সংবাদ

ছোটগল্প

বিফোর মেমোরি এন্ডস


দীপু মাহমুদ
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ এএম

বিফোর মেমোরি এন্ডস
ছবিসূত্র : ইন্টারনেট

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। ইশতিয়াক মঈন কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তার বয়স হয়েছে পঁয়ষট্টি বছর। মাথার চুল বেশিরভাগ সাদা হয়ে গেছে। পাতলা ফ্রেমের চশমার ওপাশে দুটো শান্ত চোখ। তাকেও দেখাচ্ছে গাছের মতো স্থির। 

শহরের শেষ প্রান্তে প্রবীণ নিবাস। নাম ঘাসফড়িং। প্রবীণ নিবাসের নাম শুনলে মনে হয় এখানে সবাই সব সময় হাসিখুশি থাকেন। ভেতরে এলে দেখা যায়, কেউ খুব জোরে হাসেন না। সবাই আস্তে কথা বলেন। ধীরে হাঁটেন। এখানে সকলেই যেন রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় আটকে আছেন, “মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।”

ইশতিয়াক প্রবীণ নিবাসে আছেন দেড় বছর হলো। তার প্রতিদিনের রুটিন সাজানো। ভোরে হাঁটেন। সকালে বই পড়েন। দুপুরে একটুখানি ঘুম। বিকেলে কদমগাছের নিচে এসে বসা। রাতে ডায়েরি লেখেন।

রাত আটটার সময়ের ঘটনা অন্য রকম। তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। আলমারি থেকে পুরোনো একখানা ডায়েরি বের করেন। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পড়েন। তারপর নতুন ডায়েরিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখতে থাকেন।

প্রবীণ নিবাসের সুপারভাইজার ফারজানা অতিকৌতূহলে জানতে চাইলেন, “স্যার, এত কী লেখেন?”

ইশতিয়াক হাসি মুখে বললেন, “যারা হারিয়ে যায়, তাদেরও কোথাও বেঁচে থাকতে হয়। সেসবই লিখি।”

ফারজানা আর কিছু বললেন না। তার মনে হলো বয়স্ক এই মানুষ কবি হতে পারেন। তার কথায় ভাব আছে। ফারজানার ধারণা ঠিক। ইশতিয়াক বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। কবিতাও লিখতেন। ছাত্ররা তার লেখা কবিতা মুখস্থ বলত। নতুন লেখা কবিতা শোনার জন্য বায়না ধরত।

এখানে আসার পর বহুদিন বাদে আবার সেই ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে এখানে একজন স্বেচ্ছাসেবী আসে। নাম ঐশী। ইশতিয়াককে প্রথমদিন দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। মুগ্ধ চোখে বলল, “আপনি, কবি ইশতিয়াক মঈন!”

ইশতিয়াক হেসে বললেন, “এখনো কেউ এই নাম মনে রেখেছে!”

ঐশী বলল, “বাবা আপনার ছাত্র ছিলেন। আপনার কবিতা মুখস্থ বলতে পারেন।”

বলে ঐশী আবৃত্তি শুরু করল, “যে চলে যায়, সে সবসময় দূরে সরে যায় না।”

ইশতিয়াক হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “থাক, বাকিটা বোলো না।”

ঐশী অবাক হয়েছে। ইশতিয়াক নরম গলায় বললেন, “থাক না, অসমাপ্ত পড়া কিছু কবিতা।”

সেরাতে ডায়েরিতে ইশতিয়াক লিখলেন, “মানুষ কবিতা মনে রাখে। কবিতার ভেতরের মানুষকে মনে রাখে না।”

ইশতিয়াকের আলমারির একটা ড্রয়ার বন্ধ থাকে। সেই ড্রয়ার খুব কম খোলেন। তার ভেতরে রেখেছেন শুকনো কৃষ্ণচূড়া। নীল ফিতার টুকরো। সিনেমা আর বাসের টিকিট। একটা চিঠি। চিঠির শেষ লাইনে লেখা, “ভালো থেকো। আমাদের দেখা না হওয়াই ভালো।”

চিঠিতে নাম লেখা নেই। নাম ইশতিয়াক জানে। নিবেদিতা সেন। এই নাম তিনি উচ্চারণ করেন না। তার প্রথম ডায়েরির প্রথম পাতাতেও নামটা নেই। সেখানে লেখা, “১৭ জুলাই। আজ একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। বইয়ের ভেতর শুকনো কৃষ্ণচূড়া রেখে দিয়েছে। তাই দেখে অদ্ভুতভাবে আমার মনে হয়েছে, কিছু ফুল শুকিয়ে গেলেও মরে যায় না। আরও গভীর হয়ে যায়।”

সেদিনের পর থেকে ইশতিয়াক প্রত্যেকটা ডায়েরি সেই একজনকে নিয়েই লিখে গেছেন।


এক বৃহস্পতিবার দুপুরে নিবাসজুড়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততা দেখা গেল। নতুন বাসিন্দা আসছেন। তিনি একজন নারী। বয়স ষাট বছরের কাছাকাছি।

ইশতিয়াক শুনতে পেয়েছে ফারজানা কাউকে বলছেন, “ডাক্তার যা-যা লিখে দিয়েছেন, সব দেখে রাখবে।”

ঐশী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ওনার?”

ফারজানা বললেন, “আলঝেইমার। সঙ্গে ডিমেনশিয়াও আছে।”

গেটের সামনে সাদা অ্যাম্বুলেন্স এসে থেমেছে। দুজন সেবিকা একজন মহিলাকে ধরে নামাচ্ছে। মহিলা অবাক চোখে চারদিক দেখছেন। তিনি যেন পৃথিবীকে প্রথমবার দেখছেন। আবার মনে হচ্ছে, তিনি কিছু খুঁজছেন। কিন্তু কী খুঁজছেন, নিজেই জানেন না।

ইশতিয়াক কদমগাছের নিচ থেকে মহিলার দিকে তাকালেন। এক মুহূর্ত। তার বুকের ভেতর কোথাও যেন শব্দ হচ্ছে, ঢিপঢিপ। মনে হলো বুকের ভেতরের শব্দ বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে। তিনি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছেন। নড়তে পারছেন না।

মহিলাও আচমকা থেমে গেলেন। দূর থেকে ইশতিয়াকের দিকে তাকালেন। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। কেবল দ্বিধা। যেন এই মানুষকে কোথাও দেখেছেন। বহুদিন আগে। অন্য এক জীবনে।

ফারজানা এগিয়ে এসে বললেন, “স্যার, উনি আমাদের নতুন বাসিন্দা।”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। মহিলা তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ধীর পায়ে কাছে এগিয়ে এলেন। বিস্মিত চোখে বললেন, “আমাদের আগে কোথাও দেখা হয়েছে!”

ইশতিয়াকের ঠোঁট কেঁপে উঠল। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। মাথা নিচু করে ফেললেন। মনে হলো তিনি কেন জানি ভয় পাচ্ছেন।


পরের বৃহস্পতিবার। বিকেলের রোদ পুকুরের জলে নেমে থেমে আছে। বাতাসে শিউলিফুলের গন্ধ। ইশতিয়াক বেঞ্চে বসে আছেন। হাতে ডায়েরি। করিডোরের মাথায় হালকা ঘিয়ে রঙের শাল জড়িয়ে একজন নারী ধীর পায়ে হাঁটছেন। পাশে নার্স। ইশতিয়াক উঠে দাঁড়িয়েছেন। নার্স এগিয়ে এসে বলল, “ভালো লাগছে বললেন। বাইরে বসতে চাইলেন।”

তিনি এসে বেঞ্চের অন্যপাশে বসলেন। ইশতিয়াক খুব আস্তে করে বললেন, “আজ কেমন বোধ করছেন?”

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “আমাকে কি আপনি চেনেন?”

“জানি না। তবে মনে হয় অনেকদিন ধরে চিনি।”

তিনি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমার নাম কী?”

নার্স বলল, “নিবেদিতা।”

নিবেদিতা নাম যেন প্রথমবার শুনছেন এমনভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, “নি-বে-দি-তা!”

বলেই শিশুর মতো হেসে ফেললেন। ইশতিয়াক হাসলেন না। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলেন। এই হাসি তার অতিপরিচিত। তিনি দেখেছেন। বহু বছর আগে। কলেজের বারান্দায়। কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে। নদীর ঘাটে। সেই একই হাসি। শুধু ভুলে গেছে সে একদিন এমন মন খুলে হাসত।

এখন প্রতিদিন বিকেলে তারা পুকুরপাড়ে বসেন। দুজনের কথা খুব কম হয়। ইশতিয়াক নিজে থেকে গল্প বলেন। একদিন বললেন, “একজন সুন্দর মানুষ ছিল। সে বইয়ের ভেতর শুকনো ফুল রেখে দিত।”

নিবেদিতা বললেন, “আমিও কি কখনো শুকনো ফুল রেখে দিয়েছি বইয়ের ভেতর!”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। পরদিন নিয়ে এলেন ছোট একখানা বাক্স। চুপচাপ বসে আছেন। নিবেদিতা বললেন, “গল্প বলবেন না?”

ইশতিয়াক বললেন, “আজ গল্পের জিনিস দেখাব।”

বাক্স খুলে বের করলেন শুকনো কৃষ্ণচূড়া। নীল ফিতা। পুরোনো সিনেমার টিকিট। কালো ফাউন্টেন পেন। আর একটা সাদা-কালো ছবি।

নিবেদিতা ছবিটা হাতে নিয়েছেন। খানিক সময় ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ছবিতে একজন তরুণ শিক্ষক। তার পাশে এক তরুণী। দুজনই হাসছেন।

নিবেদিতার চোখ জলে ভিজে উঠেছে। ছবির মেয়ের মুখে আলতো করে আঙুল রেখে বললেন, “এই মেয়েটা!”

আগ্রহ নিয়ে ইশতিয়াক বললেন, “চেনা লাগছে?”

চোখ মুছে নিবেদিতা বললেন, “জানি না!”

বলে অনিশ্চিত গলায় বললেন, “আমার মাথার ভেতর খারাপ লাগছে!”


রাতে ডায়েরিতে ইশতিয়াক লিখলেন, “তোমার হাতে ছবিটা দিলাম। নিজের মুখ চিনতে পারলে না। কিন্তু কী আশ্চর্য! ছবি দেখে তোমার চোখ ভিজে উঠেছিল।”

ইশতিয়াক বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। সেখানে কদমগাছ। তার মনে হলো, কোনো কোনো মানুষ গাছের মতো। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। বছরের পর বছর কারও প্রতীক্ষা করে।


ডিসেম্বরের শেষ বিকেল। ঘাসফড়িং নিবাসের পুকুরপাড়ে কুয়াশা যেন আগে নেমেছে। ইশতিয়াক আর নিবেদিতা বেঞ্চে বসে আছেন। ইশতিয়াকের হাতে ডায়েরি। নিবেদিতাকে অস্বাভাবিক নীরব দেখাচ্ছে।

ইশতিয়াক ডায়েরি থেকে পড়ছেন, “নদীর ধারে বসে তুমি বললে, যদি কোনোদিন তোমাকে ভুলে যাই!”

নিবেদিতা গভীর গলায় বলে উঠলেন, “নদী!”

আদর মেশানো গলায় ইশতিয়াক বললেন, “কোন নদী?”

নিবেদিতা নিজের কপালে আঙুল ছুঁয়ে বললেন, “জানি না। তবে আমরা নৌকায় উঠেছিলাম।”

ইশতিয়াকের বুকে অমনি দুম করে ধাক্কার মতো লেগেছে। তিনি ডায়েরির লেখার দিকে তাকিয়ে আছেন। লম্বাশ্বাস নিয়ে পড়লেন, “ফেরার সময় মাঝি বলল, নদী খুব শান্ত।”

নিবেদিতা খিলখিল করে হেসে উঠেছেন। হাসতে হাসতে বললেন, “আমি ঠিক বলেছি!”

ইশতিয়াক কাঁপা গলায় বললেন, “একদম ঠিক। সেদিন ফিরতে আমাদের সন্ধে হয়ে গিয়েছিল।”


পরদিন ইশতিয়াক আরেকটা ছবি নিবেদিতাকে দেখতে দিলেন। অনেকটা সময় নিয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে নিবেদিতা বললেন, “মেয়েটা আমি! আর এই মানুষটা?”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। নিবেদিতা ছবির ওপর নরম আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বললেন, “ই-শ-তি-য়া-ক।”

ইশতিয়াকের চোখ উপচে জল চলে এসেছে। চল্লিশ বছরের প্রতীক্ষা এসে এক মুহূর্তে থমকে গেছে।

বুকের তল থেকে বাতাস টেনে এনে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে নিবেদিতা বললেন, “তুমি এতদিন কোথায় ছিলে!”

ইশতিয়াক ম্লান হাসলেন। সেই পুরোনো শান্ত হাসি। বললেন, “কোথাও যাইনি, দিতি। তোমার জন্য লেখা ডায়েরির ভেতরেই ছিলাম।”

অমনি নিবেদিতা দু-হাত বাড়িয়ে ইশতিয়াককে আঁকড়ে ধরলেন। বুজে আসা গলায় বললেন, “আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো, ইশতি। তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম।”

ইশতিয়াক শান্ত হেসে বললেন, “তুমি ইচ্ছে করে ভুলে যাওনি। প্রকৃতি তোমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।”

চারপাশ আবার নীরব হয়ে এলো।


পরদিন ভোরবেলা। নিবেদিতা এসে দাঁড়িয়েছেন ইশতিয়াকের ঘরের দরজায়। ইশতিয়াক দরজা খুলতেই নিবেদিতা হালকা হেসে বললেন, “তোমাকে চিনতে পেরে ভালো লাগছে। ভাবলাম, তুমি ঘর থেকে বেরুনোর আগেই চলে আসি।”

নিবেদিতা ঘরে ঢুকলেন। ইশতিয়াক অনেকগুলো ডায়েরি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখলেন। তানিয়া বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন, “এতগুলো!”

“চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়।”

“সব আমার কথা!”

“সব তোমাকে নিয়ে।”

নিবেদিতা একটা ডায়েরি তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ফিসফিস করে বললেন, “আমরা কি খুব দেরি করে ফেললাম!”

শান্ত গলায় ইশতিয়াক বললেন, “না দিতি, ভালোবাসা কখনো দেরি করে ফেলে না।”

দরজায় কেউ নক করেছেন। ফারজানা এসেছেন। তার পাশে মধ্যবয়সী একজন মানুষ। শীতল গলায় বলল, “অদ্রি আমি। নিবেদিতা সেনের ছেলে।”

নিবেদিতা ছেলের দিকে তাকালেন। মাথা ঘুরিয়ে অনিরুদ্ধকে দেখলেন।

অদ্রি এগিয়ে এসে বলল, “মা, বাড়ি চলো।”

বিস্মিত গলায় নিবেদিতা বললেন, “ইশতিয়াক!”

ইশতিয়াক বললেন, “বাড়ি যাও, দিতি।”

নিবেদিতা অসহিষ্ণু গলায় বললেন, “তুমি যাবে না!”

শুকনো হেসে ইশতিয়াক বললেন, “এটাই আমার বাড়ি।”

নিবেদিতা বললেন, “তোমার একখানা ডায়েরি নিতে চাই।”

ইশতিয়াক সবগুলো ডায়েরি গুছিয়ে নিবেদিতাকে দিয়ে বললেন, “সবগুলোই তোমার।”


সে রাতে ইশতিয়াক নতুন আরেকটা ডায়েরিতে লিখলেন, “আজ আমার ঘর খালি হয়ে গেল। এত বছর ধরে যে স্মৃতিগুলো পাহারা দিয়েছি, আজ সেগুলো তাদের মানুষের কাছে ফিরে গেছে। বুকের ভেতর আশ্চর্য রকমের হালকা বোধ হচ্ছে।”


শীত গিয়ে বসন্ত এলো। এক বিকেলে ঐশী এসে দেখে ইশতিয়াক কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। ঐশী জিজ্ঞেস করল, “গতরাতে কী লিখেছেন, স্যার?”

শান্ত গলায় ইশতিয়াক বললেন, “সব লেখা শেষ হয়ে গেছে।”

“লেখা কি কখনো শেষ হয়?”

“লেখা হয়তো শেষ হয় না। লেখক থেমে যায়।”

সে রাতে ঘুমের ভেতর ইশতিয়াক নিঃশব্দে চলে গেলেন। তার মুখে শান্ত হাসি। বিছানার পাশে খোলা ডায়েরি। শেষ পাতায় লেখা, “দিতি, কোনোদিন যদি আবার সব ভুলে যাও, তবু দুঃখ নেই। মানুষকে মনে রাখার দায় সবসময় মানুষের নয়। কখনো ভালোবাসাই স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে। আমি আর প্রতীক্ষা করছি না। প্রতীক্ষা শেষ হয়েছে। তুমি আরও একবার আমার নাম ধরে ডেকেছ। এক জীবন পার করার জন্য ওই একবারই যথেষ্ট।”


এক বছর পর। ঘাসফড়িং প্রবীণ নিবাসে কুরিয়ার এসেছে। ইশতিয়াকের ডায়েরিগুলো। সঙ্গে ছোট্ট চিঠি। নিবেদিতার মেয়ে লিখেছে, “মা আর নেই। ডায়েরিগুলো দিয়ে দিলাম। এগুলো শুধু আমার মায়ের একার নয়। যে মানুষ কাউকে হারিয়েছে, কিংবা যাকে কেউ ভুলে গেছে— তাদের সকলের।”

ঘাসফড়িং নিবাসের আলমারিতে ডায়েরিগুলো আছে। নতুন কেউ এলে সেবিকারা ডায়েরি থেকে পড়ে শোনায়। সবাই গল্পের সব ঘটনা মনে রাখতে পারেন না। তবু গল্প শেষ হলে অনেকের চোখ ভিজে ওঠে।

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


বিফোর মেমোরি এন্ডস

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image


বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। ইশতিয়াক মঈন কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তার বয়স হয়েছে পঁয়ষট্টি বছর। মাথার চুল বেশিরভাগ সাদা হয়ে গেছে। পাতলা ফ্রেমের চশমার ওপাশে দুটো শান্ত চোখ। তাকেও দেখাচ্ছে গাছের মতো স্থির। 

শহরের শেষ প্রান্তে প্রবীণ নিবাস। নাম ঘাসফড়িং। প্রবীণ নিবাসের নাম শুনলে মনে হয় এখানে সবাই সব সময় হাসিখুশি থাকেন। ভেতরে এলে দেখা যায়, কেউ খুব জোরে হাসেন না। সবাই আস্তে কথা বলেন। ধীরে হাঁটেন। এখানে সকলেই যেন রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় আটকে আছেন, “মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।”

ইশতিয়াক প্রবীণ নিবাসে আছেন দেড় বছর হলো। তার প্রতিদিনের রুটিন সাজানো। ভোরে হাঁটেন। সকালে বই পড়েন। দুপুরে একটুখানি ঘুম। বিকেলে কদমগাছের নিচে এসে বসা। রাতে ডায়েরি লেখেন।

রাত আটটার সময়ের ঘটনা অন্য রকম। তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। আলমারি থেকে পুরোনো একখানা ডায়েরি বের করেন। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পড়েন। তারপর নতুন ডায়েরিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখতে থাকেন।

প্রবীণ নিবাসের সুপারভাইজার ফারজানা অতিকৌতূহলে জানতে চাইলেন, “স্যার, এত কী লেখেন?”

ইশতিয়াক হাসি মুখে বললেন, “যারা হারিয়ে যায়, তাদেরও কোথাও বেঁচে থাকতে হয়। সেসবই লিখি।”

ফারজানা আর কিছু বললেন না। তার মনে হলো বয়স্ক এই মানুষ কবি হতে পারেন। তার কথায় ভাব আছে। ফারজানার ধারণা ঠিক। ইশতিয়াক বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। কবিতাও লিখতেন। ছাত্ররা তার লেখা কবিতা মুখস্থ বলত। নতুন লেখা কবিতা শোনার জন্য বায়না ধরত।

এখানে আসার পর বহুদিন বাদে আবার সেই ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে এখানে একজন স্বেচ্ছাসেবী আসে। নাম ঐশী। ইশতিয়াককে প্রথমদিন দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। মুগ্ধ চোখে বলল, “আপনি, কবি ইশতিয়াক মঈন!”

ইশতিয়াক হেসে বললেন, “এখনো কেউ এই নাম মনে রেখেছে!”

ঐশী বলল, “বাবা আপনার ছাত্র ছিলেন। আপনার কবিতা মুখস্থ বলতে পারেন।”

বলে ঐশী আবৃত্তি শুরু করল, “যে চলে যায়, সে সবসময় দূরে সরে যায় না।”

ইশতিয়াক হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “থাক, বাকিটা বোলো না।”

ঐশী অবাক হয়েছে। ইশতিয়াক নরম গলায় বললেন, “থাক না, অসমাপ্ত পড়া কিছু কবিতা।”

সেরাতে ডায়েরিতে ইশতিয়াক লিখলেন, “মানুষ কবিতা মনে রাখে। কবিতার ভেতরের মানুষকে মনে রাখে না।”

ইশতিয়াকের আলমারির একটা ড্রয়ার বন্ধ থাকে। সেই ড্রয়ার খুব কম খোলেন। তার ভেতরে রেখেছেন শুকনো কৃষ্ণচূড়া। নীল ফিতার টুকরো। সিনেমা আর বাসের টিকিট। একটা চিঠি। চিঠির শেষ লাইনে লেখা, “ভালো থেকো। আমাদের দেখা না হওয়াই ভালো।”

চিঠিতে নাম লেখা নেই। নাম ইশতিয়াক জানে। নিবেদিতা সেন। এই নাম তিনি উচ্চারণ করেন না। তার প্রথম ডায়েরির প্রথম পাতাতেও নামটা নেই। সেখানে লেখা, “১৭ জুলাই। আজ একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। বইয়ের ভেতর শুকনো কৃষ্ণচূড়া রেখে দিয়েছে। তাই দেখে অদ্ভুতভাবে আমার মনে হয়েছে, কিছু ফুল শুকিয়ে গেলেও মরে যায় না। আরও গভীর হয়ে যায়।”

সেদিনের পর থেকে ইশতিয়াক প্রত্যেকটা ডায়েরি সেই একজনকে নিয়েই লিখে গেছেন।


এক বৃহস্পতিবার দুপুরে নিবাসজুড়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততা দেখা গেল। নতুন বাসিন্দা আসছেন। তিনি একজন নারী। বয়স ষাট বছরের কাছাকাছি।

ইশতিয়াক শুনতে পেয়েছে ফারজানা কাউকে বলছেন, “ডাক্তার যা-যা লিখে দিয়েছেন, সব দেখে রাখবে।”

ঐশী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ওনার?”

ফারজানা বললেন, “আলঝেইমার। সঙ্গে ডিমেনশিয়াও আছে।”

গেটের সামনে সাদা অ্যাম্বুলেন্স এসে থেমেছে। দুজন সেবিকা একজন মহিলাকে ধরে নামাচ্ছে। মহিলা অবাক চোখে চারদিক দেখছেন। তিনি যেন পৃথিবীকে প্রথমবার দেখছেন। আবার মনে হচ্ছে, তিনি কিছু খুঁজছেন। কিন্তু কী খুঁজছেন, নিজেই জানেন না।

ইশতিয়াক কদমগাছের নিচ থেকে মহিলার দিকে তাকালেন। এক মুহূর্ত। তার বুকের ভেতর কোথাও যেন শব্দ হচ্ছে, ঢিপঢিপ। মনে হলো বুকের ভেতরের শব্দ বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে। তিনি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছেন। নড়তে পারছেন না।

মহিলাও আচমকা থেমে গেলেন। দূর থেকে ইশতিয়াকের দিকে তাকালেন। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। কেবল দ্বিধা। যেন এই মানুষকে কোথাও দেখেছেন। বহুদিন আগে। অন্য এক জীবনে।

ফারজানা এগিয়ে এসে বললেন, “স্যার, উনি আমাদের নতুন বাসিন্দা।”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। মহিলা তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ধীর পায়ে কাছে এগিয়ে এলেন। বিস্মিত চোখে বললেন, “আমাদের আগে কোথাও দেখা হয়েছে!”

ইশতিয়াকের ঠোঁট কেঁপে উঠল। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। মাথা নিচু করে ফেললেন। মনে হলো তিনি কেন জানি ভয় পাচ্ছেন।


পরের বৃহস্পতিবার। বিকেলের রোদ পুকুরের জলে নেমে থেমে আছে। বাতাসে শিউলিফুলের গন্ধ। ইশতিয়াক বেঞ্চে বসে আছেন। হাতে ডায়েরি। করিডোরের মাথায় হালকা ঘিয়ে রঙের শাল জড়িয়ে একজন নারী ধীর পায়ে হাঁটছেন। পাশে নার্স। ইশতিয়াক উঠে দাঁড়িয়েছেন। নার্স এগিয়ে এসে বলল, “ভালো লাগছে বললেন। বাইরে বসতে চাইলেন।”

তিনি এসে বেঞ্চের অন্যপাশে বসলেন। ইশতিয়াক খুব আস্তে করে বললেন, “আজ কেমন বোধ করছেন?”

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “আমাকে কি আপনি চেনেন?”

“জানি না। তবে মনে হয় অনেকদিন ধরে চিনি।”

তিনি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমার নাম কী?”

নার্স বলল, “নিবেদিতা।”

নিবেদিতা নাম যেন প্রথমবার শুনছেন এমনভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, “নি-বে-দি-তা!”

বলেই শিশুর মতো হেসে ফেললেন। ইশতিয়াক হাসলেন না। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলেন। এই হাসি তার অতিপরিচিত। তিনি দেখেছেন। বহু বছর আগে। কলেজের বারান্দায়। কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে। নদীর ঘাটে। সেই একই হাসি। শুধু ভুলে গেছে সে একদিন এমন মন খুলে হাসত।

এখন প্রতিদিন বিকেলে তারা পুকুরপাড়ে বসেন। দুজনের কথা খুব কম হয়। ইশতিয়াক নিজে থেকে গল্প বলেন। একদিন বললেন, “একজন সুন্দর মানুষ ছিল। সে বইয়ের ভেতর শুকনো ফুল রেখে দিত।”

নিবেদিতা বললেন, “আমিও কি কখনো শুকনো ফুল রেখে দিয়েছি বইয়ের ভেতর!”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। পরদিন নিয়ে এলেন ছোট একখানা বাক্স। চুপচাপ বসে আছেন। নিবেদিতা বললেন, “গল্প বলবেন না?”

ইশতিয়াক বললেন, “আজ গল্পের জিনিস দেখাব।”

বাক্স খুলে বের করলেন শুকনো কৃষ্ণচূড়া। নীল ফিতা। পুরোনো সিনেমার টিকিট। কালো ফাউন্টেন পেন। আর একটা সাদা-কালো ছবি।

নিবেদিতা ছবিটা হাতে নিয়েছেন। খানিক সময় ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ছবিতে একজন তরুণ শিক্ষক। তার পাশে এক তরুণী। দুজনই হাসছেন।

নিবেদিতার চোখ জলে ভিজে উঠেছে। ছবির মেয়ের মুখে আলতো করে আঙুল রেখে বললেন, “এই মেয়েটা!”

আগ্রহ নিয়ে ইশতিয়াক বললেন, “চেনা লাগছে?”

চোখ মুছে নিবেদিতা বললেন, “জানি না!”

বলে অনিশ্চিত গলায় বললেন, “আমার মাথার ভেতর খারাপ লাগছে!”


রাতে ডায়েরিতে ইশতিয়াক লিখলেন, “তোমার হাতে ছবিটা দিলাম। নিজের মুখ চিনতে পারলে না। কিন্তু কী আশ্চর্য! ছবি দেখে তোমার চোখ ভিজে উঠেছিল।”

ইশতিয়াক বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। সেখানে কদমগাছ। তার মনে হলো, কোনো কোনো মানুষ গাছের মতো। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। বছরের পর বছর কারও প্রতীক্ষা করে।


ডিসেম্বরের শেষ বিকেল। ঘাসফড়িং নিবাসের পুকুরপাড়ে কুয়াশা যেন আগে নেমেছে। ইশতিয়াক আর নিবেদিতা বেঞ্চে বসে আছেন। ইশতিয়াকের হাতে ডায়েরি। নিবেদিতাকে অস্বাভাবিক নীরব দেখাচ্ছে।

ইশতিয়াক ডায়েরি থেকে পড়ছেন, “নদীর ধারে বসে তুমি বললে, যদি কোনোদিন তোমাকে ভুলে যাই!”

নিবেদিতা গভীর গলায় বলে উঠলেন, “নদী!”

আদর মেশানো গলায় ইশতিয়াক বললেন, “কোন নদী?”

নিবেদিতা নিজের কপালে আঙুল ছুঁয়ে বললেন, “জানি না। তবে আমরা নৌকায় উঠেছিলাম।”

ইশতিয়াকের বুকে অমনি দুম করে ধাক্কার মতো লেগেছে। তিনি ডায়েরির লেখার দিকে তাকিয়ে আছেন। লম্বাশ্বাস নিয়ে পড়লেন, “ফেরার সময় মাঝি বলল, নদী খুব শান্ত।”

নিবেদিতা খিলখিল করে হেসে উঠেছেন। হাসতে হাসতে বললেন, “আমি ঠিক বলেছি!”

ইশতিয়াক কাঁপা গলায় বললেন, “একদম ঠিক। সেদিন ফিরতে আমাদের সন্ধে হয়ে গিয়েছিল।”


পরদিন ইশতিয়াক আরেকটা ছবি নিবেদিতাকে দেখতে দিলেন। অনেকটা সময় নিয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে নিবেদিতা বললেন, “মেয়েটা আমি! আর এই মানুষটা?”

ইশতিয়াক কিছু বললেন না। নিবেদিতা ছবির ওপর নরম আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বললেন, “ই-শ-তি-য়া-ক।”

ইশতিয়াকের চোখ উপচে জল চলে এসেছে। চল্লিশ বছরের প্রতীক্ষা এসে এক মুহূর্তে থমকে গেছে।

বুকের তল থেকে বাতাস টেনে এনে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে নিবেদিতা বললেন, “তুমি এতদিন কোথায় ছিলে!”

ইশতিয়াক ম্লান হাসলেন। সেই পুরোনো শান্ত হাসি। বললেন, “কোথাও যাইনি, দিতি। তোমার জন্য লেখা ডায়েরির ভেতরেই ছিলাম।”

অমনি নিবেদিতা দু-হাত বাড়িয়ে ইশতিয়াককে আঁকড়ে ধরলেন। বুজে আসা গলায় বললেন, “আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো, ইশতি। তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম।”

ইশতিয়াক শান্ত হেসে বললেন, “তুমি ইচ্ছে করে ভুলে যাওনি। প্রকৃতি তোমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।”

চারপাশ আবার নীরব হয়ে এলো।


পরদিন ভোরবেলা। নিবেদিতা এসে দাঁড়িয়েছেন ইশতিয়াকের ঘরের দরজায়। ইশতিয়াক দরজা খুলতেই নিবেদিতা হালকা হেসে বললেন, “তোমাকে চিনতে পেরে ভালো লাগছে। ভাবলাম, তুমি ঘর থেকে বেরুনোর আগেই চলে আসি।”

নিবেদিতা ঘরে ঢুকলেন। ইশতিয়াক অনেকগুলো ডায়েরি টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখলেন। তানিয়া বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন, “এতগুলো!”

“চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়।”

“সব আমার কথা!”

“সব তোমাকে নিয়ে।”

নিবেদিতা একটা ডায়েরি তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ফিসফিস করে বললেন, “আমরা কি খুব দেরি করে ফেললাম!”

শান্ত গলায় ইশতিয়াক বললেন, “না দিতি, ভালোবাসা কখনো দেরি করে ফেলে না।”

দরজায় কেউ নক করেছেন। ফারজানা এসেছেন। তার পাশে মধ্যবয়সী একজন মানুষ। শীতল গলায় বলল, “অদ্রি আমি। নিবেদিতা সেনের ছেলে।”

নিবেদিতা ছেলের দিকে তাকালেন। মাথা ঘুরিয়ে অনিরুদ্ধকে দেখলেন।

অদ্রি এগিয়ে এসে বলল, “মা, বাড়ি চলো।”

বিস্মিত গলায় নিবেদিতা বললেন, “ইশতিয়াক!”

ইশতিয়াক বললেন, “বাড়ি যাও, দিতি।”

নিবেদিতা অসহিষ্ণু গলায় বললেন, “তুমি যাবে না!”

শুকনো হেসে ইশতিয়াক বললেন, “এটাই আমার বাড়ি।”

নিবেদিতা বললেন, “তোমার একখানা ডায়েরি নিতে চাই।”

ইশতিয়াক সবগুলো ডায়েরি গুছিয়ে নিবেদিতাকে দিয়ে বললেন, “সবগুলোই তোমার।”


সে রাতে ইশতিয়াক নতুন আরেকটা ডায়েরিতে লিখলেন, “আজ আমার ঘর খালি হয়ে গেল। এত বছর ধরে যে স্মৃতিগুলো পাহারা দিয়েছি, আজ সেগুলো তাদের মানুষের কাছে ফিরে গেছে। বুকের ভেতর আশ্চর্য রকমের হালকা বোধ হচ্ছে।”


শীত গিয়ে বসন্ত এলো। এক বিকেলে ঐশী এসে দেখে ইশতিয়াক কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। ঐশী জিজ্ঞেস করল, “গতরাতে কী লিখেছেন, স্যার?”

শান্ত গলায় ইশতিয়াক বললেন, “সব লেখা শেষ হয়ে গেছে।”

“লেখা কি কখনো শেষ হয়?”

“লেখা হয়তো শেষ হয় না। লেখক থেমে যায়।”

সে রাতে ঘুমের ভেতর ইশতিয়াক নিঃশব্দে চলে গেলেন। তার মুখে শান্ত হাসি। বিছানার পাশে খোলা ডায়েরি। শেষ পাতায় লেখা, “দিতি, কোনোদিন যদি আবার সব ভুলে যাও, তবু দুঃখ নেই। মানুষকে মনে রাখার দায় সবসময় মানুষের নয়। কখনো ভালোবাসাই স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে। আমি আর প্রতীক্ষা করছি না। প্রতীক্ষা শেষ হয়েছে। তুমি আরও একবার আমার নাম ধরে ডেকেছ। এক জীবন পার করার জন্য ওই একবারই যথেষ্ট।”


এক বছর পর। ঘাসফড়িং প্রবীণ নিবাসে কুরিয়ার এসেছে। ইশতিয়াকের ডায়েরিগুলো। সঙ্গে ছোট্ট চিঠি। নিবেদিতার মেয়ে লিখেছে, “মা আর নেই। ডায়েরিগুলো দিয়ে দিলাম। এগুলো শুধু আমার মায়ের একার নয়। যে মানুষ কাউকে হারিয়েছে, কিংবা যাকে কেউ ভুলে গেছে— তাদের সকলের।”

ঘাসফড়িং নিবাসের আলমারিতে ডায়েরিগুলো আছে। নতুন কেউ এলে সেবিকারা ডায়েরি থেকে পড়ে শোনায়। সবাই গল্পের সব ঘটনা মনে রাখতে পারেন না। তবু গল্প শেষ হলে অনেকের চোখ ভিজে ওঠে।

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত