সাদা বকের সারির মতো যেন পালক ফুলিয়ে হাওয়ায় দুলছে কাশফুল। এ যেন বিশাল এলাকা জুড়ে সাদার মেলা বসিয়েছে কাশফুল। শরৎকাল এলেই নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় কাশফুলের সৌন্দর্যের টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় জমে।
বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে তৃতীয় ঋতু হচ্ছে শরৎকাল। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে হয় শরৎ। শরৎকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘অটাম’। আমাদের দেশে প্রাণের সজীবতা, রং, রূপ, রস ও স্নিগ্ধতা নিয়ে আসে শরৎ। শরৎ আমাদের মাঝে বিভিন্ন উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। প্রকৃতিতে শরৎ মানেই নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদা হাসি। শরৎ মানেই মেঘের খেলা আর কাশফুলের দোলা। প্রাকৃতিক শুভ্রতায় সৌন্দর্যকে আরেকটু বাড়তি আমেজে জানান দিচ্ছে শরতের কাশফুল। নদীনালা, খালবিলের তীরে কাশফুল; বাদ নেই খোলা জায়গাও। সর্বত্র কাশফুলের সমারোহই জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে এখন ভরা শরৎ। স্বচ্ছ নীল আকাশে সাদা মেঘের সৌন্দর্যসুধা নিতে কাশবনে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। বিকেল হলেই তরুণ-তরুণীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
নরসিংদী শহরের নাগরিয়াকান্দি সেতু সংলগ্ন এলাকা সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনন্য দৃষ্টিনন্দন শরতের বাতাসে দুলছে কাশফুল। মুগ্ধতার এই স্বাদ মনে করিয়ে দিচ্ছে শরৎকালকে এবং পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের আভাস। বালুচরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা উঁচু করে সটান দাঁড়িয়ে দোল খাচ্ছে কাশফুল। কাশবনে কাশফুল ফুটে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে প্রাণ ও প্রকৃতিতে।
শরতের আরেকটি দিক হলো, এ সময় মাঠ জুড়ে থাকে সবুজ ধানের সমারোহ। ধানের কচি পাতায় জমা হওয়া শিশিরের ওপর প্রভাতের অরুণ আলো মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়ায়। আমাদের দেশের কৃষকেরা নবান্নের আশায় দিন গোনে। আর বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসবের কথা সবাই জানি। শরৎকাল শারদীয় আরাধনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেমন উৎসবমুখর করে তোলে, তেমনই বিজয়ার বেদনায়ও করে তোলে ব্যথিত। শরৎ বাংলার প্রকৃতিতে আসে শুভেচ্ছাস্মারক হিসেবে, নানামাত্রিক আনন্দের বার্তা নিয়ে। ভোরবেলা শিউলিতলায় হালকা শিশিরে ভেজা দুর্বাঘাসের ওপর চাদরের মতো বিছানো থাকে ঘ্রাণমেশানো শিউলি ফুল। তাই তো শরৎ মানেই শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ানো দিন।
এ ছাড়াও শরতের ফুল হচ্ছে হিমঝুরি, গগনশিরীষ, ছাতিম, পাখিফুল, পান্থপাদপ, বকফুল, মিনজিরি, শেফালি, কলিয়েন্ড্রা, শাপলা, শালুক, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, জবা, কামিনী, মালতী, মল্লিকা, মাধবী, বরই ফুল, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, ঝিঙে, জয়ন্তী, শ্বেতকাঞ্চন, রাধাচূড়া, স্থলপদ্ম, বাগানবিলাস (বোগেনভেলিয়া) ও কাশফুল ইত্যাদি। শরতের ফল হচ্ছে আমলকী, জলপাই, তাল, যজ্ঞডুমুর, করমচা ও চালতা ইত্যাদি।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ঘুরতে ঘুরতে দেখা মিলে কাশফুলের। বালুচরে অপরূপ সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় সাদা কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য দেখতে কতই না মনমুগ্ধকর! এক মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এমন দৃষ্টিনন্দন নয়নাভিরাম সৌন্দর্য এবং কাশফুলগুলো হেলেদুলে নিজ মহিমায় খেলছে চারিদিকে–এমন দৃশ্য সত্যি রোমাঞ্চকর মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি।
নাগরিয়াকান্দি সেতুতে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর। কথা হয় নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্র সিয়াম হাসানের সাথে। তিনি বলেন, 'ঋতুর পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতি জানান দিচ্ছে এখন শরৎকাল। রাশি রাশি কাশফুল ছড়াচ্ছে শ্বেত-শুভ্র নৈসর্গিকতা নিয়ে, যা মুগ্ধ করছে প্রকৃতিপ্রেমীদের।'
নাগরিয়াকান্দি সংলগ্ন বালুচরে কাশফুল দেখতে আসা নাঈম হাসান আযান বলেন, 'শরৎকাল তার উপস্থিতির কথা জানিয়ে দিচ্ছে নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনার মাধ্যমে। এদিকে কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ডানা মেলে ছড়াচ্ছে, আর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এখানে আসা।'
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে দগরিয়ার আবদুল কাদির মোল্লা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল সংলগ্ন বালুচরের কাশবনে কাশফুল দেখতে এসেছেন কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী। তাদের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, 'শরৎ ঋতুর কথা মনে আসলেই আমাদের চোখের কোণে ভেসে ওঠে ফুটন্ত সাদা কাশফুল। তাই স্বচক্ষে দেখতেই আসা।' শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি দোয়েল, কোয়েল, ময়না ও টিয়ার মধুর ধ্বনিতে মুখরিত হয়।
নাগরিয়াকান্দিতে কাশফুল দেখতে আসা আহাদ বলেন, 'দিগন্তজোড়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য মানবমনকে করে তোলে আন্দোলিত ও প্রফুল্ল। অপরূপ সাদা কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য রোমাঞ্চিত করে তোলে। এমন নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকসহ প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে।'
রিপন আহাম্মেদ এসেছেন পরিবার নিয়ে ওয়ান্ডার পার্কে। পরিবারের সদস্যদের পার্কে দিয়ে তিনি নদীর তীরে কাশফুল দেখছেন। তিনি বলেন, 'কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণাগুণ। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা ও গ্রামের উঁচু স্থানে কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই কাশফুল বেশি নজরে আসে। প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে এই কাশফুলের বালুচর।'
শিবপুর উপজেলার কামরাব থেকে সৈয়দনগর বিসিক-২ এ ঘুরতে আসা আতাবুর রহমান বলেন, 'এবছর এখানে এসে হতাশ হলাম। এখানে যখন বালু দিয়ে ভরাট করেছিল, তারপর থেকে ৫-৬ বছর এখানে কাশফুল ফুটত। বর্তমানে এটার ভেতরে পুরোদমে বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরির কাজ চলমান, তাই এখানে আগের মতো আর কাশফুল নেই।'
তিনি আরো বলেন, 'শরতের কাশবন নদীর দুই ধারে বা জমির আইলে শরৎকালের সেই চিরচেনা দৃশ্যে আর দেখা যায় না। কালের আবর্তে নরসিংদী থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে কাশবন। এখন এই অঞ্চলের গ্রামগঞ্জে বিচ্ছিন্নভাবে থাকা যে কয়টি কাশবন চোখে পড়ে, সেগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে মৌসুমি ফসলের বাগান ও সবজি খেত। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ঘরবাড়ি, কলকারখানা ও শহরগুলো এভাবেই শরতের সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে বিদায় দিচ্ছে।'
প্রতিদিন প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত নাগরিয়াকান্দি সেতু সংলগ্ন কাশফুলের বালুচর। আর প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটছেন অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে আসছেন; কেউবা আনন্দে হারিয়ে যাচ্ছেন কাশবনে, কেউ তুলছেন ছবি, আবার কেউ হাত বুলিয়ে নিচ্ছেন কাশফুলে। শরৎকালের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে কাশফুল। আর তাই তো কাশবনে ছুটে বেড়ান দর্শনার্থীরা, সৌন্দর্য উপভোগে মেতে ওঠেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
সাহিত্যের অনেকাংশ জুড়ে আছে শরৎকাল, যার সবটুকুই উৎসব আর আনন্দের। তবে শরতের সৌন্দর্যের উৎসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে নগরায়ণে। এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কাশবন শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে তৃপ্তি আনে তা নয়, এটি পরিবেশের জন্যও উপকারী। নদীর পাড়ে যে কাশবন থাকে, তা অনেক সময় নদীভাঙন থেকেও রক্ষা করে। সেই সঙ্গে কাশফুল শুকিয়ে গেলে জ্বালানি হিসেবেও অনেকেই ব্যবহার করেন।
কাশফুল বন্দনা শেষ করতে চাই কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার পংক্তি দিয়ে। তিনি লিখেছিলেন:
“শরৎ রানী যেন কাশের বোরখা খানি খুলে,
কাশ বনের ওই আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে।'
প্রথম কবে ফুটেছে কাশ সেই শুঁধুরা জানে,
তাইতো সেটা সবার আগে খোঁপায় বেঁধে আনে।'
ইচ্ছে করে ডেকে বলি, "ওগো কাশের মেয়ে―
আজকে আমার চোখ জুড়ালো তোমার দেখা পেয়ে,
তোমার হাতে বন্দী আমার ভালোবাসার কাশ
তাইতো আমি এই শরতে তোমার দাশ।”

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাদা বকের সারির মতো যেন পালক ফুলিয়ে হাওয়ায় দুলছে কাশফুল। এ যেন বিশাল এলাকা জুড়ে সাদার মেলা বসিয়েছে কাশফুল। শরৎকাল এলেই নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় কাশফুলের সৌন্দর্যের টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় জমে।
বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে তৃতীয় ঋতু হচ্ছে শরৎকাল। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে হয় শরৎ। শরৎকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘অটাম’। আমাদের দেশে প্রাণের সজীবতা, রং, রূপ, রস ও স্নিগ্ধতা নিয়ে আসে শরৎ। শরৎ আমাদের মাঝে বিভিন্ন উৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। প্রকৃতিতে শরৎ মানেই নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদা হাসি। শরৎ মানেই মেঘের খেলা আর কাশফুলের দোলা। প্রাকৃতিক শুভ্রতায় সৌন্দর্যকে আরেকটু বাড়তি আমেজে জানান দিচ্ছে শরতের কাশফুল। নদীনালা, খালবিলের তীরে কাশফুল; বাদ নেই খোলা জায়গাও। সর্বত্র কাশফুলের সমারোহই জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে এখন ভরা শরৎ। স্বচ্ছ নীল আকাশে সাদা মেঘের সৌন্দর্যসুধা নিতে কাশবনে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। বিকেল হলেই তরুণ-তরুণীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
নরসিংদী শহরের নাগরিয়াকান্দি সেতু সংলগ্ন এলাকা সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনন্য দৃষ্টিনন্দন শরতের বাতাসে দুলছে কাশফুল। মুগ্ধতার এই স্বাদ মনে করিয়ে দিচ্ছে শরৎকালকে এবং পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের আভাস। বালুচরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা উঁচু করে সটান দাঁড়িয়ে দোল খাচ্ছে কাশফুল। কাশবনে কাশফুল ফুটে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে প্রাণ ও প্রকৃতিতে।
শরতের আরেকটি দিক হলো, এ সময় মাঠ জুড়ে থাকে সবুজ ধানের সমারোহ। ধানের কচি পাতায় জমা হওয়া শিশিরের ওপর প্রভাতের অরুণ আলো মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়ায়। আমাদের দেশের কৃষকেরা নবান্নের আশায় দিন গোনে। আর বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসবের কথা সবাই জানি। শরৎকাল শারদীয় আরাধনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেমন উৎসবমুখর করে তোলে, তেমনই বিজয়ার বেদনায়ও করে তোলে ব্যথিত। শরৎ বাংলার প্রকৃতিতে আসে শুভেচ্ছাস্মারক হিসেবে, নানামাত্রিক আনন্দের বার্তা নিয়ে। ভোরবেলা শিউলিতলায় হালকা শিশিরে ভেজা দুর্বাঘাসের ওপর চাদরের মতো বিছানো থাকে ঘ্রাণমেশানো শিউলি ফুল। তাই তো শরৎ মানেই শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ানো দিন।
এ ছাড়াও শরতের ফুল হচ্ছে হিমঝুরি, গগনশিরীষ, ছাতিম, পাখিফুল, পান্থপাদপ, বকফুল, মিনজিরি, শেফালি, কলিয়েন্ড্রা, শাপলা, শালুক, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, জবা, কামিনী, মালতী, মল্লিকা, মাধবী, বরই ফুল, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, ঝিঙে, জয়ন্তী, শ্বেতকাঞ্চন, রাধাচূড়া, স্থলপদ্ম, বাগানবিলাস (বোগেনভেলিয়া) ও কাশফুল ইত্যাদি। শরতের ফল হচ্ছে আমলকী, জলপাই, তাল, যজ্ঞডুমুর, করমচা ও চালতা ইত্যাদি।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ঘুরতে ঘুরতে দেখা মিলে কাশফুলের। বালুচরে অপরূপ সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় সাদা কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য দেখতে কতই না মনমুগ্ধকর! এক মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এমন দৃষ্টিনন্দন নয়নাভিরাম সৌন্দর্য এবং কাশফুলগুলো হেলেদুলে নিজ মহিমায় খেলছে চারিদিকে–এমন দৃশ্য সত্যি রোমাঞ্চকর মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি।
নাগরিয়াকান্দি সেতুতে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর। কথা হয় নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্র সিয়াম হাসানের সাথে। তিনি বলেন, 'ঋতুর পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতি জানান দিচ্ছে এখন শরৎকাল। রাশি রাশি কাশফুল ছড়াচ্ছে শ্বেত-শুভ্র নৈসর্গিকতা নিয়ে, যা মুগ্ধ করছে প্রকৃতিপ্রেমীদের।'
নাগরিয়াকান্দি সংলগ্ন বালুচরে কাশফুল দেখতে আসা নাঈম হাসান আযান বলেন, 'শরৎকাল তার উপস্থিতির কথা জানিয়ে দিচ্ছে নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনার মাধ্যমে। এদিকে কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ডানা মেলে ছড়াচ্ছে, আর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এখানে আসা।'
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে দগরিয়ার আবদুল কাদির মোল্লা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল সংলগ্ন বালুচরের কাশবনে কাশফুল দেখতে এসেছেন কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী। তাদের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, 'শরৎ ঋতুর কথা মনে আসলেই আমাদের চোখের কোণে ভেসে ওঠে ফুটন্ত সাদা কাশফুল। তাই স্বচক্ষে দেখতেই আসা।' শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি দোয়েল, কোয়েল, ময়না ও টিয়ার মধুর ধ্বনিতে মুখরিত হয়।
নাগরিয়াকান্দিতে কাশফুল দেখতে আসা আহাদ বলেন, 'দিগন্তজোড়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য মানবমনকে করে তোলে আন্দোলিত ও প্রফুল্ল। অপরূপ সাদা কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য রোমাঞ্চিত করে তোলে। এমন নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকসহ প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে।'
রিপন আহাম্মেদ এসেছেন পরিবার নিয়ে ওয়ান্ডার পার্কে। পরিবারের সদস্যদের পার্কে দিয়ে তিনি নদীর তীরে কাশফুল দেখছেন। তিনি বলেন, 'কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণাগুণ। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা ও গ্রামের উঁচু স্থানে কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই কাশফুল বেশি নজরে আসে। প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে এই কাশফুলের বালুচর।'
শিবপুর উপজেলার কামরাব থেকে সৈয়দনগর বিসিক-২ এ ঘুরতে আসা আতাবুর রহমান বলেন, 'এবছর এখানে এসে হতাশ হলাম। এখানে যখন বালু দিয়ে ভরাট করেছিল, তারপর থেকে ৫-৬ বছর এখানে কাশফুল ফুটত। বর্তমানে এটার ভেতরে পুরোদমে বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরির কাজ চলমান, তাই এখানে আগের মতো আর কাশফুল নেই।'
তিনি আরো বলেন, 'শরতের কাশবন নদীর দুই ধারে বা জমির আইলে শরৎকালের সেই চিরচেনা দৃশ্যে আর দেখা যায় না। কালের আবর্তে নরসিংদী থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে কাশবন। এখন এই অঞ্চলের গ্রামগঞ্জে বিচ্ছিন্নভাবে থাকা যে কয়টি কাশবন চোখে পড়ে, সেগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে মৌসুমি ফসলের বাগান ও সবজি খেত। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ঘরবাড়ি, কলকারখানা ও শহরগুলো এভাবেই শরতের সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে বিদায় দিচ্ছে।'
প্রতিদিন প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত নাগরিয়াকান্দি সেতু সংলগ্ন কাশফুলের বালুচর। আর প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটছেন অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে আসছেন; কেউবা আনন্দে হারিয়ে যাচ্ছেন কাশবনে, কেউ তুলছেন ছবি, আবার কেউ হাত বুলিয়ে নিচ্ছেন কাশফুলে। শরৎকালের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে কাশফুল। আর তাই তো কাশবনে ছুটে বেড়ান দর্শনার্থীরা, সৌন্দর্য উপভোগে মেতে ওঠেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
সাহিত্যের অনেকাংশ জুড়ে আছে শরৎকাল, যার সবটুকুই উৎসব আর আনন্দের। তবে শরতের সৌন্দর্যের উৎসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে নগরায়ণে। এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কাশবন শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে তৃপ্তি আনে তা নয়, এটি পরিবেশের জন্যও উপকারী। নদীর পাড়ে যে কাশবন থাকে, তা অনেক সময় নদীভাঙন থেকেও রক্ষা করে। সেই সঙ্গে কাশফুল শুকিয়ে গেলে জ্বালানি হিসেবেও অনেকেই ব্যবহার করেন।
কাশফুল বন্দনা শেষ করতে চাই কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার পংক্তি দিয়ে। তিনি লিখেছিলেন:
“শরৎ রানী যেন কাশের বোরখা খানি খুলে,
কাশ বনের ওই আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে।'
প্রথম কবে ফুটেছে কাশ সেই শুঁধুরা জানে,
তাইতো সেটা সবার আগে খোঁপায় বেঁধে আনে।'
ইচ্ছে করে ডেকে বলি, "ওগো কাশের মেয়ে―
আজকে আমার চোখ জুড়ালো তোমার দেখা পেয়ে,
তোমার হাতে বন্দী আমার ভালোবাসার কাশ
তাইতো আমি এই শরতে তোমার দাশ।”

আপনার মতামত লিখুন