মানব মুক্তি সংগ্রামের এক অবিচল নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের অকাল প্রয়াণে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান “প্রথম দেখা শেষ দেখা” লেখায় মোহাম্মদ ফরহাদের ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, ‘যে পারে সে এমনি পারে, পারে সে ফুল ফুটাতে’। ষাটের দশক থেকে তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের পুরোভাগে থেকেছেন। আর ‘সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর’ সহজাত ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি থাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনে ধ্রুবতারার মতো। ষাট ও সত্তরের দশকে সামনে থেকে সবসময় তিনি দৃশ্যমান না থাকলেও ছাত্র আন্দোলনের ভেতরে এবং একই সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টিতে তার প্রভাব ছিল গভীর। তিনি অনেকটা ঐ সময়ের সর্বত্যাগী প্রবীণ কমিউনিস্ট প্রজন্ম এবং ষাট দশকের নবীন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যে অন্যতম এক সেতুবন্ধ ছিলেন। দুই প্রজন্মের মধ্যেই তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত।
মোহাম্মদ ফরহাদের শৈশব চেতনা গড়ে উঠেছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাহিনী পড়ে আর কৈশোরেই সংস্পর্শে এসেছিলেন দিনাজপুরের কমিউনিস্ট ও কৃষক নেতৃবর্গের। দিনাজপুর জেলা স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন। দিনাজপুরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নকালে মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে ১০ জুন পাকিস্তানের কুখ্যাত নিরাপত্তা আইন ৯২-ক ধারায় গ্রেফতার হয়ে বিনা বিচারে ৭ মাস রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই ১৭ বছর বয়সে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন দিনাজপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কাজের সুবিধার্থে শীর্ষ পদে না থেকে ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পাস করেন। ১৯৬২ সালে আইন অধ্যয়নরত অবস্থায় আইয়ুব আমলে ফরহাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। সেই থেকে আত্মগোপনে থাকার জীবন হলেও ক্রমেই তিনি পরিণত হন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণপুরুষে। ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে নেপথ্য থেকেই তিনি মূল ভূমিকা রেখেছেন আবার ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের নেপথ্য কারিগরও তিনি।
ষাটের দশক জুড়েই ছাত্ররাজনীতিতে ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। সংগঠনের নানা সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের প্রস্তুতি এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবীর ছদ্ম নামেই তিনি ছিলেন অনেকটা নেপথ্যের শক্তি—যাকে সবসময় মঞ্চের সামনে দেখা যেত না, কিন্তু যার উপস্থিতি সংগঠনের কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে অনুভূত হতো। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আগে পরে দেখতাম খুলনায় ছাত্র ইউনিয়নের জেলা নেতারা তাদের পারস্পরিক আলোচনায় কবীর ভাই নামটা প্রায়শই উচ্চারণ করতেন। আমি এর মাহাত্ম্য তখন বুঝতে পারতাম না।
মোহাম্মদ ফরহাদকে আমি সর্বপ্রথম দেখি ১৯৭১ সালের জুন মাসে আগরতলায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্পে। আমরা যারা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাব তাদের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। সাক্ষাৎকার পর্বে তিনি আমাকে ‘আন্ডার এজ’ হিসেবে অথবা ‘সাহসের ঘাটতি’ দেখে বাদ দেন। পরে খুলনার পার্টি নেতা রতন দা’র হস্তক্ষেপে আমি কোনোরকম রেহাই পাই এবং ট্রেনিং-এ যাওয়া দলের অন্তর্ভুক্ত হই। সেদিন অবশ্য ফরহাদ ভাইয়ের কথাবার্তায় অতটা আকৃষ্ট হইনি। তবে স্বাধীনতার পরে পরে কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক জাতীয় সমাবেশগুলোতে উপস্থিত থাকায় তার বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়। অনলবর্ষী বক্তা বলতে যা বুঝায় তা তিনি কোনো কালেই ছিলেন না। ধীরে সুস্থে যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন এবং তার যুক্তি এত সহজ ও তীক্ষ্ণ হতো যা শ্রোতাকে আলোড়িত করতো, আকৃষ্ট করতো। সভার পরেও শ্রোতাদের মনে অনুরণিত হতে থাকতো।
ফরহাদ ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে উনি যখন আত্মগোপনে। ঐ সময়ে কয়েকটি গোপন বৈঠকের আয়োজনের সাথে যুক্ত হওয়ার এবং তার ডাক বিভিন্ন জনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হওয়ায়। ঐ সময়ে কিভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে এসব আলোচনা করতেন। কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসের আগে আমি সবেমাত্র ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়েছি। এসময়ে কংগ্রেসে উত্থাপনের জন্য পার্টির সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট প্রস্তুত করার কাজে তিনি বেছে নিলেন আমাকে। এক সপ্তাহ যাবৎ তার বাসায় যেতে হতো প্রতিদিন রাত নয়টায়। রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ চলতো। ফরহাদ ভাই বলে যেতেন আমি লিখতাম। রাত সাড়ে দশটা-এগারোটা বেজে গেলে রীনা আপা আমাকে ছেড়ে দিতে বলতেন। বলতেন ও সদ্যবিবাহিত, থাকে আবার শ্বশুর বাড়িতে। প্রতিদিন এতো রাত করে যাওয়া বেমানান। কিন্তু বারোটার আগে ছাড়া পেতাম না। লেখার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির নানা অজানা কথা তার কাছ থেকে শুনতে পেতাম।
তবে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তোলার কারিগর সে অভিজ্ঞতা হয়েছিলো আরো আগে ১৯৮২ সালে। তিনি তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি খন্দকার মো. ফারুক এবং আমার সাথে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে পরামর্শ দিলেন বামপন্থী বা বামমুখী ছাত্র সংগঠনগুলোকে এক মঞ্চে এনে কর্মসূচিভিত্তিক একটি জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিতে। সে অনুযায়ী আমরা তৎপর হলাম। শুরুতেই আমরা জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মুনীর উদ্দিন আহমেদের সাথে আলোচনা করতেই এ উদ্যোগে অকুণ্ঠ সমর্থন পেলাম। ফজলুর রহমান ও বাহালুল চুন্নুর নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ এবং মিজানুর রহমান মানুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নও উৎসাহের সাথে এগিয়ে এলো। এভাবে সম্ভবত ৭টি ছাত্র সংগঠন আমরা একমত হলাম ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিনে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ছাত্র গণজমায়েতের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার। নারায়ণগঞ্জের রাফিউর রাব্বি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র। এ উপলক্ষে দারুণ একটি পোস্টারের ডিজাইন করেছিলেন। তবে ২৪ মার্চ তারিখেই জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং স্থগিত করেন সংবিধানের কার্যকারিতা। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
কিন্তু ফরহাদ ভাই আমাদের বার্তা পাঠাতে বিলম্ব করেননি। বার্তা পাঠালেন, যে বাম সমঝোতা হয়েছে তা অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত সকল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের ব্যাপকতর ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে। কাজটি সহজ ছিলো না। বাম সমঝোতায় যারা এসেছিলেন তাদেরও কেউ কেউ এধরনের ঐক্যে রাজি ছিলেন না। কিন্তু তার নানামুখী পরামর্শে আমরা সফল হয়েছিলাম সে ধরনের ঐক্য গড়ে তুলতে যা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এক বীরত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন যার ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান। আর এ অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব অর্থাৎ ১৫ দলীয় ঐক্য জোট গড়ে তোলা, ৭ দলীয় ঐক্য জোটের সাথে সমন্বয় ও যুগপৎ আন্দোলন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনকেও জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা—এ সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ।
জাতীয় রাজনীতি, একই সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক, নারী, যুব, ক্ষেতমজুর, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সমাজের তৎপরতার পেছনেও ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। শ্রেণি আন্দোলন ও জাতীয় আন্দোলনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তার নেতৃত্বাধীন পার্টি বাংলাদেশে সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলো। আর মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও সৃজনশীলতার সাথে বাম বৃত্তের চৌহদ্দি পেরিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অন্যতম রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। পেশাদার বিপ্লবী চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে এবং নীতিতে অবিচল থেকেও কৌশলে নমনীয় হয়ে প্রকৃতই একজন জাতীয় নেতা হিসেবে জায়গা করে নেন। পার্টিতেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মত একতরফা চাপিয়ে না দিয়ে, নানা মত বা ভিন্ন মতকে গুরুত্ব দিয়ে সম্ভবমতো অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ফলে পার্টিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঐ সময়ে পার্টি নেতৃত্বে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনে অভিজ্ঞ একঝাঁক নক্ষত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের কারো সাথে কখনো মতান্তর হলেও গভীর ব্যক্তিগত ও কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে পার্টিতে ‘এক পরিবারের’ পরিবেশ বজায় রেখেছেন। মানুষ মাত্রই নিখুঁত নয়। মোহাম্মদ ফরহাদও ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তার উদ্যোগে নেয়া সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হয়তো নির্ভুল ছিল না, সেটা কখনো হয়ও না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—চলো, চলো এবং চলো। ভুল যদি হয় কখনও, একটু থেমে ভুলটা শুধরে, সামনে আবার চলো।
আজ যখন চারিদিকে সর্বগ্রাসী হতাশা, স্বৈরাচার আর কর্তৃত্ববাদের বিপরীতে দুয়ারে কড়া নাড়ছে অন্ধকারের ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট শক্তি তখন মোহাম্মদ ফরহাদের জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নতুন নেতৃত্বকে সংকীর্ণতামুক্ত এক সার্বজনীন ভাবমূর্তি নিয়ে পার্টি কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মুখোমুখি হতে হবে। বামপন্থার একমাত্র জিম্মাদারীর মনোভাব যেনো নিজেদেরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। পার্টির সবার মাঝেই অন্তত এ বোধ জাগ্রত হোক, আমরা আমাদেরকে পতনের মুখোমুখি হতে দেবো না।
জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৮ সনে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আবার ৩৫ বছরের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১৪ বছরই আত্মগোপন বা কারান্তরালে ছিলেন। আর ৯ অক্টোবর ১৯৮৭, আজ থেকে ৪০ বছর আগে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কর্মবহুল জীবনের অবসান ঘটে। মোহাম্মদ ফরহাদের নেতৃত্বাধীন পার্টি যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, নিশ্চয়ই সে ইতিহাসের স্রষ্টা গোটা পার্টি। তবে ইতিহাস নির্মাণে ব্যক্তির ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। তার অকাল প্রয়াণে বাংলাদেশের বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা আর পূরণ করা সম্ভব হয় নি। এ শূন্যতা সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল কবি শামসুর রহমানের লেখায়, “অকস্মাৎ এ কেমন নিস্তব্ধতা এলো দেশে? / এ কেমন সূর্যাস্তের ছটা / বিলাপের মতো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে? / বেদনার্ত পাখি নীড়ে ফেরা ভুলে যায়, / ফুল উন্মীলনে পায় না উৎসাহ .....”। সৈয়দ শামসুল হক লেখেন, “তাহলে বিদায়, বন্ধু, তাহলে বিদায়; / এভাবে, এ অবেলায়,/ সূর্যের অস্তের আগে আমাদের কণ্ঠে তুলে নিতে হচ্ছে সূর্যাস্তের গান,/ সবচেয়ে প্রয়োজন যখন আপনাকে,/ আমাদের বলতে হচ্ছে ‘বিদায়’ ......”। কবিতার ভাষায় এই যে প্রয়োজনের আকুতি তা মিটাবে কে বা কারা? শুধু বামপন্থার অনুসারী বা সমর্থকেরা নয় সাম্য ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখা মানুষেরা সে অপেক্ষায়!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬
মানব মুক্তি সংগ্রামের এক অবিচল নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের অকাল প্রয়াণে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান “প্রথম দেখা শেষ দেখা” লেখায় মোহাম্মদ ফরহাদের ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, ‘যে পারে সে এমনি পারে, পারে সে ফুল ফুটাতে’। ষাটের দশক থেকে তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের পুরোভাগে থেকেছেন। আর ‘সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর’ সহজাত ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি থাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনে ধ্রুবতারার মতো। ষাট ও সত্তরের দশকে সামনে থেকে সবসময় তিনি দৃশ্যমান না থাকলেও ছাত্র আন্দোলনের ভেতরে এবং একই সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টিতে তার প্রভাব ছিল গভীর। তিনি অনেকটা ঐ সময়ের সর্বত্যাগী প্রবীণ কমিউনিস্ট প্রজন্ম এবং ষাট দশকের নবীন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যে অন্যতম এক সেতুবন্ধ ছিলেন। দুই প্রজন্মের মধ্যেই তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত।
মোহাম্মদ ফরহাদের শৈশব চেতনা গড়ে উঠেছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাহিনী পড়ে আর কৈশোরেই সংস্পর্শে এসেছিলেন দিনাজপুরের কমিউনিস্ট ও কৃষক নেতৃবর্গের। দিনাজপুর জেলা স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন। দিনাজপুরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নকালে মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে ১০ জুন পাকিস্তানের কুখ্যাত নিরাপত্তা আইন ৯২-ক ধারায় গ্রেফতার হয়ে বিনা বিচারে ৭ মাস রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই ১৭ বছর বয়সে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন দিনাজপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কাজের সুবিধার্থে শীর্ষ পদে না থেকে ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পাস করেন। ১৯৬২ সালে আইন অধ্যয়নরত অবস্থায় আইয়ুব আমলে ফরহাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। সেই থেকে আত্মগোপনে থাকার জীবন হলেও ক্রমেই তিনি পরিণত হন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণপুরুষে। ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে নেপথ্য থেকেই তিনি মূল ভূমিকা রেখেছেন আবার ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের নেপথ্য কারিগরও তিনি।
ষাটের দশক জুড়েই ছাত্ররাজনীতিতে ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। সংগঠনের নানা সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের প্রস্তুতি এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবীর ছদ্ম নামেই তিনি ছিলেন অনেকটা নেপথ্যের শক্তি—যাকে সবসময় মঞ্চের সামনে দেখা যেত না, কিন্তু যার উপস্থিতি সংগঠনের কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে অনুভূত হতো। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আগে পরে দেখতাম খুলনায় ছাত্র ইউনিয়নের জেলা নেতারা তাদের পারস্পরিক আলোচনায় কবীর ভাই নামটা প্রায়শই উচ্চারণ করতেন। আমি এর মাহাত্ম্য তখন বুঝতে পারতাম না।
মোহাম্মদ ফরহাদকে আমি সর্বপ্রথম দেখি ১৯৭১ সালের জুন মাসে আগরতলায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্পে। আমরা যারা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাব তাদের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। সাক্ষাৎকার পর্বে তিনি আমাকে ‘আন্ডার এজ’ হিসেবে অথবা ‘সাহসের ঘাটতি’ দেখে বাদ দেন। পরে খুলনার পার্টি নেতা রতন দা’র হস্তক্ষেপে আমি কোনোরকম রেহাই পাই এবং ট্রেনিং-এ যাওয়া দলের অন্তর্ভুক্ত হই। সেদিন অবশ্য ফরহাদ ভাইয়ের কথাবার্তায় অতটা আকৃষ্ট হইনি। তবে স্বাধীনতার পরে পরে কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক জাতীয় সমাবেশগুলোতে উপস্থিত থাকায় তার বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়। অনলবর্ষী বক্তা বলতে যা বুঝায় তা তিনি কোনো কালেই ছিলেন না। ধীরে সুস্থে যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন এবং তার যুক্তি এত সহজ ও তীক্ষ্ণ হতো যা শ্রোতাকে আলোড়িত করতো, আকৃষ্ট করতো। সভার পরেও শ্রোতাদের মনে অনুরণিত হতে থাকতো।
ফরহাদ ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে উনি যখন আত্মগোপনে। ঐ সময়ে কয়েকটি গোপন বৈঠকের আয়োজনের সাথে যুক্ত হওয়ার এবং তার ডাক বিভিন্ন জনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হওয়ায়। ঐ সময়ে কিভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে এসব আলোচনা করতেন। কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসের আগে আমি সবেমাত্র ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়েছি। এসময়ে কংগ্রেসে উত্থাপনের জন্য পার্টির সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট প্রস্তুত করার কাজে তিনি বেছে নিলেন আমাকে। এক সপ্তাহ যাবৎ তার বাসায় যেতে হতো প্রতিদিন রাত নয়টায়। রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ চলতো। ফরহাদ ভাই বলে যেতেন আমি লিখতাম। রাত সাড়ে দশটা-এগারোটা বেজে গেলে রীনা আপা আমাকে ছেড়ে দিতে বলতেন। বলতেন ও সদ্যবিবাহিত, থাকে আবার শ্বশুর বাড়িতে। প্রতিদিন এতো রাত করে যাওয়া বেমানান। কিন্তু বারোটার আগে ছাড়া পেতাম না। লেখার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির নানা অজানা কথা তার কাছ থেকে শুনতে পেতাম।
তবে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তোলার কারিগর সে অভিজ্ঞতা হয়েছিলো আরো আগে ১৯৮২ সালে। তিনি তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি খন্দকার মো. ফারুক এবং আমার সাথে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে পরামর্শ দিলেন বামপন্থী বা বামমুখী ছাত্র সংগঠনগুলোকে এক মঞ্চে এনে কর্মসূচিভিত্তিক একটি জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিতে। সে অনুযায়ী আমরা তৎপর হলাম। শুরুতেই আমরা জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মুনীর উদ্দিন আহমেদের সাথে আলোচনা করতেই এ উদ্যোগে অকুণ্ঠ সমর্থন পেলাম। ফজলুর রহমান ও বাহালুল চুন্নুর নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ এবং মিজানুর রহমান মানুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নও উৎসাহের সাথে এগিয়ে এলো। এভাবে সম্ভবত ৭টি ছাত্র সংগঠন আমরা একমত হলাম ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিনে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ছাত্র গণজমায়েতের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার। নারায়ণগঞ্জের রাফিউর রাব্বি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র। এ উপলক্ষে দারুণ একটি পোস্টারের ডিজাইন করেছিলেন। তবে ২৪ মার্চ তারিখেই জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং স্থগিত করেন সংবিধানের কার্যকারিতা। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
কিন্তু ফরহাদ ভাই আমাদের বার্তা পাঠাতে বিলম্ব করেননি। বার্তা পাঠালেন, যে বাম সমঝোতা হয়েছে তা অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত সকল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের ব্যাপকতর ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে। কাজটি সহজ ছিলো না। বাম সমঝোতায় যারা এসেছিলেন তাদেরও কেউ কেউ এধরনের ঐক্যে রাজি ছিলেন না। কিন্তু তার নানামুখী পরামর্শে আমরা সফল হয়েছিলাম সে ধরনের ঐক্য গড়ে তুলতে যা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এক বীরত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন যার ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান। আর এ অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব অর্থাৎ ১৫ দলীয় ঐক্য জোট গড়ে তোলা, ৭ দলীয় ঐক্য জোটের সাথে সমন্বয় ও যুগপৎ আন্দোলন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনকেও জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা—এ সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ।
জাতীয় রাজনীতি, একই সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক, নারী, যুব, ক্ষেতমজুর, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সমাজের তৎপরতার পেছনেও ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। শ্রেণি আন্দোলন ও জাতীয় আন্দোলনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তার নেতৃত্বাধীন পার্টি বাংলাদেশে সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলো। আর মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও সৃজনশীলতার সাথে বাম বৃত্তের চৌহদ্দি পেরিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অন্যতম রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। পেশাদার বিপ্লবী চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে এবং নীতিতে অবিচল থেকেও কৌশলে নমনীয় হয়ে প্রকৃতই একজন জাতীয় নেতা হিসেবে জায়গা করে নেন। পার্টিতেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মত একতরফা চাপিয়ে না দিয়ে, নানা মত বা ভিন্ন মতকে গুরুত্ব দিয়ে সম্ভবমতো অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ফলে পার্টিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঐ সময়ে পার্টি নেতৃত্বে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনে অভিজ্ঞ একঝাঁক নক্ষত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের কারো সাথে কখনো মতান্তর হলেও গভীর ব্যক্তিগত ও কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে পার্টিতে ‘এক পরিবারের’ পরিবেশ বজায় রেখেছেন। মানুষ মাত্রই নিখুঁত নয়। মোহাম্মদ ফরহাদও ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তার উদ্যোগে নেয়া সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হয়তো নির্ভুল ছিল না, সেটা কখনো হয়ও না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—চলো, চলো এবং চলো। ভুল যদি হয় কখনও, একটু থেমে ভুলটা শুধরে, সামনে আবার চলো।
আজ যখন চারিদিকে সর্বগ্রাসী হতাশা, স্বৈরাচার আর কর্তৃত্ববাদের বিপরীতে দুয়ারে কড়া নাড়ছে অন্ধকারের ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট শক্তি তখন মোহাম্মদ ফরহাদের জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নতুন নেতৃত্বকে সংকীর্ণতামুক্ত এক সার্বজনীন ভাবমূর্তি নিয়ে পার্টি কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মুখোমুখি হতে হবে। বামপন্থার একমাত্র জিম্মাদারীর মনোভাব যেনো নিজেদেরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। পার্টির সবার মাঝেই অন্তত এ বোধ জাগ্রত হোক, আমরা আমাদেরকে পতনের মুখোমুখি হতে দেবো না।
জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৮ সনে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আবার ৩৫ বছরের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১৪ বছরই আত্মগোপন বা কারান্তরালে ছিলেন। আর ৯ অক্টোবর ১৯৮৭, আজ থেকে ৪০ বছর আগে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কর্মবহুল জীবনের অবসান ঘটে। মোহাম্মদ ফরহাদের নেতৃত্বাধীন পার্টি যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, নিশ্চয়ই সে ইতিহাসের স্রষ্টা গোটা পার্টি। তবে ইতিহাস নির্মাণে ব্যক্তির ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। তার অকাল প্রয়াণে বাংলাদেশের বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা আর পূরণ করা সম্ভব হয় নি। এ শূন্যতা সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল কবি শামসুর রহমানের লেখায়, “অকস্মাৎ এ কেমন নিস্তব্ধতা এলো দেশে? / এ কেমন সূর্যাস্তের ছটা / বিলাপের মতো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে? / বেদনার্ত পাখি নীড়ে ফেরা ভুলে যায়, / ফুল উন্মীলনে পায় না উৎসাহ .....”। সৈয়দ শামসুল হক লেখেন, “তাহলে বিদায়, বন্ধু, তাহলে বিদায়; / এভাবে, এ অবেলায়,/ সূর্যের অস্তের আগে আমাদের কণ্ঠে তুলে নিতে হচ্ছে সূর্যাস্তের গান,/ সবচেয়ে প্রয়োজন যখন আপনাকে,/ আমাদের বলতে হচ্ছে ‘বিদায়’ ......”। কবিতার ভাষায় এই যে প্রয়োজনের আকুতি তা মিটাবে কে বা কারা? শুধু বামপন্থার অনুসারী বা সমর্থকেরা নয় সাম্য ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখা মানুষেরা সে অপেক্ষায়!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন