সংবাদ

ভুয়া রসিদে অর্থ লেনদেন: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই আউটলেট বন্ধ ঘোষণা


আসাদুজ্জামান মিলন,শরণখোলা (বাগেরহাট)
আসাদুজ্জামান মিলন,শরণখোলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

ভুয়া রসিদে অর্থ লেনদেন: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই আউটলেট বন্ধ ঘোষণা
বাগেরহাটের শরণখোলায় তালাবদ্ধ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট। অভিযুক্ত পরিচালক ওমর ফারুক রাজু (ইনসেট)।

ভুয়া জমার রসিদ ও মুঠোফোনে ভুয়া খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে গ্রাহকদের প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনে বেরিয়ে এসেছে, গ্রাহকদের দেওয়া বেশির ভাগ জমার রসিদই ছিল ভুয়া। প্রতারক ব্যাংক এজেন্টের বিরুদ্ধে এখন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার তাফালবাড়ি বাজারে। অভিযুক্ত পরিচালকের নাম ওমর ফারুক রাজু। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি। টাকা আত্মসাতের পর তার লাপাত্তা হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষ থেকে গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শরণখোলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

অভিযুক্ত পরিচালক ওমর ফারুক রাজুর বিরুদ্ধ শরণখোলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ছবি : সংবাদ

গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ ঘোষণা করে সামনে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট উধাও

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বাগেরহাট জেলার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সিনিয়র সেলস ম্যানেজার শেখ ওবায়দুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আউটলেটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে যেসব গ্রাহক অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, তাদের রসিদ তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা করে মাত্র ৩০ লাখ টাকা পরিমাণ জমার সঠিক স্লিপ পাওয়া গেছে। বাকি সবার জমার স্লিপ ফেক (ভুয়া) বলে মনে হয়েছে। ভুয়া স্লিপ তৈরি করে এজেন্ট পরিচালক দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের দিয়েছেন, যা তারা বুঝতে পারেননি।’

টাকা জমার ভুয়া ছিল । ছবি : সংবাদ

তিনি আরও বলেন, ‘যাদের কাছে বৈধ জমার রসিদ আছে, তাদের জেলা শাখায় অভিযোগ করতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে যাদেরটা সঠিক প্রমাণিত হবে, তাদের আমানত ফেরত দেওয়া হবে। গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা ও ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন করার দায়ে পরিচালক ওমর ফারুক রাজুর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালে তাফালবাড়ি বাজারে আউটলেটটি চালু করেন রাজু। এক লাখ টাকা জমা রাখলে মাসে দুই হাজার টাকা মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন তিনি। বেশি লাভের আশায় জীবনের শেষ সম্বলটুকু জমা করেছিলেন অনেক গ্রাহক। টাকা জমার পর সিল মারা ভুয়া রসিদ ও নিজের মুঠোফোন থেকে জমার ভুয়া এসএমএস পাঠাতেন রাজু।

ভুক্তভোগী গ্রাহক। ছবি : সংবাদ

ভুক্তভোগী গ্রাহক আ. খালেক পঞ্চায়েত জানান, তার ৩৫ লাখ টাকা ওই আউটলেটে জমা রয়েছে। মিনারা বেগম জানান, তার জমা ৩৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিউটি আক্তারের ১০ লাখ, খালিদ সরদারের ২০ লাখ, জামাল হোসেনের ৩ লাখ, জলিল গাজীর ৫ লাখ, পান্না ফরাজীর ৫ লাখ ৫০ হাজার, বেল্লাল মিয়ার ৯ লাখ, রাসেল শরীফের ৮ লাখ ২০ হাজার, গিয়াস মিয়ার ৪ লাখ ৫০ হাজার, সজল শেখের ৩ লাখ ৫০ হাজার ও বাবুল হাওলাদারের ১০ লাখ টাকা জমা ছিল। সব মিলিয়ে জমার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা হবে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন। আউটলেট বন্ধ থাকায় নিঃস্ব গ্রাহকেরা প্রতিদিন সেখানে এসে চোখের জল ফেলছেন।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিপুল অঙ্কের এই টাকা হাতিয়ে গোপনে নেপালে পাড়ি জমিয়েছেন রাজু। সেখান থেকে তার ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাফালবাড়ি বাজার কমিটির সভাপতি আ. রাজ্জাক মৃধা বলেন, ‘রাজুর ভালো আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছে। প্রতিদিন গ্রাহকেরা এসে অভিযোগ করছেন। তাদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া ছাড়া আমাদের কীই-বা করার আছে?’

তাফালবাড়ি বাজার। ছবি : সংবাদ

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, লেনদেনের সময় প্রকৃত ব্যাংক রসিদ ও এসএমএস যাচাই না করলে এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি থেকেই যায়। এসব আউটলেটের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকেয়া খানম সংবাদকে বলেন, ‘টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

অভিযুক্ত ওমর ফারুক রাজুর সাউথখালী ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটি বন্ধ। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শাহ আলম হাওলাদার বলেন, ‘রাজু পিরোজপুরে তার বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। কোথায় আছে বলতে পারছি না। ছেলের কাছে মানুষ এত টাকা পাবে, তা আগে কেউ আমাকে বলেনি। এখন অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন। এখানে আমার কী করার আছে? এত টাকা শোধ করার সামর্থ্যও আমার নেই।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬


ভুয়া রসিদে অর্থ লেনদেন: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই আউটলেট বন্ধ ঘোষণা

প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ভুয়া জমার রসিদ ও মুঠোফোনে ভুয়া খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে গ্রাহকদের প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনে বেরিয়ে এসেছে, গ্রাহকদের দেওয়া বেশির ভাগ জমার রসিদই ছিল ভুয়া। প্রতারক ব্যাংক এজেন্টের বিরুদ্ধে এখন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার তাফালবাড়ি বাজারে। অভিযুক্ত পরিচালকের নাম ওমর ফারুক রাজু। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি। টাকা আত্মসাতের পর তার লাপাত্তা হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষ থেকে গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শরণখোলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

অভিযুক্ত পরিচালক ওমর ফারুক রাজুর বিরুদ্ধ শরণখোলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ছবি : সংবাদ

গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ ঘোষণা করে সামনে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট উধাও

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বাগেরহাট জেলার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সিনিয়র সেলস ম্যানেজার শেখ ওবায়দুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আউটলেটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে যেসব গ্রাহক অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, তাদের রসিদ তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা করে মাত্র ৩০ লাখ টাকা পরিমাণ জমার সঠিক স্লিপ পাওয়া গেছে। বাকি সবার জমার স্লিপ ফেক (ভুয়া) বলে মনে হয়েছে। ভুয়া স্লিপ তৈরি করে এজেন্ট পরিচালক দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের দিয়েছেন, যা তারা বুঝতে পারেননি।’

টাকা জমার ভুয়া ছিল । ছবি : সংবাদ

তিনি আরও বলেন, ‘যাদের কাছে বৈধ জমার রসিদ আছে, তাদের জেলা শাখায় অভিযোগ করতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে যাদেরটা সঠিক প্রমাণিত হবে, তাদের আমানত ফেরত দেওয়া হবে। গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা ও ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন করার দায়ে পরিচালক ওমর ফারুক রাজুর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালে তাফালবাড়ি বাজারে আউটলেটটি চালু করেন রাজু। এক লাখ টাকা জমা রাখলে মাসে দুই হাজার টাকা মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন তিনি। বেশি লাভের আশায় জীবনের শেষ সম্বলটুকু জমা করেছিলেন অনেক গ্রাহক। টাকা জমার পর সিল মারা ভুয়া রসিদ ও নিজের মুঠোফোন থেকে জমার ভুয়া এসএমএস পাঠাতেন রাজু।

ভুক্তভোগী গ্রাহক। ছবি : সংবাদ

ভুক্তভোগী গ্রাহক আ. খালেক পঞ্চায়েত জানান, তার ৩৫ লাখ টাকা ওই আউটলেটে জমা রয়েছে। মিনারা বেগম জানান, তার জমা ৩৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিউটি আক্তারের ১০ লাখ, খালিদ সরদারের ২০ লাখ, জামাল হোসেনের ৩ লাখ, জলিল গাজীর ৫ লাখ, পান্না ফরাজীর ৫ লাখ ৫০ হাজার, বেল্লাল মিয়ার ৯ লাখ, রাসেল শরীফের ৮ লাখ ২০ হাজার, গিয়াস মিয়ার ৪ লাখ ৫০ হাজার, সজল শেখের ৩ লাখ ৫০ হাজার ও বাবুল হাওলাদারের ১০ লাখ টাকা জমা ছিল। সব মিলিয়ে জমার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা হবে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন। আউটলেট বন্ধ থাকায় নিঃস্ব গ্রাহকেরা প্রতিদিন সেখানে এসে চোখের জল ফেলছেন।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিপুল অঙ্কের এই টাকা হাতিয়ে গোপনে নেপালে পাড়ি জমিয়েছেন রাজু। সেখান থেকে তার ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাফালবাড়ি বাজার কমিটির সভাপতি আ. রাজ্জাক মৃধা বলেন, ‘রাজুর ভালো আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছে। প্রতিদিন গ্রাহকেরা এসে অভিযোগ করছেন। তাদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া ছাড়া আমাদের কীই-বা করার আছে?’

তাফালবাড়ি বাজার। ছবি : সংবাদ

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, লেনদেনের সময় প্রকৃত ব্যাংক রসিদ ও এসএমএস যাচাই না করলে এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি থেকেই যায়। এসব আউটলেটের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকেয়া খানম সংবাদকে বলেন, ‘টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

অভিযুক্ত ওমর ফারুক রাজুর সাউথখালী ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটি বন্ধ। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শাহ আলম হাওলাদার বলেন, ‘রাজু পিরোজপুরে তার বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। কোথায় আছে বলতে পারছি না। ছেলের কাছে মানুষ এত টাকা পাবে, তা আগে কেউ আমাকে বলেনি। এখন অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন। এখানে আমার কী করার আছে? এত টাকা শোধ করার সামর্থ্যও আমার নেই।’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত