দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এগারো.
উত্তরের জোয়ারের জল বাড়তে শুরু করলে দক্ষিণ পাড়ার দিঘল পুকুরটার পুবপাশের বাঁধের এক অংশ কেটে দেওয়া হয়। তখন জোয়ারের জলে উজিয়ে আসা মাছ পুকুরটায় আসে। গোমতী নদীর মাছও জোয়ারের জলের সঙ্গে চলে আসে। সাধারণত পুকুরে বোয়াল, আইর, বা বড় পাঙাশ মাছ পাওয়া যায় না। কিন্তু দক্ষিণ পাড়ার বেপারি বাড়ির পুকুরটায় কয়েকবার জালে বোয়াল, আইর, পাঙাশ, কালিবাউস ও চিতল মাছ ধরা পড়েছে। এসব মাছ গোমতী নদী থেকে জোয়ারের জলের সঙ্গে উঠে এসেছে। একবার শুশুকও ধরা পড়েছিল। তা অবশ্য অনেক বছর আগে।
কার্তিকের শুরুতে উত্তরের জোয়ারের জল কমতে শুরু করলে পুকুরের পুবপাশের বাঁধের কাটা অংশ আবার ভরাট করে দেওয়া হয়, যাতে পুকুরে আসা মাছ আর চলে যেতে না পারে। শীতকাল বা সুদিনে পুকুরের জল অনেকটা কমে গেলে তখন জাল দিয়ে সেই মাছ ধরা হয়। জোয়ারের জলে পুকুরে প্রচুর মাছ আসে। পুকুরের অংশীদারিত্ব যদি দুই-চার ঘর হতো, তাহলে অনায়াসে পুকুরের মাছ দিয়ে সারা বছর চালিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এই দিঘল পুকুরের অংশীদার শুধু বেপারিবাড়ির মানুষ নয়, পুরো দক্ষিণপাড়ার সব ইশার মানুষ। তাই জালে যা মাছ ওঠে, তা ভাগ করে খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে পুকুরের জল বেশ সুপেয়। গোছল করা ও রান্নাবাড়ার জন্য খুব ব্যবহার করা হয়। এ পাড়ার মানুষদের আর গোমতী নদীতে গিয়ে গোছল করতে হয় না। বিশেষ করে শীতকালে, সুদিনে। এই পুকুরটাতেই গোছল করে।
দক্ষিণপাড়ার এই পুকুরটায় ঘাট আছে ছয়টা। দক্ষিণপাড়ে দুটো, দিঘল পশ্চিমপাড়ে তিনটা, আর উত্তরপাড়ে একটা। উত্তরপাড়ের ঘাটটা মনসুর পাগলাদের। পুবপাড়ে কোনো ঘাট নেই। অবশ্য পুবপাড়ে কোনো বসতিও নেই। পুকুরের দিঘল পুবপাড়ের সমান্তরালে বুইদ্দার বিল। বুইদ্দার খালটাও পুবপাড়ের সামান্য অংশ ছুঁয়ে গেছে।
পশ্চিমপাড়ের প্রথম ঘাটটা মমিনাদের। পুকুরটা যেহেতু উত্তর-দক্ষিণে দিঘালো, তাই মনসুর পাগলাদের ঘাট থেকে মমিনাদের ঘাট খুব বেশি দূরে নয়। এক ডুবে এঘাট থেকে ওঘাটে চলে যাওয়া যায়। ছোটবেলায় মমিনা তাই করত। এক ডুবে তাদের ঘাট থেকে মনসুর পাগলাদের ঘাটে চলে যেত।
পুকুরটায় কোনো পাকা ঘাটলা নেই। কোনোকালে ছিলও না। কোনো ঘাটে বাঁশের সরু মাচা বিছানো, কোনো ঘাটে গাছের গুঁড়ি দিয়ে সিঁড়ি করা। একটা ঘাটে অবশ্য ইট বিছানো, কিন্তু পাকা নয়।
মমিনাদের ঘাটটা গাছের গুঁড়ির উপর বাঁশের সরু মাচা করা। ঘাটটা পুকুরের জলের অনেকটা অব্দি এগিয়ে গেছে। মমিনা সেই মাচার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। সে গোছল করতে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে। কিন্তু এখনও জলে নামিনি। মাচার ওপর স্থাণু হয়ে বসে সে তার জীবনের কথা ভাবছে। তার এই বড্ড বিপন্ন ও বিপর্যস্ত জীবন। ঘাটে গোছল করতে এলেই সে প্রতিনিয়ত এ কাজটা করে। ঘাটে ঝিম মেরে বসে থাকে। এ জন্য মাঝেমধ্যে সে তার মা’র বেশ বকা খায়। এক বোঁচকা কাপড় ঢিল মেরে ফেলে বলে, ‘ঘাডে আইসা এমুন ঝিম মাইরা বইসা থাকবি না। কাপড়গুলান ধোয়। কামে আইব। আজাইরা বইসা বইসা খাওয়নের দিন শেষ।’
আগে মা’র এমন বকা খেলে মমিনা বেশ মন খারাপ করত। এখন করে না। নিঃশব্দে কাজ করে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তার কাজের শেষ নেই। সেই সকালে উঠে গোয়ালঘর পরিষ্কার থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় মুরগির খোঁয়াড় বন্ধ করা পর্যন্ত সব কাজ তাকেই করতে হয়। সকাল-দুপুর দুইবেলা রান্না করা, ঘরবাড়ি ঝাড়পোঁছ সবই সে করে। এত সব কাজ করতে করতে সে তার নিজের কপালকে আজকাল নিজেই দোষ দেয়, নিজেকে নিজে অভিসম্পাত করে। সে হলো এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট। বিয়ের আগে সুন্দরী বলে পাড়ায় আলাদা একটা দাম ছিল। মীরবহরি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। অনুতপুর হাইস্কুলে পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাদের একটা মাত্র নৌকা, স্কুলে যাতায়াতের অসুবিধা দেখে আর পড়ালেখা এগিয়ে নিয়ে যায়নি। এখনকার মতো নতুন রাস্তাটা থাকলে সে ঠিকই পড়ালেখা এগিয়ে নিয়ে যেত। তার বাবা-মা, এমনকি বড়চাচি ভেবেছিল, তার ভালো একটা বিয়ে হবে। সবার বলে, সে নাকি খুব গুণবতী মেয়ে। ছোটবেলা থেকে সংসারের সব কাজ শিখে রেখেছিল। কিন্তু তার ভাগ্যটা এমন হলো! তার কপালে এমন একটা স্বামী জুটল!
আজকাল আর মমিনা কারও কাছে সান্ত্বনা খুঁজতে যায় না। এমনকি তার বড়চাচির কাছেও না। সে কার কাছে কী সান্ত্বনা খুঁজবে? বড়চাচি তাকে আশ্বাস দেয়। সেটা আশ্বাস দেওয়া পর্যন্তই। তার বাবা দুই-চারবার সান্ত্বনা দিতে এসে বিরক্তই হয়েছে। তার মা তো এক আজব মানুষ। মানুষের বাড়িতে গিয়ে পান খাওয়া ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। তার ছোটমেয়ে যে এত কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, এতে কোনো বিকার নেই। বরং আজকাল বাড়ির সমস্ত কাজ ছোটমেয়ের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মানুষের বাড়িতে-বাড়িতে আরও বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মমিনা একটা ভারি নিঃশ্বাস ছাড়ল। একটা অস্ফুট শব্দ করল, স্বামী! নয় মাস হতে চলেছে তার স্বামীর কোনো খোঁজ নেই। একবার বাড়িতে কান্নাকাটি করে, বড়চাচির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে স্বামীর খুঁজে তার ছোটভাই হানিফকে নিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিল। সাতদিন ছিল তার বড়ভাইয়ের বাসা। সেই সাত দিনের প্রায় প্রতিদিন কাজীর দেউরিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিমুহূর্ত সে আশা করেছিল, তার স্বামীকে যদি কোনো রিকশায় দেখতে পায়! হোক কোনো অন্য মহিলার সঙ্গে। তারপরও সে স্বামীকে দেখে জিজ্ঞেস করত, তার সঙ্গে সে এমনটা কেন করেছে? তার অন্যায়টা কী? কিন্তু চট্টগ্রাম হলো বড় শহর। ওখানে লাখে-লাখে মানুষ। কোথায় তার স্বামীকে খুঁজে পাবে...! সে চট্টগ্রাম থেকে ভগ্ন মন নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামে ফিরে আসার পর তার মা’র যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়। সারাক্ষণ কোনো কারণ ছাড়াই খোঁটা দিতে থাকে।
মমিনা কাঁদে। নিজে নিজে অনেক কাঁদে। গুমরে ওঠা কান্না। মানুষ নানান কথা বলে, তাই সে জোরে কাঁদে না। কিন্তু এই ঘাটে বসে নিঃশব্দে কেঁদে টুপ করে পুকুরে জলে নেমে যায়। একের পর এক ডুব দেয়। ভেসে উঠে বড় একটা শ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরের গুমরে ওঠা সমস্ত কান্না বের না হওয়া পর্যন্ত পুকুরের জল থেকে ওঠে না।
মমিনা আজকাল বড়চাচির কাছে যেতেও অস্বস্তিবোধ করে। অস্বস্তিটা বড়চাচিকে নিয়ে নয়। বড়চাচি বরাবরের মতোই সে তার মা’র চেয়েও বেশি আপন ভাবে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে তার চাচাত ভাই মনসুর পাগলাকে নিয়ে। পুরুষমানুষের চোখের ভাষা বোঝার যথেষ্ট বয়স তার হয়েছে। মনসুর পাগলা যে তার সঙ্গে কোনো অসৌজন্যমূলক রূঢ় আচরণ করে, তা নয়। বরং আগের চেয়ে ভালো ব্যবহার করে। মীরবহরি বাজার থেকে এটাসেটা কিনে এনে তাকে খেতে সাধে। কথা বলে খুব নরম গলায়। সে যখন বড়চাচির কাছে যায়, কোথায় থেকে যেন উদয় হয়। খানিকটা দূরে বসে তাকে শুধু দেখে। সে বড়চাচির কাছে না গেলে সন্ধ্যায় মনসুর পাগলা তাদের বাড়িতে এসে উঁকিঝুঁকি মারে। আগ বাড়িয়ে এটাসেটা জানতে চায়। চোরাচোখে তাকে দেখে।
মনসুর পাগলা সরাসরি কোনো কিছু না বললেও মমিনা তার এহেন আচরণ বুঝতে পারে। আর সেটা বুঝতে পারে বলেই তার আজকাল যত অস্বস্তি। ছোটবেলা থেকে যাকে সে ভাইজান বলে ডেকে এসেছে। এমন তো নয় যে, চাচাত ভাইয়ের সঙ্গে চাচাত বোনের বিয়ে হয় না। অহরহ হয়। কিন্তু সে অতদূর পর্যন্ত ভাবার চিন্তাও করে না। এছাড়া তার স্বামী আছে। স্বামীকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসে। যদিও স্বামী নয় মাসের ওপরে নিখোঁজ। আরেকটা বিয়ে করেছে বলে কথা উঠেছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি তার স্বামীর বড়বোনও এ ব্যাপারে কিছু জানে না। তাই সে আশায় বসে আছে। একদিন হয়তো তার স্বামী তার পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘আমার গুনাইবিবি, আনারকলি, রাগ কইরাছ?’
মমিনা এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তার বড়চাচিকে কিছু বলেনি। অবশ্য বলার মতো এমন কিছু যে হয়েছে, তাও নয়। মনসুর পাগলা আসে, তাকে চোরাচোখে দেখে। চোখাচোখি হলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। অযথা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, দেখা হলে অযথা বেশি যত্নআত্তি করে। এসব তো তার বড়চাচিকে বলার মতো কিছু নেই। তার মনে আছে, ছোটবেলা থেকেই সে তার এই চাচাত ভাইকে খুব ভয় পেত। পারতে সামনে পড়ত না। মাথায় পাগলামি চাপলে মনসুর পাগলা যখন সারাদিন পুকুরের জলে এপার-ওপার সাঁতার কাটত, তখন সে ভুলেও পুকুরের ধারেকাছে আসত না।
মমিনা মাঝেমধ্যে ভাবে, তার চাচাত ভাইটা তার সঙ্গে আজকাল এমনটা কেন করছে? কিছু কিছু সম্পর্ক তো একটা গণ্ডির বাইরে বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকে যাকে আপন বড়ভাইটির মতো ভেবেছে! শ্রদ্ধাভরে সে ভাইজান ডাকে! তাহলে কি পুরুষ মানুষ এমনই?
মমিনা কেন জানি এ ব্যাপারে আর ভাবতে চাইল না। অবশ্য সে ভাবার মতো যৌক্তিক কারণও খুঁজে পেল না। তার স্বামী আছে। স্বামী যতই নিখোঁজ থাকুক, সে এখনও বিবাহিত। এছাড়া সে এভাবে কখনও ভেবে দেখেনি যে হুট করে তার স্বামীর স্থানটা কেউ একজন দখল করবে। সে তার স্বামীর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করতে রাজি।
মমিনা ঘাটের মাচা ছেড়ে টুপ করে পুকুরের জলে নেমে গেল। পুকুর সর্বত্র এখন জোয়ারের কালো জলে ভরাট হয়ে আছে। সে পরপর কয়েকবার সেই জলে ডুব দিল। শুধু মন ও মাথাটা নয়, শরীরটাও শীতল হয়ে গেল এই জলের স্পর্শে। তার দিঘল পুকুরে দিঘল সাঁতার কাটতে ইচ্ছে হলো। ছোটবেলা থেকেই সে সাঁতারে ভালো। পাড়ার কোনো মেয়েছেলে তার সঙ্গে সাঁতার কেটে হারাতে পারত না।
মমিনা ভাবতে ভাবতে সাঁতার কাটা শুরু করল। বারবার পরনের শাড়িটা পায়ে প্যাচিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার সাঁতার কাটতে কোনো সমস্যা হলো না। সে ঘাট ছেড়ে পুকুরের অনেকটা ভেতরে চলে এলো। ঠিক তখনই সে দেখল, মনসুর পাগলা উত্তরে ঘাটে গামছা পেঁচিয়ে পুকুরের জলে নামছে আর তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মমিনার বুঝতে পারল, মনসুর পাগলা এখন ইচ্ছে করেই পুকুরে গোছল করতে এসেছে। সে কী করবে বুঝতে পারল না। তার ভেতরে একটা ভয় ধরে গেল। কোনো কারণ ছাড়াই ভয়।
মমিনার ভয়টা আরও বেশি পেয়ে বসল যখন সে দেখলে, পুকুরের জলে নেমেই মনসুর পাগলা তার দিকে সাঁতার কেটে আসছে। সে আর একমুহূর্ত দেরি করল না। জলে একটা বড় ঘূর্ণন তুলে তাদের ঘাটের দিকে জোরে সাঁতার কাটতে শুরু করল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাটে উঠে আরেকবার মনসুর পাগলার দিকে তাকাল। মনসুর পাগলা তখন মাঝ-পুকুরে। সে ঘাট থেকে উঠোন উঠে ভেজা কাপড়েই বসত ঘরের দিকে দৌড় দিল।
কেরামত আলী গোয়ালঘরের দরজায় কিছু একটা করছিল। মেয়েকে উঠোন ধরে দৌড়াতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হইছে, এমনে ভিজা কাপড় লইয়া দৌড়াইতাছস ক্যান?’
মমিনা কোনো জবাব দিল না। বসতঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
কেরামত আলীর দৃষ্টি গেল পুকুরে। সে দেখল, মনসুর পাগলা পুকুরের মাঝখানে সাঁতার কাটছে। সে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরেও মাথা ঝাঁকাল। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এগারো.
উত্তরের জোয়ারের জল বাড়তে শুরু করলে দক্ষিণ পাড়ার দিঘল পুকুরটার পুবপাশের বাঁধের এক অংশ কেটে দেওয়া হয়। তখন জোয়ারের জলে উজিয়ে আসা মাছ পুকুরটায় আসে। গোমতী নদীর মাছও জোয়ারের জলের সঙ্গে চলে আসে। সাধারণত পুকুরে বোয়াল, আইর, বা বড় পাঙাশ মাছ পাওয়া যায় না। কিন্তু দক্ষিণ পাড়ার বেপারি বাড়ির পুকুরটায় কয়েকবার জালে বোয়াল, আইর, পাঙাশ, কালিবাউস ও চিতল মাছ ধরা পড়েছে। এসব মাছ গোমতী নদী থেকে জোয়ারের জলের সঙ্গে উঠে এসেছে। একবার শুশুকও ধরা পড়েছিল। তা অবশ্য অনেক বছর আগে।
কার্তিকের শুরুতে উত্তরের জোয়ারের জল কমতে শুরু করলে পুকুরের পুবপাশের বাঁধের কাটা অংশ আবার ভরাট করে দেওয়া হয়, যাতে পুকুরে আসা মাছ আর চলে যেতে না পারে। শীতকাল বা সুদিনে পুকুরের জল অনেকটা কমে গেলে তখন জাল দিয়ে সেই মাছ ধরা হয়। জোয়ারের জলে পুকুরে প্রচুর মাছ আসে। পুকুরের অংশীদারিত্ব যদি দুই-চার ঘর হতো, তাহলে অনায়াসে পুকুরের মাছ দিয়ে সারা বছর চালিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এই দিঘল পুকুরের অংশীদার শুধু বেপারিবাড়ির মানুষ নয়, পুরো দক্ষিণপাড়ার সব ইশার মানুষ। তাই জালে যা মাছ ওঠে, তা ভাগ করে খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে পুকুরের জল বেশ সুপেয়। গোছল করা ও রান্নাবাড়ার জন্য খুব ব্যবহার করা হয়। এ পাড়ার মানুষদের আর গোমতী নদীতে গিয়ে গোছল করতে হয় না। বিশেষ করে শীতকালে, সুদিনে। এই পুকুরটাতেই গোছল করে।
দক্ষিণপাড়ার এই পুকুরটায় ঘাট আছে ছয়টা। দক্ষিণপাড়ে দুটো, দিঘল পশ্চিমপাড়ে তিনটা, আর উত্তরপাড়ে একটা। উত্তরপাড়ের ঘাটটা মনসুর পাগলাদের। পুবপাড়ে কোনো ঘাট নেই। অবশ্য পুবপাড়ে কোনো বসতিও নেই। পুকুরের দিঘল পুবপাড়ের সমান্তরালে বুইদ্দার বিল। বুইদ্দার খালটাও পুবপাড়ের সামান্য অংশ ছুঁয়ে গেছে।
পশ্চিমপাড়ের প্রথম ঘাটটা মমিনাদের। পুকুরটা যেহেতু উত্তর-দক্ষিণে দিঘালো, তাই মনসুর পাগলাদের ঘাট থেকে মমিনাদের ঘাট খুব বেশি দূরে নয়। এক ডুবে এঘাট থেকে ওঘাটে চলে যাওয়া যায়। ছোটবেলায় মমিনা তাই করত। এক ডুবে তাদের ঘাট থেকে মনসুর পাগলাদের ঘাটে চলে যেত।
পুকুরটায় কোনো পাকা ঘাটলা নেই। কোনোকালে ছিলও না। কোনো ঘাটে বাঁশের সরু মাচা বিছানো, কোনো ঘাটে গাছের গুঁড়ি দিয়ে সিঁড়ি করা। একটা ঘাটে অবশ্য ইট বিছানো, কিন্তু পাকা নয়।
মমিনাদের ঘাটটা গাছের গুঁড়ির উপর বাঁশের সরু মাচা করা। ঘাটটা পুকুরের জলের অনেকটা অব্দি এগিয়ে গেছে। মমিনা সেই মাচার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। সে গোছল করতে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে। কিন্তু এখনও জলে নামিনি। মাচার ওপর স্থাণু হয়ে বসে সে তার জীবনের কথা ভাবছে। তার এই বড্ড বিপন্ন ও বিপর্যস্ত জীবন। ঘাটে গোছল করতে এলেই সে প্রতিনিয়ত এ কাজটা করে। ঘাটে ঝিম মেরে বসে থাকে। এ জন্য মাঝেমধ্যে সে তার মা’র বেশ বকা খায়। এক বোঁচকা কাপড় ঢিল মেরে ফেলে বলে, ‘ঘাডে আইসা এমুন ঝিম মাইরা বইসা থাকবি না। কাপড়গুলান ধোয়। কামে আইব। আজাইরা বইসা বইসা খাওয়নের দিন শেষ।’
আগে মা’র এমন বকা খেলে মমিনা বেশ মন খারাপ করত। এখন করে না। নিঃশব্দে কাজ করে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তার কাজের শেষ নেই। সেই সকালে উঠে গোয়ালঘর পরিষ্কার থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় মুরগির খোঁয়াড় বন্ধ করা পর্যন্ত সব কাজ তাকেই করতে হয়। সকাল-দুপুর দুইবেলা রান্না করা, ঘরবাড়ি ঝাড়পোঁছ সবই সে করে। এত সব কাজ করতে করতে সে তার নিজের কপালকে আজকাল নিজেই দোষ দেয়, নিজেকে নিজে অভিসম্পাত করে। সে হলো এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট। বিয়ের আগে সুন্দরী বলে পাড়ায় আলাদা একটা দাম ছিল। মীরবহরি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। অনুতপুর হাইস্কুলে পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাদের একটা মাত্র নৌকা, স্কুলে যাতায়াতের অসুবিধা দেখে আর পড়ালেখা এগিয়ে নিয়ে যায়নি। এখনকার মতো নতুন রাস্তাটা থাকলে সে ঠিকই পড়ালেখা এগিয়ে নিয়ে যেত। তার বাবা-মা, এমনকি বড়চাচি ভেবেছিল, তার ভালো একটা বিয়ে হবে। সবার বলে, সে নাকি খুব গুণবতী মেয়ে। ছোটবেলা থেকে সংসারের সব কাজ শিখে রেখেছিল। কিন্তু তার ভাগ্যটা এমন হলো! তার কপালে এমন একটা স্বামী জুটল!
আজকাল আর মমিনা কারও কাছে সান্ত্বনা খুঁজতে যায় না। এমনকি তার বড়চাচির কাছেও না। সে কার কাছে কী সান্ত্বনা খুঁজবে? বড়চাচি তাকে আশ্বাস দেয়। সেটা আশ্বাস দেওয়া পর্যন্তই। তার বাবা দুই-চারবার সান্ত্বনা দিতে এসে বিরক্তই হয়েছে। তার মা তো এক আজব মানুষ। মানুষের বাড়িতে গিয়ে পান খাওয়া ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। তার ছোটমেয়ে যে এত কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, এতে কোনো বিকার নেই। বরং আজকাল বাড়ির সমস্ত কাজ ছোটমেয়ের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মানুষের বাড়িতে-বাড়িতে আরও বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মমিনা একটা ভারি নিঃশ্বাস ছাড়ল। একটা অস্ফুট শব্দ করল, স্বামী! নয় মাস হতে চলেছে তার স্বামীর কোনো খোঁজ নেই। একবার বাড়িতে কান্নাকাটি করে, বড়চাচির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে স্বামীর খুঁজে তার ছোটভাই হানিফকে নিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিল। সাতদিন ছিল তার বড়ভাইয়ের বাসা। সেই সাত দিনের প্রায় প্রতিদিন কাজীর দেউরিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিমুহূর্ত সে আশা করেছিল, তার স্বামীকে যদি কোনো রিকশায় দেখতে পায়! হোক কোনো অন্য মহিলার সঙ্গে। তারপরও সে স্বামীকে দেখে জিজ্ঞেস করত, তার সঙ্গে সে এমনটা কেন করেছে? তার অন্যায়টা কী? কিন্তু চট্টগ্রাম হলো বড় শহর। ওখানে লাখে-লাখে মানুষ। কোথায় তার স্বামীকে খুঁজে পাবে...! সে চট্টগ্রাম থেকে ভগ্ন মন নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামে ফিরে আসার পর তার মা’র যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়। সারাক্ষণ কোনো কারণ ছাড়াই খোঁটা দিতে থাকে।
মমিনা কাঁদে। নিজে নিজে অনেক কাঁদে। গুমরে ওঠা কান্না। মানুষ নানান কথা বলে, তাই সে জোরে কাঁদে না। কিন্তু এই ঘাটে বসে নিঃশব্দে কেঁদে টুপ করে পুকুরে জলে নেমে যায়। একের পর এক ডুব দেয়। ভেসে উঠে বড় একটা শ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরের গুমরে ওঠা সমস্ত কান্না বের না হওয়া পর্যন্ত পুকুরের জল থেকে ওঠে না।
মমিনা আজকাল বড়চাচির কাছে যেতেও অস্বস্তিবোধ করে। অস্বস্তিটা বড়চাচিকে নিয়ে নয়। বড়চাচি বরাবরের মতোই সে তার মা’র চেয়েও বেশি আপন ভাবে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে তার চাচাত ভাই মনসুর পাগলাকে নিয়ে। পুরুষমানুষের চোখের ভাষা বোঝার যথেষ্ট বয়স তার হয়েছে। মনসুর পাগলা যে তার সঙ্গে কোনো অসৌজন্যমূলক রূঢ় আচরণ করে, তা নয়। বরং আগের চেয়ে ভালো ব্যবহার করে। মীরবহরি বাজার থেকে এটাসেটা কিনে এনে তাকে খেতে সাধে। কথা বলে খুব নরম গলায়। সে যখন বড়চাচির কাছে যায়, কোথায় থেকে যেন উদয় হয়। খানিকটা দূরে বসে তাকে শুধু দেখে। সে বড়চাচির কাছে না গেলে সন্ধ্যায় মনসুর পাগলা তাদের বাড়িতে এসে উঁকিঝুঁকি মারে। আগ বাড়িয়ে এটাসেটা জানতে চায়। চোরাচোখে তাকে দেখে।
মনসুর পাগলা সরাসরি কোনো কিছু না বললেও মমিনা তার এহেন আচরণ বুঝতে পারে। আর সেটা বুঝতে পারে বলেই তার আজকাল যত অস্বস্তি। ছোটবেলা থেকে যাকে সে ভাইজান বলে ডেকে এসেছে। এমন তো নয় যে, চাচাত ভাইয়ের সঙ্গে চাচাত বোনের বিয়ে হয় না। অহরহ হয়। কিন্তু সে অতদূর পর্যন্ত ভাবার চিন্তাও করে না। এছাড়া তার স্বামী আছে। স্বামীকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসে। যদিও স্বামী নয় মাসের ওপরে নিখোঁজ। আরেকটা বিয়ে করেছে বলে কথা উঠেছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি তার স্বামীর বড়বোনও এ ব্যাপারে কিছু জানে না। তাই সে আশায় বসে আছে। একদিন হয়তো তার স্বামী তার পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘আমার গুনাইবিবি, আনারকলি, রাগ কইরাছ?’
মমিনা এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তার বড়চাচিকে কিছু বলেনি। অবশ্য বলার মতো এমন কিছু যে হয়েছে, তাও নয়। মনসুর পাগলা আসে, তাকে চোরাচোখে দেখে। চোখাচোখি হলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। অযথা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, দেখা হলে অযথা বেশি যত্নআত্তি করে। এসব তো তার বড়চাচিকে বলার মতো কিছু নেই। তার মনে আছে, ছোটবেলা থেকেই সে তার এই চাচাত ভাইকে খুব ভয় পেত। পারতে সামনে পড়ত না। মাথায় পাগলামি চাপলে মনসুর পাগলা যখন সারাদিন পুকুরের জলে এপার-ওপার সাঁতার কাটত, তখন সে ভুলেও পুকুরের ধারেকাছে আসত না।
মমিনা মাঝেমধ্যে ভাবে, তার চাচাত ভাইটা তার সঙ্গে আজকাল এমনটা কেন করছে? কিছু কিছু সম্পর্ক তো একটা গণ্ডির বাইরে বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকে যাকে আপন বড়ভাইটির মতো ভেবেছে! শ্রদ্ধাভরে সে ভাইজান ডাকে! তাহলে কি পুরুষ মানুষ এমনই?
মমিনা কেন জানি এ ব্যাপারে আর ভাবতে চাইল না। অবশ্য সে ভাবার মতো যৌক্তিক কারণও খুঁজে পেল না। তার স্বামী আছে। স্বামী যতই নিখোঁজ থাকুক, সে এখনও বিবাহিত। এছাড়া সে এভাবে কখনও ভেবে দেখেনি যে হুট করে তার স্বামীর স্থানটা কেউ একজন দখল করবে। সে তার স্বামীর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করতে রাজি।
মমিনা ঘাটের মাচা ছেড়ে টুপ করে পুকুরের জলে নেমে গেল। পুকুর সর্বত্র এখন জোয়ারের কালো জলে ভরাট হয়ে আছে। সে পরপর কয়েকবার সেই জলে ডুব দিল। শুধু মন ও মাথাটা নয়, শরীরটাও শীতল হয়ে গেল এই জলের স্পর্শে। তার দিঘল পুকুরে দিঘল সাঁতার কাটতে ইচ্ছে হলো। ছোটবেলা থেকেই সে সাঁতারে ভালো। পাড়ার কোনো মেয়েছেলে তার সঙ্গে সাঁতার কেটে হারাতে পারত না।
মমিনা ভাবতে ভাবতে সাঁতার কাটা শুরু করল। বারবার পরনের শাড়িটা পায়ে প্যাচিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার সাঁতার কাটতে কোনো সমস্যা হলো না। সে ঘাট ছেড়ে পুকুরের অনেকটা ভেতরে চলে এলো। ঠিক তখনই সে দেখল, মনসুর পাগলা উত্তরে ঘাটে গামছা পেঁচিয়ে পুকুরের জলে নামছে আর তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মমিনার বুঝতে পারল, মনসুর পাগলা এখন ইচ্ছে করেই পুকুরে গোছল করতে এসেছে। সে কী করবে বুঝতে পারল না। তার ভেতরে একটা ভয় ধরে গেল। কোনো কারণ ছাড়াই ভয়।
মমিনার ভয়টা আরও বেশি পেয়ে বসল যখন সে দেখলে, পুকুরের জলে নেমেই মনসুর পাগলা তার দিকে সাঁতার কেটে আসছে। সে আর একমুহূর্ত দেরি করল না। জলে একটা বড় ঘূর্ণন তুলে তাদের ঘাটের দিকে জোরে সাঁতার কাটতে শুরু করল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাটে উঠে আরেকবার মনসুর পাগলার দিকে তাকাল। মনসুর পাগলা তখন মাঝ-পুকুরে। সে ঘাট থেকে উঠোন উঠে ভেজা কাপড়েই বসত ঘরের দিকে দৌড় দিল।
কেরামত আলী গোয়ালঘরের দরজায় কিছু একটা করছিল। মেয়েকে উঠোন ধরে দৌড়াতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হইছে, এমনে ভিজা কাপড় লইয়া দৌড়াইতাছস ক্যান?’
মমিনা কোনো জবাব দিল না। বসতঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
কেরামত আলীর দৃষ্টি গেল পুকুরে। সে দেখল, মনসুর পাগলা পুকুরের মাঝখানে সাঁতার কাটছে। সে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরেও মাথা ঝাঁকাল। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন