কাশফুলে দোলা লাগিয়ে এবার মর্ত্যে আবির্ভূতা হবেন চিন্ময়ী দেবী দুর্গা। স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে ভক্তদের দর্শন দিতে আসেন দশভূজা দুর্গতিনাশিনী। শারদীয় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে মহালয়া তিথিতে চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন করা হয়। মহালয়া এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন মাতৃপূজার শুভক্ষণকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়। দেবী বন্দনার সুর ধ্বনিত হয় মানুষের হৃদয়ে। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকে জাগে আনন্দ ও প্রতীক্ষা—মা আসছেন আমাদের মাঝে। কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, নাকি শরৎ এলে কাশফুল ফোটে—এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই।
মহালয়া মানে পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা। চাঁদের হিসাব অনুসারে, আশ্বিনের অমাবস্যায় পিতৃপক্ষ শেষ হয় এবং দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে। দেবীপক্ষের শেষ তিথি পূর্ণিমা, যা কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। এ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করেন। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচ দিনের উৎসব হলেও মহালয়া থেকেই বাঙালির মনে শারদীয় উৎসবের আনন্দ শুরু হয়। দেবীর আগমনী সুরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-আকাশ আর কাশবন যেন সেই আনন্দেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষ পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাদের উদ্দেশে তর্পণের জন্য বিশেষ সময়। তর্পণ শব্দের অর্থ তৃপ্ত করা বা সন্তুষ্ট করা। সনাতন ধর্মে কোনো শুভ কাজের আগে প্রয়াত পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাদের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতি রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। অনেকে মহালয়ার দিন গঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর জলে অঞ্জলি দিয়ে তর্পণ করেন। এই আচার শুধু পূর্বপুরুষদের স্মরণেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে সমগ্র জীবজগতের মঙ্গলও কামনা করা হয়। যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে পারেননি, তারাও এ দিন তা করতে পারেন বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।
মহালয়া ও তর্পণ নিয়ে মহাভারতে কর্ণের একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। কথিত আছে, মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গে গেলে তাকে খাদ্য হিসেবে সোনা ও রত্ন দেওয়া হয়। কারণ, জীবদ্দশায় তিনি প্রচুর স্বর্ণ দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অন্ন দান করেননি। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাকে জানানো হয়, তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে খাদ্য নিবেদন করেননি। কর্ণ জানান, তিনি তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরে তাকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে তাদের উদ্দেশে অন্ন ও জল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাদের উদ্দেশে অন্ন-জল নিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
শাস্ত্রমতে, মহালয়া একটি অমাবস্যা তিথি। এ দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের তৃপ্তি সাধিত হয় এবং তারা উত্তরসূরিদের আশীর্বাদ করেন। একই সঙ্গে মহালয়া দেবী দুর্গার আগমনের প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ‘বোধন’ অর্থ জাগরণ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে দেবীর বোধন করা হয়। শ্রীশ্রী চণ্ডীর কাহিনিতে দেবী মহামায়ার যোগনিদ্রা থেকে বিষ্ণুর জেগে ওঠা এবং মধু-কৈটভ নামের দুই অসুরের সঙ্গে তার যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। দুর্গার আবির্ভাব ও মহিষাসুরবধের কাহিনিও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক।
মহালয়ার আগে ‘শুভ মহালয়া’ বলা যাবে কি না, তা নিয়েও কারও কারও প্রশ্ন রয়েছে। তবে অনেক শাস্ত্রজ্ঞের মতে, পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাদের আত্মার শান্তি কামনা এবং দেবী দুর্গার আবাহনের এই তিথিকে অশুভ বলার কারণ নেই। পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের ব্যাখ্যায়, মহালয়ার তর্পণ শুধু পিতৃপুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেবতা, ঋষি এবং পরিচিত-অপরিচিত প্রয়াতদের উদ্দেশেও তর্পণের বিধান রয়েছে। এই দৃষ্টিতে মহালয়া স্মরণ, শ্রদ্ধা ও কল্যাণকামনার তিথি। তাই অনেকে বিশ্বাস করেন, এই পুণ্য তিথিকে ‘শুভ মহালয়া’ বলে অভিহিত করায় কোনো অসংগতি নেই।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতাদের রক্ষায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তির সমন্বয়ে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র ধারণ করে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কাহিনি অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা বহন করে। মহালয়া তাই একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণের দিন, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা ও দুর্গার আগমনী বার্তা। এই তিথি মানুষের মনে শুভবোধ, আশা ও নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।
ছোটবেলায় মহালয়া দিয়েই আমাদের দুর্গাপূজার আনন্দপর্ব শুরু হতো। সেই আনন্দের সমাপ্তি ঘটত দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিন সুন্দর ও আনন্দময় হোক। শুভ মহালয়া সবার মনে জাগিয়ে তুলুক শুভবোধ, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
কাশফুলে দোলা লাগিয়ে এবার মর্ত্যে আবির্ভূতা হবেন চিন্ময়ী দেবী দুর্গা। স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে ভক্তদের দর্শন দিতে আসেন দশভূজা দুর্গতিনাশিনী। শারদীয় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে মহালয়া তিথিতে চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন করা হয়। মহালয়া এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন মাতৃপূজার শুভক্ষণকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়। দেবী বন্দনার সুর ধ্বনিত হয় মানুষের হৃদয়ে। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকে জাগে আনন্দ ও প্রতীক্ষা—মা আসছেন আমাদের মাঝে। কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, নাকি শরৎ এলে কাশফুল ফোটে—এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই।
মহালয়া মানে পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা। চাঁদের হিসাব অনুসারে, আশ্বিনের অমাবস্যায় পিতৃপক্ষ শেষ হয় এবং দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে। দেবীপক্ষের শেষ তিথি পূর্ণিমা, যা কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। এ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করেন। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচ দিনের উৎসব হলেও মহালয়া থেকেই বাঙালির মনে শারদীয় উৎসবের আনন্দ শুরু হয়। দেবীর আগমনী সুরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-আকাশ আর কাশবন যেন সেই আনন্দেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষ পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাদের উদ্দেশে তর্পণের জন্য বিশেষ সময়। তর্পণ শব্দের অর্থ তৃপ্ত করা বা সন্তুষ্ট করা। সনাতন ধর্মে কোনো শুভ কাজের আগে প্রয়াত পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাদের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতি রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। অনেকে মহালয়ার দিন গঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর জলে অঞ্জলি দিয়ে তর্পণ করেন। এই আচার শুধু পূর্বপুরুষদের স্মরণেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে সমগ্র জীবজগতের মঙ্গলও কামনা করা হয়। যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে পারেননি, তারাও এ দিন তা করতে পারেন বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।
মহালয়া ও তর্পণ নিয়ে মহাভারতে কর্ণের একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। কথিত আছে, মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গে গেলে তাকে খাদ্য হিসেবে সোনা ও রত্ন দেওয়া হয়। কারণ, জীবদ্দশায় তিনি প্রচুর স্বর্ণ দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অন্ন দান করেননি। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাকে জানানো হয়, তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে খাদ্য নিবেদন করেননি। কর্ণ জানান, তিনি তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরে তাকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে তাদের উদ্দেশে অন্ন ও জল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাদের উদ্দেশে অন্ন-জল নিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
শাস্ত্রমতে, মহালয়া একটি অমাবস্যা তিথি। এ দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের তৃপ্তি সাধিত হয় এবং তারা উত্তরসূরিদের আশীর্বাদ করেন। একই সঙ্গে মহালয়া দেবী দুর্গার আগমনের প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ‘বোধন’ অর্থ জাগরণ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে দেবীর বোধন করা হয়। শ্রীশ্রী চণ্ডীর কাহিনিতে দেবী মহামায়ার যোগনিদ্রা থেকে বিষ্ণুর জেগে ওঠা এবং মধু-কৈটভ নামের দুই অসুরের সঙ্গে তার যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। দুর্গার আবির্ভাব ও মহিষাসুরবধের কাহিনিও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক।
মহালয়ার আগে ‘শুভ মহালয়া’ বলা যাবে কি না, তা নিয়েও কারও কারও প্রশ্ন রয়েছে। তবে অনেক শাস্ত্রজ্ঞের মতে, পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাদের আত্মার শান্তি কামনা এবং দেবী দুর্গার আবাহনের এই তিথিকে অশুভ বলার কারণ নেই। পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের ব্যাখ্যায়, মহালয়ার তর্পণ শুধু পিতৃপুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেবতা, ঋষি এবং পরিচিত-অপরিচিত প্রয়াতদের উদ্দেশেও তর্পণের বিধান রয়েছে। এই দৃষ্টিতে মহালয়া স্মরণ, শ্রদ্ধা ও কল্যাণকামনার তিথি। তাই অনেকে বিশ্বাস করেন, এই পুণ্য তিথিকে ‘শুভ মহালয়া’ বলে অভিহিত করায় কোনো অসংগতি নেই।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতাদের রক্ষায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তির সমন্বয়ে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র ধারণ করে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কাহিনি অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা বহন করে। মহালয়া তাই একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণের দিন, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা ও দুর্গার আগমনী বার্তা। এই তিথি মানুষের মনে শুভবোধ, আশা ও নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।
ছোটবেলায় মহালয়া দিয়েই আমাদের দুর্গাপূজার আনন্দপর্ব শুরু হতো। সেই আনন্দের সমাপ্তি ঘটত দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিন সুন্দর ও আনন্দময় হোক। শুভ মহালয়া সবার মনে জাগিয়ে তুলুক শুভবোধ, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন