রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বালাতে এখন আর শুধু দিয়াশলাই লাগে না, লাগে আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাবও। সৌদি আরবের বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে সেই চাপ আরও বাড়ে। জাহাজভাড়া, বিমা, আমদানি ব্যয় কিংবা আন্তর্জাতিক নৌপথে সংকট তৈরি হলেও তার শেষ ধাক্কাটি এসে লাগে ভোক্তার রান্নাঘরে।
সেই ধাক্কা এবার বেশ বড়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)রোববার (৪ অক্টোবর) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে। নতুন দর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
কিন্তু এলপিজির গল্প শুধু অক্টোবরের ২৫২ টাকা নয়। এর পেছনে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার প্রায় দুই দশকের একটি বড় পরিবর্তনের গল্প। ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবার বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির খুচরা দাম আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করে বিইআরসি। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। আজ সেই একই আকারের সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছর পাঁচ মাসে বেড়েছে ৮৬২ টাকা, বা প্রায় ৮৮ শতাংশ।
২০১৭ সালে ঢাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার প্রায় ৯৫০–১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ২০১৮ সালের অক্টোবরে দেশের কিছু অঞ্চলে একই সিলিন্ডারের দাম ১,০৫০–১,১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ২০১৯ সালেও বাজারদর ছিল কোম্পানি ও এলাকার ওপর নির্ভরশীল; ২০২০ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পর ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,১০০–১,২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—২০২১ সালের আগে বেসরকারি এলপিজির জন্য বিইআরসির নিয়মিত মাসভিত্তিক খুচরা দর ছিল না। ফলে ২০১৭–২০২০ সালের সংখ্যাগুলোকে আজকের বিইআরসি-নির্ধারিত দরের সঙ্গে একেবারে একই ধরনের ‘সরকারি মূল্য’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ২০২১ থেকে শুরু হয় নিয়মিত মূল্য সমন্বয়।
এবারের বড় প্রশ্ন—সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে অক্টোবরেই ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলো কেন? এর বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাজার। বাংলাদেশের বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক। এর সঙ্গে যোগ হয় জাহাজভাড়া, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, বিমা, বন্দর ও অন্যান্য খরচ।
অক্টোবরে সৌদি আরামকো প্রোপেনের দাম প্রতি টনে ৫৫ ডলার বাড়িয়ে ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭০ ডলার বাড়িয়ে ৭৩০ ডলার করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর অর্থ হলো সেপ্টেম্বরের তুলনায় এলপিজির মূল কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের এলপিজি বাজার এমন একটি পণ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার বড় অংশের দাম দেশের ভেতরে বসে নির্ধারণ করা যায় না।
এলপিজি এত জনপ্রিয় কীভাবে?
এখানেই এলপিজির গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপিজি বোতলজাত করে বাজারজাত করা হতো। কিন্তু তখন উৎপাদন সীমিত থাকায় এলপিজি ছিল সীমিত পরিসরের জ্বালানি।
১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতির পর বেসরকারি খাতকে এলপিজি আমদানি, সংরক্ষণ, বোতলজাত ও বিতরণের সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি ও বিতরণ শুরু হয় এবং ১৯৯৯ সালে বসুন্ধরা এলপিজি বাজারে প্রবেশ করে। এরপর ধীরে ধীরে একাধিক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই বাজারে আসে।
কিন্তু এলপিজির প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের সময়। ২০০৮ সালের দিকে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ বা সীমিত হতে শুরু করে। পরে ২০০৯ সালে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করা হয়। যে পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসে রান্না করত, তাদের সামনে তখন বিকল্প ছিল কয়লা, কাঠ, কেরোসিন কিংবা সিলিন্ডারের এলপিজি। শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য এলপিজি ধীরে ধীরে সেই বিকল্পের প্রধান হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালে দেশে এলপিজির ব্যবহার ছিল মাত্র ৪৭ হাজার টন। পরবর্তী বছরগুলোতে তা দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বছরে প্রায় ১৫–১৬ লাখ টন এলপিজি ব্যবহারের কথা শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রতিবেদনে এসেছে। আজ শুধু বাসাবাড়ি নয়—রেস্তোরাঁ, ছোট শিল্প, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং যানবাহনেও এলপিজি ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এলপিজির বাজার আসলে কতটা আমদানিনির্ভর?এই প্রশ্নের উত্তরেই রয়েছে দামের ঝুঁকিটা কেন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১৪.৬৫ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের এলপিজির দাম অনেকটা একটি সরল সমীকরণ। যেটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক দাম সঙ্গে জাহাজভাড়া এর সঙ্গে ডলার, এরপর আমদানি ব্যয়, সঙ্গে কর ও অন্যান্য খরচ। সব মিলে গিয়ে পড়ে বাংলাদেশের এলপিজির দামের ওপর। এর যেকোনো একটি বড় হলে ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে।
বিশেষ করে ডলারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রোববার (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল প্রায় ১২২.৯২ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার বিনিময় হার দুর্বল হলে একই পণ্য কিনতে বাংলাদেশি আমদানিকারকের বেশি টাকা লাগে।
এখন প্রশ্ন, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারই কি দায়ী? উত্তরটা হচ্ছে, পুরোপুরি নয়। এলপিজির বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৫০–৯০০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল।
এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। সরকার তখন কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা তদন্তে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়।
গত ৩ অক্টোবর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকও হয়। আমদানিকারকদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার সংকট, জাহাজের স্বল্পতা ও বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কথা বলেছেন। আবার কয়েকটি সূত্র আমদানি করা পণ্য বাজারে ছাড়ার গতি কমিয়ে কৃত্রিম চাপ তৈরির অভিযোগও তুলেছে। এসব অভিযোগ অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত দাম আর বাস্তব বাজারদর—এই দুইয়ের ব্যবধানও বাংলাদেশের এলপিজি অর্থনীতির বড় সমস্যা।
এবার দাম কোথায় যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ মাসভিত্তিক। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি সিপি, জাহাজভাড়া, ডলার এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয় পরের মাসের দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে সামনে চাপের কিছু কারণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরে সৌদি আরামকোর এলপিজি বেঞ্চমার্ক বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও এলপিজির চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকও জ্বালানি ও অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যয়-ধাক্কাকে মূল্যস্ফীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। তাই আগামী মাসগুলোতে তিনটি পরিস্থিতি হতে পারে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক এলপিজির দাম কমলে এবং পরিবহনব্যয় স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশেও দাম কমতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে ১ হাজার ৮০০ টাকার আশপাশে দাম কিছু সময় স্থির থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাম আরও বাড়ার সঙ্গে জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয় বাড়লে ১২ কেজির সিলিন্ডার আবার ১ হাজার ৯০০ টাকার ওপরে যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এটি কোনো পূর্বাভাস নয়; এটি বর্তমান মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি থেকে তৈরি সম্ভাব্য চিত্র। আগামী মাসের প্রকৃত দাম নির্ভর করবে বিইআরসির হিসাবের ওপর।
এলপিজির দাম বাড়লে শুধু একটি পরিবারের রান্নার খরচ বাড়ে না। রেস্তোরাঁর রান্নার খরচ বাড়ে। চায়ের দোকানের খরচ বাড়ে। ছোট খাবারের ব্যবসার খরচ বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত খাবারের দামেও চলে আসে। অর্থাৎ একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বাজারের আরও অনেক দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণেই এলপিজির দামকে শুধু একটি জ্বালানির দাম হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
বাংলাদেশে একসময় এলপিজি ছিল পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প। গ্যাস-সংকট তাকে করেছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি। আর এখন আমদানিনির্ভর এই জ্বালানি দেশের লাখ লাখ পরিবারের মাসিক ব্যয়ের একটি স্থায়ী অংশ। ১৯৭৮ সালে যে জ্বালানি ছিল সীমিত পরিসরের বিকল্প, প্রায় পাঁচ দশক পর সেটিই বাংলাদেশের রান্নাঘরের অন্যতম প্রধান ভরসা।
আর সেই ভরসার দাম এখন নির্ধারিত হচ্ছে শুধু বাংলাদেশের বাজারে নয়—রিয়াদ, সমুদ্রপথ, ডলারবাজার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামার সঙ্গেও। ৯৭৫ টাকা থেকে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা—এটি শুধু ৮৬২ টাকার ব্যবধান নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বদলে যাওয়ারও একটি অর্থনৈতিক দলিল।

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বালাতে এখন আর শুধু দিয়াশলাই লাগে না, লাগে আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাবও। সৌদি আরবের বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে সেই চাপ আরও বাড়ে। জাহাজভাড়া, বিমা, আমদানি ব্যয় কিংবা আন্তর্জাতিক নৌপথে সংকট তৈরি হলেও তার শেষ ধাক্কাটি এসে লাগে ভোক্তার রান্নাঘরে।
সেই ধাক্কা এবার বেশ বড়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)রোববার (৪ অক্টোবর) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে। নতুন দর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
কিন্তু এলপিজির গল্প শুধু অক্টোবরের ২৫২ টাকা নয়। এর পেছনে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার প্রায় দুই দশকের একটি বড় পরিবর্তনের গল্প। ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবার বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির খুচরা দাম আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করে বিইআরসি। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। আজ সেই একই আকারের সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছর পাঁচ মাসে বেড়েছে ৮৬২ টাকা, বা প্রায় ৮৮ শতাংশ।
২০১৭ সালে ঢাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার প্রায় ৯৫০–১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ২০১৮ সালের অক্টোবরে দেশের কিছু অঞ্চলে একই সিলিন্ডারের দাম ১,০৫০–১,১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ২০১৯ সালেও বাজারদর ছিল কোম্পানি ও এলাকার ওপর নির্ভরশীল; ২০২০ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পর ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,১০০–১,২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—২০২১ সালের আগে বেসরকারি এলপিজির জন্য বিইআরসির নিয়মিত মাসভিত্তিক খুচরা দর ছিল না। ফলে ২০১৭–২০২০ সালের সংখ্যাগুলোকে আজকের বিইআরসি-নির্ধারিত দরের সঙ্গে একেবারে একই ধরনের ‘সরকারি মূল্য’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ২০২১ থেকে শুরু হয় নিয়মিত মূল্য সমন্বয়।
এবারের বড় প্রশ্ন—সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে অক্টোবরেই ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলো কেন? এর বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাজার। বাংলাদেশের বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক। এর সঙ্গে যোগ হয় জাহাজভাড়া, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, বিমা, বন্দর ও অন্যান্য খরচ।
অক্টোবরে সৌদি আরামকো প্রোপেনের দাম প্রতি টনে ৫৫ ডলার বাড়িয়ে ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭০ ডলার বাড়িয়ে ৭৩০ ডলার করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর অর্থ হলো সেপ্টেম্বরের তুলনায় এলপিজির মূল কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের এলপিজি বাজার এমন একটি পণ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার বড় অংশের দাম দেশের ভেতরে বসে নির্ধারণ করা যায় না।
এলপিজি এত জনপ্রিয় কীভাবে?
এখানেই এলপিজির গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপিজি বোতলজাত করে বাজারজাত করা হতো। কিন্তু তখন উৎপাদন সীমিত থাকায় এলপিজি ছিল সীমিত পরিসরের জ্বালানি।
১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতির পর বেসরকারি খাতকে এলপিজি আমদানি, সংরক্ষণ, বোতলজাত ও বিতরণের সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি ও বিতরণ শুরু হয় এবং ১৯৯৯ সালে বসুন্ধরা এলপিজি বাজারে প্রবেশ করে। এরপর ধীরে ধীরে একাধিক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই বাজারে আসে।
কিন্তু এলপিজির প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের সময়। ২০০৮ সালের দিকে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ বা সীমিত হতে শুরু করে। পরে ২০০৯ সালে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করা হয়। যে পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসে রান্না করত, তাদের সামনে তখন বিকল্প ছিল কয়লা, কাঠ, কেরোসিন কিংবা সিলিন্ডারের এলপিজি। শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য এলপিজি ধীরে ধীরে সেই বিকল্পের প্রধান হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালে দেশে এলপিজির ব্যবহার ছিল মাত্র ৪৭ হাজার টন। পরবর্তী বছরগুলোতে তা দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বছরে প্রায় ১৫–১৬ লাখ টন এলপিজি ব্যবহারের কথা শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রতিবেদনে এসেছে। আজ শুধু বাসাবাড়ি নয়—রেস্তোরাঁ, ছোট শিল্প, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং যানবাহনেও এলপিজি ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এলপিজির বাজার আসলে কতটা আমদানিনির্ভর?এই প্রশ্নের উত্তরেই রয়েছে দামের ঝুঁকিটা কেন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১৪.৬৫ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের এলপিজির দাম অনেকটা একটি সরল সমীকরণ। যেটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক দাম সঙ্গে জাহাজভাড়া এর সঙ্গে ডলার, এরপর আমদানি ব্যয়, সঙ্গে কর ও অন্যান্য খরচ। সব মিলে গিয়ে পড়ে বাংলাদেশের এলপিজির দামের ওপর। এর যেকোনো একটি বড় হলে ভোক্তার ওপর চাপ পড়ে।
বিশেষ করে ডলারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রোববার (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল প্রায় ১২২.৯২ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার বিনিময় হার দুর্বল হলে একই পণ্য কিনতে বাংলাদেশি আমদানিকারকের বেশি টাকা লাগে।
এখন প্রশ্ন, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারই কি দায়ী? উত্তরটা হচ্ছে, পুরোপুরি নয়। এলপিজির বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৫০–৯০০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল।
এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। সরকার তখন কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা তদন্তে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়।
গত ৩ অক্টোবর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকও হয়। আমদানিকারকদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার সংকট, জাহাজের স্বল্পতা ও বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কথা বলেছেন। আবার কয়েকটি সূত্র আমদানি করা পণ্য বাজারে ছাড়ার গতি কমিয়ে কৃত্রিম চাপ তৈরির অভিযোগও তুলেছে। এসব অভিযোগ অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত দাম আর বাস্তব বাজারদর—এই দুইয়ের ব্যবধানও বাংলাদেশের এলপিজি অর্থনীতির বড় সমস্যা।
এবার দাম কোথায় যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ মাসভিত্তিক। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি সিপি, জাহাজভাড়া, ডলার এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয় পরের মাসের দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে সামনে চাপের কিছু কারণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরে সৌদি আরামকোর এলপিজি বেঞ্চমার্ক বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও এলপিজির চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকও জ্বালানি ও অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যয়-ধাক্কাকে মূল্যস্ফীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। তাই আগামী মাসগুলোতে তিনটি পরিস্থিতি হতে পারে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক এলপিজির দাম কমলে এবং পরিবহনব্যয় স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশেও দাম কমতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে ১ হাজার ৮০০ টাকার আশপাশে দাম কিছু সময় স্থির থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাম আরও বাড়ার সঙ্গে জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয় বাড়লে ১২ কেজির সিলিন্ডার আবার ১ হাজার ৯০০ টাকার ওপরে যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এটি কোনো পূর্বাভাস নয়; এটি বর্তমান মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি থেকে তৈরি সম্ভাব্য চিত্র। আগামী মাসের প্রকৃত দাম নির্ভর করবে বিইআরসির হিসাবের ওপর।
এলপিজির দাম বাড়লে শুধু একটি পরিবারের রান্নার খরচ বাড়ে না। রেস্তোরাঁর রান্নার খরচ বাড়ে। চায়ের দোকানের খরচ বাড়ে। ছোট খাবারের ব্যবসার খরচ বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত খাবারের দামেও চলে আসে। অর্থাৎ একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বাজারের আরও অনেক দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণেই এলপিজির দামকে শুধু একটি জ্বালানির দাম হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
বাংলাদেশে একসময় এলপিজি ছিল পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প। গ্যাস-সংকট তাকে করেছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি। আর এখন আমদানিনির্ভর এই জ্বালানি দেশের লাখ লাখ পরিবারের মাসিক ব্যয়ের একটি স্থায়ী অংশ। ১৯৭৮ সালে যে জ্বালানি ছিল সীমিত পরিসরের বিকল্প, প্রায় পাঁচ দশক পর সেটিই বাংলাদেশের রান্নাঘরের অন্যতম প্রধান ভরসা।
আর সেই ভরসার দাম এখন নির্ধারিত হচ্ছে শুধু বাংলাদেশের বাজারে নয়—রিয়াদ, সমুদ্রপথ, ডলারবাজার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামার সঙ্গেও। ৯৭৫ টাকা থেকে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা—এটি শুধু ৮৬২ টাকার ব্যবধান নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বদলে যাওয়ারও একটি অর্থনৈতিক দলিল।

আপনার মতামত লিখুন