সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১৫

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পাঁচ.

আনিস আবার বাড়িতে এল মনসুর পাগলার জেল থেকে জামিনে আসার সাতদিনের মাথায়। শুধু যে মনসুর পাগলাকে দেখবে বলে সে বাড়িতে এসেছে, তা নয়; তার বাড়ি আসার পেছনে অন্য একটা কারণও আছে। আজ শুক্রবার। মীরবহরি বাজারে শুক্রবারে সাপ্তাহিক হাট বসে। আজ সে তার জমির বর্গাচাষিদের সঙ্গে থেকে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মিষ্টি আলুর বিক্রি করা দেখবে। হাটে শুধু খুচরাই বিক্রি হয় না, প্রচুর পাইকারিও বিক্রি হয়। অনেক মহাজন ও দালাল এসব সবজি পাইকারি কিনে নৌকায় করে উপজেলার নৌকাঘাটে নিয়ে যায়। সেখানে সারি করে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ট্রাকে করে সেসব শীতের সবজি ঢাকা-কুমিল্লা নিয়ে বড় বড় রেস্তোঁরা, হোটেল ও সেখানকার বড় বড় বাজারগুলোতে পাইকারের কাছে বিক্রি করে। দেখা যায় গ্রামের বাজারে যেসব দামে সবজি কেনা হয়, ঢাকা বা কুমিল্লা গিয়ে সেসবের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়।

ঢাকা-কুমিল্লায় নেওয়ার পর আলু, ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম কত গুণ বাড়ল, সেটা আনিসের মাথাব্যথা নয়। তার মাথাব্যথা হলো, বর্গাচাষিরা তার অনুপস্থিতিতে যে তাকে বেশ ঠকাচ্ছে। ক্ষেতে মাপলে ভাগে কম দিচ্ছে। বাজারে নিলে যে টাকায় বিক্রি হয়, এর চার ভাগের একভাগ টাকাও দিচ্ছে না। সে আর যাই হোক, তাকে কেউ ঠকাবে সেটা সে পছন্দ করে না। কয়েক দিন আগে সে বাড়িতে এসে রমজান আলী নামে এক বর্গাচাষিকে হাতেনাতে ধরেছে। অবশ্য এই ধরার পেছনে বশিরের হাত ছিল বেশি।

আনিস আজ ঢাকা থেকে অত সকালে রওনা না হলেও সকালের নাস্তা সেরে সাড়ে আটটার দিকেই রওনা হয়েছিল। গতরাতে পত্রিকায় তার বেশ চাপ ছিল। সাহিত্যের পাতাটা শুক্রবারে বের হয়। আগের দিন রাতে শেষমুহূর্তের পাঠানো লেখাগুলোর প্রুফ দেখা, পাতার গেটআপ-মেকআপ ঠিক করা, চিত্রশিল্পীর সঙ্গে ইলাস্ট্রেশন নিয়ে বসা, তারপর প্রেসে দিয়ে বের হতে হতে রাত বারোটা-একটা বেজে যায়। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুটো। তাই শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে তার দেরি হয়। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তার দশটা-এগারোটা বেজে যায়।

আজ অবশ্য আনিস এত দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেনি। সে আটটার আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। ঠিক সাড়ে আটটার সময় ঢাকা ছেড়ে রওনা হলেও রাস্তায় যানজটের কারণে আঁধারিয়ায় আসতে আসতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। এমনিতে তার ঢাকা থেকে আসতে দেড় ঘণ্টা, বড়জোর দুই ঘণ্টা সময় লাগে। আজ তিনঘণ্টা লেগে গেল।

আনিস বাড়িতে ঢুকেই বশিরকে ডেকে নেয়। মনসুর পাগলাকে ডেকে আনার জন্য পাঠায়। সে এখন তাদের দিঘল বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারে বসে সে বুইদ্দার বিলে রোদের ওঠানামা দেখছে। শীতের রোদ, এই উঠে তো পরক্ষণই আবার মেঘের ছায়ায় পুরো বিলটা ঢেকে যায়। রোদের এই ওঠানামা নিয়ে সে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছে। শীতের কবিতা। তখন সে অনুতপুর ও তাদের আঁধারিয়া গ্রামে থাকত। শীত ও রোদের ওঠানামা সে খুব উপভোগ করত। শহরে গিয়ে এটা আর হয়ে উঠছে না। ওখানে তার সময়টাইবা কোথায়? শহরে শীত আসে। সে সেই শীতে মোটা জ্যাকেট পরে ঘুরে। ব্যস শীত বলতে এটুকুও। তবে সে চিলেকোঠায় থাকে বলে বিশাল একটা ছাদ পেয়েছে। বর্ষায় বর্ষণে মাঝেমধ্যে সে ভিজে। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে তার মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতির জন্ম নেয়।

এখন শীতের ওঠানামা দেখতে দেখতে আনিসের মধ্যে সত্যি আবার সেই কবিতা লেখার ভাবটা চলে এসেছে। সে বরাবরই তার ব্যাগে একটা কবিতা লেখার খাতা রাখে। হঠাৎ করে পুরো কবিতাটি না হোক, কবিতার কোনো পঙ্ক্তি মনে এলে সে খাতায় টুকে রাখে। পরে কবিতাটির পুরো রূপ দেয়। আজকাল সে আরেকটা কাজ করে। মোবাইলে টুকটুক করে কবিতা লেখে। এছাড়া তার আর উপায় কী, আগের মতো সে অঢেল সময় পায় না। ঢাকার জীবন যে বড্ড ব্যস্ত জীবন। মাঝেমধ্যে সে হাঁপিয়ে ওঠে। পত্রিকার চাকরিটা ছেড়ে দিবে বলে ভাবে। তবে ঢাকা গিয়ে সে একটা ব্যাপার দেখেছে, কোনো কিছু ছেড়ে দিতে চাইলেও ছাড়া যায় না। ঢাকা শহরটায় ব্যক্তির চেয়ে ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় বেশি। তার অবশ্য তেমন ক্ষমতা নেই। কিন্তু সে একটা পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর সহকারী। এতেই অনেক বড় বড় কবি-সাহিত্যিক তাকে তোয়াজ করে। অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিক একটা লেখা পাঠিয়ে তার দিকে উন্মুখ তাকিয়ে থাকে ও তাকে সমীহ করে। এদিকে নিজের পরিচিতিও বেশ বাড়ছে। লেখালেখিতে পরিচিতি একটা বড় ব্যাপার। পরিচিতির অভাবে অনেক কবি-সাহিত্যিকের প্রতিভা নিষ্প্রভ হয়ে হারিয়ে যায়।

বুইদ্দার বিলে রোদের ওঠানামা দেখতে দেখতে আনিস কবিতা লিখবে বলে ভেবেছিল, সেটা আর হয়ে উঠল না। কবিতার খাতাটা হাতে নেওয়ার পর ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসতে চাইল। তার মধ্যে বেশ ক্লান্তি। সে চেয়ারের একপাশে ঘাড়টা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল।

আনিসের ঘুম ভাঙল মনসুর পাগলার ডাকে। ঘুম নাকি তন্দ্রায় ছিল, সে ঠিক বুঝতে পারল না। হয়তো একটা স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল। এরই মধ্যে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল বলে প্রথমে সে বিরক্ত হয়ে মনসুর পাগলার দিকে তাকালেও পরক্ষণ হেসে বলল, ‘তুই এসেছিস, ভালো হয়েছে। আমি তোর অপেক্ষায় ছিলাম।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি বশিরের কাছে শুইনা কোনোমতে কাপড় পইরা দৌড়াইয়া আইছি।’

‘বশির কোথায়?’

‘হেয় মনে হয় ক্ষেতে গেছে।’

আনিস বলল, ‘অ।’ বলেই সে মনসুর পাগলার দিকে ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, কী ব্যাপার? প্যান্ট-শার্ট পরে তো পুরা সাহেব হয়ে গেছিস!’

মনসুর পাগলা একটু লজ্জা পেল। শব্দ করে হাসল— হে হে, হে হে। বলল, ‘উকিল সাবের কাছ থাইকা টাকা লইয়া কুমিল্লার শাসনগাছার ফুটপাত থাইকা কিনছি।’

‘যেখান থেকেই কিনিস, তোকে বেশ মানাইছে।’

‘হাছা কইছ?’

‘মিছা কথা বলব কেন?

‘হেইডাও কথা।’ু বলেই মনসুর পাগলা আবার হাসল। এবার অবশ্য শব্দ করে হাসল না। কী ভেবে বারান্দার পুব ঘেঁষে রাখা মোটর সাইকেলটার দিকে তাকাল। একটু উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই হোন্ডাটা কার, তোমার?’

আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, আমার।’

‘তুমি কবে কিনছ?

‘এক বছরের ওপরে হলো।’

‘কও কী! কও কী! আমার কী যে ভালা লাগতাছে। আইজকা তোমার এই হোন্ডায় আমি চড়মু।’

‘আচ্ছা, চড়িস। আমি তো একটু পরেই মীরবহরি হাটে যাব। তোকে আমার সাথে নিয়ে যাব বলেই তো ডেকেছি।’

মনসুর পাগলা উচ্ছ্বাসের গলায় বলল, ‘হ হ, আমারে ডাকছ, ভালা করছ। তুমি না ডাকলেও আমি আইতাম। তোমারে দেখনের লাইগা মন চাইতেছিল।

আনিস হাসল। বলল, আমি জানি। এখন তুই একটু সুস্থির হয়ে বস। তোর জেলখানার গল্প শুনি।

মনসুর পাগলা পাশের একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী গল্প শুনবা?’

আনিস বলল, ‘ওই তো, তোর জেলের গল্প। কেমন ছিলি ওখানে?’

‘ভালা না।’

‘ভালো না। কেন?’

‘জেলখানা ভালা জায়গা না। একটা জিনিস ভালা ছিল। হাজতে পুলিশ যেমুন মারত, জেলখানায় কেউ মারত না।’

‘খাবারদাবার ঠিক মতো দিতো তো?’

‘অইডাও দিত না। তয় এক্কেবারে উপাস রাখত না। ঘুমানের সমুস্যা হইত। বড় কথা কী, মা’র কথা খালি মনে পড়ত। মা’রে খুব জ্বালাইছি তো। ভালা পাই নাই।

‘তাহলে তো ভালোই। এখন থেকে তোর মা’র সাথে ভালো ব্যবহার করবি। তোর মা’র বয়স হয়েছে।

‘হ হ, ঠিক কইছ। অখন থাইকা তাই করমু। তয় তোমার কথাও খুব মনে পড়ত।’

‘আমার কী কথা?’

‘অই যে, তুমি আমারে দেখবার যাইতা না, হেইডা।’

‘আমি গেলাম না, একবার?’

‘অইডা তো হেই কবে!’

‘পাগলা, আমি ঢাকা চলে গেছি না, কীভাবে যাব? কিন্তু তোর খবরাখবর সবসময় নিয়েছি। তোর উকিল এডভোকেট আতিকুল হকের সাথে সবসময় কথা হতো।’

‘আমি জানি। হেয় কইছে। কিন্তুক আমি তোমার লাইগা অপেক্ষায় থাকতাম।’

‘আমি জানি। আমারও যেতে ইচ্ছে করত। তবে...!’

মনসুর পাগলা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তবে কিতা?

আনিস কী ভেবে একমুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘না, কিছু না। পাগলা, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা। জিগাও?’

‘তোর কি আমার ওপর কোনো কারণে রাগ আছে?’

‘এইডা আবার কী কথা? তুমি কোন রাগের কথা জিগাইতাছ?’

‘অনেক ধরনের রাগই তো তোর থাকতে পারে।’

মনসুর পাগলা মাথা নাড়ল। দৃষ্টির ওঠানামা করল একবার। একবারের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর একটু জোর গলায় বলল, ‘আনিস, তোমার লগে আমি রাগ করমু ক্যান? আমার জীবনে তো আপন কইরা কেউ লয় নাই। মা’র লগে মিল হয় নাই কোনো কালেই। তুমি আপন কইরা লইছিলা। তুমি আছ বইলা সারাজীবন গেরামে ঠাট দেখাইয়া চলছি। আমি জেলে গেলাম। তুমি আমার লাইগা উকিল ধরছ। বুইদ্দার বিলে আমার কি জমিজমা কম আছে? কিন্তুক তুমি নিজ থাইকা উকিলের ট্যাকা দিয়া আমারে জেল থাইকা ছাড়াইয়া আনছ। আমারে অখনও একটা ট্যাকার লাইগা জিগাও নাই।’

মনসুর পাগলার কথা শুনে আনিসের মনটা ভারি হয়ে গেল। গত আড়াই বছর ধরেই তার ভেতর প্রতিনিয়ত একটা অপরাধবোধ এসে জড়ো হচ্ছে। বারবার তার মনে হচ্ছে, সে সত্যি মনসুর পাগলার সঙ্গে অন্যায় করেছে। বড় বেশি অন্যায়। কী একটা অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সেতারা বেগম তো মনসুর পাগলার বউ ছিল। এই মনসুর পাগলা তাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।

কিন্তু আনিস এটাও ভাবল, মানব চরিত্র যে বড় কঠিন। সম্পর্ক ও ভালোবাসার চরিত্র আরও কঠিন। সেই কঠিনকে নিয়ে ভাবতে গেলেই তার মধ্যে একটা প্রশ্ন এসে বাসা বাঁধে, সে কি সত্যি কোনো অন্যায় করেছে? শরীরের টান নিয়ে তার নিজের কোনো জিজ্ঞাসা নেই। কিন্তু মনে টান, ভালোবাসা? সে নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিল। ভাবল, মানুষ ভালোবাসার ব্যাপারে বড্ড বেশি স্বার্থপর।

আনিস নিজের পক্ষে যুক্তি খাটালেও তার মধ্যে দ্বিধা বেশ কাজ করছে। সে ভাবল, মনসুর পাগলার কি সেতারা বেগমের প্রতি কোনো টান ছিল? আর যদি টান থাকত তাহলে সে এভাবে বউ ফেলে মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত কেন? এতটা উদাসীনতা নিয়ে তো কোনো সম্পর্ক টিকে না। সেতারা বেগম তো একজন মানুষ। তার কামনা আছে, বাসনা আছে, চাহিদা আছে। তাকে অনির্ধারিত আহ্বান ডেকেছে। প্রথমে শরীরের টান, পরে নিজের অজান্তেই মনের টান গড়ে ওঠে। অবশ্য সে মনের টান বোধ করে সেতারা বেগমের মৃত্যুর পর।

আনিস আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। মনসুর পাগলাও কেমন চুপ হয়ে গেল। দু’জনের দৃষ্টি দূরে, বুইদ্দার বিলের দিকে। ঠিক তখনই ওরা দেখল বশির বুইদ্দার বিল থেকে তাদের দিকে আসছে।

বশির খানিকটা দূর থেকেই আনিসকে বলল, ‘ভাইজান, উত্তর পাড়ার রমজান আলী, পশ্চিম পাড়ার কুদরত মিয়া মীরবহরি হাটের দিকে যাইতাছে।’

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘বলিস কী, কখন?’

বশির বলল, ‘অই তো, এক্ষণই দেইখা আইলাম। বান্ধাকপি আর ফুলকপি কাইট্টা একেকটা টুকরিতে ঢুকাইছে। অনেকগুলা টুকরি। আমি তাদের জিগাইছি। হেরা আমারে পাত্তা দেয় নাই।

‘তোকে পাত্তা দেয়নি, এত বড় সাহস?

‘হেইডাই তো, ভাইজান। অখন আমার কথা হইল, হেরা যদি পাইকার আর মহাজনের লগে আগেবাগে গিয়া বাও কইরা ফেলে?’

‘কী করবে?’

বশির বলল, বাও। বাও বোঝেন নাই? অই যে, আগেবাগে গিয়া দামটাম ঠিক কইরা ফেলব। ভাইজান, আপনের তাড়াতাড়ি হাটে যাওন লাগব।

আনিস বলল, ‘আচ্ছা, আমি এখনই মীরবহরি হাটে যাচ্ছি। তুই কি এখন আমার সাথে যাবি?’

বশির বলল, ‘আপনে যান, আমি আইতাছি। ক্ষেতে একটু কাম আছে। অইডা শেষ কইরাই হাটে আইতাছি।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি তোমার লগে হাটে যাইমু।’

আনিস বলল, ‘তুই তো যাবি। তোকে না নিয়ে যাব নাকি?’

মনসুর পাগলা বলল, ‘হ হ, চলো।’ বলেই আনিস যাওয়ার আগে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে মোটর সাইকেলটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

আনিস হাসতে গিয়ে হাসল না। তার এখন তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি মীরবহরি হাটে যেতে হবে। তাই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে শরীরের আড়মোড়া না ভেঙেই হাঁটা দিল। মোটর সাইকেলের কাছে গিয়ে মনসুর পাগলাকে বলল, ‘পাগলা, ধাক্কা দেয়। ঠেলে খালটা পার করি।’

মনসুর পাগলা বলল, হ, হ, আমি পিছন থাইকা ঠেলতাছি। তুমি হ্যান্ডেল ধরো।’

আনিস বলল, ‘ঠিক আছে।’

ওরা অনায়েসেই খালের ভেতরের শুকনো এবড়োথেবড়ো খাদ পেরিয়ে মোটর সাইকেলটা ঠেলে বুইদ্দার বিলে উঠল।

আনিস সিটে বসে মোটর সাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে বলল, ‘পাগলা, তুই বসে আমাকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরিস।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আইচ্ছা, আমি তাই করমু।

আনিস তার মোটর সাইকেলটা ক্ষেতের আইল ধরে একটু ধীরেই চালাচ্ছে। সে মনসুর পাগলাকে নিয়ে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। তাকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরতে বলা হলেও সে এখন শক্ত করে ধরে রাখা থাক দূরের কথা বারবার তাকে ছেড়ে দিয়ে দু’হাত হাওয়ায় ভাসিয়ে বাতাসের ঢেঊ খেলছে। সে এমন ভাব করছে যেন সে মোটর সাইকেলে চড়ছে না, পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আকাশে উড়ছে।

আনিস হাল্কা ধমকের গলায় বলল, ‘পাগলা, কী করছিস, পড়ে যাবি তো?’

মনসুর পাগলা কলকল করে হেসে বলল, ‘না না, কী কও, আমি পড়মু না।’

‘পড়লে কিন্তু তোর খবর আছে। হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে যেতে হবে।’

‘হেইডা আমি জানি। তুমি আছ না?

‘আমি থাকলে কী হবে?’

‘আমি পইড়া যাওয়ার আগেই তোমারে ধইরা ফেলমু।

আনিস হাসল। মুখে কিছু বলল না। সে ভালো করেই জানে, আঁধারিয়া গ্রামে মনসুর পাগলার সবচেয়ে বেশি ভরসার মানুষ সে নিজে। সেই ছোটবেলা থেকেই সে তার মধ্যে সেটা দেখে আসছে। কিন্তু সে কি মনসুর পাগলার ভরসার বিপরীতে বিশ্বাসটা ধরে রাখতে পেরেছে? সেতারা বেগমের নামটা তার মধ্যে যে কালকূট হয়ে ধরা দেয়। ধীমান কালকূট।

আনিস মোটর সাইকেলটা নিয়ে নতুন রাস্তায় উঠে এল। নতুন রাস্তায় উঠলেই খানিকটা দূরের মীরবহরি বাজারটা দেখা যায়। রাস্তার মাটি এখনও সমান হয়নি। তারপরও সে মোটর সাইকেলটা একটু জোরে টান দিল।

মনসুর পাগলা বলল, ‘আনিস, আমার কী যে ভালা লাগতাছে!’— বলেই সে হাত দুটো আবার হাওয়ায় ভাসিয়ে ঢেউ তুলে কলকল শব্দে হাসতে শুরু করল। বড্ড প্রাণখোলা হাসি। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পাঁচ.

আনিস আবার বাড়িতে এল মনসুর পাগলার জেল থেকে জামিনে আসার সাতদিনের মাথায়। শুধু যে মনসুর পাগলাকে দেখবে বলে সে বাড়িতে এসেছে, তা নয়; তার বাড়ি আসার পেছনে অন্য একটা কারণও আছে। আজ শুক্রবার। মীরবহরি বাজারে শুক্রবারে সাপ্তাহিক হাট বসে। আজ সে তার জমির বর্গাচাষিদের সঙ্গে থেকে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মিষ্টি আলুর বিক্রি করা দেখবে। হাটে শুধু খুচরাই বিক্রি হয় না, প্রচুর পাইকারিও বিক্রি হয়। অনেক মহাজন ও দালাল এসব সবজি পাইকারি কিনে নৌকায় করে উপজেলার নৌকাঘাটে নিয়ে যায়। সেখানে সারি করে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ট্রাকে করে সেসব শীতের সবজি ঢাকা-কুমিল্লা নিয়ে বড় বড় রেস্তোঁরা, হোটেল ও সেখানকার বড় বড় বাজারগুলোতে পাইকারের কাছে বিক্রি করে। দেখা যায় গ্রামের বাজারে যেসব দামে সবজি কেনা হয়, ঢাকা বা কুমিল্লা গিয়ে সেসবের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়।

ঢাকা-কুমিল্লায় নেওয়ার পর আলু, ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম কত গুণ বাড়ল, সেটা আনিসের মাথাব্যথা নয়। তার মাথাব্যথা হলো, বর্গাচাষিরা তার অনুপস্থিতিতে যে তাকে বেশ ঠকাচ্ছে। ক্ষেতে মাপলে ভাগে কম দিচ্ছে। বাজারে নিলে যে টাকায় বিক্রি হয়, এর চার ভাগের একভাগ টাকাও দিচ্ছে না। সে আর যাই হোক, তাকে কেউ ঠকাবে সেটা সে পছন্দ করে না। কয়েক দিন আগে সে বাড়িতে এসে রমজান আলী নামে এক বর্গাচাষিকে হাতেনাতে ধরেছে। অবশ্য এই ধরার পেছনে বশিরের হাত ছিল বেশি।

আনিস আজ ঢাকা থেকে অত সকালে রওনা না হলেও সকালের নাস্তা সেরে সাড়ে আটটার দিকেই রওনা হয়েছিল। গতরাতে পত্রিকায় তার বেশ চাপ ছিল। সাহিত্যের পাতাটা শুক্রবারে বের হয়। আগের দিন রাতে শেষমুহূর্তের পাঠানো লেখাগুলোর প্রুফ দেখা, পাতার গেটআপ-মেকআপ ঠিক করা, চিত্রশিল্পীর সঙ্গে ইলাস্ট্রেশন নিয়ে বসা, তারপর প্রেসে দিয়ে বের হতে হতে রাত বারোটা-একটা বেজে যায়। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুটো। তাই শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে তার দেরি হয়। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তার দশটা-এগারোটা বেজে যায়।

আজ অবশ্য আনিস এত দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেনি। সে আটটার আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। ঠিক সাড়ে আটটার সময় ঢাকা ছেড়ে রওনা হলেও রাস্তায় যানজটের কারণে আঁধারিয়ায় আসতে আসতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। এমনিতে তার ঢাকা থেকে আসতে দেড় ঘণ্টা, বড়জোর দুই ঘণ্টা সময় লাগে। আজ তিনঘণ্টা লেগে গেল।

আনিস বাড়িতে ঢুকেই বশিরকে ডেকে নেয়। মনসুর পাগলাকে ডেকে আনার জন্য পাঠায়। সে এখন তাদের দিঘল বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারে বসে সে বুইদ্দার বিলে রোদের ওঠানামা দেখছে। শীতের রোদ, এই উঠে তো পরক্ষণই আবার মেঘের ছায়ায় পুরো বিলটা ঢেকে যায়। রোদের এই ওঠানামা নিয়ে সে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছে। শীতের কবিতা। তখন সে অনুতপুর ও তাদের আঁধারিয়া গ্রামে থাকত। শীত ও রোদের ওঠানামা সে খুব উপভোগ করত। শহরে গিয়ে এটা আর হয়ে উঠছে না। ওখানে তার সময়টাইবা কোথায়? শহরে শীত আসে। সে সেই শীতে মোটা জ্যাকেট পরে ঘুরে। ব্যস শীত বলতে এটুকুও। তবে সে চিলেকোঠায় থাকে বলে বিশাল একটা ছাদ পেয়েছে। বর্ষায় বর্ষণে মাঝেমধ্যে সে ভিজে। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে তার মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতির জন্ম নেয়।

এখন শীতের ওঠানামা দেখতে দেখতে আনিসের মধ্যে সত্যি আবার সেই কবিতা লেখার ভাবটা চলে এসেছে। সে বরাবরই তার ব্যাগে একটা কবিতা লেখার খাতা রাখে। হঠাৎ করে পুরো কবিতাটি না হোক, কবিতার কোনো পঙ্ক্তি মনে এলে সে খাতায় টুকে রাখে। পরে কবিতাটির পুরো রূপ দেয়। আজকাল সে আরেকটা কাজ করে। মোবাইলে টুকটুক করে কবিতা লেখে। এছাড়া তার আর উপায় কী, আগের মতো সে অঢেল সময় পায় না। ঢাকার জীবন যে বড্ড ব্যস্ত জীবন। মাঝেমধ্যে সে হাঁপিয়ে ওঠে। পত্রিকার চাকরিটা ছেড়ে দিবে বলে ভাবে। তবে ঢাকা গিয়ে সে একটা ব্যাপার দেখেছে, কোনো কিছু ছেড়ে দিতে চাইলেও ছাড়া যায় না। ঢাকা শহরটায় ব্যক্তির চেয়ে ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় বেশি। তার অবশ্য তেমন ক্ষমতা নেই। কিন্তু সে একটা পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর সহকারী। এতেই অনেক বড় বড় কবি-সাহিত্যিক তাকে তোয়াজ করে। অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিক একটা লেখা পাঠিয়ে তার দিকে উন্মুখ তাকিয়ে থাকে ও তাকে সমীহ করে। এদিকে নিজের পরিচিতিও বেশ বাড়ছে। লেখালেখিতে পরিচিতি একটা বড় ব্যাপার। পরিচিতির অভাবে অনেক কবি-সাহিত্যিকের প্রতিভা নিষ্প্রভ হয়ে হারিয়ে যায়।

বুইদ্দার বিলে রোদের ওঠানামা দেখতে দেখতে আনিস কবিতা লিখবে বলে ভেবেছিল, সেটা আর হয়ে উঠল না। কবিতার খাতাটা হাতে নেওয়ার পর ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসতে চাইল। তার মধ্যে বেশ ক্লান্তি। সে চেয়ারের একপাশে ঘাড়টা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল।

আনিসের ঘুম ভাঙল মনসুর পাগলার ডাকে। ঘুম নাকি তন্দ্রায় ছিল, সে ঠিক বুঝতে পারল না। হয়তো একটা স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল। এরই মধ্যে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল বলে প্রথমে সে বিরক্ত হয়ে মনসুর পাগলার দিকে তাকালেও পরক্ষণ হেসে বলল, ‘তুই এসেছিস, ভালো হয়েছে। আমি তোর অপেক্ষায় ছিলাম।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি বশিরের কাছে শুইনা কোনোমতে কাপড় পইরা দৌড়াইয়া আইছি।’

‘বশির কোথায়?’

‘হেয় মনে হয় ক্ষেতে গেছে।’

আনিস বলল, ‘অ।’ বলেই সে মনসুর পাগলার দিকে ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা, কী ব্যাপার? প্যান্ট-শার্ট পরে তো পুরা সাহেব হয়ে গেছিস!’

মনসুর পাগলা একটু লজ্জা পেল। শব্দ করে হাসল— হে হে, হে হে। বলল, ‘উকিল সাবের কাছ থাইকা টাকা লইয়া কুমিল্লার শাসনগাছার ফুটপাত থাইকা কিনছি।’

‘যেখান থেকেই কিনিস, তোকে বেশ মানাইছে।’

‘হাছা কইছ?’

‘মিছা কথা বলব কেন?

‘হেইডাও কথা।’ু বলেই মনসুর পাগলা আবার হাসল। এবার অবশ্য শব্দ করে হাসল না। কী ভেবে বারান্দার পুব ঘেঁষে রাখা মোটর সাইকেলটার দিকে তাকাল। একটু উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই হোন্ডাটা কার, তোমার?’

আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, আমার।’

‘তুমি কবে কিনছ?

‘এক বছরের ওপরে হলো।’

‘কও কী! কও কী! আমার কী যে ভালা লাগতাছে। আইজকা তোমার এই হোন্ডায় আমি চড়মু।’

‘আচ্ছা, চড়িস। আমি তো একটু পরেই মীরবহরি হাটে যাব। তোকে আমার সাথে নিয়ে যাব বলেই তো ডেকেছি।’

মনসুর পাগলা উচ্ছ্বাসের গলায় বলল, ‘হ হ, আমারে ডাকছ, ভালা করছ। তুমি না ডাকলেও আমি আইতাম। তোমারে দেখনের লাইগা মন চাইতেছিল।

আনিস হাসল। বলল, আমি জানি। এখন তুই একটু সুস্থির হয়ে বস। তোর জেলখানার গল্প শুনি।

মনসুর পাগলা পাশের একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী গল্প শুনবা?’

আনিস বলল, ‘ওই তো, তোর জেলের গল্প। কেমন ছিলি ওখানে?’

‘ভালা না।’

‘ভালো না। কেন?’

‘জেলখানা ভালা জায়গা না। একটা জিনিস ভালা ছিল। হাজতে পুলিশ যেমুন মারত, জেলখানায় কেউ মারত না।’

‘খাবারদাবার ঠিক মতো দিতো তো?’

‘অইডাও দিত না। তয় এক্কেবারে উপাস রাখত না। ঘুমানের সমুস্যা হইত। বড় কথা কী, মা’র কথা খালি মনে পড়ত। মা’রে খুব জ্বালাইছি তো। ভালা পাই নাই।

‘তাহলে তো ভালোই। এখন থেকে তোর মা’র সাথে ভালো ব্যবহার করবি। তোর মা’র বয়স হয়েছে।

‘হ হ, ঠিক কইছ। অখন থাইকা তাই করমু। তয় তোমার কথাও খুব মনে পড়ত।’

‘আমার কী কথা?’

‘অই যে, তুমি আমারে দেখবার যাইতা না, হেইডা।’

‘আমি গেলাম না, একবার?’

‘অইডা তো হেই কবে!’

‘পাগলা, আমি ঢাকা চলে গেছি না, কীভাবে যাব? কিন্তু তোর খবরাখবর সবসময় নিয়েছি। তোর উকিল এডভোকেট আতিকুল হকের সাথে সবসময় কথা হতো।’

‘আমি জানি। হেয় কইছে। কিন্তুক আমি তোমার লাইগা অপেক্ষায় থাকতাম।’

‘আমি জানি। আমারও যেতে ইচ্ছে করত। তবে...!’

মনসুর পাগলা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তবে কিতা?

আনিস কী ভেবে একমুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘না, কিছু না। পাগলা, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।’

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা। জিগাও?’

‘তোর কি আমার ওপর কোনো কারণে রাগ আছে?’

‘এইডা আবার কী কথা? তুমি কোন রাগের কথা জিগাইতাছ?’

‘অনেক ধরনের রাগই তো তোর থাকতে পারে।’

মনসুর পাগলা মাথা নাড়ল। দৃষ্টির ওঠানামা করল একবার। একবারের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর একটু জোর গলায় বলল, ‘আনিস, তোমার লগে আমি রাগ করমু ক্যান? আমার জীবনে তো আপন কইরা কেউ লয় নাই। মা’র লগে মিল হয় নাই কোনো কালেই। তুমি আপন কইরা লইছিলা। তুমি আছ বইলা সারাজীবন গেরামে ঠাট দেখাইয়া চলছি। আমি জেলে গেলাম। তুমি আমার লাইগা উকিল ধরছ। বুইদ্দার বিলে আমার কি জমিজমা কম আছে? কিন্তুক তুমি নিজ থাইকা উকিলের ট্যাকা দিয়া আমারে জেল থাইকা ছাড়াইয়া আনছ। আমারে অখনও একটা ট্যাকার লাইগা জিগাও নাই।’

মনসুর পাগলার কথা শুনে আনিসের মনটা ভারি হয়ে গেল। গত আড়াই বছর ধরেই তার ভেতর প্রতিনিয়ত একটা অপরাধবোধ এসে জড়ো হচ্ছে। বারবার তার মনে হচ্ছে, সে সত্যি মনসুর পাগলার সঙ্গে অন্যায় করেছে। বড় বেশি অন্যায়। কী একটা অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সেতারা বেগম তো মনসুর পাগলার বউ ছিল। এই মনসুর পাগলা তাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।

কিন্তু আনিস এটাও ভাবল, মানব চরিত্র যে বড় কঠিন। সম্পর্ক ও ভালোবাসার চরিত্র আরও কঠিন। সেই কঠিনকে নিয়ে ভাবতে গেলেই তার মধ্যে একটা প্রশ্ন এসে বাসা বাঁধে, সে কি সত্যি কোনো অন্যায় করেছে? শরীরের টান নিয়ে তার নিজের কোনো জিজ্ঞাসা নেই। কিন্তু মনে টান, ভালোবাসা? সে নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিল। ভাবল, মানুষ ভালোবাসার ব্যাপারে বড্ড বেশি স্বার্থপর।

আনিস নিজের পক্ষে যুক্তি খাটালেও তার মধ্যে দ্বিধা বেশ কাজ করছে। সে ভাবল, মনসুর পাগলার কি সেতারা বেগমের প্রতি কোনো টান ছিল? আর যদি টান থাকত তাহলে সে এভাবে বউ ফেলে মস্তানের দরগায় গিয়ে পড়ে থাকত কেন? এতটা উদাসীনতা নিয়ে তো কোনো সম্পর্ক টিকে না। সেতারা বেগম তো একজন মানুষ। তার কামনা আছে, বাসনা আছে, চাহিদা আছে। তাকে অনির্ধারিত আহ্বান ডেকেছে। প্রথমে শরীরের টান, পরে নিজের অজান্তেই মনের টান গড়ে ওঠে। অবশ্য সে মনের টান বোধ করে সেতারা বেগমের মৃত্যুর পর।

আনিস আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। মনসুর পাগলাও কেমন চুপ হয়ে গেল। দু’জনের দৃষ্টি দূরে, বুইদ্দার বিলের দিকে। ঠিক তখনই ওরা দেখল বশির বুইদ্দার বিল থেকে তাদের দিকে আসছে।

বশির খানিকটা দূর থেকেই আনিসকে বলল, ‘ভাইজান, উত্তর পাড়ার রমজান আলী, পশ্চিম পাড়ার কুদরত মিয়া মীরবহরি হাটের দিকে যাইতাছে।’

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘বলিস কী, কখন?’

বশির বলল, ‘অই তো, এক্ষণই দেইখা আইলাম। বান্ধাকপি আর ফুলকপি কাইট্টা একেকটা টুকরিতে ঢুকাইছে। অনেকগুলা টুকরি। আমি তাদের জিগাইছি। হেরা আমারে পাত্তা দেয় নাই।

‘তোকে পাত্তা দেয়নি, এত বড় সাহস?

‘হেইডাই তো, ভাইজান। অখন আমার কথা হইল, হেরা যদি পাইকার আর মহাজনের লগে আগেবাগে গিয়া বাও কইরা ফেলে?’

‘কী করবে?’

বশির বলল, বাও। বাও বোঝেন নাই? অই যে, আগেবাগে গিয়া দামটাম ঠিক কইরা ফেলব। ভাইজান, আপনের তাড়াতাড়ি হাটে যাওন লাগব।

আনিস বলল, ‘আচ্ছা, আমি এখনই মীরবহরি হাটে যাচ্ছি। তুই কি এখন আমার সাথে যাবি?’

বশির বলল, ‘আপনে যান, আমি আইতাছি। ক্ষেতে একটু কাম আছে। অইডা শেষ কইরাই হাটে আইতাছি।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি তোমার লগে হাটে যাইমু।’

আনিস বলল, ‘তুই তো যাবি। তোকে না নিয়ে যাব নাকি?’

মনসুর পাগলা বলল, ‘হ হ, চলো।’ বলেই আনিস যাওয়ার আগে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে মোটর সাইকেলটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

আনিস হাসতে গিয়ে হাসল না। তার এখন তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি মীরবহরি হাটে যেতে হবে। তাই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে শরীরের আড়মোড়া না ভেঙেই হাঁটা দিল। মোটর সাইকেলের কাছে গিয়ে মনসুর পাগলাকে বলল, ‘পাগলা, ধাক্কা দেয়। ঠেলে খালটা পার করি।’

মনসুর পাগলা বলল, হ, হ, আমি পিছন থাইকা ঠেলতাছি। তুমি হ্যান্ডেল ধরো।’

আনিস বলল, ‘ঠিক আছে।’

ওরা অনায়েসেই খালের ভেতরের শুকনো এবড়োথেবড়ো খাদ পেরিয়ে মোটর সাইকেলটা ঠেলে বুইদ্দার বিলে উঠল।

আনিস সিটে বসে মোটর সাইকেল স্টার্ট দিতে দিতে বলল, ‘পাগলা, তুই বসে আমাকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরিস।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘আইচ্ছা, আমি তাই করমু।

আনিস তার মোটর সাইকেলটা ক্ষেতের আইল ধরে একটু ধীরেই চালাচ্ছে। সে মনসুর পাগলাকে নিয়ে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। তাকে পেছন থেকে শক্ত করে ধরতে বলা হলেও সে এখন শক্ত করে ধরে রাখা থাক দূরের কথা বারবার তাকে ছেড়ে দিয়ে দু’হাত হাওয়ায় ভাসিয়ে বাতাসের ঢেঊ খেলছে। সে এমন ভাব করছে যেন সে মোটর সাইকেলে চড়ছে না, পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আকাশে উড়ছে।

আনিস হাল্কা ধমকের গলায় বলল, ‘পাগলা, কী করছিস, পড়ে যাবি তো?’

মনসুর পাগলা কলকল করে হেসে বলল, ‘না না, কী কও, আমি পড়মু না।’

‘পড়লে কিন্তু তোর খবর আছে। হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে যেতে হবে।’

‘হেইডা আমি জানি। তুমি আছ না?

‘আমি থাকলে কী হবে?’

‘আমি পইড়া যাওয়ার আগেই তোমারে ধইরা ফেলমু।

আনিস হাসল। মুখে কিছু বলল না। সে ভালো করেই জানে, আঁধারিয়া গ্রামে মনসুর পাগলার সবচেয়ে বেশি ভরসার মানুষ সে নিজে। সেই ছোটবেলা থেকেই সে তার মধ্যে সেটা দেখে আসছে। কিন্তু সে কি মনসুর পাগলার ভরসার বিপরীতে বিশ্বাসটা ধরে রাখতে পেরেছে? সেতারা বেগমের নামটা তার মধ্যে যে কালকূট হয়ে ধরা দেয়। ধীমান কালকূট।

আনিস মোটর সাইকেলটা নিয়ে নতুন রাস্তায় উঠে এল। নতুন রাস্তায় উঠলেই খানিকটা দূরের মীরবহরি বাজারটা দেখা যায়। রাস্তার মাটি এখনও সমান হয়নি। তারপরও সে মোটর সাইকেলটা একটু জোরে টান দিল।

মনসুর পাগলা বলল, ‘আনিস, আমার কী যে ভালা লাগতাছে!’— বলেই সে হাত দুটো আবার হাওয়ায় ভাসিয়ে ঢেউ তুলে কলকল শব্দে হাসতে শুরু করল। বড্ড প্রাণখোলা হাসি। ক্রমশ...


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত