শিল্প-সাহিত্যে এমন কিছু উচ্চারণ আছে, যেগুলো একসময় আর কেবল সাহিত্যিক উচ্চারণ থাকে না— বইয়ের পৃষ্ঠা অতিক্রম করে মানুষের মুখে এসে বসে; নাটকের সংলাপ থেকে জনস্মৃতিতে, জনস্মৃতি থেকে মিছিলে, মিছিল থেকে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারাজীবন-এর সেই বহুল উচ্চারিত ডাক— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’ তেমনই এক উচ্চারণ।
বাক্যটি প্রথমত একটি নাট্যসংলাপ; কিন্তু তার পরিণতি কেবল নাট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং এর ভেতরে যে উত্তরবঙ্গীয় স্বর, যে লোকজ সম্বোধন, যে কৃষক সমাজের সম্মিলিত চেতনা, তা তাকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করে তুলেছে। ‘জাগো’ শব্দটি সর্বজনীন; কিন্তু ‘বাহে’, ‘কোনঠে’, ‘সবায়’— এই শব্দগুলো উচ্চারণটিকে একটি নির্দিষ্ট ভূগোলকে নির্দেশ করে— ফলে বাক্যটি একই সঙ্গে স্থানীয় এবং সর্বজনীন, আঞ্চলিক এবং ঐতিহাসিক, লোকজ এবং মহাকাব্যিক। সেখানেই প্রশ্নটির জন্ম— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— এটি কোন ভাষা? উত্তরবঙ্গের ভাষা? উত্তরের ভাষা? রংপুরের ভাষা? আঞ্চলিক ভাষা? উপভাষা? রাজবংশী? রংপুরী? কামতাপুরী? নাকি এই সব নামের সীমা অতিক্রম করে থাকা একটি বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলীয় ভাষিক ভূখণ্ডের কথ্যরূপ?
প্রশ্নটি আপাত সরল হলেও উত্তরটি সরল নয়। কারণ ভাষার যে নাম অভিধান বা ভাষাবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাসে পাওয়া যায়, মানুষের মুখে তার পরিচয় সবসময় একই থাকে না। উত্তরবঙ্গের ভাষিক পরিসরে ‘রংপুরী’, ‘দেশি ভাষা’, ‘বাহে’, ‘রাজবংশী’, ‘কামতাপুরী’, ‘আঞ্চলিক ভাষা’— বিভিন্ন নাম ও আত্মপরিচয়ের সহাবস্থান দেখা যায়। ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণাতেও এই অঞ্চলকে একটি জটিল ভাষিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, ভারতের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, ক্যালিংম্পং, মালদা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ উত্তরের বিশাল অঞ্চলে এই ভাষাই কথ্যরূপে প্রচলিত। অতএব, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যভাষাকে কেবল ‘আঞ্চলিক ভাষা’ বলে চিহ্নিত করা তাঁর ভাষাশিল্পের ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করে। বরং বলা যায়— উত্তরবঙ্গের রাজবংশী-রংপুরী-কামতা ভাষিক ঐতিহ্যের শব্দ, স্বর, বাক্যভঙ্গি ও লোকস্মৃতিকে তিনি বাংলা কাব্যনাট্যের নন্দনতত্ত্বে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেখানে আঞ্চলিকতা আর প্রান্তিকতার সমার্থক থাকে না; তা হয়ে ওঠে শিল্পের শক্তি এবং এই ভাষিক নন্দনের দুই প্রধান মঞ্চ— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’।
উত্তরের মাটি ও ভূগোলের সমান্তরালে গভীর এক ভাষাগোষ্ঠী কথ্যরূপে চর্চা করে আসছে একটি ভাষিক ঐতিহ্য— সৈয়দ শামসুল হককে শুধু ‘উত্তরবঙ্গের লেখক’ বলা তাঁর পরিচয়ের পূর্ণতা নয়; কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে উত্তরবঙ্গের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করাও অসম্ভব। কুড়িগ্রামে জন্ম নেওয়া এই সব্যসাচী লেখকের সাহিত্যিক চেতনায় উত্তর যেন একটি ভূগোলের চেয়ে বেশি কিছু— এটি শৈশবের শ্রুতি, নদীর শব্দ, কাদামাটির গন্ধ, কৃষকের শ্রম, হাটের কোলাহল, শীতের কুয়াশা, বন্যার আতঙ্ক, নবান্নের আনন্দ এবং মানুষের মুখের ভাষা এবং এই ‘মুখের ভাষা’ই সম্ভবত তাঁর উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কারণ কোনো অঞ্চলকে শুধু তার নদী, মাঠ বা মানুষের পোশাক দিয়ে চেনা যায় না— একটি ভূখণ্ডের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ পরিচয় তার উচ্চারণে। মানুষ ‘কী বলে’— তার চেয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ— ‘কীভাবে বলে’। সৈয়দ হক সেই ‘কীভাবে’-কে ধরেছেন। তিনি উত্তরবঙ্গের ভাষাকে কেবল চরিত্রের মুখে বসাননি; তিনি তার ছন্দ শুনেছেন— তার বিরতি শুনেছেন; তার সম্বোধন শুনেছেন। তার রাগ, ভয়, কৌতুক, বিষাদ, আর্তি— সব শুনেছেন; ফলে তাঁর কাব্যনাট্যে ভাষা কোনো বাহ্যিক অলংকার নয়; ভাষাই হয়ে উঠেছে চরিত্র নির্মাণের অন্তর্গত উপাদান। একজন কৃষক যখন প্রমিত বাংলায় কথা বলে, তখন সে ‘কৃষক’। কিন্তু যখন সে বলে ‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’, ‘কুনঠে’, ‘বাহে’— তখন সে কেবল কৃষক থাকে না; তার সঙ্গে একটি অঞ্চলও কথা বলতে শুরু করে।
রাজবংশী— একটি নামের ভেতর বহু ভূগোল; রাজবংশী ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার— ‘রাজবংশী’ একটি বহুমাত্রিক পরিচয়। এটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়ও, ভাষার পরিচয়ও; আবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গীয় ভাষিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নামও। পশ্চিমবঙ্গের ভাষাবৈচিত্র্য-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যভাণ্ডারে রাজবংশীকে কোচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও এর ভাষিক উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে এবং একই সঙ্গে রাজবংশী, রংপুরী ও কামতাপুরী নামগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও ভাষা-গবেষণায় দেখা যায়, উত্তরবঙ্গের বক্তারা নিজেদের ভাষাকে এক নামে চিহ্নিত করেন না। কারও কাছে তা রংপুরী, কারও কাছে দেশি ভাষা, কারও কাছে বাহে’র ভাষা। অর্থাৎ ভাষাবৈজ্ঞানিক শ্রেণির আলোচ্য বিষয় এবং অন্যদিকে মেলবর্ন বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ম্যাথিউ টুলমিনের গবেষণায় [টুমলিন মডেল অফ আরগুমেন্ট] দেখা যায়, উত্তরবঙ্গের মানুষ নিজেদের ভাষাকে এক নামে চিহ্নিত করেন না; কারও কাছে তা রংপুরী, কারও কাছে দেশি ভাষা, কারও কাছে বাহে। অর্থাৎ ভাষাবৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বক্তার আত্মপরিচয়— দুটি সবসময় একই রেখায় চলে না এবং এই দ্বৈততা সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যভাষা পড়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যবহৃত ভাষাকে একেবারে ‘বিশুদ্ধ রাজবংশী’ বলে দাবি করা যেমন ভাষাবৈজ্ঞানিকভাবে অতি সরলীকরণ হতে পারে, তেমনি একে কেবল ‘রংপুরের আঞ্চলিক বাংলা’ বলেও শেষ করে দেওয়া যায় না। বরং তাঁর নাট্যভাষাকে দেখা যেতে পারে উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তৃত লোকভাষিক ভুবনের শিল্পরূপ হিসেবে— যেখানে রাজবংশী, রংপুরী, কামতা ও স্থানীয় কথ্য বাংলার বহুস্তরীয় প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় এবং এই দুই কাব্যনাটকে সংলাপ নির্মাণে এই মিশ্রণই তাঁর ভাষার শক্তি।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক যেন যুদ্ধের মধ্যে মানুষের মুখ; মুক্তিযুদ্ধের নাটক। কিন্তু এটি কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে থাকা একটি জনপদের মানুষের নাটক। এখানে শহর নেই কেবল; আছে গ্রাম। ইতিহাস নেই কেবল; আছে মানুষের ব্যক্তিগত আতঙ্ক। স্বাধীনতা নেই; আছে ক্ষুধা, ভয়, বিশ্বাস, প্রতারণা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ক্ষমতার সংঘর্ষ এবং এই সব কিছুর মধ্যবর্তী সেতু— ভাষা; নাটকের সংলাপে যখন শোনা যায়— ‘মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা/মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ী নাগেশ্বরী থিকা’; তখন এটি নিছক তথ্য নয়; ‘থিকা’ শব্দটি ‘থেকে’র অর্থ বহন করলেও তার সাংস্কৃতিক অভিঘাত আলাদা এবং একইভাবে ‘লাহান’, ‘য্যান’, ‘কই’, ‘দ্যাও’, ‘হইল’— এসব শব্দ শুধু আঞ্চলিকতার চিহ্ন নয়; এগুলো চরিত্রের সামাজিক শরীর। প্রমিত ভাষায় কোনো বাক্য হয়তো অর্থকে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দিতে পারে; কিন্তু স্থানীয় উচ্চারণ চরিত্রটির অস্তিত্বের স্থানাঙ্ক নির্ধারণ করে এবং এই কারণেই ‘লাহান’ কেবল ‘মতো’ নয়; ‘লাহান’-এর মধ্যে একটি অঞ্চল আছে, একটি শ্রুতি আছে, একটি জীবনযাপন আছে।
ভাষা যখন মঞ্চের ছন্দর বিষয়টি সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এখানেই যে তিনি আঞ্চলিক শব্দকে অভিধানগত প্রদর্শনীতে পরিণত করেননি; তিনি তার ছন্দ নিয়েছেন— কাব্যনাট্যের সংলাপ পাঠ করার জন্য যেমন, তেমনি উচ্চারণ করার জন্যও। ফলে নাট্যকারের কাছে শব্দের অর্থের পাশাপাশি তার ধ্বনিগত গতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘মানুষ আসতে আছে’— এই পুনরাবৃত্তি কেবল একটি বাক্যের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি ক্রমশ ঘনীভূত হওয়া একটি শব্দ-দৃশ্য। ‘মানুষ আসছে।/আরও মানুষ আসছে।’ তারপর সেই মানুষ আর ব্যক্তিমানুষ থাকে না— সমষ্টিতে পরিণত হয়; ভাষা তখন কাহিনির বাহন নয়— ভাষাই কাহিনির গতি।
উত্তরের মানুষকে ‘মফিজ’ এবং উত্তরের ভাষাকে ‘মফিজের ভাষা’ বলা এক ধরনের সামাজিক স্টেরিওটাইপ। কিন্তু এই ধারণা আমাদের ভাষা সম্পর্কে গভীর একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়— কেন একটি ভাষা ‘প্রমিত’, আর অন্যটি ‘আঞ্চলিক’? কে নির্ধারণ করে ভাষার মর্যাদা? শহরের ভাষা কেন কেন্দ্র? গ্রামের ভাষা কেন প্রান্ত? সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যভাষার তাৎপর্য এখানেই যে তিনি এই মর্যাদাক্রমকে সরাসরি বক্তৃতা দিয়ে প্রশ্ন করেননি; তিনি শিল্পের ভিতর দিয়ে প্রশ্নটি করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, যে ভাষাকে শহুরে রুচি ‘গ্রাম্য’ বলে চিহ্নিত করতে পারে, সেই ভাষাতেই মহাকাব্যিক ইতিহাস বলা যায়; সেই ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের ভয় বলা যায়, সেই ভাষায় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করা যায়, সেই ভাষায় বিদ্রোহের ডাক দেওয়া যায়, এমনকি সেই ভাষায় ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখা যায়— অর্থাৎ ভাষার সামাজিক মর্যাদা এবং ভাষার নন্দনতাত্ত্বিক ক্ষমতা এক নয়।
ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথার জন্ম যেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের সামাজিক কাঠামোয় মাতবর, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং সাধারণ মানুষের জীবন— সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত এবং এই সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা ভাষিক; ক্ষমতার ভাষা সাধারণত ঘোষণা করে; জনতার ভাষা প্রশ্ন করে— ‘কই?’ ‘ক্যান?’ ‘কার?’ এবং এই ছোট ছোট প্রশ্নের ভেতরেই একটি জনপদের আত্মসচেতনতা জন্ম নেয়; লোকভাষা এখানে শুধু বাস্তবতার অনুকরণ নয়; এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে কণ্ঠের পুনর্দখল এবং যে মানুষ নিজের ভাষায় প্রশ্ন করতে পারে, সে নিজের অস্তিত্বকেও পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং এই অর্থে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর আঞ্চলিক ভাষা একটি নাট্য-রাজনীতি নির্মাণ করে।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ ভাষা যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন আতঙ্ককে ধারণ করে, নূরলদীনের সারাজীবন-এ সেই ভাষা আরও দূরের ইতিহাসে ফিরে যায়; ১৭৮৩ সালের রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকবিদ্রোহের পটভূমিতে নির্মিত এই কাব্যনাট্যে ইতিহাস কোনো জাদুঘরের বস্তু হয়ে থাকে না; তা মানুষের মুখে ফিরে আসে। গবেষণাতেও নাটকটির ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং রংপুরের কৃষকবিদ্রোহের সঙ্গে এর সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এখানেই নাটকের আরেকটি বিস্ময়। নাট্যকার ইতিহাসকে কেবল তথ্য দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেননি; তিনি ইতিহাসকে ভাষা দিয়ে পুনর্জন্ম দিয়েছেন, নূরলদীন কোনো দূরবর্তী ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। সে নাড়িমাটির মানুষ, তার স্বপ্ন নাড়িমাটির, তার ক্ষুধা নাড়িমাটির; তার বিদ্রোহও নাড়িমাটির জন্যে এবং তার ভাষাও মাটির। ফলে ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’: একটি উচ্চারণের নন্দনতত্ত্ব এবং এই একটি বাক্যের কাছেই ফিরে আসা দরকার; এই একটি বাক্যই উত্তরে ভাষাকে আঞ্চলিক থেকে বৈশ্বিক করে তুলবে— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়।’ এর নন্দনশক্তি অর্থে যেমন, তার চেয়ে কম নয় ধ্বনিতে। ‘জাগো’— আহ্বান; ‘বাহে’— সম্বোধন, ‘কোনঠে’— স্থানিক উচ্চারণ, ‘সবায়’— সমষ্টি এবং চারটি স্তর একটি জনতার কণ্ঠ তৈরি করে। ফলে ‘সবাই জাগো’— বললে বাক্যটি সর্বজনীন— কিন্তু ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— বললে সেই সর্বজনীনতার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট জনপদ প্রবেশ করে এবং এখানে উত্তরবঙ্গ নিজেকে লুকিয়ে থাকে না। বরং নিজের উচ্চারণেই নিজেকে প্রকাশ করে— এই জন্য ‘জাগো বাহে’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি ভাষার মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার।
‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’: সর্বনামের অন্তর্গত ভূগোলটা অনুধাবন জরুরি— একজন মানুষ ‘আমি’ বললেই আমরা বুঝি সে নিজের কথা বলছে। কিন্তু ‘মুই’ বললে শুধু বক্তার পরিচয় বদলায় না— বদলে যায় তার সাংস্কৃতিক অবস্থানও। রাজবংশী-রংপুরী ভাষিক পরিসরে ‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’-এর মতো রূপগুলোর ব্যবহার ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে স্পর্শ করে এবং ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এ ধরনের প্রথম পুরুষ সর্বনাম ও ক্রিয়ারূপের বৈশিষ্ট্য নথিবদ্ধ হয়েছে; ফলে নাট্যকারের নাটকে তাই সর্বনামও চরিত্রের ভূগোল। ‘আমি’ একটি ব্যক্তি, ‘মুই’ একটি ব্যক্তি, কিন্তু তার পেছনে একটি জনপদ দাঁড়িয়ে থাকে, ‘আমার’ ব্যক্তিগত মালিকানা, ‘হামার’ সেই মালিকানাকে নিয়ে যায় সমষ্টিগত জীবনযাপনের দিকে এবং এই জায়গাতেই ভাষা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।
নূরলদীনের সারাজীবন-এর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জায়গাগুলোর একটি তার স্বপ্নের জগৎ। নূরলদীনের স্বপ্ন কোনো প্রাসাদ নির্মাণের স্বপ্ন নয়। ‘হামার গাভীন গাই’ নূরলদীনের স্বপ্নের নন্দন— তার স্বপ্নে আছে গাভী, দুধ, সন্তান, নবান্ন, ঘর, নিরাপদ জীবন। ‘হামার গাভীন গাই’— এই উচ্চারণের মধ্যে একটি কৃষকসভ্যতা কথা বলে এবং ইকোফেমিনিজমের প্রসঙ্গ এখানে প্রকট হয়ে ওঠে— এখানে ‘হামার’ শব্দটির গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিকতার কারণে নয়। ‘হামার’ শব্দটি যেন স্বপ্নটিকে ব্যক্তিগত থেকে সামষ্টিক করে; এটি কেবল ‘আমার গাভী’ নয়— এটি এমন এক জীবনের আকাঙ্ক্ষা যেখানে কৃষকের নিজের ঘর থাকবে, নিজের খাদ্য থাকবে, নিজের ভবিষ্যৎ থাকবে— নূরলদীনের রাজনীতি আসলে সিংহাসনের রাজনীতি নয়; এটি জীবনের রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির ভাষাও আসে জীবনের কাছ থেকে।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটকে ভাষা-প্রয়োগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর ভাষিক নির্মাণের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না এবং এখানে লোকভাষা গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু; আঞ্চলিক ভাষার কাব্যিক সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর পরীক্ষা এই গ্রন্থে আরও গভীর; তাই তাঁর ভাষিক অভিযাত্রাকে একটি সরল রেখায় দেখা যায়— ‘লোকভাষা > কবিতার অন্তঃসুর > কাব্যনাট্যের সংলাপ > ইতিহাসের কণ্ঠ।’ অর্থাৎ তিনি লোকভাষাকে সাহিত্যে ঢোকাননি মাত্র; তার ভেতরের কবিত্ব আবিষ্কার করেছেন। আঞ্চলিকতা নয়, ভাষার বিকল্প কেন্দ্র— ‘আঞ্চলিক ভাষা’— শব্দবন্ধটির ভেতরেই একটি ক্ষমতার সম্পর্ক লুকিয়ে আছে; ‘আঞ্চলিক’ মানে যেন কেন্দ্রের বাইরে। কিন্তু কে কেন্দ্র? ঢাকা? কলকাতা? প্রমিত বাংলা? নাকি মানুষের নিজস্ব জনপদ? সৈয়দ হকের কাব্যনাটক এই প্রশ্নের একটি নন্দনতাত্ত্বিক উত্তর দেয়— উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে উত্তরবঙ্গই তো কেন্দ্র; তার নিজের ভাষাই তার প্রথম ভাষা। তার ‘হামি’ তার কাছে ‘আমি’-র চেয়ে কম সত্য নয়। তার ‘বাহে’ কোনো বিকৃত সম্বোধন নয়— তার ‘কুনঠে’ ভুল বাংলা নয় এবং এগুলো তার নিজের পৃথিবীর সঠিক শব্দ; এই কারণে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যদ্বয়ে ভাষাশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ সম্ভবত ভাষিক মর্যাদার পুনর্বণ্টন; তিনি বলেননি যে প্রমিত ভাষা অপ্রয়োজনীয়, তিনি দেখিয়েছেন— প্রমিত ভাষা একমাত্র সাহিত্যিক ভাষা নয়।
‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ ভাষা শ্রেণিগত পরিচয়েরও একটি সূক্ষ্ম মানচিত্র তৈরি করে— কৃষক, স্থানীয় মানুষ ও ক্ষমতাবান চরিত্রের ভাষিক ব্যবধান নাটকের সামাজিক দূরত্বকে দৃশ্যমান করে; নাটকটির কৃষক চরিত্রের সঙ্গে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সম্পর্ক এবং অন্যান্য চরিত্রের তুলনামূলক ভিন্ন ভাষাব্যবহারের দিকটি আলোচনায় প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: ইতিহাস কার ভাষায় লেখা হয়? সাধারণত ইতিহাস লেখা হয় ক্ষমতাবানদের ভাষায়, কিন্তু নূরলদীনের ইতিহাস বলা হচ্ছে কৃষকের ভাষায়। এটি নিছক শৈলীগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাসের কণ্ঠ বদলে দেওয়া। ইংরেজ শাসনের ইতিহাস নয় শুধু— কৃষকের ক্ষুধার ইতিহাস; রাজস্বের ইতিহাস নয় শুধু— ধানের ইতিহাস; বিদ্রোহের ইতিহাস নয় শুধু— ঘরের ইতিহাস এবং এই ইতিহাসের জন্য প্রমিত ভাষা যথেষ্ট হতে পারে; কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক হয়তো জানতেন, যে মানুষ ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু, তার মুখের ভাষা বাদ দিলে ইতিহাসের শরীর অসম্পূর্ণ থাকে।
প্রকৃতি— দৃশ্য নয়, জীবনব্যবস্থা; উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি সৈয়দ শামসুল হকের নাটকে কোনো রোমান্টিক পটভূমি নয়— নদী মানে বন্যা, মাঠ মানে শ্রম, ধান মানে খাদ্য, গাভী মানে সম্পদ, কাদা মানে জীবনযাপন, নবান্ন মানে বেঁচে থাকার উৎসব এবং এই কারণে তাঁর ভাষার প্রকৃতি-চিত্রও কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ মানুষের আগমনকে যখন বানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন প্রকৃতি ও মানুষের সমষ্টিগত গতির মধ্যে একটি নন্দনাত্মক সমান্তরালতা তৈরি হয় এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর স্বপ্নে নবান্ন, পিঠা, গাভী, দুধ, ঘর— সব মিলিয়ে যে ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়, তা আসলে একটি কৃষকসমাজের মুক্ত জীবনের কল্পনা— এই কারণে সৈয়দ শামসুল হকের উত্তরবঙ্গ কোনো ‘সুন্দর গ্রাম’ নয়; এটি শ্রমের ভূগোল এবং সেই শ্রমের ভাষাই তাঁর নাট্যের ভাষা।
চাচির গল্প থেকে কাব্যনাট্যের মঞ্চভাষা— একজন লেখকের সাহিত্যিক ভাষা কখনো কেবল বই পড়ে তৈরি হয় না; তার উৎস আরও পুরোনো, শৈশবের গল্পে— ঘুমপাড়ানি কথায়, পরিবারের প্রবীণ মানুষের মুখে, হাটের কথোপকথনে, গ্রামের মানুষের হাসি-ঠাট্টায়— সৈয়দ শামসুল হকের শৈশবের গল্পশোনার অভিজ্ঞতা এবং তাঁর চাচির গল্প বলার ভঙ্গির প্রভাব সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ তাঁর ভাষার শ্রুতিগত উৎস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র; প্রাবন্ধিকের সাথে ব্যক্তি সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন আড্ডায় যেমন তিনি এ বিষয়টি বলতেন তেমনি একাধিক সাক্ষাৎকারেও এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ তুলেছেন এবং এই জায়গায় ‘মাতৃভাষা’ শব্দটিকে কেবল ভাষাবিজ্ঞানের অর্থে নিলে চলবে না। মাতৃভাষা কখনো কখনো সেই ভাষা, যে ভাষায় প্রথম গল্প শুনেছি, যে ভাষায় প্রথম ভয় পেয়েছি; যে ভাষায় প্রথম ঘুমিয়েছি, যে ভাষায় প্রথম পৃথিবীকে চিনেছি, সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায় উত্তরবঙ্গের সেই শ্রুতিস্মৃতি ফিরে আসে; তাই তাঁর লোকভাষা কখনো অভিধান থেকে ধার করা বলে মনে হয় না এবং এটি যেন স্মৃতি থেকে উঠে আসে।
মঞ্চে ভাষার শরীর; কাব্যনাট্যের ভাষা কেবল পাঠের ভাষা নয়; এটি শরীরের ভাষা; অভিনেতার মুখে তাকে উচ্চারিত হতে হয়, তার স্বরাঘাত থাকতে হয়, বিরতি থাকতে হয়, শ্বাস নিতে হয় এবং এই জায়গায় উত্তরবঙ্গের লোকভাষা সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যে বিশেষ শক্তি পেয়েছে— ‘হামি’, ‘বাহে’, ‘কুনঠে’, ‘হামার’—এসব শব্দ উচ্চারণ করলেই অভিনেতার শরীর বদলে যায়; তার স্বর, গতি, মুখের ভঙ্গি, এমনকি চরিত্রের সামাজিক অবস্থানও বদলে যায়- অর্থাৎ ভাষা এখানে চরিত্রের পোশাক নয়, ভাষাই চরিত্রের শরীর এবং এই কারণেই তাঁর কাব্যনাট্য মঞ্চে উচ্চারণযোগ্য হয়েছে— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’— দুটিই দীর্ঘকাল মঞ্চে উপস্থিত থেকেছে এবং দর্শক-স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে।
‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’ সাহিত্য থেকে লোকস্মৃতিতে— একটি সাহিত্যিক বাক্য কখন জনতার বাক্য হয়ে ওঠে? যখন তার ভেতরে এমন কিছু থাকে, যা একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের চেয়ে বড়; ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— এই বাক্যের ভেতর সেই বৃহত্তর সম্ভাবনাটি ছিল এবং এখানে জাগরণ আছে, সমষ্টি আছে, স্থান আছে, আত্মপরিচয় আছে, প্রতিরোধের সম্ভাবনা আছে— তাই সংলাপটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জনপ্রিয় পরিসরে পুনরায় ব্যবহৃত হয়েছে; এবং এখানে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়— লোকভাষা লেখকের কাছে আসে; নাট্যকার তাকে সাহিত্যে রূপ দেন; সাহিত্য আবার সেই ভাষাকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং মাটি থেকে শব্দ আসে; শব্দ সাহিত্যে ওঠে; সাহিত্য থেকে আবার মাটিতে ফিরে যায়।
প্রশ্ন আসতেই পারে নাটক দুটি প্রমিত ভাষায় বললে কী হারাত? ধরা যাক, ‘নূরলদীনের’ সারাজীবন সম্পূর্ণ প্রমিত বাংলায় লেখা হতো, ইতিহাস থাকত, নূরলদীন থাকত, বিদ্রোহ থাকত, কৃষকের দুঃখও থাকত কিন্তু কী যেন থাকত না— থাকত না কণ্ঠ। ‘আমি কোথায় যাব?’ এবং ‘মুই কুনঠে যাম?’— দুটি বাক্যের অভিধানগত অর্থ কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি যে মানুষটি বলে, তার পেছনে একটি ভূগোল দাঁড়িয়ে থাকে— তার নদী আছে, তার মাটি আছে,তার উঠোন আছে, তার উচ্চারণ আছে, তার পূর্বপুরুষ আছে, তার ভয়ও তার নিজের এবং সৈয়দ শামসুল হক সেই ‘নিজস্বতা’টিই ধরে রেখেছেন। কাব্যনাট্যদ্বয়ে রাজবংশী প্রভাব যেন শব্দের চেয়ে বেশি কিছু— সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে রাজবংশী ভাষার প্রভাবকে কেবল কিছু আঞ্চলিক শব্দের উপস্থিতি দিয়ে মাপা যায় না; প্রভাবটি কমপক্ষে পাঁচটি স্তরে কাজ করে— ১. শব্দে — ‘বাহে’, ‘হামি’, ‘হামার’, ‘মুই’, ‘কুনঠে’, ‘লাহান’ ইত্যাদি লোকভাষিক রূপে। ২. বাক্যভঙ্গিতে — প্রমিত বাংলার বাইরে উত্তরাঞ্চলীয় কথনরীতির ব্যবহারে। ৩. ছন্দে — পুনরাবৃত্তি, উচ্চারণ ও কথ্য গতির মাধ্যমে। ৪. চরিত্র নির্মাণে — ভাষার সাহায্যে শ্রেণি, অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে এবং ৫. ইতিহাস নির্মাণে — প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষাকে ইতিহাসের প্রধান কণ্ঠে পরিণত করার মাধ্যমে এবং এই পাঁচটি স্তর মিলেই তাঁর ভাষাকে নন্দন ও রাজনীতির একটি জটিল ভৌগোলিক ক্ষেত্র করে তোলে।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে উত্তরবঙ্গের ভাষা কোনো ‘অন্য’ ভাষা হয়ে বাংলা সাহিত্যের বাইরে দাঁড়ায় না। বরং তা বাংলা সাহিত্যের ভেতরেই একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে এবং এইখানে তাঁর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত কেন্দ্রের ধারণাকে প্রসারিত করা; বাংলা ভাষার কেন্দ্র একটিমাত্র নয়— ঢাকার উচ্চারণ যেমন বাংলা, রংপুরের উচ্চারণও বাংলা ভাষিক অভিজ্ঞতার অংশ; শহরের কবিতা যেমন সাহিত্য, কুড়িগ্রামের মানুষের মুখের গল্পও সাহিত্যিক সম্ভাবনায় পূর্ণ, প্রমিত ভাষা যেমন মূল্যবান, লোকভাষাও তেমনি অভিজ্ঞতার নিজস্ব ভাণ্ডার।
সৈয়দ হক সেই ভাণ্ডারের দরজা খুলেছেন এবং সৈয়দ শামসুল হক কুড়িগ্রাম নাড়িমাটি উত্তরবঙ্গকে লেখেননি, শুনেছেন— তাঁর কাব্যনাট্যের সবচেয়ে বড় ভাষিক অর্জন হয়তো এই নয় যে, তিনি অনেক আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন— বরং তিনি মানুষের মুখ শুনেছেন, তিনি শুনেছেন কৃষকের ভয়, শুনেছেন নারীর কান্না, শুনেছেন মাতবরের কর্তৃত্ব, শুনেছেন ধর্মীয় ভাষার আড়ালে লুকানো ক্ষমতা, শুনেছেন বিদ্রোহীর ডাক, শুনেছেন নবান্নের আনন্দ, শুনেছেন একটি জনপদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস এবং সেই শ্রুতিকে তিনি কাব্যনাট্যে প্রতিরূপায়ন করেছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ উত্তরবঙ্গের লোকভাষা মুক্তিযুদ্ধের অন্ধকারে মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ সেই ভাষাই আঠারো শতকের কৃষকবিদ্রোহকে বর্তমানের শ্রুতিতে ফিরিয়ে আনে— দুই নাটকের সময় আলাদা, ইতিহাস পৃথক, সংগ্রামের প্রকৃতি ভিন্ন— কিন্তু মাটি এক এবং সেই মাটির ভাষাও এক গভীর অন্তঃস্রোতে প্রবাহিত— তাই ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— শুধু নূরলদীনের ডাক নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ভাষ কোনো লোকরঙও নয়। এটি তাঁর চরিত্রের আত্মা, তাঁর ইতিহাসের শ্রুতি, তাঁর মঞ্চারও আত্মপ্রকাশ— ‘জাগো’— তার আহ্বান, ‘বাহে’— তার আপন সম্বোধন, ‘কোনঠে’— তার ভূগোল,‘সবায়’— তার মানুষ এবং এই চারটি শব্দে যেন একটি সম্পূর্ণ জনপদচিত্র উঠে আসে— সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যশিল্পের বিস্ময় এখানেই— তিনি উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যের বিষয় করেননি শুধু; উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যের কণ্ঠে পরিণত করেছেন তাই তাঁর নাট্যে রাজবংশী-রংপুরী ভাষিক ঐতিহ্য কোনো অলংকার নয়, কোনো লোকরঙও নয়। এটি তাঁর চরিত্রের আত্মা, তাঁর ইতিহাসের শ্রুতি, তাঁর মঞ্চের ছন্দ এবং তাঁর মানুষের অস্তিত্বের ভাষা— একসময় যাকে ‘আঞ্চলিক’ বলা হয়েছিল, তাঁর হাতে সেই ভাষাই হয়ে উঠেছে মহাকাব্যিক, যে ভাষাকে শহর ‘গ্রাম্য’ বলে পাশ কাটাতে পারে, সেই ভাষাতেই তিনি ইতিহাসকে কথা বলিয়েছেন এবং এখানেই সৈয়দ শামসুল হকের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার— তিনি উত্তরবঙ্গকে শুধু লিখেননি; তিনি উত্তরবঙ্গের মুখ দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে কথা বলিয়েছেন— সেই কণ্ঠ আজও শোনা যায়; দূরে কোথাও, মাটির ওপর, মানুষের ভিড়ের ভিতর— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়।’ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মাকোন্দো গ্রামের মতোই উত্তরবঙ্গ হয়ে ওঠে বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক এবং নাড়িমাটির রাজবংশী বা উত্তুরে মফিজ ভাষাই তার ভিত্তিভূমি।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিল্প-সাহিত্যে এমন কিছু উচ্চারণ আছে, যেগুলো একসময় আর কেবল সাহিত্যিক উচ্চারণ থাকে না— বইয়ের পৃষ্ঠা অতিক্রম করে মানুষের মুখে এসে বসে; নাটকের সংলাপ থেকে জনস্মৃতিতে, জনস্মৃতি থেকে মিছিলে, মিছিল থেকে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারাজীবন-এর সেই বহুল উচ্চারিত ডাক— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’ তেমনই এক উচ্চারণ।
বাক্যটি প্রথমত একটি নাট্যসংলাপ; কিন্তু তার পরিণতি কেবল নাট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং এর ভেতরে যে উত্তরবঙ্গীয় স্বর, যে লোকজ সম্বোধন, যে কৃষক সমাজের সম্মিলিত চেতনা, তা তাকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করে তুলেছে। ‘জাগো’ শব্দটি সর্বজনীন; কিন্তু ‘বাহে’, ‘কোনঠে’, ‘সবায়’— এই শব্দগুলো উচ্চারণটিকে একটি নির্দিষ্ট ভূগোলকে নির্দেশ করে— ফলে বাক্যটি একই সঙ্গে স্থানীয় এবং সর্বজনীন, আঞ্চলিক এবং ঐতিহাসিক, লোকজ এবং মহাকাব্যিক। সেখানেই প্রশ্নটির জন্ম— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— এটি কোন ভাষা? উত্তরবঙ্গের ভাষা? উত্তরের ভাষা? রংপুরের ভাষা? আঞ্চলিক ভাষা? উপভাষা? রাজবংশী? রংপুরী? কামতাপুরী? নাকি এই সব নামের সীমা অতিক্রম করে থাকা একটি বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলীয় ভাষিক ভূখণ্ডের কথ্যরূপ?
প্রশ্নটি আপাত সরল হলেও উত্তরটি সরল নয়। কারণ ভাষার যে নাম অভিধান বা ভাষাবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাসে পাওয়া যায়, মানুষের মুখে তার পরিচয় সবসময় একই থাকে না। উত্তরবঙ্গের ভাষিক পরিসরে ‘রংপুরী’, ‘দেশি ভাষা’, ‘বাহে’, ‘রাজবংশী’, ‘কামতাপুরী’, ‘আঞ্চলিক ভাষা’— বিভিন্ন নাম ও আত্মপরিচয়ের সহাবস্থান দেখা যায়। ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণাতেও এই অঞ্চলকে একটি জটিল ভাষিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, ভারতের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, ক্যালিংম্পং, মালদা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ উত্তরের বিশাল অঞ্চলে এই ভাষাই কথ্যরূপে প্রচলিত। অতএব, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যভাষাকে কেবল ‘আঞ্চলিক ভাষা’ বলে চিহ্নিত করা তাঁর ভাষাশিল্পের ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করে। বরং বলা যায়— উত্তরবঙ্গের রাজবংশী-রংপুরী-কামতা ভাষিক ঐতিহ্যের শব্দ, স্বর, বাক্যভঙ্গি ও লোকস্মৃতিকে তিনি বাংলা কাব্যনাট্যের নন্দনতত্ত্বে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেখানে আঞ্চলিকতা আর প্রান্তিকতার সমার্থক থাকে না; তা হয়ে ওঠে শিল্পের শক্তি এবং এই ভাষিক নন্দনের দুই প্রধান মঞ্চ— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’।
উত্তরের মাটি ও ভূগোলের সমান্তরালে গভীর এক ভাষাগোষ্ঠী কথ্যরূপে চর্চা করে আসছে একটি ভাষিক ঐতিহ্য— সৈয়দ শামসুল হককে শুধু ‘উত্তরবঙ্গের লেখক’ বলা তাঁর পরিচয়ের পূর্ণতা নয়; কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে উত্তরবঙ্গের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করাও অসম্ভব। কুড়িগ্রামে জন্ম নেওয়া এই সব্যসাচী লেখকের সাহিত্যিক চেতনায় উত্তর যেন একটি ভূগোলের চেয়ে বেশি কিছু— এটি শৈশবের শ্রুতি, নদীর শব্দ, কাদামাটির গন্ধ, কৃষকের শ্রম, হাটের কোলাহল, শীতের কুয়াশা, বন্যার আতঙ্ক, নবান্নের আনন্দ এবং মানুষের মুখের ভাষা এবং এই ‘মুখের ভাষা’ই সম্ভবত তাঁর উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কারণ কোনো অঞ্চলকে শুধু তার নদী, মাঠ বা মানুষের পোশাক দিয়ে চেনা যায় না— একটি ভূখণ্ডের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ পরিচয় তার উচ্চারণে। মানুষ ‘কী বলে’— তার চেয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ— ‘কীভাবে বলে’। সৈয়দ হক সেই ‘কীভাবে’-কে ধরেছেন। তিনি উত্তরবঙ্গের ভাষাকে কেবল চরিত্রের মুখে বসাননি; তিনি তার ছন্দ শুনেছেন— তার বিরতি শুনেছেন; তার সম্বোধন শুনেছেন। তার রাগ, ভয়, কৌতুক, বিষাদ, আর্তি— সব শুনেছেন; ফলে তাঁর কাব্যনাট্যে ভাষা কোনো বাহ্যিক অলংকার নয়; ভাষাই হয়ে উঠেছে চরিত্র নির্মাণের অন্তর্গত উপাদান। একজন কৃষক যখন প্রমিত বাংলায় কথা বলে, তখন সে ‘কৃষক’। কিন্তু যখন সে বলে ‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’, ‘কুনঠে’, ‘বাহে’— তখন সে কেবল কৃষক থাকে না; তার সঙ্গে একটি অঞ্চলও কথা বলতে শুরু করে।
রাজবংশী— একটি নামের ভেতর বহু ভূগোল; রাজবংশী ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার— ‘রাজবংশী’ একটি বহুমাত্রিক পরিচয়। এটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়ও, ভাষার পরিচয়ও; আবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গীয় ভাষিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নামও। পশ্চিমবঙ্গের ভাষাবৈচিত্র্য-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যভাণ্ডারে রাজবংশীকে কোচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও এর ভাষিক উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে এবং একই সঙ্গে রাজবংশী, রংপুরী ও কামতাপুরী নামগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও ভাষা-গবেষণায় দেখা যায়, উত্তরবঙ্গের বক্তারা নিজেদের ভাষাকে এক নামে চিহ্নিত করেন না। কারও কাছে তা রংপুরী, কারও কাছে দেশি ভাষা, কারও কাছে বাহে’র ভাষা। অর্থাৎ ভাষাবৈজ্ঞানিক শ্রেণির আলোচ্য বিষয় এবং অন্যদিকে মেলবর্ন বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ম্যাথিউ টুলমিনের গবেষণায় [টুমলিন মডেল অফ আরগুমেন্ট] দেখা যায়, উত্তরবঙ্গের মানুষ নিজেদের ভাষাকে এক নামে চিহ্নিত করেন না; কারও কাছে তা রংপুরী, কারও কাছে দেশি ভাষা, কারও কাছে বাহে। অর্থাৎ ভাষাবৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বক্তার আত্মপরিচয়— দুটি সবসময় একই রেখায় চলে না এবং এই দ্বৈততা সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যভাষা পড়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যবহৃত ভাষাকে একেবারে ‘বিশুদ্ধ রাজবংশী’ বলে দাবি করা যেমন ভাষাবৈজ্ঞানিকভাবে অতি সরলীকরণ হতে পারে, তেমনি একে কেবল ‘রংপুরের আঞ্চলিক বাংলা’ বলেও শেষ করে দেওয়া যায় না। বরং তাঁর নাট্যভাষাকে দেখা যেতে পারে উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তৃত লোকভাষিক ভুবনের শিল্পরূপ হিসেবে— যেখানে রাজবংশী, রংপুরী, কামতা ও স্থানীয় কথ্য বাংলার বহুস্তরীয় প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় এবং এই দুই কাব্যনাটকে সংলাপ নির্মাণে এই মিশ্রণই তাঁর ভাষার শক্তি।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক যেন যুদ্ধের মধ্যে মানুষের মুখ; মুক্তিযুদ্ধের নাটক। কিন্তু এটি কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে থাকা একটি জনপদের মানুষের নাটক। এখানে শহর নেই কেবল; আছে গ্রাম। ইতিহাস নেই কেবল; আছে মানুষের ব্যক্তিগত আতঙ্ক। স্বাধীনতা নেই; আছে ক্ষুধা, ভয়, বিশ্বাস, প্রতারণা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ক্ষমতার সংঘর্ষ এবং এই সব কিছুর মধ্যবর্তী সেতু— ভাষা; নাটকের সংলাপে যখন শোনা যায়— ‘মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা/মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ী নাগেশ্বরী থিকা’; তখন এটি নিছক তথ্য নয়; ‘থিকা’ শব্দটি ‘থেকে’র অর্থ বহন করলেও তার সাংস্কৃতিক অভিঘাত আলাদা এবং একইভাবে ‘লাহান’, ‘য্যান’, ‘কই’, ‘দ্যাও’, ‘হইল’— এসব শব্দ শুধু আঞ্চলিকতার চিহ্ন নয়; এগুলো চরিত্রের সামাজিক শরীর। প্রমিত ভাষায় কোনো বাক্য হয়তো অর্থকে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দিতে পারে; কিন্তু স্থানীয় উচ্চারণ চরিত্রটির অস্তিত্বের স্থানাঙ্ক নির্ধারণ করে এবং এই কারণেই ‘লাহান’ কেবল ‘মতো’ নয়; ‘লাহান’-এর মধ্যে একটি অঞ্চল আছে, একটি শ্রুতি আছে, একটি জীবনযাপন আছে।
ভাষা যখন মঞ্চের ছন্দর বিষয়টি সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এখানেই যে তিনি আঞ্চলিক শব্দকে অভিধানগত প্রদর্শনীতে পরিণত করেননি; তিনি তার ছন্দ নিয়েছেন— কাব্যনাট্যের সংলাপ পাঠ করার জন্য যেমন, তেমনি উচ্চারণ করার জন্যও। ফলে নাট্যকারের কাছে শব্দের অর্থের পাশাপাশি তার ধ্বনিগত গতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘মানুষ আসতে আছে’— এই পুনরাবৃত্তি কেবল একটি বাক্যের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি ক্রমশ ঘনীভূত হওয়া একটি শব্দ-দৃশ্য। ‘মানুষ আসছে।/আরও মানুষ আসছে।’ তারপর সেই মানুষ আর ব্যক্তিমানুষ থাকে না— সমষ্টিতে পরিণত হয়; ভাষা তখন কাহিনির বাহন নয়— ভাষাই কাহিনির গতি।
উত্তরের মানুষকে ‘মফিজ’ এবং উত্তরের ভাষাকে ‘মফিজের ভাষা’ বলা এক ধরনের সামাজিক স্টেরিওটাইপ। কিন্তু এই ধারণা আমাদের ভাষা সম্পর্কে গভীর একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়— কেন একটি ভাষা ‘প্রমিত’, আর অন্যটি ‘আঞ্চলিক’? কে নির্ধারণ করে ভাষার মর্যাদা? শহরের ভাষা কেন কেন্দ্র? গ্রামের ভাষা কেন প্রান্ত? সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যভাষার তাৎপর্য এখানেই যে তিনি এই মর্যাদাক্রমকে সরাসরি বক্তৃতা দিয়ে প্রশ্ন করেননি; তিনি শিল্পের ভিতর দিয়ে প্রশ্নটি করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, যে ভাষাকে শহুরে রুচি ‘গ্রাম্য’ বলে চিহ্নিত করতে পারে, সেই ভাষাতেই মহাকাব্যিক ইতিহাস বলা যায়; সেই ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের ভয় বলা যায়, সেই ভাষায় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করা যায়, সেই ভাষায় বিদ্রোহের ডাক দেওয়া যায়, এমনকি সেই ভাষায় ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখা যায়— অর্থাৎ ভাষার সামাজিক মর্যাদা এবং ভাষার নন্দনতাত্ত্বিক ক্ষমতা এক নয়।
ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথার জন্ম যেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের সামাজিক কাঠামোয় মাতবর, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং সাধারণ মানুষের জীবন— সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত এবং এই সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা ভাষিক; ক্ষমতার ভাষা সাধারণত ঘোষণা করে; জনতার ভাষা প্রশ্ন করে— ‘কই?’ ‘ক্যান?’ ‘কার?’ এবং এই ছোট ছোট প্রশ্নের ভেতরেই একটি জনপদের আত্মসচেতনতা জন্ম নেয়; লোকভাষা এখানে শুধু বাস্তবতার অনুকরণ নয়; এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে কণ্ঠের পুনর্দখল এবং যে মানুষ নিজের ভাষায় প্রশ্ন করতে পারে, সে নিজের অস্তিত্বকেও পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং এই অর্থে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর আঞ্চলিক ভাষা একটি নাট্য-রাজনীতি নির্মাণ করে।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ ভাষা যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন আতঙ্ককে ধারণ করে, নূরলদীনের সারাজীবন-এ সেই ভাষা আরও দূরের ইতিহাসে ফিরে যায়; ১৭৮৩ সালের রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকবিদ্রোহের পটভূমিতে নির্মিত এই কাব্যনাট্যে ইতিহাস কোনো জাদুঘরের বস্তু হয়ে থাকে না; তা মানুষের মুখে ফিরে আসে। গবেষণাতেও নাটকটির ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং রংপুরের কৃষকবিদ্রোহের সঙ্গে এর সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এখানেই নাটকের আরেকটি বিস্ময়। নাট্যকার ইতিহাসকে কেবল তথ্য দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেননি; তিনি ইতিহাসকে ভাষা দিয়ে পুনর্জন্ম দিয়েছেন, নূরলদীন কোনো দূরবর্তী ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। সে নাড়িমাটির মানুষ, তার স্বপ্ন নাড়িমাটির, তার ক্ষুধা নাড়িমাটির; তার বিদ্রোহও নাড়িমাটির জন্যে এবং তার ভাষাও মাটির। ফলে ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’: একটি উচ্চারণের নন্দনতত্ত্ব এবং এই একটি বাক্যের কাছেই ফিরে আসা দরকার; এই একটি বাক্যই উত্তরে ভাষাকে আঞ্চলিক থেকে বৈশ্বিক করে তুলবে— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়।’ এর নন্দনশক্তি অর্থে যেমন, তার চেয়ে কম নয় ধ্বনিতে। ‘জাগো’— আহ্বান; ‘বাহে’— সম্বোধন, ‘কোনঠে’— স্থানিক উচ্চারণ, ‘সবায়’— সমষ্টি এবং চারটি স্তর একটি জনতার কণ্ঠ তৈরি করে। ফলে ‘সবাই জাগো’— বললে বাক্যটি সর্বজনীন— কিন্তু ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— বললে সেই সর্বজনীনতার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট জনপদ প্রবেশ করে এবং এখানে উত্তরবঙ্গ নিজেকে লুকিয়ে থাকে না। বরং নিজের উচ্চারণেই নিজেকে প্রকাশ করে— এই জন্য ‘জাগো বাহে’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি ভাষার মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার।
‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’: সর্বনামের অন্তর্গত ভূগোলটা অনুধাবন জরুরি— একজন মানুষ ‘আমি’ বললেই আমরা বুঝি সে নিজের কথা বলছে। কিন্তু ‘মুই’ বললে শুধু বক্তার পরিচয় বদলায় না— বদলে যায় তার সাংস্কৃতিক অবস্থানও। রাজবংশী-রংপুরী ভাষিক পরিসরে ‘মুই’, ‘হামি’, ‘হামার’-এর মতো রূপগুলোর ব্যবহার ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে স্পর্শ করে এবং ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এ ধরনের প্রথম পুরুষ সর্বনাম ও ক্রিয়ারূপের বৈশিষ্ট্য নথিবদ্ধ হয়েছে; ফলে নাট্যকারের নাটকে তাই সর্বনামও চরিত্রের ভূগোল। ‘আমি’ একটি ব্যক্তি, ‘মুই’ একটি ব্যক্তি, কিন্তু তার পেছনে একটি জনপদ দাঁড়িয়ে থাকে, ‘আমার’ ব্যক্তিগত মালিকানা, ‘হামার’ সেই মালিকানাকে নিয়ে যায় সমষ্টিগত জীবনযাপনের দিকে এবং এই জায়গাতেই ভাষা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।
নূরলদীনের সারাজীবন-এর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জায়গাগুলোর একটি তার স্বপ্নের জগৎ। নূরলদীনের স্বপ্ন কোনো প্রাসাদ নির্মাণের স্বপ্ন নয়। ‘হামার গাভীন গাই’ নূরলদীনের স্বপ্নের নন্দন— তার স্বপ্নে আছে গাভী, দুধ, সন্তান, নবান্ন, ঘর, নিরাপদ জীবন। ‘হামার গাভীন গাই’— এই উচ্চারণের মধ্যে একটি কৃষকসভ্যতা কথা বলে এবং ইকোফেমিনিজমের প্রসঙ্গ এখানে প্রকট হয়ে ওঠে— এখানে ‘হামার’ শব্দটির গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিকতার কারণে নয়। ‘হামার’ শব্দটি যেন স্বপ্নটিকে ব্যক্তিগত থেকে সামষ্টিক করে; এটি কেবল ‘আমার গাভী’ নয়— এটি এমন এক জীবনের আকাঙ্ক্ষা যেখানে কৃষকের নিজের ঘর থাকবে, নিজের খাদ্য থাকবে, নিজের ভবিষ্যৎ থাকবে— নূরলদীনের রাজনীতি আসলে সিংহাসনের রাজনীতি নয়; এটি জীবনের রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির ভাষাও আসে জীবনের কাছ থেকে।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটকে ভাষা-প্রয়োগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর ভাষিক নির্মাণের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না এবং এখানে লোকভাষা গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু; আঞ্চলিক ভাষার কাব্যিক সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর পরীক্ষা এই গ্রন্থে আরও গভীর; তাই তাঁর ভাষিক অভিযাত্রাকে একটি সরল রেখায় দেখা যায়— ‘লোকভাষা > কবিতার অন্তঃসুর > কাব্যনাট্যের সংলাপ > ইতিহাসের কণ্ঠ।’ অর্থাৎ তিনি লোকভাষাকে সাহিত্যে ঢোকাননি মাত্র; তার ভেতরের কবিত্ব আবিষ্কার করেছেন। আঞ্চলিকতা নয়, ভাষার বিকল্প কেন্দ্র— ‘আঞ্চলিক ভাষা’— শব্দবন্ধটির ভেতরেই একটি ক্ষমতার সম্পর্ক লুকিয়ে আছে; ‘আঞ্চলিক’ মানে যেন কেন্দ্রের বাইরে। কিন্তু কে কেন্দ্র? ঢাকা? কলকাতা? প্রমিত বাংলা? নাকি মানুষের নিজস্ব জনপদ? সৈয়দ হকের কাব্যনাটক এই প্রশ্নের একটি নন্দনতাত্ত্বিক উত্তর দেয়— উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে উত্তরবঙ্গই তো কেন্দ্র; তার নিজের ভাষাই তার প্রথম ভাষা। তার ‘হামি’ তার কাছে ‘আমি’-র চেয়ে কম সত্য নয়। তার ‘বাহে’ কোনো বিকৃত সম্বোধন নয়— তার ‘কুনঠে’ ভুল বাংলা নয় এবং এগুলো তার নিজের পৃথিবীর সঠিক শব্দ; এই কারণে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যদ্বয়ে ভাষাশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ সম্ভবত ভাষিক মর্যাদার পুনর্বণ্টন; তিনি বলেননি যে প্রমিত ভাষা অপ্রয়োজনীয়, তিনি দেখিয়েছেন— প্রমিত ভাষা একমাত্র সাহিত্যিক ভাষা নয়।
‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ ভাষা শ্রেণিগত পরিচয়েরও একটি সূক্ষ্ম মানচিত্র তৈরি করে— কৃষক, স্থানীয় মানুষ ও ক্ষমতাবান চরিত্রের ভাষিক ব্যবধান নাটকের সামাজিক দূরত্বকে দৃশ্যমান করে; নাটকটির কৃষক চরিত্রের সঙ্গে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সম্পর্ক এবং অন্যান্য চরিত্রের তুলনামূলক ভিন্ন ভাষাব্যবহারের দিকটি আলোচনায় প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: ইতিহাস কার ভাষায় লেখা হয়? সাধারণত ইতিহাস লেখা হয় ক্ষমতাবানদের ভাষায়, কিন্তু নূরলদীনের ইতিহাস বলা হচ্ছে কৃষকের ভাষায়। এটি নিছক শৈলীগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাসের কণ্ঠ বদলে দেওয়া। ইংরেজ শাসনের ইতিহাস নয় শুধু— কৃষকের ক্ষুধার ইতিহাস; রাজস্বের ইতিহাস নয় শুধু— ধানের ইতিহাস; বিদ্রোহের ইতিহাস নয় শুধু— ঘরের ইতিহাস এবং এই ইতিহাসের জন্য প্রমিত ভাষা যথেষ্ট হতে পারে; কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক হয়তো জানতেন, যে মানুষ ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু, তার মুখের ভাষা বাদ দিলে ইতিহাসের শরীর অসম্পূর্ণ থাকে।
প্রকৃতি— দৃশ্য নয়, জীবনব্যবস্থা; উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি সৈয়দ শামসুল হকের নাটকে কোনো রোমান্টিক পটভূমি নয়— নদী মানে বন্যা, মাঠ মানে শ্রম, ধান মানে খাদ্য, গাভী মানে সম্পদ, কাদা মানে জীবনযাপন, নবান্ন মানে বেঁচে থাকার উৎসব এবং এই কারণে তাঁর ভাষার প্রকৃতি-চিত্রও কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ মানুষের আগমনকে যখন বানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন প্রকৃতি ও মানুষের সমষ্টিগত গতির মধ্যে একটি নন্দনাত্মক সমান্তরালতা তৈরি হয় এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর স্বপ্নে নবান্ন, পিঠা, গাভী, দুধ, ঘর— সব মিলিয়ে যে ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়, তা আসলে একটি কৃষকসমাজের মুক্ত জীবনের কল্পনা— এই কারণে সৈয়দ শামসুল হকের উত্তরবঙ্গ কোনো ‘সুন্দর গ্রাম’ নয়; এটি শ্রমের ভূগোল এবং সেই শ্রমের ভাষাই তাঁর নাট্যের ভাষা।
চাচির গল্প থেকে কাব্যনাট্যের মঞ্চভাষা— একজন লেখকের সাহিত্যিক ভাষা কখনো কেবল বই পড়ে তৈরি হয় না; তার উৎস আরও পুরোনো, শৈশবের গল্পে— ঘুমপাড়ানি কথায়, পরিবারের প্রবীণ মানুষের মুখে, হাটের কথোপকথনে, গ্রামের মানুষের হাসি-ঠাট্টায়— সৈয়দ শামসুল হকের শৈশবের গল্পশোনার অভিজ্ঞতা এবং তাঁর চাচির গল্প বলার ভঙ্গির প্রভাব সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ তাঁর ভাষার শ্রুতিগত উৎস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র; প্রাবন্ধিকের সাথে ব্যক্তি সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন আড্ডায় যেমন তিনি এ বিষয়টি বলতেন তেমনি একাধিক সাক্ষাৎকারেও এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ তুলেছেন এবং এই জায়গায় ‘মাতৃভাষা’ শব্দটিকে কেবল ভাষাবিজ্ঞানের অর্থে নিলে চলবে না। মাতৃভাষা কখনো কখনো সেই ভাষা, যে ভাষায় প্রথম গল্প শুনেছি, যে ভাষায় প্রথম ভয় পেয়েছি; যে ভাষায় প্রথম ঘুমিয়েছি, যে ভাষায় প্রথম পৃথিবীকে চিনেছি, সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায় উত্তরবঙ্গের সেই শ্রুতিস্মৃতি ফিরে আসে; তাই তাঁর লোকভাষা কখনো অভিধান থেকে ধার করা বলে মনে হয় না এবং এটি যেন স্মৃতি থেকে উঠে আসে।
মঞ্চে ভাষার শরীর; কাব্যনাট্যের ভাষা কেবল পাঠের ভাষা নয়; এটি শরীরের ভাষা; অভিনেতার মুখে তাকে উচ্চারিত হতে হয়, তার স্বরাঘাত থাকতে হয়, বিরতি থাকতে হয়, শ্বাস নিতে হয় এবং এই জায়গায় উত্তরবঙ্গের লোকভাষা সৈয়দ শামসুল হকের নাট্যে বিশেষ শক্তি পেয়েছে— ‘হামি’, ‘বাহে’, ‘কুনঠে’, ‘হামার’—এসব শব্দ উচ্চারণ করলেই অভিনেতার শরীর বদলে যায়; তার স্বর, গতি, মুখের ভঙ্গি, এমনকি চরিত্রের সামাজিক অবস্থানও বদলে যায়- অর্থাৎ ভাষা এখানে চরিত্রের পোশাক নয়, ভাষাই চরিত্রের শরীর এবং এই কারণেই তাঁর কাব্যনাট্য মঞ্চে উচ্চারণযোগ্য হয়েছে— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’— দুটিই দীর্ঘকাল মঞ্চে উপস্থিত থেকেছে এবং দর্শক-স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে।
‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’ সাহিত্য থেকে লোকস্মৃতিতে— একটি সাহিত্যিক বাক্য কখন জনতার বাক্য হয়ে ওঠে? যখন তার ভেতরে এমন কিছু থাকে, যা একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের চেয়ে বড়; ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— এই বাক্যের ভেতর সেই বৃহত্তর সম্ভাবনাটি ছিল এবং এখানে জাগরণ আছে, সমষ্টি আছে, স্থান আছে, আত্মপরিচয় আছে, প্রতিরোধের সম্ভাবনা আছে— তাই সংলাপটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জনপ্রিয় পরিসরে পুনরায় ব্যবহৃত হয়েছে; এবং এখানে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়— লোকভাষা লেখকের কাছে আসে; নাট্যকার তাকে সাহিত্যে রূপ দেন; সাহিত্য আবার সেই ভাষাকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং মাটি থেকে শব্দ আসে; শব্দ সাহিত্যে ওঠে; সাহিত্য থেকে আবার মাটিতে ফিরে যায়।
প্রশ্ন আসতেই পারে নাটক দুটি প্রমিত ভাষায় বললে কী হারাত? ধরা যাক, ‘নূরলদীনের’ সারাজীবন সম্পূর্ণ প্রমিত বাংলায় লেখা হতো, ইতিহাস থাকত, নূরলদীন থাকত, বিদ্রোহ থাকত, কৃষকের দুঃখও থাকত কিন্তু কী যেন থাকত না— থাকত না কণ্ঠ। ‘আমি কোথায় যাব?’ এবং ‘মুই কুনঠে যাম?’— দুটি বাক্যের অভিধানগত অর্থ কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি যে মানুষটি বলে, তার পেছনে একটি ভূগোল দাঁড়িয়ে থাকে— তার নদী আছে, তার মাটি আছে,তার উঠোন আছে, তার উচ্চারণ আছে, তার পূর্বপুরুষ আছে, তার ভয়ও তার নিজের এবং সৈয়দ শামসুল হক সেই ‘নিজস্বতা’টিই ধরে রেখেছেন। কাব্যনাট্যদ্বয়ে রাজবংশী প্রভাব যেন শব্দের চেয়ে বেশি কিছু— সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে রাজবংশী ভাষার প্রভাবকে কেবল কিছু আঞ্চলিক শব্দের উপস্থিতি দিয়ে মাপা যায় না; প্রভাবটি কমপক্ষে পাঁচটি স্তরে কাজ করে— ১. শব্দে — ‘বাহে’, ‘হামি’, ‘হামার’, ‘মুই’, ‘কুনঠে’, ‘লাহান’ ইত্যাদি লোকভাষিক রূপে। ২. বাক্যভঙ্গিতে — প্রমিত বাংলার বাইরে উত্তরাঞ্চলীয় কথনরীতির ব্যবহারে। ৩. ছন্দে — পুনরাবৃত্তি, উচ্চারণ ও কথ্য গতির মাধ্যমে। ৪. চরিত্র নির্মাণে — ভাষার সাহায্যে শ্রেণি, অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে এবং ৫. ইতিহাস নির্মাণে — প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষাকে ইতিহাসের প্রধান কণ্ঠে পরিণত করার মাধ্যমে এবং এই পাঁচটি স্তর মিলেই তাঁর ভাষাকে নন্দন ও রাজনীতির একটি জটিল ভৌগোলিক ক্ষেত্র করে তোলে।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে উত্তরবঙ্গের ভাষা কোনো ‘অন্য’ ভাষা হয়ে বাংলা সাহিত্যের বাইরে দাঁড়ায় না। বরং তা বাংলা সাহিত্যের ভেতরেই একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে এবং এইখানে তাঁর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত কেন্দ্রের ধারণাকে প্রসারিত করা; বাংলা ভাষার কেন্দ্র একটিমাত্র নয়— ঢাকার উচ্চারণ যেমন বাংলা, রংপুরের উচ্চারণও বাংলা ভাষিক অভিজ্ঞতার অংশ; শহরের কবিতা যেমন সাহিত্য, কুড়িগ্রামের মানুষের মুখের গল্পও সাহিত্যিক সম্ভাবনায় পূর্ণ, প্রমিত ভাষা যেমন মূল্যবান, লোকভাষাও তেমনি অভিজ্ঞতার নিজস্ব ভাণ্ডার।
সৈয়দ হক সেই ভাণ্ডারের দরজা খুলেছেন এবং সৈয়দ শামসুল হক কুড়িগ্রাম নাড়িমাটি উত্তরবঙ্গকে লেখেননি, শুনেছেন— তাঁর কাব্যনাট্যের সবচেয়ে বড় ভাষিক অর্জন হয়তো এই নয় যে, তিনি অনেক আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন— বরং তিনি মানুষের মুখ শুনেছেন, তিনি শুনেছেন কৃষকের ভয়, শুনেছেন নারীর কান্না, শুনেছেন মাতবরের কর্তৃত্ব, শুনেছেন ধর্মীয় ভাষার আড়ালে লুকানো ক্ষমতা, শুনেছেন বিদ্রোহীর ডাক, শুনেছেন নবান্নের আনন্দ, শুনেছেন একটি জনপদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস এবং সেই শ্রুতিকে তিনি কাব্যনাট্যে প্রতিরূপায়ন করেছেন। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ উত্তরবঙ্গের লোকভাষা মুক্তিযুদ্ধের অন্ধকারে মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ সেই ভাষাই আঠারো শতকের কৃষকবিদ্রোহকে বর্তমানের শ্রুতিতে ফিরিয়ে আনে— দুই নাটকের সময় আলাদা, ইতিহাস পৃথক, সংগ্রামের প্রকৃতি ভিন্ন— কিন্তু মাটি এক এবং সেই মাটির ভাষাও এক গভীর অন্তঃস্রোতে প্রবাহিত— তাই ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’— শুধু নূরলদীনের ডাক নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ভাষ কোনো লোকরঙও নয়। এটি তাঁর চরিত্রের আত্মা, তাঁর ইতিহাসের শ্রুতি, তাঁর মঞ্চারও আত্মপ্রকাশ— ‘জাগো’— তার আহ্বান, ‘বাহে’— তার আপন সম্বোধন, ‘কোনঠে’— তার ভূগোল,‘সবায়’— তার মানুষ এবং এই চারটি শব্দে যেন একটি সম্পূর্ণ জনপদচিত্র উঠে আসে— সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যশিল্পের বিস্ময় এখানেই— তিনি উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যের বিষয় করেননি শুধু; উত্তরবঙ্গকে সাহিত্যের কণ্ঠে পরিণত করেছেন তাই তাঁর নাট্যে রাজবংশী-রংপুরী ভাষিক ঐতিহ্য কোনো অলংকার নয়, কোনো লোকরঙও নয়। এটি তাঁর চরিত্রের আত্মা, তাঁর ইতিহাসের শ্রুতি, তাঁর মঞ্চের ছন্দ এবং তাঁর মানুষের অস্তিত্বের ভাষা— একসময় যাকে ‘আঞ্চলিক’ বলা হয়েছিল, তাঁর হাতে সেই ভাষাই হয়ে উঠেছে মহাকাব্যিক, যে ভাষাকে শহর ‘গ্রাম্য’ বলে পাশ কাটাতে পারে, সেই ভাষাতেই তিনি ইতিহাসকে কথা বলিয়েছেন এবং এখানেই সৈয়দ শামসুল হকের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার— তিনি উত্তরবঙ্গকে শুধু লিখেননি; তিনি উত্তরবঙ্গের মুখ দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে কথা বলিয়েছেন— সেই কণ্ঠ আজও শোনা যায়; দূরে কোথাও, মাটির ওপর, মানুষের ভিড়ের ভিতর— ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়।’ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মাকোন্দো গ্রামের মতোই উত্তরবঙ্গ হয়ে ওঠে বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক এবং নাড়িমাটির রাজবংশী বা উত্তুরে মফিজ ভাষাই তার ভিত্তিভূমি।

আপনার মতামত লিখুন