সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাস যত পুরোনো, শিল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্কও তত পুরোনো। শিল্প কি নিছক সৌন্দর্যের নির্মাণ, নাকি মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও সময়ের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে— এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। কিন্তু সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাস অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে সাহিত্য নিজের সময়কে অস্বীকার করে, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কেবল অলংকারের কারুকাজে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তার স্থায়িত্ব সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অন্যদিকে যে সাহিত্য ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা, নৈতিক প্রশ্ন এবং নন্দনতত্ত্বকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তার প্রভাব সময়ের সীমানা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রাখে। এক্ষেত্রে সাহিত্যের পথও বহুরৈখিক— উপন্যাস-ছোটগল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নাটক-সঙ্গীত। এসবেরও আবার বহুরূপ আছে। সাহিত্যের সবচেয়ে নির্মোহ নিরস ও চিন্তাপ্রসূত যৌক্তিক শাখাটি প্রবন্ধ। ফলে যত সহজে একটি উপন্যাস ছোটগল্প কবিতা রচনা করা সম্ভব, প্রবন্ধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত সহজসাধ্য নয়। আবেগবর্জিত চিন্তাভাবনা যুক্তি এখানে কথা বলে।
অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এর একটি সহযোগী কার্যক্রম ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ প্রথমে কাজ করেছে ছোটগল্প নিয়ে। দ্বিতীয় প্রকাশনা কবি ওবায়েদ আকাশ ও কবি মাহফুজ আল-হোসেন সম্পাদিত প্রবন্ধ সংকলন: ‘শালুক-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ— প্রতিনির্মাণ’। ‘শালুক’ মূলত কবিতানির্ভর লিটল ম্যাগাজিন। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম সংকলনটিই হতে পারতো কবিতার। কিন্তু এখানে শালুকের সম্পাদকমণ্ডলী এবং শালুক ক্রিয়েটিভ পরিবার ভিন্নভাবে চিন্তা করেছে।
বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাস নতুন নয়। সাহিত্যিক-চিন্তাবিদ-সমাজচিন্তকরা সমাজ সংস্কার থেকে শুরু করে সমাজ-রাষ্ট্র বিভিন্ন দায়বোধ ও দায়িত্ব থেকে মানুষের ভেতরে চিন্তার জাগরণ ঘটাতে প্রবন্ধকেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ফলে প্রবন্ধের একক প্রবন্ধ গ্রন্থ যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও প্রয়োজনে বিভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ থেকে বাছাই করে প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রকাশের রীতি রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, বিষয় বিবেচনা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রকাশের রীতি ও আগ্রহ অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এক্ষেত্রে ‘শালুক’-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন ‘প্রতিনির্মাণ’ একটি অন্য রকম প্রয়াস। এটিও শালুকের দীর্ঘ সাতাশ বছরের ঊনত্রিশটি সংখ্যায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ থেকে বাছাই করা প্রবন্ধের সমাহার। স্বসম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ থেকে বাছাই করে নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে বোধহয় বিরল ঘটনা। এক্ষেত্রে শালুক নতুন এক পথের আলোর অভিস্রবন খুলে দিয়েছে, যা আগে কখনো ঘটেনি। সহজ কথায় বাংলা সাহিত্যে সংকলন প্রকাশনায় এ এক নতুন অভিযাত্রা।
বাংলা সাহিত্যে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ বিদগ্ধ মনীষীরা সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রয়োজনেই প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যা উপন্যাসে বলা যায় না, কবিতায় বলা যায় না, সেখানে প্রবন্ধ হয়ে ওঠে অনিবার্য।
সাধারণভাবে বাংলা ও ইংরেজিসহ সকল ভাষাতেই গদ্যের উদ্ভব ও ব্যবহারের সময় থেকেই প্রবন্ধের আত্মপ্রকাশ। ইংরেজি ভাষায় নবম শতক ও তার পরবর্তীকালে অনুবাদকার ও ধর্মযাজকদের হাতে এবং বাংলায় শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতে প্রবন্ধের জন্ম। এলিজাবেথের যুগে ফ্রান্সিস বেকন ও উনিশ শতকের প্রারম্ভিক পর্বে রামমোহন রায় যথাক্রমে ইংরেজি ও বাংলা প্রবন্ধ শিল্পের সার্থক রূপকার। সুতরাং সাহিত্যসাধক ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেন কবি হলেও প্রবন্ধ সাহিত্য যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন এই প্রবন্ধ সংকলনটিতে। এই সংকলনে বিখ্যাত অনেক প্রাবন্ধিকের প্রবন্ধ রয়েছে এবং তার সবই শালুকে প্রকাশিত। বাংলা প্রবন্ধের জন্ম ও বিকাশের ধারায় একুশ শতকের এই প্রবন্ধ সংকলনটি প্রবন্ধ সাহিত্যে উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম এক স্মারক হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রবন্ধগুলিতে দেশ-রাষ্ট্র চিন্তা থেকে ব্যক্তিচিন্তা, সাহিত্যের বহুকৌণিক বিশ্লেষণ, প্রত্যেকটি প্রবন্ধে যুক্তি ও বিশ্লেষণের ভিন্নতা, চিন্তা ও মননের নানা স্বরূপ, যুক্তির ভেতর হৃদয়াবেগও পরিলক্ষিত হয়েছে। বেশ কিছু প্রবন্ধে জ্ঞান, বুদ্ধি, চিন্তাচেতনার বিস্ময়কর গভীরতা রয়েছে, যা আমাদের মগজের চাহিদাকে পরিতৃপ্ত করে, আমাদের ভাবিত করে, জাগ্রত করে। কিছু প্রবন্ধ প্রাবন্ধিকের ভাবকল্পনার দীপ্তিতে আমাদের হৃদয়ের পিপাসা মেটাতে সক্ষম হয়েছে— যা প্রবন্ধের সঙ্গে আমাদের একাত্ম করে তোলে। বিশদ, জ্ঞানগর্ভ বিষয়ের যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি-প্রযুক্তিগত জীবনসমস্যাকে আত্মগত ভাবরসে স্নিগ্ধভাবে জারিত করে পাঠকের কাছে এক শান্ত, আবেগমন্থিত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
‘প্রতিনির্মাণ’ সংকলনে লেখকের নিজস্ব ভঙ্গি, মেজাজ, স্বতঃস্ফূর্ততা, যৌক্তিক ও চিন্তাপ্রসূত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংকলনটিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসনাত আবদুল হাই, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মোহাম্মদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ বিখ্যাত লেখকের প্রবন্ধ সংকলনের মর্যাদাকে কালোত্তীর্ণ করেছে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা সাহিত্যে এই সংকলনটি কালের যাত্রা ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে থাকবে বলে বিশ্বাস।
এই কাজটি যে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আছে তা সম্পাদকের ভাষ্যে প্রতীয়মান হয়, “প্রতিনির্মাণ নামটি কেবল একটি শিরোনাম নয়, এটি এই সংকলনের অন্তর্নিহিত বৌদ্ধিক প্রবণতারও একটি দ্যোতক। প্রচলিত চিন্তার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনা, প্রশ্ন, বিশ্লেষণ, ভাঙন ও নতুন অর্থে নির্মাণের যে বিকল্পচিন্তা— এই সংকলনের বহু প্রবন্ধ সেই মননশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব, পুরাণ, ভাষা, কবিতা ও কথাসাহিত্য— বহুমাত্রিক এই বিষয় পরিসরে প্রবন্ধগুলো একদিকে আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে পুনর্পাঠ করে, অন্যদিকে সমকালীন মননের ভেতর থেকে নতুন প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।”
এই সংকলনের সম্পাদকদ্বয় তাদের কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ সম্পাদনায় তাদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাছাইয়ের কাজটি তারা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন বলেই বোধ হয় কঠিনের থেকে কঠিনকে জয় করতে পেরেছেন। এখানে গুণগতমান, বিষয়বস্তু, রচনাশৈলী— নানা বিষয় যুক্ত ছিল। এসব বিবেচনায় নিয়ে নির্মোহভাবে লেখা নির্বাচন কোনভাবেই সহজসাধ্য ছিল না। সম্পাকীয়তে তা উল্লেখও আছে, “বিশেষত একই থিমেটিক এরিয়ায় বিষয়গত সমোচ্চারণ রোধ করা এবং একজন প্রাবন্ধিকের একাধিক অসাধারণ রচনার মধ্য থেকে শ্রেয়তর একটি প্রবন্ধ নির্বাচন করা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোর অন্যতম। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের লক্ষ্যে প্রবন্ধগুলোর নিবিড় পুনর্পাঠ, সতর্ক পর্যবেক্ষণ, বিষয়গত ভারসাম্য রক্ষা, রচনার স্বাতন্ত্র্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক মূল্য বিচার এবং একাধিক সম্পাদকীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে। সেই অর্থে ‘প্রতিনির্মাণ’ শুধু নির্বাচিত প্রবন্ধ ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় পাঠ, বিচার ও পুনর্বিবেচনারও ফল।’
এই সংকলনের প্রবন্ধসমূহের বিষয়বৈচিত্র্য বহু বিস্তৃত, যুক্তি ও চিন্তার বহুরৈখিকতা, শিল্পিত পরিসর অত্যন্ত তাৎপর্যময়। প্রবন্ধের শিরোনাম ও লেখক তালিকা দেখলেই অনুভূত হয় এটা কতটা সমৃদ্ধ একটি সংকলন। সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জেমস জয়েসের ইউলিসিস— বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং মিথ— হাসনাত আবদুল হাই, সোনা-মোড়া কথাশিল্প: শহীদুল জহির— হাসান আজিজুল হক, জীবনানন্দের প্রেমের কবিতা— আবদুল মান্নান সৈয়দ, চেনা না-চেনা কথার কারিগর— জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রক্ত চুয়ে ওঠে চাঁদ, গ্রানাডায়— মোহাম্মদ রফিক, কাফকাকে পড়া, কাফকাকে পড়ানো— সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কাফকার প্যারাবোল ‘বিফোর দ্য ল’— জীবনসংগ্রামের এক অ্যাবসার্ড বাস্তবতা— আবদুস সেলিম, কবিতার ভিতর বাহির: সিকদার আমিনুল হক— শিহাব সরকার, বহুমাত্রিক শঙ্খ ঘোষ: বিপুল বিস্ময়— নাসির আহমেদ, কবি শঙ্খ ঘোষ ও তাঁর বাঁশি— দিলারা হাফিজ, শুশ্রূষার আশ্রয়ঘর— আবদুর রাজ্জাক, কেন উত্তরআধুনিক সাহিত্য চিন্তা— অঞ্জন সেন, সাহিত্যতত্ত্ব নয়, তত্ত্বে সাহিত্য— মাসুদুজ্জামান, বিশিষ্টতম কবি— মঈনউদ্দিন মুনশী, একগুচ্ছ বালক এবং একজন— দেবাহুতি চক্রবর্তী, কাফকায়েস্ক— কামাল রাহমান, ‘গাবো’ মনে রাখার ব্যক্তিগত চাবি— মামুন হুসাইন, দেবেশ রায়ের উপন্যাস: রাষ্ট্রই মুখ্য চরিত্র— সাদ কামালী, আমার ব্যক্তিগত মিথসমূহ— ইমতিয়ার শামীম, শঙ্খধ্বনি— মহীবুল আজিজ, শহীদুল জহির ও জাদুবাস্তবতা: এক ভুল পাঠের বিশ্লেষণ— আনিসুজ জামান, শহীদুল জহিরের চাঁদ ও চরিত্রেরা— শাহাব আহমেদ, কবির নিশীথচিত্র— কুমার চক্রবর্তী, কাফকা ও জীবনানন্দ— চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ, জীবনের নয়া বীজবপনের উত্তর ঔপনিবেশিক চেতনা— হাফিজ রশিদ খান, কাফকার দ্য মেটামরফসিস: অনন্য নভেলা— খালেদ হামিদী, তোমার ‘মতন’ আর কেউ নয়— সরকার আবদুল মান্নান, মৃত্যুর ১০০ বছর পরও ফ্রান্ৎস কাফকা কতটা প্রাসঙ্গিক!— শাকিব লোহানী, শঙ্খ ঘোষ: শব্দকে উজ্জ্বল করেন যে কবি— জিললুর রহমান, বাংলা নাট্যের আত্ম-সন্ধিৎসা বিপ্লব বালা, মিথ: এক আবহমান জাদুশক্তি— গৌতম গুহ রায়, লোরকার খোঁজে গ্রানাদায়— রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, শঙ্খ ঘোষের কবিতা— মিহির মুসাকী, শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্য: অস্তিত্ববাদী দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের স্বকীয় সৌরভ— মাহফুজ আল-হোসেন, শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ কবিতা: মূলের কাছাকাছি ছন্দ-শব্দ-নন্দনের মহার্ঘ ভাষ্য— ওবায়েদ আকাশ, শিল্প-সাহিত্যে ‘ইজম’-এর ব্যবহার: মডার্নিজম থেকে পোস্টমডার্নিজম— কামরুল ইসলাম, মহাদেশ, অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতার মহাকাব্য— শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হুইটম্যান এলিয়ট ফ্রস্ট: কাব্যচর্চায় ত্রয়ী প্রভাব— বিনয় বর্মন, জীবনানন্দের মৃত্যুরহস্য— হিন্দোল ভট্টাচার্য, শিল্প-জিজ্ঞাসা— আবু হেনা মোস্তফা এনাম, শেকড়ের টান, দেশভাগ এবং শঙ্খ ঘোষের কবিতা— রকিবুল হাসান, জীবনানন্দ দাশের কথাসাহিত্যচর্চা এবং কতিপয় জিজ্ঞাসাচিহ্ন— চন্দন আনোয়ার, লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের মর্মস্পর্শী ও দূরদর্শী সাহিত্যকর্ম— অনন্ত মাহফুজ, দৃশ্যকাব্যের কবি: শহীদুল জহির— কাজল রশীদ শাহীন, শহীদুল জহিরের গল্পনির্মাণশৈলীর বীক্ষণ— পারভেজ আহসান, বিশ্বের নতুন কবিতা— চন্দন চৌধুরী, শহীদুল জহিরের ভাষা ও বর্ণনারীতি— মোজাফ্ফর হোসেন, অনশন শিল্পী: যাপিত জীবনের অস্তিত্ববাদী চেতনার স্ফুরণ— মো. নাহিদ পারভেজ, বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব— জয়নাল আবেদীন শিবু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস: তুলনামূলক বিচার— সোহেল মাজহার, ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’: মার্কেসের অপেক্ষায় প্রহরগনা দারিদ্র্যপীড়িত নির্বাসিত জীবনের প্রতিচ্ছবি— সুরাইয়া ফারজানা হাসান, কাফকার ভূগোলে মার্কেস— তুষার তালুকদার, কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’: সর্বগ্রাসী আদালত ও একজন মানুষের গল্প— স্বপঞ্জয় চৌধুরী, এবং জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা: গভীর অন্তরবেদনা ও অনন্য ভাষাশৈলীর আলেখ্য— আনোয়ার মল্লিক।
‘প্রতিনির্মাণ’ সময়ের বুকে কঠিন এক নির্মাণ। এমন নির্মাণ ইচ্ছে করলেই করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন রয়েছে সাহিত্যের প্রতি দায় ও দায়িত্ব এবং নির্মোহ আত্মত্যাগ। এখানে বাণিজ্য নেই, পুঁজির বিকাশ নেই, সুখ-সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন ও হাতছানি নেই। আছে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়ে সাহিত্যের আকাশের আলো জ্বালাবার দৃঢ় প্রত্যয়। সাহিত্যেও নির্মোহ কঠিন সাধক না হলে এ ধরনের কর্মযজ্ঞ সাধন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিনির্মাণ কালের যাত্রায় তারই প্রমাণ বহন করবে— এ কথা শক্ত করেই বলা যেতে পারে। এমন একটি মহৎ কাজের জন্য ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ পরিবারকে ধন্যবাদ না জানালে অবিচার করা হবে।
শালুক-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ: প্রতিনির্মাণ। সম্পাদনা: ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেন। প্রকাশক: শালুক ক্রিয়েটিভ। প্রচ্ছদ: সঞ্জয় দে রিপন। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬। পৃষ্ঠা ৫৪৪। মূল্য: ৮৭৫ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাস যত পুরোনো, শিল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্কও তত পুরোনো। শিল্প কি নিছক সৌন্দর্যের নির্মাণ, নাকি মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও সময়ের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে— এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। কিন্তু সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাস অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে সাহিত্য নিজের সময়কে অস্বীকার করে, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কেবল অলংকারের কারুকাজে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তার স্থায়িত্ব সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অন্যদিকে যে সাহিত্য ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা, নৈতিক প্রশ্ন এবং নন্দনতত্ত্বকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তার প্রভাব সময়ের সীমানা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রাখে। এক্ষেত্রে সাহিত্যের পথও বহুরৈখিক— উপন্যাস-ছোটগল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নাটক-সঙ্গীত। এসবেরও আবার বহুরূপ আছে। সাহিত্যের সবচেয়ে নির্মোহ নিরস ও চিন্তাপ্রসূত যৌক্তিক শাখাটি প্রবন্ধ। ফলে যত সহজে একটি উপন্যাস ছোটগল্প কবিতা রচনা করা সম্ভব, প্রবন্ধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত সহজসাধ্য নয়। আবেগবর্জিত চিন্তাভাবনা যুক্তি এখানে কথা বলে।
অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এর একটি সহযোগী কার্যক্রম ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ প্রথমে কাজ করেছে ছোটগল্প নিয়ে। দ্বিতীয় প্রকাশনা কবি ওবায়েদ আকাশ ও কবি মাহফুজ আল-হোসেন সম্পাদিত প্রবন্ধ সংকলন: ‘শালুক-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ— প্রতিনির্মাণ’। ‘শালুক’ মূলত কবিতানির্ভর লিটল ম্যাগাজিন। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম সংকলনটিই হতে পারতো কবিতার। কিন্তু এখানে শালুকের সম্পাদকমণ্ডলী এবং শালুক ক্রিয়েটিভ পরিবার ভিন্নভাবে চিন্তা করেছে।
বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাস নতুন নয়। সাহিত্যিক-চিন্তাবিদ-সমাজচিন্তকরা সমাজ সংস্কার থেকে শুরু করে সমাজ-রাষ্ট্র বিভিন্ন দায়বোধ ও দায়িত্ব থেকে মানুষের ভেতরে চিন্তার জাগরণ ঘটাতে প্রবন্ধকেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ফলে প্রবন্ধের একক প্রবন্ধ গ্রন্থ যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও প্রয়োজনে বিভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ থেকে বাছাই করে প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রকাশের রীতি রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, বিষয় বিবেচনা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রকাশের রীতি ও আগ্রহ অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এক্ষেত্রে ‘শালুক’-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন ‘প্রতিনির্মাণ’ একটি অন্য রকম প্রয়াস। এটিও শালুকের দীর্ঘ সাতাশ বছরের ঊনত্রিশটি সংখ্যায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ থেকে বাছাই করা প্রবন্ধের সমাহার। স্বসম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ থেকে বাছাই করে নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে বোধহয় বিরল ঘটনা। এক্ষেত্রে শালুক নতুন এক পথের আলোর অভিস্রবন খুলে দিয়েছে, যা আগে কখনো ঘটেনি। সহজ কথায় বাংলা সাহিত্যে সংকলন প্রকাশনায় এ এক নতুন অভিযাত্রা।
বাংলা সাহিত্যে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ বিদগ্ধ মনীষীরা সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রয়োজনেই প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যা উপন্যাসে বলা যায় না, কবিতায় বলা যায় না, সেখানে প্রবন্ধ হয়ে ওঠে অনিবার্য।
সাধারণভাবে বাংলা ও ইংরেজিসহ সকল ভাষাতেই গদ্যের উদ্ভব ও ব্যবহারের সময় থেকেই প্রবন্ধের আত্মপ্রকাশ। ইংরেজি ভাষায় নবম শতক ও তার পরবর্তীকালে অনুবাদকার ও ধর্মযাজকদের হাতে এবং বাংলায় শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতে প্রবন্ধের জন্ম। এলিজাবেথের যুগে ফ্রান্সিস বেকন ও উনিশ শতকের প্রারম্ভিক পর্বে রামমোহন রায় যথাক্রমে ইংরেজি ও বাংলা প্রবন্ধ শিল্পের সার্থক রূপকার। সুতরাং সাহিত্যসাধক ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেন কবি হলেও প্রবন্ধ সাহিত্য যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন এই প্রবন্ধ সংকলনটিতে। এই সংকলনে বিখ্যাত অনেক প্রাবন্ধিকের প্রবন্ধ রয়েছে এবং তার সবই শালুকে প্রকাশিত। বাংলা প্রবন্ধের জন্ম ও বিকাশের ধারায় একুশ শতকের এই প্রবন্ধ সংকলনটি প্রবন্ধ সাহিত্যে উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম এক স্মারক হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রবন্ধগুলিতে দেশ-রাষ্ট্র চিন্তা থেকে ব্যক্তিচিন্তা, সাহিত্যের বহুকৌণিক বিশ্লেষণ, প্রত্যেকটি প্রবন্ধে যুক্তি ও বিশ্লেষণের ভিন্নতা, চিন্তা ও মননের নানা স্বরূপ, যুক্তির ভেতর হৃদয়াবেগও পরিলক্ষিত হয়েছে। বেশ কিছু প্রবন্ধে জ্ঞান, বুদ্ধি, চিন্তাচেতনার বিস্ময়কর গভীরতা রয়েছে, যা আমাদের মগজের চাহিদাকে পরিতৃপ্ত করে, আমাদের ভাবিত করে, জাগ্রত করে। কিছু প্রবন্ধ প্রাবন্ধিকের ভাবকল্পনার দীপ্তিতে আমাদের হৃদয়ের পিপাসা মেটাতে সক্ষম হয়েছে— যা প্রবন্ধের সঙ্গে আমাদের একাত্ম করে তোলে। বিশদ, জ্ঞানগর্ভ বিষয়ের যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি-প্রযুক্তিগত জীবনসমস্যাকে আত্মগত ভাবরসে স্নিগ্ধভাবে জারিত করে পাঠকের কাছে এক শান্ত, আবেগমন্থিত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
‘প্রতিনির্মাণ’ সংকলনে লেখকের নিজস্ব ভঙ্গি, মেজাজ, স্বতঃস্ফূর্ততা, যৌক্তিক ও চিন্তাপ্রসূত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংকলনটিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসনাত আবদুল হাই, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মোহাম্মদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ বিখ্যাত লেখকের প্রবন্ধ সংকলনের মর্যাদাকে কালোত্তীর্ণ করেছে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা সাহিত্যে এই সংকলনটি কালের যাত্রা ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে থাকবে বলে বিশ্বাস।
এই কাজটি যে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আছে তা সম্পাদকের ভাষ্যে প্রতীয়মান হয়, “প্রতিনির্মাণ নামটি কেবল একটি শিরোনাম নয়, এটি এই সংকলনের অন্তর্নিহিত বৌদ্ধিক প্রবণতারও একটি দ্যোতক। প্রচলিত চিন্তার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে পুনর্বিবেচনা, প্রশ্ন, বিশ্লেষণ, ভাঙন ও নতুন অর্থে নির্মাণের যে বিকল্পচিন্তা— এই সংকলনের বহু প্রবন্ধ সেই মননশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব, পুরাণ, ভাষা, কবিতা ও কথাসাহিত্য— বহুমাত্রিক এই বিষয় পরিসরে প্রবন্ধগুলো একদিকে আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে পুনর্পাঠ করে, অন্যদিকে সমকালীন মননের ভেতর থেকে নতুন প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।”
এই সংকলনের সম্পাদকদ্বয় তাদের কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ সম্পাদনায় তাদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাছাইয়ের কাজটি তারা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন বলেই বোধ হয় কঠিনের থেকে কঠিনকে জয় করতে পেরেছেন। এখানে গুণগতমান, বিষয়বস্তু, রচনাশৈলী— নানা বিষয় যুক্ত ছিল। এসব বিবেচনায় নিয়ে নির্মোহভাবে লেখা নির্বাচন কোনভাবেই সহজসাধ্য ছিল না। সম্পাকীয়তে তা উল্লেখও আছে, “বিশেষত একই থিমেটিক এরিয়ায় বিষয়গত সমোচ্চারণ রোধ করা এবং একজন প্রাবন্ধিকের একাধিক অসাধারণ রচনার মধ্য থেকে শ্রেয়তর একটি প্রবন্ধ নির্বাচন করা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোর অন্যতম। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের লক্ষ্যে প্রবন্ধগুলোর নিবিড় পুনর্পাঠ, সতর্ক পর্যবেক্ষণ, বিষয়গত ভারসাম্য রক্ষা, রচনার স্বাতন্ত্র্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক মূল্য বিচার এবং একাধিক সম্পাদকীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে। সেই অর্থে ‘প্রতিনির্মাণ’ শুধু নির্বাচিত প্রবন্ধ ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় পাঠ, বিচার ও পুনর্বিবেচনারও ফল।’
এই সংকলনের প্রবন্ধসমূহের বিষয়বৈচিত্র্য বহু বিস্তৃত, যুক্তি ও চিন্তার বহুরৈখিকতা, শিল্পিত পরিসর অত্যন্ত তাৎপর্যময়। প্রবন্ধের শিরোনাম ও লেখক তালিকা দেখলেই অনুভূত হয় এটা কতটা সমৃদ্ধ একটি সংকলন। সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জেমস জয়েসের ইউলিসিস— বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং মিথ— হাসনাত আবদুল হাই, সোনা-মোড়া কথাশিল্প: শহীদুল জহির— হাসান আজিজুল হক, জীবনানন্দের প্রেমের কবিতা— আবদুল মান্নান সৈয়দ, চেনা না-চেনা কথার কারিগর— জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রক্ত চুয়ে ওঠে চাঁদ, গ্রানাডায়— মোহাম্মদ রফিক, কাফকাকে পড়া, কাফকাকে পড়ানো— সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কাফকার প্যারাবোল ‘বিফোর দ্য ল’— জীবনসংগ্রামের এক অ্যাবসার্ড বাস্তবতা— আবদুস সেলিম, কবিতার ভিতর বাহির: সিকদার আমিনুল হক— শিহাব সরকার, বহুমাত্রিক শঙ্খ ঘোষ: বিপুল বিস্ময়— নাসির আহমেদ, কবি শঙ্খ ঘোষ ও তাঁর বাঁশি— দিলারা হাফিজ, শুশ্রূষার আশ্রয়ঘর— আবদুর রাজ্জাক, কেন উত্তরআধুনিক সাহিত্য চিন্তা— অঞ্জন সেন, সাহিত্যতত্ত্ব নয়, তত্ত্বে সাহিত্য— মাসুদুজ্জামান, বিশিষ্টতম কবি— মঈনউদ্দিন মুনশী, একগুচ্ছ বালক এবং একজন— দেবাহুতি চক্রবর্তী, কাফকায়েস্ক— কামাল রাহমান, ‘গাবো’ মনে রাখার ব্যক্তিগত চাবি— মামুন হুসাইন, দেবেশ রায়ের উপন্যাস: রাষ্ট্রই মুখ্য চরিত্র— সাদ কামালী, আমার ব্যক্তিগত মিথসমূহ— ইমতিয়ার শামীম, শঙ্খধ্বনি— মহীবুল আজিজ, শহীদুল জহির ও জাদুবাস্তবতা: এক ভুল পাঠের বিশ্লেষণ— আনিসুজ জামান, শহীদুল জহিরের চাঁদ ও চরিত্রেরা— শাহাব আহমেদ, কবির নিশীথচিত্র— কুমার চক্রবর্তী, কাফকা ও জীবনানন্দ— চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ, জীবনের নয়া বীজবপনের উত্তর ঔপনিবেশিক চেতনা— হাফিজ রশিদ খান, কাফকার দ্য মেটামরফসিস: অনন্য নভেলা— খালেদ হামিদী, তোমার ‘মতন’ আর কেউ নয়— সরকার আবদুল মান্নান, মৃত্যুর ১০০ বছর পরও ফ্রান্ৎস কাফকা কতটা প্রাসঙ্গিক!— শাকিব লোহানী, শঙ্খ ঘোষ: শব্দকে উজ্জ্বল করেন যে কবি— জিললুর রহমান, বাংলা নাট্যের আত্ম-সন্ধিৎসা বিপ্লব বালা, মিথ: এক আবহমান জাদুশক্তি— গৌতম গুহ রায়, লোরকার খোঁজে গ্রানাদায়— রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, শঙ্খ ঘোষের কবিতা— মিহির মুসাকী, শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্য: অস্তিত্ববাদী দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের স্বকীয় সৌরভ— মাহফুজ আল-হোসেন, শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ কবিতা: মূলের কাছাকাছি ছন্দ-শব্দ-নন্দনের মহার্ঘ ভাষ্য— ওবায়েদ আকাশ, শিল্প-সাহিত্যে ‘ইজম’-এর ব্যবহার: মডার্নিজম থেকে পোস্টমডার্নিজম— কামরুল ইসলাম, মহাদেশ, অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতার মহাকাব্য— শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হুইটম্যান এলিয়ট ফ্রস্ট: কাব্যচর্চায় ত্রয়ী প্রভাব— বিনয় বর্মন, জীবনানন্দের মৃত্যুরহস্য— হিন্দোল ভট্টাচার্য, শিল্প-জিজ্ঞাসা— আবু হেনা মোস্তফা এনাম, শেকড়ের টান, দেশভাগ এবং শঙ্খ ঘোষের কবিতা— রকিবুল হাসান, জীবনানন্দ দাশের কথাসাহিত্যচর্চা এবং কতিপয় জিজ্ঞাসাচিহ্ন— চন্দন আনোয়ার, লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের মর্মস্পর্শী ও দূরদর্শী সাহিত্যকর্ম— অনন্ত মাহফুজ, দৃশ্যকাব্যের কবি: শহীদুল জহির— কাজল রশীদ শাহীন, শহীদুল জহিরের গল্পনির্মাণশৈলীর বীক্ষণ— পারভেজ আহসান, বিশ্বের নতুন কবিতা— চন্দন চৌধুরী, শহীদুল জহিরের ভাষা ও বর্ণনারীতি— মোজাফ্ফর হোসেন, অনশন শিল্পী: যাপিত জীবনের অস্তিত্ববাদী চেতনার স্ফুরণ— মো. নাহিদ পারভেজ, বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিষয়, প্রকরণ ও বিশেষত্ব— জয়নাল আবেদীন শিবু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস: তুলনামূলক বিচার— সোহেল মাজহার, ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’: মার্কেসের অপেক্ষায় প্রহরগনা দারিদ্র্যপীড়িত নির্বাসিত জীবনের প্রতিচ্ছবি— সুরাইয়া ফারজানা হাসান, কাফকার ভূগোলে মার্কেস— তুষার তালুকদার, কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’: সর্বগ্রাসী আদালত ও একজন মানুষের গল্প— স্বপঞ্জয় চৌধুরী, এবং জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা: গভীর অন্তরবেদনা ও অনন্য ভাষাশৈলীর আলেখ্য— আনোয়ার মল্লিক।
‘প্রতিনির্মাণ’ সময়ের বুকে কঠিন এক নির্মাণ। এমন নির্মাণ ইচ্ছে করলেই করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন রয়েছে সাহিত্যের প্রতি দায় ও দায়িত্ব এবং নির্মোহ আত্মত্যাগ। এখানে বাণিজ্য নেই, পুঁজির বিকাশ নেই, সুখ-সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন ও হাতছানি নেই। আছে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়ে সাহিত্যের আকাশের আলো জ্বালাবার দৃঢ় প্রত্যয়। সাহিত্যেও নির্মোহ কঠিন সাধক না হলে এ ধরনের কর্মযজ্ঞ সাধন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিনির্মাণ কালের যাত্রায় তারই প্রমাণ বহন করবে— এ কথা শক্ত করেই বলা যেতে পারে। এমন একটি মহৎ কাজের জন্য ‘শালুক ক্রিয়েটিভ’ পরিবারকে ধন্যবাদ না জানালে অবিচার করা হবে।
শালুক-এর নির্বাচিত প্রবন্ধ: প্রতিনির্মাণ। সম্পাদনা: ওবায়েদ আকাশ ও মাহফুজ আল-হোসেন। প্রকাশক: শালুক ক্রিয়েটিভ। প্রচ্ছদ: সঞ্জয় দে রিপন। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬। পৃষ্ঠা ৫৪৪। মূল্য: ৮৭৫ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন