপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়। রিউটার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের জরিপে অংশ নেওয়া ৫৮ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ভুয়া খবর ও অপতথ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৯ শতাংশ ভারতীয় বলেছেন, তারা বেশির ভাগ সময়ের খবরকে বিশ্বাস করেন। তবে রিউটার্স ইনস্টিটিউট নিজেই সতর্ক করেছে, ভারতের নমুনাটি অন্যান্য অনেক দেশের মতো সম্পূর্ণ জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল নয়।

ভারতের সংবাদমাধ্যম নিয়ে সবচেয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে। ২০২৪ সালে রিউমর স্ক্যানার অন্তত ১৪৮টি ভারত-উৎসভিত্তিক অপতথ্য শনাক্ত করেছিল। এর মধ্যে ৭২টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ৩২টি ঘটনা বা বিষয়ে মোট ১৩৭টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেগুলোতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ১৪৮টি ঘটনার মধ্যে ১১৫টি ছিল সাম্প্রদায়িক বিষয়সংক্রান্ত।

২০২৫ সালে সংখ্যাটি আরও বেড়েছে। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ৩৮টি ঘটনায় মোট ১৪০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেগুলোতে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের ১৫৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৯১টি—অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ—ছিল সাম্প্রদায়িক বিষয়ক। রিউমর স্ক্যানার বলেছে, ৩৩টি ঘটনায় মুসলিম ব্যক্তিকে মিথ্যাভাবে হিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরোনো ঘটনাকে নতুন বলে চালানো এবং বিনোদনের জন্য তৈরি স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।

তবে এই সংখ্যাগুলোকে ভারতীয় গণমাধ্যমে ছড়ানো সব অপতথ্যের পূর্ণ হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না। রিউমর স্ক্যানার নিজেই বলেছে, তারা যেসব দাবি যাচাই করতে পেরেছে, কেবল সেগুলোই এই হিসাবের মধ্যে রেখেছে।

অপতথ্যের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ভারতীয় মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আলাদা করে নজরে এসেছে।

২০২৪ সালের রিউমর স্ক্যানার বিশ্লেষণে রিপাবলিক বাংলা সবচেয়ে বেশি—১০টি ঘটনায়—অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত বলে শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে অবশ্য তালিকার শীর্ষে ছিল আজতক বাংলা; ৩২টি ঘটনার মধ্যে ১০টিতে তাদের প্রকাশিত তথ্যের বিরুদ্ধে অপতথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের বিশ্লেষণে যেসব ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, জি নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮, টিভি৯, এবিপি, মিরর নাও এবং ওয়িওনের মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রিউমর স্ক্যানারের তালিকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা মানে ওই প্রতিষ্ঠানের সব সংবাদ বা সামগ্রিক সাংবাদিকতা মিথ্যা—এমন সিদ্ধান্ত নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রতিবেদন বা ঘটনার তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময়ও ভারতীয় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের তথ্য যাচাই নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছিল।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, সংঘাতের সময় কয়েকটি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল পাকিস্তানে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করেছে বা পাকিস্তানের বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—এমন যাচাইহীন দাবি প্রচার করে। কিছু ক্ষেত্রে গাজা, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান দুর্ঘটনা এবং ভিডিও গেমের দৃশ্যও যুদ্ধের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।

সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও তখন টেলিভিশন সংবাদে ‘হাইপারন্যাশনালিজম’ ও ‘অ্যাবনরমাল ট্রায়ামফালিজম’-এর কথা বলেন এবং এটিকে একটি ‘প্যারালাল রিয়্যালিটি’ তৈরির সঙ্গে তুলনা করেন।

এ ধরনের ঘটনা দেখায়, সংকট বা যুদ্ধের সময়ে দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতা কখনো কখনো যাচাই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। তবে কোনো দেশের সব সংবাদমাধ্যমকে একই মানদণ্ডে বিচার করার জন্য এসব ঘটনা যথেষ্ট নয়।

ভারতের সংবাদপরিবেশ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স।

২০২৬ সালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। আগের বছর দেশটির অবস্থান ছিল ১৫১তম। আরএসএফ ভারতের সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, মালিকানার ঘনত্ব এবং কিছু সংবাদমাধ্যমের স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

ভারতীয় টেলিভিশন সাংবাদিকতার উচ্চস্বরে বিতর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংবাদ উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আলোচনায় রিপাবলিক বাংলার সাবেক জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও অ্যাঙ্কর ময়ূখরঞ্জন ঘোষের নামও এসেছে।আগস্ট ২০২৬-এ তিনি রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্ক থেকে সরে দাঁড়ান। 

এক্সচেঞ্জ৪মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেছেন এবং রিপাবলিক বাংলায় সিনিয়র এডিটর, হেড অব ইনপুট ও সিনিয়র অ্যাঙ্কর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদায়বার্তায় তিনি নতুন যাত্রা, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতে আবার গণমাধ্যমে ফেরার সম্ভাবনার কথা জানান।

তার বিদায়বার্তাকে কেন্দ্র করে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও জল্পনা তৈরি হলেও, সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে তার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ভারতীয় গণমাধ্যমের কোনো ‘পরিকল্পিত কৌশল’-এর সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না।

ভুয়া তথ্যের বিস্তার অবশ্য শুধু ভারতীয় গণমাধ্যমের সমস্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দ্রুতগতির ডিজিটাল প্রকাশনা এবং দর্শক টানার প্রতিযোগিতার কারণে বিশ্বজুড়েই সংবাদ যাচাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় উৎস থেকে আসা অপতথ্যের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, ভাষা, ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে একটি মিথ্যা তথ্য খুব দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।

রিউমর স্ক্যানারের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণেও ভারতীয় উৎস থেকে ছড়ানো অপতথ্যের সামাজিক প্রভাব নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভারতীয় গণমাধ্যমের নয়। প্রশ্নটি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির—একটি তথ্য কত দ্রুত প্রকাশ করা হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কতটা যাচাই করা হলো। যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা রাজনৈতিক সংকটের সময়ে এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। 

সেক্ষেত্রে এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ পাল্টা প্রচার নয়; আরও নির্ভুল তথ্য, স্বচ্ছ উৎস এবং শক্তিশালী তথ্য-যাচাই।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ভুয়া তথ্যের বিস্তারে ভারতীয় গণমাধ্যম নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছেই

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার নিয়ে ভারতকে ঘিরে কয়েক বছর ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেশটির নাগরিকদের অনলাইনে ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ঘিরে ভুল, বিভ্রান্তিকর কিংবা যাচাই না করা তথ্য প্রচারের অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এসেছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত মাইক্রোসফটের ‘ডিজিটাল সিভিলিটি ইনডেক্স ২০১৮’-এর ভারতীয় তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ ভারতীয় জানিয়েছেন, তারা অনলাইনে ‘ফেক নিউজ’-এর মুখোমুখি হয়েছেন। বৈশ্বিক গড় ছিল ৫৭ শতাংশ। একই জরিপে ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতারণামূলক তথ্য বা ‘হোক্স’-এর মুখোমুখি হওয়ার হার ভারতে ছিল ৫৪ শতাংশ, বৈশ্বিক গড় ৫০ শতাংশ। জরিপটি ২২টি দেশের অনলাইন ব্যবহারকারীদের নিয়ে করা হয়েছিল।

অর্থাৎ, মাইক্রোসফটের ওই জরিপ থেকে ভারতকে ‘বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভুয়া খবর ছড়ানো দেশ’ বলা যায় না। বরং বলা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ভারতীয়দের মধ্যে অনলাইনে ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি ছিল।

২০২৬ সালের ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট’-এও ভারতের সংবাদপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়। রিউটার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের জরিপে অংশ নেওয়া ৫৮ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ভুয়া খবর ও অপতথ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৯ শতাংশ ভারতীয় বলেছেন, তারা বেশির ভাগ সময়ের খবরকে বিশ্বাস করেন। তবে রিউটার্স ইনস্টিটিউট নিজেই সতর্ক করেছে, ভারতের নমুনাটি অন্যান্য অনেক দেশের মতো সম্পূর্ণ জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল নয়।

ভারতের সংবাদমাধ্যম নিয়ে সবচেয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে। ২০২৪ সালে রিউমর স্ক্যানার অন্তত ১৪৮টি ভারত-উৎসভিত্তিক অপতথ্য শনাক্ত করেছিল। এর মধ্যে ৭২টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ৩২টি ঘটনা বা বিষয়ে মোট ১৩৭টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেগুলোতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ১৪৮টি ঘটনার মধ্যে ১১৫টি ছিল সাম্প্রদায়িক বিষয়সংক্রান্ত।

২০২৫ সালে সংখ্যাটি আরও বেড়েছে। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়। আগের বছরের তুলনায় এটি প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ৩৮টি ঘটনায় মোট ১৪০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেগুলোতে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের ১৫৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৯১টি—অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ—ছিল সাম্প্রদায়িক বিষয়ক। রিউমর স্ক্যানার বলেছে, ৩৩টি ঘটনায় মুসলিম ব্যক্তিকে মিথ্যাভাবে হিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরোনো ঘটনাকে নতুন বলে চালানো এবং বিনোদনের জন্য তৈরি স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।

তবে এই সংখ্যাগুলোকে ভারতীয় গণমাধ্যমে ছড়ানো সব অপতথ্যের পূর্ণ হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না। রিউমর স্ক্যানার নিজেই বলেছে, তারা যেসব দাবি যাচাই করতে পেরেছে, কেবল সেগুলোই এই হিসাবের মধ্যে রেখেছে।

অপতথ্যের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ভারতীয় মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আলাদা করে নজরে এসেছে।

২০২৪ সালের রিউমর স্ক্যানার বিশ্লেষণে রিপাবলিক বাংলা সবচেয়ে বেশি—১০টি ঘটনায়—অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত বলে শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে অবশ্য তালিকার শীর্ষে ছিল আজতক বাংলা; ৩২টি ঘটনার মধ্যে ১০টিতে তাদের প্রকাশিত তথ্যের বিরুদ্ধে অপতথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের বিশ্লেষণে যেসব ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, জি নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮, টিভি৯, এবিপি, মিরর নাও এবং ওয়িওনের মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রিউমর স্ক্যানারের তালিকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা মানে ওই প্রতিষ্ঠানের সব সংবাদ বা সামগ্রিক সাংবাদিকতা মিথ্যা—এমন সিদ্ধান্ত নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রতিবেদন বা ঘটনার তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময়ও ভারতীয় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের তথ্য যাচাই নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছিল।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, সংঘাতের সময় কয়েকটি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল পাকিস্তানে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করেছে বা পাকিস্তানের বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—এমন যাচাইহীন দাবি প্রচার করে। কিছু ক্ষেত্রে গাজা, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান দুর্ঘটনা এবং ভিডিও গেমের দৃশ্যও যুদ্ধের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।

সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও তখন টেলিভিশন সংবাদে ‘হাইপারন্যাশনালিজম’ ও ‘অ্যাবনরমাল ট্রায়ামফালিজম’-এর কথা বলেন এবং এটিকে একটি ‘প্যারালাল রিয়্যালিটি’ তৈরির সঙ্গে তুলনা করেন।

এ ধরনের ঘটনা দেখায়, সংকট বা যুদ্ধের সময়ে দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতা কখনো কখনো যাচাই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। তবে কোনো দেশের সব সংবাদমাধ্যমকে একই মানদণ্ডে বিচার করার জন্য এসব ঘটনা যথেষ্ট নয়।

ভারতের সংবাদপরিবেশ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স।

২০২৬ সালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। আগের বছর দেশটির অবস্থান ছিল ১৫১তম। আরএসএফ ভারতের সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, মালিকানার ঘনত্ব এবং কিছু সংবাদমাধ্যমের স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

ভারতীয় টেলিভিশন সাংবাদিকতার উচ্চস্বরে বিতর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংবাদ উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আলোচনায় রিপাবলিক বাংলার সাবেক জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও অ্যাঙ্কর ময়ূখরঞ্জন ঘোষের নামও এসেছে।আগস্ট ২০২৬-এ তিনি রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্ক থেকে সরে দাঁড়ান। 

এক্সচেঞ্জ৪মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেছেন এবং রিপাবলিক বাংলায় সিনিয়র এডিটর, হেড অব ইনপুট ও সিনিয়র অ্যাঙ্কর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদায়বার্তায় তিনি নতুন যাত্রা, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতে আবার গণমাধ্যমে ফেরার সম্ভাবনার কথা জানান।

তার বিদায়বার্তাকে কেন্দ্র করে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও জল্পনা তৈরি হলেও, সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে তার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ভারতীয় গণমাধ্যমের কোনো ‘পরিকল্পিত কৌশল’-এর সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না।

ভুয়া তথ্যের বিস্তার অবশ্য শুধু ভারতীয় গণমাধ্যমের সমস্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দ্রুতগতির ডিজিটাল প্রকাশনা এবং দর্শক টানার প্রতিযোগিতার কারণে বিশ্বজুড়েই সংবাদ যাচাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় উৎস থেকে আসা অপতথ্যের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, ভাষা, ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে একটি মিথ্যা তথ্য খুব দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।

রিউমর স্ক্যানারের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণেও ভারতীয় উৎস থেকে ছড়ানো অপতথ্যের সামাজিক প্রভাব নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভারতীয় গণমাধ্যমের নয়। প্রশ্নটি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির—একটি তথ্য কত দ্রুত প্রকাশ করা হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কতটা যাচাই করা হলো। যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা রাজনৈতিক সংকটের সময়ে এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। 

সেক্ষেত্রে এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ পাল্টা প্রচার নয়; আরও নির্ভুল তথ্য, স্বচ্ছ উৎস এবং শক্তিশালী তথ্য-যাচাই।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত