সংবাদ

অমীমাংসিত এক ইতিহাস ৭ নভেম্বর


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

অমীমাংসিত এক ইতিহাস ৭ নভেম্বর
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবসে। ছবি: উইকিপিডিয়া।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স তখন মাত্র চার বছর। ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রক্ষমতায় খন্দকার মোশতাক আহমদ। কিন্তু সরকার থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার বড় অংশ তখন সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে।

সেনাবাহিনীর ভেতরেও চলছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একদিকে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রভাব, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তার বলয়। এই পরিস্থিতিতে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে ঘটে দুটি অভ্যুত্থান। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একের পর এক এসব ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দেয়। ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সেই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্নেল আবু তাহেরের পরিণতি হয় ফাঁসির মঞ্চে।

প্রশ্ন ওঠে ৭ নভেম্বর আসলে কী ছিল, সৈনিকদের বিদ্রোহ, সিপাহী-জনতার বিপ্লব, নাকি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আরেক সামরিক শক্তির ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা বঙ্গভবনে অবস্থান করে ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ। পরে তাকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করা হয় জিয়াউর রহমানকে।

কিন্তু সেনাবাহিনীর ভেতরে এই ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রভাব এবং নিয়মিত সামরিক শৃঙ্খলার বাইরে তাদের অবস্থান অনেক কর্মকর্তার কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিতি পাওয়া তিন সেনা কর্মকর্তা—জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও কে এম শফিউল্লাহকে ঘিরে সেনাবাহিনীতে আলাদা প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল বলে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। ১৫ আগস্টের পর এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বই অবশ্য পুরো সংকটের একমাত্র কারণ ছিল না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ও পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষও পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল।

নভেম্বরের ৩ তারিখ ভোরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায়। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়। সেনাসদস্যরা বঙ্গভবন ঘিরে ফেলেন। রেডিও স্টেশনও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের প্রভাব থেকে সেনাবাহিনীকে মুক্ত করা এবং সেনাবাহিনীতে নিয়মিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তবে খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিগত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ১০ নভেম্বর, ১৯৭৫ তারিখের একটি কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পেছনে তার ব্যক্তিগত পদোন্নতি ও সেনাবাহিনীতে জুনিয়র কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রভাবের বিরোধিতা—দুই ধরনের কারণই কাজ করে থাকতে পারে। তবে বার্তাটিতে এটিও বলা হয়েছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তখন নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভ্যুত্থানের দিনই শুরু হয় আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।

জেলহত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ১৫ আগস্টের হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওই কূটনৈতিক বার্তাতেও চার নেতার হত্যাকাণ্ডকে আগের একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও এর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে আরও দলিলভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে চলে যান। ফলে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর ভেতরের সংকটের অবসান ঘটাতে পারেনি; বরং নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনী এবং সৈনিক সংস্থা।

কর্নেল আবু তাহের ছিলেন এই তৎপরতার অন্যতম প্রধান সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তাহের ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে জাসদের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

জাসদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল প্রচলিত রাষ্ট্র ও শ্রেণিব্যবস্থার পরিবর্তন। দলটির একটি অংশ সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখছিল। তাদের ধারণা ছিল, সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহের সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো বদলানো সম্ভব।

এক সাক্ষাৎকারে তাহেরের ভাই ও তৎকালীন গণবাহিনীর ঢাকা মহানগর প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাহের সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। ৬ নভেম্বর রাতে ক্যান্টনমেন্টের একটি বৈঠকে বিদ্রোহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। সেখানে তাহেরের পাশাপাশি হাসানুল হক ইনু ও গণবাহিনীর অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন বলে তার বর্ণনা।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাসদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৯ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কথা থাকলেও ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় ৬ নভেম্বর রাতেই বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে বিদ্রোহ শুরু হয়। নিম্নপদস্থ সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষের একটি বড় কারণ ছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরে পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য। তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করছেন, কিন্তু তাদের সমস্যার দিকে নজর দিচ্ছেন না।

সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, জেসিও ছাড়া র‍্যাংক নাই’ স্লোগান। জাসদের সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী এই অসন্তোষকে সংগঠিত বিদ্রোহে রূপ দিতে ভূমিকা রাখে।

সেই রাতেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। তবে তাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কোন ইউনিট কী ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোর বেঙ্গল ও টু ফিল্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা তাকে মুক্ত করেন।

পরদিন সকালে সেনানিবাসে জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের মধ্যে দেখা হয়। তাহের চেয়েছিলেন, জিয়া রেডিওতে গিয়ে গণবাহিনীর ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করবেন এবং সেগুলো মেনে নেওয়ার কথা জানাবেন। কিন্তু জিয়া সে পথে যাননি। তিনি আগেই নিজের ভাষণ রেকর্ড করে রেডিওতে পাঠিয়ে দেন। এখানেই দুই নেতার রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পথের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এদিকে ৭ নভেম্বর সকালে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল কে এন হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারকে হত্যা করা হয়। তাদের হত্যার পেছনে কারা ছিল, কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল—তা নিয়ে আজও প্রশ্ন রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও বিচার হয়নি।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। সৈনিকদের বিদ্রোহে জাসদের গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিদ্রোহের পর রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ জাসদের হাতে যায়নি। বরং জিয়াউর রহমান ক্রমে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

ইতিহাসবিদ উইলেম ভ্যান শেন্ডেল তার ‘এ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৩ ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে পরপর দুটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জাসদ-প্রভাবিত বিদ্রোহী সৈনিকদের ভূমিকা ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং জাসদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। 

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাহেরের সম্পর্কও দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সামরিক আদালতে তার বিচার হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তবে ২০১১ সালে হাইকোর্ট এবং পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০১৩ সালে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাহেরের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭ নভেম্বরের তিন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

একই ঘটনার তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। বিএনপি ৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। তাদের ব্যাখ্যায় এটি ছিল সিপাহী-জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করার ঘটনা।

জাসদ ও এর বিভিন্ন অংশ ৭ নভেম্বরকে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ বা ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে দেখে। তাদের বক্তব্যে কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈনিকদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সৈনিক-জনতা অভ্যুত্থান।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ানে দিনটি সামরিক অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এসব ব্যাখ্যার পেছনে রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে দলীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখলে বোঝা যায়, ৭ নভেম্বর ছিল একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির সংঘাতের ফল। সেখানে সৈনিকদের অসন্তোষ, জাসদের সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় উত্থান এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—সবই একসঙ্গে কাজ করেছে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাগুলোকে শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়।

কেন স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে সেনাবাহিনী বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এল? কেন সৈনিকদের অসন্তোষ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের শক্তিতে পরিণত হলো? কেন ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শক্তির মধ্যে শেষ পর্যন্ত ঐক্য টিকল না? আর কেন সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক তাহেরকে কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ৭ নভেম্বর নয়, ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ৩ নভেম্বর, জেলহত্যা, ৭ নভেম্বর এবং পরবর্তী সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা একসঙ্গে দেখতে হবে।

ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো, কোনো অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব পক্ষের লক্ষ্য এক হয় না। একই ঘটনায় কেউ সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, কেউ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে চায়, কেউ সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, আবার কেউ সেই পরিস্থিতিকে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরেও এমনটাই ঘটেছিল। সৈনিকেরা বিদ্রোহ করেছিলেন, জাসদ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল, আর জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এই তিনটি ঘটনা একই রাজনৈতিক পরিণতির অংশ ছিল না।

সেই কারণেই ৭ নভেম্বরের ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে বিপ্লবের স্বপ্ন, সামরিক কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতার ইতিহাস। সূত্র: বিবিসি। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


অমীমাংসিত এক ইতিহাস ৭ নভেম্বর

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

১৯৭৫ সালের নভেম্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স তখন মাত্র চার বছর। ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রক্ষমতায় খন্দকার মোশতাক আহমদ। কিন্তু সরকার থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার বড় অংশ তখন সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে।

সেনাবাহিনীর ভেতরেও চলছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একদিকে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রভাব, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তার বলয়। এই পরিস্থিতিতে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে ঘটে দুটি অভ্যুত্থান। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একের পর এক এসব ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দেয়। ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সেই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্নেল আবু তাহেরের পরিণতি হয় ফাঁসির মঞ্চে।

প্রশ্ন ওঠে ৭ নভেম্বর আসলে কী ছিল, সৈনিকদের বিদ্রোহ, সিপাহী-জনতার বিপ্লব, নাকি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আরেক সামরিক শক্তির ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা বঙ্গভবনে অবস্থান করে ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ। পরে তাকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করা হয় জিয়াউর রহমানকে।

কিন্তু সেনাবাহিনীর ভেতরে এই ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষ করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রভাব এবং নিয়মিত সামরিক শৃঙ্খলার বাইরে তাদের অবস্থান অনেক কর্মকর্তার কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিতি পাওয়া তিন সেনা কর্মকর্তা—জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও কে এম শফিউল্লাহকে ঘিরে সেনাবাহিনীতে আলাদা প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল বলে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। ১৫ আগস্টের পর এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বই অবশ্য পুরো সংকটের একমাত্র কারণ ছিল না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ও পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষও পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল।

নভেম্বরের ৩ তারিখ ভোরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায়। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়। সেনাসদস্যরা বঙ্গভবন ঘিরে ফেলেন। রেডিও স্টেশনও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের প্রভাব থেকে সেনাবাহিনীকে মুক্ত করা এবং সেনাবাহিনীতে নিয়মিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তবে খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিগত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ১০ নভেম্বর, ১৯৭৫ তারিখের একটি কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পেছনে তার ব্যক্তিগত পদোন্নতি ও সেনাবাহিনীতে জুনিয়র কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রভাবের বিরোধিতা—দুই ধরনের কারণই কাজ করে থাকতে পারে। তবে বার্তাটিতে এটিও বলা হয়েছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তখন নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভ্যুত্থানের দিনই শুরু হয় আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।

জেলহত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ১৫ আগস্টের হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওই কূটনৈতিক বার্তাতেও চার নেতার হত্যাকাণ্ডকে আগের একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও এর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে আরও দলিলভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে চলে যান। ফলে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর ভেতরের সংকটের অবসান ঘটাতে পারেনি; বরং নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনী এবং সৈনিক সংস্থা।

কর্নেল আবু তাহের ছিলেন এই তৎপরতার অন্যতম প্রধান সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তাহের ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে জাসদের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

জাসদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল প্রচলিত রাষ্ট্র ও শ্রেণিব্যবস্থার পরিবর্তন। দলটির একটি অংশ সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখছিল। তাদের ধারণা ছিল, সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহের সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো বদলানো সম্ভব।

এক সাক্ষাৎকারে তাহেরের ভাই ও তৎকালীন গণবাহিনীর ঢাকা মহানগর প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাহের সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। ৬ নভেম্বর রাতে ক্যান্টনমেন্টের একটি বৈঠকে বিদ্রোহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। সেখানে তাহেরের পাশাপাশি হাসানুল হক ইনু ও গণবাহিনীর অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন বলে তার বর্ণনা।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাসদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৯ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কথা থাকলেও ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় ৬ নভেম্বর রাতেই বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে বিদ্রোহ শুরু হয়। নিম্নপদস্থ সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষের একটি বড় কারণ ছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরে পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য। তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করছেন, কিন্তু তাদের সমস্যার দিকে নজর দিচ্ছেন না।

সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, জেসিও ছাড়া র‍্যাংক নাই’ স্লোগান। জাসদের সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী এই অসন্তোষকে সংগঠিত বিদ্রোহে রূপ দিতে ভূমিকা রাখে।

সেই রাতেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। তবে তাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কোন ইউনিট কী ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোর বেঙ্গল ও টু ফিল্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা তাকে মুক্ত করেন।

পরদিন সকালে সেনানিবাসে জিয়াউর রহমান ও কর্নেল তাহেরের মধ্যে দেখা হয়। তাহের চেয়েছিলেন, জিয়া রেডিওতে গিয়ে গণবাহিনীর ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করবেন এবং সেগুলো মেনে নেওয়ার কথা জানাবেন। কিন্তু জিয়া সে পথে যাননি। তিনি আগেই নিজের ভাষণ রেকর্ড করে রেডিওতে পাঠিয়ে দেন। এখানেই দুই নেতার রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পথের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এদিকে ৭ নভেম্বর সকালে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল কে এন হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারকে হত্যা করা হয়। তাদের হত্যার পেছনে কারা ছিল, কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল—তা নিয়ে আজও প্রশ্ন রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও বিচার হয়নি।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। সৈনিকদের বিদ্রোহে জাসদের গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিদ্রোহের পর রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ জাসদের হাতে যায়নি। বরং জিয়াউর রহমান ক্রমে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

ইতিহাসবিদ উইলেম ভ্যান শেন্ডেল তার ‘এ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৩ ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে পরপর দুটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জাসদ-প্রভাবিত বিদ্রোহী সৈনিকদের ভূমিকা ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং জাসদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। 

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাহেরের সম্পর্কও দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সামরিক আদালতে তার বিচার হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তবে ২০১১ সালে হাইকোর্ট এবং পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০১৩ সালে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাহেরের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭ নভেম্বরের তিন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

একই ঘটনার তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। বিএনপি ৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। তাদের ব্যাখ্যায় এটি ছিল সিপাহী-জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করার ঘটনা।

জাসদ ও এর বিভিন্ন অংশ ৭ নভেম্বরকে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ বা ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে দেখে। তাদের বক্তব্যে কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈনিকদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সৈনিক-জনতা অভ্যুত্থান।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ানে দিনটি সামরিক অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এসব ব্যাখ্যার পেছনে রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে দলীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখলে বোঝা যায়, ৭ নভেম্বর ছিল একাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির সংঘাতের ফল। সেখানে সৈনিকদের অসন্তোষ, জাসদের সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় উত্থান এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—সবই একসঙ্গে কাজ করেছে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাগুলোকে শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়।

কেন স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে সেনাবাহিনী বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এল? কেন সৈনিকদের অসন্তোষ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের শক্তিতে পরিণত হলো? কেন ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শক্তির মধ্যে শেষ পর্যন্ত ঐক্য টিকল না? আর কেন সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক তাহেরকে কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ৭ নভেম্বর নয়, ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ৩ নভেম্বর, জেলহত্যা, ৭ নভেম্বর এবং পরবর্তী সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা একসঙ্গে দেখতে হবে।

ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো, কোনো অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব পক্ষের লক্ষ্য এক হয় না। একই ঘটনায় কেউ সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, কেউ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে চায়, কেউ সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, আবার কেউ সেই পরিস্থিতিকে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরেও এমনটাই ঘটেছিল। সৈনিকেরা বিদ্রোহ করেছিলেন, জাসদ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল, আর জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এই তিনটি ঘটনা একই রাজনৈতিক পরিণতির অংশ ছিল না।

সেই কারণেই ৭ নভেম্বরের ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে বিপ্লবের স্বপ্ন, সামরিক কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতার ইতিহাস। সূত্র: বিবিসি। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত