শিল্প ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার পরিসর
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এক.
মানুষ যখন প্রথম বুঝতে শিখেছিল দৃশ্যমান পৃথিবীই তার সমস্ত পৃথিবী নয়, সম্ভবত তখনই রোমান্টিকতার জন্ম। কোনো সাহিত্যিক ইশতেহারে নয়, কোনো বিশেষ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও নয়, তার জন্ম মানুষের সেই আদিম মুহূর্তে, যখন সে হাতের নাগালে থাকা বাস্তবতার পাশে কল্পনা করেছিল আরেকটি বাস্তবতা; যখন গুহার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, ওই অসীম নীল-কালো শূন্যতার সঙ্গে তার ক্ষুদ্র জীবনের কোনো রহস্যময় আত্মীয়তা আছে। সেই মুহূর্ত থেকেই মানুষ কেবল যা আছে তার অধিবাসী নয়, যা নেই অথচ থাকতে পারত— তারও নাগরিক। বাস্তব ও আকাঙ্ক্ষিতের এই ব্যবধান, সসীম অস্তিত্বের মধ্যে অসীমের জন্য এই দুর্নিবার ব্যাকুলতা, দৃশ্যমানের আড়ালে অদৃশ্যের উপস্থিতি অনুভব করার ক্ষমতাই সম্ভবত রোমান্টিকতার গভীরতম বীজ।
সাহিত্যের ইতিহাস অবশ্য রোমান্টিসিজমকে একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে শনাক্ত করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপে আলোকায়নের যুক্তিবাদ, নব্যধ্রুপদী শৃঙ্খলা, শিল্পবিপ্লবের যান্ত্রিকতা এবং ক্রমশ সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠা নাগরিক সভ্যতার বিরুদ্ধে যে নন্দনতাত্ত্বিক ও আত্মিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তারই নাম রোমান্টিসিজম। কিন্তু এই সংজ্ঞার ভেতর তাকে সম্পূর্ণ বন্দি করা যায় না। কারণ রোমান্টিকতা একই সঙ্গে ইতিহাসের একটি আন্দোলন এবং মানুষের চেতনার একটি স্থায়ী প্রবণতা। একদিকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলি, কিটস, বায়রন, নোভালিস, হোল্ডারলিন, গ্যেটে; অন্যদিকে ডেলাক্রোয়া, ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডরিখ, টার্নার কিংবা গোয়ার ছবিতে তার ঐতিহাসিক প্রকাশ— কিন্তু তার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাটি আরও প্রাচীন, আরও বিস্তৃত। কালিদাসের মেঘদূত-এ বিরহী যক্ষ যখন মেঘকে দূত করে প্রিয়ার কাছে পাঠায়, কিংবা বৈষ্ণব পদাবলির রাধা যখন অনুপস্থিত কৃষ্ণের মধ্যেই তাঁর সর্বাধিক উপস্থিতি অনুভব করেন, তখন আধুনিক ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের বহু শতাব্দী আগেই মানবমনের সেই একই আকাঙ্ক্ষা কথা বলে— যেখানে অনুপস্থিতিই উপস্থিতির চেয়ে গভীর, বিরহ মিলনের চেয়ে নান্দনিকভাবে অধিক তীব্র।
রোমান্টিকতার আবির্ভাবের পেছনে ছিল সভ্যতার একটি গভীর দ্বন্দ্ব। আলোকায়ন মানুষকে বলেছিল— জানো, যুক্তি দিয়ে বিচার করো, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করো। রোমান্টিকতা এসে যেন বলল— জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, বিস্মিত হতেও শেখো। প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করতে পারা মানেই তাকে অনুভব করা নয়। একটি ফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় জানা যায়; কিন্তু শিশিরভেজা ভোরে সেই ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতার কোনো বৈজ্ঞানিক সমীকরণ নেই। এখানেই রোমান্টিকতা যুক্তিকে অস্বীকার না করেও যুক্তির সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। ইমানুয়েল কান্টের ‘সাবলাইম’ বা মহিমান্বিতের ধারণা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সৌন্দর্য যেখানে আমাদের আনন্দ দেয়, মহিমান্বিত সেখানে একই সঙ্গে আকর্ষণ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে— উত্তাল সমুদ্র, সীমাহীন আকাশ, দুর্দম ঝড়, অতিকায় পর্বতশ্রেণি আমাদের ক্ষুদ্রতার বোধ জাগায়, অথচ সেই ক্ষুদ্রতার মধ্যেই মানুষ আবিষ্কার করে নিজের কল্পনার অসীম ক্ষমতা। রোমান্টিক শিল্পে প্রকৃতি তাই নিছক দৃশ্যপট নয়; সে মানুষের আত্মার প্রতিপক্ষ, প্রতিধ্বনি এবং কখনো তারই মহাজাগতিক সম্প্রসারণ।
ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডরিখের Wanderer above the Sea of Fog ছবিটির দিকে তাকালে রোমান্টিকতার এই দর্শন প্রায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একজন মানুষ পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন পাহাড়চূড়ায়; তাঁর সামনে কুয়াশায় ঢাকা অনির্ণেয় ভূদৃশ্য। আমরা তাঁর মুখ দেখি না, কারণ মুখটি এখানে জরুরি নয়; জরুরি তাঁর দৃষ্টি এবং তাঁর সামনে উন্মুক্ত অসীম। দর্শকও যেন তাঁর সঙ্গে সেই অজানার দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটি প্রকৃতিকে জয় করেননি; বরং প্রকৃতির অসীমতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রহস্যকেই প্রত্যক্ষ করছেন। টার্নারের ঝড়, সমুদ্র, আগুন ও আলোর ছবিতে প্রকৃতি আরও অস্থির— আকার যেন রঙের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে যায়। Snow Storm: Steam-Boat off a HarbourÕs Mouth-এ সভ্যতার যন্ত্র— স্টিমবোট— প্রকৃতির ঘূর্ণির মধ্যে প্রায় বিলীন। শিল্পবিপ্লব মানুষকে যন্ত্র দিয়েছে, কিন্তু টার্নারের ঝড় যেন প্রশ্ন করে: প্রকৃতির আদিম শক্তির সামনে সেই যন্ত্রের অহংকার কতটুকু?
এই প্রশ্নটিই ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় অন্যভাবে ফিরে আসে। তাঁর কাছে প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্যের উৎস নয়, মানুষের নৈতিক ও আত্মিক শিক্ষার ক্ষেত্র। Tintern Abbey-তে বহু বছর পর পরিচিত প্রকৃতির কাছে ফিরে এসে কবি বুঝতে পারেন, শৈশবের উচ্ছ্বাস বদলে গেছে এক গভীরতর অন্তর্দৃষ্টিতে। প্রকৃতি তাঁর কাছে হয়ে ওঠে এমন এক উপস্থিতি যা দৃশ্যমান বস্তুসমূহের গভীরে প্রবাহিত। তাঁর কবিতায় সাধারণ গ্রাম্য মানুষ, শিশু, পথ, পাহাড়, ড্যাফোডিল— সব কিছুই কাব্যের বিষয় হতে পারে। এর মধ্যেই ছিল একটি নন্দনতাত্ত্বিক গণতন্ত্র। নব্যধ্রুপদী সাহিত্য যেখানে মহৎ বিষয় ও অলংকৃত ভাষার প্রতি আকৃষ্ট, সেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতাকে ফিরিয়ে আনলেন মানুষের দৈনন্দিন ভাষা ও সাধারণ জীবনের কাছে। কিন্তু এই ‘সাধারণ’ কখনোই তুচ্ছ নয়; কল্পনার স্পর্শে সাধারণই অসাধারণ হয়ে ওঠে।
কোলরিজ আবার রোমান্টিকতার অন্য দরজা খুললেন— স্বপ্ন, অতিপ্রাকৃত, অবচেতন ও রহস্যের দরজা। The Rime of the Ancient Mariner কিংবা Kubla Khan-এ বাস্তবতা স্বপ্নের সীমান্তে এসে ভেঙে পড়ে। রোমান্টিক কল্পনা এখানে বাস্তবের প্রতিলিপিকার নয়, নতুন বাস্তবতার স্রষ্টা। কোলরিজের ‘প্রাইমারি ইমাজিনেশন’ ও ‘সেকেন্ডারি ইমাজিনেশন’-এর তত্ত্ব তাই গুরুত্বপূর্ণ: কল্পনা কেবল সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নয়, বিচ্ছিন্ন জগতকে নতুন ঐক্যে নির্মাণের সৃজনশক্তি। এই ধারণা রোমান্টিক নন্দনতত্ত্বের কেন্দ্রে শিল্পীর মর্যাদাই বদলে দেয়। শিল্পী আর কারিগর নন; তিনি এক অর্থে স্রষ্টা— যিনি বাস্তবের উপাদানকে পুনর্বিন্যস্ত করে এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন, যা আগে ছিল না।
শেলির কাছে এই কল্পনা আরও রাজনৈতিক। ‘আ ডিফেন্স অফ পোয়েট্রি’তে কবির কল্পনাশক্তি নৈতিক সহমর্মিতার সঙ্গে যুক্ত; মানুষ নিজের সত্তার সীমানা অতিক্রম করে অন্যের অনুভূতির মধ্যে প্রবেশ করতে শেখে কল্পনার মাধ্যমেই। তাঁর ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’-এর পশ্চিমা বাতাস একই সঙ্গে ধ্বংসকারী ও সংরক্ষক— মৃত পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়, আবার নতুন বীজকে ভবিষ্যতের জন্য বহন করে। রোমান্টিকতা তাই কেবল চাঁদের আলোয় প্রেম কিংবা ব্যক্তিগত বিষণ্নতার নাম নয়; তার মধ্যে বিপ্লবের আগুনও রয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের স্বপ্ন ইউরোপীয় রোমান্টিকদের গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। বায়রনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও আত্মবিনাশী নায়ক তাই রোমান্টিকতার আরেক মুখ। ‘বায়রনিক হিরো’ সামাজিক বিধির সঙ্গে আপস করে না; সে নিঃসঙ্গ, অহংকারী, আহত, বিদ্রোহী এবং নিজের ধ্বংসের মধ্যেও স্বাধীন।
ডেলাক্রোয়ার ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’ যেন সেই রোমান্টিক বিদ্রোহের রঙিন বিস্ফোরণ। ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে স্বাধীনতা এগিয়ে চলেছে; চারপাশে মৃতদেহ, ধোঁয়া, অস্ত্র, বিপ্লবী জনতা। এখানে সৌন্দর্য আর নিস্পৃহ নয়; সে রক্তাক্ত, রাজনৈতিক, ইতিহাসের ভেতর সক্রিয়। আবার গোয়ার ‘দ্য থার্ড অফ মে ১৮০৮’-এ রোমান্টিকতার অন্ধকার মুখ— যুদ্ধ, মৃত্যু, রাষ্ট্রের নির্মমতা। সাদা পোশাকের অসহায় মানুষটি হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে; বন্দুকের সারি তার দিকে তাক করা। যুক্তিবাদী সভ্যতার অগ্রগতির আড়ালে যে বর্বরতা রয়ে যায়, রোমান্টিক শিল্প সেই অন্ধকারকে উন্মোচিত করে।
কিটসের কাছে অবশ্য বিপ্লবের ভাষা বদলে যায় সৌন্দর্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষায়। তাঁর পৃথিবী স্পর্শ, ঘ্রাণ, রং, সংগীত ও মৃত্যুচেতনার পৃথিবী। ‘ওড টু আ নাইটিঙ্গেল’-এ নাইটিঙ্গেলের গান মানুষের ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বের বিপরীতে যেন অমর শিল্পের প্রতীক। ‘ওড অন আ গ্রেশিয়ান আর্ন’-এ স্থির শিল্পের ভেতর জমে থাকা প্রেম কখনো পূর্ণ হবে না, কিন্তু সেই অপূর্ণতার কারণেই তা অনন্ত। এখানেই রোমান্টিকতার এক গভীর প্যারাডক্স— সে পূর্ণতা চায়, অথচ তার শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য জন্মায় অপূর্ণতা থেকে। যে প্রেম পাওয়া হয়ে গেছে তার চেয়ে যে প্রেম পাওয়া যায়নি, যে দেশ ছেড়ে আসা হয়েছে তার চেয়ে স্মৃতির দেশ, যে মুখ হারিয়ে গেছে তার চেয়ে স্মৃতিতে ফিরে আসা মুখ— রোমান্টিক কল্পনায় প্রায়ই অধিক দীপ্তিমান।
জার্মান রোমান্টিক নোভালিসের বিখ্যাত নীল ফুল এই অনন্ত আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক। জার্মান ভাষায় ‘জেনজুখ্ট’— এমন এক আকুলতা যার নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। মানুষ জানে না সে ঠিক কী চায়, শুধু জানে বর্তমান পৃথিবী যথেষ্ট নয়। এই অতৃপ্তিই রোমান্টিকতার অস্তিত্ববাদী গভীরতা। মানুষ সসীম অথচ অসীমকে কামনা করে; নশ্বর অথচ অমরতার স্বপ্ন দেখে; একা অথচ পরম সংযোগের জন্য ব্যাকুল। পরবর্তী কালে কিয়ের্কেগার্দের উদ্বেগ, নীৎশের আত্মোত্তরণ কিংবা অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতার অনেক দূরবর্তী পূর্বাভাস রোমান্টিক আত্মসচেতনতায় খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিকতা এসেছে ইউরোপীয় প্রভাবের মধ্য দিয়ে, কিন্তু তার শিকড় মিশেছে আরও পুরোনো দেশীয় রসধারায়। বৈষ্ণব পদাবলির বিরহ, মঙ্গলকাব্যের কল্পলোক, মধ্যযুগীয় প্রেমকাব্য, কালিদাসীয় প্রকৃতি-সংবেদন— সব মিলিয়ে বাংলা রোমান্টিকতার ভূমি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য সরাসরি রোমান্টিক কাব্য না হলেও তার বিদ্রোহী পুনর্নির্মাণে রোমান্টিক চেতনার প্রবল স্ফুরণ রয়েছে। প্রচলিত নৈতিকতার বিপরীতে পরাজিত মেঘনাদকে মহিমান্বিত করে তোলা— এ যেন ইতিহাসের বিজয়ীর বদলে পরাজিতের ট্র্যাজিক মহত্ত্ব আবিষ্কার। রোমান্টিকতা প্রায়ই পরাজিত, নির্বাসিত ও সমাজের প্রান্তবর্তী মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট; কারণ প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির মধ্যেই সে স্বাধীনতার সম্ভাবনা দেখে।
রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা আরও জটিল। তাঁকে শুধু রোমান্টিক কবি বললে তাঁর বিশাল শিল্পজগৎকে সংকুচিত করা হবে, কিন্তু তাঁর কবিতার গভীরে প্রকৃতি, প্রেম, অসীম, মানবাত্মা ও বিশ্বসত্তার যে সংলাপ, তার সঙ্গে রোমান্টিক নন্দনবোধের নিবিড় আত্মীয়তা অস্বীকার করা যায় না। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এর বাঁধভাঙা আত্মপ্রকাশ, ‘সোনার তরী’র রহস্যময় প্রাপ্তি ও হারানো, ‘বলাকা’র গতি কিংবা ‘গীতাঞ্জলি’-র সসীম থেকে অসীমের অভিসার— সবখানেই দৃশ্যমান পৃথিবী তার দৃশ্যমানতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় রোমান্টিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ভারতীয় উপনিষদীয় বিশ্বাত্মবোধের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। তাঁর ‘আমি’ নিঃসঙ্গ দ্বীপ নয়; বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই সে বৃহত্তর আত্মপরিচয় পায়।
আর নজরুলের রোমান্টিকতা একই সঙ্গে প্রেম ও বিদ্রোহ। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’ কোনো শান্ত প্রকৃতিপ্রেমী সত্তা নয়; সে মহাবিশ্বের সমস্ত বিরোধকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে চায়— সৃষ্টি ও ধ্বংস, প্রেম ও ক্রোধ, কোমলতা ও প্রলয়। ইউরোপীয় রোমান্টিকতার বায়রনিক বিদ্রোহী সত্তার সঙ্গে এর আত্মীয়তা থাকলেও নজরুল তাকে ভারতীয় পুরাণ, ইসলামি ঐতিহ্য এবং উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহুস্বরিক ভাষায় রূপান্তরিত করেন। তাঁর প্রেমের কবিতাতেও প্রিয়তমা কখনো কেবল ব্যক্তি নয়; সৌন্দর্যের এমন এক অধরা প্রতিমা, যার দিকে কবির যাত্রা শেষ হয় না।
জীবনানন্দ দাশের কাছে এসে বাংলা রোমান্টিকতা এক অদ্ভুত গোধূলি অর্জন করে। তিনি আধুনিক কবি, তাঁর পৃথিবী যুদ্ধ, ইতিহাস, নগর-নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের ক্লান্তিতে পূর্ণ; তবু তাঁর কবিতার বাংলার মাঠ, ধানসিঁড়ি, শঙ্খচিল, হিজল, বনলতা, শিশির ও নক্ষত্র যেন হারানো কোনো পৃথিবীর স্মৃতি। জীবনানন্দের প্রকৃতি ওয়ার্ডসওয়ার্থীয় প্রশান্ত আশ্রয় নয়; সেখানে মৃত্যু ও সৌন্দর্য পাশাপাশি হাঁটে। তাঁর রোমান্টিকতা তাই প্রত্যাবর্তনের অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা— এমন একটি বাংলায় ফিরে যাওয়ার বাসনা, যা হয়তো বাস্তবে কখনোই ছিল না। স্মৃতি এখানে বাস্তবের অনুলিপি নয়; স্মৃতি নিজেই নতুন করে এক মহাপৃথিবী পুনর্নির্মাণ করে। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতার ভেতরে হারানো সম্পূর্ণতার এই আকাঙ্ক্ষাই জীবনানন্দকে একদিকে আধুনিক, অন্যদিকে গভীরভাবে উত্তর-রোমান্টিক করে তোলে।
বাংলার চিত্রকলাতেও রোমান্টিকতার স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রজগতে কুয়াশাময় রং, স্বপ্ন, স্মৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় কল্পনার সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর ভারতমাতা কেবল নারীমূর্তি নয়, একটি ভূখণ্ডের আবেগীয় প্রতিরূপ; আবার আরব্য রজনী সিরিজে বাস্তব কলকাতা ও কল্পনার প্রাচ্য রহস্য পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। নন্দলাল বসুর প্রকৃতিচিত্রে দেশজ ভূদৃশ্য নিছক অনুকরণ নয়— প্রকৃতি সেখানে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের ছবিগুলো রোমান্টিকতার আরেক গোপন অঞ্চল উন্মুক্ত করে: মুখোশ, অন্ধকার মুখ, অদ্ভুত প্রাণি, অনির্ণেয় ভূদৃশ্য— যেন অবচেতনের অরণ্য। এখানে সৌন্দর্য আর সুন্দর মাত্র নয়; অস্বস্তিকর, রহস্যময় এবং কখনো বিকৃতও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
রোমান্টিকতার একটি বড় অবদান এখানেই— সৌন্দর্যের ধারণাকে সে শৃঙ্খলিত সামঞ্জস্য থেকে মুক্ত করে। এডমন্ড বার্ক ও কান্টের ‘সাবলাইম’ ধারণায় যেমন দেখা যায়, নান্দনিক অভিজ্ঞতা শুধু কোমল আনন্দ নয়; ভয়, বিপুলতা, অন্ধকার, অসীমতাও নন্দনের উৎস হতে পারে। ঝড় সুন্দর হতে পারে, ধ্বংসস্তূপ সুন্দর হতে পারে, মধ্যরাতের নির্জন দুর্গ সুন্দর হতে পারে, এমনকি বিষাদও নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে। এখান থেকেই গথিক সাহিত্য, রহস্য, অতিপ্রাকৃত এবং পরবর্তী কালের ডার্ক রোমান্টিসিজমের পথ খুলে যায়। মেরি শেলির Frankenstein রোমান্টিকতার এই অন্ধকার আত্মসমালোচনার অসাধারণ দৃষ্টান্ত। মানুষ জ্ঞানের শক্তিতে জীবন সৃষ্টি করতে চায়, কিন্তু নিজের সৃষ্টির নৈতিক দায় বহন করতে ব্যর্থ হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অহংকারের বিরুদ্ধে উপন্যাসটির প্রশ্ন আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও আশ্চর্যভাবে প্রাসঙ্গিক: আমরা যা সৃষ্টি করতে সক্ষম, তা সৃষ্টি করা কি সবসময় উচিত?
এ কারণেই রোমান্টিকতা অতীতের মৃত অধ্যায় নয়। ডিজিটাল সভ্যতার এই সময়ে বরং তার প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে এসেছে। আমাদের হাতে এখন পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দৃশ্যের ছবি আছে, অথচ একটি দৃশ্যের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর ধৈর্য কমেছে; অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সংযোগ আছে, অথচ নিঃসঙ্গতা কমেনি; অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ অনুমান করতে পারে, কিন্তু আমাদের অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষার ভাষা কি সে জানে? রোমান্টিকতা এই প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমানের কাছে পুরোনো প্রশ্নটি আবার রাখে— মানুষ কি কেবল তথ্যপ্রক্রিয়াকারী প্রাণি? মানুষের এমন কিছু কি নেই যা পরিমাপ, গণনা ও পূর্বাভাসের বাইরে থেকে যায়— স্বপ্ন, বিস্ময়, স্মৃতি, প্রেম, বিষাদ, কল্পনা, অকারণ আনন্দ, অজ্ঞাতের জন্য আকুলতা?
অবশ্য রোমান্টিকতার বিপদও রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কখনো আত্মমুগ্ধতায় পরিণত হতে পারে; অতীতের প্রতি আকর্ষণ প্রতিক্রিয়াশীল নস্টালজিয়ায়, জাতীয় কল্পনা উগ্র জাতীয়তাবাদে, প্রকৃতির আদর্শায়ন বাস্তব সামাজিক সংকট থেকে পলায়নে রূপ নিতে পারে। প্রেমের রোমান্টিকীকরণ বাস্তব সম্পর্কের জটিলতাকে আড়াল করতে পারে। তাই রোমান্টিকতার নন্দনকে গ্রহণ করতে হলে তার সমালোচনাও জরুরি। শিল্পের কাজ বাস্তব থেকে শুধু পালিয়ে যাওয়া নয়; কখনো কল্পনার অন্য বাস্তব নির্মাণের মধ্য দিয়েই বর্তমান বাস্তবকে প্রশ্ন করা। শেলি, বায়রন, ডেলাক্রোয়া কিংবা নজরুলের রোমান্টিকতা তাই পলায়ন নয়— প্রতিরোধের ভাষা।
শেষ পর্যন্ত রোমান্টিকতার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এই যে মানুষ তার প্রাপ্ত পৃথিবীর মধ্যে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারে না। তার ভেতরে সবসময় আরেকটি পৃথিবীর ক্ষুধা থাকে। সেই পৃথিবী কখনো প্রেমিকার চোখে, কখনো পাহাড়ের ওপারের কুয়াশায়, কখনো বিপ্লবের পতাকায়, কখনো হারানো শৈশবের গ্রামে, কখনো কবিতার অসমাপ্ত পঙ্ক্তিতে, কখনো ছবির অন্ধকার আকাশে দেখা দেয়। আমরা তাকে স্পর্শ করতে গেলেই সে আরও দূরে সরে যায়। কিন্তু সেই দূরত্বই আমাদের যাত্রাকে সম্ভব করে।
হয়তো এ কারণেই রোমান্টিক মানুষ জানে— পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর সবকটি আমাদের অধিকারে আসে না। কিছু সৌন্দর্যকে দূর থেকেই দেখতে হয়; কিছু প্রেম পূর্ণ না হয়েও জীবনব্যাপী থেকে যায়; কিছু পথের কোনো গন্তব্য নেই, তবু সেই পথেই হাঁটতে ইচ্ছে করে; কিছু নক্ষত্রে কোনোদিন পৌঁছানো যাবে না জেনেও মানুষ রাতের আকাশে তাকায়। যুক্তি তাকে বলে— ওখানে কেবল অগ্নিগোলক; কল্পনা বলে— ওই আলোয় হয়তো আমার হারানো কোনো স্বপ্নের ঠিকানা আছে। এই দুই বাক্যের মাঝখানেই রোমান্টিকতার বাস।
সভ্যতা যতই যন্ত্রনির্ভর হোক, মানুষ যতই তথ্যের নাগরিক হয়ে উঠুক, যতদিন কোনো বৃষ্টির রাতে অকারণে কারও পুরোনো মুখ মনে পড়বে, যতদিন দূরের পাহাড় দেখে মনে হবে তার ওপারে অন্য কোনো জীবন অপেক্ষা করছে, যতদিন কোনো কবিতার একটি পঙ্ক্তি আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে মুহূর্তের জন্য অপরিচিত করে তুলবে, কিংবা কোনো চিত্রের অসীম আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতার মধ্যেও এক অজ্ঞাত মহিমা অনুভব করবে— ততদিন রোমান্টিকতা শেষ হবে না। কারণ রোমান্টিকতা কোনো বিশেষ যুগের নামমাত্র নয়; এটি মানুষের সেই অনিবার্য ব্যাকুলতার নাম, যা দৃশ্যমানের ভেতরে অদৃশ্যকে, সসীমের মধ্যে অসীমকে, প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিকে এবং বাস্তবতার কঠিন ভূমির নিচে এখনো স্পন্দিত কোনো স্বপ্নের ভূগর্ভস্থ নদীকেই খুঁজে ফেরে। ক্রমশ...
***

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
শিল্প ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার পরিসর
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এক.
মানুষ যখন প্রথম বুঝতে শিখেছিল দৃশ্যমান পৃথিবীই তার সমস্ত পৃথিবী নয়, সম্ভবত তখনই রোমান্টিকতার জন্ম। কোনো সাহিত্যিক ইশতেহারে নয়, কোনো বিশেষ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও নয়, তার জন্ম মানুষের সেই আদিম মুহূর্তে, যখন সে হাতের নাগালে থাকা বাস্তবতার পাশে কল্পনা করেছিল আরেকটি বাস্তবতা; যখন গুহার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, ওই অসীম নীল-কালো শূন্যতার সঙ্গে তার ক্ষুদ্র জীবনের কোনো রহস্যময় আত্মীয়তা আছে। সেই মুহূর্ত থেকেই মানুষ কেবল যা আছে তার অধিবাসী নয়, যা নেই অথচ থাকতে পারত— তারও নাগরিক। বাস্তব ও আকাঙ্ক্ষিতের এই ব্যবধান, সসীম অস্তিত্বের মধ্যে অসীমের জন্য এই দুর্নিবার ব্যাকুলতা, দৃশ্যমানের আড়ালে অদৃশ্যের উপস্থিতি অনুভব করার ক্ষমতাই সম্ভবত রোমান্টিকতার গভীরতম বীজ।
সাহিত্যের ইতিহাস অবশ্য রোমান্টিসিজমকে একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে শনাক্ত করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপে আলোকায়নের যুক্তিবাদ, নব্যধ্রুপদী শৃঙ্খলা, শিল্পবিপ্লবের যান্ত্রিকতা এবং ক্রমশ সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠা নাগরিক সভ্যতার বিরুদ্ধে যে নন্দনতাত্ত্বিক ও আত্মিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তারই নাম রোমান্টিসিজম। কিন্তু এই সংজ্ঞার ভেতর তাকে সম্পূর্ণ বন্দি করা যায় না। কারণ রোমান্টিকতা একই সঙ্গে ইতিহাসের একটি আন্দোলন এবং মানুষের চেতনার একটি স্থায়ী প্রবণতা। একদিকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলি, কিটস, বায়রন, নোভালিস, হোল্ডারলিন, গ্যেটে; অন্যদিকে ডেলাক্রোয়া, ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডরিখ, টার্নার কিংবা গোয়ার ছবিতে তার ঐতিহাসিক প্রকাশ— কিন্তু তার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাটি আরও প্রাচীন, আরও বিস্তৃত। কালিদাসের মেঘদূত-এ বিরহী যক্ষ যখন মেঘকে দূত করে প্রিয়ার কাছে পাঠায়, কিংবা বৈষ্ণব পদাবলির রাধা যখন অনুপস্থিত কৃষ্ণের মধ্যেই তাঁর সর্বাধিক উপস্থিতি অনুভব করেন, তখন আধুনিক ইউরোপীয় রোমান্টিসিজমের বহু শতাব্দী আগেই মানবমনের সেই একই আকাঙ্ক্ষা কথা বলে— যেখানে অনুপস্থিতিই উপস্থিতির চেয়ে গভীর, বিরহ মিলনের চেয়ে নান্দনিকভাবে অধিক তীব্র।
রোমান্টিকতার আবির্ভাবের পেছনে ছিল সভ্যতার একটি গভীর দ্বন্দ্ব। আলোকায়ন মানুষকে বলেছিল— জানো, যুক্তি দিয়ে বিচার করো, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করো। রোমান্টিকতা এসে যেন বলল— জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, বিস্মিত হতেও শেখো। প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করতে পারা মানেই তাকে অনুভব করা নয়। একটি ফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় জানা যায়; কিন্তু শিশিরভেজা ভোরে সেই ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতার কোনো বৈজ্ঞানিক সমীকরণ নেই। এখানেই রোমান্টিকতা যুক্তিকে অস্বীকার না করেও যুক্তির সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। ইমানুয়েল কান্টের ‘সাবলাইম’ বা মহিমান্বিতের ধারণা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সৌন্দর্য যেখানে আমাদের আনন্দ দেয়, মহিমান্বিত সেখানে একই সঙ্গে আকর্ষণ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে— উত্তাল সমুদ্র, সীমাহীন আকাশ, দুর্দম ঝড়, অতিকায় পর্বতশ্রেণি আমাদের ক্ষুদ্রতার বোধ জাগায়, অথচ সেই ক্ষুদ্রতার মধ্যেই মানুষ আবিষ্কার করে নিজের কল্পনার অসীম ক্ষমতা। রোমান্টিক শিল্পে প্রকৃতি তাই নিছক দৃশ্যপট নয়; সে মানুষের আত্মার প্রতিপক্ষ, প্রতিধ্বনি এবং কখনো তারই মহাজাগতিক সম্প্রসারণ।
ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডরিখের Wanderer above the Sea of Fog ছবিটির দিকে তাকালে রোমান্টিকতার এই দর্শন প্রায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একজন মানুষ পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন পাহাড়চূড়ায়; তাঁর সামনে কুয়াশায় ঢাকা অনির্ণেয় ভূদৃশ্য। আমরা তাঁর মুখ দেখি না, কারণ মুখটি এখানে জরুরি নয়; জরুরি তাঁর দৃষ্টি এবং তাঁর সামনে উন্মুক্ত অসীম। দর্শকও যেন তাঁর সঙ্গে সেই অজানার দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটি প্রকৃতিকে জয় করেননি; বরং প্রকৃতির অসীমতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রহস্যকেই প্রত্যক্ষ করছেন। টার্নারের ঝড়, সমুদ্র, আগুন ও আলোর ছবিতে প্রকৃতি আরও অস্থির— আকার যেন রঙের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে যায়। Snow Storm: Steam-Boat off a HarbourÕs Mouth-এ সভ্যতার যন্ত্র— স্টিমবোট— প্রকৃতির ঘূর্ণির মধ্যে প্রায় বিলীন। শিল্পবিপ্লব মানুষকে যন্ত্র দিয়েছে, কিন্তু টার্নারের ঝড় যেন প্রশ্ন করে: প্রকৃতির আদিম শক্তির সামনে সেই যন্ত্রের অহংকার কতটুকু?
এই প্রশ্নটিই ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় অন্যভাবে ফিরে আসে। তাঁর কাছে প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্যের উৎস নয়, মানুষের নৈতিক ও আত্মিক শিক্ষার ক্ষেত্র। Tintern Abbey-তে বহু বছর পর পরিচিত প্রকৃতির কাছে ফিরে এসে কবি বুঝতে পারেন, শৈশবের উচ্ছ্বাস বদলে গেছে এক গভীরতর অন্তর্দৃষ্টিতে। প্রকৃতি তাঁর কাছে হয়ে ওঠে এমন এক উপস্থিতি যা দৃশ্যমান বস্তুসমূহের গভীরে প্রবাহিত। তাঁর কবিতায় সাধারণ গ্রাম্য মানুষ, শিশু, পথ, পাহাড়, ড্যাফোডিল— সব কিছুই কাব্যের বিষয় হতে পারে। এর মধ্যেই ছিল একটি নন্দনতাত্ত্বিক গণতন্ত্র। নব্যধ্রুপদী সাহিত্য যেখানে মহৎ বিষয় ও অলংকৃত ভাষার প্রতি আকৃষ্ট, সেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতাকে ফিরিয়ে আনলেন মানুষের দৈনন্দিন ভাষা ও সাধারণ জীবনের কাছে। কিন্তু এই ‘সাধারণ’ কখনোই তুচ্ছ নয়; কল্পনার স্পর্শে সাধারণই অসাধারণ হয়ে ওঠে।
কোলরিজ আবার রোমান্টিকতার অন্য দরজা খুললেন— স্বপ্ন, অতিপ্রাকৃত, অবচেতন ও রহস্যের দরজা। The Rime of the Ancient Mariner কিংবা Kubla Khan-এ বাস্তবতা স্বপ্নের সীমান্তে এসে ভেঙে পড়ে। রোমান্টিক কল্পনা এখানে বাস্তবের প্রতিলিপিকার নয়, নতুন বাস্তবতার স্রষ্টা। কোলরিজের ‘প্রাইমারি ইমাজিনেশন’ ও ‘সেকেন্ডারি ইমাজিনেশন’-এর তত্ত্ব তাই গুরুত্বপূর্ণ: কল্পনা কেবল সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নয়, বিচ্ছিন্ন জগতকে নতুন ঐক্যে নির্মাণের সৃজনশক্তি। এই ধারণা রোমান্টিক নন্দনতত্ত্বের কেন্দ্রে শিল্পীর মর্যাদাই বদলে দেয়। শিল্পী আর কারিগর নন; তিনি এক অর্থে স্রষ্টা— যিনি বাস্তবের উপাদানকে পুনর্বিন্যস্ত করে এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন, যা আগে ছিল না।
শেলির কাছে এই কল্পনা আরও রাজনৈতিক। ‘আ ডিফেন্স অফ পোয়েট্রি’তে কবির কল্পনাশক্তি নৈতিক সহমর্মিতার সঙ্গে যুক্ত; মানুষ নিজের সত্তার সীমানা অতিক্রম করে অন্যের অনুভূতির মধ্যে প্রবেশ করতে শেখে কল্পনার মাধ্যমেই। তাঁর ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’-এর পশ্চিমা বাতাস একই সঙ্গে ধ্বংসকারী ও সংরক্ষক— মৃত পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়, আবার নতুন বীজকে ভবিষ্যতের জন্য বহন করে। রোমান্টিকতা তাই কেবল চাঁদের আলোয় প্রেম কিংবা ব্যক্তিগত বিষণ্নতার নাম নয়; তার মধ্যে বিপ্লবের আগুনও রয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের স্বপ্ন ইউরোপীয় রোমান্টিকদের গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। বায়রনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও আত্মবিনাশী নায়ক তাই রোমান্টিকতার আরেক মুখ। ‘বায়রনিক হিরো’ সামাজিক বিধির সঙ্গে আপস করে না; সে নিঃসঙ্গ, অহংকারী, আহত, বিদ্রোহী এবং নিজের ধ্বংসের মধ্যেও স্বাধীন।
ডেলাক্রোয়ার ‘লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল’ যেন সেই রোমান্টিক বিদ্রোহের রঙিন বিস্ফোরণ। ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে স্বাধীনতা এগিয়ে চলেছে; চারপাশে মৃতদেহ, ধোঁয়া, অস্ত্র, বিপ্লবী জনতা। এখানে সৌন্দর্য আর নিস্পৃহ নয়; সে রক্তাক্ত, রাজনৈতিক, ইতিহাসের ভেতর সক্রিয়। আবার গোয়ার ‘দ্য থার্ড অফ মে ১৮০৮’-এ রোমান্টিকতার অন্ধকার মুখ— যুদ্ধ, মৃত্যু, রাষ্ট্রের নির্মমতা। সাদা পোশাকের অসহায় মানুষটি হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে; বন্দুকের সারি তার দিকে তাক করা। যুক্তিবাদী সভ্যতার অগ্রগতির আড়ালে যে বর্বরতা রয়ে যায়, রোমান্টিক শিল্প সেই অন্ধকারকে উন্মোচিত করে।
কিটসের কাছে অবশ্য বিপ্লবের ভাষা বদলে যায় সৌন্দর্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষায়। তাঁর পৃথিবী স্পর্শ, ঘ্রাণ, রং, সংগীত ও মৃত্যুচেতনার পৃথিবী। ‘ওড টু আ নাইটিঙ্গেল’-এ নাইটিঙ্গেলের গান মানুষের ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বের বিপরীতে যেন অমর শিল্পের প্রতীক। ‘ওড অন আ গ্রেশিয়ান আর্ন’-এ স্থির শিল্পের ভেতর জমে থাকা প্রেম কখনো পূর্ণ হবে না, কিন্তু সেই অপূর্ণতার কারণেই তা অনন্ত। এখানেই রোমান্টিকতার এক গভীর প্যারাডক্স— সে পূর্ণতা চায়, অথচ তার শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য জন্মায় অপূর্ণতা থেকে। যে প্রেম পাওয়া হয়ে গেছে তার চেয়ে যে প্রেম পাওয়া যায়নি, যে দেশ ছেড়ে আসা হয়েছে তার চেয়ে স্মৃতির দেশ, যে মুখ হারিয়ে গেছে তার চেয়ে স্মৃতিতে ফিরে আসা মুখ— রোমান্টিক কল্পনায় প্রায়ই অধিক দীপ্তিমান।
জার্মান রোমান্টিক নোভালিসের বিখ্যাত নীল ফুল এই অনন্ত আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক। জার্মান ভাষায় ‘জেনজুখ্ট’— এমন এক আকুলতা যার নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। মানুষ জানে না সে ঠিক কী চায়, শুধু জানে বর্তমান পৃথিবী যথেষ্ট নয়। এই অতৃপ্তিই রোমান্টিকতার অস্তিত্ববাদী গভীরতা। মানুষ সসীম অথচ অসীমকে কামনা করে; নশ্বর অথচ অমরতার স্বপ্ন দেখে; একা অথচ পরম সংযোগের জন্য ব্যাকুল। পরবর্তী কালে কিয়ের্কেগার্দের উদ্বেগ, নীৎশের আত্মোত্তরণ কিংবা অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতার অনেক দূরবর্তী পূর্বাভাস রোমান্টিক আত্মসচেতনতায় খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিকতা এসেছে ইউরোপীয় প্রভাবের মধ্য দিয়ে, কিন্তু তার শিকড় মিশেছে আরও পুরোনো দেশীয় রসধারায়। বৈষ্ণব পদাবলির বিরহ, মঙ্গলকাব্যের কল্পলোক, মধ্যযুগীয় প্রেমকাব্য, কালিদাসীয় প্রকৃতি-সংবেদন— সব মিলিয়ে বাংলা রোমান্টিকতার ভূমি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য সরাসরি রোমান্টিক কাব্য না হলেও তার বিদ্রোহী পুনর্নির্মাণে রোমান্টিক চেতনার প্রবল স্ফুরণ রয়েছে। প্রচলিত নৈতিকতার বিপরীতে পরাজিত মেঘনাদকে মহিমান্বিত করে তোলা— এ যেন ইতিহাসের বিজয়ীর বদলে পরাজিতের ট্র্যাজিক মহত্ত্ব আবিষ্কার। রোমান্টিকতা প্রায়ই পরাজিত, নির্বাসিত ও সমাজের প্রান্তবর্তী মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট; কারণ প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির মধ্যেই সে স্বাধীনতার সম্ভাবনা দেখে।
রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা আরও জটিল। তাঁকে শুধু রোমান্টিক কবি বললে তাঁর বিশাল শিল্পজগৎকে সংকুচিত করা হবে, কিন্তু তাঁর কবিতার গভীরে প্রকৃতি, প্রেম, অসীম, মানবাত্মা ও বিশ্বসত্তার যে সংলাপ, তার সঙ্গে রোমান্টিক নন্দনবোধের নিবিড় আত্মীয়তা অস্বীকার করা যায় না। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এর বাঁধভাঙা আত্মপ্রকাশ, ‘সোনার তরী’র রহস্যময় প্রাপ্তি ও হারানো, ‘বলাকা’র গতি কিংবা ‘গীতাঞ্জলি’-র সসীম থেকে অসীমের অভিসার— সবখানেই দৃশ্যমান পৃথিবী তার দৃশ্যমানতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় রোমান্টিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ভারতীয় উপনিষদীয় বিশ্বাত্মবোধের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। তাঁর ‘আমি’ নিঃসঙ্গ দ্বীপ নয়; বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই সে বৃহত্তর আত্মপরিচয় পায়।
আর নজরুলের রোমান্টিকতা একই সঙ্গে প্রেম ও বিদ্রোহ। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’ কোনো শান্ত প্রকৃতিপ্রেমী সত্তা নয়; সে মহাবিশ্বের সমস্ত বিরোধকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে চায়— সৃষ্টি ও ধ্বংস, প্রেম ও ক্রোধ, কোমলতা ও প্রলয়। ইউরোপীয় রোমান্টিকতার বায়রনিক বিদ্রোহী সত্তার সঙ্গে এর আত্মীয়তা থাকলেও নজরুল তাকে ভারতীয় পুরাণ, ইসলামি ঐতিহ্য এবং উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহুস্বরিক ভাষায় রূপান্তরিত করেন। তাঁর প্রেমের কবিতাতেও প্রিয়তমা কখনো কেবল ব্যক্তি নয়; সৌন্দর্যের এমন এক অধরা প্রতিমা, যার দিকে কবির যাত্রা শেষ হয় না।
জীবনানন্দ দাশের কাছে এসে বাংলা রোমান্টিকতা এক অদ্ভুত গোধূলি অর্জন করে। তিনি আধুনিক কবি, তাঁর পৃথিবী যুদ্ধ, ইতিহাস, নগর-নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের ক্লান্তিতে পূর্ণ; তবু তাঁর কবিতার বাংলার মাঠ, ধানসিঁড়ি, শঙ্খচিল, হিজল, বনলতা, শিশির ও নক্ষত্র যেন হারানো কোনো পৃথিবীর স্মৃতি। জীবনানন্দের প্রকৃতি ওয়ার্ডসওয়ার্থীয় প্রশান্ত আশ্রয় নয়; সেখানে মৃত্যু ও সৌন্দর্য পাশাপাশি হাঁটে। তাঁর রোমান্টিকতা তাই প্রত্যাবর্তনের অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা— এমন একটি বাংলায় ফিরে যাওয়ার বাসনা, যা হয়তো বাস্তবে কখনোই ছিল না। স্মৃতি এখানে বাস্তবের অনুলিপি নয়; স্মৃতি নিজেই নতুন করে এক মহাপৃথিবী পুনর্নির্মাণ করে। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতার ভেতরে হারানো সম্পূর্ণতার এই আকাঙ্ক্ষাই জীবনানন্দকে একদিকে আধুনিক, অন্যদিকে গভীরভাবে উত্তর-রোমান্টিক করে তোলে।
বাংলার চিত্রকলাতেও রোমান্টিকতার স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রজগতে কুয়াশাময় রং, স্বপ্ন, স্মৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় কল্পনার সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর ভারতমাতা কেবল নারীমূর্তি নয়, একটি ভূখণ্ডের আবেগীয় প্রতিরূপ; আবার আরব্য রজনী সিরিজে বাস্তব কলকাতা ও কল্পনার প্রাচ্য রহস্য পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। নন্দলাল বসুর প্রকৃতিচিত্রে দেশজ ভূদৃশ্য নিছক অনুকরণ নয়— প্রকৃতি সেখানে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের ছবিগুলো রোমান্টিকতার আরেক গোপন অঞ্চল উন্মুক্ত করে: মুখোশ, অন্ধকার মুখ, অদ্ভুত প্রাণি, অনির্ণেয় ভূদৃশ্য— যেন অবচেতনের অরণ্য। এখানে সৌন্দর্য আর সুন্দর মাত্র নয়; অস্বস্তিকর, রহস্যময় এবং কখনো বিকৃতও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
রোমান্টিকতার একটি বড় অবদান এখানেই— সৌন্দর্যের ধারণাকে সে শৃঙ্খলিত সামঞ্জস্য থেকে মুক্ত করে। এডমন্ড বার্ক ও কান্টের ‘সাবলাইম’ ধারণায় যেমন দেখা যায়, নান্দনিক অভিজ্ঞতা শুধু কোমল আনন্দ নয়; ভয়, বিপুলতা, অন্ধকার, অসীমতাও নন্দনের উৎস হতে পারে। ঝড় সুন্দর হতে পারে, ধ্বংসস্তূপ সুন্দর হতে পারে, মধ্যরাতের নির্জন দুর্গ সুন্দর হতে পারে, এমনকি বিষাদও নান্দনিক হয়ে উঠতে পারে। এখান থেকেই গথিক সাহিত্য, রহস্য, অতিপ্রাকৃত এবং পরবর্তী কালের ডার্ক রোমান্টিসিজমের পথ খুলে যায়। মেরি শেলির Frankenstein রোমান্টিকতার এই অন্ধকার আত্মসমালোচনার অসাধারণ দৃষ্টান্ত। মানুষ জ্ঞানের শক্তিতে জীবন সৃষ্টি করতে চায়, কিন্তু নিজের সৃষ্টির নৈতিক দায় বহন করতে ব্যর্থ হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অহংকারের বিরুদ্ধে উপন্যাসটির প্রশ্ন আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও আশ্চর্যভাবে প্রাসঙ্গিক: আমরা যা সৃষ্টি করতে সক্ষম, তা সৃষ্টি করা কি সবসময় উচিত?
এ কারণেই রোমান্টিকতা অতীতের মৃত অধ্যায় নয়। ডিজিটাল সভ্যতার এই সময়ে বরং তার প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে এসেছে। আমাদের হাতে এখন পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দৃশ্যের ছবি আছে, অথচ একটি দৃশ্যের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর ধৈর্য কমেছে; অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সংযোগ আছে, অথচ নিঃসঙ্গতা কমেনি; অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ অনুমান করতে পারে, কিন্তু আমাদের অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষার ভাষা কি সে জানে? রোমান্টিকতা এই প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমানের কাছে পুরোনো প্রশ্নটি আবার রাখে— মানুষ কি কেবল তথ্যপ্রক্রিয়াকারী প্রাণি? মানুষের এমন কিছু কি নেই যা পরিমাপ, গণনা ও পূর্বাভাসের বাইরে থেকে যায়— স্বপ্ন, বিস্ময়, স্মৃতি, প্রেম, বিষাদ, কল্পনা, অকারণ আনন্দ, অজ্ঞাতের জন্য আকুলতা?
অবশ্য রোমান্টিকতার বিপদও রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কখনো আত্মমুগ্ধতায় পরিণত হতে পারে; অতীতের প্রতি আকর্ষণ প্রতিক্রিয়াশীল নস্টালজিয়ায়, জাতীয় কল্পনা উগ্র জাতীয়তাবাদে, প্রকৃতির আদর্শায়ন বাস্তব সামাজিক সংকট থেকে পলায়নে রূপ নিতে পারে। প্রেমের রোমান্টিকীকরণ বাস্তব সম্পর্কের জটিলতাকে আড়াল করতে পারে। তাই রোমান্টিকতার নন্দনকে গ্রহণ করতে হলে তার সমালোচনাও জরুরি। শিল্পের কাজ বাস্তব থেকে শুধু পালিয়ে যাওয়া নয়; কখনো কল্পনার অন্য বাস্তব নির্মাণের মধ্য দিয়েই বর্তমান বাস্তবকে প্রশ্ন করা। শেলি, বায়রন, ডেলাক্রোয়া কিংবা নজরুলের রোমান্টিকতা তাই পলায়ন নয়— প্রতিরোধের ভাষা।
শেষ পর্যন্ত রোমান্টিকতার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এই যে মানুষ তার প্রাপ্ত পৃথিবীর মধ্যে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারে না। তার ভেতরে সবসময় আরেকটি পৃথিবীর ক্ষুধা থাকে। সেই পৃথিবী কখনো প্রেমিকার চোখে, কখনো পাহাড়ের ওপারের কুয়াশায়, কখনো বিপ্লবের পতাকায়, কখনো হারানো শৈশবের গ্রামে, কখনো কবিতার অসমাপ্ত পঙ্ক্তিতে, কখনো ছবির অন্ধকার আকাশে দেখা দেয়। আমরা তাকে স্পর্শ করতে গেলেই সে আরও দূরে সরে যায়। কিন্তু সেই দূরত্বই আমাদের যাত্রাকে সম্ভব করে।
হয়তো এ কারণেই রোমান্টিক মানুষ জানে— পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর সবকটি আমাদের অধিকারে আসে না। কিছু সৌন্দর্যকে দূর থেকেই দেখতে হয়; কিছু প্রেম পূর্ণ না হয়েও জীবনব্যাপী থেকে যায়; কিছু পথের কোনো গন্তব্য নেই, তবু সেই পথেই হাঁটতে ইচ্ছে করে; কিছু নক্ষত্রে কোনোদিন পৌঁছানো যাবে না জেনেও মানুষ রাতের আকাশে তাকায়। যুক্তি তাকে বলে— ওখানে কেবল অগ্নিগোলক; কল্পনা বলে— ওই আলোয় হয়তো আমার হারানো কোনো স্বপ্নের ঠিকানা আছে। এই দুই বাক্যের মাঝখানেই রোমান্টিকতার বাস।
সভ্যতা যতই যন্ত্রনির্ভর হোক, মানুষ যতই তথ্যের নাগরিক হয়ে উঠুক, যতদিন কোনো বৃষ্টির রাতে অকারণে কারও পুরোনো মুখ মনে পড়বে, যতদিন দূরের পাহাড় দেখে মনে হবে তার ওপারে অন্য কোনো জীবন অপেক্ষা করছে, যতদিন কোনো কবিতার একটি পঙ্ক্তি আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে মুহূর্তের জন্য অপরিচিত করে তুলবে, কিংবা কোনো চিত্রের অসীম আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতার মধ্যেও এক অজ্ঞাত মহিমা অনুভব করবে— ততদিন রোমান্টিকতা শেষ হবে না। কারণ রোমান্টিকতা কোনো বিশেষ যুগের নামমাত্র নয়; এটি মানুষের সেই অনিবার্য ব্যাকুলতার নাম, যা দৃশ্যমানের ভেতরে অদৃশ্যকে, সসীমের মধ্যে অসীমকে, প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিকে এবং বাস্তবতার কঠিন ভূমির নিচে এখনো স্পন্দিত কোনো স্বপ্নের ভূগর্ভস্থ নদীকেই খুঁজে ফেরে। ক্রমশ...
***

আপনার মতামত লিখুন