একটি কবিতা কীভাবে একটি পরাধীন জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দিতে পারে, কীভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে পরাক্রমশালী ব্রিটিশ রাজসিংহাসন— এর অনন্য দলিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। সময়ের হিসাবে শতাব্দী পেরিয়ে গেছে এই কালজয়ী সৃষ্টির। ১০৫ বছর পরও যখন কোনো তরুণ আবৃত্তি করে— ‘বল বীর— বল উন্নত মম শির!’— তখন বাংলা ভাষাভাষি মানুষের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ তীব্র হয়, গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে, আর অবচেতন মনে জেগে ওঠে এক অনমনীয় আত্মমর্যাদা। ‘বিদ্রোহী’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি শোষণের বিরুদ্ধে শাশ্বত মানবতার এক অবিনাশী ইশতেহার।
বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের এক কনকনে শীতের রাতে কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে মাত্র ২২ বছরের এক তরুণ পেনসিলে লিখেছিলেন কালজয়ী এই কবিতা, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল এই কবিতায় যে শব্দশৈলী ও রূপক ব্যবহার করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিবেচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন মাত্র ২২ বছর ৮ মাস। সাহিত্য বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বিদ্রোহী কবিতা রবীন্দ্র যুগের সাহিত্য থেকে বেরিয়ে নতুন এক সাহিত্য ধারার সূচনা করে। বিদ্রোহী কবিতা ৩৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশের ১০০টি ভাষায় অনুবাদের আয়োজন চলছে।
বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন নজরুলের বন্ধু কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ। নজরুল ভোরেই তাকে কবিতাটি শুনিয়েছিলেন। কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ তার ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ বইয়ে লিখেছেন, “আসলে বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বড়দিনের ছুটিতে। প্রথম ছাপা হয়েছিল ‘বিজলী’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়।” তিনি আরো লিখেছেন, ‘তখন নজরুল ও আমি নিচের তলার পূর্বদিকের, অর্থাৎ বাড়ির নিচেকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন রাতে। রাতের কোন সময় তা জানি না। রাত ১০টার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময় নজরুল বলল সে একটা কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটিই সে আমাকে পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। আমার মনে হয়, নজরুল শেষ রাতে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমাকে কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। এখন থেকে ১০৫ বছর আগে নজরুল কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারবার কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেনসিলে লিখেছিল।” সেদিন ওই বাড়িতে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার আফজালুল হকও আসেন। তাকেও কবিতাটি পড়ে শোনান নজরুল। তিনি সেটি শুনে একটি কপি সঙ্গে নিয়ে যান। মুজাফ্ফর আহমদ উল্লেখ করেন, “আমি বাইরে গিয়ে ১২টায় ফিরে এলে নজরুল জানায়, অবিনাশদা এসেছিলেন। তিনি কবিতাটি শুনে বললেন, তুমি পাগল হয়েছ নজরুল, আফজালের কাগজ কখন বার হবে তার ঠিক নেই, কপি করে দাও, ‘বিজলী’তে ছেপে দিই আগে।” তাকেও নজরুল সেই পেনসিলে লিখেই কবিতাটি কপি করে দিয়েছিলেন। ১৩৯ পঙ্ক্তির এই দীর্ঘ কবিতায় নজরুল ১২১ বার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই ‘আমি’ কোনো অহংকার বা ব্যক্তিস্বার্থের ‘আমি’ নয়; এটি হলো শৃঙ্খলিত মানবাত্মার সামষ্টিক জাগরণের ‘আমি’। এই কবিতা ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। অবিরাম বৃষ্টির দিনেও পত্রিকার চাহিদা এত হয়েছিল যে, বিজলী দুবার মুদ্রণ করতে হয়েছিল। পরে মুসলিম ভারতে ফাল্গুন মাসে আবার ছাপা হয়। বিজলী সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র নজরুলের মুখে শুনেছেন, বিদ্রোহী ছাপা হওয়ার পরে নজরুল এটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনান। কবিতাটি শুনে সানন্দে তিনি নজরুলকে বুকে চেপে ধরে আশীর্বাদ করেছিলেন।
নজরুল গবেষক জাতীয় অধ্যাপক মরহুম রফিকুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তুরস্কের কামাল পাশার আবির্ভাব, বাংলা সাহিত্যের এসব পটভূমি নজরুলকে বিদ্রোহীর মতো কবিতা লেখার জন্য প্রভাবিত করেছে।’ ‘তাই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে বিশ শতকে রবীন্দ্র প্রভাব এত সর্বগ্রাসী হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল এর বাইরে যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হই হই করে নজরুল এসে হাজির হলেন।’ রবীন্দ্র ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক বাংলা কবিতার যে জন্ম হলো বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমেই এর সূচনা। তার মতে, “গত একশ বছরে বহু আন্দোলন-সংগ্রামে কবিতাটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। শুধু ‘বিদ্রোহী’র জন্য হলেও নজরুল যুগ যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।” এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ইংরেজি সাহিত্যে টিএস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এ কবিতা ইংরেজি কবিতার ধারা বদলে দেয়। আর নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা বদলে দেয় বাংলা সাহিত্যের ধারা। বাংলা সাহিত্যে ‘আধুনিক কবিতা’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার পেছনে রয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত নজরুল অ্যালবাম ১৯৯৪-এর ‘কাজী নজরুল ইসলাম’বিষয়ক দীর্ঘ লেখায় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে লিখেছেন, ১৯২১ সালের জুন মাসে কুমিল্লার দৌলতপুরে নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে দুঃখজনক ঘটনার পর নজরুল ১৭ দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এ সময় ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে কুমিল্লা উদ্বেলিত ছিল। নজরুল ব্রিটিশবিরোধী সভা, সমাবেশে যোগ দিয়ে গাইলেন, সদ্য রচিত ও নিজের সুর করা স্বদেশি গান, ‘এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মা-র আঙিনায়’। আজি রক্তনিশি ভোরে, একি, শুনি ওরে, মুক্তি কোলাহল বন্দি শৃঙ্খল ইত্যাদি গান। ১৯২১ সালের নভেম্বরে কলকাতা থেকে নজরুল আবার কুমিল্লায় আসেন। অসহযোগ মিছিলে শহর প্রদক্ষিণ করে গাইলেন ‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও। ফিরে চাও ওগো পুরবাসী’। কলকাতায় ফিরে গিয়েই রচনা করেন তার ঐতিহাসিক ‘ভাঙার গান’— কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ ও বিদ্রোহী কবিতা— ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’। বাংলা কবিতা ও গানের ইতিহাসে অমন বলিষ্ঠ গান ও কবিতা আর রচিত হয়নি। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পরপরই নজরুলের কবিখ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অবিভক্ত বাংলার শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতিতে ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। মাত্র ২২ বছর বয়সে নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিরূপে যে খ্যাতি অর্জন করেন, হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর নজির নেই।
বিদ্রোহী কবিতা নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ১২টি কবিতার একটি। ‘বিদ্রোহী’ এ কাব্যের দুই নম্বর কবিতা। ‘বিজলী’ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের খ্যাতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে তার নাম হয়ে যায়। কবিতাটি হয়ে ওঠে নজরুলের কাব্যমূর্তির প্রতীক। সেনাবাহিনীর চাকরি শেষ করে কলকাতায় ফিরে নজরুল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ভারতের প্রয়াত অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় বলেন, যারা সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়তে চাইছে, তাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল নজরুল ইসলামের জ্বালাময়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহ চেতনারই প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বিদ্রোহ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এবং শৃঙ্খল পরা আমিত্বের বিরুদ্ধে।
পরাধীন ভারতবর্ষে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ছিল ধূমকেতুর মতো। বিশিষ্ট গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান তার ‘নজরুল জীবন কথা’ বইয়ে নতুন একটি তথ্য উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, নজরুলের জন্মগ্রাম চুরুলিয়ার কাছে সাঁওতাল পরগনার বিদ্রোহী পরিবেশও বিদ্রোহী নজরুলের প্রাথমিক চেতনাভূমি হিসেবে কাজ করেছে। নজরুলের জন্মের দশ বছর আগেই এ অঞ্চলে ঘটে ‘মুন্ডা বিদ্রোহ’। এসব বিদ্রোহের গল্প ও গান চুরুলিয়া ও আশপাশে বেশি বয়সি মানুষের মুখে মুখে ফিরত। নজরুল ছোটবেলায় এসব লড়াই-সংগ্রামের গল্প শুনেছেন। তার মনন গঠনে এটি কমবেশি প্রভাব ফেলেছিল। কবি আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে নজরুল সম্পর্কে বলেছিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম অসাধারণ এক কবিপ্রতিভা। তার বিদ্রোহী কবিতার মতো এমন কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল। আবার কবি শামসুর রাহমান তার ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় লেখেন, স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা’। কবি শামসুর রহমান লেখেন, কবিতাটিতে নজরুল শব্দের ঘুঙুর বাজিয়েছেন। কবি তার নিজের সত্তাকে চঞ্চল ঘুঙুর বা নূপুরের শব্দের সঙ্গে তুলনা করে কবিতায় বলেছেন—
‘আমি তরুণীর আলুথালু চুল, আমি যুবতীর চোখের চাতুরী,/আমি কুমারীর রিমিঝিমি রিমিঝিমি নূপুর-নিক্বণ, আমি নিখিল-প্রেমিক-বিলাসী!’
বিদ্রোহী কবিতার মূল বার্তা হচ্ছে যেকোনো অন্যায়, অবিচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মশক্তির চরম জাগরণ এবং চিরমুক্তির ঘোষণা। কবিতার চূড়ান্ত বার্তাটি লুকিয়ে আছে এর শেষের লাইনে। কবি ক্ষমতা বা প্রতিশোধের জন্য বিদ্রোহ করেননি; তার বিদ্রোহ ততক্ষণ চলবে, যতক্ষণ না এই পৃথিবী থেকে অত্যাচারীর জুলুম শেষ হচ্ছে এবং উৎপীড়িতের কান্না থামছে। শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই এই বিদ্রোহের শেষ লক্ষ্য। কবিতার শেষাংশে কবি যে চরম সত্য ও অঙ্গীকার উচ্চারণ করেছেন, তা আজও যেকোনো সংবেদনশীল পাঠককে আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত করে তোলে। নজরুল ঘোষণা করেছিলেন—
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
এই শান্ত হওয়ার শর্তটি আজ শত বছর পরেও পূরণ হয়নি, তাই কবি আজও রণ-ক্লান্ত হয়ে শান্ত হতে পারেননি। তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো তরুণের কণ্ঠে, মিছিলে দ্রোহে। আর শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বাঁচতে হয়, কীভাবে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর মশাল জ্বালাতে হয়। নজরুলের এই অমর সৃষ্টি যুগ যুগ ধরে শৃঙ্খলমুক্তির গান গেয়ে যাবে এবং পৃথিবীকে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখিয়ে যাবে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একটি কবিতা কীভাবে একটি পরাধীন জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দিতে পারে, কীভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে পরাক্রমশালী ব্রিটিশ রাজসিংহাসন— এর অনন্য দলিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। সময়ের হিসাবে শতাব্দী পেরিয়ে গেছে এই কালজয়ী সৃষ্টির। ১০৫ বছর পরও যখন কোনো তরুণ আবৃত্তি করে— ‘বল বীর— বল উন্নত মম শির!’— তখন বাংলা ভাষাভাষি মানুষের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ তীব্র হয়, গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে, আর অবচেতন মনে জেগে ওঠে এক অনমনীয় আত্মমর্যাদা। ‘বিদ্রোহী’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি শোষণের বিরুদ্ধে শাশ্বত মানবতার এক অবিনাশী ইশতেহার।
বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের এক কনকনে শীতের রাতে কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে মাত্র ২২ বছরের এক তরুণ পেনসিলে লিখেছিলেন কালজয়ী এই কবিতা, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল এই কবিতায় যে শব্দশৈলী ও রূপক ব্যবহার করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিবেচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন মাত্র ২২ বছর ৮ মাস। সাহিত্য বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বিদ্রোহী কবিতা রবীন্দ্র যুগের সাহিত্য থেকে বেরিয়ে নতুন এক সাহিত্য ধারার সূচনা করে। বিদ্রোহী কবিতা ৩৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশের ১০০টি ভাষায় অনুবাদের আয়োজন চলছে।
বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন নজরুলের বন্ধু কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ। নজরুল ভোরেই তাকে কবিতাটি শুনিয়েছিলেন। কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ তার ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ বইয়ে লিখেছেন, “আসলে বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বড়দিনের ছুটিতে। প্রথম ছাপা হয়েছিল ‘বিজলী’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়।” তিনি আরো লিখেছেন, ‘তখন নজরুল ও আমি নিচের তলার পূর্বদিকের, অর্থাৎ বাড়ির নিচেকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন রাতে। রাতের কোন সময় তা জানি না। রাত ১০টার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময় নজরুল বলল সে একটা কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটিই সে আমাকে পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। আমার মনে হয়, নজরুল শেষ রাতে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমাকে কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। এখন থেকে ১০৫ বছর আগে নজরুল কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারবার কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেনসিলে লিখেছিল।” সেদিন ওই বাড়িতে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার আফজালুল হকও আসেন। তাকেও কবিতাটি পড়ে শোনান নজরুল। তিনি সেটি শুনে একটি কপি সঙ্গে নিয়ে যান। মুজাফ্ফর আহমদ উল্লেখ করেন, “আমি বাইরে গিয়ে ১২টায় ফিরে এলে নজরুল জানায়, অবিনাশদা এসেছিলেন। তিনি কবিতাটি শুনে বললেন, তুমি পাগল হয়েছ নজরুল, আফজালের কাগজ কখন বার হবে তার ঠিক নেই, কপি করে দাও, ‘বিজলী’তে ছেপে দিই আগে।” তাকেও নজরুল সেই পেনসিলে লিখেই কবিতাটি কপি করে দিয়েছিলেন। ১৩৯ পঙ্ক্তির এই দীর্ঘ কবিতায় নজরুল ১২১ বার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই ‘আমি’ কোনো অহংকার বা ব্যক্তিস্বার্থের ‘আমি’ নয়; এটি হলো শৃঙ্খলিত মানবাত্মার সামষ্টিক জাগরণের ‘আমি’। এই কবিতা ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। অবিরাম বৃষ্টির দিনেও পত্রিকার চাহিদা এত হয়েছিল যে, বিজলী দুবার মুদ্রণ করতে হয়েছিল। পরে মুসলিম ভারতে ফাল্গুন মাসে আবার ছাপা হয়। বিজলী সম্পাদক অবিনাশচন্দ্র নজরুলের মুখে শুনেছেন, বিদ্রোহী ছাপা হওয়ার পরে নজরুল এটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনান। কবিতাটি শুনে সানন্দে তিনি নজরুলকে বুকে চেপে ধরে আশীর্বাদ করেছিলেন।
নজরুল গবেষক জাতীয় অধ্যাপক মরহুম রফিকুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তুরস্কের কামাল পাশার আবির্ভাব, বাংলা সাহিত্যের এসব পটভূমি নজরুলকে বিদ্রোহীর মতো কবিতা লেখার জন্য প্রভাবিত করেছে।’ ‘তাই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, বাংলা সাহিত্যে বিশ শতকে রবীন্দ্র প্রভাব এত সর্বগ্রাসী হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল এর বাইরে যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হই হই করে নজরুল এসে হাজির হলেন।’ রবীন্দ্র ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক বাংলা কবিতার যে জন্ম হলো বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমেই এর সূচনা। তার মতে, “গত একশ বছরে বহু আন্দোলন-সংগ্রামে কবিতাটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। শুধু ‘বিদ্রোহী’র জন্য হলেও নজরুল যুগ যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।” এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ইংরেজি সাহিত্যে টিএস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এ কবিতা ইংরেজি কবিতার ধারা বদলে দেয়। আর নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা বদলে দেয় বাংলা সাহিত্যের ধারা। বাংলা সাহিত্যে ‘আধুনিক কবিতা’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার পেছনে রয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত নজরুল অ্যালবাম ১৯৯৪-এর ‘কাজী নজরুল ইসলাম’বিষয়ক দীর্ঘ লেখায় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে লিখেছেন, ১৯২১ সালের জুন মাসে কুমিল্লার দৌলতপুরে নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে দুঃখজনক ঘটনার পর নজরুল ১৭ দিন কুমিল্লায় ছিলেন। এ সময় ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে কুমিল্লা উদ্বেলিত ছিল। নজরুল ব্রিটিশবিরোধী সভা, সমাবেশে যোগ দিয়ে গাইলেন, সদ্য রচিত ও নিজের সুর করা স্বদেশি গান, ‘এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মা-র আঙিনায়’। আজি রক্তনিশি ভোরে, একি, শুনি ওরে, মুক্তি কোলাহল বন্দি শৃঙ্খল ইত্যাদি গান। ১৯২১ সালের নভেম্বরে কলকাতা থেকে নজরুল আবার কুমিল্লায় আসেন। অসহযোগ মিছিলে শহর প্রদক্ষিণ করে গাইলেন ‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও। ফিরে চাও ওগো পুরবাসী’। কলকাতায় ফিরে গিয়েই রচনা করেন তার ঐতিহাসিক ‘ভাঙার গান’— কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ ও বিদ্রোহী কবিতা— ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’। বাংলা কবিতা ও গানের ইতিহাসে অমন বলিষ্ঠ গান ও কবিতা আর রচিত হয়নি। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পরপরই নজরুলের কবিখ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অবিভক্ত বাংলার শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতিতে ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। মাত্র ২২ বছর বয়সে নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিরূপে যে খ্যাতি অর্জন করেন, হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর নজির নেই।
বিদ্রোহী কবিতা নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ১২টি কবিতার একটি। ‘বিদ্রোহী’ এ কাব্যের দুই নম্বর কবিতা। ‘বিজলী’ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের খ্যাতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে তার নাম হয়ে যায়। কবিতাটি হয়ে ওঠে নজরুলের কাব্যমূর্তির প্রতীক। সেনাবাহিনীর চাকরি শেষ করে কলকাতায় ফিরে নজরুল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ভারতের প্রয়াত অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় বলেন, যারা সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়তে চাইছে, তাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল নজরুল ইসলামের জ্বালাময়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহ চেতনারই প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বিদ্রোহ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এবং শৃঙ্খল পরা আমিত্বের বিরুদ্ধে।
পরাধীন ভারতবর্ষে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ছিল ধূমকেতুর মতো। বিশিষ্ট গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান তার ‘নজরুল জীবন কথা’ বইয়ে নতুন একটি তথ্য উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, নজরুলের জন্মগ্রাম চুরুলিয়ার কাছে সাঁওতাল পরগনার বিদ্রোহী পরিবেশও বিদ্রোহী নজরুলের প্রাথমিক চেতনাভূমি হিসেবে কাজ করেছে। নজরুলের জন্মের দশ বছর আগেই এ অঞ্চলে ঘটে ‘মুন্ডা বিদ্রোহ’। এসব বিদ্রোহের গল্প ও গান চুরুলিয়া ও আশপাশে বেশি বয়সি মানুষের মুখে মুখে ফিরত। নজরুল ছোটবেলায় এসব লড়াই-সংগ্রামের গল্প শুনেছেন। তার মনন গঠনে এটি কমবেশি প্রভাব ফেলেছিল। কবি আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে নজরুল সম্পর্কে বলেছিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম অসাধারণ এক কবিপ্রতিভা। তার বিদ্রোহী কবিতার মতো এমন কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল। আবার কবি শামসুর রাহমান তার ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় লেখেন, স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা’। কবি শামসুর রহমান লেখেন, কবিতাটিতে নজরুল শব্দের ঘুঙুর বাজিয়েছেন। কবি তার নিজের সত্তাকে চঞ্চল ঘুঙুর বা নূপুরের শব্দের সঙ্গে তুলনা করে কবিতায় বলেছেন—
‘আমি তরুণীর আলুথালু চুল, আমি যুবতীর চোখের চাতুরী,/আমি কুমারীর রিমিঝিমি রিমিঝিমি নূপুর-নিক্বণ, আমি নিখিল-প্রেমিক-বিলাসী!’
বিদ্রোহী কবিতার মূল বার্তা হচ্ছে যেকোনো অন্যায়, অবিচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মশক্তির চরম জাগরণ এবং চিরমুক্তির ঘোষণা। কবিতার চূড়ান্ত বার্তাটি লুকিয়ে আছে এর শেষের লাইনে। কবি ক্ষমতা বা প্রতিশোধের জন্য বিদ্রোহ করেননি; তার বিদ্রোহ ততক্ষণ চলবে, যতক্ষণ না এই পৃথিবী থেকে অত্যাচারীর জুলুম শেষ হচ্ছে এবং উৎপীড়িতের কান্না থামছে। শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই এই বিদ্রোহের শেষ লক্ষ্য। কবিতার শেষাংশে কবি যে চরম সত্য ও অঙ্গীকার উচ্চারণ করেছেন, তা আজও যেকোনো সংবেদনশীল পাঠককে আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত করে তোলে। নজরুল ঘোষণা করেছিলেন—
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
এই শান্ত হওয়ার শর্তটি আজ শত বছর পরেও পূরণ হয়নি, তাই কবি আজও রণ-ক্লান্ত হয়ে শান্ত হতে পারেননি। তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো তরুণের কণ্ঠে, মিছিলে দ্রোহে। আর শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বাঁচতে হয়, কীভাবে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর মশাল জ্বালাতে হয়। নজরুলের এই অমর সৃষ্টি যুগ যুগ ধরে শৃঙ্খলমুক্তির গান গেয়ে যাবে এবং পৃথিবীকে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখিয়ে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন