সংবাদ

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি : ইতিহাস, স্থাপত্য ও গৌরবের নীরব সাক্ষী


সংগ্রাম দত্ত, মৌলভীবাজার
সংগ্রাম দত্ত, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২০ এএম

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি : ইতিহাস, স্থাপত্য ও গৌরবের নীরব সাক্ষী
গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বার। ছবি : সংবাদ

একসময় ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল অসংখ্য জমিদার পরিবার। তখন জমিদারি প্রথা চালু ছিল। জমিদারদের হাতে ছিল বিস্তীর্ণ জমিজমা ও বিপুল সম্পদ। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল নানা স্থাপনা, প্রাসাদ, দিঘি ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। সময়ের পরিক্রমায় সেই জমিদারি প্রথার অবসান হয়েছে, হারিয়ে গেছে অনেক জমিদার পরিবারও।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব বাংলার অধিকাংশ জমিদার পরিবার সহায়-সম্পত্তি ফেলে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায় এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। একসময়ের প্রভাবশালী এসব পরিবারের অনেকেই আর নিজেদের পুরোনো ভিটায় ফিরে আসেননি। ফলে তাদের রেখে যাওয়া স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নগুলোও ধীরে ধীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে এর ব্যতিক্রম কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবার। এই পরিবারের জমিদারের পুত্র ও বংশধর মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী, এলাকায় যিনি ‘মানব বাবু’ নামে পরিচিত, এখনো জীবিত আছেন। তার বর্তমান বয়স ৯৩ বছর। দীর্ঘ জীবনের এই পর্যায়ে এসেও মানবেন্দ্র বাবু গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একজন জীবন্ত সাক্ষী। তার জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি আমলের নানা ঘটনা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সময়ের পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস।

একসময় যে জমিদারি ব্যবস্থা ছিল বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দেশভাগ ও পরবর্তী সময়ের নানা পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটে। অনেক জমিদার পরিবার ছড়িয়ে পড়ে দেশের বাইরে। কিন্তু গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ইতিহাসে মানবেন্দ্র বাবুর উপস্থিতি সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হয়ে আছে।

নব্বই পেরোনো মানবেন্দ্র বাবু যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের অতীত, দেশভাগের সময়কার পরিবর্তন এবং একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের স্মৃতি। তার বেঁচে থাকা শুধু একটি পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করে না; এটি গাঙ্গাটিয়ার জমিদারি ইতিহাসেরও একটি জীবন্ত অধ্যায়।

কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চারশ বছরের পুরোনো এক স্থাপনা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘মানব বাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত। সময়ের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী এই জমিদার বাড়ি আজও বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের স্মৃতি। রোমান-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবমণ্ডিত এর নকশা, স্তম্ভের কারুকাজ ও নির্মাণরীতি দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে।

কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বাড়িটি প্রায় ১০ একর জমির ওপর বিস্তৃত। একসময়ের জমিদারি প্রভাব, ধর্মীয় আচার, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি–সব মিলিয়ে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এখনো এই বাড়িতে বসবাস করেন জমিদার বংশের শেষ উত্তরাধিকারী ৯৩ বছর বয়সী মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন তিনি। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে জমিদার বাড়ির আশপাশে মাছ চাষের পাশাপাশি এস্টেটের বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদ পরিচালনা করছেন।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভবন।


যেভাবে গড়ে উঠেছিল জমিদারি

মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬শ শতাব্দীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত পূর্ববঙ্গে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন রাজবংশীয় ব্রাহ্মণ। তার মাতুলালয় ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর মহকুমার কমলপুর এলাকায়।

ত্রিপুরার কমলপুর শহরের শশীকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর শ্বশুর। শশীকান্ত ভট্টাচার্যের পাঁচ ছেলে–অশুতোষ ভট্টাচার্য, সন্তোষ ভট্টাচার্য, সদানন্দ ভট্টাচার্য, পরিতোষ ভট্টাচার্য ও আরও একজন–ছিলেন মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর মামা।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের প্রথম পুরুষ হিসেবে ওই পণ্ডিতের নামই উল্লেখ করা হয়। গৌড়ীয় পরম্পরা অনুসারে তিনি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার কাছে পূজার জন্য একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এটিই ছিল বংশটির নির্মিত প্রথম শিবমন্দির।

সময়ের সঙ্গে ধ্যান, পূজা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবারটি এলাকায় মর্যাদা ও পরিচিতি লাভ করে। পরে এ বংশের দীননাথ চক্রবর্তী এলাকার প্রথম জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৮শ শতকের শেষভাগে তিনি হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ জমি কিনে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।

এরপর তার ছেলে অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী আঠারবাড়ির জমিদার জ্ঞানদাসুন্দরী চৌধুরানীর কাছ থেকে আরও দুই আনা জমি কিনে তা গাঙ্গাটিয়া জমিদারির সঙ্গে যুক্ত করেন। এভাবে ক্রমে জমিদারির পরিধি বাড়তে থাকে।

শিবমন্দির, সাগরদিঘী পেরিয়ে মূল ভবন

জমিদার পরিবারের প্রথম শিবমন্দিরটি মূল বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘ সময়ের ক্ষয় ও অবহেলায় মন্দিরটি এখন অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবু পুরোনো স্থাপনাটি অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে।

মন্দিরটির পাশেই রয়েছে বিশাল পুকুর ‘সাগরদিঘী’। এর পরেই চোখে পড়ে আরেকটি পুরোনো শিবমন্দির। সেটিও অনেকটা জরাজীর্ণ। তবে সেখানে এখনো পারিবারিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর একটি বড় ফটক পেরিয়ে দেখা যায় ‘শ্রীধর ভবন’। সেখান থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবন। মূল ফটক থেকে প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা চলে গেছে বাড়িটির দিকে। দুই পাশে সারি সারি নারকেলগাছ। সেই পথ ধরে এগোলেই সামনে আসে পুরোনো প্রাসাদসদৃশ স্থাপনাটি।

জমিদার বাড়ির প্রাচীন মন্দির।


রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের ছাপ

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্য। প্রায় চারশ বছর আগে নির্মিত হলেও ভবনের বিভিন্ন অংশে রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে সামনের অংশের স্তম্ভগুলোতে সেই নকশার ছাপ চোখে পড়ে।

দুইতলা মূল ভবনের বিভিন্ন অংশে রয়েছে বসার ঘর, অতিথিকক্ষ, আদালত কক্ষ ও সংগীতচর্চার কক্ষ। পাশাপাশি রয়েছে কাচারিঘর, নাহাবতখানা ও দরবারঘর। স্তম্ভগুলোতে সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। সামনের বড় উঠোন এবং চারপাশের উঁচু প্রাচীর পুরো স্থাপনাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

প্রধান প্রবেশদ্বারটিও নকশা ও অলংকরণে সমৃদ্ধ। সময়ের ক্ষয়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে জীর্ণতার ছাপ পড়েছে। তবু এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্য এখনো হারিয়ে যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতও বহন করছে বাড়িটি

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবিধুর স্মৃতি। মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা তার বাবা শ্রীভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৭ মে জমিদার বাড়িতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়।

যে স্থানে তার বাবা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হন, সেখানে পরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠন প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছে।

ফলে স্থাপনাটি শুধু জমিদারি আমলের স্মৃতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্থানীয় ইতিহাসও।

এক উত্তরাধিকারীর নিঃসঙ্গ পাহারা

দীর্ঘ ইতিহাসের এই বাড়িতে এখন অনেকটা একাকী জীবন কাটাচ্ছেন মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। তার প্রয়াত ছোট ভাই তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরীরও কোনো সন্তান নেই। ফলে বংশের উত্তরাধিকার ও পুরোনো স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর ভাষ্য, তাদের পরিবার দেশের ছোট জমিদার পরিবারগুলোর একটি। তারা ব্রাহ্মণ বংশীয় এবং পূর্বপুরুষেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

স্থানীয়ভাবে সমাজসেবক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। তিনি নিজেও বাড়িটির সংস্কার ও সংরক্ষণের বিষয়ে আগ্রহী।

লেখকের সঙ্গে জমিদার পরিবারের শেষ বংশধর মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী।


পর্যটনের সম্ভাবনা, প্রয়োজন সংরক্ষণের

বর্তমানে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন। বিদেশি পর্যটকেরাও স্থাপনাটি দেখতে আসেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এর স্থাপত্য, পুরোনো শিবমন্দির, সাগরদিঘী এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান–সব মিলিয়ে এখানে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রায় ১০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এ স্থাপনা যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে কিশোরগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভবন, পারিবারিক স্থাপত্য, ধর্মীয় নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে একটি সমন্বিত ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত সংরক্ষণ, স্থাপত্যগত মূল্যায়ন এবং ভবনের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের উদ্যোগ।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি তাই কেবল একটি পুরোনো ভবনের নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জমিদার পরিবারের উত্থান-পতন, ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাস, স্থাপত্যের স্বতন্ত্রতা এবং মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি। প্রায় চার শতাব্দীর পথ পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি এখন সময়ের কাছে একটি প্রশ্নও রেখে দিয়েছে–কীভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হবে এই ইতিহাস?

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত সংস্কার করা গেলে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে শুধু টিকে থাকবে না; কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের মানচিত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি : ইতিহাস, স্থাপত্য ও গৌরবের নীরব সাক্ষী

প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একসময় ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল অসংখ্য জমিদার পরিবার। তখন জমিদারি প্রথা চালু ছিল। জমিদারদের হাতে ছিল বিস্তীর্ণ জমিজমা ও বিপুল সম্পদ। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল নানা স্থাপনা, প্রাসাদ, দিঘি ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। সময়ের পরিক্রমায় সেই জমিদারি প্রথার অবসান হয়েছে, হারিয়ে গেছে অনেক জমিদার পরিবারও।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব বাংলার অধিকাংশ জমিদার পরিবার সহায়-সম্পত্তি ফেলে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায় এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। একসময়ের প্রভাবশালী এসব পরিবারের অনেকেই আর নিজেদের পুরোনো ভিটায় ফিরে আসেননি। ফলে তাদের রেখে যাওয়া স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নগুলোও ধীরে ধীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে এর ব্যতিক্রম কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবার। এই পরিবারের জমিদারের পুত্র ও বংশধর মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী, এলাকায় যিনি ‘মানব বাবু’ নামে পরিচিত, এখনো জীবিত আছেন। তার বর্তমান বয়স ৯৩ বছর। দীর্ঘ জীবনের এই পর্যায়ে এসেও মানবেন্দ্র বাবু গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একজন জীবন্ত সাক্ষী। তার জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি আমলের নানা ঘটনা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সময়ের পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস।

একসময় যে জমিদারি ব্যবস্থা ছিল বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দেশভাগ ও পরবর্তী সময়ের নানা পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটে। অনেক জমিদার পরিবার ছড়িয়ে পড়ে দেশের বাইরে। কিন্তু গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ইতিহাসে মানবেন্দ্র বাবুর উপস্থিতি সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হয়ে আছে।

নব্বই পেরোনো মানবেন্দ্র বাবু যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের অতীত, দেশভাগের সময়কার পরিবর্তন এবং একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের স্মৃতি। তার বেঁচে থাকা শুধু একটি পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করে না; এটি গাঙ্গাটিয়ার জমিদারি ইতিহাসেরও একটি জীবন্ত অধ্যায়।

কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চারশ বছরের পুরোনো এক স্থাপনা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘মানব বাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত। সময়ের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী এই জমিদার বাড়ি আজও বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের স্মৃতি। রোমান-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবমণ্ডিত এর নকশা, স্তম্ভের কারুকাজ ও নির্মাণরীতি দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে।

কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বাড়িটি প্রায় ১০ একর জমির ওপর বিস্তৃত। একসময়ের জমিদারি প্রভাব, ধর্মীয় আচার, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি–সব মিলিয়ে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এখনো এই বাড়িতে বসবাস করেন জমিদার বংশের শেষ উত্তরাধিকারী ৯৩ বছর বয়সী মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন তিনি। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে জমিদার বাড়ির আশপাশে মাছ চাষের পাশাপাশি এস্টেটের বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদ পরিচালনা করছেন।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভবন।


যেভাবে গড়ে উঠেছিল জমিদারি

মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬শ শতাব্দীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত পূর্ববঙ্গে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন রাজবংশীয় ব্রাহ্মণ। তার মাতুলালয় ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর মহকুমার কমলপুর এলাকায়।

ত্রিপুরার কমলপুর শহরের শশীকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর শ্বশুর। শশীকান্ত ভট্টাচার্যের পাঁচ ছেলে–অশুতোষ ভট্টাচার্য, সন্তোষ ভট্টাচার্য, সদানন্দ ভট্টাচার্য, পরিতোষ ভট্টাচার্য ও আরও একজন–ছিলেন মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর মামা।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের প্রথম পুরুষ হিসেবে ওই পণ্ডিতের নামই উল্লেখ করা হয়। গৌড়ীয় পরম্পরা অনুসারে তিনি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার কাছে পূজার জন্য একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এটিই ছিল বংশটির নির্মিত প্রথম শিবমন্দির।

সময়ের সঙ্গে ধ্যান, পূজা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিবারটি এলাকায় মর্যাদা ও পরিচিতি লাভ করে। পরে এ বংশের দীননাথ চক্রবর্তী এলাকার প্রথম জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৮শ শতকের শেষভাগে তিনি হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ জমি কিনে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।

এরপর তার ছেলে অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী আঠারবাড়ির জমিদার জ্ঞানদাসুন্দরী চৌধুরানীর কাছ থেকে আরও দুই আনা জমি কিনে তা গাঙ্গাটিয়া জমিদারির সঙ্গে যুক্ত করেন। এভাবে ক্রমে জমিদারির পরিধি বাড়তে থাকে।

শিবমন্দির, সাগরদিঘী পেরিয়ে মূল ভবন

জমিদার পরিবারের প্রথম শিবমন্দিরটি মূল বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘ সময়ের ক্ষয় ও অবহেলায় মন্দিরটি এখন অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবু পুরোনো স্থাপনাটি অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে।

মন্দিরটির পাশেই রয়েছে বিশাল পুকুর ‘সাগরদিঘী’। এর পরেই চোখে পড়ে আরেকটি পুরোনো শিবমন্দির। সেটিও অনেকটা জরাজীর্ণ। তবে সেখানে এখনো পারিবারিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর একটি বড় ফটক পেরিয়ে দেখা যায় ‘শ্রীধর ভবন’। সেখান থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবন। মূল ফটক থেকে প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা চলে গেছে বাড়িটির দিকে। দুই পাশে সারি সারি নারকেলগাছ। সেই পথ ধরে এগোলেই সামনে আসে পুরোনো প্রাসাদসদৃশ স্থাপনাটি।

জমিদার বাড়ির প্রাচীন মন্দির।


রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের ছাপ

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্য। প্রায় চারশ বছর আগে নির্মিত হলেও ভবনের বিভিন্ন অংশে রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে সামনের অংশের স্তম্ভগুলোতে সেই নকশার ছাপ চোখে পড়ে।

দুইতলা মূল ভবনের বিভিন্ন অংশে রয়েছে বসার ঘর, অতিথিকক্ষ, আদালত কক্ষ ও সংগীতচর্চার কক্ষ। পাশাপাশি রয়েছে কাচারিঘর, নাহাবতখানা ও দরবারঘর। স্তম্ভগুলোতে সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। সামনের বড় উঠোন এবং চারপাশের উঁচু প্রাচীর পুরো স্থাপনাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

প্রধান প্রবেশদ্বারটিও নকশা ও অলংকরণে সমৃদ্ধ। সময়ের ক্ষয়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে জীর্ণতার ছাপ পড়েছে। তবু এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্য এখনো হারিয়ে যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতও বহন করছে বাড়িটি

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবিধুর স্মৃতি। মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা তার বাবা শ্রীভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৭ মে জমিদার বাড়িতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়।

যে স্থানে তার বাবা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হন, সেখানে পরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠন প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছে।

ফলে স্থাপনাটি শুধু জমিদারি আমলের স্মৃতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্থানীয় ইতিহাসও।

এক উত্তরাধিকারীর নিঃসঙ্গ পাহারা

দীর্ঘ ইতিহাসের এই বাড়িতে এখন অনেকটা একাকী জীবন কাটাচ্ছেন মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। তার প্রয়াত ছোট ভাই তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরীরও কোনো সন্তান নেই। ফলে বংশের উত্তরাধিকার ও পুরোনো স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর ভাষ্য, তাদের পরিবার দেশের ছোট জমিদার পরিবারগুলোর একটি। তারা ব্রাহ্মণ বংশীয় এবং পূর্বপুরুষেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

স্থানীয়ভাবে সমাজসেবক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। তিনি নিজেও বাড়িটির সংস্কার ও সংরক্ষণের বিষয়ে আগ্রহী।

লেখকের সঙ্গে জমিদার পরিবারের শেষ বংশধর মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী।


পর্যটনের সম্ভাবনা, প্রয়োজন সংরক্ষণের

বর্তমানে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন। বিদেশি পর্যটকেরাও স্থাপনাটি দেখতে আসেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এর স্থাপত্য, পুরোনো শিবমন্দির, সাগরদিঘী এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান–সব মিলিয়ে এখানে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রায় ১০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এ স্থাপনা যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে কিশোরগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভবন, পারিবারিক স্থাপত্য, ধর্মীয় নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে একটি সমন্বিত ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত সংরক্ষণ, স্থাপত্যগত মূল্যায়ন এবং ভবনের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের উদ্যোগ।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি তাই কেবল একটি পুরোনো ভবনের নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জমিদার পরিবারের উত্থান-পতন, ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাস, স্থাপত্যের স্বতন্ত্রতা এবং মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি। প্রায় চার শতাব্দীর পথ পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি এখন সময়ের কাছে একটি প্রশ্নও রেখে দিয়েছে–কীভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হবে এই ইতিহাস?

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত সংস্কার করা গেলে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে শুধু টিকে থাকবে না; কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের মানচিত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত