সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের শ্রমের ইতিহাস। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক কারখানা সচল রাখেন, নির্মাণশ্রমিক শহর গড়ে তোলেন, পরিবহনশ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। গৃহশ্রমিক পরিবার ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। পোশাকশ্রমিক বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন। রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, মৎস্যজীবী ও ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণেরাও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। অথচ তাদের অনেকেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রতিবছর ৭ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস। শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। শোভন কাজ বলতে শুধু কর্মসংস্থান বোঝায় না। এমন কাজকে শোভন বলা যায়, যেখানে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, অধিকার চর্চার স্বাধীনতা এবং অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বার্ধক্য কিংবা কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৯৯ সালে শোভন কাজের ধারণাকে বৈশ্বিক শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে সামনে আনে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অষ্টম লক্ষ্যেও শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তরুণ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ
তরুণেরা শ্রমবাজারের বড় সম্ভাবনা। কিন্তু তাদের অনেকেই কর্মজীবনের শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। স্থায়ী চাকরির বদলে অস্থায়ী কাজ, কম মজুরি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষাহীন কর্মসংস্থান তাদের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও কাজ পাচ্ছেন না। আবার কাজ পেলেও অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরি বা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
তাই শুধু কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, তা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কাজের মানও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ সময় কাজ করেও যদি একজন তরুণের আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হয়, তবে সেই কর্মসংস্থানকে শোভন বলা যায় না। চাকরি হারালে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারাও অনিশ্চয়তার লক্ষণ। এসব সমস্যা সমাধানকে শ্রমনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সংকট
বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পোশাক ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। কিন্তু শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের অনেকের লিখিত নিয়োগপত্র নেই, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত নয়, নিয়মিত মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষাও সীমিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না। অসুস্থতা বা কর্মক্ষমতা হারালে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
এই পরিস্থিতি শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। শ্রমজীবী মানুষের আয় অনিশ্চিত হলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে। এতে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি।
জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয় না। মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও পোশাকের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমে যায়। কাগজে মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে জীবনমানের উন্নতি ঘটে না। তাই মজুরি নির্ধারণে শিল্পের সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার
শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার শোভন কাজের অন্যতম শর্ত। একজন শ্রমিকের পক্ষে একা মালিকের সঙ্গে দরকষাকষি করা কঠিন। সংগঠিত শ্রমিকেরা সম্মিলিতভাবে তাদের দাবি তুলতে পারেন এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
শ্রমিক সংগঠন শুধু মজুরি বৃদ্ধির জন্য নয়; কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও বৈষম্য প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সংগঠন গঠনে বাধা, চাকরি হারানোর ভয়, মালিকপক্ষের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বাধীনতা সীমিত করে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে শ্রমিক-মালিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।
শোভন কাজের সঙ্গে গণতন্ত্রেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকের মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে কর্মক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না। মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আইন সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের সুরক্ষা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে পোশাকশিল্প ও সেবা খাতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজুরি ও পদোন্নতিতে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এখনো তাদের জন্য বড় বাধা। এসব দূর করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একইভাবে হকার, রিকশাচালক, গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে এক দিনে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।
প্রযুক্তির পরিবর্তন ও নতুন কর্মসংস্থান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু প্রচলিত কাজ কমে যেতে পারে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, পরিবহন ও প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিপণন ও অনলাইন শিক্ষায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সক্ষম করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রচলিত কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা জরুরি। যাঁরা যাত্রী পরিবহন, খাবার সরবরাহ কিংবা অনলাইনভিত্তিক সেবা দেন, তাদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। নতুন কর্মসংস্থানের ধরন যেন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুশ্রম ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা
দারিদ্র্য, পারিবারিক আয়সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে থাকার বয়সে শিশু শ্রমে যুক্ত হলে তার শৈশব নষ্ট হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, পরিবহন ও কৃষিতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের করণীয়
শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি অধিকার। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মহীনতা ও বার্ধক্যের সময়ে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বিমা ও বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা ধাপে ধাপে বিস্তৃত করতে হবে।
শোভন কাজ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। মালিকদেরও ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, আইনসম্মত ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এতে শ্রমিকের আস্থা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজকেও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকের অবদান ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কর্মপরিবেশের উদাহরণও সামনে আনতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্য
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন কিংবা রপ্তানি দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, উন্নয়নের সুফল শ্রমজীবী মানুষ কতটা পাচ্ছেন। তরুণেরা কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছেন, নারী শ্রমিকের মর্যাদা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অসুস্থ ও প্রবীণ শ্রমিকের জন্য কী সুরক্ষা রয়েছে—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও উন্নত হবে; প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। এ জন্য তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ, শ্রমিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
মানুষের শ্রমের মর্যাদা ছাড়া কোনো উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ নয়। একজন শ্রমিক শুধু উৎপাদনের সংখ্যা নন; তিনি একজন মানুষ, নাগরিক ও পরিবারের সদস্য। তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল তরুণ শ্রমশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর শ্রম আইন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ও কার্যকর সামাজিক সংলাপ।
তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত করার অর্থ শুধু মজুরি বা কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নয়; নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ শ্রমিকেরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবেন। তাদের জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজগৎ গড়ে তুলতে পারলেই শোভন কাজের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে।
শ্রমের মর্যাদা, বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব গড়ে উঠুক। কাজ হোক শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শোভন কাজ হোক সবার অধিকার, তরুণ শ্রমিকের কণ্ঠ হোক ভবিষ্যতের শক্তি।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের শ্রমের ইতিহাস। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক কারখানা সচল রাখেন, নির্মাণশ্রমিক শহর গড়ে তোলেন, পরিবহনশ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। গৃহশ্রমিক পরিবার ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। পোশাকশ্রমিক বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন। রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, মৎস্যজীবী ও ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণেরাও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। অথচ তাদের অনেকেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রতিবছর ৭ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস। শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। শোভন কাজ বলতে শুধু কর্মসংস্থান বোঝায় না। এমন কাজকে শোভন বলা যায়, যেখানে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, অধিকার চর্চার স্বাধীনতা এবং অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বার্ধক্য কিংবা কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৯৯ সালে শোভন কাজের ধারণাকে বৈশ্বিক শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে সামনে আনে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অষ্টম লক্ষ্যেও শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তরুণ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ
তরুণেরা শ্রমবাজারের বড় সম্ভাবনা। কিন্তু তাদের অনেকেই কর্মজীবনের শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। স্থায়ী চাকরির বদলে অস্থায়ী কাজ, কম মজুরি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষাহীন কর্মসংস্থান তাদের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও কাজ পাচ্ছেন না। আবার কাজ পেলেও অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরি বা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
তাই শুধু কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, তা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কাজের মানও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ সময় কাজ করেও যদি একজন তরুণের আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হয়, তবে সেই কর্মসংস্থানকে শোভন বলা যায় না। চাকরি হারালে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারাও অনিশ্চয়তার লক্ষণ। এসব সমস্যা সমাধানকে শ্রমনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সংকট
বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পোশাক ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। কিন্তু শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের অনেকের লিখিত নিয়োগপত্র নেই, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত নয়, নিয়মিত মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষাও সীমিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না। অসুস্থতা বা কর্মক্ষমতা হারালে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
এই পরিস্থিতি শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। শ্রমজীবী মানুষের আয় অনিশ্চিত হলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে। এতে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি।
জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয় না। মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও পোশাকের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমে যায়। কাগজে মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে জীবনমানের উন্নতি ঘটে না। তাই মজুরি নির্ধারণে শিল্পের সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার
শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার শোভন কাজের অন্যতম শর্ত। একজন শ্রমিকের পক্ষে একা মালিকের সঙ্গে দরকষাকষি করা কঠিন। সংগঠিত শ্রমিকেরা সম্মিলিতভাবে তাদের দাবি তুলতে পারেন এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
শ্রমিক সংগঠন শুধু মজুরি বৃদ্ধির জন্য নয়; কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও বৈষম্য প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সংগঠন গঠনে বাধা, চাকরি হারানোর ভয়, মালিকপক্ষের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বাধীনতা সীমিত করে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে শ্রমিক-মালিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।
শোভন কাজের সঙ্গে গণতন্ত্রেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকের মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে কর্মক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না। মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আইন সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের সুরক্ষা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে পোশাকশিল্প ও সেবা খাতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজুরি ও পদোন্নতিতে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এখনো তাদের জন্য বড় বাধা। এসব দূর করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একইভাবে হকার, রিকশাচালক, গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে এক দিনে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।
প্রযুক্তির পরিবর্তন ও নতুন কর্মসংস্থান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু প্রচলিত কাজ কমে যেতে পারে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, পরিবহন ও প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিপণন ও অনলাইন শিক্ষায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সক্ষম করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রচলিত কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা জরুরি। যাঁরা যাত্রী পরিবহন, খাবার সরবরাহ কিংবা অনলাইনভিত্তিক সেবা দেন, তাদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। নতুন কর্মসংস্থানের ধরন যেন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুশ্রম ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা
দারিদ্র্য, পারিবারিক আয়সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে থাকার বয়সে শিশু শ্রমে যুক্ত হলে তার শৈশব নষ্ট হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, পরিবহন ও কৃষিতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের করণীয়
শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি অধিকার। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মহীনতা ও বার্ধক্যের সময়ে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বিমা ও বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা ধাপে ধাপে বিস্তৃত করতে হবে।
শোভন কাজ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। মালিকদেরও ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, আইনসম্মত ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এতে শ্রমিকের আস্থা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজকেও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকের অবদান ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কর্মপরিবেশের উদাহরণও সামনে আনতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্য
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন কিংবা রপ্তানি দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, উন্নয়নের সুফল শ্রমজীবী মানুষ কতটা পাচ্ছেন। তরুণেরা কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছেন, নারী শ্রমিকের মর্যাদা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অসুস্থ ও প্রবীণ শ্রমিকের জন্য কী সুরক্ষা রয়েছে—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও উন্নত হবে; প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। এ জন্য তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ, শ্রমিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
মানুষের শ্রমের মর্যাদা ছাড়া কোনো উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ নয়। একজন শ্রমিক শুধু উৎপাদনের সংখ্যা নন; তিনি একজন মানুষ, নাগরিক ও পরিবারের সদস্য। তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল তরুণ শ্রমশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর শ্রম আইন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ও কার্যকর সামাজিক সংলাপ।
তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত করার অর্থ শুধু মজুরি বা কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নয়; নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ শ্রমিকেরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবেন। তাদের জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজগৎ গড়ে তুলতে পারলেই শোভন কাজের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে।
শ্রমের মর্যাদা, বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব গড়ে উঠুক। কাজ হোক শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শোভন কাজ হোক সবার অধিকার, তরুণ শ্রমিকের কণ্ঠ হোক ভবিষ্যতের শক্তি।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

আপনার মতামত লিখুন