১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাস। আলব্যের কামু চিঠি লিখতে বসেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে সাহিত্যে ও দর্শনে তিনি তখন ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। সংবাদমাধ্যম তাকে নিয়ে নিউজ করছে, সাহিত্যজগতে তাকে নিয়ে মাতামাতি চলছে, সবাই তার সাফল্য উদযাপন করছে। ঠিক সেই সময়, কামুর মনে পড়ছে আলজেরিয়ার এক বৃদ্ধ স্কুলশিক্ষকের কথা।
শিক্ষকের নাম লুই জারমেই। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় আগে আলজিয়ার্সের এক প্রাথমিক বিদ্যালয় একোল কমিউনাল দ্য বেলকুরে তিনি ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত কামুর শিক্ষক ছিলেন। নোবেল পেয়ে কামু তাকে লিখে জানালেন যে, পুরস্কার পাওয়ার খবর শোনার পর প্রথমেই মায়ের কথা মনে পড়েছিল এবং তারপরই মনে পড়েছে তার কথা। কামু তাকে জানিয়েছিলেন যে তার স্নেহ, উৎসাহ আর সহযোগিতা না পেলে জীবনে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।
১৯৫৭ সালের ১৯ নভেম্বর লেখা সেই চিঠি আজও সাহিত্যের ইতিহাসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক সুন্দর দলিল হিসেবে পঠিত হয়। চিঠিটা আমাদের এমন একজন কামুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার এই দিকটা নিয়ে আমরা তেমন ভাবি না। আমরা তাকে চিনি অ্যাবসার্ড দর্শন, বিদ্রোহ, মানুষের অস্তিত্ব আর জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে লেখালেখির জন্য। কিন্তু বিখ্যাত লেখক হয়ে ওঠার আগে তিনি ছিলেন দরিদ্র পরিবারের এক শিশু। তার ভবিষ্যৎ বদলে গিয়েছিল একজন শিক্ষক তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন বলে।
এই চিঠিটার কথা আমরা জানতে পারি কামুর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’ এবং ২০২২ সালে গালিমার থেকে প্রকাশিত ‘শের মঁসিয় জারিমেইন’ বইয়ে।
আমি নিজেও কামুর কাছ থেকে তার শিক্ষকের প্রতি এমন আচরণই আশা করি। তাহলে আরেকটু বলি এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের আলজেরিয়ায় ফিরে যাই। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর ফরাসি শাসনাধীন আলজেরিয়ার মন্দোভি নামের ছোট্ট একটা জনপদে কামুর জন্ম। তার বাবা লুসিয়েন কামু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হয়ে মারা যান। তখন আলব্যের এক বছরের শিশু। মা ক্যাথরিন ছিলেন দরিদ্র, শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত একজন নারী। অন্যের বাড়িতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সবাই থাকতেন আলজিয়ার্সের শ্রমজীবী মানুষের এলাকা বেলকুরের একটি ছোট্ট বাসায়। মা কানে শুনতে পেতেন না বলে তাদের বাসায় কথাবার্তাও হতো কম। প্রচণ্ড অভাবের সংসার ছিল তাদের, বাসায় বইপত্র বা পড়ালেখার পরিবেশ তেমন ছিল না। তবে শৈশবে কামু ফুটবল খেলেছেন, সাঁতার কেটেছেন, ভূমধ্যসাগরের রোদে দৌড়ে বেড়িয়েছেন।
এই জীবন যাপনের মধ্যেই স্কুল কামুর সামনে নতুন একটা পৃথিবীর দরজা খুলে দিল। সেখানেই দেখা শিক্ষক লুই জারমেই-এর সঙ্গে। জারমেই তেমন কোনো বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা একটা শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কামুর মেধা আর জানার আগ্রহ বুঝতে পারলেন। ছেলেটা মন দিয়ে পড়াশোনা করে, প্রশ্ন করে, নতুন কিছু শিখতে চায়। জারমেই ঠিক করলেন যে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরও এই ছেলেটার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করবেন।
কামুর পরিবারের কাছ থেকে বাধা এসেছিল। পরিবারে তার নানির কর্তৃত্ব ছিল প্রবল। তিনি চাইতেন, কামু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কামাই-রোজগার শুরু করুক। যে পরিবার প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আরও পড়াশোনা করাকে বিলাসিতা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্কুলে আরও এক বছর কাটানোর অর্থ হলো আরও এক বছর কোনো আয় না করা।
জারমেই এই যুক্তি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি মনে করতেন, একটা শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার পরিবারের দারিদ্র্য দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। তিনি কামুকে আলাদাভাবে প্রাইভেট পড়িয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করলেন। এমনকি কামুর নানিকেও বোঝালেন ছেলেটাকে আরও পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যে। শেষ পর্যন্ত কামু বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। ১৯২৪ সালে ভর্তি হলেন আলজিয়ার্সের একটা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ু গ্রাঁ লিসে দ’আলজের-এ।
এই সুযোগ কামুর জীবনে একটা বড় মাইলফলক ছিল, জীবনে এক অভূতপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল। এই ঘটনা কামু পরে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এ লিখে গেছেন। ১৯৯৪ সালে তার মৃত্যুর অনেক বছর পর বইটা প্রকাশিত হয়। সেখানে শিক্ষক জারমেই-এর নাম দেওয়া হয়েছে মঁসিয় বেরনার। উপন্যাসের এক পর্যায়ে আমরা দেখি যে শিক্ষক কীভাবে একটা গরিব পরিবারকে তাদের সন্তানকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে দিতে রাজি করাচ্ছেন।
তবে জারমেই-এর অবদান শুধু বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি কামুকে বুঝিয়েছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়, শিক্ষা হচ্ছে পৃথিবীকে জানার জ্ঞান। তিনি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও ইতিহাস পড়াতেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতেন ও তাদের কৌতূহলকে গুরুত্ব দিতেন। কামুদের পরিবারে কেউ ছোটদের কথা শুনতো না। বয়সে বড় একজন মানুষ ছোটদের কথা, চিন্তা, আগ্রহ এবং প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা ছিল কামুর জন্যে এক বিশাল আনন্দের অভিজ্ঞতা। পিতৃহীন এক শিশুর জন্যে এই মনোযোগের মূল্য ছিল অসীম।
কামু পরিণত বয়সে জারমেইকে শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে মনে রাখেননি, মনে রেখেছেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি কামুর দারিদ্র্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাটুকু দেখতে পেয়েছিলেন। এক শিশুকে পড়ানো আর তার ওপর বিশ্বাস রাখা এক বিষয় নয়। জারমেই দুটোই করেছিলেন।
শিক্ষালয়ের বাইরেও আরেকজন মানুষ নীরবে কামুর শিক্ষাজীবনে অবদান রাখছিলেন। তিনি গুস্তাভ আকো, কামুর আপন মামা। পেশায় আলজিয়ার্সের এক কসাই, কিন্তু বই পড়া এবং নানা বিষয়ে আলোচনা করার প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। সতেরো বছর বয়সে কামু যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলে কিছুদিন এই মামা ও মামির বাড়িতে থাকেন। সেখানে তিনি এমন একটা পরিবেশ পেলেন, যা শৈশবে নিজের বাড়িতে ছিল না। মামাবাড়িতে ছিল বালজাক, হুগো এবং জোলার মতো বিখ্যাত লেখকদের বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। গুস্তাভের বাড়িতে বসবাসের সময়ই কামু আধুনিক সাহিত্য ও দর্শনের জগতের সাথে পরিচিত হতে শুরু করেন।
মামা কামুকে নোবেলজয়ী আঁদ্রে জিদের বিখ্যাত বই ‘লে নুরিতুর তেরেস্ত্র’ পড়তে দেন এবং তখন থেকেই কামুর চিন্তাজগত বদলে যেতে থাকে। কামু নিজে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, এই বইটা পড়ার পরেই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন যে তার ভেতরের অনুভূতিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব এবং সাহিত্যে জিদই ছিলেন তার প্রথম প্রকৃত গাইড। মামা গুস্তাভ হয়তো সমাজে কেউই ছিলেন না, তবুও তিনি কামুকে বুঝতে সাহায্য করেছিলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। যে ছেলেটা ছেলেবেলায় পড়ার বই পায়নি, তার জন্য এটা ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। জারমেই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, গুস্তাভ তাকে দেখিয়েছিলেন, সেই দরজার বাইরেও চিন্তার এক বিশাল জগত রয়েছে।
সময়ের সাথে কামুর শিক্ষা এগিয়ে চলে। সেই সময় তার জীবনে এলেন আরেকজন শিক্ষক।
নাম জঁ গ্রেনিয়ে। গ্রেনিয়ে ছিলেন একজন দার্শনিক ও লেখক। ১৯৩০ সালে কামু যখন আলজেরিয়ার বিখ্যাত ‘লিসে বুজো’ স্কুলে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন, তখন গ্রেনিয়ে সেখানে দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। গ্রেনিয়ে খুব তাড়াতাড়িই তরুণ কামুর বুদ্ধিমত্তা ও লেখার প্রতিভা টের পান এবং তাকে নিবিড়ভাবে গাইড করতে শুরু করেন এবং তাকে বুঝতে সাহায্য করলেন, যে এই শিক্ষা দিয়ে তিনি কী করতে চান। তিনি কামুর সামনে দর্শন ও সাহিত্যের নতুন জানালা খুলে দিলেন।
গ্রেনিয়ে ছিলেন একটু ভিন্ন ধরনের চিন্তাবিদ। দর্শনের অনিশ্চয়তা, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, সৌন্দর্য এবং মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা নিয়ে লিখতেন। তার কাছে দর্শন মানে শুধু কয়েকটা মতবাদ শেখা নয়, দর্শন ছিল জীবনের গভীর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া। কামুর কাছে এটা ভালো লেগে যায়।
জীবন নিয়ে কামুর অনেক তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। দারিদ্র্যতা, অসুস্থতা, মৃত্যুর ভয়, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা। গ্রেনিয়েরের দর্শনচর্চা তাকে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করল। গ্রেনিয়েরের প্রবন্ধের সংকলন ‘লে ইল’ (দ্বীপপুঞ্জ) কামুর চিন্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। কামু এই বই পড়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি পরে লিখেছিলেন— ‘এই বই পড়ার পর আমি নিজে লিখতে শুরু করার গভীর তাগিদ অনুভব করি।’ গ্রেনিয়েই কামুকে প্রাচীন গ্রীক ও ভারতীয় দর্শন এবং নিৎসের ভাবনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে কামুর অ্যাবসার্ডিজমের ভিত গড়েছিল।
এই শিক্ষক তার সাহিত্যকেও উৎসাহ দিলেন এবং তখনকার লেখকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আঁদ্রে দ্য রিশো। তার উপন্যাস ‘লা দোলোর’ বা ‘বেদনা’ কামুকে প্রভাবিত করেছিল। কামু বুঝতে শুরু করলেন, সাধারণ মানুষের কষ্ট আর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। কামু পরে তার প্রথম বই যা প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথামূলক ‘লঁভের এ লঁদ্রোয়া’ (দ্য রঙ সাইড অব দ্য রাইট)-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন— ‘এই বইটা পড়ার পর আমি বুঝতে পারলাম যে আমার চারপাশের চেনা জগৎ, আমার মা এবং আমার দারিদ্র্যও সাহিত্যের অংশ হতে পারে। রিশো আমাকে লিখতে শিখিয়েছেন।’
তবে গ্রেনিয়ের নিজের লেখা ‘লে ইল’ কামুর ওপর সবচেয়ে গভীর সাহিত্যিক প্রভাব ফেলেছিল। বইটার ভাষা ছিল চিন্তাশীল, কাব্যিক ও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সমৃদ্ধ। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, দর্শন আর মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে তুলে ধরার এই ভঙ্গি কামুকে মুগ্ধ করেছিল। কামু বুঝতে পারলেন, গভীর দর্শনের কথা বলার জন্য সব সময় কঠিন তাত্ত্বিক ভাষার প্রয়োজন হয় না। জীবনের সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও দর্শনের প্রশ্ন তোলা যায়।
শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক একসময় বন্ধুত্বে রূপ নেয়, তারা একে অন্যকে চিঠি লেখা শুরু করেন, বই-পুস্তক নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, দর্শন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন। গ্রেনিয়ে জীবনের শেষের দিকে বুর-লা-রেইন শহরে বসবাস করেন এবং শহরটাকে নিয়ে প্রকাশিত জীবনীমূলক বইয়েও কামুর সাথে তার সম্পর্ক এবং শিক্ষকের প্রতি কামুর শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ রয়েছে।
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘লঁভের এ লঁদ্রোয়া’ বইটা কামু গ্রেনিয়েকে উৎসর্গ করেছিলেন। তারও চৌদ্দ বছর পর, ১৯৫১ সালে, কামুর লেখা ‘দ্য রেবেল’ প্রকাশিত হলো। এই গুরুত্বপূর্ণ বইটাও তিনি তার শিক্ষক গ্রেনিয়েকে উৎসর্গ করলেন। ততদিনে কামু এক আন্তর্জাতিক লেখক বনে গেছেন, কিন্তু গ্রেনিয়ের অবদানের কথা তিনি ভুলে যাননি।
তবে দুই মানুষের সব বিষয়ে মতের মিল ছিল না। গ্রেনিয়ে ছিলেন অনেক বেশি সংশয়ী এবং অন্যদিকে কামু ছিলেন বিদ্রোহী। তবে তাদের মতপার্থক্য বন্ধুত্ব নষ্ট করেনি। এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। গ্রেনিয়ে এমন একজন ছাত্র তৈরি করতে চাননি, যে শুধু শিক্ষকের কথাই কপচাতে থাকবে। বরং তিনি এমন একজন চিন্তাশীল মানুষ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন, যিনি নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দিতে পারবেন। তাই গ্রেনিয়ের প্রতি কামুর কৃতজ্ঞতা অন্ধ আনুগত্য থেকে আসেনি। এসেছিল এই উপলব্ধি থেকে যে একজন শিক্ষক তাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন।
লুই জারমেই এবং জঁ গ্রেনিয়ে, এই দুই শিক্ষকের অবদান পাশাপাশি রাখলে একটা বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। জারমেই কামুকে দারিদ্র্েযর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছিলেন এবং গ্রেনিয়ে তাকে চিন্তার সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে শিখিয়েছিলেন। একজন শিক্ষার সুযোগ দিয়েছিলেন, আরেকজন তার বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। একজন এক দরিদ্র শিশুর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন এবং আরেকজন একজন তরুণ লেখককে বিকশিত হতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এই শিক্ষকদের কেউই জানতেন না, তাদের এই ছাত্র একদিন ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’, ‘দ্য প্লেইগ’, ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’ এবং ‘দ্য রেবেল’ লিখবেন এবং সাহিত্যে নোবেল পাবেন।
১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কামু মারা যান। গাড়ির মধ্যে পাওয়া যায় ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এর পাণ্ডুলিপি। অসমাপ্ত এই উপন্যাসটা তার মেয়ে ক্যাথরিন কামু প্রকাশের ব্যবস্থা করেন ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৬ সালে ‘ফিলসফি নাও’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যাথরিন তার বাবার জীবনে লুই জারমেই-এর প্রতি তার ভালোবাসার কথা বলেন। তিনি জানান, ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এর শিক্ষক চরিত্রটি একজন সত্যিকার মানুষের ওপর ভিত্তি করে লেখা যার অবদান বাবা কখনো ভুলতে পারেননি।
কামুর শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাদের একটা সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়— পৃথিবীতে কেউ একা একা বড় হয় না, প্রতিটা সফল মানুষের পেছনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের নাম আমরা হয়তো কখনো জানতে পারি না। কামু নিজে মানুষের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজেছেন, জীবনের অসংগতি নিয়ে লিখেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলেছেন, ওদিকে নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সহযোগিতা। তার শিক্ষকেরা তাকে শুধু পড়াননি, নিজের ওপর বিশ্বাস করতেও শিখিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাস। আলব্যের কামু চিঠি লিখতে বসেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে সাহিত্যে ও দর্শনে তিনি তখন ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। সংবাদমাধ্যম তাকে নিয়ে নিউজ করছে, সাহিত্যজগতে তাকে নিয়ে মাতামাতি চলছে, সবাই তার সাফল্য উদযাপন করছে। ঠিক সেই সময়, কামুর মনে পড়ছে আলজেরিয়ার এক বৃদ্ধ স্কুলশিক্ষকের কথা।
শিক্ষকের নাম লুই জারমেই। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় আগে আলজিয়ার্সের এক প্রাথমিক বিদ্যালয় একোল কমিউনাল দ্য বেলকুরে তিনি ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত কামুর শিক্ষক ছিলেন। নোবেল পেয়ে কামু তাকে লিখে জানালেন যে, পুরস্কার পাওয়ার খবর শোনার পর প্রথমেই মায়ের কথা মনে পড়েছিল এবং তারপরই মনে পড়েছে তার কথা। কামু তাকে জানিয়েছিলেন যে তার স্নেহ, উৎসাহ আর সহযোগিতা না পেলে জীবনে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।
১৯৫৭ সালের ১৯ নভেম্বর লেখা সেই চিঠি আজও সাহিত্যের ইতিহাসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক সুন্দর দলিল হিসেবে পঠিত হয়। চিঠিটা আমাদের এমন একজন কামুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার এই দিকটা নিয়ে আমরা তেমন ভাবি না। আমরা তাকে চিনি অ্যাবসার্ড দর্শন, বিদ্রোহ, মানুষের অস্তিত্ব আর জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে লেখালেখির জন্য। কিন্তু বিখ্যাত লেখক হয়ে ওঠার আগে তিনি ছিলেন দরিদ্র পরিবারের এক শিশু। তার ভবিষ্যৎ বদলে গিয়েছিল একজন শিক্ষক তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন বলে।
এই চিঠিটার কথা আমরা জানতে পারি কামুর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’ এবং ২০২২ সালে গালিমার থেকে প্রকাশিত ‘শের মঁসিয় জারিমেইন’ বইয়ে।
আমি নিজেও কামুর কাছ থেকে তার শিক্ষকের প্রতি এমন আচরণই আশা করি। তাহলে আরেকটু বলি এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের আলজেরিয়ায় ফিরে যাই। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর ফরাসি শাসনাধীন আলজেরিয়ার মন্দোভি নামের ছোট্ট একটা জনপদে কামুর জন্ম। তার বাবা লুসিয়েন কামু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হয়ে মারা যান। তখন আলব্যের এক বছরের শিশু। মা ক্যাথরিন ছিলেন দরিদ্র, শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত একজন নারী। অন্যের বাড়িতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সবাই থাকতেন আলজিয়ার্সের শ্রমজীবী মানুষের এলাকা বেলকুরের একটি ছোট্ট বাসায়। মা কানে শুনতে পেতেন না বলে তাদের বাসায় কথাবার্তাও হতো কম। প্রচণ্ড অভাবের সংসার ছিল তাদের, বাসায় বইপত্র বা পড়ালেখার পরিবেশ তেমন ছিল না। তবে শৈশবে কামু ফুটবল খেলেছেন, সাঁতার কেটেছেন, ভূমধ্যসাগরের রোদে দৌড়ে বেড়িয়েছেন।
এই জীবন যাপনের মধ্যেই স্কুল কামুর সামনে নতুন একটা পৃথিবীর দরজা খুলে দিল। সেখানেই দেখা শিক্ষক লুই জারমেই-এর সঙ্গে। জারমেই তেমন কোনো বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা একটা শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কামুর মেধা আর জানার আগ্রহ বুঝতে পারলেন। ছেলেটা মন দিয়ে পড়াশোনা করে, প্রশ্ন করে, নতুন কিছু শিখতে চায়। জারমেই ঠিক করলেন যে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরও এই ছেলেটার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করবেন।
কামুর পরিবারের কাছ থেকে বাধা এসেছিল। পরিবারে তার নানির কর্তৃত্ব ছিল প্রবল। তিনি চাইতেন, কামু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কামাই-রোজগার শুরু করুক। যে পরিবার প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আরও পড়াশোনা করাকে বিলাসিতা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্কুলে আরও এক বছর কাটানোর অর্থ হলো আরও এক বছর কোনো আয় না করা।
জারমেই এই যুক্তি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি মনে করতেন, একটা শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার পরিবারের দারিদ্র্য দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। তিনি কামুকে আলাদাভাবে প্রাইভেট পড়িয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করলেন। এমনকি কামুর নানিকেও বোঝালেন ছেলেটাকে আরও পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যে। শেষ পর্যন্ত কামু বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। ১৯২৪ সালে ভর্তি হলেন আলজিয়ার্সের একটা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ু গ্রাঁ লিসে দ’আলজের-এ।
এই সুযোগ কামুর জীবনে একটা বড় মাইলফলক ছিল, জীবনে এক অভূতপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল। এই ঘটনা কামু পরে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এ লিখে গেছেন। ১৯৯৪ সালে তার মৃত্যুর অনেক বছর পর বইটা প্রকাশিত হয়। সেখানে শিক্ষক জারমেই-এর নাম দেওয়া হয়েছে মঁসিয় বেরনার। উপন্যাসের এক পর্যায়ে আমরা দেখি যে শিক্ষক কীভাবে একটা গরিব পরিবারকে তাদের সন্তানকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে দিতে রাজি করাচ্ছেন।
তবে জারমেই-এর অবদান শুধু বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি কামুকে বুঝিয়েছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়, শিক্ষা হচ্ছে পৃথিবীকে জানার জ্ঞান। তিনি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও ইতিহাস পড়াতেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতেন ও তাদের কৌতূহলকে গুরুত্ব দিতেন। কামুদের পরিবারে কেউ ছোটদের কথা শুনতো না। বয়সে বড় একজন মানুষ ছোটদের কথা, চিন্তা, আগ্রহ এবং প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা ছিল কামুর জন্যে এক বিশাল আনন্দের অভিজ্ঞতা। পিতৃহীন এক শিশুর জন্যে এই মনোযোগের মূল্য ছিল অসীম।
কামু পরিণত বয়সে জারমেইকে শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে মনে রাখেননি, মনে রেখেছেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি কামুর দারিদ্র্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাটুকু দেখতে পেয়েছিলেন। এক শিশুকে পড়ানো আর তার ওপর বিশ্বাস রাখা এক বিষয় নয়। জারমেই দুটোই করেছিলেন।
শিক্ষালয়ের বাইরেও আরেকজন মানুষ নীরবে কামুর শিক্ষাজীবনে অবদান রাখছিলেন। তিনি গুস্তাভ আকো, কামুর আপন মামা। পেশায় আলজিয়ার্সের এক কসাই, কিন্তু বই পড়া এবং নানা বিষয়ে আলোচনা করার প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। সতেরো বছর বয়সে কামু যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হলে কিছুদিন এই মামা ও মামির বাড়িতে থাকেন। সেখানে তিনি এমন একটা পরিবেশ পেলেন, যা শৈশবে নিজের বাড়িতে ছিল না। মামাবাড়িতে ছিল বালজাক, হুগো এবং জোলার মতো বিখ্যাত লেখকদের বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। গুস্তাভের বাড়িতে বসবাসের সময়ই কামু আধুনিক সাহিত্য ও দর্শনের জগতের সাথে পরিচিত হতে শুরু করেন।
মামা কামুকে নোবেলজয়ী আঁদ্রে জিদের বিখ্যাত বই ‘লে নুরিতুর তেরেস্ত্র’ পড়তে দেন এবং তখন থেকেই কামুর চিন্তাজগত বদলে যেতে থাকে। কামু নিজে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, এই বইটা পড়ার পরেই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন যে তার ভেতরের অনুভূতিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব এবং সাহিত্যে জিদই ছিলেন তার প্রথম প্রকৃত গাইড। মামা গুস্তাভ হয়তো সমাজে কেউই ছিলেন না, তবুও তিনি কামুকে বুঝতে সাহায্য করেছিলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। যে ছেলেটা ছেলেবেলায় পড়ার বই পায়নি, তার জন্য এটা ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। জারমেই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, গুস্তাভ তাকে দেখিয়েছিলেন, সেই দরজার বাইরেও চিন্তার এক বিশাল জগত রয়েছে।
সময়ের সাথে কামুর শিক্ষা এগিয়ে চলে। সেই সময় তার জীবনে এলেন আরেকজন শিক্ষক।
নাম জঁ গ্রেনিয়ে। গ্রেনিয়ে ছিলেন একজন দার্শনিক ও লেখক। ১৯৩০ সালে কামু যখন আলজেরিয়ার বিখ্যাত ‘লিসে বুজো’ স্কুলে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন, তখন গ্রেনিয়ে সেখানে দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। গ্রেনিয়ে খুব তাড়াতাড়িই তরুণ কামুর বুদ্ধিমত্তা ও লেখার প্রতিভা টের পান এবং তাকে নিবিড়ভাবে গাইড করতে শুরু করেন এবং তাকে বুঝতে সাহায্য করলেন, যে এই শিক্ষা দিয়ে তিনি কী করতে চান। তিনি কামুর সামনে দর্শন ও সাহিত্যের নতুন জানালা খুলে দিলেন।
গ্রেনিয়ে ছিলেন একটু ভিন্ন ধরনের চিন্তাবিদ। দর্শনের অনিশ্চয়তা, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, সৌন্দর্য এবং মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা নিয়ে লিখতেন। তার কাছে দর্শন মানে শুধু কয়েকটা মতবাদ শেখা নয়, দর্শন ছিল জীবনের গভীর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া। কামুর কাছে এটা ভালো লেগে যায়।
জীবন নিয়ে কামুর অনেক তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। দারিদ্র্যতা, অসুস্থতা, মৃত্যুর ভয়, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা। গ্রেনিয়েরের দর্শনচর্চা তাকে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করল। গ্রেনিয়েরের প্রবন্ধের সংকলন ‘লে ইল’ (দ্বীপপুঞ্জ) কামুর চিন্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। কামু এই বই পড়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি পরে লিখেছিলেন— ‘এই বই পড়ার পর আমি নিজে লিখতে শুরু করার গভীর তাগিদ অনুভব করি।’ গ্রেনিয়েই কামুকে প্রাচীন গ্রীক ও ভারতীয় দর্শন এবং নিৎসের ভাবনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে কামুর অ্যাবসার্ডিজমের ভিত গড়েছিল।
এই শিক্ষক তার সাহিত্যকেও উৎসাহ দিলেন এবং তখনকার লেখকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আঁদ্রে দ্য রিশো। তার উপন্যাস ‘লা দোলোর’ বা ‘বেদনা’ কামুকে প্রভাবিত করেছিল। কামু বুঝতে শুরু করলেন, সাধারণ মানুষের কষ্ট আর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। কামু পরে তার প্রথম বই যা প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথামূলক ‘লঁভের এ লঁদ্রোয়া’ (দ্য রঙ সাইড অব দ্য রাইট)-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন— ‘এই বইটা পড়ার পর আমি বুঝতে পারলাম যে আমার চারপাশের চেনা জগৎ, আমার মা এবং আমার দারিদ্র্যও সাহিত্যের অংশ হতে পারে। রিশো আমাকে লিখতে শিখিয়েছেন।’
তবে গ্রেনিয়ের নিজের লেখা ‘লে ইল’ কামুর ওপর সবচেয়ে গভীর সাহিত্যিক প্রভাব ফেলেছিল। বইটার ভাষা ছিল চিন্তাশীল, কাব্যিক ও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সমৃদ্ধ। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, দর্শন আর মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে তুলে ধরার এই ভঙ্গি কামুকে মুগ্ধ করেছিল। কামু বুঝতে পারলেন, গভীর দর্শনের কথা বলার জন্য সব সময় কঠিন তাত্ত্বিক ভাষার প্রয়োজন হয় না। জীবনের সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও দর্শনের প্রশ্ন তোলা যায়।
শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক একসময় বন্ধুত্বে রূপ নেয়, তারা একে অন্যকে চিঠি লেখা শুরু করেন, বই-পুস্তক নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, দর্শন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন। গ্রেনিয়ে জীবনের শেষের দিকে বুর-লা-রেইন শহরে বসবাস করেন এবং শহরটাকে নিয়ে প্রকাশিত জীবনীমূলক বইয়েও কামুর সাথে তার সম্পর্ক এবং শিক্ষকের প্রতি কামুর শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ রয়েছে।
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘লঁভের এ লঁদ্রোয়া’ বইটা কামু গ্রেনিয়েকে উৎসর্গ করেছিলেন। তারও চৌদ্দ বছর পর, ১৯৫১ সালে, কামুর লেখা ‘দ্য রেবেল’ প্রকাশিত হলো। এই গুরুত্বপূর্ণ বইটাও তিনি তার শিক্ষক গ্রেনিয়েকে উৎসর্গ করলেন। ততদিনে কামু এক আন্তর্জাতিক লেখক বনে গেছেন, কিন্তু গ্রেনিয়ের অবদানের কথা তিনি ভুলে যাননি।
তবে দুই মানুষের সব বিষয়ে মতের মিল ছিল না। গ্রেনিয়ে ছিলেন অনেক বেশি সংশয়ী এবং অন্যদিকে কামু ছিলেন বিদ্রোহী। তবে তাদের মতপার্থক্য বন্ধুত্ব নষ্ট করেনি। এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। গ্রেনিয়ে এমন একজন ছাত্র তৈরি করতে চাননি, যে শুধু শিক্ষকের কথাই কপচাতে থাকবে। বরং তিনি এমন একজন চিন্তাশীল মানুষ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন, যিনি নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দিতে পারবেন। তাই গ্রেনিয়ের প্রতি কামুর কৃতজ্ঞতা অন্ধ আনুগত্য থেকে আসেনি। এসেছিল এই উপলব্ধি থেকে যে একজন শিক্ষক তাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন।
লুই জারমেই এবং জঁ গ্রেনিয়ে, এই দুই শিক্ষকের অবদান পাশাপাশি রাখলে একটা বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। জারমেই কামুকে দারিদ্র্েযর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছিলেন এবং গ্রেনিয়ে তাকে চিন্তার সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে শিখিয়েছিলেন। একজন শিক্ষার সুযোগ দিয়েছিলেন, আরেকজন তার বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। একজন এক দরিদ্র শিশুর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন এবং আরেকজন একজন তরুণ লেখককে বিকশিত হতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এই শিক্ষকদের কেউই জানতেন না, তাদের এই ছাত্র একদিন ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’, ‘দ্য প্লেইগ’, ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’ এবং ‘দ্য রেবেল’ লিখবেন এবং সাহিত্যে নোবেল পাবেন।
১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কামু মারা যান। গাড়ির মধ্যে পাওয়া যায় ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এর পাণ্ডুলিপি। অসমাপ্ত এই উপন্যাসটা তার মেয়ে ক্যাথরিন কামু প্রকাশের ব্যবস্থা করেন ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৬ সালে ‘ফিলসফি নাও’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যাথরিন তার বাবার জীবনে লুই জারমেই-এর প্রতি তার ভালোবাসার কথা বলেন। তিনি জানান, ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’-এর শিক্ষক চরিত্রটি একজন সত্যিকার মানুষের ওপর ভিত্তি করে লেখা যার অবদান বাবা কখনো ভুলতে পারেননি।
কামুর শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাদের একটা সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়— পৃথিবীতে কেউ একা একা বড় হয় না, প্রতিটা সফল মানুষের পেছনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের নাম আমরা হয়তো কখনো জানতে পারি না। কামু নিজে মানুষের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজেছেন, জীবনের অসংগতি নিয়ে লিখেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলেছেন, ওদিকে নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সহযোগিতা। তার শিক্ষকেরা তাকে শুধু পড়াননি, নিজের ওপর বিশ্বাস করতেও শিখিয়েছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন