সংবাদ

ঢাকার রাত কেন এত গরম হচ্ছে?


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম

ঢাকার রাত কেন এত গরম হচ্ছে?

সন্ধ্যা মানে দিনের তপ্ত কপালে একটু শীতল বাতাসের স্পর্শ। রোদের বিদায়, পাখির ঘরে ফেরা, ক্লান্ত মানুষের স্বস্তির অপেক্ষা। সারাদিনের উত্তাপ পেছনে ফেলে পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ঢাকায় এখন কোনো কোনো সন্ধ্যায় অন্ধকার নামে, শীতলতা নামে না। সূর্য ডুবে যায়, অথচ গরম থেকে যায় আরও ভ্যাপসা, আরও আবদ্ধ হয়ে।

সম্প্রতি ঢাকায় পরপর কয়েকটি রাতে এই অস্বস্তি গভীরভাবে অনুভব করেছি। পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীর তীব্র গরম আমার অপরিচিত নয়। দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুবাদে সেই রুক্ষ তাপের সঙ্গে পরিচয় আছে। তবু ঢাকার রাতের গরম যেন অন্য রকম। গায়ে ঘাম জমে, শরীর জুড়ায় না। এমনকি এসি চালানোর পরও স্বস্তি পেতে সময় লাগে। মনে হয়, দিনের উত্তাপ রাতের মধ্যেও আমাদের পিছু ছাড়ছে না।

সন্ধ্যার পর যে শহরের ধীরে ধীরে শীতল হওয়ার কথা, সেখানে রাতও কেন এত অস্বস্তিকর? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাপমাত্রার সংখ্যায় নেই। সন্ধ্যায় বেশি গরম অনুভব করা মানেই দুপুরের চেয়ে বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে, তা নয়। তাপমাত্রা কিছুটা নামলেও আর্দ্রতা, বাতাসের স্থবিরতা আর চারপাশের উত্তপ্ত দেয়াল ও রাস্তা থেকে আসা তাপ মিলিয়ে শরীরের অস্বস্তি বাড়তে পারে। কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; তবে তা আমাদের নগরজীবনের একটি জরুরি সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।

দিনের পুরোটা সময় ভবন, ছাদ ও পিচঢালা রাস্তা সূর্যের তাপ গ্রহণ করে। সূর্যাস্তের পর সেই সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রী থেকে ধীরে তাপ বের হওয়ার কারণে সন্ধ্যার পর নগর তাপদ্বীপের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। আশপাশের কম নির্মিত এলাকার তুলনায় শহর উষ্ণ থেকে যাওয়ার এই ঘটনাই ‘নগর তাপদ্বীপ’।

পাশাপাশি উঁচু ভবন ও সরু রাস্তার বিন্যাসও সমস্যাটিকে জটিল করে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) ইপিএর তথ্যানুসারে, এ ধরনের ভবনঘেরা পথ প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহে বাধা দিতে পারে; ঘন নির্মাণের মধ্যে জমে থাকা তাপও সহজে বের হতে পারে না। ফলে রোদ চলে গেলেও দিনের উত্তাপের রেশ থেকে যায়। 

এর সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে গরমের চরিত্র বদলে যায়। শরীর ঠান্ডা হওয়ার জন্য শুধু ঘাম হওয়া যথেষ্ট নয়; সেই ঘাম বাষ্পীভূত হয়ে ত্বক থেকে তাপ সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে প্রক্রিয়াটি ধীর হয়। তখন ঘামলেও স্বস্তি আসে না। সন্ধ্যায় বাতাস কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়তেও পারে। বাতাস চলাচল কম থাকলে ভ্যাপসা অনুভূতি আরও প্রকট হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুসারে, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা একসঙ্গে বিবেচনা করে ‘হিট ইনডেক্স’ নির্ধারণ করা হয়, যা অনুভূত গরমের একটি সূচক। রোদ, বাতাস ও শারীরিক পরিশ্রমের প্রভাব বুঝতে আরও বিষয় বিবেচনা করতে হয়। অর্থাৎ একই তাপমাত্রা দুই জায়গায় মানুষের শরীরে একই অনুভূতি তৈরি করবে, এমন নয়। 

রাজশাহীর গরমের সঙ্গে ঢাকার গরমের পার্থক্য অনুভব করার পেছনেও এই বিষয়গুলো কাজ করতে পারে। রাজশাহীর রাত সব সময় শীতল, এমন দাবি করছি না। তবে শুষ্ক পরিস্থিতিতে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যে স্বস্তি দিতে পারে, আর্দ্র ও বাতাসহীন পরিবেশে তা পাওয়া কঠিন। দুই শহরের যথাযথ তুলনার জন্য একই সময়ের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের তথ্য প্রয়োজন।

সম্প্রতি ওমরাহ পালনের সময় মক্কা-মদিনার প্রচণ্ড গরমের সঙ্গেও ঢাকার গরমের একটি পার্থক্য অনুভব করেছি। সেখানে তীব্র তাপের মধ্যেও গায়ে ঘাম জমে থাকার অনুভূতি ঢাকার মতো ছিল না। এর অর্থ শরীর ঘামছিল না, তা নয়। শুষ্ক বাতাসে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে বলে ত্বকের ভেজাভাব কম টের পাওয়া যায়। ঢাকার আর্দ্র পরিবেশে সেই ঘামই সহজে শুকাতে চায় না।

অবশ্য মক্কা-মদিনার আবহাওয়াও প্রতিদিন এক রকম নয়। শুষ্ক গরমকে নিরাপদ ভাবারও সুযোগ নেই; ঘাম চোখে না পড়লেও শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, গরমের কষ্ট শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় ধরা পড়ে না।

ঘর কিংবা গাড়ির এসির অভিজ্ঞতাতেও তাপ সঞ্চয়ের বিষয়টি বোঝা যায়। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচ দিয়ে আসা সৌরশক্তি আসন, ড্যাশবোর্ড ও ভেতরের অংশ গরম করে। এসি চালানোর পর ঠান্ডা বাতাস এলেও ওই অংশগুলো তাপ ছাড়তে থাকে। ফলে পুরো কেবিন আরামদায়ক হতে সময় লাগে। ঘরের ছাদ, দেয়াল ও আসবাবও দিনের তাপ ধরে রাখতে পারে। এসিকে বাতাস ঠান্ডা করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও সরাতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পরিবেশ সংস্থার পরিচালিত ফুয়েল ইকোনমি ওয়েবসাইট-এর তথ্যানুসারে, অত্যন্ত গরমে এসি ব্যবহারে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির জ্বালানি-দক্ষতা ২৫ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে, বিশেষ করে ছোট যাত্রায়। বাইরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রোদের তীব্রতায় এই প্রভাব বদলায়। তাদের নির্দেশনায় ছায়ায় গাড়ি রাখা, সানশেড ব্যবহার এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রথমে জমে থাকা গরম বাতাস বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

তবে এসি দেরিতে ঠান্ডা করার পেছনে যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ বা ত্রুটিও থাকতে পারে। সব দায় বাইরের গরমের নয়। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এসি তাপ নিশ্চিহ্ন করে না; ভেতর থেকে বাইরে সরায় এবং যন্ত্র চালানোর শক্তিও তাপ যোগ করে। ইপিএ যানবাহন, এসি ও শিল্পকারখানার বর্জ্যতাপকে নগরের উষ্ণতায় অবদান রাখা উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকার মোট তাপে কোন উৎসের অবদান কত, স্থানীয় গবেষণা ছাড়া তা নির্দিষ্ট করা যাবে না।

এই পরিস্থিতিতে গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও জলাশয়ের গুরুত্ব গভীর। গাছ ছায়া দেয় এবং পাতার প্রস্বেদনের মাধ্যমে শীতলতায় সাহায্য করে। ইপিএর ব্যাখ্যাতেও এই দুই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের জায়গা পাকা করে পাশে কয়েকটি টব বসালে হারানো ছায়া ফিরে আসে না। 

হাতিরঝিলের কথাই ধরা যাক। এর পানির দুর্গন্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলাশয় থাকলেই তার পাশে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয় না। মানুষ যদি পানির ধারে গিয়েও দুর্গন্ধে অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেই উন্মুক্ত পরিসরের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। এতো বিশাল পানির উৎস হাতিরঝিলকে ঘিরে শক্তিশালী পরিকল্পনায় আসা উচিত। পানির মান, গাছের ছায়া, হাঁটার পথ ও বিশ্রামের জায়গা একসঙ্গে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

দুর্গন্ধের উৎস শনাক্ত করে দূষিত প্রবাহ বন্ধ করা এবং প্রয়োজনমতো শোধনের ব্যবস্থা এখানে প্রথম কাজ। শুধু ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করে ফল প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি হাঁটার পথ ও বসার জায়গায় উপযুক্ত ছায়াদানকারী গাছ বাড়ানো দরকার। গাছের অবস্থান এমন হতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল ও মানুষের নিরাপদ যাতায়াত বজায় থাকে। আশপাশের পাড়ায় শীতলতার সুবিধা কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।

একটি হাতিরঝিল অবশ্য পুরো ঢাকার শীতলতার দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের পাড়াতেই ছায়া, মাঠ ও জলাশয়ের সুযোগ থাকা দরকার। জলাশয়ের পরিমাণ বাড়াতে আগে বিদ্যমান পুকুর ও খাল রক্ষা, পুনরুদ্ধারযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন উন্নয়ন এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত। তবে পানি বাড়ালেই রাতের ভ্যাপসা গরম কমবে এমন সরল হিসাব কিন্তু নয়। জলাশয়ের সঙ্গে সবুজ, বায়ুপ্রবাহ, পানির মান ও স্থানীয় আর্দ্রতার প্রভাব মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

রাতের গরমকে শুধু আরামের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, দীর্ঘ সময় দিন ও রাতের উচ্চ তাপমাত্রা শরীরে তাপের চাপ বাড়ায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি করে। নিম্নমানের আবাসন ও শীতল হওয়ার সুযোগের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষভাবে বিপন্ন হন। যে মানুষ সারাদিন বাইরে শ্রম দেন, রাতে গরম ঘরে ফিরেও যদি বিশ্রাম না পান, তার জন্য উত্তাপ দিনের শেষে শেষ হয় না। 

একই শহরে কেউ এসির তাপমাত্রা কমিয়ে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ একটি ফ্যানের নিচে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাত কাটান। তাই শীতলতা জনস্বাস্থ্য ও ন্যায্যতারও প্রশ্ন। সমাধানের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এই মানুষদের অবস্থাই আগে দেখতে হবে।

বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এখানে বাস্তব শিক্ষা নিতে পারি। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার ‘ক্লাইমেট-অ্যাডাপ্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ২০০২ সালের বিধানে নতুন ও সংস্কার করা সমতল ছাদে সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়; ২০১০ সালে তা আরও জোরদার হয়। এর আগে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ সবুজ করার উদ্যোগ উৎসাহিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়নি; সহায়তা ও নকশার নির্দেশনাও ছিল। এটি পুরো সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেক বাড়ির জন্য একই নিয়ম এমনটা কিন্তু নয়। 

ঢাকায় এই ধারণা প্রয়োগ করতে হলে সবুজ ছাদকে ভবনের নকশার অংশ করতে হবে। ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিকল্পিত উদ্ভিদ আচ্ছাদন ছাদের শীতলতায় সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কয়েকটি টব রেখে পুরো ছাদ সবুজ হয়েছে বলা যায় না; জলরোধক স্তর, উপযুক্ত রোপণমাধ্যম ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। 

নির্দিষ্ট শ্রেণির নতুন ভবনে উপযোগী ছাদের অংশে সবুজায়নের শর্ত আনার প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়। পানির ট্যাংক, সৌরবিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও চলাচলের জায়গা হিসাব করে মান নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো ভবনে ভেজা মাটিসহ অতিরিক্ত ওজন বহনের সক্ষমতা প্রকৌশলী দিয়ে পরীক্ষা ছাড়া বাগান চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ঢাকার বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমের উপযোগী উদ্ভিদ, পরিচর্যা এবং পানি জমতে না দেওয়ার ব্যবস্থা একই পরিকল্পনায় থাকতে হবে।

যেসব ভবনে সবুজ ছাদ সম্ভব নয়, সেখানে তাপ-প্রতিফলক প্রলেপ ও তাপ নিরোধক বিকল্প হতে পারে। ইপিএর উল্লেখ করা গবেষণায় এসিবিহীন আবাসিক ভবনে শীতল ছাদ সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ১.২ থেকে ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর ফল পাওয়া গেছে। ঢাকাতেও একই ফল হবে ধরে না নিয়ে স্থানীয় ভবনে পরীক্ষা করতে হবে।

আগামী গরম মৌসুমের আগে নির্বাচিত বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নিম্ন আয়ের আবাসনে এসব ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সম্ভব। কাজের আগে ও পরে ঘরের তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনা করা হোক। কার্যকর উদ্যোগে যাচাইসাপেক্ষ অনুদান বা করের ছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে। নিয়মের সঙ্গে সামর্থ্য তৈরির সহায়তা না থাকলে বাস্তবায়ন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে পাড়াভিত্তিক রাতের তাপ পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারে। ঘনবসতি, বাজার, শ্রমজীবী মানুষের আবাসন এবং তুলনামূলক সবুজ এলাকায় একই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাস মাপতে হবে। শুধু উপগ্রহে দেখা ছাদ বা রাস্তার পৃষ্ঠতাপ নয়, মানুষের বসবাসের উচ্চতায় বাতাস এবং নির্বাচিত ঘরের ভেতরের অবস্থাও জানা দরকার। তথ্য প্রকাশ করে সবচেয়ে বিপন্ন এলাকাকে বরাদ্দে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বৃক্ষরোপণের সাফল্যও চারার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। তিন বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটা ছায়া তৈরি হয়েছে সেই হিসাব চাই। পুরোনো বড় গাছ সংরক্ষণ, শিকড়ের জন্য জায়গা এবং পরিচর্যার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ, বাসস্ট্যান্ড ও হাসপাতালের প্রবেশপথ আগে ছায়া পাক। ছাদের সবুজ দিয়ে মাটির গাছ রক্ষার দায়িত্ব পূরণ হয় না।

নতুন বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় আশপাশের আলো-বাতাসের ওপর প্রভাব গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অনুমোদিত নকশার ফাঁকা জায়গা বাস্তবে অক্ষুণ্ণ আছে কি না, নির্মাণশেষেও যাচাই করতে হবে। পরিবহনেও চাই নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, ছায়াযুক্ত যাত্রীছাউনি এবং নিরাপদ হাঁটার পথ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ইঞ্জিন চালু রাখা কমাতে সুশৃঙ্খল ওঠানামার ব্যবস্থা ও চালকদের ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল দরকার।

সবশেষে প্রয়োজন রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা। তীব্র গরমে নিরাপদ শীতল আশ্রয় কোথায় খোলা থাকবে, পানীয় জল কোথায় মিলবে, বিদ্যুৎ গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কীভাবে চলবে এবং অসহায় প্রবীণদের খোঁজ কে নেবে আগেই ঠিক করতে হবে। বিদ্যমান কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে নিরাপত্তা, কর্মী, বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করেই।

প্রতিটি উদ্যোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সময়সীমা প্রকাশ করা জরুরি। বছর শেষে সাফল্য মাপতে হবে মানুষের পাওয়া সুবিধায় কত ঘরে উত্তাপ কমল, কত পথ ছায়া পেল, কত জলাশয়ের পানি ভালো হলো এবং কতজন বিপন্ন মানুষ সহায়তা পেলেন।

সন্ধ্যা একসময় দিনের ক্লান্তি শেষে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসত। ঢাকার মানুষ সেই সামান্য স্বস্তিটুকু ফিরে পাওয়ার দাবি রাখেন। শহরকে রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু আরও উত্তপ্ত করে তোলার সিদ্ধান্তগুলো থামানো সম্ভব। মাটি, পানি, গাছ ও বাতাসের জন্য জায়গা রেখে উন্নয়ন করাও সম্ভব।

শহর ঘুমাতে চায়, মানুষও ঘুমাতে চায় কিন্তু কংক্রিটে জমে থাকা তাপ জেগে থাকে। ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় তাই রাতেরও একটি জায়গা থাকা দরকার। একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা শুধু দিনের ব্যস্ততা ও উঁচু ভবনে বোঝা যায় না বরং মানুষ রাতে কতটা স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেই উত্তরেও বোঝা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকার রাত কেন এত গরম হচ্ছে?

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সন্ধ্যা মানে দিনের তপ্ত কপালে একটু শীতল বাতাসের স্পর্শ। রোদের বিদায়, পাখির ঘরে ফেরা, ক্লান্ত মানুষের স্বস্তির অপেক্ষা। সারাদিনের উত্তাপ পেছনে ফেলে পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ঢাকায় এখন কোনো কোনো সন্ধ্যায় অন্ধকার নামে, শীতলতা নামে না। সূর্য ডুবে যায়, অথচ গরম থেকে যায় আরও ভ্যাপসা, আরও আবদ্ধ হয়ে।

সম্প্রতি ঢাকায় পরপর কয়েকটি রাতে এই অস্বস্তি গভীরভাবে অনুভব করেছি। পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীর তীব্র গরম আমার অপরিচিত নয়। দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুবাদে সেই রুক্ষ তাপের সঙ্গে পরিচয় আছে। তবু ঢাকার রাতের গরম যেন অন্য রকম। গায়ে ঘাম জমে, শরীর জুড়ায় না। এমনকি এসি চালানোর পরও স্বস্তি পেতে সময় লাগে। মনে হয়, দিনের উত্তাপ রাতের মধ্যেও আমাদের পিছু ছাড়ছে না।

সন্ধ্যার পর যে শহরের ধীরে ধীরে শীতল হওয়ার কথা, সেখানে রাতও কেন এত অস্বস্তিকর? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাপমাত্রার সংখ্যায় নেই। সন্ধ্যায় বেশি গরম অনুভব করা মানেই দুপুরের চেয়ে বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে, তা নয়। তাপমাত্রা কিছুটা নামলেও আর্দ্রতা, বাতাসের স্থবিরতা আর চারপাশের উত্তপ্ত দেয়াল ও রাস্তা থেকে আসা তাপ মিলিয়ে শরীরের অস্বস্তি বাড়তে পারে। কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; তবে তা আমাদের নগরজীবনের একটি জরুরি সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।

দিনের পুরোটা সময় ভবন, ছাদ ও পিচঢালা রাস্তা সূর্যের তাপ গ্রহণ করে। সূর্যাস্তের পর সেই সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রী থেকে ধীরে তাপ বের হওয়ার কারণে সন্ধ্যার পর নগর তাপদ্বীপের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। আশপাশের কম নির্মিত এলাকার তুলনায় শহর উষ্ণ থেকে যাওয়ার এই ঘটনাই ‘নগর তাপদ্বীপ’।

পাশাপাশি উঁচু ভবন ও সরু রাস্তার বিন্যাসও সমস্যাটিকে জটিল করে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) ইপিএর তথ্যানুসারে, এ ধরনের ভবনঘেরা পথ প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহে বাধা দিতে পারে; ঘন নির্মাণের মধ্যে জমে থাকা তাপও সহজে বের হতে পারে না। ফলে রোদ চলে গেলেও দিনের উত্তাপের রেশ থেকে যায়। 

এর সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে গরমের চরিত্র বদলে যায়। শরীর ঠান্ডা হওয়ার জন্য শুধু ঘাম হওয়া যথেষ্ট নয়; সেই ঘাম বাষ্পীভূত হয়ে ত্বক থেকে তাপ সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে প্রক্রিয়াটি ধীর হয়। তখন ঘামলেও স্বস্তি আসে না। সন্ধ্যায় বাতাস কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়তেও পারে। বাতাস চলাচল কম থাকলে ভ্যাপসা অনুভূতি আরও প্রকট হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুসারে, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা একসঙ্গে বিবেচনা করে ‘হিট ইনডেক্স’ নির্ধারণ করা হয়, যা অনুভূত গরমের একটি সূচক। রোদ, বাতাস ও শারীরিক পরিশ্রমের প্রভাব বুঝতে আরও বিষয় বিবেচনা করতে হয়। অর্থাৎ একই তাপমাত্রা দুই জায়গায় মানুষের শরীরে একই অনুভূতি তৈরি করবে, এমন নয়। 

রাজশাহীর গরমের সঙ্গে ঢাকার গরমের পার্থক্য অনুভব করার পেছনেও এই বিষয়গুলো কাজ করতে পারে। রাজশাহীর রাত সব সময় শীতল, এমন দাবি করছি না। তবে শুষ্ক পরিস্থিতিতে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যে স্বস্তি দিতে পারে, আর্দ্র ও বাতাসহীন পরিবেশে তা পাওয়া কঠিন। দুই শহরের যথাযথ তুলনার জন্য একই সময়ের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের তথ্য প্রয়োজন।

সম্প্রতি ওমরাহ পালনের সময় মক্কা-মদিনার প্রচণ্ড গরমের সঙ্গেও ঢাকার গরমের একটি পার্থক্য অনুভব করেছি। সেখানে তীব্র তাপের মধ্যেও গায়ে ঘাম জমে থাকার অনুভূতি ঢাকার মতো ছিল না। এর অর্থ শরীর ঘামছিল না, তা নয়। শুষ্ক বাতাসে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে বলে ত্বকের ভেজাভাব কম টের পাওয়া যায়। ঢাকার আর্দ্র পরিবেশে সেই ঘামই সহজে শুকাতে চায় না।

অবশ্য মক্কা-মদিনার আবহাওয়াও প্রতিদিন এক রকম নয়। শুষ্ক গরমকে নিরাপদ ভাবারও সুযোগ নেই; ঘাম চোখে না পড়লেও শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, গরমের কষ্ট শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় ধরা পড়ে না।

ঘর কিংবা গাড়ির এসির অভিজ্ঞতাতেও তাপ সঞ্চয়ের বিষয়টি বোঝা যায়। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচ দিয়ে আসা সৌরশক্তি আসন, ড্যাশবোর্ড ও ভেতরের অংশ গরম করে। এসি চালানোর পর ঠান্ডা বাতাস এলেও ওই অংশগুলো তাপ ছাড়তে থাকে। ফলে পুরো কেবিন আরামদায়ক হতে সময় লাগে। ঘরের ছাদ, দেয়াল ও আসবাবও দিনের তাপ ধরে রাখতে পারে। এসিকে বাতাস ঠান্ডা করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও সরাতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পরিবেশ সংস্থার পরিচালিত ফুয়েল ইকোনমি ওয়েবসাইট-এর তথ্যানুসারে, অত্যন্ত গরমে এসি ব্যবহারে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির জ্বালানি-দক্ষতা ২৫ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে, বিশেষ করে ছোট যাত্রায়। বাইরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রোদের তীব্রতায় এই প্রভাব বদলায়। তাদের নির্দেশনায় ছায়ায় গাড়ি রাখা, সানশেড ব্যবহার এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রথমে জমে থাকা গরম বাতাস বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

তবে এসি দেরিতে ঠান্ডা করার পেছনে যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ বা ত্রুটিও থাকতে পারে। সব দায় বাইরের গরমের নয়। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এসি তাপ নিশ্চিহ্ন করে না; ভেতর থেকে বাইরে সরায় এবং যন্ত্র চালানোর শক্তিও তাপ যোগ করে। ইপিএ যানবাহন, এসি ও শিল্পকারখানার বর্জ্যতাপকে নগরের উষ্ণতায় অবদান রাখা উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকার মোট তাপে কোন উৎসের অবদান কত, স্থানীয় গবেষণা ছাড়া তা নির্দিষ্ট করা যাবে না।

এই পরিস্থিতিতে গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও জলাশয়ের গুরুত্ব গভীর। গাছ ছায়া দেয় এবং পাতার প্রস্বেদনের মাধ্যমে শীতলতায় সাহায্য করে। ইপিএর ব্যাখ্যাতেও এই দুই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের জায়গা পাকা করে পাশে কয়েকটি টব বসালে হারানো ছায়া ফিরে আসে না। 

হাতিরঝিলের কথাই ধরা যাক। এর পানির দুর্গন্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলাশয় থাকলেই তার পাশে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয় না। মানুষ যদি পানির ধারে গিয়েও দুর্গন্ধে অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেই উন্মুক্ত পরিসরের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। এতো বিশাল পানির উৎস হাতিরঝিলকে ঘিরে শক্তিশালী পরিকল্পনায় আসা উচিত। পানির মান, গাছের ছায়া, হাঁটার পথ ও বিশ্রামের জায়গা একসঙ্গে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

দুর্গন্ধের উৎস শনাক্ত করে দূষিত প্রবাহ বন্ধ করা এবং প্রয়োজনমতো শোধনের ব্যবস্থা এখানে প্রথম কাজ। শুধু ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করে ফল প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি হাঁটার পথ ও বসার জায়গায় উপযুক্ত ছায়াদানকারী গাছ বাড়ানো দরকার। গাছের অবস্থান এমন হতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল ও মানুষের নিরাপদ যাতায়াত বজায় থাকে। আশপাশের পাড়ায় শীতলতার সুবিধা কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।

একটি হাতিরঝিল অবশ্য পুরো ঢাকার শীতলতার দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের পাড়াতেই ছায়া, মাঠ ও জলাশয়ের সুযোগ থাকা দরকার। জলাশয়ের পরিমাণ বাড়াতে আগে বিদ্যমান পুকুর ও খাল রক্ষা, পুনরুদ্ধারযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন উন্নয়ন এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত। তবে পানি বাড়ালেই রাতের ভ্যাপসা গরম কমবে এমন সরল হিসাব কিন্তু নয়। জলাশয়ের সঙ্গে সবুজ, বায়ুপ্রবাহ, পানির মান ও স্থানীয় আর্দ্রতার প্রভাব মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

রাতের গরমকে শুধু আরামের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, দীর্ঘ সময় দিন ও রাতের উচ্চ তাপমাত্রা শরীরে তাপের চাপ বাড়ায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি করে। নিম্নমানের আবাসন ও শীতল হওয়ার সুযোগের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষভাবে বিপন্ন হন। যে মানুষ সারাদিন বাইরে শ্রম দেন, রাতে গরম ঘরে ফিরেও যদি বিশ্রাম না পান, তার জন্য উত্তাপ দিনের শেষে শেষ হয় না। 

একই শহরে কেউ এসির তাপমাত্রা কমিয়ে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ একটি ফ্যানের নিচে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাত কাটান। তাই শীতলতা জনস্বাস্থ্য ও ন্যায্যতারও প্রশ্ন। সমাধানের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এই মানুষদের অবস্থাই আগে দেখতে হবে।

বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এখানে বাস্তব শিক্ষা নিতে পারি। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার ‘ক্লাইমেট-অ্যাডাপ্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ২০০২ সালের বিধানে নতুন ও সংস্কার করা সমতল ছাদে সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়; ২০১০ সালে তা আরও জোরদার হয়। এর আগে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ সবুজ করার উদ্যোগ উৎসাহিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়নি; সহায়তা ও নকশার নির্দেশনাও ছিল। এটি পুরো সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেক বাড়ির জন্য একই নিয়ম এমনটা কিন্তু নয়। 

ঢাকায় এই ধারণা প্রয়োগ করতে হলে সবুজ ছাদকে ভবনের নকশার অংশ করতে হবে। ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিকল্পিত উদ্ভিদ আচ্ছাদন ছাদের শীতলতায় সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কয়েকটি টব রেখে পুরো ছাদ সবুজ হয়েছে বলা যায় না; জলরোধক স্তর, উপযুক্ত রোপণমাধ্যম ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। 

নির্দিষ্ট শ্রেণির নতুন ভবনে উপযোগী ছাদের অংশে সবুজায়নের শর্ত আনার প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়। পানির ট্যাংক, সৌরবিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও চলাচলের জায়গা হিসাব করে মান নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো ভবনে ভেজা মাটিসহ অতিরিক্ত ওজন বহনের সক্ষমতা প্রকৌশলী দিয়ে পরীক্ষা ছাড়া বাগান চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ঢাকার বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমের উপযোগী উদ্ভিদ, পরিচর্যা এবং পানি জমতে না দেওয়ার ব্যবস্থা একই পরিকল্পনায় থাকতে হবে।

যেসব ভবনে সবুজ ছাদ সম্ভব নয়, সেখানে তাপ-প্রতিফলক প্রলেপ ও তাপ নিরোধক বিকল্প হতে পারে। ইপিএর উল্লেখ করা গবেষণায় এসিবিহীন আবাসিক ভবনে শীতল ছাদ সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ১.২ থেকে ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর ফল পাওয়া গেছে। ঢাকাতেও একই ফল হবে ধরে না নিয়ে স্থানীয় ভবনে পরীক্ষা করতে হবে।

আগামী গরম মৌসুমের আগে নির্বাচিত বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নিম্ন আয়ের আবাসনে এসব ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সম্ভব। কাজের আগে ও পরে ঘরের তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনা করা হোক। কার্যকর উদ্যোগে যাচাইসাপেক্ষ অনুদান বা করের ছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে। নিয়মের সঙ্গে সামর্থ্য তৈরির সহায়তা না থাকলে বাস্তবায়ন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে পাড়াভিত্তিক রাতের তাপ পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারে। ঘনবসতি, বাজার, শ্রমজীবী মানুষের আবাসন এবং তুলনামূলক সবুজ এলাকায় একই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাস মাপতে হবে। শুধু উপগ্রহে দেখা ছাদ বা রাস্তার পৃষ্ঠতাপ নয়, মানুষের বসবাসের উচ্চতায় বাতাস এবং নির্বাচিত ঘরের ভেতরের অবস্থাও জানা দরকার। তথ্য প্রকাশ করে সবচেয়ে বিপন্ন এলাকাকে বরাদ্দে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বৃক্ষরোপণের সাফল্যও চারার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। তিন বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটা ছায়া তৈরি হয়েছে সেই হিসাব চাই। পুরোনো বড় গাছ সংরক্ষণ, শিকড়ের জন্য জায়গা এবং পরিচর্যার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ, বাসস্ট্যান্ড ও হাসপাতালের প্রবেশপথ আগে ছায়া পাক। ছাদের সবুজ দিয়ে মাটির গাছ রক্ষার দায়িত্ব পূরণ হয় না।

নতুন বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় আশপাশের আলো-বাতাসের ওপর প্রভাব গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অনুমোদিত নকশার ফাঁকা জায়গা বাস্তবে অক্ষুণ্ণ আছে কি না, নির্মাণশেষেও যাচাই করতে হবে। পরিবহনেও চাই নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, ছায়াযুক্ত যাত্রীছাউনি এবং নিরাপদ হাঁটার পথ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ইঞ্জিন চালু রাখা কমাতে সুশৃঙ্খল ওঠানামার ব্যবস্থা ও চালকদের ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল দরকার।

সবশেষে প্রয়োজন রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা। তীব্র গরমে নিরাপদ শীতল আশ্রয় কোথায় খোলা থাকবে, পানীয় জল কোথায় মিলবে, বিদ্যুৎ গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কীভাবে চলবে এবং অসহায় প্রবীণদের খোঁজ কে নেবে আগেই ঠিক করতে হবে। বিদ্যমান কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে নিরাপত্তা, কর্মী, বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করেই।

প্রতিটি উদ্যোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সময়সীমা প্রকাশ করা জরুরি। বছর শেষে সাফল্য মাপতে হবে মানুষের পাওয়া সুবিধায় কত ঘরে উত্তাপ কমল, কত পথ ছায়া পেল, কত জলাশয়ের পানি ভালো হলো এবং কতজন বিপন্ন মানুষ সহায়তা পেলেন।

সন্ধ্যা একসময় দিনের ক্লান্তি শেষে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসত। ঢাকার মানুষ সেই সামান্য স্বস্তিটুকু ফিরে পাওয়ার দাবি রাখেন। শহরকে রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু আরও উত্তপ্ত করে তোলার সিদ্ধান্তগুলো থামানো সম্ভব। মাটি, পানি, গাছ ও বাতাসের জন্য জায়গা রেখে উন্নয়ন করাও সম্ভব।

শহর ঘুমাতে চায়, মানুষও ঘুমাতে চায় কিন্তু কংক্রিটে জমে থাকা তাপ জেগে থাকে। ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় তাই রাতেরও একটি জায়গা থাকা দরকার। একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা শুধু দিনের ব্যস্ততা ও উঁচু ভবনে বোঝা যায় না বরং মানুষ রাতে কতটা স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেই উত্তরেও বোঝা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত