রোমেইন গ্যারি ছিলেন লিথুয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া একজন ফরাসি ঔপন্যাসিক, সামরিক বিমানচালক, কূটনীতিক, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং রহস্যময় লেখকদের একজন ছিলেন। তাঁর সাহিত্য প্রচলিত ঘরানার সীমানা অতিক্রম করে মানবতা, পরিচয় এবং মানুষের চিরন্তন শক্তির মতো বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধান করেছে। তিনি ‘এমিলে আজার’ ছদ্মনামে লিখেছেন এবং সুনাম কুড়িয়েছেন।
রোমেইন গ্যারির ‘দ্য লাইফ বিফোর আস’ বিশ শতকের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফরাসি উপন্যাস। তিনি একমাত্র লেখক যিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানিত ‘গনকোর্ট’ সাহিত্য পুরস্কার দু’বার জিতেছেন— দুই ভিন্ন নামে, প্রথম ছদ্মনামে (রোমেইন গ্যারি) এবং দ্বিতীয় ছদ্মনামে (এমিলে আজার)— যা মূলত ‘গনকোর্ট’ পুরস্কারের নিয়ম-বহির্ভূত ছিল।
রোমেইন গ্যারির একাধিক গুণ এবং একজন স্বনামধন্য এবং পাঠকনন্দিত সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ১৯৮০ সালে আত্মহত্যা করেন।
‘রোমেইন গ্যারি’ নাম রাখার পেছনে কারণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে লড়াই করার জন্য দখলকৃত ফ্রান্স থেকে পালিয়ে যান, তখন তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম রাখেন। প্রথমে (১৯৩৫ সালে) মাকে খুশি করার জন্য নাম রাখেন ‘রোমেইন’ এবং পরে ১৯৪০ সালের ২২ জুন রেডিওতে শুনেছিলেন ‘গ্যারি’ নাম, যা তিনি পদবি হিসেবে রাখেন। এছাড়া তিনি ছদ্মনামটি বেছে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর পরিচয় একজন ফরাসি লেখক ও কূটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রোমেইন গ্যারির প্রথম স্ত্রী ছিলেন ব্রিটিশ লেখিকা, সাংবাদিক এবং বিখ্যাত মার্কিন ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এর সম্পাদিকা লেসলি ব্লাঞ্চ। তাঁরা ১৯৪৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৬১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
তারপর গ্যারি হলিউডের অভিনেত্রী জিন সেবার্গকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় জিন সেবার্গের বয়স ছিল ২১ বছর এবং গ্যারি ৪৫ বছর বয়সী ছিলেন। তবে তিনি লেখক হিসেবে খ্যাতির চূড়ায় ওঠার পরপরই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে চির ধরে। সেসময় গুজব ছড়ায় যে, জিন সেবার্গ ব্ল্যাক প্যান্থার গ্রুপের একজন সদস্যের সঙ্গে রাত্রি যাপন করেছেন এবং তিনি সেই সদস্যের সন্তান বহন করছেন। গুজবে সেবার্গ হতাশ হয়ে পড়েন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তাঁকে একটি সমুদ্র সৈকতে অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। যাহোক, অবশেষে সেবার্গ যখন গ্যারির সন্তানের জন্ম দেন, তখন তাঁরা দু’জনই আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একসময় রোমেইন গ্যারি জানতে পারেন যে, হলিউডের সুপরিচিত অভিনেতা ক্লিন্ট ইস্টউডের সঙ্গে জিন সেবার্গের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যারি ক্লিন্ট ইস্টউডকে দ্বৈরথের জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কিন্তু ক্লিন্ট ইস্টউড তা প্রত্যাখ্যান করেন। শেষপর্যন্ত ১৯৬৮ সালে গ্যারি ও সেবার্গ আলাদা হন এবং দু’বছর পরে (১৯৭০ সালে) তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।
রোমেইন গ্যারি ১৯৮০ সালের ২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) প্যারিসের নিজের অ্যাপার্টমেন্টে .৩৮ (পয়েন্ট থ্রী এইট) ক্যালিবার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলভার মুখে ঢুকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তাঁর বয়স ছিল ৬৬ বছর।
জানা যায়, আত্মহত্যার মুহূর্তেও রোমেইন গ্যারি স্বাভাবিক ছিলেন। তিনি কাউকে বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাননি। তাই একা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তারপর তিনি মাথায় লাল শাওয়ার ক্যাপ পরেন এবং নিজেই গুলি করেন। কোনো ধরনের মৃত্যুর যন্ত্রণা বা মগজ বেরিয়ে আসার ঘটনা ছাড়াই তিনি তৎক্ষণাৎ মারা যান।
রোমেইন গ্যারির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান হয়েছিল সাঁ লুই দে ইনভ্যালিডসের চ্যাপেলে, যেখানে ফ্রান্সের বিশিষ্ট সামরিক নেতাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এবং যেখানে নেপোলিয়নের কবর রয়েছে। চার্লস্ দে গলের সব সহযোগী, খ্যাতনামা সামরিক নেতা, লেখক এবং রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন। তবে পাদ্রী অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে অস্বীকার করেছেন, কেননা রোমেইন গ্যারি আত্মহত্যা করেন এবং কোনো ধর্ম মেনে চলেননি। প্রথমে ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত ‘লা মার্সেইলেস’ পরিবেশন করা হয় এবং তারপর হঠাৎ গির্জার শিল্পীরা সমবেত সঙ্গীত শুরু করে। রোমেইন গ্যারির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ‘লাইলাক নেগ্রো’ গানটি গাওয়া হয়। পোলিশ গায়ক রুশ ভাষায় গানটি পরিবেশন করেন এবং উপস্থিত কেউ গানের কথা বুঝতে পারেননি। শোকাহত ফরাসিরা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন তারা রাশিয়ান অর্থডক্স সঙ্গীত শুনছেন।
যাহোক, পরে রোমেইন গ্যারির মৃতদেহ পেরে লাশেজ কবরস্থানে দাহ করা হয় এবং ছাই ভূমধ্যসাগরে রকেব্রুন-ক্যাপ-মার্তিনের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রোমেইন গ্যারির বহুমুখী জীবন এবং জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরেও তাঁর আত্মহননের নেপথ্যে মোটেও কোনো মামুলি কারণ ছিল না, বরং বিভিন্ন সূত্র থেকে একাধিক কারণ অনুমান করা হয়েছে। যেমন:
১. রোমেইন গ্যারির মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থে দেখা যায়, ছদ্মনামে গণকোর্ট পুরস্কার লাভের পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। কেননা তিনি মনে করেছিলেন যে, সাধারণ পাঠকরা তাঁর আসল উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তাঁকে হয়তো প্রতারণা করে খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করার জন্য একজন জালিয়াত মনে করত, এমনকি গণকোর্ট পুরস্কার কমিটির দশজন সম্মানিত বিচারকের আত্মমর্যাদা নিয়েও প্রভাব ফেলত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে এই মানসিক বোঝা ক্রমশ ভারি হয়ে উঠতে থাকে। সমাজকে আসল উদ্দেশ্য বোঝানো এবং আড়ালে ফিসফাস ও তীব্র সমালোচনার প্রবণতাকে রোধ করার জন্য তাঁর মনে হয়েছে যে, শুধুমাত্র মৃত্যুই সবকিছু সমাধান করতে পারে।
২. রোমেইন গ্যারির আত্মহত্যার আরেকটি বড় কারণ ছিল প্রচার মাধ্যম (মিডিয়া) এবং জনগণের মতামত বিশ্লেষণ। একজন সৎ লেখক হিসেবে তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন, নিরন্তরভাবে সমাজের অসুস্থতা এবং বিভিন্ন গভীর সমস্যা উন্মোচন ও বিশ্লেষণ করতেন। তিনি তাঁর মাতৃভূমির মুক্তি যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন এবং জানতেন যে, বিজয়ের দাম কতটা মূল্যবান এবং কষ্টসাধ্য। তবে যুদ্ধপরবর্তী সামাজিক অবস্থা তাঁর সেই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল, যা অনেক বছর আগে যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন সৈনিক আশা করেছিলেন। রাজনীতিবিদরা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা অর্থকড়ি অপব্যয় করতেন এবং কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখতেন না; প্রতারণা এবং একে অপরকে ধ্বংস করা সমাজের নীরব নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যবধান খুব তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সামাজিক সংঘাত ভীষণভাবে দেখা দিয়েছিল। তিনি জানতেন যে, তাঁর কলম সমাজকে বাঁচাতে পারবে না। তাই তিনি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আত্মহননের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
৩. অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, রোমেইন গ্যারির আত্মহত্যা তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী জিন সেবার্গের আগের বছরের বিতর্কিত মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও তিনি প্রাক্তন স্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জিন সেবার্গের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এফবিআই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গুঞ্জন (বিশেষ করে ব্ল্যাক প্যান্থার্সের সঙ্গে জড়িত থাকা এবং গর্ভধারণ) ছড়িয়েছিল, যা তাঁর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। ধারণা করা হয় যে, তিনি নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ তিনি গভীর মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। কিন্তু তিনি আত্মহত্যার চিরকূটে রেখে গেছেন যে, তাঁর মৃত্যু প্রাক্তন স্ত্রীর আত্মহত্যার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
৪. রোমেইন গ্যারি নিজের আত্মহত্যা চিরকূটে লিখেছেন যে, তাঁর মানসিক সমস্যাগুলো যুবক বয়স থেকেই ছিল। তবে তিনি সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যেতে পারতেন। আসলে তাঁর আত্মহত্যা ছিল মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘকালীন সমস্যার অংশ।
রোমেইন গ্যারির (স্বনামে এবং ছদ্মনামে) প্রায় সব উপন্যাস বিশ্বের পাঠকদের সঙ্গে আজও সংযোগ স্থাপন করে চলেছে, এমনকি পরিচয়, মানবিকতা এবং আধুনিক বিশ্বের জটিলতা নিয়ে চিরন্তন অনুসন্ধান করার সুযোগ তৈরি করেছে। একজন সফল ঔপন্যাসিক এবং অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা ও কৌশল উত্তরাধিকার হিসেবে বেঁচে থাকবে।
রোমেইন গ্যারি কেবল উৎকৃষ্ট এবং পাঠকনন্দিত লেখার জন্য স্মরণীয় নন, বরং তিনি তাঁর সাহস, সৃজনশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। লেখক হিসেবে তাঁর দ্বৈত পরিচয় আধুনিক সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। খুব কম লেখকই এত নাটকীয়ভাবে এবং সফলভাবে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করতে পেরেছেন।
লেখকদের ব্র্যান্ড এবং পরিচয় নিয়ে যে জগত এতই পাগল, সেখানে রোমেইন গ্যারির কাহিনি মনে করিয়ে দেয়: লেখালেখি আসলে কী— অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, বিকাশের সুযোগ এবং মাঝেমধ্যে শিল্পের জন্য ধোঁকাবাজি। তবে নতুন লেখকদের জন্য রোমেইন গ্যারির উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে প্রেরণা যোগায়। কেননা তিনি কেবল কাহিনি লিখতেন না, বরং নিজেই একটি গল্প ছিলেন।
ফরাসি সাহিত্যে রোমেইন গ্যারির অবদানকে সম্মান জানাতে তাঁর নাম বিভিন্ন প্রচার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর নামানুসারে প্যারিসের একটি জায়গার নামকরণ করা হয়েছে এবং নিস শহরের ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারের নাম রাখা হয়েছে। জেরুসালেমে অবস্থিত ফরাসি ইনস্টিটিউটও রোমেইন গ্যারির নাম বহন করে। এছাড়া ২০১৯ সালে তাঁর সাহিত্যকর্ম ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানিত প্লেয়াড গ্রন্থাগার থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
রোমেইন গ্যারির উপন্যাস প্রমিস অব ডন-এর মুখ্য চরিত্র রোমুয়ালদাস কভিনটাসের একটি মূর্তি ২০০৭ সালে ভিলনিয়াস শহরে বাসানাভিকাস-এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তাঁর শৈশব কেটেছে। তাঁর নামে একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে আইক্স-মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞান অনুষদের পুইয়ন বিল্ডিং-এ, যেখানে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর কাজ ফরাসি সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের গভীরতা ও নতুনত্বের জন্য এখনো স্মরণ করা হয়।
তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও তুখোড় প্রতিভার অধিকারী রোমেইন গ্যারির জীবন ছিল বহুমুখী। তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক, সামরিক বাহিনির বিমান চালক, কূটনৈতিক কর্মকর্তা, চিত্র নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম সফল লেখক। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন ছাড়াও ছদ্মনামের আড়ালে আরেক জীবন কাটিয়েছেন। রোমেইন গ্যারি এবং এমিলে আজার নামের দ্বৈত জীবন তাঁকে তাঁর লেখনীর শৈলীকে নতুনভাবে তৈরি করতে এবং সাহিত্য জগতের সঙ্গে এক নতুন ও পরীক্ষামূলক পথে যুক্ত হতে সাহায্য করেছিল। আর সেই দ্বৈত লেখক জীবনে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিলেন, যেমন দু’নামে দু’বার ‘গনকোর্ট’ সাহিত্য পুরস্কার জয় করা। তবুও তাঁকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং সামাজিক চাপের কারণে মানসিক অবসাদে ভুগতে হয়েছে।
রোমেইন গ্যারির আত্মহনন ছিল দুঃখজনক ঘটনা। মাত্র একটি গুলিতে ফরাসি সাহিত্য একজন মহান লেখকের আলাদা দুই লেখক সত্তাকে হারিয়েছে। তবে এ কথা সত্যি যে, তিনি বিশ্বের কাছে ছদ্মনামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখার মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার এবং সমাজকে সতর্ক করার জন্য নিজের মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে প্রমাণ করেছেন যে, রোমেইন গ্যারি ছিলেন একজন সৎ চরিত্রের এবং শক্তিশালী দায়বদ্ধতার মানুষ।
ইহুদী অভিবাসী থেকে ফরাসি সাহিত্যে খ্যাতিমান লেখকে রূপান্তরের রোমেইন গ্যারির অসাধারণ যাত্রা, যা সহনশীলতা এবং বহুমুখিতার প্রতীক, তা বিশ্বব্যাপী পাঠক এবং লেখকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
জন্মের পর রোমেইন গ্যারির নাম রাখা হয়েছিল রোমান লেইবোভিচ কাতসেভ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৪ সালের ৮ মে (কেউ বলে ২১ মে), মস্কোতে (কিছু সূত্র অনুসারে, ভিলনিয়াস, লিথুয়ানিয়া) এক রুশ ইহুদি পরিবারে। তাঁর বাবা ১৯২৫ সালে পরিবার ত্যাগ করে পুনরায় বিয়ে করেন। তখন থেকে মা তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। যখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর, তখন তিনি এবং তাঁর মা ফ্রান্সের নিস শহরে চলে যান। সেখানে তিনি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন, যেখানে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
রোমেইন গ্যারির শৈশবকাল তাঁর মায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর মা ছিলেন অভিনেত্রী এবং তিনি ছেলেকে সাফল্যের দিকে পথ চলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ছেলেকে কেবল জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করেননি, বরং একই সঙ্গে জীবনকে ভালোবাসতে এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন অনুসরণ করার পথ দেখিয়েছেন। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা এবং প্রত্যাশা বালক রোমেইন গ্যারিকে ধৈর্য ধরার প্রেরণা যুগিয়েছ, যা তাঁকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস দিয়েছে।
রোমেইন গ্যারি সৈন্যবাহিনির বিমান চালক হিসেবে ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় ২৫টির বেশি আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁর সাহসিকতার জন্য অনেক মেডেল ও সম্মান পেয়েছিলেন। যুদ্ধের পরে তিনি একজন ফরাসি কূটনীতিক হিসেবে সোফিয়া, বার্ন এবং লন্ডনের দূতাবাসে কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত লস এঞ্জেলেসে ফরাসি কনস্যুল জেনারেল ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে নিউ ইয়র্কে এবং পরে (১৯৫৫) লন্ডনে জাতিসংঘে ফরাসি প্রতিনিধি দলের সেক্রেটারি ছিলেন।
রোমেইন গ্যারির রচনা বিভিন্ন সাহিত্যধারার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে বাইরেও গেছে এবং সেখানে তিনি পরিচয়, মানবতা এবং মানব আত্মার চিরস্থায়ী শক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বলা হয়, তাঁর উপন্যাস আত্মজীবনীমূলক এবং অনেকটাই কাল্পনিক (যদিও তিনি স্মৃতিকথা হিসেবে দাবি করেছেন), যা সত্য ও মিথ্যা আলাদা করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। তিনি সম্ভবত দু’টি ফরাসি ভাষার মাস্টারপিসের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং সেই দু’টি গ্রন্থের জন্য তিনি আলাদা ছদ্মনামে ‘গনকোর্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথমটি রোমেইন গ্যারি নামে প্রকাশিত লেস রেসিন দ্যু সিয়েল (১৯৫৬), যার ইংরেজি অনুবাদ হলো দ্য রুটস অব হেভেন। এই উপন্যাসে পরিবেশবাদ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয়টি এমিল আজার ছদ্মনামে প্রকাশিত লা ভি দেভঁত সোয়ি (১৯৭৫), যা ইংরেজিতে ‘দ্য লাইফ বিফোর আস’ বা ‘মোমো’ নামে অনুবাদ করা হয়েছে। এ উপন্যাসে তিনি সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে তুলে ধরেছেন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে জাতিগত বৈষম্য। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে দ্য এডুকেশন অব ইউরোপ, দ্য কোম্পানি অব ম্যান (যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্যারিসের পটভূমিতে লেখা হয়েছে), লেডি এল (ফরাসি ও ইংরেজি সংস্করণ, ১৯৫৯), প্রমিস অ্যাট ডন (ব্যাঙ্গাত্মক), হোয়াইট ডগ, দ্য লাইট অব অ্যা উম্যান (আত্মজীবনী) এবং দ্য কাইটস। উল্লেখ্য, এসব বই তাঁর বহুমুখী সাহিত্যিক প্রতিভার অনন্য অন্তর্দৃষ্টির উজ্জ্বল উদাহরণ। এছাড়া তিনি ১৯৬২ সালের ডি-ডে নিয়ে তৈরি বড় বাজেটের চলচ্চিত্র দ্য লংগেস্ট ডে-এর জন্যও সহ-লেখক ছিলেন, যেখানে খ্যাতনামা অভিনেতা জন ওয়েইন অভিনয় করেছিলেন।
রোমেইন গ্যারি নামে একাধিক পাঠক নন্দিত উপন্যাস উপহার দিলেও একসময় তিনি লেখালেখির জন্য এমিল আজার ছদ্মনাম নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা তখন তাঁকে বিশ শতকের সবচেয়ে বিশাল প্রতারণার একজন লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং নিজেও এক ধরনের পৌরাণিক কাহিনির অংশ হয়ে যান। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সমালোচকরা হঠাৎ করে তাঁর প্রতি মনোযোগ কমাতে শুরু করেন এবং একই সঙ্গে ‘হাল-ফ্যাশন’ ম্যাগাজিনগুলো গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, রোমেইন গ্যারির ‘সাহিত্য রচনার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি কখনোই প্রতারণা শুরু করার ইচ্ছা করেননি। তিনি ফরাসি ভাষায় এৎড়ং পধষরহ শিরোনামে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে শেষ মুহূর্তে ঠিক করেন তিনি বইটি নতুন ছদ্মনামে (এমিল আজার) প্রকাশ করবেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রকাশের পর বইটি ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, নতুন ছদ্মনামের রহস্যটি উন্মোচন করবেন না, অর্থাৎ গোপন রেখে দেবেন। কেননা তিনি সবসময় মজা এবং প্রতারণা পছন্দ করতেন। তার পর থেকে তিনি উভয় নামেই (রোমেইন গ্যারি এবং এমিল আজার) লেখা চালিয়ে যান। তবে পরবর্তীতে তিনি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গ্রন্থে (দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব এমিল আজার) সত্যিটা প্রকাশ করেন। জানা যায়, তিনি আরও অনেক ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন, যেমন শাতান বোগাত (রুশ ভাষায় ‘ধনবান শয়তান’), জন মার্কহাম বিচ (প্রমিজ অ্যাট ডন গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে), ফোসকো সিনিবাল্ডি এবং ফ্রাঁসোয়া মেরমন্ট।
রোমেইন গ্যারি অবিশ্বাস্যভাবে প্রতিভাবান ছিলেন এবং ছয়টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (ইডিশ, রুশ, পোলিশ, ফরাসি, জার্মান এবং ইংরেজি)। তবে তাঁর বেশিরভাগ বই ফরাসি ভাষায় লেখা হয়েছে। তিনি ইংরেজিতেও ছয়টি উপন্যাস লিখেছেন এবং পরে নিজেই সেগুলো ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
রোমেইন গ্যারির একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন লেডি এল-এর কাহিনি অবলম্বনে ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন পিটার উস্তিনভ, যেখানে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সোফিয়া লরেন এবং পল নিউম্যান। এছাড়া ইজরায়েলী পরিচালক মোশে মিজরাহি ১৯৭৭ সালে গ্যারির সবচেয়ে বেশি বিক্রিত উপন্যাস দ্য লাইফ বিফোর আস-এর উপর অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘মাদাম রোজা’ তৈরি করেন।
একজন খ্যাতিমান লেখক এবং কূটনীতিবিদ ছাড়াও রোমেইন গ্যারি নিজের উপন্যাসের কাহিনির ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন, যা ফ্রান্সে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে তিনি আরও দু’টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন— বার্ডস ইন পেরু (১৯৬৮, প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য) এবং কিল! (১৯৭১)— যা উভয় চলচ্চিত্রে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী জিন সেবার্গ অভিনয় করেছিলেন।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রোমেইন গ্যারি ছিলেন লিথুয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া একজন ফরাসি ঔপন্যাসিক, সামরিক বিমানচালক, কূটনীতিক, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং রহস্যময় লেখকদের একজন ছিলেন। তাঁর সাহিত্য প্রচলিত ঘরানার সীমানা অতিক্রম করে মানবতা, পরিচয় এবং মানুষের চিরন্তন শক্তির মতো বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধান করেছে। তিনি ‘এমিলে আজার’ ছদ্মনামে লিখেছেন এবং সুনাম কুড়িয়েছেন।
রোমেইন গ্যারির ‘দ্য লাইফ বিফোর আস’ বিশ শতকের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফরাসি উপন্যাস। তিনি একমাত্র লেখক যিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানিত ‘গনকোর্ট’ সাহিত্য পুরস্কার দু’বার জিতেছেন— দুই ভিন্ন নামে, প্রথম ছদ্মনামে (রোমেইন গ্যারি) এবং দ্বিতীয় ছদ্মনামে (এমিলে আজার)— যা মূলত ‘গনকোর্ট’ পুরস্কারের নিয়ম-বহির্ভূত ছিল।
রোমেইন গ্যারির একাধিক গুণ এবং একজন স্বনামধন্য এবং পাঠকনন্দিত সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ১৯৮০ সালে আত্মহত্যা করেন।
‘রোমেইন গ্যারি’ নাম রাখার পেছনে কারণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে লড়াই করার জন্য দখলকৃত ফ্রান্স থেকে পালিয়ে যান, তখন তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম রাখেন। প্রথমে (১৯৩৫ সালে) মাকে খুশি করার জন্য নাম রাখেন ‘রোমেইন’ এবং পরে ১৯৪০ সালের ২২ জুন রেডিওতে শুনেছিলেন ‘গ্যারি’ নাম, যা তিনি পদবি হিসেবে রাখেন। এছাড়া তিনি ছদ্মনামটি বেছে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর পরিচয় একজন ফরাসি লেখক ও কূটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রোমেইন গ্যারির প্রথম স্ত্রী ছিলেন ব্রিটিশ লেখিকা, সাংবাদিক এবং বিখ্যাত মার্কিন ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এর সম্পাদিকা লেসলি ব্লাঞ্চ। তাঁরা ১৯৪৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৬১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।
তারপর গ্যারি হলিউডের অভিনেত্রী জিন সেবার্গকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় জিন সেবার্গের বয়স ছিল ২১ বছর এবং গ্যারি ৪৫ বছর বয়সী ছিলেন। তবে তিনি লেখক হিসেবে খ্যাতির চূড়ায় ওঠার পরপরই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে চির ধরে। সেসময় গুজব ছড়ায় যে, জিন সেবার্গ ব্ল্যাক প্যান্থার গ্রুপের একজন সদস্যের সঙ্গে রাত্রি যাপন করেছেন এবং তিনি সেই সদস্যের সন্তান বহন করছেন। গুজবে সেবার্গ হতাশ হয়ে পড়েন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তাঁকে একটি সমুদ্র সৈকতে অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। যাহোক, অবশেষে সেবার্গ যখন গ্যারির সন্তানের জন্ম দেন, তখন তাঁরা দু’জনই আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একসময় রোমেইন গ্যারি জানতে পারেন যে, হলিউডের সুপরিচিত অভিনেতা ক্লিন্ট ইস্টউডের সঙ্গে জিন সেবার্গের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যারি ক্লিন্ট ইস্টউডকে দ্বৈরথের জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কিন্তু ক্লিন্ট ইস্টউড তা প্রত্যাখ্যান করেন। শেষপর্যন্ত ১৯৬৮ সালে গ্যারি ও সেবার্গ আলাদা হন এবং দু’বছর পরে (১৯৭০ সালে) তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।
রোমেইন গ্যারি ১৯৮০ সালের ২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) প্যারিসের নিজের অ্যাপার্টমেন্টে .৩৮ (পয়েন্ট থ্রী এইট) ক্যালিবার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলভার মুখে ঢুকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তাঁর বয়স ছিল ৬৬ বছর।
জানা যায়, আত্মহত্যার মুহূর্তেও রোমেইন গ্যারি স্বাভাবিক ছিলেন। তিনি কাউকে বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাননি। তাই একা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তারপর তিনি মাথায় লাল শাওয়ার ক্যাপ পরেন এবং নিজেই গুলি করেন। কোনো ধরনের মৃত্যুর যন্ত্রণা বা মগজ বেরিয়ে আসার ঘটনা ছাড়াই তিনি তৎক্ষণাৎ মারা যান।
রোমেইন গ্যারির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান হয়েছিল সাঁ লুই দে ইনভ্যালিডসের চ্যাপেলে, যেখানে ফ্রান্সের বিশিষ্ট সামরিক নেতাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এবং যেখানে নেপোলিয়নের কবর রয়েছে। চার্লস্ দে গলের সব সহযোগী, খ্যাতনামা সামরিক নেতা, লেখক এবং রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন। তবে পাদ্রী অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে অস্বীকার করেছেন, কেননা রোমেইন গ্যারি আত্মহত্যা করেন এবং কোনো ধর্ম মেনে চলেননি। প্রথমে ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত ‘লা মার্সেইলেস’ পরিবেশন করা হয় এবং তারপর হঠাৎ গির্জার শিল্পীরা সমবেত সঙ্গীত শুরু করে। রোমেইন গ্যারির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ‘লাইলাক নেগ্রো’ গানটি গাওয়া হয়। পোলিশ গায়ক রুশ ভাষায় গানটি পরিবেশন করেন এবং উপস্থিত কেউ গানের কথা বুঝতে পারেননি। শোকাহত ফরাসিরা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন তারা রাশিয়ান অর্থডক্স সঙ্গীত শুনছেন।
যাহোক, পরে রোমেইন গ্যারির মৃতদেহ পেরে লাশেজ কবরস্থানে দাহ করা হয় এবং ছাই ভূমধ্যসাগরে রকেব্রুন-ক্যাপ-মার্তিনের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রোমেইন গ্যারির বহুমুখী জীবন এবং জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার পরেও তাঁর আত্মহননের নেপথ্যে মোটেও কোনো মামুলি কারণ ছিল না, বরং বিভিন্ন সূত্র থেকে একাধিক কারণ অনুমান করা হয়েছে। যেমন:
১. রোমেইন গ্যারির মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থে দেখা যায়, ছদ্মনামে গণকোর্ট পুরস্কার লাভের পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। কেননা তিনি মনে করেছিলেন যে, সাধারণ পাঠকরা তাঁর আসল উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তাঁকে হয়তো প্রতারণা করে খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করার জন্য একজন জালিয়াত মনে করত, এমনকি গণকোর্ট পুরস্কার কমিটির দশজন সম্মানিত বিচারকের আত্মমর্যাদা নিয়েও প্রভাব ফেলত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে এই মানসিক বোঝা ক্রমশ ভারি হয়ে উঠতে থাকে। সমাজকে আসল উদ্দেশ্য বোঝানো এবং আড়ালে ফিসফাস ও তীব্র সমালোচনার প্রবণতাকে রোধ করার জন্য তাঁর মনে হয়েছে যে, শুধুমাত্র মৃত্যুই সবকিছু সমাধান করতে পারে।
২. রোমেইন গ্যারির আত্মহত্যার আরেকটি বড় কারণ ছিল প্রচার মাধ্যম (মিডিয়া) এবং জনগণের মতামত বিশ্লেষণ। একজন সৎ লেখক হিসেবে তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন, নিরন্তরভাবে সমাজের অসুস্থতা এবং বিভিন্ন গভীর সমস্যা উন্মোচন ও বিশ্লেষণ করতেন। তিনি তাঁর মাতৃভূমির মুক্তি যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন এবং জানতেন যে, বিজয়ের দাম কতটা মূল্যবান এবং কষ্টসাধ্য। তবে যুদ্ধপরবর্তী সামাজিক অবস্থা তাঁর সেই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল, যা অনেক বছর আগে যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন সৈনিক আশা করেছিলেন। রাজনীতিবিদরা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা অর্থকড়ি অপব্যয় করতেন এবং কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখতেন না; প্রতারণা এবং একে অপরকে ধ্বংস করা সমাজের নীরব নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যবধান খুব তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সামাজিক সংঘাত ভীষণভাবে দেখা দিয়েছিল। তিনি জানতেন যে, তাঁর কলম সমাজকে বাঁচাতে পারবে না। তাই তিনি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আত্মহননের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
৩. অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, রোমেইন গ্যারির আত্মহত্যা তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী জিন সেবার্গের আগের বছরের বিতর্কিত মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও তিনি প্রাক্তন স্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জিন সেবার্গের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এফবিআই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গুঞ্জন (বিশেষ করে ব্ল্যাক প্যান্থার্সের সঙ্গে জড়িত থাকা এবং গর্ভধারণ) ছড়িয়েছিল, যা তাঁর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। ধারণা করা হয় যে, তিনি নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ তিনি গভীর মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। কিন্তু তিনি আত্মহত্যার চিরকূটে রেখে গেছেন যে, তাঁর মৃত্যু প্রাক্তন স্ত্রীর আত্মহত্যার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
৪. রোমেইন গ্যারি নিজের আত্মহত্যা চিরকূটে লিখেছেন যে, তাঁর মানসিক সমস্যাগুলো যুবক বয়স থেকেই ছিল। তবে তিনি সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যেতে পারতেন। আসলে তাঁর আত্মহত্যা ছিল মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘকালীন সমস্যার অংশ।
রোমেইন গ্যারির (স্বনামে এবং ছদ্মনামে) প্রায় সব উপন্যাস বিশ্বের পাঠকদের সঙ্গে আজও সংযোগ স্থাপন করে চলেছে, এমনকি পরিচয়, মানবিকতা এবং আধুনিক বিশ্বের জটিলতা নিয়ে চিরন্তন অনুসন্ধান করার সুযোগ তৈরি করেছে। একজন সফল ঔপন্যাসিক এবং অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা ও কৌশল উত্তরাধিকার হিসেবে বেঁচে থাকবে।
রোমেইন গ্যারি কেবল উৎকৃষ্ট এবং পাঠকনন্দিত লেখার জন্য স্মরণীয় নন, বরং তিনি তাঁর সাহস, সৃজনশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। লেখক হিসেবে তাঁর দ্বৈত পরিচয় আধুনিক সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। খুব কম লেখকই এত নাটকীয়ভাবে এবং সফলভাবে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করতে পেরেছেন।
লেখকদের ব্র্যান্ড এবং পরিচয় নিয়ে যে জগত এতই পাগল, সেখানে রোমেইন গ্যারির কাহিনি মনে করিয়ে দেয়: লেখালেখি আসলে কী— অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, বিকাশের সুযোগ এবং মাঝেমধ্যে শিল্পের জন্য ধোঁকাবাজি। তবে নতুন লেখকদের জন্য রোমেইন গ্যারির উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে প্রেরণা যোগায়। কেননা তিনি কেবল কাহিনি লিখতেন না, বরং নিজেই একটি গল্প ছিলেন।
ফরাসি সাহিত্যে রোমেইন গ্যারির অবদানকে সম্মান জানাতে তাঁর নাম বিভিন্ন প্রচার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর নামানুসারে প্যারিসের একটি জায়গার নামকরণ করা হয়েছে এবং নিস শহরের ঐতিহ্যবাহী পাঠাগারের নাম রাখা হয়েছে। জেরুসালেমে অবস্থিত ফরাসি ইনস্টিটিউটও রোমেইন গ্যারির নাম বহন করে। এছাড়া ২০১৯ সালে তাঁর সাহিত্যকর্ম ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানিত প্লেয়াড গ্রন্থাগার থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
রোমেইন গ্যারির উপন্যাস প্রমিস অব ডন-এর মুখ্য চরিত্র রোমুয়ালদাস কভিনটাসের একটি মূর্তি ২০০৭ সালে ভিলনিয়াস শহরে বাসানাভিকাস-এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তাঁর শৈশব কেটেছে। তাঁর নামে একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে আইক্স-মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞান অনুষদের পুইয়ন বিল্ডিং-এ, যেখানে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর কাজ ফরাসি সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের গভীরতা ও নতুনত্বের জন্য এখনো স্মরণ করা হয়।
তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও তুখোড় প্রতিভার অধিকারী রোমেইন গ্যারির জীবন ছিল বহুমুখী। তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক, সামরিক বাহিনির বিমান চালক, কূটনৈতিক কর্মকর্তা, চিত্র নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম সফল লেখক। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন ছাড়াও ছদ্মনামের আড়ালে আরেক জীবন কাটিয়েছেন। রোমেইন গ্যারি এবং এমিলে আজার নামের দ্বৈত জীবন তাঁকে তাঁর লেখনীর শৈলীকে নতুনভাবে তৈরি করতে এবং সাহিত্য জগতের সঙ্গে এক নতুন ও পরীক্ষামূলক পথে যুক্ত হতে সাহায্য করেছিল। আর সেই দ্বৈত লেখক জীবনে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিলেন, যেমন দু’নামে দু’বার ‘গনকোর্ট’ সাহিত্য পুরস্কার জয় করা। তবুও তাঁকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং সামাজিক চাপের কারণে মানসিক অবসাদে ভুগতে হয়েছে।
রোমেইন গ্যারির আত্মহনন ছিল দুঃখজনক ঘটনা। মাত্র একটি গুলিতে ফরাসি সাহিত্য একজন মহান লেখকের আলাদা দুই লেখক সত্তাকে হারিয়েছে। তবে এ কথা সত্যি যে, তিনি বিশ্বের কাছে ছদ্মনামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখার মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার এবং সমাজকে সতর্ক করার জন্য নিজের মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে প্রমাণ করেছেন যে, রোমেইন গ্যারি ছিলেন একজন সৎ চরিত্রের এবং শক্তিশালী দায়বদ্ধতার মানুষ।
ইহুদী অভিবাসী থেকে ফরাসি সাহিত্যে খ্যাতিমান লেখকে রূপান্তরের রোমেইন গ্যারির অসাধারণ যাত্রা, যা সহনশীলতা এবং বহুমুখিতার প্রতীক, তা বিশ্বব্যাপী পাঠক এবং লেখকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
জন্মের পর রোমেইন গ্যারির নাম রাখা হয়েছিল রোমান লেইবোভিচ কাতসেভ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৪ সালের ৮ মে (কেউ বলে ২১ মে), মস্কোতে (কিছু সূত্র অনুসারে, ভিলনিয়াস, লিথুয়ানিয়া) এক রুশ ইহুদি পরিবারে। তাঁর বাবা ১৯২৫ সালে পরিবার ত্যাগ করে পুনরায় বিয়ে করেন। তখন থেকে মা তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। যখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর, তখন তিনি এবং তাঁর মা ফ্রান্সের নিস শহরে চলে যান। সেখানে তিনি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন, যেখানে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
রোমেইন গ্যারির শৈশবকাল তাঁর মায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর মা ছিলেন অভিনেত্রী এবং তিনি ছেলেকে সাফল্যের দিকে পথ চলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ছেলেকে কেবল জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করেননি, বরং একই সঙ্গে জীবনকে ভালোবাসতে এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন অনুসরণ করার পথ দেখিয়েছেন। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা এবং প্রত্যাশা বালক রোমেইন গ্যারিকে ধৈর্য ধরার প্রেরণা যুগিয়েছ, যা তাঁকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস দিয়েছে।
রোমেইন গ্যারি সৈন্যবাহিনির বিমান চালক হিসেবে ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় ২৫টির বেশি আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁর সাহসিকতার জন্য অনেক মেডেল ও সম্মান পেয়েছিলেন। যুদ্ধের পরে তিনি একজন ফরাসি কূটনীতিক হিসেবে সোফিয়া, বার্ন এবং লন্ডনের দূতাবাসে কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত লস এঞ্জেলেসে ফরাসি কনস্যুল জেনারেল ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে নিউ ইয়র্কে এবং পরে (১৯৫৫) লন্ডনে জাতিসংঘে ফরাসি প্রতিনিধি দলের সেক্রেটারি ছিলেন।
রোমেইন গ্যারির রচনা বিভিন্ন সাহিত্যধারার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে বাইরেও গেছে এবং সেখানে তিনি পরিচয়, মানবতা এবং মানব আত্মার চিরস্থায়ী শক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বলা হয়, তাঁর উপন্যাস আত্মজীবনীমূলক এবং অনেকটাই কাল্পনিক (যদিও তিনি স্মৃতিকথা হিসেবে দাবি করেছেন), যা সত্য ও মিথ্যা আলাদা করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। তিনি সম্ভবত দু’টি ফরাসি ভাষার মাস্টারপিসের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং সেই দু’টি গ্রন্থের জন্য তিনি আলাদা ছদ্মনামে ‘গনকোর্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথমটি রোমেইন গ্যারি নামে প্রকাশিত লেস রেসিন দ্যু সিয়েল (১৯৫৬), যার ইংরেজি অনুবাদ হলো দ্য রুটস অব হেভেন। এই উপন্যাসে পরিবেশবাদ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয়টি এমিল আজার ছদ্মনামে প্রকাশিত লা ভি দেভঁত সোয়ি (১৯৭৫), যা ইংরেজিতে ‘দ্য লাইফ বিফোর আস’ বা ‘মোমো’ নামে অনুবাদ করা হয়েছে। এ উপন্যাসে তিনি সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে তুলে ধরেছেন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে জাতিগত বৈষম্য। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে দ্য এডুকেশন অব ইউরোপ, দ্য কোম্পানি অব ম্যান (যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্যারিসের পটভূমিতে লেখা হয়েছে), লেডি এল (ফরাসি ও ইংরেজি সংস্করণ, ১৯৫৯), প্রমিস অ্যাট ডন (ব্যাঙ্গাত্মক), হোয়াইট ডগ, দ্য লাইট অব অ্যা উম্যান (আত্মজীবনী) এবং দ্য কাইটস। উল্লেখ্য, এসব বই তাঁর বহুমুখী সাহিত্যিক প্রতিভার অনন্য অন্তর্দৃষ্টির উজ্জ্বল উদাহরণ। এছাড়া তিনি ১৯৬২ সালের ডি-ডে নিয়ে তৈরি বড় বাজেটের চলচ্চিত্র দ্য লংগেস্ট ডে-এর জন্যও সহ-লেখক ছিলেন, যেখানে খ্যাতনামা অভিনেতা জন ওয়েইন অভিনয় করেছিলেন।
রোমেইন গ্যারি নামে একাধিক পাঠক নন্দিত উপন্যাস উপহার দিলেও একসময় তিনি লেখালেখির জন্য এমিল আজার ছদ্মনাম নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেননা তখন তাঁকে বিশ শতকের সবচেয়ে বিশাল প্রতারণার একজন লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং নিজেও এক ধরনের পৌরাণিক কাহিনির অংশ হয়ে যান। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সমালোচকরা হঠাৎ করে তাঁর প্রতি মনোযোগ কমাতে শুরু করেন এবং একই সঙ্গে ‘হাল-ফ্যাশন’ ম্যাগাজিনগুলো গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, রোমেইন গ্যারির ‘সাহিত্য রচনার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি কখনোই প্রতারণা শুরু করার ইচ্ছা করেননি। তিনি ফরাসি ভাষায় এৎড়ং পধষরহ শিরোনামে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে শেষ মুহূর্তে ঠিক করেন তিনি বইটি নতুন ছদ্মনামে (এমিল আজার) প্রকাশ করবেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রকাশের পর বইটি ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, নতুন ছদ্মনামের রহস্যটি উন্মোচন করবেন না, অর্থাৎ গোপন রেখে দেবেন। কেননা তিনি সবসময় মজা এবং প্রতারণা পছন্দ করতেন। তার পর থেকে তিনি উভয় নামেই (রোমেইন গ্যারি এবং এমিল আজার) লেখা চালিয়ে যান। তবে পরবর্তীতে তিনি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গ্রন্থে (দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব এমিল আজার) সত্যিটা প্রকাশ করেন। জানা যায়, তিনি আরও অনেক ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন, যেমন শাতান বোগাত (রুশ ভাষায় ‘ধনবান শয়তান’), জন মার্কহাম বিচ (প্রমিজ অ্যাট ডন গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে), ফোসকো সিনিবাল্ডি এবং ফ্রাঁসোয়া মেরমন্ট।
রোমেইন গ্যারি অবিশ্বাস্যভাবে প্রতিভাবান ছিলেন এবং ছয়টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (ইডিশ, রুশ, পোলিশ, ফরাসি, জার্মান এবং ইংরেজি)। তবে তাঁর বেশিরভাগ বই ফরাসি ভাষায় লেখা হয়েছে। তিনি ইংরেজিতেও ছয়টি উপন্যাস লিখেছেন এবং পরে নিজেই সেগুলো ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
রোমেইন গ্যারির একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন লেডি এল-এর কাহিনি অবলম্বনে ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন পিটার উস্তিনভ, যেখানে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সোফিয়া লরেন এবং পল নিউম্যান। এছাড়া ইজরায়েলী পরিচালক মোশে মিজরাহি ১৯৭৭ সালে গ্যারির সবচেয়ে বেশি বিক্রিত উপন্যাস দ্য লাইফ বিফোর আস-এর উপর অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘মাদাম রোজা’ তৈরি করেন।
একজন খ্যাতিমান লেখক এবং কূটনীতিবিদ ছাড়াও রোমেইন গ্যারি নিজের উপন্যাসের কাহিনির ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন, যা ফ্রান্সে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে তিনি আরও দু’টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন— বার্ডস ইন পেরু (১৯৬৮, প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য) এবং কিল! (১৯৭১)— যা উভয় চলচ্চিত্রে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী জিন সেবার্গ অভিনয় করেছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন