বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে আসে খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, মোবাইল কোর্ট, খাদ্য পরীক্ষা, জীবাণু, কারখানার স্বাস্থ্যবিধি, জিএমপি, হ্যাসাপ, আইএসও ২২০০০ কিংবা এফএসএসসি ২২০০০-এর মতো বিষয়। এগুলোর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সবচেয়ে মৌলিক জায়গাটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—যে মানুষটি প্রতিদিন খাদ্য তৈরি করছেন, রান্না করছেন, কাঁচামাল বহন করছেন, খাদ্য পরিবেশন করছেন, যন্ত্র চালাচ্ছেন, খাদ্য প্যাক করছেন, গুদামে রাখছেন কিংবা উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার করছেন, তিনি খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো কতটা জানেন?
এই প্রশ্নটি শুধু বড় খাদ্য কারখানার জন্য নয়। রাস্তার পাশে যিনি ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পরোটা, ভাজাপোড়া, শরবত, ফলের রস বা অন্য কোনো খাবার তৈরি ও বিক্রি করছেন, তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কারণ খাদ্য কারখানায় তৈরি হোক কিংবা রাস্তার ছোট দোকান বা ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে তৈরি হোক—খাদ্য অনিরাপদ হলে ভোক্তার জন্য ঝুঁকি একই।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাই পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদেরও খাদ্যকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
একটি খাদ্য কারখানায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে পারে। হ্যাসাপ পরিকল্পনা থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদ থাকতে পারে, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও থাকতে পারে। কিন্তু একজন কর্মী যদি টয়লেট থেকে এসে সঠিকভাবে হাত না ধুয়ে খাদ্য স্পর্শ করেন, ডায়রিয়া বা বমির মতো অসুস্থতা গোপন করে কাজে যোগ দেন, মেঝেতে পড়ে যাওয়া কোনো উপকরণ আবার ব্যবহার করেন কিংবা পরিষ্কার করার রাসায়নিক খাদ্যের পাশে রেখে দেন—তাহলে প্রতিষ্ঠানের উন্নত খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে পথের খাবারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সেখানে সব সময় পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বর্জ্য ফেলার স্থান, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা ঢাকা দেওয়া খাবার রাখার সুযোগ নাও থাকতে পারে। ধুলাবালি, মাছি, যানবাহনের ধোঁয়া, অপরিষ্কার পানি, একই হাতে টাকা ও খাবার ধরা এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় পরিবেশের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়ার মতো বিষয়ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গাতেই প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১, অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার একেবারে প্রাথমিক শিক্ষা। লেভেল ১ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার স্তর নয়। এটি মূলত কর্মক্ষেত্রভিত্তিক খুব সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা। একজন মানুষ খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, বিক্রয় বা পরিবেশনের কাজ শুরু করার আগে ন্যূনতম কী কী বিষয় জানবেন, সেটিই এই শিক্ষার মূল বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা শুধু বড় আধুনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি খাদ্য কারখানা রয়েছে। রয়েছে মিষ্টির কারখানা, বেকারি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা, পানীয় প্রস্তুতকারী, মসলা, আচার, সস, জ্যাম-জেলি, স্ন্যাকস ও হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারীসহ হাজারো ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা। এর সঙ্গে রয়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, ক্যান্টিন এবং বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের অসংখ্য পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা।
এসব মানুষের প্রত্যেককে হ্যাসাপের জটিল বিষয় শেখানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রত্যেককে অবশ্যই জানতে হবে—তার হাত, পানি, কাঁচামাল, বাসনপত্র, পোশাক, অসুস্থতা কিংবা একটি ছোট ভুল কীভাবে খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত—“নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্ব আমারও।”
একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন না, তার আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও নেই। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই কাঁচামাল কিনছেন, খাবার তৈরি করছেন, সংরক্ষণ করছেন, পরিবেশন করছেন, টাকা নিচ্ছেন এবং বাসন পরিষ্কার করছেন। ফলে তার খাদ্য নিরাপত্তা জ্ঞানই অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যবসার প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা।
খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রশিক্ষণ তাই শুধু কারখানার কর্মীদের জন্য তৈরি করলে চলবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর একটি বিশেষ অংশ অথবা আলাদা সংস্করণ থাকতে পারে পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের জন্য।
বাংলাদেশে এ প্রয়োজনের পক্ষে গবেষণার তথ্যও রয়েছে। ২৬৬ জন পথের খাবার বিক্রেতাকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশের বেশি বিক্রেতা খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। গবেষকেরা নিয়মিত মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ঢাকার ৩৫০ জন পথের খাবার বিক্রেতার ওপর আরেকটি গবেষণাতেও ৮৫ শতাংশের কোনো খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ছিল না। অর্থাৎ পথের খাবার খাতকে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার বাইরে রেখে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।
বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতির কর্মপরিকল্পনাতেও পথের খাবার বিক্রেতা ও শহুরে খাদ্য উৎপাদকদের জন্য দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে পথের খাবারকে জাতীয় লেভেল ১ প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করার যথেষ্ট নীতিগত ভিত্তিও রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য লেভেল ১ প্রশিক্ষণ খুব দীর্ঘ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই থেকে তিন ঘণ্টার একটি সুপরিকল্পিত ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েই একজন নতুন কর্মী কিংবা পথের খাবার বিক্রেতার মধ্যে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া নয়; উদ্দেশ্য হতে হবে আচরণ পরিবর্তন করা।
প্রথমেই তাকে বোঝাতে হবে খাদ্যের মধ্যে কীভাবে বিপদ আসতে পারে। সহজভাবে খাদ্যের বিপদকে জীবাণুজনিত, রাসায়নিক, বাহ্যিক বস্তুজনিত এবং অ্যালার্জিজনিত—এই কয়েকটি ভাগে বোঝানো যেতে পারে।
জীবাণুজনিত বিপদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ইস্ট, ছত্রাক, পরজীবী এবং কিছু অণুজীবের স্পোর। তবে একজন সাধারণ কর্মী বা পথের খাবার বিক্রেতাকে এসব জীবাণুর জটিল বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাকে সহজভাবে বোঝাতে হবে—অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, নোংরা বাসন, কাঁচা খাদ্য, মাছি, অসুস্থ খাদ্যকর্মী কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশ থেকে খাদ্যে ক্ষতিকর জীবাণু যেতে পারে। অর্থাৎ তাকে ব্যাকটেরিয়ার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস শেখানোর পরিবর্তে শেখাতে হবে—“আমার অপরিষ্কার হাত বা দূষিত পানি আমার তৈরি খাবারকে অনিরাপদ করতে পারে।”
পথের খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যে পানি দিয়ে শরবত তৈরি করা হচ্ছে, বরফ তৈরি করা হচ্ছে, ফল ধোয়া হচ্ছে, প্লেট-গ্লাস পরিষ্কার করা হচ্ছে কিংবা হাত ধোয়া হচ্ছে—সেই পানি নিরাপদ না হলে অন্যান্য সব পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
একইভাবে কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখার বিষয়টি শেখাতে হবে। কাঁচা মাংস বা মাছ কাটার ছুরি ও বোর্ড দিয়ে রান্না করা খাবার কাটা হলে দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুচকার জন্য ব্যবহৃত পানি, সালাদ, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ কিংবা অন্য যেসব উপকরণ রান্না ছাড়াই খাওয়া হয়, সেগুলোর পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
লেভেল ১ প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাদ্য প্রস্তুতের আগে, বর্জ্য স্পর্শ করার পর, কাঁচা খাদ্য ধরার পর, কাশি বা হাঁচির পর এবং হাত নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাজের পর সঠিকভাবে হাত ধুতে হবে।
পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে আরও একটি বাস্তব বিষয় শেখাতে হবে—একই হাতে টাকা এবং প্রস্তুত খাবার ধরা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা। টাকা অসংখ্য মানুষের হাতে ঘোরে। তাই সম্ভব হলে টাকা নেওয়া এবং খাদ্য পরিবেশনের কাজ আলাদা করা, চিমটা বা উপযুক্ত পরিবেশন উপকরণ ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
খাবার ঢেকে রাখা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করা, বর্জ্য ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা, পরিষ্কার ও নোংরা বাসন আলাদা রাখা, রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় না রাখা এবং বাসি খাবার ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়গুলোও পথের খাবারের লেভেল ১ পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—“পরিষ্কার দেখালেই নিরাপদ নয়।” স্বচ্ছ পানি জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। ভালো গন্ধযুক্ত খাবারেও ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। পরিষ্কার দেখতে একটি হাতেও জীবাণু থাকতে পারে। ফলে শুধু চোখ বা নাক দিয়ে খাবারের নিরাপত্তা বিচার করা যায় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে উৎপাদন এলাকায় পান, জর্দা, তামাক বা সুপারি খাওয়া, থুতু ফেলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, অপরিষ্কার পোশাক পরে খাদ্য তৈরি করা এবং খোলা খাবারের পাশে বর্জ্য রাখা—এসব আচরণ নিয়েও প্রশিক্ষণে আলোচনা করা উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থ অবস্থায় কাজ করা। ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, সংক্রমিত ক্ষত কিংবা সংক্রামক রোগের লক্ষণ থাকলে খাদ্য তৈরি বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জানাতে হবে। একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ দোকান বন্ধ করলে তার দিনের আয় বন্ধ হতে পারে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত সহায়তার বিষয়টিও ভাবতে হবে।
লেভেল ১-এর আরেকটি প্রধান শিক্ষা হওয়া উচিত—“সন্দেহ হলে থামুন এবং জানান।” কারখানায় কাচ ভেঙে গেলে, মেশিন থেকে ধাতুর অংশ খুলে গেলে কিংবা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে যেমন কাজ থামানো দরকার, পথের খাবারের ক্ষেত্রে দূষিত পানি পাওয়া গেলে, পচা কাঁচামাল দেখা গেলে, খাবারের মধ্যে পোকা বা বাহ্যিক বস্তু পাওয়া গেলে কিংবা খাবার নষ্ট হওয়ার সন্দেহ হলে সেটি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এই জাতীয় লেভেল ১ শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ—বিএফএসএ নেতৃত্ব দিতে পারে। ইতিবাচক বিষয় হলো, বিএফএসএ ইতোমধ্যেই খাদ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শেখার উপকরণ প্রকাশ করেছে এবং পথের খাবার বিক্রেতাদের নিয়েও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পথের খাবার বিক্রেতাদের জন্য হাতে-কলমে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা যায়।
এই অভিজ্ঞতাকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ হিসেবে না রেখে জাতীয় কাঠামোয় নিয়ে আসাই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ। এর নাম হতে পারে—“বিএফএসএ খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১: মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা”।
এর আওতায় খাদ্য কারখানার নতুন কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গুদাম ও প্যাকিং সহকারী, অস্থায়ী কর্মী, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীর পাশাপাশি পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা, ক্ষুদ্র খাবারের দোকানদার, বাজারে প্রস্তুত খাবার বিক্রেতা এবং ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
তবে সবার প্রশিক্ষণ একেবারে একই হওয়া প্রয়োজন নেই। কারখানার কর্মীর জন্য যন্ত্রপাতি, উৎপাদন এলাকা এবং কারখানার পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ থাকবে। পথের খাবার বিক্রেতার প্রশিক্ষণে বেশি গুরুত্ব পাবে নিরাপদ পানি, বরফ, হাত ধোয়া, রান্না ও সংরক্ষণ, কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখা, টাকা ও খাবার পরিচালনা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
প্রশিক্ষণ অবশ্যই সহজ বাংলায় হওয়া উচিত এবং ছবি, বাস্তব উদাহরণ ও প্রদর্শনের ওপর বেশি নির্ভর করা উচিত। যারা পড়তে বা লিখতে পারেন না, তারাও যেন এই প্রশিক্ষণ নিতে এবং মূল্যায়নে অংশ নিতে পারেন। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার পরীক্ষা নয়।
বিএফএসএ জাতীয় পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা এবং মূল্যায়নের মান নির্ধারণ করতে পারে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষিত খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ, অভিজ্ঞ খাদ্যশিল্প পেশাজীবী, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বিক্রয়কেন্দ্র ধরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার পথের খাবার বিক্রির অনুমতির সঙ্গে এই মৌলিক প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য যেন শুধু আরেকটি সনদ তৈরি করা না হয়। লক্ষ্য হবে বিক্রেতা বাস্তবে নিরাপদ পানি ব্যবহার করছেন কি না, হাত পরিষ্কার রাখছেন কি না, খাবার ঢেকে রাখছেন কি না এবং কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখছেন কি না।
পরিদর্শনের সময় তাই শুধু “সনদ আছে?” প্রশ্ন করলে চলবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে—“আপনার হাত ধোয়ার পানি কোথায়?”, “এই বরফের পানি নিরাপদ কি না কীভাবে জানেন?”, “কাঁচা মাংস কাটার ছুরি দিয়ে রান্না করা খাবার কাটবেন কি?”, “ডায়রিয়া হলে কী করবেন?”, “বিক্রি না হওয়া খাবার আগামীকাল কীভাবে ব্যবহার করবেন?” সঠিক উত্তর এবং বাস্তব কাজ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরীক্ষাগার, আইন, তদারকি, আধুনিক কারখানা, জিএমপি, হ্যাসাপ ও আন্তর্জাতিক মান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ প্রতিদিন যে খাবারটি খান, তার সবটাই বড় কারখানা থেকে আসে না। রাস্তার পাশের ফুচকা, চটপটি, সিঙ্গারা, শরবত কিংবা ছোট দোকানের খাবারও আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই নিরাপদ খাদ্যের জাতীয় উদ্যোগে বড় কারখানার কর্মী এবং রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র খাবার বিক্রেতাকে দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। দুজনের কাজের পরিসর আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুজনের হাতেই ভোক্তার খাদ্যের নিরাপত্তা নির্ভর করে।
বাংলাদেশের জন্য তাই একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী নীতি হতে পারে—যিনি মানুষের জন্য খাদ্য তৈরি, প্রক্রিয়াজাত, পরিবেশন বা বিক্রি করবেন, কাজ শুরু করার আগে তার মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা থাকা প্রয়োজন।
কারখানার কর্মী থেকে পথের খাবার বিক্রেতা—সবার কাছে যদি এই প্রাথমিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু আইন, অভিযান বা কারখানার সনদের বিষয় হয়ে থাকবে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হবে।
নিরাপদ খাদ্য শেষ পর্যন্ত শুধু পরীক্ষাগারে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় পরিষ্কার হাতে, নিরাপদ পানিতে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সঠিক অভ্যাসে এবং নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম পাঠ হতে পারে—খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১।
[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে আসে খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, মোবাইল কোর্ট, খাদ্য পরীক্ষা, জীবাণু, কারখানার স্বাস্থ্যবিধি, জিএমপি, হ্যাসাপ, আইএসও ২২০০০ কিংবা এফএসএসসি ২২০০০-এর মতো বিষয়। এগুলোর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সবচেয়ে মৌলিক জায়গাটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—যে মানুষটি প্রতিদিন খাদ্য তৈরি করছেন, রান্না করছেন, কাঁচামাল বহন করছেন, খাদ্য পরিবেশন করছেন, যন্ত্র চালাচ্ছেন, খাদ্য প্যাক করছেন, গুদামে রাখছেন কিংবা উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার করছেন, তিনি খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো কতটা জানেন?
এই প্রশ্নটি শুধু বড় খাদ্য কারখানার জন্য নয়। রাস্তার পাশে যিনি ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পরোটা, ভাজাপোড়া, শরবত, ফলের রস বা অন্য কোনো খাবার তৈরি ও বিক্রি করছেন, তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কারণ খাদ্য কারখানায় তৈরি হোক কিংবা রাস্তার ছোট দোকান বা ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে তৈরি হোক—খাদ্য অনিরাপদ হলে ভোক্তার জন্য ঝুঁকি একই।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাই পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদেরও খাদ্যকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
একটি খাদ্য কারখানায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে পারে। হ্যাসাপ পরিকল্পনা থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদ থাকতে পারে, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও থাকতে পারে। কিন্তু একজন কর্মী যদি টয়লেট থেকে এসে সঠিকভাবে হাত না ধুয়ে খাদ্য স্পর্শ করেন, ডায়রিয়া বা বমির মতো অসুস্থতা গোপন করে কাজে যোগ দেন, মেঝেতে পড়ে যাওয়া কোনো উপকরণ আবার ব্যবহার করেন কিংবা পরিষ্কার করার রাসায়নিক খাদ্যের পাশে রেখে দেন—তাহলে প্রতিষ্ঠানের উন্নত খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে পথের খাবারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সেখানে সব সময় পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বর্জ্য ফেলার স্থান, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা ঢাকা দেওয়া খাবার রাখার সুযোগ নাও থাকতে পারে। ধুলাবালি, মাছি, যানবাহনের ধোঁয়া, অপরিষ্কার পানি, একই হাতে টাকা ও খাবার ধরা এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় পরিবেশের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়ার মতো বিষয়ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গাতেই প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১, অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার একেবারে প্রাথমিক শিক্ষা। লেভেল ১ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার স্তর নয়। এটি মূলত কর্মক্ষেত্রভিত্তিক খুব সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা। একজন মানুষ খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, বিক্রয় বা পরিবেশনের কাজ শুরু করার আগে ন্যূনতম কী কী বিষয় জানবেন, সেটিই এই শিক্ষার মূল বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা শুধু বড় আধুনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি খাদ্য কারখানা রয়েছে। রয়েছে মিষ্টির কারখানা, বেকারি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা, পানীয় প্রস্তুতকারী, মসলা, আচার, সস, জ্যাম-জেলি, স্ন্যাকস ও হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারীসহ হাজারো ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা। এর সঙ্গে রয়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, ক্যান্টিন এবং বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের অসংখ্য পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা।
এসব মানুষের প্রত্যেককে হ্যাসাপের জটিল বিষয় শেখানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রত্যেককে অবশ্যই জানতে হবে—তার হাত, পানি, কাঁচামাল, বাসনপত্র, পোশাক, অসুস্থতা কিংবা একটি ছোট ভুল কীভাবে খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত—“নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্ব আমারও।”
একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন না, তার আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও নেই। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই কাঁচামাল কিনছেন, খাবার তৈরি করছেন, সংরক্ষণ করছেন, পরিবেশন করছেন, টাকা নিচ্ছেন এবং বাসন পরিষ্কার করছেন। ফলে তার খাদ্য নিরাপত্তা জ্ঞানই অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যবসার প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা।
খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রশিক্ষণ তাই শুধু কারখানার কর্মীদের জন্য তৈরি করলে চলবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর একটি বিশেষ অংশ অথবা আলাদা সংস্করণ থাকতে পারে পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের জন্য।
বাংলাদেশে এ প্রয়োজনের পক্ষে গবেষণার তথ্যও রয়েছে। ২৬৬ জন পথের খাবার বিক্রেতাকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশের বেশি বিক্রেতা খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। গবেষকেরা নিয়মিত মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ঢাকার ৩৫০ জন পথের খাবার বিক্রেতার ওপর আরেকটি গবেষণাতেও ৮৫ শতাংশের কোনো খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ছিল না। অর্থাৎ পথের খাবার খাতকে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার বাইরে রেখে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।
বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতির কর্মপরিকল্পনাতেও পথের খাবার বিক্রেতা ও শহুরে খাদ্য উৎপাদকদের জন্য দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে পথের খাবারকে জাতীয় লেভেল ১ প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করার যথেষ্ট নীতিগত ভিত্তিও রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য লেভেল ১ প্রশিক্ষণ খুব দীর্ঘ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই থেকে তিন ঘণ্টার একটি সুপরিকল্পিত ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েই একজন নতুন কর্মী কিংবা পথের খাবার বিক্রেতার মধ্যে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া নয়; উদ্দেশ্য হতে হবে আচরণ পরিবর্তন করা।
প্রথমেই তাকে বোঝাতে হবে খাদ্যের মধ্যে কীভাবে বিপদ আসতে পারে। সহজভাবে খাদ্যের বিপদকে জীবাণুজনিত, রাসায়নিক, বাহ্যিক বস্তুজনিত এবং অ্যালার্জিজনিত—এই কয়েকটি ভাগে বোঝানো যেতে পারে।
জীবাণুজনিত বিপদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ইস্ট, ছত্রাক, পরজীবী এবং কিছু অণুজীবের স্পোর। তবে একজন সাধারণ কর্মী বা পথের খাবার বিক্রেতাকে এসব জীবাণুর জটিল বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাকে সহজভাবে বোঝাতে হবে—অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, নোংরা বাসন, কাঁচা খাদ্য, মাছি, অসুস্থ খাদ্যকর্মী কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশ থেকে খাদ্যে ক্ষতিকর জীবাণু যেতে পারে। অর্থাৎ তাকে ব্যাকটেরিয়ার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস শেখানোর পরিবর্তে শেখাতে হবে—“আমার অপরিষ্কার হাত বা দূষিত পানি আমার তৈরি খাবারকে অনিরাপদ করতে পারে।”
পথের খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যে পানি দিয়ে শরবত তৈরি করা হচ্ছে, বরফ তৈরি করা হচ্ছে, ফল ধোয়া হচ্ছে, প্লেট-গ্লাস পরিষ্কার করা হচ্ছে কিংবা হাত ধোয়া হচ্ছে—সেই পানি নিরাপদ না হলে অন্যান্য সব পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
একইভাবে কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখার বিষয়টি শেখাতে হবে। কাঁচা মাংস বা মাছ কাটার ছুরি ও বোর্ড দিয়ে রান্না করা খাবার কাটা হলে দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুচকার জন্য ব্যবহৃত পানি, সালাদ, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ কিংবা অন্য যেসব উপকরণ রান্না ছাড়াই খাওয়া হয়, সেগুলোর পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
লেভেল ১ প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাদ্য প্রস্তুতের আগে, বর্জ্য স্পর্শ করার পর, কাঁচা খাদ্য ধরার পর, কাশি বা হাঁচির পর এবং হাত নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাজের পর সঠিকভাবে হাত ধুতে হবে।
পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে আরও একটি বাস্তব বিষয় শেখাতে হবে—একই হাতে টাকা এবং প্রস্তুত খাবার ধরা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা। টাকা অসংখ্য মানুষের হাতে ঘোরে। তাই সম্ভব হলে টাকা নেওয়া এবং খাদ্য পরিবেশনের কাজ আলাদা করা, চিমটা বা উপযুক্ত পরিবেশন উপকরণ ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
খাবার ঢেকে রাখা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করা, বর্জ্য ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা, পরিষ্কার ও নোংরা বাসন আলাদা রাখা, রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় না রাখা এবং বাসি খাবার ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়গুলোও পথের খাবারের লেভেল ১ পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—“পরিষ্কার দেখালেই নিরাপদ নয়।” স্বচ্ছ পানি জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। ভালো গন্ধযুক্ত খাবারেও ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। পরিষ্কার দেখতে একটি হাতেও জীবাণু থাকতে পারে। ফলে শুধু চোখ বা নাক দিয়ে খাবারের নিরাপত্তা বিচার করা যায় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে উৎপাদন এলাকায় পান, জর্দা, তামাক বা সুপারি খাওয়া, থুতু ফেলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, অপরিষ্কার পোশাক পরে খাদ্য তৈরি করা এবং খোলা খাবারের পাশে বর্জ্য রাখা—এসব আচরণ নিয়েও প্রশিক্ষণে আলোচনা করা উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থ অবস্থায় কাজ করা। ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, সংক্রমিত ক্ষত কিংবা সংক্রামক রোগের লক্ষণ থাকলে খাদ্য তৈরি বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জানাতে হবে। একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ দোকান বন্ধ করলে তার দিনের আয় বন্ধ হতে পারে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত সহায়তার বিষয়টিও ভাবতে হবে।
লেভেল ১-এর আরেকটি প্রধান শিক্ষা হওয়া উচিত—“সন্দেহ হলে থামুন এবং জানান।” কারখানায় কাচ ভেঙে গেলে, মেশিন থেকে ধাতুর অংশ খুলে গেলে কিংবা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে যেমন কাজ থামানো দরকার, পথের খাবারের ক্ষেত্রে দূষিত পানি পাওয়া গেলে, পচা কাঁচামাল দেখা গেলে, খাবারের মধ্যে পোকা বা বাহ্যিক বস্তু পাওয়া গেলে কিংবা খাবার নষ্ট হওয়ার সন্দেহ হলে সেটি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এই জাতীয় লেভেল ১ শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ—বিএফএসএ নেতৃত্ব দিতে পারে। ইতিবাচক বিষয় হলো, বিএফএসএ ইতোমধ্যেই খাদ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শেখার উপকরণ প্রকাশ করেছে এবং পথের খাবার বিক্রেতাদের নিয়েও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পথের খাবার বিক্রেতাদের জন্য হাতে-কলমে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা যায়।
এই অভিজ্ঞতাকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ হিসেবে না রেখে জাতীয় কাঠামোয় নিয়ে আসাই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ। এর নাম হতে পারে—“বিএফএসএ খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১: মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা”।
এর আওতায় খাদ্য কারখানার নতুন কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গুদাম ও প্যাকিং সহকারী, অস্থায়ী কর্মী, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীর পাশাপাশি পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা, ক্ষুদ্র খাবারের দোকানদার, বাজারে প্রস্তুত খাবার বিক্রেতা এবং ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
তবে সবার প্রশিক্ষণ একেবারে একই হওয়া প্রয়োজন নেই। কারখানার কর্মীর জন্য যন্ত্রপাতি, উৎপাদন এলাকা এবং কারখানার পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ থাকবে। পথের খাবার বিক্রেতার প্রশিক্ষণে বেশি গুরুত্ব পাবে নিরাপদ পানি, বরফ, হাত ধোয়া, রান্না ও সংরক্ষণ, কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখা, টাকা ও খাবার পরিচালনা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
প্রশিক্ষণ অবশ্যই সহজ বাংলায় হওয়া উচিত এবং ছবি, বাস্তব উদাহরণ ও প্রদর্শনের ওপর বেশি নির্ভর করা উচিত। যারা পড়তে বা লিখতে পারেন না, তারাও যেন এই প্রশিক্ষণ নিতে এবং মূল্যায়নে অংশ নিতে পারেন। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার পরীক্ষা নয়।
বিএফএসএ জাতীয় পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা এবং মূল্যায়নের মান নির্ধারণ করতে পারে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষিত খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ, অভিজ্ঞ খাদ্যশিল্প পেশাজীবী, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বিক্রয়কেন্দ্র ধরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার পথের খাবার বিক্রির অনুমতির সঙ্গে এই মৌলিক প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য যেন শুধু আরেকটি সনদ তৈরি করা না হয়। লক্ষ্য হবে বিক্রেতা বাস্তবে নিরাপদ পানি ব্যবহার করছেন কি না, হাত পরিষ্কার রাখছেন কি না, খাবার ঢেকে রাখছেন কি না এবং কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখছেন কি না।
পরিদর্শনের সময় তাই শুধু “সনদ আছে?” প্রশ্ন করলে চলবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে—“আপনার হাত ধোয়ার পানি কোথায়?”, “এই বরফের পানি নিরাপদ কি না কীভাবে জানেন?”, “কাঁচা মাংস কাটার ছুরি দিয়ে রান্না করা খাবার কাটবেন কি?”, “ডায়রিয়া হলে কী করবেন?”, “বিক্রি না হওয়া খাবার আগামীকাল কীভাবে ব্যবহার করবেন?” সঠিক উত্তর এবং বাস্তব কাজ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরীক্ষাগার, আইন, তদারকি, আধুনিক কারখানা, জিএমপি, হ্যাসাপ ও আন্তর্জাতিক মান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ প্রতিদিন যে খাবারটি খান, তার সবটাই বড় কারখানা থেকে আসে না। রাস্তার পাশের ফুচকা, চটপটি, সিঙ্গারা, শরবত কিংবা ছোট দোকানের খাবারও আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই নিরাপদ খাদ্যের জাতীয় উদ্যোগে বড় কারখানার কর্মী এবং রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র খাবার বিক্রেতাকে দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। দুজনের কাজের পরিসর আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুজনের হাতেই ভোক্তার খাদ্যের নিরাপত্তা নির্ভর করে।
বাংলাদেশের জন্য তাই একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী নীতি হতে পারে—যিনি মানুষের জন্য খাদ্য তৈরি, প্রক্রিয়াজাত, পরিবেশন বা বিক্রি করবেন, কাজ শুরু করার আগে তার মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা থাকা প্রয়োজন।
কারখানার কর্মী থেকে পথের খাবার বিক্রেতা—সবার কাছে যদি এই প্রাথমিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু আইন, অভিযান বা কারখানার সনদের বিষয় হয়ে থাকবে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হবে।
নিরাপদ খাদ্য শেষ পর্যন্ত শুধু পরীক্ষাগারে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় পরিষ্কার হাতে, নিরাপদ পানিতে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সঠিক অভ্যাসে এবং নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম পাঠ হতে পারে—খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১।
[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

আপনার মতামত লিখুন