সংবাদ

‘অমানুষের’ দেশ-সমাজ কীভাবে তৈরি হচ্ছে?


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

‘অমানুষের’ দেশ-সমাজ কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
প্রতীকী ছবি।

অপ্রতিমের মৃত্যু, মায়ের রাজনৈতিক অবস্থান আর সামাজিকমাধ্যমের নিষ্ঠুরতা আমাদের যে ভয়ংকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সে। এরপর নিখোঁজ।

শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশ তদন্ত করছে; প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে সন্দেহভাজন দুজনকে আটকের খবরও এসেছে। তবে হত্যার চূড়ান্ত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়নি।

এ পর্যন্ত ঘটনাটি একটি ভয়াবহ অপরাধের তদন্ত।কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিকমাধ্যমে আরেকটি ঘটনা ঘটছে—যা হয়তো হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বড় কোনো সামাজিক অসুখের দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করছে।নাহিদা বেগম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন—এমন পুরোনো বক্তব্য বা সামাজিকমাধ্যমের অবস্থানকে সামনে এনে তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সন্তানের মৃত্যুকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একটি শিশুর মৃত্যুকে কেউ কেউ ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মূলত, একজন মানুষ কোন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, তা নিয়ে আপনি তার সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারেন। তার বক্তব্যের সমালোচনা করতেই পারেন। এমনকি তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু তার ১৩ বছরের সন্তান কী অপরাধ করেছে?

‘অমানুষ’ তৈরি শুরু

অমানুষ জন্মগতভাবে অমানুষ হয়ে জন্মায় না। মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে অক্ষম হয়ে উঠতে পারে।রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিহিউম্যানাইজেশন—অন্য পক্ষকে তার পূর্ণ মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা।

কখন সহিংস হয়ে ওঠে মানুষ?

প্রথমে সে ‘অন্য মতের মানুষ’।তারপর ‘ওদের লোক’।তারপর ‘শত্রু’।শেষ পর্যন্ত তার ওপর যা ঘটে, সেটিও আর মানুষের কষ্ট বলে মনে হয় না।এই রূপান্তরটি খুব বিপজ্জনক।কারণ একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় যদি তার মানবিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলে, তখন তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় নিয়েও মানুষের নৈতিক প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে।‘সে কী করেছে?’—এই প্রশ্নের জায়গা নেয় ‘সে কোন পক্ষের?’এটাই রাজনৈতিক ঘৃণার সবচেয়ে ভয়ংকর সাফল্য।

নিষ্ঠুরতাটি আরও ভয়াবহ

ধরুন, শিক্ষক, লেখক নাহিদা বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান আপনার অপছন্দ।আপনি মনে করেন তিনি ভুল বলেছেন। আপনি মনে করেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে তার অবস্থান রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট।আপনি তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করতে পারেন।কিন্তু তার ১৩ বছরের সন্তান তো সেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়নি।সে তো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়।সে তো কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সে শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল।তার হাতে ছিল মায়ের আইফোন।তার পৃথিবী ছিল স্কুল, বন্ধু, পরিবার, ভবিষ্যৎ।একজন মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একটি শিশুর মৃত্যুকে জুড়ে দেওয়া তাই শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নয়; এটি মানবিক পরিচয়ের সম্পূর্ণ বিলোপের লক্ষণ।

রাজনীতি যখন ‘পক্ষ’ বানিয়ে ফেলে

গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রাজনীতি বলে—আমাদের মত আলাদা।অসুস্থ রাজনীতি বলে—তুমি আমার শত্রু। আর ঘৃণার রাজনীতি বলে—তুমি শত্রু  হলে তোমার কষ্টও আমার কাছে মূল্যহীন।এখানে রাজনীতি আর নীতির প্রতিযোগিতা থাকে না। থাকে নৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি।

‘ওরা আমাদের সঙ্গে যা করেছে, তার জবাব দিতে হবে।’‘ ওরা খারাপ ছিল, তাই ওদের জন্য মায়া দেখানোর দরকার নেই।’‘ওরা আমাদের শত্রু।’এই ভাষা যখন ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে একটি ভয়ংকর নৈতিক শিক্ষা পায়: মানুষের অধিকার সর্বজনীন নয়; মানুষের অধিকার তার পক্ষের ওপর নির্ভরশীল।

এখানেই সভ্যতার সংকট। ঘৃণা প্রথমে ভাষায় আসে, পরে আচরণে। সহিংসতা সবসময় প্রথমে ছুরি, লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে আসে না। অনেক সময় তার প্রথম রূপ হয় ভাষা। গালি। অপমান। বিদ্বেষ। মানবিক পরিচয় অস্বীকার। মৃত্যুতেও আনন্দ প্রকাশ। অন্যের শোককে উপহাস। অন্যের সন্তানকে তার বাবা-মায়ের রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা। তারপর আসে সহিংসতার নৈতিক বৈধতা। ‘ওরা এটা ডিজার্ভ করে।’ এই ‘ডিজার্ভ করে’ কথাটিই ভয়ংকর। কারণ এটি অপরাধকে শুধু ঘটতে দেয় না—অপরাধের আগে একটি নৈতিক অনুমোদন তৈরি করে।

রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র আবেগনির্ভর মেরুকরণ প্রতিপক্ষকে অমানবিক করে দেখা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতি বেশি সহনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ মতপার্থক্য নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখন, যখন প্রতিপক্ষের মানবিক মর্যাদাটিই অস্বীকার করা শুরু হয়।

আজ প্রতিপক্ষ, কাল প্রতিবেশী

এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হবে বিষয়টিকে শুধু পক্ষ-বিপক্ষের সমস্যা হিসেবে দেখা। আজ কোনো দলের সমর্থক প্রতিপক্ষের সন্তানকে নিয়ে নিষ্ঠুর কথা বলছে। কাল অন্য কোনো পক্ষ একই কাজ করতে পারে। আজ আপনি যার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করছেন, কাল আপনারই রাজনৈতিক পরিচয় অন্য কারও কাছে অপরাধের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তখন প্রশ্ন হবে—মানুষ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ নয়? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সেই নীতিটি সবার জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে। এটাই সভ্যতার ন্যূনতম নৈতিকতা।

অপ্রতিমের হত্যাকারী কে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, অপ্রতিমকে কে হত্যা করেছে, কেন করেছে—তার উত্তর তদন্তেই বের করতে হবে। সামাজিকমাধ্যমের কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তদন্তের বিকল্প নয়। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যদি সত্যিই কেউ তার মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শিশুটির মৃত্যুকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি আলাদা একটি অপরাধের ঘটনা নয়; সেটি আমাদের সামাজিক নৈতিকতার আয়না।

একজন শিশুর মৃত্যুর পরও যদি আমরা প্রথমে দেখি—‘তার মা কোন দলের?’ ‘তার মা কার পক্ষে ছিলেন?’ ‘কোন রাজনৈতিক পরিবারের?’ তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের চোখে মানুষের পরিচয় কতটা সংকুচিত হয়ে গেছে। একটি শিশুর পরিচয় হওয়ার কথা ছিল—সে একজন শিশু। অপ্রতিম। একজন ছেলে। একজন বন্ধু। একজন শিক্ষার্থী। একজন মায়ের সন্তান। এর বেশি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় তার প্রয়োজন নেই।

তাহলে কি রাজনৈতিক ঘৃণাই সব নৃশংসতার কারণ?না। এটিও বলা ঠিক হবে না। অপ্রতিমের হত্যার প্রত্যক্ষ কারণ এখনো তদন্তাধীন। মাদক, অপরাধী চক্র, ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ, লোভ, সুযোগ—অসংখ্য কারণ কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। পরিবারে সহিংসতার ক্ষেত্রেও মাদক, মানসিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, ক্ষমতার সম্পর্ক, পারিবারিক অকার্যকারিতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—বহু কারণ কাজ করে।

কিন্তু রাজনৈতিক ঘৃণা অন্য একটি কাজ করতে পারে: এটি সমাজের নৈতিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। মানুষ যখন নিয়মিত শেখে যে ‘ওদের’ প্রতি সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজন নেই, তখন সহিংসতার বিরুদ্ধে সর্বজনীন নৈতিক অবস্থানটিও দুর্বল হয়। এ কারণেই রাজনৈতিক ঘৃণা শুধু নির্বাচনের সমস্যা নয়। এটি শেষ পর্যন্ত সামাজিক চরিত্রের সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের শেষ প্রশ্নটি করে যায়- অপ্রতিমের হত্যার বিচার চাই। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত চাই। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রাখতে হবে— আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি? আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহক? নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই ঠিক করে দেবে—কার কান্নায় আমরা কাঁদব, কার মৃত্যুতে আমরা নীরব থাকব, আর কার মৃত্যুকে আমরা উপহাস করব?

বিভাজনেই সহিংসতার শেড়ক

দ্বিতীয় সমাজটি খুব বিপজ্জনক। কারণ সেখানে হত্যাকারী শুধু অন্ধকার গলিতে তৈরি হয় না। হত্যার আগে তার জন্য একটি নৈতিক পরিবেশও তৈরি হয়। আর সেই পরিবেশ তৈরি হয় আমাদের ভাষায়, আমাদের ঘৃণায়, আমাদের নীরবতায়, আমাদের দলীয় আনুগত্যে এবং সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে—যখন আমরা অন্যের মানবিকতাকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে বন্ধক রেখে দিই।

অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে না। এটি আমাদের কাছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—রাজনীতি কি আমাদের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে, নাকি মানুষকে ‘আমাদের’ আর ‘ওদের’ ভাগ করে ধীরে ধীরে অমানুষ বানিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের প্রত্যেকের দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


‘অমানুষের’ দেশ-সমাজ কীভাবে তৈরি হচ্ছে?

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অপ্রতিমের মৃত্যু, মায়ের রাজনৈতিক অবস্থান আর সামাজিকমাধ্যমের নিষ্ঠুরতা আমাদের যে ভয়ংকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সে। এরপর নিখোঁজ।

শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশ তদন্ত করছে; প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে সন্দেহভাজন দুজনকে আটকের খবরও এসেছে। তবে হত্যার চূড়ান্ত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়নি।

এ পর্যন্ত ঘটনাটি একটি ভয়াবহ অপরাধের তদন্ত।কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিকমাধ্যমে আরেকটি ঘটনা ঘটছে—যা হয়তো হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বড় কোনো সামাজিক অসুখের দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করছে।নাহিদা বেগম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন—এমন পুরোনো বক্তব্য বা সামাজিকমাধ্যমের অবস্থানকে সামনে এনে তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সন্তানের মৃত্যুকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একটি শিশুর মৃত্যুকে কেউ কেউ ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মূলত, একজন মানুষ কোন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, তা নিয়ে আপনি তার সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারেন। তার বক্তব্যের সমালোচনা করতেই পারেন। এমনকি তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু তার ১৩ বছরের সন্তান কী অপরাধ করেছে?

‘অমানুষ’ তৈরি শুরু

অমানুষ জন্মগতভাবে অমানুষ হয়ে জন্মায় না। মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে অক্ষম হয়ে উঠতে পারে।রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিহিউম্যানাইজেশন—অন্য পক্ষকে তার পূর্ণ মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা।

কখন সহিংস হয়ে ওঠে মানুষ?

প্রথমে সে ‘অন্য মতের মানুষ’।তারপর ‘ওদের লোক’।তারপর ‘শত্রু’।শেষ পর্যন্ত তার ওপর যা ঘটে, সেটিও আর মানুষের কষ্ট বলে মনে হয় না।এই রূপান্তরটি খুব বিপজ্জনক।কারণ একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় যদি তার মানবিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলে, তখন তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় নিয়েও মানুষের নৈতিক প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে।‘সে কী করেছে?’—এই প্রশ্নের জায়গা নেয় ‘সে কোন পক্ষের?’এটাই রাজনৈতিক ঘৃণার সবচেয়ে ভয়ংকর সাফল্য।

নিষ্ঠুরতাটি আরও ভয়াবহ

ধরুন, শিক্ষক, লেখক নাহিদা বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান আপনার অপছন্দ।আপনি মনে করেন তিনি ভুল বলেছেন। আপনি মনে করেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে তার অবস্থান রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট।আপনি তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করতে পারেন।কিন্তু তার ১৩ বছরের সন্তান তো সেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়নি।সে তো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়।সে তো কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সে শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল।তার হাতে ছিল মায়ের আইফোন।তার পৃথিবী ছিল স্কুল, বন্ধু, পরিবার, ভবিষ্যৎ।একজন মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একটি শিশুর মৃত্যুকে জুড়ে দেওয়া তাই শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নয়; এটি মানবিক পরিচয়ের সম্পূর্ণ বিলোপের লক্ষণ।

রাজনীতি যখন ‘পক্ষ’ বানিয়ে ফেলে

গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রাজনীতি বলে—আমাদের মত আলাদা।অসুস্থ রাজনীতি বলে—তুমি আমার শত্রু। আর ঘৃণার রাজনীতি বলে—তুমি শত্রু  হলে তোমার কষ্টও আমার কাছে মূল্যহীন।এখানে রাজনীতি আর নীতির প্রতিযোগিতা থাকে না। থাকে নৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি।

‘ওরা আমাদের সঙ্গে যা করেছে, তার জবাব দিতে হবে।’‘ ওরা খারাপ ছিল, তাই ওদের জন্য মায়া দেখানোর দরকার নেই।’‘ওরা আমাদের শত্রু।’এই ভাষা যখন ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে একটি ভয়ংকর নৈতিক শিক্ষা পায়: মানুষের অধিকার সর্বজনীন নয়; মানুষের অধিকার তার পক্ষের ওপর নির্ভরশীল।

এখানেই সভ্যতার সংকট। ঘৃণা প্রথমে ভাষায় আসে, পরে আচরণে। সহিংসতা সবসময় প্রথমে ছুরি, লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে আসে না। অনেক সময় তার প্রথম রূপ হয় ভাষা। গালি। অপমান। বিদ্বেষ। মানবিক পরিচয় অস্বীকার। মৃত্যুতেও আনন্দ প্রকাশ। অন্যের শোককে উপহাস। অন্যের সন্তানকে তার বাবা-মায়ের রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা। তারপর আসে সহিংসতার নৈতিক বৈধতা। ‘ওরা এটা ডিজার্ভ করে।’ এই ‘ডিজার্ভ করে’ কথাটিই ভয়ংকর। কারণ এটি অপরাধকে শুধু ঘটতে দেয় না—অপরাধের আগে একটি নৈতিক অনুমোদন তৈরি করে।

রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র আবেগনির্ভর মেরুকরণ প্রতিপক্ষকে অমানবিক করে দেখা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতি বেশি সহনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ মতপার্থক্য নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখন, যখন প্রতিপক্ষের মানবিক মর্যাদাটিই অস্বীকার করা শুরু হয়।

আজ প্রতিপক্ষ, কাল প্রতিবেশী

এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হবে বিষয়টিকে শুধু পক্ষ-বিপক্ষের সমস্যা হিসেবে দেখা। আজ কোনো দলের সমর্থক প্রতিপক্ষের সন্তানকে নিয়ে নিষ্ঠুর কথা বলছে। কাল অন্য কোনো পক্ষ একই কাজ করতে পারে। আজ আপনি যার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করছেন, কাল আপনারই রাজনৈতিক পরিচয় অন্য কারও কাছে অপরাধের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তখন প্রশ্ন হবে—মানুষ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ নয়? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সেই নীতিটি সবার জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে। এটাই সভ্যতার ন্যূনতম নৈতিকতা।

অপ্রতিমের হত্যাকারী কে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, অপ্রতিমকে কে হত্যা করেছে, কেন করেছে—তার উত্তর তদন্তেই বের করতে হবে। সামাজিকমাধ্যমের কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তদন্তের বিকল্প নয়। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যদি সত্যিই কেউ তার মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শিশুটির মৃত্যুকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি আলাদা একটি অপরাধের ঘটনা নয়; সেটি আমাদের সামাজিক নৈতিকতার আয়না।

একজন শিশুর মৃত্যুর পরও যদি আমরা প্রথমে দেখি—‘তার মা কোন দলের?’ ‘তার মা কার পক্ষে ছিলেন?’ ‘কোন রাজনৈতিক পরিবারের?’ তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের চোখে মানুষের পরিচয় কতটা সংকুচিত হয়ে গেছে। একটি শিশুর পরিচয় হওয়ার কথা ছিল—সে একজন শিশু। অপ্রতিম। একজন ছেলে। একজন বন্ধু। একজন শিক্ষার্থী। একজন মায়ের সন্তান। এর বেশি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় তার প্রয়োজন নেই।

তাহলে কি রাজনৈতিক ঘৃণাই সব নৃশংসতার কারণ?না। এটিও বলা ঠিক হবে না। অপ্রতিমের হত্যার প্রত্যক্ষ কারণ এখনো তদন্তাধীন। মাদক, অপরাধী চক্র, ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ, লোভ, সুযোগ—অসংখ্য কারণ কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। পরিবারে সহিংসতার ক্ষেত্রেও মাদক, মানসিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, ক্ষমতার সম্পর্ক, পারিবারিক অকার্যকারিতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—বহু কারণ কাজ করে।

কিন্তু রাজনৈতিক ঘৃণা অন্য একটি কাজ করতে পারে: এটি সমাজের নৈতিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। মানুষ যখন নিয়মিত শেখে যে ‘ওদের’ প্রতি সহানুভূতি দেখানোর প্রয়োজন নেই, তখন সহিংসতার বিরুদ্ধে সর্বজনীন নৈতিক অবস্থানটিও দুর্বল হয়। এ কারণেই রাজনৈতিক ঘৃণা শুধু নির্বাচনের সমস্যা নয়। এটি শেষ পর্যন্ত সামাজিক চরিত্রের সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের শেষ প্রশ্নটি করে যায়- অপ্রতিমের হত্যার বিচার চাই। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত চাই। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রাখতে হবে— আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি? আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহক? নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই ঠিক করে দেবে—কার কান্নায় আমরা কাঁদব, কার মৃত্যুতে আমরা নীরব থাকব, আর কার মৃত্যুকে আমরা উপহাস করব?

বিভাজনেই সহিংসতার শেড়ক

দ্বিতীয় সমাজটি খুব বিপজ্জনক। কারণ সেখানে হত্যাকারী শুধু অন্ধকার গলিতে তৈরি হয় না। হত্যার আগে তার জন্য একটি নৈতিক পরিবেশও তৈরি হয়। আর সেই পরিবেশ তৈরি হয় আমাদের ভাষায়, আমাদের ঘৃণায়, আমাদের নীরবতায়, আমাদের দলীয় আনুগত্যে এবং সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে—যখন আমরা অন্যের মানবিকতাকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে বন্ধক রেখে দিই।

অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে না। এটি আমাদের কাছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—রাজনীতি কি আমাদের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে, নাকি মানুষকে ‘আমাদের’ আর ‘ওদের’ ভাগ করে ধীরে ধীরে অমানুষ বানিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের প্রত্যেকের দিতে হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত