সংবাদ

বাড়ি তোলার নামে লাল মাটির বাণিজ্য


প্রতিনিধি, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
প্রতিনিধি, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

বাড়ি তোলার নামে লাল মাটির বাণিজ্য
ছবি : সংবাদ

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর পরগনায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আবারও শুরু হয়েছে পাহাড় ও টিলা কাটার তাণ্ডব। গভীর রাতে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে পাহাড় কেটে লাল মাটি ডাম্প ট্রাকে করে বিক্রি করা হচ্ছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এতে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ এবং চরম ঝুঁকিতে পড়ছে পাহাড়ি গ্রামীণ সড়ক। অন্যদিকে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা শত শত পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের আতঙ্ক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিনারপুর পরগনার আইনগাঁও এলাকার রুনু বেগম নামের এক নারী পাহাড়ি টিলায় বসতবাড়ি নির্মাণের কথা বলে আবেদন করলে ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেন। তবে শর্ত ছিল, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী মাটির শ্রেণি পরিবর্তন না করে কেবল ঘর তোলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই মাটি কাটা যাবে।

অভিযোগ উঠেছে, গৃহনির্মাণের সেই সরকারি অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটি চক্র বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির সুযোগে গভীর রাতে ভারী এক্সকাভেটর বসিয়ে টিলা কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। দিন-রাত ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে ভেঙে পড়ছে পাহাড়ি অঞ্চলের কাঁচা-পাকা গ্রামীণ সড়কগুলো। ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানালে সেখান থেকে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

দেবপাড়া, গজনাইপুর ও পানিউমদা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঐতিহ্যবাহী দিনারপুর পরগনা দীর্ঘ দিন ধরেই অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত পাহাড় কাটা বন্ধে স্থিতাবস্থা জারি করেন। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, আদালতের সেই ঐতিহাসিক আদেশের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো তোয়াক্কাই করছে না প্রভাবশালীরা।

আইনগাঁওয়ের বাসিন্দা আবদুল্লাহ্ অভিযোগ করেন, 'রুনু বেগমের বাড়ির কথা বলে টিলা কাটা হলেও মূল কলকাঠি নাড়ছে একটি শক্তিশালী চক্র। প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে লাল মাটি পাশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামের রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গেছে, আর আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।'

একই এলাকার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুছ জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষায় আশপাশের ঘরবাড়ি ধসে পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দিনের পর দিন থেমে থেমে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চললেও কেউ স্থায়ী সমাধান করছে না।

গজনাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের কায়েদের দাবি, 'রাতের আঁধারে এই পরিবেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযুক্তদের অনেকের নামেই আদালতে মামলা রয়েছে। এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে।'

অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে রুনু বেগম বলেন, 'পাহাড়টি আমার নিজ মালিকানাধীন। আমি তো শুধু বাড়ি বানানোর অনুমতি পেয়েছি। আমার দেবরেরা সেই মাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করছে। তবে বাড়ি তৈরির অনুমতি নিয়ে মাটি বিক্রি করা যাবে না–এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না।'

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাফা) হবিগঞ্জ শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, 'দীর্ঘ দিন ধরে এভাবে পাহাড়-টিলা কাটার ফলে এই অঞ্চলের প্রতিবেশ ও প্রকৃতি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুধু চিঠি বা নিষেধ নয়, পাহাড় রক্ষায় দায়ীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।'

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় জানান, রাতে পাহাড় কাটার খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। রুনু বেগম অনুমতির অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, 'আইন মেনে মাটির শ্রেণি পরিবর্তন না করে সীমিত পরিসরে বসতবাড়ির জন্য অনুমতির চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কোনো পাহাড় কাটার জন্য নয়। ইতিমধ্যে সেই অনুমতিপত্র স্থগিত করা হয়েছে এবং সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


বাড়ি তোলার নামে লাল মাটির বাণিজ্য

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর পরগনায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আবারও শুরু হয়েছে পাহাড় ও টিলা কাটার তাণ্ডব। গভীর রাতে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে পাহাড় কেটে লাল মাটি ডাম্প ট্রাকে করে বিক্রি করা হচ্ছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এতে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ এবং চরম ঝুঁকিতে পড়ছে পাহাড়ি গ্রামীণ সড়ক। অন্যদিকে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা শত শত পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের আতঙ্ক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিনারপুর পরগনার আইনগাঁও এলাকার রুনু বেগম নামের এক নারী পাহাড়ি টিলায় বসতবাড়ি নির্মাণের কথা বলে আবেদন করলে ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেন। তবে শর্ত ছিল, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী মাটির শ্রেণি পরিবর্তন না করে কেবল ঘর তোলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই মাটি কাটা যাবে।

অভিযোগ উঠেছে, গৃহনির্মাণের সেই সরকারি অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটি চক্র বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির সুযোগে গভীর রাতে ভারী এক্সকাভেটর বসিয়ে টিলা কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। দিন-রাত ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে ভেঙে পড়ছে পাহাড়ি অঞ্চলের কাঁচা-পাকা গ্রামীণ সড়কগুলো। ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানালে সেখান থেকে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

দেবপাড়া, গজনাইপুর ও পানিউমদা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঐতিহ্যবাহী দিনারপুর পরগনা দীর্ঘ দিন ধরেই অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত পাহাড় কাটা বন্ধে স্থিতাবস্থা জারি করেন। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, আদালতের সেই ঐতিহাসিক আদেশের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো তোয়াক্কাই করছে না প্রভাবশালীরা।

আইনগাঁওয়ের বাসিন্দা আবদুল্লাহ্ অভিযোগ করেন, 'রুনু বেগমের বাড়ির কথা বলে টিলা কাটা হলেও মূল কলকাঠি নাড়ছে একটি শক্তিশালী চক্র। প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে লাল মাটি পাশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামের রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গেছে, আর আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।'

একই এলাকার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুছ জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষায় আশপাশের ঘরবাড়ি ধসে পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দিনের পর দিন থেমে থেমে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চললেও কেউ স্থায়ী সমাধান করছে না।

গজনাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের কায়েদের দাবি, 'রাতের আঁধারে এই পরিবেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযুক্তদের অনেকের নামেই আদালতে মামলা রয়েছে। এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে।'

অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে রুনু বেগম বলেন, 'পাহাড়টি আমার নিজ মালিকানাধীন। আমি তো শুধু বাড়ি বানানোর অনুমতি পেয়েছি। আমার দেবরেরা সেই মাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করছে। তবে বাড়ি তৈরির অনুমতি নিয়ে মাটি বিক্রি করা যাবে না–এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না।'

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাফা) হবিগঞ্জ শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, 'দীর্ঘ দিন ধরে এভাবে পাহাড়-টিলা কাটার ফলে এই অঞ্চলের প্রতিবেশ ও প্রকৃতি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুধু চিঠি বা নিষেধ নয়, পাহাড় রক্ষায় দায়ীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।'

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় জানান, রাতে পাহাড় কাটার খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। রুনু বেগম অনুমতির অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, 'আইন মেনে মাটির শ্রেণি পরিবর্তন না করে সীমিত পরিসরে বসতবাড়ির জন্য অনুমতির চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কোনো পাহাড় কাটার জন্য নয়। ইতিমধ্যে সেই অনুমতিপত্র স্থগিত করা হয়েছে এবং সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত