সংবাদ

ঘরের ভেতরেই যখন মানুষ শত্রু


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

ঘরের ভেতরেই যখন মানুষ শত্রু
প্রতীকী ছবি।

বাইরে যতই অনিশ্চয়তা থাকুক, মানুষ বিশ্বাস করে—ঘরে ফিরলে অন্তত আপনজনের কাছে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সেই ঘরই যখন হত্যার মঞ্চ হয়ে ওঠে, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা সন্তান যখন একে অন্যের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখন ঘটনাটি আর কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে—পরিবারের ভেতরে আসলে কী ভাঙছে?

গত দুই দশকে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো সাধারণ হত্যাকাণ্ডের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলের পাঁচ খুন, ২০২৬ সালের গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনের হত্যাকাণ্ড, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৭ সালের ময়মনসিংহে একই পরিবারের নয় সদস্যের সম্মিলিত আত্মহত্যা—ঘটনাগুলোর কারণ এক নয়, চরিত্রও এক নয়। 

কিন্তু এগুলো পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজের কিছু গভীর দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। এখানেই এই ঘটনাগুলোর সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব। এগুলো কি বিচ্ছিন্ন কিছু উন্মাদ মানুষের কাজ? নাকি পরিবার, অর্থনীতি, মাদক, ক্ষমতার সম্পর্ক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার কোথাও এমন ফাঁক তৈরি হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চরম সহিংসতা ঘরে ঢুকে পড়ছে?

বাবুরাইলে আপনজনের মধ্যেই অপরাধের অন্ধকার: ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ছিল দুই শিশুও। তদন্তে মাহফুজ নামে পরিবারেরই একজন আত্মীয়কে অভিযুক্ত করা হয়।তার বিরুদ্ধে এককভাবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পুলিশি তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমে হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে।

প্রাচীনকাল থেকে পারিবারিক সহিংসতা ছিল

এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে আনে।পরিবারের পরিচিতি কি সব সময় নৈতিক বাধা তৈরি করে?উত্তর হচ্ছে, না। বরং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাখ্যান, অপমান, যৌন আগ্রহ, প্রতিশোধ কিংবা অর্থনৈতিক বিরোধ কখনো কখনো আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অপরাধী ভুক্তভোগীর জীবন, অভ্যাস, দুর্বলতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বেশি জানে। অর্থাৎ ঘনিষ্ঠতা নিজে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

কাপাসিয়ায় পরিবারের ভাঙন যখন শিশুদেরও রক্ষা করতে পারে না: ২০২৬ সালের মে মাসে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজন—এক নারী, তার তিন সন্তান ও ভাই—নিহত হন। পুলিশ ও মামলার নথিতে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি উঠে আসে; প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে নারীর স্বামীকে খোঁজা হয়। পরে তার সম্ভাব্য মৃত্যুর বিষয়েও পুলিশ তদন্ত করেছে, তবে পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কথা জানানো হয়েছিল। এই ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে।পারিবারিক দ্বন্দ্ব যখন চরমে যায়, তখন শিশুরাও কখনো অপরাধীর চোখে পৃথক মানুষ থাকে না। তারা হয়ে ওঠে সংঘাতের অংশ।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য বা পারিবারিক সংঘাতে মানুষ কখনো প্রতিপক্ষকে আর ব্যক্তি হিসেবে দেখে না; তাকে দেখে নিজের অপমান, ক্ষোভ বা ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে। তখন প্রতিশোধের পরিধি বেড়ে গিয়ে অন্য সদস্যদেরও গ্রাস করতে পারে। এটি অবশ্যই প্রতিটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু পরিবারে সহিংসতার ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে ক্ষমতার অসমতা, দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা গুরুত্বপূর্ণ।

সহিংসতা

রংপুরে মাদক যখন ঘরের নিরাপত্তা ভেঙে দেয়: ২০২৬ সালের আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিহত হন। পুলিশ বলেছে, দুই যুবক ওই বাড়ির ছাদে মাদক সেবন করছিলেন; গণপতি চক্রবর্তী তাদের বাধা দেওয়ার পর সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। দুই সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।

এখানে পরিবারটি অপরাধী পরিবারের মতো নয়—বরং অপরাধের আগ্রাসনের শিকার একটি পরিবার।এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাদককে শুধু “নৈতিক অবক্ষয়” বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে। মাদক একটি অপরাধ অর্থনীতি, একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং একটি সামাজিক নেটওয়ার্কের অংশ। মাদক সহজলভ্য হলে এবং তার সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে একটি সাধারণ পারিবারিক বিরোধও দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হতে পারে।

ময়মনসিংহে যখন একটি পরিবারের ভেতরেই তৈরি হয় আলাদা পৃথিবী: ২০০৭ সালের ময়মনসিংহের কাশর এলাকার ঘটনাটি অন্য ধরনের। একই পরিবারের নয়জন ট্রেনের সামনে গিয়ে মারা যান। পরে তাদের বাড়ি থেকে পাওয়া ডায়েরি ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে তদন্তে পরিবারের বিচ্ছিন্ন জীবন ও একটি নিজস্ব বিশ্বাসব্যবস্থার কথা উঠে আসে। তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে পরিবারের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পুনর্জন্ম ও পরকালসংক্রান্ত বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

এটিকে সরাসরি “কাল্ট” বলে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং ঘটনাটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং যৌথ মানসিক সংকটের একটি বিরল কেসস্টাডি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-একটি পরিবার যখন দীর্ঘ সময় সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস বাইরের বাস্তবতার ওপর অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তখন একজনের বিশ্বাস অন্যদের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও নির্ভরশীল সদস্যদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত থাকায় পুরো পরিবার একটি সম্মিলিত মানসিক কাঠামোর মধ্যে আটকে যেতে পারে।

পরিবার কেন সহিংস হয়ে ওঠে? এখানে “সামাজিক অবক্ষয়” শব্দটি খুব সহজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি যথেষ্ট নয়। পরিবারের নৃশংসতার পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। বরং কয়েকটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে।

পারিবারিক সহিংসতা

প্রথমত, ব্যক্তি স্তরে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, আসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, পূর্বের সহিংসতার অভিজ্ঞতা, গুরুতর মানসিক সংকট। দ্বিতীয় স্তরে দাম্পত্য সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ, ক্ষমতার লড়াই, যৌন নিপীড়ন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী অপমান, যোগাযোগের ভাঙন। তৃতীয় সমাজ স্তরে দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক নেটওয়ার্ক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ এবং প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের “ওটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার” মনোভাব।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় স্তরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, শিশু সুরক্ষার দুর্বলতা, মাদক নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, দ্রুত আইনি সহায়তার অভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে একইভাবে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি ও সমাজ—চার স্তরের আন্তঃসম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। মাদক ও অ্যালকোহলের ক্ষতিকর ব্যবহার, পারিবারিক অকার্যকারিতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করা এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা—সবই ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারণা হচ্ছে, ‘এটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার’।বাংলাদেশের সমাজে পারিবারিক বিরোধকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রবল। স্বামী স্ত্রীকে মারছেন—“ঘরের ব্যাপার”। বাবা সন্তানকে নির্যাতন করছেন—“শাসন করছেন”। ভাই ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করছেন—“নিজেদের ব্যাপার”। কিশোরী আত্মীয়ের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার—“সম্মানের বিষয়”। এই সংস্কৃতি অপরাধীকে একটি অদৃশ্য নিরাপদ অঞ্চল দেয়। ফলে সহিংসতার প্রথম পর্যায়ে যে হস্তক্ষেপ করা যেত, তা আর হয় না।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জাতীয় নারী ও শিশু বিষয়ক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় তথ্য হলো—বিবিএস ও ইউএনএফপিএর জাতীয় জরিপে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো ধরনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; গত ১২ মাসে এই হার ৪৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক, ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা কাউকে জানাননি।

এখানে একটি বড় সামাজিক বার্তা আছে। সহিংসতা প্রকাশের আগেই অনেক পরিবার নীরব হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে বিপদ আরও গভীর।শিশু নির্যাতনকে শুধু “অপরাধ” হিসেবে দেখলে এর আন্তঃপ্রজন্মীয় চরিত্র বোঝা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শৈশবে সহিংসতার শিকার হওয়া ভবিষ্যতে মানসিক সমস্যা, মাদক ব্যবহার, আত্মক্ষতি এবং পরবর্তী জীবনে সহিংসতার শিকার বা অপরাধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সহিংসতা কখনো কখনো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।

অর্থাৎ যে পরিবারে শিশু প্রতিদিন দেখে বাবা মাকে মারছেন, কিংবা মা-বাবা সন্তানকে অপমান করছেন, কিংবা যৌন নির্যাতন গোপন রাখা হচ্ছে—সেখানে শিশু শুধু একটি ঘটনা দেখছে না। সে একটি আচরণগত মডেল শিখছে। এ কারণেই পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আসলে ভবিষ্যতের অপরাধ প্রতিরোধও।

তাহলে কি বাংলাদেশ আগের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর? এখানে সাবধান হওয়া জরুরি। আলোচিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ বা পারিবারিক নৃশংসতার খবর আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে—এর একটি কারণ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার। তাই শুধু সংবাদে বেশি ঘটনা দেখা যাচ্ছে বলে “অপরাধ ভয়াবহ হারে বেড়েছে” বলা বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়।

তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিশু নির্যাতন ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বড় সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত এএসকে-এর হিসাবে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।ধর্ষণের পর অন্তত ১৪ শিশু নিহত হয়েছে। অর্থাৎ “অপরাধ বেড়েছে কি না” প্রশ্নের পাশাপাশি আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি সহিংসতার প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারছি?রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?পরিবারকে সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আড়ালে চলে যায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ শুধু হত্যার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়।

রাষ্ট্রকে কাজ করতে হয় হত্যার আগেই। প্রয়োজন— ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক কর্মীভিত্তিক সহায়তা। উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সংকটকালীন কাউন্সেলিং। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ ও সমাজসেবার সমন্বিত রিপোর্টিং ব্যবস্থা। পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগকে “পারিবারিক ব্যাপার” হিসেবে না দেখে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা। স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সুরক্ষা ব্যবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশু সহিংসতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ, অভিভাবক সহায়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সাড়া দেওয়ার সেবা এবং শিক্ষা—সবগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলছে। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো সম্পর্কের নয়, সম্পর্ক সামলানোর। বাংলাদেশের পরিবার ভেঙে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে এবং সেই চাপ সামলানোর সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল।

এখানে অর্থনৈতিক চাপ আছে। দাম্পত্য প্রত্যাশা বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বেড়েছে। মাদক ও ডিজিটাল জগত নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা এখনও প্রবল। যৌন নির্যাতন নিয়ে নীরবতা আছে। আর পরিবার ও রাষ্ট্রের মাঝখানে থাকা সামাজিক প্রতিষ্ঠান—প্রতিবেশী, আত্মীয়, স্থানীয় নেতৃত্ব, স্কুল, সামাজিক সংগঠন—অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো কার্যকর নেই। ফলে একজন মানুষ সংকটে পড়লে তার চারপাশে মানুষ থাকলেও সহায়তার নেটওয়ার্ক নাও থাকতে পারে।

পরিবারিক সহিংসতা

ঘরকে আবার নিরাপদ করতে হলে পারিবারিক নৃশংসতার সমাধান কেবল কঠোর শাস্তি নয়। শাস্তি প্রয়োজন। কিন্তু শাস্তি হলো শেষ ধাপ। প্রথম ধাপ হলো ঝুঁকি শনাক্ত করা। যেখানে নিয়মিত সহিংসতা আছে, সেখানে দ্রুত হস্তক্ষেপ। যেখানে মাদকাসক্তি আছে, সেখানে চিকিৎসা। যেখানে শিশু নির্যাতনের সন্দেহ আছে, সেখানে সুরক্ষা। যেখানে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে, সেখানে কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা। যেখানে কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে, সেখানে জরুরি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা।

আর যেখানে একটি পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, সেখানে সমাজকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক না হয়ে সহায়তার অংশ হতে হবে। কারণ ভয়াবহ পারিবারিক অপরাধ সাধারণত এক মুহূর্তে জন্ম নেয় না। তার আগে থাকে— দীর্ঘ নীরবতা। অমীমাংসিত ক্ষোভ। ক্ষমতার অপব্যবহার। আর্থিক চাপ। আসক্তি।

মানসিক বিচ্ছিন্নতা। এবং চারপাশের মানুষের ‘ওটা তাদের ব্যাপার’ বলে সরে দাঁড়ানো। শেষ পর্যন্ত যখন রক্ত ঝরে, তখন আমরা ঘটনাটিকে “পৈশাচিক” বলি। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তার আগেই করা উচিত— রক্ত ঝরার আগের সংকেতগুলো আমরা কেন দেখতে পেলাম না?

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঘরের ভেতরেই যখন মানুষ শত্রু

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাইরে যতই অনিশ্চয়তা থাকুক, মানুষ বিশ্বাস করে—ঘরে ফিরলে অন্তত আপনজনের কাছে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সেই ঘরই যখন হত্যার মঞ্চ হয়ে ওঠে, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা সন্তান যখন একে অন্যের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখন ঘটনাটি আর কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে—পরিবারের ভেতরে আসলে কী ভাঙছে?

গত দুই দশকে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো সাধারণ হত্যাকাণ্ডের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলের পাঁচ খুন, ২০২৬ সালের গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনের হত্যাকাণ্ড, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চারজনের হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৭ সালের ময়মনসিংহে একই পরিবারের নয় সদস্যের সম্মিলিত আত্মহত্যা—ঘটনাগুলোর কারণ এক নয়, চরিত্রও এক নয়। 

কিন্তু এগুলো পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজের কিছু গভীর দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। এখানেই এই ঘটনাগুলোর সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব। এগুলো কি বিচ্ছিন্ন কিছু উন্মাদ মানুষের কাজ? নাকি পরিবার, অর্থনীতি, মাদক, ক্ষমতার সম্পর্ক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার কোথাও এমন ফাঁক তৈরি হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চরম সহিংসতা ঘরে ঢুকে পড়ছে?

বাবুরাইলে আপনজনের মধ্যেই অপরাধের অন্ধকার: ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ছিল দুই শিশুও। তদন্তে মাহফুজ নামে পরিবারেরই একজন আত্মীয়কে অভিযুক্ত করা হয়।তার বিরুদ্ধে এককভাবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পুলিশি তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমে হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে।

প্রাচীনকাল থেকে পারিবারিক সহিংসতা ছিল

এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে আনে।পরিবারের পরিচিতি কি সব সময় নৈতিক বাধা তৈরি করে?উত্তর হচ্ছে, না। বরং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাখ্যান, অপমান, যৌন আগ্রহ, প্রতিশোধ কিংবা অর্থনৈতিক বিরোধ কখনো কখনো আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অপরাধী ভুক্তভোগীর জীবন, অভ্যাস, দুর্বলতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বেশি জানে। অর্থাৎ ঘনিষ্ঠতা নিজে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

কাপাসিয়ায় পরিবারের ভাঙন যখন শিশুদেরও রক্ষা করতে পারে না: ২০২৬ সালের মে মাসে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজন—এক নারী, তার তিন সন্তান ও ভাই—নিহত হন। পুলিশ ও মামলার নথিতে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি উঠে আসে; প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে নারীর স্বামীকে খোঁজা হয়। পরে তার সম্ভাব্য মৃত্যুর বিষয়েও পুলিশ তদন্ত করেছে, তবে পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কথা জানানো হয়েছিল। এই ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে।পারিবারিক দ্বন্দ্ব যখন চরমে যায়, তখন শিশুরাও কখনো অপরাধীর চোখে পৃথক মানুষ থাকে না। তারা হয়ে ওঠে সংঘাতের অংশ।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য বা পারিবারিক সংঘাতে মানুষ কখনো প্রতিপক্ষকে আর ব্যক্তি হিসেবে দেখে না; তাকে দেখে নিজের অপমান, ক্ষোভ বা ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে। তখন প্রতিশোধের পরিধি বেড়ে গিয়ে অন্য সদস্যদেরও গ্রাস করতে পারে। এটি অবশ্যই প্রতিটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু পরিবারে সহিংসতার ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে ক্ষমতার অসমতা, দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা গুরুত্বপূর্ণ।

সহিংসতা

রংপুরে মাদক যখন ঘরের নিরাপত্তা ভেঙে দেয়: ২০২৬ সালের আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিহত হন। পুলিশ বলেছে, দুই যুবক ওই বাড়ির ছাদে মাদক সেবন করছিলেন; গণপতি চক্রবর্তী তাদের বাধা দেওয়ার পর সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। দুই সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।

এখানে পরিবারটি অপরাধী পরিবারের মতো নয়—বরং অপরাধের আগ্রাসনের শিকার একটি পরিবার।এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাদককে শুধু “নৈতিক অবক্ষয়” বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে। মাদক একটি অপরাধ অর্থনীতি, একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং একটি সামাজিক নেটওয়ার্কের অংশ। মাদক সহজলভ্য হলে এবং তার সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে একটি সাধারণ পারিবারিক বিরোধও দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হতে পারে।

ময়মনসিংহে যখন একটি পরিবারের ভেতরেই তৈরি হয় আলাদা পৃথিবী: ২০০৭ সালের ময়মনসিংহের কাশর এলাকার ঘটনাটি অন্য ধরনের। একই পরিবারের নয়জন ট্রেনের সামনে গিয়ে মারা যান। পরে তাদের বাড়ি থেকে পাওয়া ডায়েরি ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে তদন্তে পরিবারের বিচ্ছিন্ন জীবন ও একটি নিজস্ব বিশ্বাসব্যবস্থার কথা উঠে আসে। তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে পরিবারের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পুনর্জন্ম ও পরকালসংক্রান্ত বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

এটিকে সরাসরি “কাল্ট” বলে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং ঘটনাটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং যৌথ মানসিক সংকটের একটি বিরল কেসস্টাডি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-একটি পরিবার যখন দীর্ঘ সময় সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস বাইরের বাস্তবতার ওপর অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তখন একজনের বিশ্বাস অন্যদের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও নির্ভরশীল সদস্যদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত থাকায় পুরো পরিবার একটি সম্মিলিত মানসিক কাঠামোর মধ্যে আটকে যেতে পারে।

পরিবার কেন সহিংস হয়ে ওঠে? এখানে “সামাজিক অবক্ষয়” শব্দটি খুব সহজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি যথেষ্ট নয়। পরিবারের নৃশংসতার পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। বরং কয়েকটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে।

পারিবারিক সহিংসতা

প্রথমত, ব্যক্তি স্তরে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, আসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, পূর্বের সহিংসতার অভিজ্ঞতা, গুরুতর মানসিক সংকট। দ্বিতীয় স্তরে দাম্পত্য সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ, ক্ষমতার লড়াই, যৌন নিপীড়ন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী অপমান, যোগাযোগের ভাঙন। তৃতীয় সমাজ স্তরে দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক নেটওয়ার্ক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ এবং প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের “ওটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার” মনোভাব।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় স্তরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, শিশু সুরক্ষার দুর্বলতা, মাদক নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, দ্রুত আইনি সহায়তার অভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে একইভাবে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি ও সমাজ—চার স্তরের আন্তঃসম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। মাদক ও অ্যালকোহলের ক্ষতিকর ব্যবহার, পারিবারিক অকার্যকারিতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করা এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা—সবই ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারণা হচ্ছে, ‘এটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার’।বাংলাদেশের সমাজে পারিবারিক বিরোধকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রবল। স্বামী স্ত্রীকে মারছেন—“ঘরের ব্যাপার”। বাবা সন্তানকে নির্যাতন করছেন—“শাসন করছেন”। ভাই ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করছেন—“নিজেদের ব্যাপার”। কিশোরী আত্মীয়ের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার—“সম্মানের বিষয়”। এই সংস্কৃতি অপরাধীকে একটি অদৃশ্য নিরাপদ অঞ্চল দেয়। ফলে সহিংসতার প্রথম পর্যায়ে যে হস্তক্ষেপ করা যেত, তা আর হয় না।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জাতীয় নারী ও শিশু বিষয়ক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় তথ্য হলো—বিবিএস ও ইউএনএফপিএর জাতীয় জরিপে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো ধরনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; গত ১২ মাসে এই হার ৪৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক, ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা কাউকে জানাননি।

এখানে একটি বড় সামাজিক বার্তা আছে। সহিংসতা প্রকাশের আগেই অনেক পরিবার নীরব হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে বিপদ আরও গভীর।শিশু নির্যাতনকে শুধু “অপরাধ” হিসেবে দেখলে এর আন্তঃপ্রজন্মীয় চরিত্র বোঝা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শৈশবে সহিংসতার শিকার হওয়া ভবিষ্যতে মানসিক সমস্যা, মাদক ব্যবহার, আত্মক্ষতি এবং পরবর্তী জীবনে সহিংসতার শিকার বা অপরাধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সহিংসতা কখনো কখনো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।

অর্থাৎ যে পরিবারে শিশু প্রতিদিন দেখে বাবা মাকে মারছেন, কিংবা মা-বাবা সন্তানকে অপমান করছেন, কিংবা যৌন নির্যাতন গোপন রাখা হচ্ছে—সেখানে শিশু শুধু একটি ঘটনা দেখছে না। সে একটি আচরণগত মডেল শিখছে। এ কারণেই পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আসলে ভবিষ্যতের অপরাধ প্রতিরোধও।

তাহলে কি বাংলাদেশ আগের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর? এখানে সাবধান হওয়া জরুরি। আলোচিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ বা পারিবারিক নৃশংসতার খবর আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে—এর একটি কারণ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার। তাই শুধু সংবাদে বেশি ঘটনা দেখা যাচ্ছে বলে “অপরাধ ভয়াবহ হারে বেড়েছে” বলা বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়।

তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিশু নির্যাতন ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বড় সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত এএসকে-এর হিসাবে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।ধর্ষণের পর অন্তত ১৪ শিশু নিহত হয়েছে। অর্থাৎ “অপরাধ বেড়েছে কি না” প্রশ্নের পাশাপাশি আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি সহিংসতার প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারছি?রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?পরিবারকে সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আড়ালে চলে যায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ শুধু হত্যার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়।

রাষ্ট্রকে কাজ করতে হয় হত্যার আগেই। প্রয়োজন— ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক কর্মীভিত্তিক সহায়তা। উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সংকটকালীন কাউন্সেলিং। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ ও সমাজসেবার সমন্বিত রিপোর্টিং ব্যবস্থা। পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগকে “পারিবারিক ব্যাপার” হিসেবে না দেখে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা। স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সুরক্ষা ব্যবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশু সহিংসতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ, অভিভাবক সহায়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সাড়া দেওয়ার সেবা এবং শিক্ষা—সবগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলছে। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো সম্পর্কের নয়, সম্পর্ক সামলানোর। বাংলাদেশের পরিবার ভেঙে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে এবং সেই চাপ সামলানোর সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল।

এখানে অর্থনৈতিক চাপ আছে। দাম্পত্য প্রত্যাশা বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বেড়েছে। মাদক ও ডিজিটাল জগত নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা এখনও প্রবল। যৌন নির্যাতন নিয়ে নীরবতা আছে। আর পরিবার ও রাষ্ট্রের মাঝখানে থাকা সামাজিক প্রতিষ্ঠান—প্রতিবেশী, আত্মীয়, স্থানীয় নেতৃত্ব, স্কুল, সামাজিক সংগঠন—অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো কার্যকর নেই। ফলে একজন মানুষ সংকটে পড়লে তার চারপাশে মানুষ থাকলেও সহায়তার নেটওয়ার্ক নাও থাকতে পারে।

পরিবারিক সহিংসতা

ঘরকে আবার নিরাপদ করতে হলে পারিবারিক নৃশংসতার সমাধান কেবল কঠোর শাস্তি নয়। শাস্তি প্রয়োজন। কিন্তু শাস্তি হলো শেষ ধাপ। প্রথম ধাপ হলো ঝুঁকি শনাক্ত করা। যেখানে নিয়মিত সহিংসতা আছে, সেখানে দ্রুত হস্তক্ষেপ। যেখানে মাদকাসক্তি আছে, সেখানে চিকিৎসা। যেখানে শিশু নির্যাতনের সন্দেহ আছে, সেখানে সুরক্ষা। যেখানে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে, সেখানে কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা। যেখানে কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে, সেখানে জরুরি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা।

আর যেখানে একটি পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, সেখানে সমাজকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক না হয়ে সহায়তার অংশ হতে হবে। কারণ ভয়াবহ পারিবারিক অপরাধ সাধারণত এক মুহূর্তে জন্ম নেয় না। তার আগে থাকে— দীর্ঘ নীরবতা। অমীমাংসিত ক্ষোভ। ক্ষমতার অপব্যবহার। আর্থিক চাপ। আসক্তি।

মানসিক বিচ্ছিন্নতা। এবং চারপাশের মানুষের ‘ওটা তাদের ব্যাপার’ বলে সরে দাঁড়ানো। শেষ পর্যন্ত যখন রক্ত ঝরে, তখন আমরা ঘটনাটিকে “পৈশাচিক” বলি। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তার আগেই করা উচিত— রক্ত ঝরার আগের সংকেতগুলো আমরা কেন দেখতে পেলাম না?


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত